শেষ পাতায় সূচনা [২০]
সাদিয়াসুলতানামনি
পরেরদিন সকালে পূর্ণতা তাড়াতাড়ি উঠলেও ঘাপটি মেরে শুয়ে থাকে। এলার্মের আওয়াজে জাওয়াদের ঘুম ভেঙে গেলে সে শোয়া থেকে উঠে বসে। ঘাড়ে হাত রেখে ম্যাসাজ করে আড়মোড়া দেয়। এমনটা করলে তার ঘুম ঘুম ভাবটা তাড়াতাড়ি কেটে যায়। স্বভাব সুলভ ঘাড় ঘুরিয়ে পূর্ণতার জায়গায় তাকালে দেখতে পায় আজও পূর্ণতা শুয়ে আছে। আগে এমনটা কখনোই হয়নি।
মিসেস শেখের ঐদিনের কাজের পর থেকে এমনটা হচ্ছে। পূর্ণতা বেশিক্ষণ শুয়ে থাকার কারণ হলো, তাড়াতাড়ি উঠলেই কিচেনে গিয়ে মিসেস শেখের হাতে হাতে নাস্তা বানাত। যেটা কিনা মিসেস শেখ পছন্দ করতেন না। মিসেস শেখ ঐদিন ওভাবে অপমান করার পর সে সত্যিকার অর্থে ভীষণ কষ্ট পেয়েছে। যার কারণে এখন আর তার পেছন পেছন ঘুরে না আর নাই বা কোন কিছু রান্না করে।
বেশিরভাগ দিনই সকালে না খেয়ে অফিসে চলে যায়। অজুহাত হিসেবে অবশ্যই দেরি হয়ে গিয়েছে বলে। তারপর বারোটার দিকে পেটে টান লাগে বেশি তখন হ্যাভি কিছু খায়, ঐ খাওয়াতেই তার দুপুরের খাওয়া হয়ে যায়। অফিস থেকেও দেরি করে ফিরে। জাওয়াদ সাড়ে সাতটা বা আটটার মধ্যে বাসায় এসে পড়লেও সে আসে ন’টায়। কখনো কখনো সাড়ে নয়টাও বাজে। মূলত সে একেবারে ডিনার করে আসে। জাওয়াদ, মি.শেখ, জিনিয়া তাকে খাওয়ার জন্য জিজ্ঞেস করলে সে কোন একটা বাহানা দিয়ে কাটিয়ে দেয়। আবার মাঝে মধ্যে তাদের সাথে খায়। কিন্তু তারা যতক্ষণ না বেড়ে দেয় সে নিজ থেকে বেড়ে নেয় না। কোথায় যেনো একটা বাঝে তার।
জাওয়াদ এখন তাকে রাতে নিজ থেকেই বুকে টেনে নেয়। পূর্ণতার ঘুম ভেঙে নিজেকে তাড়াতাড়ি সরিয়ে আনে জাওয়াদের থেকে। পূর্ণতা ইদানীং প্রচন্ড ডিপ্রেশনে ভুগছে, যার কারণে তার ব্রেনেও সমস্যা দিচ্ছে। আজ সত্যিই তার ঘুম থেকে উঠার পর মাথা অস্বাভাবিক ব্যথা করায় সে এখনও শুয়ে আছে। সে শুয়ে শুয়ে চোখ বন্ধ করে ভাবে, আজ একবার তার ডাক্তারের কাছে যাবে।
জাওয়াদের আজ কি হলো, সে পূর্ণতার কাছে গিয়ে তার কপালের উপর থেকে হাত সরিয়ে গালে নিজের হাত রেখে জিজ্ঞেস করে–
—পূর্ণ, কি হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ লাগছে? আমি জানি তুমি জেগে আছো।
পূর্ণতা জাওয়াদের এহেন কাজে হকচকিয়ে গিয়ে চোখ খুলে ড্যাবড্যাব করে তার দিকে তাকিয়ে থাকে। জাওয়াদই আবার জিজ্ঞেস করে–
—কি হয়েছে তোমার বলো তো? ইদানীং এত অনিয়ম কেন তুমি? সকালে না খেয়েই বেরিয়ে যাও, দুপুরেও তেমন একটা খেতে দেখি না। রাতে জোর না করলে খাও না। এমন কেন করছো? অসুস্থ হয়ে আমাকে নাকানিচুবানি খাওয়াতে চাচ্ছো? খবরদার এমন হলে, সোজা বাপের বাড়ি রেখে আসবো বলে দিলাম।
শেষের কথাগুলো জাওয়াদ বেশ কৌতুক করেই বলে। কিন্তু পূর্ণতার মস্তিষ্ক সেটাকে ভুল বুঝে নেয়। সে জাওয়াদের কথাগুলোকে সিরিয়াস নিয়ে নেয়। ভাবে জাওয়াদও তাকে উটকো ঝামেলা ভেবে কথাগুলো বলেছে। পূর্ণতা তার কথার উত্তরে দেয় না তাৎক্ষণিকভাবে। বরং নিজের গাল থেকে জাওয়াদের হাতটা সরিয়ে শোয়া থেকে সে-ও উঠে বসে।
অর্ধেক খুলে যাওয়া এলোমেলো চুলগুলো খোঁপা করতে করতে বেড ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। তারপর সরাসরি জাওয়াদের দিকে ঘুরে ঠান্ডা গলায় বলে–
—আমি কিছুদিন বাবার বাড়ি থাকতে চাই। বাবা একটু অসুস্থ৷ বড় বাবা- বড় মা, আরিয়ান ভাইয়া থাকলেও তারা বাবার যথাযথ খেয়াল রাখতে পারে না। তাই আমি কিছুদিন যেয়ে থাকতে চাইছি, পারমিশন পাবো তো?
পূর্ণতা একটু থেমে জাওয়াদকে কিছু বলতে না দিয়েই, নিজেই আবার বলতে থাকে–
—দেখেছেন আমিও কি বোকা! পারমিশন না পাওয়ার কি আছে? আমি না থাকলে তো আপনারাই স্বস্তি পান। উটকো, উড়ে আসা ঝামেলা বিদায় নিয়েছে।
জাওয়াদ ছোট ছোট চোখ করে তার দিকে তাকিয়ে ভাবতে থাকে, মেয়েটার মাথায় সমস্যা দেখা দিলো নাকি? তখন ঐ কথাটা তো সে মজা করেই বললো, এটা সিরিয়াস নিয়ে নিলো। এত চেঞ্জ একটা থাপ্পড়ে। নাহ্, থাপ্পড়টা তারই মারা উচিত ছিলো আরো আগে, তাহলে তাকে এতদিন নাকানিচুবানি খাওয়া লাগত না।
সেও বেড ছেড়ে দাঁড়িয়ে পূর্ণতার মুখোমুখি হয়ে দাঁড়ায়। তারপর পূর্ণতার মাথায় দুই আঙুল দিয়ে একটা টোকা দিয়ে বলে–
—মাথার ডাক্তার দেখাও মেয়ে। নাহলে পাবনার টিকিট আমাদের দু’জনের জন্যই কাটা লাগবে। তোমার বাবার বাড়ি যাবে ভালো কথা, আমাকে বলেছো বাবা-মায়ের থেকেও পারমিশন নিয়ে নিও। আর বাপের বাড়ি থেকে ফিরে এসে রান্নাবান্নায় হাত লাগাবে, আমার মায়ের বয়স হয়েছে। একা হাতে সব করতে তার কষ্ট হয়। বাই দ্যা ওয়ে, আরিয়ান কে?
জাওয়াদের প্রশ্ন শুনে পূর্ণতা এমন একটা লুক দেয় না জানি জাওয়াদ পৃথিবীর সবচাইতে উদ্ভট একটা প্রশ্ন করে ফেলেছে। কিন্তু জাওয়াদের দোষ নেই। আরিয়ান বাসায় থাকে খুবই কম আর বিভিন্ন কারণে আজ পর্যন্ত তার আর জাওয়াদের সাক্ষাৎ হয়নি। পূর্ণতা পূর্বের ন্যায় শান্ত গলায় বলে–
—আমার বড় বাবার ছেলে।
—ওহহ।
কথাটা বলে জাওয়াদ আলনা থেকে টাওয়াল নিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকে যায়। সে ফ্রেশ হয়ে আসার পর পূর্ণতা যায় ফ্রেশ হতে। তার ফ্রেশ হয়ে অফিসের জন্য রেডি হতে হতে অফিস টাইমের সময় হয়ে যায় অনেকটাই। সে তাড়াহুড়ো করে ল্যাপটপ ব্যাগ নিয়ে বের হয়ে যেতে চাইলে, তার কানে আসে মিসেস শেখের কিছু কথা। সে একটা প্লেটে খাবার বেড়ে দিয়ে একটু উঁচু গলাতেই বলে–
—জাওয়াদ, তোর বউকে খেয়ে বের হতে বল। প্রতিদিন আমি একই কাহিনি দেখতে দেখতে বিরক্ত। এমন করে অসুস্থ হয়ে গেলে ওর বড়লোক বাবা এসে আমাদের কাছে জবাবদিহি চাইবে। আমরা গরীব হতে পারি, কিন্তু মানসম্মান, বিবেক উনাদের থেকে কিছু কম না।
একদিন না হয় রাগের মাথায় একটা চড়ই মেরেছিলাম, এটার জন্য দিনের পর দিন না খেয়ে কি প্রমাণ করতে চায় তোর বউ? এত না মা মা করে, নিজের মা হলে এতদিন রাগ ধরে রাখতে পারতো? শাশুড়ি মেরেছে বলে এত রাগ? আসলে কি আমাকে কখনো সত্যিকার অর্থে মায়ের জায়গাতে বসাতেই পারেনি। শাশুড়ি কি কখনো মা হয় নাকি?
মিসেস শেখ একা একাই কথাগুলো বলতে বলতে সকলের প্লেটে খাবার বাড়তে থাকেন। মি.শেখ, জাওয়াদ, জিনিয়া সবাই তার কথা শুনে মিটমিটিয়ে হাসতে থাকে। পূর্ণতা বেক্কলের ন্যায় হা করে দাঁড়িয়ে থাকে তার দিকে তাকিয়ে। ভদ্রমহিলা যে তাকে উদ্দেশ্য করেই কথাগুলো বলেছে সেটা তার বোধগম্য হয়েও হচ্ছে না।
মিসেস শেখ হাসি হাসি গলায় পূর্ণতাকে বলেন–
—দাড়িয়ে আছো কেনো আম্মু? আসো বসো নিজের জায়গায়, পরিবারের সকলে একসাথে বসে খেলেই না তখন খাওয়ায় তৃপ্তি আসে। আসো বসো বসো।
মি.শেখ এত সুন্দর করে ভালোবাসা দিয়ে কথাগুলো বলেন, পূর্ণতার কোন অজুহাত দিতে ইচ্ছে করে না তার কথাটা না শোনার। সে চুপচাপ জাওয়াদের পাশের চেয়ারে বসে নাস্তা করতে থাকে সকলে একসাথে। খাওয়া শেষ করে মি.শেখ উঠবেন তখন পূর্ণতা বলে–
—বাবা আপনাদের একটা পারমিশন নেওয়ার ছিলো।
—কি পারমিশন?
—আমার বাবার শরীরটা কিছুদিন ধরে খারাপ যাচ্ছে। চাচা-চাচী থাকলেও বাবার খেয়াল তেমন একটা রাখতে পারছেন না। আমি কি ও’ বাড়িতে গিয়ে থাকতে পারি তিন-চার দিন থাকতে পারি?
—অবশ্যই পারো। তুমি যাও, এখানকার কিছু নিয়ে টেনশন করো না। তোমার বাবা সুস্থ হলে তারপর উনাকে নিয়ে এসো। বেয়াইকে এই পর্যন্ত একদিনও দাওয়াত দিতে পারলাম না, বিষয়টা আমার কাছে ভীষণ অস্বস্তিকর।
পূর্ণতা তার অস্বস্তি কাটাতে বলে–
—আব্বু আপনি এত কিছু ভাববেন না। বাবা তো দেশে ছিল না বেশ কিছুদিন। কানাডায় গিয়ছিল একটা বিজনেস পারপাসে। আর আব্বু সুস্থ হলে আমি তাকে আসতে বলবো। আমি তাহলে আজই অফিস শেষ করে যাই ও’বাড়ি?
—আচ্ছা বেশ যেও।
তাদের দু’জনের কথা এতক্ষণ সবাই চুপ করে শুনছিল। কিন্তু পূর্ণতার শেষ কথাটা জাওয়াদের ভালো লাগে না। বাবার বাসায় যাবি ভালো কথা, তাই বলে আজই? সে মুখ গোমড়া করে বলে ওঠে–
—তোমরা কথা বলো, আমি আসছি। লেট হলে বস পড়ে ঝাড়বে।
মাঝ দিয়ে জিনিয়া বলে ওঠে–
—বস তো তোমার বউই ভাইয়া। ভাবীপু কি অফিসে তোমাকে বকে?
—শুধু আমাকে না, অফিসে প্রত্যেকটা এমপ্লয়ি তোর ভাবীপুর ভয়ে তটস্থ থাকে। একটু ভুলচুক হলে যা ঝাড়া ঝাড়ে তুই দেখলে অবাক হয়ে যাবি।
সকলে জাওয়াদের কথা শুনে অবাক হয়ে যায়। যেই মেয়ের ভয়ে এত মানুষ তটস্থ থাকে, সে বাসায় এত সাধারণ, এত কোমল মনের কিভাবে থাকতে পারে? তাহলে কি সত্যিই পূর্ণতা তাদেরকে মন থেকে ভালোবাসে বলেই বাসায় এত সাধারণ ভাবে থাকে? তাই হবে।
সবাই চলে যেতে থাকে নিজ নিজ কাজে। জিনিয়া তার স্কুলের জন্য রওনা হয়। মি.শেখের আপাতত কোন কাজ নেই। সে হয়ত কোন বই নিয়ে বসবেন আর মিসেস শেখ দুপুরের রান্নার জোগাড়জন্ত করবেন। পূর্ণতা বের হতো নিবে তখনই মিসেস শেখ তার পেছন ডেকে ওঠে –
—শুনো মেয়ে, বিয়ে হয়েছে তোমার এখন। তাই এত ঘনঘন বাপের বাড়ি যাওয়া চলবে না। নেহাৎ তোমার বাবা অসুস্থ তাই অনুমতি পাচ্ছো। ফিরে এসে আমার সাথে সংসারের হাল ধরবে। সাবধানে থাকবে। এখন যাও।
মিসেস শেখ কথাগুলো জাওয়াদকে শুনিয়ে শুনিয়ে বলে। এতে করে জাওয়াদের মনে হতে থাকে তার মা সত্যিই পূর্ণতাকে মেনে নিয়েছে। জাওয়াদ খুশি খুশি মনে রওনা হয় অফিসের জন্য। তারা চলে যেতেই মিসেস শেখের মুখে একটা শয়তানি হাসি ফুটে ওঠে। সে তার রুম থেকে ফোন নিয়ে কিচেনে এসে কল লাগায় তার প্রাণপ্রিয় একজনের কাছে।
পূর্ণতা আহমেদ বাড়িতে গিয়েছে আজ তিনদিন। আরো দুইদিন পর সে জাওয়াদের বাসায় যাবে বলে জানিয়েছে। পূর্ণতা তার বাবার বাড়ি যাওয়ার তৃতীয়তম দিনে সে অফিসে আসে না। এ নিয়ে জাওয়াদ একটু চিন্তিত বোধ করলে কল লাগায় পূর্ণতার নাম্বারে। কিন্তু পূর্ণতা ফোনটা রিসিভ করে না। করবে কিভাবে? সে কাল রাত থেকে মাথা ব্যথায় অচেতনপ্রায়। ডাক্তার তাকে কড়া ঘুমের ঔষধ দিয়েছে, সেটা খেয়েই ঘুমাচ্ছে বর্তমানে। জাওয়াদ পূর্ণতার কথা তার পি.এ. সিনথিয়াকে জিজ্ঞেস করে, কিন্তু সিনথিয়াও কিছুই বলতে পারে না।
সেদিন সন্ধ্যা জাওয়াদ তার এক অসুস্থ কলিগকে দেখতে স্কোয়ার হসপিটালে যায়। সে তার কলিগের সাথে দেখা করে যখন ফিরছিলো, তখন তার দৃষ্টি গিয়ে পরে এক মেয়ে ও বয়স্ক এক পুরুষের উপর। তাদের পেছন থেকে দেখেই তার কেমন চেনা চেনা লাগে। মেয়েটাকে তার পূর্ণতার মতো লাগে, আর বয়স্ক লোকটাকে পূর্ণতার বাবার মতো। বয়স্ক লোকটি মেয়েটাকে ধরে ধরে নিউরোলজিস্ট ডাক্তারের কেবিন থেকে বের হয়। কিন্তু জাওয়াদের মন তাকে প্রশ্ন করে ওঠে, পূর্ণতা এখানে আসবে কেন? সে যদি অসুস্থও হয় তাহলে তাকে জানায়নি কেন? নাকি আমারই ভুল হচ্ছে?
সে তার প্রশ্ন গুলোর উত্তর তাড়াতাড়িই পেয়ে যায়। একজন মাঝ বয়সী মহিলা ডাক্তার কেবিন থেকে বের হয়ে পূর্ণতাদের ডেকে তাদের ফাইলটা দেয়। মি.আহমেদ সেটা নিতে ভুলে গিয়েছিলেন। পূর্ণতা ও মি.আহমেদ যখন নার্সটির ডাক শুনে পেছনে ঘুরে তখন তাদের চেহারা স্পষ্ট হয় জাওয়াদের কাছে। সে তার ধারণাই সঠিক। মেয়েটি পূর্ণতা ও বয়স্ক লোকটি তার বাবা মি.আহমেদ।
ডাক্তার ফাইলটা তাদের দিতেই পূর্ণতার বাবা সেটা নিজের হাতে তুলে নেয়। তারপর তারা আবারও ডাক্তারের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে হাঁটা দেয়। জাওয়াদ একটু আবডালে ছিল বলে তারা জাওয়াদকে দেখতে পায়নি।
পূর্ণতা অসুস্থ এই বিষয়টা জাওয়াদ আগেই ধরতে পেরেছিল, এমনকি অফিসেও সে পূর্ণতাকে জিজ্ঞেস করেছিল এই বিষয়ে কিন্তু পূর্ণতা কথা কাটিয়ে দেয়। পূর্ণতারা হসপিটাল থেকে বের হয়ে যেতেই জাওয়াদ লম্বা লম্বা কদম ফেলে সেই ডাক্তারের সামনে এসে উপস্থিত হয়। তারপর তাকে পূর্ণতার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। ডাক্তার যদিও প্রথমে কিছুই বলতে চাচ্ছিল না, পরে জাওয়াদ তাকে জানায় সে পূর্ণতার স্বামী এবং প্রমাণ হিসেবে তাদের বিয়ের ছবিও দেখায়।
ডাক্তার মহিলাটি পূর্ণতার মায়ের বান্ধবী। সে জানায়, পূর্ণতার সামনেই তার মায়ের এক্সিডেন্ট হয়েছিল। ট্রাক পিষে দিয়ে চলে যায় পূর্ণতার মাকে। সাড়ে সাত কি আট বছরের বাচ্চা মেয়ের মস্তিষ্ক এমন একটা ভয়াবহ দৃশ্য সহ্য করতে পারে না। একটা ট্রমায় চলে যায়। কথা বলা বন্ধ করে দেয় সকলের সাথে। পূর্ণতার বাবা ডাক্তার দিয়ে তাকে কাউন্সিলিং করে একটা দীর্ঘ সময় পর্যন্ত। তারপর আস্তে আস্তে সে ঠিক হয়।
কিন্তু ডাক্তার তার বাবাকে কঠোর গলায় বলে দেয়, তাকে কোন প্রকার মানসিক চাপ না দিতে। এবং হাসি-খুশি থাকতে। সে কোনপ্রকার মানসিক চাপ নিলেই তার ব্রেনে বাজে ইফেক্ট ফেলবে। এর কারণে সে ব্রেন স্ট্রোকও করতে পারে। আজ পূর্ণতার শরীর একটু বেশি খারাপ হওয়ায় তার বাবা জোর করে ডাক্তারের কাছে নিয়ে আসে। ডাক্তার তাকে স্ট্রেস ফ্রি থাকতে বলেছে, আর মেডিসিনও দিয়েছে।
জাওয়াদ তাকে ধন্যবাদ দিয়ে হসপিটাল থেকে বের হয়ে আসে। হসপিটালের সামনে একটা টংয়ের দোকানে চা খেতে খেতে ভাবতে থাকে বিগত কয়েকদিনের কথা। গত কয়েকদিনের জন্যই পূর্ণতা অসুস্থ হয়ে পড়েছে এটা বুঝতে বাকি থাকে না তার। তার মনটা আকুপাকু করছে পূর্ণতার সাথে কথা বলার জন্য।
জাওয়াদ চায়ের দোকান থেকে বের হয়ে বাইকে ওঠার আগে কি মনে করে পূর্ণতাকে কল করে। এবার পূর্ণতা কলটা রিসিভ করে। সালাম বিনিময়ের পর জাওয়াদ জিজ্ঞেস করে–
—কেমন আছো?
পূর্ণতা শান্ত গলায় জবাব দেয়–
—আলহামদুলিল্লাহ ভালো। আপনি?
—আসলেই ভালো আছো? গলা শুনে তো তা মনে হচ্ছে না।
পূর্ণতার প্রশ্নের উত্তর না দিয়ে জাওয়াদ পাল্টা প্রশ্ন করে। পূর্ণতা জাওয়াদের প্রশ্নের উত্তর দেয় না সাথে সাথেই। কি-ই বা দিবে। পূর্ণতার ভীষণ অভিমান হয়েছে জাওয়াদের উপর। সেই অভিমানের জেরেই তার বলতে ইচ্ছে করছে না জাওয়াদকে নিজের অসুস্থতার কথা। আবার মিথ্যেও বলতে পারবে না সে জাওয়াদকে। তাই চুপ থাকাকেই শ্রেয় মনে করে।
পূর্ণতার মৌনতায় জাওয়াদের উত্তর পাওয়া হয়ে যায়। জাওয়াদ আজ প্রথমবারের মতো আবদার করে পূর্ণতার কাছে –
—বের হবে পূর্ণ?
—কোথায় যাবো? আপনি বাসায় যাবেন না?
শান্ত, কোমল গলায় সুধায় পূর্ণতা। জাওয়াদ তার বাইকের সাথে হেলান দিয়ে বলে–
—আশেপাশে কোথাও যাই। নিয়মতান্ত্রিক জীবনে আজ না হয় একটু অনিয়ম করে বাসায় গেলাম।
—আচ্ছা।
—আমি তোমার বাসার সামনে আসছি।
পূর্ণতা সম্মতি জানালে জাওয়াদ কল কেটে বাইকে বসে তা ছুটিয়ে নিয়ে যেতে থাকে পূর্ণতাদের বাসার উদ্দেশ্যে। তার মনের মধ্যে আলাদা এক খুশি দোল খাচ্ছে। পূর্ণতাকে নিয়ে আজই প্রথম বের হচ্ছে। তাও রাতে। বিষয়টা কেমন অদ্ভুত ঠেকে কিন্তু কিছু করার নেই তার। মাঝে মধ্যে অদ্ভুত কাজকাম করে নিজেকে একটু প্রশান্তি দিতে হয়।
সেদিন তারা রাত দশটা পর্যন্ত ঘুরাঘুরি করে। পুরোটা সময় জাওয়াদের হাতে হাত রেখে ঘুরেছে পূর্ণতা। দশটার দিকে মিসেস শেখ ফোন দিয়ে জাওয়াদকে বাসায় আসতে বললে জাওয়াদ পূর্ণতাকে তার বাবার বাসার সামনে নামিয়ে দেয়। পূর্ণতা তাকে বাসাট ভেতরে যেতে বললে জাওয়াদ বলে–
—আর কিছুদিন পর। একেবারে জামাই আদর খেতে আসব।
পূর্ণতা একটা মিষ্টি হাসি দিয়ে বলে–
—আমার বাবা আপনাকে আপ্যায়নের জন্য বসেই আছে।
—এবার বাসায় যাও। বেশিদিন থাকা চলবে না বাপের বাড়ি, কাল পরশু চলে আসবে বাসায়।
পূর্ণতা জাওয়াদের কাছে এসে তার বুকের কাছের বোতাম নখ দিয়ে খুঁটতে খুঁটতে বলে–
—কেন? মিস করছেন বুঝি?
—তা একটু করছি। কিন্তু তোমাকে না তোমার হাতের রান্নাকে।
পূর্ণতা রাগ দেখিয়ে চলে যেতে নেয়। জাওয়াদ হেঁসে তার হাত ধরে আটকে দেয়। তারপর তাকে নিজের দিকে ঘুরিয়ে হাসি হাসি মুখে বলে–
—নিজে খেয়াল রেখো। আর বেশি খারাপ লাগলে আমায় জানিয়ো। কি জানাবে তো?
—হুম। আসি তাহলে?
—আসো।
পূর্ণতার হাত ছেড়ে দেয় জাওয়াদ। পূর্ণতা তাদের বাসার দিকে কয়েক কদম হেঁটে গিয়ে হঠাৎই থমকে যায়। তারপর হুট করে ছুটে জাওয়াদের কাছে এসে তার ডান গালে একটা চুমু দিয়ে দৌড়ে বাসার মেইন গেইটের ভেতরে চলে যায়। জাওয়াদ হা করে পূর্ণতার ভালোবাসায় সিক্ত গালে হাত রেখে তাকিয়ে তার প্রস্থান দেখে। কিছুক্ষণ পর নিজেকে সামলে নিয়ে বাইকে চড়ে বসে। মাথায় হেলমেট পরে বাইক স্টার্ট দেওয়ার আগে শেষবারের মতো পূর্ণতার রুমের বেলকনির দিকে তাকায়। দেখতে পায় পূর্ণতা সেখানে দাঁড়িয়ে তাকে দেখছে। জাওয়াদ হাত নাড়িয়ে তার থেকে বিদায় নিয়ে বাইক স্টার্ট করে চলে যায় নিজের বাসায়।
পূর্ণতা আরো দুইদিন তার বাবার বাসায় থাকে। পঞ্চম দিনে সে অফিস করে জাওয়াদের সাথেই ফিরে জাওয়াদদের বাসায়। জাওয়াদ কেমন উসখুস করছে আজ তার বাসায় আসা নিয়ে, অথচ এই জাওয়াদ গত দু’দিন তাকে পাগল করে ফেলেছে সে কখন বাসায় আসবে এরা জিজ্ঞেস করে করে।
পূর্ণতা দরজার সামনে দাঁড়িয়ে উৎফুল্ল মনেই কলিংবেল চাপে। কলিংবেল চাপার পর পূর্ণতা জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে দেখে, জাওয়াদ কেমন ঘামছে। আজ ওয়েদার নাতিশীতোষ্ণ। গরম না আহামরি। তাও কেন জাওয়াদ ঘামছে তা তার বোধগম্য হলো না। সে জাওয়াদকে জিজ্ঞেস করে–
—ঘামছেন কেন? আমি বাসায় এসেছি বলে ভয় পাচ্ছেন? তাহলে চলে যাই এখান থেকেই?
কথাটা বলেই পূর্ণতা উল্টো পায়ে হাঁটা দিলে জাওয়াদ তার হাত ধরে থামিয়ে দেয়। তারপর শান্ত গলায় বলে–
—তোমার বাসায়, তোমার সংসারে তুমি ফিরে এসেছো এতে আমার ভয় পাওয়ার কি আছে? কিন্তু একটা কথা রাখবে আমার?
জাওয়াদের মুখে “তোমার সংসার” কথাটা শুনে পূর্ণতা থমকে যায়। সত্যি এবার তার একটা সংসার হলো বুঝি? হলোই তো, জাওয়াদ বললো তো মাত্র এই সংসার তারও। পূর্ণতা ইমোশনাল হয়ে যায়। সে ভেঙে আসা গলায় বলে–
—কি কথা? বলেন, আমি আপনার সব কথা রাখবো।
—যেকোন পরিস্থিতি আসুক না কেন তা ধৈর্য ধরে মোকাবিলা করবে। অধৈর্য হয়ে চোটপাট করবে না। কি মনে থাকবে তো?
—আপনি আমার ধৈর্যের পরিমাণ জানেন না শেখ সাহেব।
তাদের কথার মাঝেই দরজা খুলে দেয় কেউ একজন। দরজা খোলার আওয়াজে তারা দু’জনে সেদিকে তাকায়৷ জাওয়াদ স্বাভাবিক থাকলেও, পূর্ণতা হতভম্ব হয়ে যায় দরজা খুলে দেওয়া ব্যক্তিটিকে দেখে।
📌গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুমহলের নিকট গল্পটি পৌঁছে দিন।
শব্দসংখ্যা~২৪৩০
~চলবে?
[এটায় বেশি রেসপন্স করলে পরের পর্বও এমন বড় হবে। নাহলে, পর্বটাকে দুই ভাগে বিভক্ত করে তারপর দিবো। সবকিছু আপনাদের হাতে। আর রোজ রোজ এক কথা বলতে ভালো লাগে না, গল্পটাকে আমার মতো লিখতে দিন। অতীত বলছি তাড়াতাড়ি শেষ হবে। বর্তমান দেখান, অতীত ভালো লাগছে না এগুলো বাদে অন্যকিছু বলার থাকলে কমেন্ট করবেন। যারা স্ল্যাং ইউজ করছেন, তাদের বিনা কথায় ব্যান করবো আমি। গল্প আপনাদের গালি খেতে লিখি না, নিজের শান্তির জন্য লিখি।
ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩১
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৫
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৮
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২