শেষ পাতায় সূচনা [২৯]
সাদিয়াসুলতানামনি
তাজওয়াদ আরো জেদ ধরতে থাকে “বাবা” শব্দটার মানে জানার। প্রথমেই বলা হয়েছে, তাজওয়াদ এমনিতে শান্তশিষ্ট, ভদ্র বাচ্চা হলেও তার সকল জেদ, আবদার, দুষ্টুমি তার মায়ের কাছে। আর মা ছাড়া তার আছেই বা কে যার কাছে এসব করবে? পূর্ণতা বহুভাবে কথাটা টলাতে চায়, কিন্তু বিষয়টা তাজওয়াদের কাছে স্পষ্ট না হওয়া অব্দি সে গো ধরে বসে থাকে সে খাবে না। এবার পরলো পূর্ণতা মাইনকার চিপায়।
কি বলবে, কি বলবে ভাবতে ভাবতে হুট করে পূর্ণতা বলে–
—বাবা মানে আমি।
তাজওয়াদ ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে বলে–
—তুমি? কিন্তু তুমি তো মাম্মা? বাবা হলে কিভাবে?
পূর্ণতা তাজওয়াদের মুখে আরেক লোকমা ঢুকিয়ে দিয়ে বলে–
—বাবা মানে সকল আবদারের ঝুড়ি, খেলার সাথী, রাতে ঘুম না আসলে তার বুকে শুয়ে শুয়ে অফুরন্ত সময় গল্প শোনা, ঝড়ের রাতে বাবার বুকে ঘাপটি মেরে বর্জ্যপাতের শব্দকে ভয় না পাওয়া, কোন টেনশন নির্বিঘ্নে তাকে সব উগরে দেওয়া যায় সেই মানুষটা। এখন বলো তাজওয়াদ এগুলো কার সাথে করে?
তাজওয়াদ চঞ্চল গলায় বলে–
—মাম্মারে সাথে, মাম্মারে সাথে।
পূর্ণতা আরেক লোকমা ভাত তাজওয়াদকে খাইয়ে দিতে দিতে মুচকি হেঁসে বলে–
—তাহলে বাবা হলো নাকি মাম্মা?
—হুম।
লক্ষী বাচ্চার মতো তাজওয়াদ উত্তর দেয়। পূর্ণতা ছেলের কপালে চুমু দিতে বলে–
—তাজওয়াদের মাম্মাও আমি, বাবাও আমি। বুঝেছেন লাট সাহেব?
পূর্ণতা ছেলেকে ক্ষ্যাপাতে “লাট সাহেব” বলে সম্বোধন করে। কিন্তু এবার তাজওয়াদ রাগে না। সেও মুচকি হাসি দিয়ে মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানায়। সব ঘটনা মিটমাট হয়েও হয় না। তখনই পেছনের টেবিল থেকে একটা পুরুষালী গলায় শোনা যায়–
—মিথ্যে বলছো কেন ডিয়ার তাজওয়াদের মাম্মা? তুমি তাজওয়াদের মাম্মা হলেও, তাজওয়াদের বাবা যে আমি। আমাকে ছাড়া তাজওয়াদ আসলো কিভাবে? আকাশ থেকে টপকেছে তোমার পেটে?
আকস্মিক এমন ঠোঁট কাটা কথা শুনে বেচারা টনির ভাত তালুতে উঠে যায়। জাওয়াদের পাশে বসা হুমায়ূনও খুক খুক করে কাশতে থাকে। পূর্ণতাও বেশ অপ্রস্তুত হয়ে পরে। কথাটা শুনে পূর্ণতা চিনতে একটুও কষ্ট হয় না ব্যক্তিটিকে।
জাওয়াদ পেছনের টেবিল থেকে উঠে এসে পূর্ণতার পাশের খালি চেয়ারটিতে বসে পড়ে। ঠোঁটের কোণে ঝুলে আছে এক নির্লজ্জ হাসি। তাকে নিজেদের পাশে বসতে দেখে পূর্ণতা ও তাজওয়াদ দুইজনই ভ্রু কুঁচকে তাকায়। যেনো তারা মহা বিরক্ত জাওয়াদকে দেখে। জাওয়াদ তাদের ভ্রু কুঁচকানো দেখে নিজেও ভ্রু কুঁচকে নেয়। মনে মনে বিরবিরায়–
—এরা দুই মা-ছেলে “বাপ কা বেটা” প্রবাদ পুরোই পাল্টে দিয়েছে। এদের দু’জনের জন্য বলা ঠিক হবে “মা কা বেটা” একদম মায়ের কার্বন কপি হয়েছে পেটের টা।
তাজওয়াদ নাক ফুলিয়ে জিজ্ঞেস করে–
—অ্যাঁই মন্সটার তুমি একানে কিনু? আর আমার মাম্মাকে মিথ্যু বলছো কেনো? আমার মাম্মা কোন মিথ্যু কতা বলে না বুচচো?
চোখ গুলো বড় বড় করে আঙুল উচিয়ে একপ্রকার শাসিয়ে কথাটা বলে তাজওয়াদ। ভাবটা এমন যেন, তার মাকে আরেকবার মিথ্যে বললেই সে ঝাপিয়ে পরবে জাওয়াদের উপর। জাওয়াদ ছেলের মুখে “মন্সটার” সম্বোধন শুনে মনে মনে বেশ কষ্টই পায়। একটা ভুল তাকে আরো কত কাঁদাবে? আর কত কষ্ট, গ্লানির পরিমাণ বাড়িয়ে দিবে সে ভেবে পায় না। এজন্যই বোধহয় বলে, ভাবিয়া করিও কাজ, করিয়া ভাবিও না৷
পাঁচ বছর আগে যদি ঠান্ডা মাথায় বিষয়টা হ্যান্ডেল করতো তাহলে আজ তার সন্তান তাকে মন্সটার হিসেবে চিনত না, বরং নিজের জন্মদাতা হিসেবেই চিনত। তাদের সকলের একটা সুখের সংসার হতে পারত। কিন্তু সবকিছুই হতো, পারত শব্দগুলোয় আঁটকে রয়েছে। হবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছে।
জাওয়াদ জোর করে নিজের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে তারপর হুট করে ছেলের কপালে মাঝ বরাবর যেখানে একটু আগেই পূর্ণতা চুমু দিয়েছিল সেখানেই একটা চুমু দেয়। তার এমন কাজে পূর্ণতা ও তাজওয়াদ দু’জনই থতমত খেয়ে যায়। তারা ভাবতেও পারেনি বজ্জাত লোকটা এমন কাজ করবে। তাজওয়াদের কপালে চুমু এঁকে দেওয়ার পর জাওয়াদ হাসি হাসি মুখে বলে–
—তোমার মাম্মা মিথ্যে বললে সেটা বলবো না? আমি তো বলিনি তোমার মাম্মার সবগুলো কথাই মিথ্যে, আমি জাস্ট যেটা মিথ্যে বলেছে সেটাই সুধরে দিয়েছি।
তাজওয়াদ তাড়াহুড়ো করে মায়ের ওড়নার আঁচল টেনে নিজের কপাল মুছতে নিলে জাওয়াদ আবারও ফোঁড়ন কেটে বলে–
—একটু আগে না তোমার মাম্মা এখানে আদর দিয়েছিলো তোমায়? তুমি তোমার মাম্মামের আদর মুছে দিবে? তার মানে তুমি তোমার মাম্মাকে ভালোবাসো না।
জাওয়াদের কথা শুনে তাজওয়াদ হাত থামিয়ে দেয়। মুখটা গম্ভীর করে নিয়ে মায়ের মুখের দিকে তাকালে দেখতে পায় তার মায়ের মুখটাও কেমন গম্ভীর করা। তাঁর মানে তার মাম্মার খারাপ লাগবে এই কাজটা করলে। ছোট তাজওয়াদ জাওয়াদের কথার প্যাচ ধরতে পারে না। তাই সে আর চুমু দেওয়া জায়গাটা মুছে না।
এবার পূর্ণতা নিজেই মুখ খুলে। সে শক্ত গলায় বলে–
—এই দুনিয়ায় তাজওয়াদের তার মাম্মা ব্যতীত আর কেউ নেই। তার মাম্মারও তাজওয়াদ ব্যতীত আর কেউ নেই। সো মিথ্যে বলার কিছুই নেই। এখন দয়া করে বিদেয় হোন, সিনক্রিয়েট করতে চাচ্ছি না
—দুঃখিত ডিয়ার আমার বাচ্চার মা, এই দয়াটা করতে পারলাম না। তুমি সিনক্রিয়েট করলে আমি বসে থাকব নাকি? আমিও তোমার সাথ দিবো। আর কে বললো তোমাদের কেউ নেই? তাজওয়াদের মাম্মা ব্যতীত তার বাবা আছে, একজন ইয়াং দাদাভাই আর বিউটিফুল দাদীমনি আছে, একটা সুইট কিউট ফুপ্পি আছে। এত এত আপনজন থাকতে তুমি বলছো কেউ নেই?
—এমন আপনজন নামক কালসাপ থাকার চেয়ে একা একাই আমরা বেশ আছি মা-ছেলে। নিজের আতে ঘা লাগলে এসব তথাকথিত আপনজন ছোবল মা”রতে দুইবার ভাববে না। তা তাজওয়াদের মাম্মার পাঁচ বছর আগে বেশ ভালো করে জানা হয়ে গিয়েছে।
জাওয়াদের বুকে আরো একটা বাণ এসে আঘা”ত করে।কথার আঘা”ত হলো বড় আঘা”ত। শরীরের আঘা”ত একসময় শুকিয়ে গেলেও কথার আঘা”ত রয়ে যায় বছরের পর বছর। মাঝে মধ্যে নিস্তব্ধ একাকী রাতে সেসব কথা মনে পড়লে নিঃশ্বাস নিতেও যেন কষ্ট হয়। সেই কষ্টটা এখন জাওয়াদের হচ্ছে। সে বিষাদময় দৃষ্টি নিয়ে পূর্ণতার দিকে তাকিয়ে থাকে।
অন্যদিকে উক্ত কথাটা বলেই পূর্ণতা জাওয়াদের থেকে চোখ সরিয়ে নেয়। কথা বললেই কথা বাড়বে। পূর্ণতা খেয়াল করে দেখে টনির খাওয়া শেষ। তাজওয়াদও আর খাবে না বোধহয়। সে হাত ধুয়ে পার্স থেকে টাকা বের করে টনিকে দিয়ে বলে–
—খাওয়া শেষ করে গাড়িতে আসো। আমরা উঠছি।
টনি হুড়মুড়িয়ে বলল–
—ম্যাম,আপনি তো কিছুই খেলেন না। কিছু খেয়ে নেন।
—যা বলছি তাই করো। ইদানীং আমার কথার উপর কথা বলতে শিখে গিয়েছো।
কথাটা শুনতে বেশ রুড লাগলেও টনি কষ্ট পায় না। টনি তো পূর্ণতাকে বেশ ভালো করেই জানে। মেয়েটা উপর দিয়ে সকলকে দেখাবে ইস্পাতের ন্যায় কাঠিন্যতা। কিন্তু ভেতরে যে কত নরম একটা মন নিয়ে চলে সে খুব কম লোকই জানে। ভালোবাসার কাঙালি এই মেয়েটাকে একটু ভালোবাসা দিয়ে মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেই ঝরঝরিয়ে নিজের সব কষ্ট বলে দেয় সামনের লোকটিকে।
পূর্ণতা তাজওয়াদকে কোলে নিয়ে উঠে দাঁড়ায়। জাওয়াদও তার সাথে সাথে উঠে দাঁড়ায়। সে বেশ ভালো করেই বুঝতে পারছে তার আগমনই পূর্ণতার না খাওয়ার কারণ। জাওয়াদ পূর্ণতাকে রিকুয়েষ্ট করে বলে–
—প্লিজ পূর্ণ আমার উপর রাগ করে না খেয়ে চলে যেও না। আমি সত্যি বলছি আর একটা টু শব্দ করবো না। প্লিজ খেয়ে নাও।
পূর্ণতা জাওয়াদকে অস্পষ্ট অবজ্ঞা করে বলে–
—নিজেকে এত প্রায়োরিটি দেওয়ার দরকার নেই। আপনি এমন কেউ নন যার জন্য আমি নাওয়াখাওয়া ছেড়ে রাগ-অভিমান করে বসে থাকব। প্লিজ পাঁচ বছরের আগের দিনগুলো থেকে বেরিয়ে আসুন। তখন আপনি আমার লাইফের অনেক বড় কিছু থাকলেও, নাউ ইউ আর নাথিং টু মি।
কথাটা শেষ করে সে হনহনিয়ে বেরিয়ে যায় হোটেল থেকে। জাওয়াদও তার পেছন পেছন ছুট লাগায়। পূর্ণতা গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে ঢুকবে তখনই জাওয়াদ পেছন থেকে এসে শক্তি খাটিয়ে দরজাটা বন্ধ করে দেয়। পূর্ণতা প্রচন্ড বিরক্ত বোধ করতে থাকে জাওয়াদের কাজে। মানে আছে এখন এমন নিব্বাদের মতো করার? সে তো চলে এসেছে তাদের সাজানো গুছানো সংসার থেকে। ভালোই তো আছে তারা মা-ছেলে। তাহলে এখন তাদের এত সমস্যা কোথায়? এত ভালোবাসি ভালোবাসি করে হেদিয়ে ম”রছে কেনো?
পূর্ণতা রেগেমেগে বলে–
—সমস্যা কোথায় আপনার আমাকে একটু বলবেন? কেন এমন আমাদের পেছনে পরে আছেন? আপনাদের কোন পাকা ধানে মই দিয়েছি?
—পাকা ধানে মই না দিলেও মন চুরি করে ঠিকই পালিয়ে যাচ্ছো। আমার মনটা আমায় দিয়ে যাও।
—মশকরা করছেন আপনি আমার সাথে?
—মশকরা তো আমার ভাগ্য আমার সাথে করছে। নাহলে তুমিই বা আমার প্রেমে কেন পরবে আর আমার মা’ই বা কেন আমার বিশ্বাসের এমন ফায়দা নিবে। তোমরা দুই নারী তো ঠিকই নিজেদের মন মর্জি আমার উপর চাপিয়ে দিলে। কখনো জানতে চেয়েছো আমি কি চাই? তুমি ভালোবেসে জোর করে আমার লাইফে ঢুকলে। আমার মা নিজের কথা রাখতে তোমায় আমার থেকে দূর করে দিলে। দু’জনই আমাকেই বেছে নিলে নিজেদের কার্যসিদ্ধি করার জন্য। তোমরা দু’জনই আমার জীবনের সবচাইতে গুরুত্বপূর্ণ অংশ। আর তোমরা দু’জনই আমাকে কষ্ট দিচ্ছো। এমন কষ্ট যেটা আমাকে বাঁচার ইচ্ছেকে প্রতিনিয়ত শেষ করে দিচ্ছে।
জাওয়াদের গম্ভীর গলায় করা অভিযোগ গুলো পূর্ণতা মস্তিস্কে এসে ধাক্কা দেয়। জাওয়াদের দিক দিয়ে সেও সঠিক, কিন্তু তাই বলে সে পাঁচ বছর আগের কথা ভুলে যাবে? এতই সহজ?
পূর্ণতা ও জাওয়াদ একে অপরের চোখে চোখ রেখে তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ না টনি এসে তাদের ধ্যান ভঙ্গ করে। টনি বলে–
—ম্যাম চলুন।
তাদের ধ্যান ভঙ্গ হলে দেখতে পায় টনি ইতিমধ্যে গাড়িতে উঠে বসেছে। পূর্ণতাও আর সময় ব্যয় না করে গাড়িতে উঠে বসে। জাওয়াদের চোখের সামনে দিয়েই চলে যায় পূর্ণতা ও তাজওয়াদকে বহনকারী গাড়িটি। জাওয়াদ শূন্য দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে দেখতে থাকে নিজের সুখের উৎসদের গমন। হুমায়ূনও ইতিমধ্যে স্যারের পাশে এসে দাঁড়িয়েছে। জাওয়াদ পূর্ণতাদের গাড়িটির দিকে ততক্ষণ তাকিয়ে থাকে যতক্ষণ না গাড়িটি দৃষ্টি সীমার বাহিরে চলে যায়। গাড়িটি একসময় মিলিয়ে যেতেই জাওয়াদও ক্লান্ত পায়ে হাঁটা দেয় নিজেদের গাড়ির উদ্দেশ্যে।
সে গাড়িতে উঠে বসতেই হুমায়ূনও চটপট করে উঠে বসে গাড়ি স্টার্ট দেয়। জাওয়াদ নিজের পাশের জানালা খুলে নিয়ে একটা সিগারেট ধরায়। পরপর তিনটা সিগারেট এসে এক ধ্যানেই শেষ করে ফেলে। যেই জাওয়াদ সিগারেটের গন্ধ পর্যন্ত সহ্য করতে পারত না, সে বর্তমানে একজন চেইন স্মোকার হয়ে গিয়েছে। ঘন্টার পর ঘন্টা সিগারেটকে সাথে নিয়ে দিব্যি কাটিয়ে দিতে পারবে।
দূরের কোন মসজিদ থেকে মাগরিবের আজান পড়তেই জাওয়াদ হাতে থাকা সিগারেটের শেষ অংশটুকু ফেলে দেয়। তারপর গাড়িতে পূর্ব থেকেই থাকা মাউথওয়াশ দিয়ে ভালো করে মুখের দুর্গন্ধ দূর করে এক মসজিদে ঢুকে। উত্তম রূপে অজু করে এক কোণায় নামাজে দাঁড়িয়ে পড়ে। হুমায়ূন জায়গা না পাওয়ায় তার থেকে একটু দূরে নামাজে দাঁড়িয়েছে। হুমায়ূন নামাজ শেষ করে দেখে বাকি মুসল্লিরা নামাজ শেষ করে নিজেদের কাজে চলে যাচ্ছে, কেউ বা জিকির করছে, কেউ বা তেলাওয়াত করছে। কিন্তু জাওয়াদের নামাজ এখনও শেষ হয়নি। দুই হাত যে তুলেছে মোনাজাতের সময় তা এখনও উঠানো।
হুমায়ূন তার পেছনে গিয়ে বসলে শুনতে পায় এক পুরুষের আকুতিভরা আবেদন ও কান্নার শব্দ। জাওয়াদ কাঁদতে কাঁদতে হিচকি তুলে ফেলেছে মোনাজাতে কিন্তু তাও থামছে না। এমনটা আজ নতুন কিছু না হুমায়ূনের কাছে। সে গত তিনবছরে বসের সাথে যেই কয়দিন নামাজ পড়েছে এমন এক দৃশ্য দেখেছে। হুমায়ূন ভেবে পায় না তার শান্ত, কোমল মনের বস কি এমন পাপ করেছে যার জন্য দয়াময় আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের কাছে এত চাওয়ার পরও উনি ওর বসের আকুতি,মিনতি দেখেও দেখছে না। আচ্ছা তার বস কি অনেক বড় পাপ করেছে যার কারণে তার এত এত অশ্রু বিফলে যাচ্ছে? একজনকেই তো চাইছে, এবং সে একসময় তার জন্য বৈধও ছিলো। ছিলো কি এখনও আছে। তাও কেন এত বাঁধা, প্রতিবন্ধকতা, অভিমান?
দীর্ঘক্ষণ মোনাজাতে নিজের প্রিয় মানুষটিকে চাওয়ার পর নামাজ শেষ করে মসজিদ থেকে বের হয়ে আসে। তারা যখন গাড়িতে ফিরে আসে তখন দেখতে পায় জাওয়াদের ফোন অনবরত বেজেই চলেছে। জাওয়াদ ফোনটা হাতে নিয়ে দেখে তার বাবা ফোন দিয়েছে। জাওয়াদ তার কান্নার কারণে ভারী হয়ে গলাটা কয়েকবার খাঁকারি দিয়ে স্বাভাবিক করে নেয়, তারপর ফোনটা রিসিভ করে কানে লাগিয়ে সালাম দেয়। মি.শেখ সালামের জবাব দিয়ে ছেলেকে জিজ্ঞেস করে–
—তুমি কোথায় আছো? কাল বিকেল থেকে তোমার দেখা নেই? না বাড়িতে আসো, না কারো ফোন ঠিকভাবে ধরো। তোমার মা তোমার টেনশনে টেনশনে প্রেশার বাড়িয়ে ফেলেছে।
জাওয়াদ শান্ত গলায় বলে–
—ঢাকায় ফিরছি। মাঝ রাস্তায় আছি। আর একটা কথা বলছি, আমি জানি ফোন লাউডস্পিকারে রয়েছে, তাই আম্মা একটু মন দিয়ে শুনে রাখুন, আমার জন্য অহেতুক টেনশন করে নিজের স্বাস্থ্য খারাপ করবেন না। বেঁচে আছি আমি। আপনি মরে যাওয়ার জন্য যেই কারণগুলো দিয়েছেন সেটার পরও মরিনি, তাহলে বুঝে নিন এই জান কৈ মাছের জান। বিশ্বাসঘাতকতার চেয়ে মৃত্যু শ্রেয়তর।
মিসেস শেখের চোখ ভরে ওঠে ছেলের কথা শুনে। নিজের করা পাপ আজ পাঁচটা বছর ধরে কুঁড়ে কুড়ে খাচ্ছে তাকে। নিজের হাতে নিজের হাসিখুশি সংসারটা ধ্বং”স করে দিয়েছে। যেই মেয়েকে অলক্ষী, অপয়া ভেবে ঘৃ”ণ্য ষড়যন্ত্র করে বের করে দিয়েছিল তার সংসার থেকে প্রকৃত অর্থে সেই ছিলো লক্ষী। তার গমনে মিসেস শেখের সুখের সংসারে নজর লেগে গিয়েছে।
মি.শেখের সাথে তার সম্পর্ক ঠিক হয়েও ঠিক নেই। সে তাকে এই সংসারে ফিরিয়ে এনেছে ঠিকই তাও কোথায় একটা কিন্তু থেকেই যায়। ভদ্রলোক নিজেই অনেক অপরাধবোধে ভুগেন। তার প্রাণপ্রিয় বড় সন্তান তো একদম ছন্নছাড়া হয়ে গিয়েছে। এই পাঁচ বছরে ভালো করে পাঁচদিন তার সাথে কথা বলেছে নাকি তার ঠিক মনে পড়ে না।
পূর্ণতা চলে যাওয়ার একবছর পর জাওয়াদ তার বন্ধু মাহবুবের সাথে পার্টনারশিপে ক্লোদিং বিজনেস শুরু করে। বিজনেস করার আইডিয়া মাহবুবের থাকলেও বিজনেসের পেছনে বেশি খেটেছে জাওয়াদই। তাদের অক্লান্ত পরিশ্রম, কর্তব্যনিষ্ঠা, সততা তাদেরকে সাফাল্য এনে দেয় জলদিই। সময়ের পরিক্রমায় জাওয়াদ নিজে এখন এক কোম্পানির মালিক। বাড়ি-গাড়ি করেছে, করেছে ব্যাংক ব্যালেন্স। টাকা-পয়সা, ঐশ্বর্য-বৈভবের কমতি নেই তার বর্তমানে। কিন্তু কাড়ি কাড়ি টাকা পয়সাও মূল্যহীন লাগে যখন ব্যক্তির মানসিক শান্তি থাকে না। নিজের করা বাড়িতে জাওয়াদ আজ পর্যন্ত একরাতও কাটায়নি। বাড়ির সাথে লাগোয়া এক পেন্ট হাউজ আছে, সেখানেই থাকে যেদিন বাসায় ফিরে।
জিনিয়া তো মা-ভাইয়ের উপর অভিমান করে স্কুল শেষ করে কলেজে ভর্তি হয়ে জোর করে হোস্টেলেই উঠে গিয়েছে। ভার্সিটিতে উঠেও হলে থাকে। তার কষ্ট আরো বাড়িয়ে দিতে, তার এক সন্তানও ভালো করে তাকে মা বলেও ডাকে না। কালেভদ্রে ডাক শোনা যায় আরকি। তার দিন যায়, সেই হারিয়ে যাওয়া সুখের সংসার ফিরে পাওয়ার আকাঙ্ক্ষায় চোখের পানি ফেলতে ফেলতে ।
মি.শেখের নিজের মিসেসের কান্না দেখে খারাপ লাগে। সে নিজেও ঐ বিষয়টা নিয়ে এখনও গ্লানিতে ভুগে, কিন্তু প্রিয়তমা স্ত্রীকে এমন দিনের পর দিন চোখের পানি ফেলতে দেখতেও তার খুব একটা ভালো লাগে না। সে গম্ভীর গলায় বলেন–
—হুট করে ঢাকায় চলে গেলে যে? এটলিস্ট বলে যেতে পারতে। আমরা তাহলে টেনশন করতাম না। তোমার দাদী তোমার সাথে কথা বলবে বলে অপেক্ষা করছিলো কাল থেকে।
—মনে ছিলো না বলতে। আর একটা ইমার্জেন্সি পরে যাওয়ায় হুট করে চলে আসা। দাদীর কথাটা হলো আমার বিয়ে। আমি বাবা বুঝি না, আমার ওয়াইফ আছে, একটা ফুটফুটে বাচ্চাও আছে তাদের রেখে আমি কোন আক্কেলে বিয়ে করবো? দাদীই বা কোন আক্কেলে আমায় এই কথা বলার জন্য বারবার তলব করে গ্রামে ডেকে নিয়ে যায়? আমাদের একটা ভুলের জন্য আমার ওয়াইফ আমার উপর অভিমান করে দূরে সরে আছে।
আ’ম প্রিটি শিওর, আমি খুব শীঘ্রই আমার স্ত্রীর অভিমান দূর করে তাকে আমার সংসারে ফিরিয়ে আনতে সক্ষম হবো ইনশা আল্লাহ। তাহলে আমার দ্বিতীয়বার বিয়ের কথা উঠছে কেন বারবার? নাকি আমায় বহুগামী পুরুষ লাগে দাদীর কাছে? যদি এটাই লাগে, তাহলে আমি আজ স্পষ্ট বলে দিচ্ছি, এই জাওয়াদ শেখের জীবনের প্রথম ও শেষ নারী হবে আনাবিয়া শেখ পূর্ণতা। সে আমাকে যতই কান পড়া দিক বা তাবিজ চুবানো পানি খাওয়ানোর চেষ্টা করুক না কেন আমি পূর্ণতা ব্যতীত আর কাউকে নিজের জীবনসঙ্গী হিসেবে বেছে নিবো না।
মি.শেখ ছেলের শক্ত গলায় বলা কথাগুলো শুনে থতমত খেয়ে যান। সেই সাথে সেখানে উপস্থিত বাকিরাও। বাড়ির বড়রা সবাই জাওয়াদের বাবাকে ঘিরে বসে আছেন। জাওয়াদ কি বলে শোনার জন্য। জাওয়াদের বড় চাচী মুখ লুকিয়ে চলে যান সেখান থেকে। সে তার ভাইয়ের ডিভোর্সি মেয়ের সাথে জাওয়াদকে বিয়ে দেওয়ার জন্য নিজের শ্বাশুড়ির কানে মন্ত্রণা দিয়েছিলেন। একসময় সকলে তাকে কালো বলে অবজ্ঞা করলেও, এখন জাওয়াদের টাকা পয়সা দেখে সবাই নিজেদের ঝুলি ভরতে চায় তার মাধ্যমে। কিন্তু এই ছেলে কিভাবে জানলো সেসব গোপণ কথা সেটাই বুঝতে পারছেন না তিনি।
[গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্প প্রেমী বন্ধুদের নিকট পৌঁছে দিন। ]
শব্দসংখ্যা~২৩৫০
~চলবে?
[বড় করে দিয়েছি। আশা করি ছোট বলে অভিযোগ করবেন না।🫠
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৪
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৭
-
শেষ পাতায় সূচনা গল্পের লিংক
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮