শেষপাতায়সূচনা [১৫]
সাদিয়াসুলতানামনি
পরেরদিন অফিসে গিয়ে পূর্ণতাকে পায় জাওয়াদ। নিত্যদিনের মতো পূর্ণতা তার কাছে এসে গদগদ করে আর নাই বা তাকে জড়িয়ে ধরে তার হালচাল জিজ্ঞেস করে। জাওয়াদের মনের খচখচানি আরো কিছুটা বেড়ে যায়। কাজের ফাঁকে ফাঁকে জাওয়াদ আজ সারাটা দিন লুকিয়ে চুরিয়ে পূর্ণতাকে দেখে। যেই কাজটা এতদিন পূর্ণতা করত আজ সেটা সে করছে। আশ্চর্যজনক ব্যাপার স্যাপার।
লাঞ্চ আওয়ারে সকলে ক্যান্টিনে লাঞ্চ করতে চলে গেলে তখন জাওয়াদ পূর্ণতার কেবিনে আসে। পূর্ণতা তখন টেবিলের উপর হাত রেখে তাতে মাথা দিয়ে শুয়ে ছিল। জাওয়াদ আজ প্রথমবারের মতো পূর্ণতা পারমিশন না নিয়েই তার কেবিনে ঢুকে যায়। কেবিনে প্রবেশ করে পূর্ণতাকে এভাবে শুয়ে থাকতে দেখে জাওয়াদের খারাপ লাগাটা বেড়ে যায়। মেয়েটা কি অসুস্থ? চোখ-মুখেও তো নিত্যদিনের ন্যায় হাসি নেই।
জাওয়াদ নিজের কৌতূহল দমাতে না পেরে জিজ্ঞেসই করে বসে–
—কি হয়েছে তোমার? এভাবে মাথা নিচে করে শুয়ে আছো কেনো অফিসে? শরীর খারাপ লাগছে?
জাওয়াদের গলার স্বর শুনে পূর্ণতা তার মাথা তুলে। পূর্ণতার মুখ আগের থেকেও কেমন বেশি গম্ভীর হয়ে আছে, সেই সাথে নাক ও চোখ হালকা লাল হয়ে আছে। কান্না আঁটকে রাখলে যেমনটা লাগে, পূর্ণতাকে বর্তমানে দেখতে ঠিক তেমনটাই লাগছে।
পূর্ণতা জোর করে নিজের মুখে হাসি ফুটিয়ে তুলে বলে–
—একমাত্র জামাই টাকে কাল থেকে নাকানিচুবানি খাওয়াতে না পেরে মনটা বড়ই খারাপ। তাই শোক পালন করছিলাম।
জাওয়াদের বিচক্ষণ নজর খুবই দক্ষতার সাথে পূর্ণতার মিথ্যে ধরে ফেলে। এই মেয়ের চোখ ভরা বিষাদের অশ্রু অথচ মুখে কি চমৎকার হাসিই না ফুটিয়েছে।
জাওয়াদ তার প্যান্টের পকেটে হাত গুঁজে বলে–
—যতটা ম্যাচিউর দেখাতে চাও নিজেকে, ততটা ম্যাচিউর এখনও হয়ে ওঠো নি। বয়সের তুলনায় বেশি ম্যাচিউরিটি নিজের কাঁধে তুলে নিতে চেও না মেয়ে, তাহলে সামলাতে হিমশিম খাবে।
জাওয়াদের কথা শুনে পূর্ণতার হাসি মিইয়ে যায়। সে এক ধ্যানে জাওয়াদের দিকে তাকিয়ে থাকে। চোখে তার কত শত অভিমান-অভিযোগ জাওয়াদের প্রতি, কিন্তু এই শ্যামসুন্দর পুরুষ বুঝলে তো!
নিস্তব্ধতার চাদর ছিন্ন করে জাওয়াদই আবার বলে ওঠে–
— বাই দ্যা ওয়ে তোমার ফোন কাল রাতে বন্ধ ছিলো কেনো?
পূর্ণতা তার প্রশ্ন শুনে চমকে ওঠে। জাওয়াদ কিভাবে জানল তার ফোন বন্ধ ছিলো? তাহলে কি তার শ্যামসুন্দর পুরুষ তার খোঁজ খবর নিতে ফোন দিয়েছিলো?
পূর্ণতার মিইয়ে যাওয়া চঞ্চলতা আবারও তার মধ্যে প্রকাশ পায় খানিকের মধ্যেই। সে চটপটে গলায় প্রশ্ন করে–
—আপনি কিভাবে জানলেন, আমার ফোন কাল রাতে বন্ধ ছিলো?
জাওয়াদ তার এহেন প্রশ্নে বিরক্তই হয়। কিভাবে জানল এটা আবার কি ধরণের প্রশ্ন? অবশ্যই সে ফোন দিয়েছিল বলেই জানতে পেরেছে, পূর্ণতার ফোন বন্ধ ছিল। জাওয়াদ তার একহাত দিয়ে ঘাড়ে ম্যাসাজ করতে করতে ত্যাড়া উত্তর দেয়–
—আমার নানা ফোন দিয়েছিল তোমায়, তোমাকে না পেয়ে চমায় ফোন দিয়ে বলেছে তার নাতী বউয়ের ফোন বন্ধ।
পূর্ণতা এবারও আরেকটা বোকার মতো প্রশ্ন করে–
—নানা শ্বশুর আমাকে ফোন দিয়েছিলো? সে নাকি কয়েক বছর আগে মারা গিয়েছে, জিনিয়া বলেছিল একদিন আমায়। তাহলে সে আমায় কিভাবে ফোন দিলো?
পূর্ণতা তার জায়গা ছেড়ে হেঁটে আসতে আসতে প্রশ্নটা করে জাওয়াদকে। জাওয়াদের বিরক্তি তার সীমা অতিক্রম করে।এই মেয়ে এত বড় বড় ডিল অনায়াসে হ্যান্ডেল করতে পারলেও, সামান্য একটা বিষয় ধরতে পারছে না। জাওয়াদ দুই আঙুল দিয়ে পূর্ণতার মাথায় টোকা দিয়ে বলে–
—ঘটে কি শুধু আমাকে নাকানিচুবানি খাওয়ানোর বুদ্ধি নিয়েই ঘুরো? এত সিলি সিলি কোয়শ্চন করছে তুমি? অবশ্যই আমি ফোন দিয়েছিলাম তাই জানতে পেরেছি তোমার ফোন বন্ধ ছিল কাল।
পূর্ণতার সকল মন খারাপী কর্পূরের ন্যায় গায়েব হয়ে যায়। চোখ মুখে অজানা এক প্রাপ্তিতে জ্বলজ্বল করে ওঠে। জাওয়াদ তাকে ফোন দিয়েছিলো এটা শুনেই তার কাল রাত থেকে হওয়া সকল মন খারাপ, অভিমান দূর হয়ে যায়।
সে জাওয়াদের আরেকটু সামনে কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করে–
—কিন্তু আপনি আমায় ফোন দিয়েছিলেন কেন জামাই জান?
এই রে! হয়েছে এবার। জাওয়াদ এই প্রশ্নের উত্তর হিসেবে কি বলবে? সে তো আর এটা বলতে পারবে না যে, আমার তোমার গলার আওয়াজ শোনার তৃষ্ণা পেয়েছিল। জাওয়াদ এদিক-সেদিক তাকিয়ে উত্তর খুঁজতে থাকে, কিন্তু যুতসই কোন উত্তর পায় না দেওয়ার মতো। সে আমতাআমতা করতে থাকে।
পূর্ণতা তার ইতস্তত দেখেও পুনরায় জিজ্ঞেস করে–
—কি হলে বলুন জোর করে বিয়ে করা জামাইজান? আপনি এই অধম নারীকে কেন ফোন দিয়েছিলেন? নিশ্চয়ই প্রেমালাপ করতে নয়। আর অফিসেরও কোন বিষয়ে জটিলতার কথা জানানোর নেই আমায়, তাহলে কেন ফোন দিয়েছিলেন?
জাওয়াদ আমতাআমতা করতে করতে মিথ্যে বলে–
—জিনি কথা বলতে চেয়েছিল তাই….
—জিনি চাইলে বাবার বা বাসার ল্যান্ডলাইন থেকে কল দিতে পারত। আপনার ফোন থেকে আমায় কল দেওয়ার সাহস এখনও ওর হয়ে ওঠেনি। তার ভাই যে এখনও আমাকে নিজের স্ত্রী হিসেবে মেনে নেয় নি, সেটা জিনি বেশ ভালো করেই জানে। তাই আমার ভোলাভালা ননদিনীর নাম নিবেন না।
এই রে! এবার জাওয়াদ কিসের ছুতো দিবে। জাওয়াদ এদিক-সেদিক তাকাতে তাকাতে আঁড়চোখে একবার পূর্ণতার দিকে তাকালে দেখতে পায়, পূর্ণতা মিটমিটিয়ে হাসছে। জাওয়াদ এই প্রথম বারের মতো পূর্ণতার হাসি দেখে তার উপর বিরক্ত না হয়ে নিজের উপর হয়। কি দরকার ছিল এত অস্থির হয়ে কাল কল দেওয়ার। দিলো তো দিলো, আবার সেটা এই নাচুনি বুড়ির কাছে বলেও দিলো। এখন এই মেয়ে নিজে তো নাচবেই, সাথে তাকেও নাচাবে।
জাওয়াদ বিরক্তি নিয়ে চলে যেতে চাইলে পূর্ণতা তার হাত ধরে থামিয়ে দেয়। তারপর জাওয়াদের প্রসস্ত বুকে মাথা এলিয়ে দিয়ে বলে–
—কালকের দিনটা আমার জীবনের বিষাদময় দিনগুলোর একটি ছিল। সারাদিন বাসায় এসে যখন দেখলাম আপনি একটাও কল দেন নি, সত্যি অনেক কষ্ট পেয়েছিলাম। আপনার প্রতি অনেক অনেক অভিমান নিয়ে ফোন অফ করেই ঘুমিয়ে পরেছিলাম। আপনি বোধহয় আরো পরে কল দিয়েছিলেন, তাই ফোন বন্ধ পেয়েছেন।
জাওয়াদ মন দিয়ে পূর্ণতার কথাগুলো শুনে। সোজা স্বীকার করতে বাধ্য মেয়েটা তাকে জোর করে বিয়ে করলেও, বিয়ের পর থেকে আজ পর্যন্ত সকল প্রকার চেষ্টা অবলম্বন করা শেষ তাকে পটানোর। হয়ত সে নিজেও একটু একটু করে পটে যাচ্ছে। কিন্তু জাওয়াদ মাকে অসন্তুষ্ট রেখে নতুন জীবন শুরু করতে দ্বিধান্বিত বোধ করছে।
দিনটা মোটামুটি ভালোই কাটে এরপর। সন্ধ্যায় পূর্ণতা ও জাওয়াদ একসাথেই বাসায় ফিরে। তার ফিরে আসায় সকলে খুশি হলেও মিসেস শেখ মুখ কালো করে নেয়। পূর্ণতা তা দেখেও না দেখার ভান করে রাখে। এতকিছু ধরলে সংসার করা যায় না। সে মনে প্রাণে বিশ্বাস করে, একদিন মিসেস শেখও তাকে মাথায় করে রাখবে। তাকেও জিনিয়ার মতো আদর করবে, শাসন করবে আর ভালোও বাসবে।
খাওয়াদাওয়া শেষ করে সকলে যে যার রুমে চলে যায়। জিনিয়া ম্যাথের একটা সমস্যা সমাধানের জন্য ভাইয়ের সাহায্য চাইলে জাওয়াদ তার রুমে যায়। পূর্ণতা নিজেদের রুমে এসে বিছানা গুছিয়ে নিজের স্কিন কেয়ার নিয়ে বসে। সারাদিন তেমন সময় পায় না বলেই রাতে টুকটাক যা একটু করে।
সে একটা মাচা ফেস মাস্ক মুখে লাগিয়ে বেডে আধশোয়া হয়ে ফোন ঘাটতে থাকে। মাস্কটা দশ মিনিট রেখে মুখ ধুয়ে জাস্ট একটু ময়েশ্চারাইজার লাগিয়ে শুয়ে পরবে এই হলো প্ল্যান। সে খুব একটা স্কিন কেয়ার করে না বললেই চলে। কাল সারাদিন বাহিরে বাহিরে ছিলো বলে স্কিনটা কেমন ট্যান পরে গিয়েছে, তাই আজ একটু স্কিন কেয়ার না করলেই নয়।
কিন্তু এরই মাঝে ঘটে যায় আরেক ঘটনা। জাওয়াদ রুমে এসে দরজা লাগিয়ে যেই না পেছনে ঘুরেছে, সাথে সাথে তার গলা দিয়ে এক আর্তচিৎকার বের হয়ে আসে। জাওয়াদের এমন চিৎকার শুনে পূর্ণতাও ভয় পেয়ে যায় এবং তার হাত থেকে ফোনটা নিচে পরে যায়। পূর্ণতা বেক্কলের ন্যায় জাওয়াদের দিকে তাকালে জাওয়াদ পুনরায় চিৎকার দিয়ে দরজা খুলে ছুটে রুম থেকে বের হয়ে যায়। পূর্ণতাও তার পেছন পেছন ছুট লাগায়।
এদিকে জাওয়াদের চিৎকার শুনে মি. এন্ড মিসেস শেখ ও জিনিয়া নিজেদের রুম থেকে হন্তদন্ত হয়ে বের হয়ে আসে। মিসেস শেখ তড়িঘড়ি করে ছেলের কাছে এসে জিজ্ঞেস করেন–
—জাওয়াদ, আব্বা কি হইছে তোমার? চিৎকার দিলা কেন?
জাওয়াদ ভীতু গলায় আঙ্গুল উঁচিয়ে পূর্ণতার দিকে তাক করে বলে–
—আম্মা, আমার ঘরে শাঁকচুন্নি ঢুকেছে। ঐ দেখো!
জাওয়াদের কথা শুনে তারা তিনজনই তার ইশারার দিকে তাকালে দেখতে পায় সেখানে পূর্ণতা দাঁড়িয়ে আছে। সকলে এমন কান্ডে আক্কেলগুড়ুম অবস্থা। কিছুক্ষণ পর জিনিয়া হাহা করে হাসতে হাসতে ফ্লোরেই বসে পড়ে। মি. শেখও হাসতে হাসতে বুকে হাত চেপে ধরে সোফায় বসে পড়েন। মিসেস শেখ বিরক্তিকর মুখ নিয়ে একবার স্বামী ও মেয়ের দিকে তাকাচ্ছেন, তো একবার ছেলের দিকে, আরেকবার পূর্ণতার দিকে।
মি. শেখ বহুকষ্টে হাসি থামান। তাও আবারও হাসি ঠিকরে বের হয়ে আসছে তার। কোন মতে হাসি চেপেচুপে ছেলের উদ্দেশ্যে বলেন–
—আরে গর্দভ ছেলে! ওটা তোর বউ পূর্ণতা। কোন শাঁকচুন্নি না।
বাবার কথা শুনে জাওয়াদ ভালো করে খেয়াল করে দেখে আসলেই সেটা পূর্ণতা। জাওয়াদ এবার নিজেই নিজের বোকামির উপর রেগে যায়। এদিকে পূর্ণতা তার দিকে এমন দৃষ্টি নিয়ে তাকিয়ে আছে যেনো চোখ দিয়েই গিলে খেলবে। সে হনহনিয়ে রুমে গিয়ে ওয়াশরুমে চলে যায়। জাওয়াদও একটু পর রুমে চলে আসে।
বর্তমান~
—ও মাম্মা, তুমি হাচচো কেনো?
অতীতের কথা মনে করে পূর্ণতা নিজের অজান্তেই হাসতে থাকে একা একা। তাকে হাসতে দেখে তাজওয়াদ উপরিউক্ত প্রশ্নটি করে। পূর্ণতা ছেলেকে ভুজুংভাজুং বলে বুঝ দেয়। তারপর ফ্রেশ হয়ে দুই মা-ছেলে ডিনার সেরে নেয়। শোয়ার সময় পূর্ণতা খেয়াল করে তাজওয়াদের শরীরটা কেমন গরম গরম। পূর্ণতা বুকের ভেতর কেমন খচখচ করে ওঠে। জ্বর আসবে ছেলেটার। দুপুরে ঘেমে গিয়ে এই জ্বর আসছে। ঠান্ডাও লেগে গিয়েছে অলরেডি ছোট জানটার।
পূর্ণতা ব্যাগ থেকে ভিক্স বের করে জাওয়াদের বুকে মালিশ করে দেয়। তারপর ছেলেকে বুকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে পড়ে। কিছুক্ষণের মাঝে তাজওয়াদ ঘুমিয়ে গেলেও ঘুমায় না পূর্ণতা। তার মাথায় শুধু একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, মিসেস শেখ আর জাওয়াদ সিলেটে কেনো? আর আরিয়ানের হবু শ্বশুর বাড়িতেই বা মিসেস শেখ কি করছিলো? তাহলে কি শেখ পরিবারের কারোর সাথে পুনরায় নতুন গাঁটছড়া বাঁধতে চলেছে তাদের পরিবারের ছেলের সাথে? প্রশ্নটা ক্রমেই পূর্ণতার অস্থিরতার কারণ হতে থাকে।
📌গল্পটি ভালো লাগলে বেশি বেশি শেয়ার করে আপনার গল্পপ্রেমী বন্ধুমহলের নিকট পৌঁছে দিন।
~চলবে?
[ভুলক্রুটি ক্ষমা সুন্দর দৃষ্টিতে দেখবেন। গঠনমূলক মন্তব্য করবেন। হ্যাপি রিডিং মাই লাভিং রিডার্স ]
Share On:
TAGS: শেষ পাতায় সূচনা, সাদিয়া সুলতানা মনি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৭
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৩
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ৩+বোনাস
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৯
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১৬
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ১০
-
শেষ পাতায় সূচনা পর্ব ২১