অন্তরালে_আগুন
পর্ব:৩৮
তানিশা সুলতানা
গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন নুপুর। কড়া ডোজের ঘুমের ঔষধ দেওয়ার ফলে এই অসময়ে ঘুমুচ্ছে। গাল দুটো টমেটোর মতো লাল হয়ে আছে।
নওয়ান পাশে বসে সিগারেট টানছে এবং গভীর মনোযোগে চাঁদকে দেখছে।
বল্টু পাশেই ফ্লোরে বসে আছে। তার মনে অনেক প্রশ্ন। কিন্তু সাহস হচ্ছে না কিছু বলার। সে শুধু তাকিয়ে আছে নওয়ানের মুখ পানে।
“বল্টু তুই যা এখন।
আই নিড সাম রেস্ট
বল্টু সঙ্গে সঙ্গে দাঁড়িয়ে পড়ে। চলে যাওয়ার উদ্দেশ্যে পা বাড়িয়ে বলে
” ভাই ভাবি ঘুমুচ্ছে। সিগারেট এর গন্ধে তার ঘুম ভেঙে যেতে পারে।
সঙ্গে সঙ্গেই ঠোঁটের ভাজ থেকে সিগারেট বের করে নওয়ান এবং ছুঁড়ে মারে জানালা বরাবর। বল্টু ততক্ষণে দরজা বন্ধ করে বেরিয়ে গিয়েছে।
নওয়ান নুপুরের পাশে গা এলিয়ে দেয়।
এবং বিরবির করে বলে
“প্রিয় চাঁদ
সাধ্য থাকিলে হতাম সাধু
যেমন তুমি চাও
অভাগা হয়ে এসেছি দুনিয়ায়
পাপই বাঁচার উপায়
ঢাকা থেকে মানিকগঞ্জ এসেছে নায়েব তালুকদার। দুরত্ব খুব বেশি বা প্রথমবার আসছে এমনটা নয়। তবে প্রধানমন্ত্রী হওয়ার পরে এই প্রথমবার নিজ জন্মস্থানে আসছে। আগে পিছে কয়েকশ পুলিশ আর্মি এবং সাংবাদিক রয়েছে। কত শত ক্যামেরা তার দিকে তাক করানো। মানিকগঞ্জ বাসস্ট্যান্ট থেকে বেওথা ব্রিজ পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের ভিড়। জয়ের ধ্বনি ছড়িয়ে পড়েছে চারিদিকে।
সবগুলো টিভি চ্যানেলে ব্রেকিং নিউজ দেখাচ্ছে “নিজ বাসস্থান মানিকগঞ্জ বেওথা গিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে বিদেশ ভ্রমণের প্ল্যানিং রয়েছে।”
বরাবরই এমনটা চেয়ে এসেছেন নায়েব তালুকদার। তাকে নিয়ে ব্যস্ত থাকবে গোটা বাংলাদেশ। তার এক কথায় থেমে যাবে সময়।
শিক্ষামন্ত্রী থাকা অবস্থায় এতোটা সম্মান আর আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে আসতে সক্ষম হয়নি তিনি। তবে এবার সবটা তার মনের মতো হচ্ছে।
এটাই তো জীবন।
এটাকেই বলে ক্ষমতা।
৩ কোটি টাকার বুলেটপ্রুফ কালো রংয়ের গাড়ির কাঁচ নামিয়ে সাধারণ জনগণকে হাত নারিয়ে কুশল বিনিময় করছে। কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করছে।
নায়েব তালুকদারের পাশে বসে আছে রাশেদুল।
তিনি বলে
“ভাই এখন আমাদের থামানোর স্পর্ধা আর কারোর নেই।
নায়েব বাঁকা হেসে বলে
” একটা পথের কাটা আছে।
নাসির শিকদার। শালাকে কেটে টুকরো টুকরো করে বেওথা নদীতে ভাসিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা কর।
রাশেদুল সম্মতি প্রকাশ করে। দুই ভাই আরও কিছু বিষয় নিয়ে আলোচনা করে। তারই মধ্যে তালুকদার বাড়ির সামনে নায়েব তালুকদারের গাড়ি থামে। কালো সুট বুট পরিহিত নায়েব তালুকদার গাড়ি থেকে নামতেই সাংবাদিকরা তার দিকে ক্যামেরা তাক করায়। মাইক্রোফোন ধরে প্রশ্ন করে
“প্রধানমন্ত্রী হয়ে আপনার অনুভূতি কেমন? কতদিন থাকার প্ল্যানিং রয়েছে মানিকগঞ্জ? এবং মানিকগঞ্জ শহরের উন্নতির জন্য তিনি কি কি করবেন?
নায়েব তালুকদার অতি গোপনে সকলের প্রশ্ন এড়িয়ে জবাব দেয়।
” আপনারা জেনে থাকবেন আমার একটি মাত্র সন্তান রয়েছে। তার নাম নওয়ান তালুকদার। সন্তান ছাড়া আমি আমাকে কল্পনা করতে পারি না। আমার বেঁচে থাকার একমাত্র সম্বল হচ্ছে আমার ছেলে। মূলত তার সাথে কিছুটা সময় কাটানোর জন্যই মানিকগঞ্জ এসেছি।
বলেই ভীড় ঠেলে বাড়ির ভেতরে পা রাখে। দুজন দারোয়ান ফজলু আর আলালের সঙ্গে কুশল বিনিময় করতেও ভুলে না।
গেটের বাইরেই দাঁড়িয়ে থাকে সাংবাদিক পুলিশ এবং আর্মিরা। তাদের ভেতরে ঢোকার অনুমতি নেই। ওই ওবদিই তাদের অধিকার।
বাড়ির মেইন দরজা খোলা ছিলো। আমিনা অধিক আগ্রহে অপেক্ষা করছিলেন স্বামীর জন্য। মাঝে মাঝে বড্ড রাগ হয়, অভিমান জমে মনে, কান্না পায়, আফসোস হয়। মানুষটা ভালোবাসলো না, রাগ বুঝলো না, অভিমান বুঝলো না, এসব ভেবে তার ওপর থেকে মায়া কমাতে ইচ্ছে করে। কিন্তু দিন শেষে এই মানুষটার মুখটা দেখতে পেলেই সে শান্তি পায়। মনে হয় দেহে প্রাণ ফিরে আসলো। ভালোবাসা বড্ড অদ্ভুত।
কথায় থাকে না “আমরা সব সময় ভুল মানুষকেই ভালোবাসি। আমাদের প্রতি যাদের এতটুকুও গুরুত্ব নেই আমরা তাদেরই বেঁচে থাকার অক্সিজেন বানিয়ে ফেলি”
নায়ের তালুকদার আমিনার মুখপানে তাকিয়ে একটুখানি হাসে। যৌবনকালে বেশ সুদর্শন পুরুষ ছিলো যার যৌলস এখনো কমে নি।
চুল দাঁড়ি হালকা সাদা হতে শুরু করেছে। মুখে বয়স্কের ছাপ স্পষ্ট। তবুও তাকে অদ্ভুত সুন্দর দেখায়। আমিনা বারংবার প্রেমে পড়ে।
“কি অবস্থা?
আমিনার গালে হাত দিয়ে শুধায় নায়েব। বোধহয় লজ্জা পেলো আমিনা। গাল দুটো কেমন লাল হয়ে ওঠে। দৃষ্টি নামিয়ে রিনরিনিয়ে জবাব দেয়
” ভালো আছি।
ভেতরে আসুন
মাথা নারিয়ে ভেতরে ঢুকে পড়ে নায়েব। ড্রয়িং রুমের সোফায় বসে পড়ে পায়ের ওপর পা তুলে। এদিক ওদিক দৃষ্টি ফিরিয়ে কাউকে খুঁজতে থাকে। চতুর আমিনা ঠিক বুঝতে পারে ছেলেকে খুঁজছে সে। তাই দৌড়ে চলে যায় নওয়ানের কক্ষের পানে। রাশেদুল সাংবাদিক এবং পুলিশ আর্মিদের বিদেয় করে এসে নায়েব তালুকদারের পাশে বসে পড়ে। বড়ই ক্লান্ত সে। লাঠিতে ভর দিয়ে নিজ কক্ষ থেকে বেরিয়ে আসে মজনু তালুকদার। গম্ভীর তার চোখ মুখ। মীরা কিচেন থেকে বেরিয়ে আসে ট্রে হাতে। নায়েব এবং রাশেদুলকে শরবত দেয়। ভালো মন্দ আলাপ করে চলে যায়।
মজনু তালুকদার বসে পড়ে ছেলেদের মুখোমুখি।
“৫০ বছর রাজনীতি করছি আমি। প্রথমে চেয়ারম্যানের পেছন পেছন ঘুরতাম। তারপর মেম্বার পদে ভোটে দাঁড়ালাম। চেয়ারম্যান এর সহযোগিতায় পাস করে গেলাম। পাঁচ বছর পরে চেয়ারম্যান এর বিপক্ষে নির্বাচনে দাঁড়ালাম। পাস করলাম।।
দীর্ঘ বিশ বছর এক টানা চেয়ারম্যান ছিলাম মানিকগঞ্জ শহরের।
তারপর এমপি হলাম।
নায়েব যোগ্য হওয়ার পরে তাকে শিক্ষা মন্ত্রী বানালাম। মুখের কথায় এতো কিছু?
নায়েব বলে
” আব্বা হয়েছে কি?
“তোর ছেলে ওই মেয়েকে আবার বাড়িতে নিয়ে এসেছে। আনু মেয়েটা বেঁচে আছে।
৪০ জন মেয়েকে খুঁজে পাচ্ছি না।
রাশেদুল বাঁকা হেসে বলে
” আব্বা আপনি চিন্তা করিয়েন না। আনুও মরবে। ওই মেয়েটাও বাড়ি থেকে বেরু
“চাচ্চু চাঁদ এই বাড়ি থেকে বেরুবে না।
উসকো খুসকো চুল, ঢিলাঢালা কালো রংয়ের টিশার্ট, কালো শর্ট প্যান্ট, ঠোঁটের ভাজে সিগারেট। সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে আসছে নায়েব তালুকদারের রাজপুত্র। আহহা কি সুন্দর। চোখ জুড়িয়ে যায় নায়েব এর। বিরবির করে কয়েকবার মাশাআল্লাহ মাশাআল্লাহ বলে ওঠে।
বাবার পাশে এসে বসে। রাশেদুল বলে
“বাজান তুমি কেনো বুঝতে পারছো না ওই মেয়ে আমাদের ধ্বংস করবে বলেই এই বাড়িতে এসেছে। তাকে মে/রে ফেলো তুমি।
নওয়ান সিগারেটে টান দিয়ে চাচ্চুর চোখে চোখ রাখে। এবং নির্ভয়ে বলে
“ধ্বংসের শেষ প্রান্তে দাঁড়িয়েও আমি বলবো চাঁদকে আমার লাগবেই।
ম/রে যাবো তবুও ওকে ছাড়বো না।
দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মজনু তালুকদার। তিনি মনে মনে ভেবে ফেলে “এবার আমাকেই কিছু করতে হবে”
উন্নত চিকিৎসার জন্য আনুকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নেওয়া হয়েছে। কিন্তু ভাগ্য বোধহয় সাথে ছিলো না বা আনুরই বোধহয় বেঁচে থাকার ইচ্ছে ছিলো না। তাই তো অপারেশন থিয়েটার থেকে ফিরে আসতে পারে না। অপারেশন চলাকালীন সময়েই শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করে। থেমে যায় জীবন প্রদীপ।
একটা জীবনের গল্প এখানেই সমাপ্ত।
ডাক্তার এবং নার্সরা স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ে। এমন টা তো হওয়ার কথা ছিলো না। এতটাও ক্রিটিক্যাল সিচুয়েশন ছিল না যে অপারেশন চলাকালীন সময় সে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করবে।
মৃ/ত্যুর পরে আনু মুখ দিয়ে লালা বের হয়। এবার সবগুলো ডাক্তার নার্স বুঝে যায় মৃত্যুর রহস্য।
কেউ একজন স্যালাইন বক্সে পয়জন পুশ করেছে। যার ফলেই মৃ/ত্যু ঘটে আনুর।
ইটস এ মার্ডার।
সিফাত বাইরে অপেক্ষা করছিলো। ডাক্তার বেরুবে ভালো একটা খবর দিবে এই অপেক্ষায় প্রহর গুনছিলো।
হাতে তার নীল রংয়ের ডাইরি। কিছু মুহূর্ত আগেই এই ডায়েরি খানা তাকে দিয়েছে এসিপি আশিক। দৌলতদিয়ার সেই ছোট্ট কুটিরে তল্লাশি চালিয়ে এই ডাইরি খানা খুঁজে পেয়েছে। সেই থেকে এটা বুকে চেপে আনুর অপেক্ষায় প্রহর গুনছে।
সময় গড়িয়ে দুই ঘন্টা পেরিয়ে যাচ্ছে কিন্তু অপারেশন থিয়েটার থেকে কোনো খবর আসছে না।
উতলা সিফাত ডাইরি প্রথম পৃষ্ঠা উল্টায়। সেখানে গোটা গোটা অক্ষরে লেখা রয়েছে
“আমি মারা গেলে মসজিদের কাছাকাছি রাস্তার পাশে কবর দিও আমায়।
কোনো একদিন, কোনো এক সময় সে যখন এই রাস্তা দিয়ে যাবে আমার কবর দেখে যেনো থমকে দাঁড়ায়। তার মনে পড়ে যাবে আমার কথা। কিছু মুহুর্ত বসবে আমার পাশে। বড্ড আফসোস নিয়ে বলবে “তোমাকে ঠকিয়ে ঠিক করি নি আমি”
নিজের ভুল সংশোধন এর তাগিদে মসজিদে ছুটবে। নামাজ আদায় করে ক্ষমা চাইবে আল্লাহর নিকটে। আর দোয়া করবে আমার জন্য। ব্যাসস মরে গিয়ে জিতে যাবো আমি।
আনু জানে। আবির এর পাপ পাহাড় ছুঁয়ে গিয়েছে। ক্ষমার অযোগ্য সে। তবুও সে চায় আবির ভালো থাকুক। যাদের সাথে অন্যায় করেছে তারা মানুষটাকে ক্ষমা করুক। এতো অভিশাপে মানুষটার জীবন ছারখার হয়ে না যাক। এই পৃথিবীর সকল সুখ তারই হোক।
অথচ বোকা আনু জানতে পারলো না। তার আবির দুনিয়া ছেড়ে বিদায় নিয়েছে। চরম কষ্টদায়ক মৃত্যু হয়েছে তার। নিথর দেহখানাও শিয়াল কুকুরে ছিড়ে ছিড়ে খেয়েছে। জানাযা কিংবা কবর কোনটাই তার কপালে জোটেনি।
এসব যদি আনু জানতে পারতো। তাহলে হয়ত চিৎকার করে কাঁদতো। বারংবার বলতে থাকতো
“আমি তো তাকে ক্ষমা করে দিয়েছিলাম। তবুও কেনো তাকে এতো যন্ত্রণা দায়ক মৃ/ত্যু দেওয়া হলো?
সিফাত ডাইরি খানা বন্ধ করে ফেলে। আনুর বাবা মা এবং বোনকে সে ঢাকায় আনে নি। আসলে সময়ই হয়ে ওঠেনি।
হঠাৎ মাঝরাতে ডাক্তার জানায় ইমারজেন্সি অপারেশনের জন্য এক্ষনি আনুকে নিয়ে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে যাওয়া উচিত।
সিফাত কোন কিছু চিন্তা না করে, কাউকে কিছু না জানিয়ে, তখনই অ্যাম্বুলেন্স ভাড়া করে ঢাকার উদ্দেশ্যে পাড়ি জমায়।
পথে অবশ্য কল করে উনাদের জানিয়ে দিয়েছিলো।
চলবে
Share On:
TAGS: অন্তরালে আগুন, তানিশা সুলতানা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
অন্তরালে আগুন পর্ব (২৪+২৫)
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ২৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪০
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৭
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৮
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ১৩
-
অন্তরালে আগুন পর্ব:৩৫
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৪
-
অন্তরালে আগুন পর্ব ৩০