Golpo romantic golpo হেই সুইটহার্ট

হেই সুইটহার্ট পর্ব ৫


হেইসুইটহার্ট__০৫

নুসরাতসুলতানাসেঁজুতি

তুহিন যে আঠার মতো তার বসের সাথে লেগে থাকে,সেটা ছুটে গেল সম্রাটের ঘরের সামনে এসে। দরজায় থামল সম্রাট৷ ঘাড় ঘুরিয়ে বলল,
“ তুমি কোথায় যাচ্ছ?”
তুহিন থতমত খেল। মাথা নুইয়ে বলল,
“ আমি আপনার রুমে যাব না, বস। আমি শুধু আপনাকে একটু পৌঁছে দিলাম।”
“ গুড। আমি নিজে না ডাকলে কারো আমার রুমে আসা পছন্দ করি না। তুমি শুতে যাও,সার্ভেন্ট তোমার রুম দেখিয়ে দেবে। উইশ ইউ আ ভেরি গুড নাইট।”
তুহিন ঘাড় নেড়ে বিদায় নিলো। সম্রাটের রুমে ঢোকার একটা বিশেষত্ব আছে, স্মার্ট ডোর লক সেট করা এখানে। পিন,পাসওয়ার্ড বা ফিঙ্গার প্রিন্ট দিয়ে দরজা খুলতে হয়। যেটা সম্রাট ছাড়া কেউ জানে না। ও একটা আঙুল রাখতেই কাচের দরজা খুলে ফাঁকা হল একটু। বাকিটা ঠেলে হাত দিয়ে সরাল সম্রাট। ভেতরে যেতেই দরজা ফের নিজে নিজে বন্ধ হয়ে গেল। এই সিস্টেম কেবল এই রুমে নয়,সম্রাট এখন যে বাড়িতে থাকে,সেখানেও একইরকম।
ও জ্যাকেট খুলে গুছিয়ে হ্যাঙারে ঝুলাল।
এটা সেই ঘর,যেখানে ও জন্ম থেকে আছে। ওর সবচেয়ে প্রিয় জায়গা,ওর নিজের জায়গা। যেখানে আছে সম্রাটের মায়ের গন্ধ, মায়ের স্মৃতি। সম্রাট এখন এ বাড়িতে মাসে একবার আসে। প্রায়সই মাসের পর মাস কাটিয়ে আসে। প্রিয় জায়গায় দীর্ঘস্থায়ী হতে নেই,তাহলে তা আর প্রিয় থাকে না। সম্রাটের ঘরের দেওয়াল চকচক করছে। পুরোটা সাদা দেওয়াল,তবে আসবাবগুলো গাঢ় কফি রঙের তৈরি। পুরো ঘর ঠান্ডা, নিস্তব্ধ, এক অদ্ভুত শৃঙ্খলায় মোড়ানো। একটা কাগজও এদিক-সেদিক নেই। সব ভাঁজে ভাঁজে গুছিয়ে রাখা। ধুলো-টুলো না পড়লেও,একটা সাদাটে স্পাইডার সিল্ক দেখা যাচ্ছে। সম্রাট নিজেই মাইক্রোফাইবার ক্লথ নিয়ে ঘরের আসবাব মুছতে নিলো। বন্ধ কাঁচ,পর্দা, দেওয়ালে অ্যাটাচড বুক-শেল্ফ, শেল্ফে রাখা সাইক্রিয়াট্রি,নিউরোসায়েন্স থেকে শুরু করে কেমিস্ট্রির একেকটি ভাগ নিয়ে রাখা সব বই যত্ন নিয়ে মুছল সে।
খাটের ঠিক পেছনের দেওয়ালে একইরকম সেট করা আরেকটা ওয়াল শোকেজ আছে। তালা দেয়া ওটাতে। ভেতরে একেকটি কাচের ছোটো ছোটো বোতল দেখতে ঠিক শো-পিচের মতোই। সম্রাট গ্লাভস পরল আগে৷ পকেট হাতিয়ে ওয়ালেট বের করল। এক ভাগে চাবির একটা গোছা রাখা, সেখান থেকে নিয়ে খুলল সেটা। প্রত্যেকটা ছোটো ছোটো বোতলের গায়ে আলাদা লেবেল করা। খুব অদ্ভুতুরে অক্ষর দিয়ে উল্লেখ করা একেকটির নাম। এগুলো ওর শখের জিনিস। সম্রাট সব গুলো বোতল মনোযোগ দিয়ে মুছল। হাত পৌঁছাল শেষেরটায়। গায়ে লেখা ক্রিপথার ( ছদ্মনাম)।
অমনি থামল সম্রাট। ছোট বোতলটা তুলে ধরল চোখের সামনে। কাচের উষ্ণতায় ঝলকে উঠল ওর সবুজ নয়নমনি। কেমন ভয়ংকর এক দানবের মতো লাগল দৃষ্টিজোড়া। অথচ খুব সুন্দর করে হাসল সম্রাট। ফিসফিসিয়ে বলল,
“ হেই ডেঞ্জার,হোয়াট এবাউট ইউ?”
“ ইউ নো না,তুমি আমার সব চেয়ে পছন্দের?”
তারপর বোতলটা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে মুছে রেখে দিলো সম্রাট। হঠাৎ চোখ পড়ল টেবিলের ওপর। টিস্যু বক্সটা বেঁকে গেছে একটু। কিন্তু ও যাওয়ার সময় এটাকে একদম ইস্টের কোণাকুণি রেখেছিল না? সম্রাটের নাকের পাটা ফুঁসে উঠল অমনি। হনহনে পায়ে বাইরে এসে
চ্যাঁচাল,
“ রোজি,রোজি…”
দু ডাকে ছুটে এলেন রোজি।
“ হাঁ বেটা, কিছু চাই?”
“ আমার ঘরে কে এসেছিল…?”
“ কে আসবে? তোমার দরজা তো লক থাকে বেটা। আমরা কেউ জানি না।”
সম্রাটকে এক ভাবে চেয়ে থাকতে দেখে একটু ঘাবড়ে গেলেন তিনি।
“ সত্যি বলছি বেটা, আমি আসিনি। তোমার বাবাও আসেনি। আমরা তো জানি তুমি তোমার ঘরে ঢোকা পছন্দ করো না।”
সম্রাট গালের ভেতর জিভ ঘুরিয়ে কিছু একটা ভাবল। ঘাড় নেড়ে বলল,
“ গুড, এটাই সব সময় মাথায় রাখবে। নাহলে কথার বাইরে গেলে তাকে আমার বাড়ি থেকে যাস্ট ছুড়ে ফেলে দেব।”
রোজির মুখ কালো হয়ে গেল। টেনেহিঁচড়ে হাসলেন তাও।
ছোটো করে বললেন,
“ শিয়র বেটা,মনে থাকবে।”
“ যাও।”
ঘুরে হাঁটা ধরলেন রোজি। সম্রাট দরজা আটকে দিতেই কিড়মিড় করে উঠলেন নীরবে।

সম্রাট ল্যাপটপ নিয়ে বিছানায় বসল। গোরদেনের কয়েক জায়গায় ওর লাগানো হিডেন ক্যামেরা আছে। যা ও ছাড়া একটা কাকপক্ষীও জানে না। আর তার একটা ছিল ঠিক স্মার্ট লক ডোরের কালো গ্লাসের ভেতরে। পিন টাইপ করতে এলেই মুখ রেকর্ড করে সে। যেখানে কিছুক্ষণের মাঝেই কিশোর আফনানের চেহারা ভেসে উঠল। অমনি নিঃশব্দে হেসে ফেলল সম্রাট। ল্যাপটপ বন্ধ করে
বলল
“ সরি আফনান,ইউ হ্যাভ টু পে ফর দিস ব্রো।”


সরু পাথরের রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ছোট্ট একটা ক্যাফে। কাঠের দরজা,দরজার হাতলে লেখা ‘’ ক্যাফে ও তে”। সাদাকালো স্টকহোমের কয়েকটি জায়গার ছবি ঝুলছে দেওয়ালে। আজ একটু রোদ আছে বোধ হয়। গত কয়েকদিনের মতো অত শীত পড়েনি । ক্যাফের সব থেকে পেছনের সাড়ির একটা টেবিলে বসে আছে আলভিন। ২৭ বছরের যুবক,ফরসা মুখ,ফরমাল নীল শার্টের ওপর সাদা কোর্ট পরনে। জিন্স প্যান্টের সাথে পায়ে খুব দামি বুট। মাথার কোকড়া চুলগুলো সুন্দর করে আচড়ানো। ক্লিন শেভে চকচকে গাল। আলভিন পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার। উচ্চশিক্ষার জন্যে একদিন সুইডেনে আসা, আর তারপর এখানেই চাকরি।
কাচের জানলা মাড়িয়ে ছুটে আসা উষ্ণতায় একবার হাতঘড়ি দেখল আলভিন।
তার দু চোখ ছাপানো অপেক্ষা কমাতে এখনো হাজির হয়নি কুহু। ধোঁয়ার মতো কুয়াশা মাড়িয়ে দেখাও যাচ্ছে না ওকে। মেয়েটা আসবে তো?
আলভিন একবার ফুলের বুকেটা দেখল। কুহুর জন্যে কিনেছে সে৷ ছোটো ছোটো নানা রঙের টিউলিপ দিয়ে বানানো। কুহুর খুব পছন্দের ফুল। দেখলে খুশিও হবে নিশ্চয়ই? আলভিন হাসল,শান্তির হাসি। আজ প্রায় ১ মাস ৬ দিন, পর কুহু আবার দেখা করতে আসবে। সুইডেনে আসা থেকে পরিবারের পর যার জন্যে আলভিন খুব ছটফট করে দিন পার করতো,সে ওই একজন,কুহু৷ তার প্রিয়মি…
ঠিক তক্ষুনি দরজা ঠেলে হন্তদন্ত পায়ে ঢুকল কুহু। গায়ে ওভারকোর্ট আছে,তাও শীতে কাঁপতে কাঁপতে চাইল চারিদিক। আলভিন ওকে দেখেই সোজা হয়ে বসল। হাত নাড়ল উদ্বেগে,
“ হ্যালো প্রিয়মি….”
কুহু ডাক শুনেই বুঝে গেল,আলভিন এসেছে।
অমনি ঠোঁটে হাসি টেনে এগিয়ে গেল সে। আলভিন উঠে দাঁড়াল। মেয়েটা আসতেই চেয়ার টেনে দিয়ে বলল,
“ বোসো।,কী অবস্থা? বেশি শীত করছে?”
“ স্নো পড়ছিল। একটু ফিল করছিলাম,তাতেই হাত পা জমে গেছে।”
বসল কুহু।
আলভিন বলল,
“ তাহলে আগে কফি খাও। দাঁড়াও বলছি…”
আলভিন হাত তুলে ওয়েটার ডাকল,অর্ডার করল দুজনের জন্যে।
কুহু ব্যাগ থেকে টিফিন বাক্স বের করে সামনে রাখল ওর।
“ আপনার খিচুড়ি।”
আলভিন অবাক হয়ে বলল,
“ সত্যিই এনেছ? আমি তো মজা করে বলেছিলাম।”
“ কিন্তু আমি সিরিয়াস ছিলাম। খেয়ে বলবেন কেমন হয়েছে।”
“ নিশ্চয়ই!’’
“ আর এটা তোমার।”
টিউলিপ দেখে কুহুর কপালে ভাঁজ পড়ল।
“ আজকেও?”
“ এনি টাইম ফর ইউ। তিয়াশা বলে,তোমাকে কেউ অতটা খুশি করতে পারে না,যতটা খুশি তুমি টিউলিপ দেখে হও।”
কুহু সত্যিই ভীষণ খুশি হল। বুকেটা দুহাতে নিয়ে সতেজ ফুলের ঘ্রাণ শুকলো একবার।
হঠাৎ চোখ পড়ল আলভিনের হাতে। ভ্রু কুঁচকে বলল,
“ এটা কালকের সেই ঘড়িটা না? আমাকে যে দেখালেন? কিন্তু বললেন তো বাড়িতে পাঠাবেন।”
“ হু? হ্যাঁ ওই আসলে তোমাকে বলা হয়নি। মা সুইডেন আসছে। তাই ভাবলাম আমি আর যাব না।”
কুহু হড়বড়িয়ে বলল,
“ আর তিয়াশা,ও আসছে?”
“ হ্যাঁ?”
“ সত্যিইইইই?”
কুহু এত জোরে চিৎকার করল,আশেপাশ থেকে লোকজন তাকাল ঘুরে। মেয়েটা মিইয়ে এলো, বসল ঠিক হয়ে। পরপর কণ্ঠ চেপে বলল,
“ আমি এবার ওর রাগ ভাঙাবই ভাঙাব।”
আলভিন বলল,
“ খুব ভালোবাসো তিয়াশাকে?”
“ ভীষণ!”
“ আর কাউকে বাসো না?”
“ বাসি,মাকে।”
কুহুর মলিন মুখ দেখে শ্বাস ফেলল আলভিন। ওর হাতের ওপর হাত রেখে বলল।
“ কষ্ট পেও না। আন্টি ভালো আছেন, প্রিয়মি। ভালো মানুষেরা সব সময় ভালো থাকে।”
কুহু দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ আমারো তাই মনে হয়।”
“ আজ কি তোমার তাড়া আছে?”
“ না। মাত্র আড়াইটা বাজে। ডিউটি তো ৫টার পর থেকে। কিন্তু আপনি আগে ঠিক করুন আমাকে কী ডাকবেন! ফোনে কুহু,সামনে প্রিয়মি…”
“ যদি অনুমতি দাও প্রিয়মিই ডাকি?”
“ অনুমতির কী আছে? ডাকুন যা ইচ্ছে।”
আলভিন বুক ফুলিয়ে হাসল। স্ফূর্ত হয়ে বলল,
“ থ্যাংক ইউ।”
কুহু সৌজন্যতায় হাসে। এই সুইডেনের মাটিতে ওর নিজের কেউ নেই,আলভিন ছাড়া। এখন ও মানুষটার সাথে যেভাবে মিশছে,অথচ এক সময় কথাই বলতো না। দেখলে মাথা নুইয়ে সালাম দিয়ে চলে যেত। আর এখন দেখা হলে মনে হয়, কুহুর দেশের কেউ আছে,একদম ওর নিজের কেউ। কিংবা তিয়াশাই বসে আছে হয়ত। মানুষ একা হলে কত কী করে তাই না?
কিন্তু মেয়েটার ওই ললিত মুখখানায় লুকিয়ে-চুরিয়ে চেয়ে রইল আলভিন। কুহুর থুতনির ঠিক মাঝখানে একটু গর্তের মতো, এটা কি,টোল? গাল ছাড়াও টোল থাকে কিনা ও জানে না,তবে মেয়েটার এই ব্যাপারটা ওর ভীষণ পছন্দের। তারওপর কুহুর ডান চোখের কার্নিশের পাশে একটা লাল তিল আছে। খুব ঘন ওর চোখের পাপড়িগুলোও। গাল অবধি সেগুলোর ছায়া ভেসে থাকে। আর সব থেকে নজরকাড়া ব্যাপার হলো,কুহুর বা পাশের ছোট গেঁজ দাঁতটা। যখন হাসে,দেখতে লাগে ঠিক ঝিনুকের বুক থেকে বেরিয়ে আসা মুক্তোর মতো।
ততক্ষণে কফি এলো,চুমুক দিতে দিতেও ছেলেটার সেই দৃষ্টি ফিরল না। শীতের চাপা হিম,নাকি সৌন্দর্যের কোনঠাসা উষ্ণতা, কোনো একটার জন্যে কুহুকে দেখতে ভীষণ আদুরে লাগছে আজও। মন দিয়ে সেই মুখটা দেখল আলভিন। দেখল,শুধু দেখল, কিছু বলল না তবে!


রবার্টের আজ শো আছে, অ্যানেক্সেট-এ। ওর এই ফ্ল্যাট থেকে বেশ দূরে সেটা। ৭ তলা অ্যাপার্টমেন্টের এই ৫ তলার ফ্ল্যাট রবার্টের। এখানে ও একাই থাকে। গত বছর ওর স্ত্রী, ৪ বছরের সন্তান নিয়ে আলাদা হয়ে গিয়েছে। ওতে অবশ্য ওর বিশেষ সমস্যা হয় না। সেলিব্রিটি হওয়ার দরুণ নতুন নতুন শরীরে সে মেতে থাকতে পারে।
যদিও এই সেলিব্রিটি তকমা কেবল নামেই এখন। আগের মতো রবার্টের দর্শক চাহিদা নেই। গান,শো,কনসার্ট যাই হোক আপাতত টপে আছে স্যাম..
গতকাল রাতে, স্যামের শোয়ের বেশ কিছু ক্লিপ দেখেছে ও। ইনস্টায় যাওয়াই যাচ্ছে না। ভরে গেছে এসবে। ছেলেমেয়ে সব হা-পিত্যেস করছে স্যাম স্যাম বলে। রবার্টের তখন গা জ্বলে যায়।
এক সময় এই পজিশান ওর ছিল। আর এখন,
রবার্টকে কেউ ডাকেই না বলতে গেলে। ইনস্টা,ইউটিউব কোথাও এখন ওর ট্রেন্ডিং গান নেই। ভিউস নেই,কাজ নেই হাতে। চারদিকে রবার্টের ডাউনফলই কেবল। নাহলে ও যেতো অ্যানেক্সেটের মতো এরকম ছোটখাটো শোতে?
রবার্ট টিভি দেখতে দেখতে ঘড়ির দিকে চাইল। শোয়ের সময় হয়নি। ওয়াইনের গ্লাসে চুমুক দিতে দিতে ফুটবল ম্যাচটা খুব আগ্রহ নিয়ে দেখছিল সে। মদের বোতলের পাশে আরো খাবার আছে। চিপস,আর এক বোল পপকর্ণ..
বেশ কিছু সময় পর ডোরবেল বাজল।
শোয়া থেকে নেমে গিয়ে খুলল রবার্ট। ওয়াচম্যান এসেছেন। খাবারের প্যাকেটটা বাড়িয়ে দিয়ে বললেন,
“ স্যার, ডেলিভারি বয় দিয়ে গেল।”
রবার্ট ভ্রু কুঁচকে ফেলল,
“ কিন্তু আমার তো অর্ডার ছিল না।”
“ তবে যে আমাকে বলল আপনি আধ ঘন্টা আগেই অর্ডার করেছেন।”
“ লেট মি চেইক।”
রবার্ট ফোন হাতে নিয়ে ফুড একাউন্ট দেখল। অর্ডার শো করছে এখানে। কী অদ্ভুত! ওর তো কিছুই মনে নেই। নাকি ওয়াইন ওভারডোজ হয়ে গেল! নাকি ভুল করে অর্ডার হয়ে গেল?
ওয়াচম্যান শুধালেন,
“ তাহলে স্যার?”
“ এসেছে যখন রাখো, পে করে দিচ্ছি।”
“ ওকে স্যার।”
ভদ্রলোক প্যাকেটটা নিচে রেখে, চলে গেলেন। রবার্ট প্যাকেটের গায়ে স্প্রে করল,তারপর তুলল নিজের হাতে। দোর আটকে ফিরে এলো জায়গায়।
একটা লার্জ সাইজ বার্গার আর চিকেন স্ট্রিপ এতে। দেখতেই তো ভীষন ডিলিসাস। ম্যাচ দেখতে দেখতে রবার্ট খেল সবটা। প্যাকেট ফেলল ডাস্টবিনে। ফোনটা তক্ষুনি বাজল। ওর ম্যানেজার কল করছে। স্ক্রিনে এক পল দেখে লাইন কেটে দিলো সে। লাস্ট মান্থ থেকে ও সব ছাড়িয়ে দিয়েছে। কিন্তু এই লোক পিছু ছাড়ছে না। স্যালারি পাওনা। অথচ রবার্ট নিজেই নিজের বিলাসবহুল সেই লাইফটাকে ছাড়তে পারছে না। না পারছে ওয়াইন ছাড়তে,না নারীসঙ্গ। টুকটাক গেয়ে টেয়ে যা পায়,ওতেই শেষ। রবার্ট ফোনই বন্ধ করে রাখল।
উঠে, তৈরি হয়ে নামল নিচে। গাড়ি নিয়ে যাওয়ার বেলায় ওয়াচম্যানকে বলল,
“ কেউ খুঁজতে এলে পাঠিয়ে দিও। বোলো,আমার ফিরতে রাত হবে।”
“ ওকে স্যার।”

সুইডেনের ক্লান্ত রাস্তা। দিনের আলো শেষ হয়ে রাত হওয়ার পথে।
এমনিও তুষারের ভিড়ে সূর্য দেখা যায় না। প্রকৃতি সব সময় নিস্তেজ এখানে। রবার্ট এক হাতে ড্রাইভ করতে করতে বিয়ারের ক্যানে চুমুক দিলো। মাঝেমধ্যে রাগ হলো নিজের প্রতি। কত কষ্ট করে স্যামকে মারার একটা সুযোগ পেল সেদিন। কত গুলো টাকা গেল তাতে। কিন্তু লাভের লাভ কিচ্ছু হয়নি। সম্রাটের নখও ভাঙতে পারল না?
রবার্ট হিঁসহিঁসিয়ে আওড়াল – লাকি!
ক্যানের শেষ চুমুকে এসে হঠাৎ হাত থমকে গেল ওর। বুকের মধ্যে দুম করে লাগল কিছু একটা। যেন কোথাও গিয়ে আটকে পড়ল সব। হৃদপিণ্ডে একটা সজোরে থাবা পড়তেই ফুসফুস বোধ হয় জ্বলে গেল। রবার্ট শ্বাস নিলো বুক টেনে, পারল না। জমে গেল শরীর। হাত কেঁপে বিয়ারের ক্যান খসে পড়ল নিচে। রবার্ট হা করে শ্বাস টানে,চোখ উল্টে যায়। এক ফোঁটা বাতাসের আশায় ছটফটায় খুব। হাত পায়ের কাঁপুনি আরো বাড়ল তার।
চোখের কোণে রক্ত ছুটে এলো। জিভে ফ্যাসফ্যাসে শব্দ, কেউ যেন দৈত্যের মত গলা চেপে ধরেছে। স্টিয়ারিং ছেড়ে , দুই-হাত দিয়ে রবার্ট নিজের গলা চেপে ধরল। জবাই করা পশুর মতো কাতরে কাতরে চাইল শ্বাস তুলতে। পারল না,উলটে ফিনকি দিয়ে মুখ থেকে রক্ত বেরিয়ে এলো। চলন্ত গাড়ি ততক্ষণে টাল হারিয়েছে। এঁকেবেঁকে যেতে যেতে সামনে থেকে ছুটে আসা আরেকটা গাড়ির সাথে গিয়েই সবেগে ধাক্কা খেল সেটা। অমনি দুটো গাড়ি ছিটকে গেল দুদিকে। ওই এক ধাক্কায় হাইওয়ের উঁচু লেন থেকে রবার্টের গাড়িটা উড়তে উড়তে থুবড়ে পড়ল নিচে। তারপর দুমড়েমুচড়ে গেল সব। চারপাশে কালো ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ল, মূহুর্তে হাঁ করে গিলে নিলো বাতাসের ছন্দটাও।

সম্রাট রকিং চেয়ারে খুব আরামসে বসেছিল। এটা ওর অফিস রুম। একটু পর প্রডিউসার হেলেন আসার কথা। আর তারপর এখান থেকে সন্ধ্যা সাতটায় ও পেশেন্ট দেখতে যাবে। ৫টা ২৫ বাজে এখন। দেওয়ালে সেট করা টেলিভিশন চলছে। পাশেই একটা দাবার কোর্ট সাজানো। সম্রাট একা খেলছে সেটা। মাঝে মধ্যে দুলতে দুলতে কফির মগে চুমুক দিচ্ছে আবার। মিডনাইট রোস্ট,খুব তেতো কফি।
সম্রাট সিপ দিতে দিতে দুলছিল, তখনই টোকা পড়ল বাইরে। দরজা খোলাই ছিল,তুহিন এসেছে। সম্রাট বলল,
“ এসো।”
তুহিন এই শীতেও ঘামছে। চোখমুখ ঠিক নেই। ও জিজ্ঞেস করল,
“ কী হয়েছে?”
ছেলেটা গলার শিরা ফুলিয়ে বলল,
“ ব, বস বস,রবার্ট ইজ ডেড।”
সম্রাট ভ্রু নাঁচিয়ে বলল,
“ আচ্ছা?”
“ ইয়েস বস,কার এক্সিডেন্ট! খুব বিশ্রী এক্সিডেন্ট।”
সম্রাট চেয়ারে দুলতে দুলতেই টেলিভিশনে ফিরল। কিছু একটাতে শব্দ করে হেসে উঠল অমনি। তুহিন তাজ্জব হয়ে বলল,
“ বস আপনি হাসছেন, আর আমার মাথা ঘুরছে। মানে ওর এই সাডেন ডেথ মানে ওর তো ওরকম শত্রু নেই। ওকে এখন চেনেই বা কজন।”
সম্রাট বলল
“ তুমি এই সিরিজটা দেখেছ, তুহিন?”
ছেলেটা নাক কুঁচকে ফেলল৷ ও কী বলল, আর বস কী বলছে। তাও নিচু স্বরে বলল,
“ না বস।”
“ কিলারটা কী বোকা দেখো। ছুরি দিয়ে মারছে। নির্বোধ জানেই না,
হাত দিয়ে না ছুঁয়েও মাছের কলিজা ছিঁড়ে বের করে আনা যায়।”
তুহিন স্পষ্ট দেখল শেষ কথায় সম্রাটের চেহারা বদলে গিয়েছে। কেমন বারুদের মতো জ্বলজ্বল করছে চোখ। ছেলেটা গুলিয়ে ফেলল, ঘাবড়ে গেল।
সম্রাট প্রশ্ন ছুড়ল তখনই,
“ পেশেন্ট দেখার সময় ক-টায় তুহিন?”
“ সাতটায়, বস।”
“ হেলেন কখন আসবে?”
“ একটু পরে বস।”
“ তাহলে যাও,আমার জন্যে একটা জ্যাক ভ্যানিয়েলস নিয়ে এসো। রবার্টের মৃত্যুতে আমার একটু শোক করা উচিত। আফটার অল এতদিনের পরিচিত আমরা!”
তুহিন ফ্রিজের দিকে পা বাড়ালে ও বলল,
“ উহু,পুরোনো ওসব,তুমি নতুন কিনে নিয়ে এসো। তুমিই যেও,কেমন?”
“ ওকে,ওকে বস।”
তুহিন চুপটি করে বেরিয়ে গেল। সম্রাটের এই শান্তরূপ ওর ভালো লাগেনি। খবর শোনার পর ও যেমন হন্তদন্ত পায়ে ছুটতে ছুটতে এসেছিল বস তেমন কিছুই করল না। উলটে মদ খেতে চাইল?
অথচ পরশু রাতেই বলল আমরা অন্যভাবে খেলব,তুহিন। আর তারপর, কাল সারা-দিন পড়ে পড়ে ঘুমাল। তুহিনও ঘুমিয়েছে যদিও। হঠাৎ কিছু একটা ভেবে দাঁড়িয়ে গেল সে। সম্রাটের অফিস রুমের ওই বন্ধ দরজায় ফিরে চাইল চকিতে। কাঁটায় কাঁটায় হিসেব মিলিয়ে অস্পষ্ট আওড়াল,
“ বঅঅঅঅঅস! ও মাই গড…কখন?”

সম্রাটের কফি শেষ। কাপটা ও টেবিলে রাখল। তারপর মনোযোগ দিয়ে চাইল দাবার কোর্টের দিকে। ওর শত্রুপক্ষের রাজার সব দিক ঘিরে রাখা। বেচারার পালানোর একটাই পথ বাকি,সম্রাট কালো রঙের ঘোড়াটা তুলে সেই পথে এনে রাখল। পৈশাচিক হেসে বলল,
“ চেকমেট!
সাইলেন্স ইন ওয়ান ড্যোজ…”

চলবে…

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply