Golpo কষ্টের গল্প রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র

রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৯


রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র

পর্ব_৯

কলমে #নিলুফানাজমিননীলা

★★★
রাত তখন অনেকটা। চারদিকে পিনপতন নীরবতা বিরাজ করছে। বাড়ির সবাই হয়তো এখন গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন, শুধু জেগে আছে তৃণা। সে একপলক আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে দেখল সে উল্টো দিকে ফিরে অঘোরে ঘুমাচ্ছে। তৃণা আরিয়ানের সাথে বিছানায় শোয়নি, মেঝের এক কোণে বিছানা পেতে শুয়েছিল।

​তৃণা অত্যন্ত সাবধানে, শব্দ না করে উঠে বসল। ঘরের কোণে রাখা তার সেই বহু পুরোনো আলমারিটা ধীর হাতে খুলল সে। একগাদা কাপড়ের পেছনের লুকানো অংশ থেকে বের করে আনল একটি কাঠের ফ্রেমের বাঁধানো ছবি। সেখানে তিনজন মানুষের হাস্যোজ্জ্বল মুখ। মাঝখানে ছোটবেলার তৃণা, আর দুই পাশে তার বাবা-মা।
​তৃণা ছবিটা নিয়ে আলমারিতে পিঠ ঠেকিয়ে মেঝেতে বসে পড়ল। ছবির মহিলার মুখখানায় অতি যত্ন আর মমতায় হাত ছুঁইয়ে দিল সে। ছবিতে মহিলাটির বয়স বড়জোর পঁচিশ হবে। নিখুঁত সুন্দরী এবং ভীষণ রূপবতী একজন নারী। তৃণা ছোটবেলায় শুনেছে, তার জন্মের পর পাড়া-প্রতিবেশী সবাই অবাক হয়ে বলত “বাবা-মা এত সুন্দর, অথচ মেয়েটা এমন শ্যামলা হলো কী করে?” তৃণার গায়ের রঙ চাপা বলে তার দাদিও তৃণার মাকে অনেক কটু কথা শুনিয়েছেন।

​কিন্তু তৃণার বাবা-মা এসবের তোয়াক্কা করেননি। তাদের কাছে তৃণা ছিল পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ উপহার। ভালোবাসার কোনো কমতি ছিল না সেই ছোট্ট সংসারে। কিন্তু প্রবাদ আছে না, অতিরিক্ত সুখ নাকি সয় না? তৃণার ক্ষেত্রেও তাই হলো।
​তৃণার বয়স যখন মাত্র দশ বছর, তখন এক ভয়াবহ রোড এক্সিডেন্টে সব তছনছ হয়ে গেল। তাদের গাড়িটি নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে নদীতে পড়ে গিয়েছিল। ভাগ্যক্রমে ছোট তৃণা আর তার বাবা বেঁচে ফিরে এলেও, চিরতরে হারিয়ে গেলেন তৃণার মা মেহেরজান। পুলিশ-উদ্ধারকারী দল অনেক খুঁজেও তাকে পায়নি। শেষ পর্যন্ত সবাই ধরে নিয়েছিল, উত্তাল স্রোতে তিনি হয়তো বহু দূরে ভেসে গেছেন। আর বেঁচে থাকা সম্ভব নয়।

​সেই থেকে তৃণার জীবনের বসন্ত ফুরিয়ে গেছে। মায়ের আদর আর বাবার সেই নিঃস্বার্থ ভালোবাসা হারিয়ে আজ সে এই বাড়িতেই পরবাসী। ছবির মেহেরজানের স্নিগ্ধ মুখের দিকে তাকিয়ে তৃণার চোখের জল টুপ করে ফ্রেমের কাঁচের ওপর পড়ল। আজ তার বড় জানতে ইচ্ছে করছে, মা থাকলে কি কি রিনি আর রৌশনারা বেগম তাকে এভাবে মারার সাহস পেত?

বুকের ভেতর জমে থাকা দীর্ঘশ্বাসগুলো আজ শব্দ হয়ে বেরিয়ে আসতে চাইছে। সে খুব নিচু স্বরে বিড়বিড় করে বলল,
​“আম্মু, তুমি সবসময় বলতে তোমার মেয়ে হবে ভীষণ সাহসী। তুমি শিখিয়েছিলে কখনো অসহায় হয়ে থাকতে নেই, কারণ মানুষ অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে ভালোবাসে। তোমার সেই প্রতিটি কথা আজও আমার কানে স্পষ্ট বাজে আম্মু। কিন্তু দেখো, তোমার মেয়ে তোমার কথা রাখতে পারছে না। আমি আজ বড় বেশি অসহায়। আমি না চাইতেই চোখ বেয়ে জল গড়িয়ে পড়ে। আমি চাইলেও কারো মনের মণিকোঠায় একটুখানি জায়গা করে নিতে পারি না। আমার সাথেই এমন কেন হয় আম্মু?”
​তৃণার কান্নার শব্দটা হয়তো খুব ক্ষীণ ছিল, কিন্তু রাতের এই পিনপতন নিস্তব্ধতায় তা প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। হঠাৎ সে খেয়াল করল বিছানায় আরিয়ান নড়াচড়া করছে। হয়তো সে জেগে যাচ্ছে। তৃণা বুক ধড়ফড়ানি নিয়ে তাড়াহুড়ো করে ছবির ফ্রেমটা আবার কাপড়ের আড়ালে লুকিয়ে ফেলল।
​এই একটা ছবিই তার জীবনের পরম সঞ্চয়। রৌশনারা বেগম এই বাড়িতে আসার পর মেহেরজানের আর কোনো স্মৃতিচিহ্ন বাকি রাখেননি সব ছবি তিনি ভেঙে চুরমার করে দিয়েছেন। কেবল এই ছোট ছবিটাই তৃণা অনেক কষ্টে বুক দিয়ে আগলে রেখেছে।
★★★
নৌশি আদনানের রুমে গান গাইতে গাইতে ঢুকল। আদনানের রুমে যখন সে ঢুকল, ঘর তখন একেবারে ফাঁকা। শুধু ওয়াশরুমের ভেতর থেকে পানির পড়ার শব্দ আসছে। নৌশি দরজার কাছে গিয়ে মুখ টিপে হেসে হাঁক ছাড়ল,
​“ও আদু ভাই! ওয়াশরুমে নাকি?”

​ভেতর থেকে আদনানের দাঁত কিড়মিড় করার শব্দ শোনা গেল, “তোর ওই লম্বা জিভটা কি একটু থামাবি? তোরে না কতবার বলছি আমাকে ওই পচা নামে ডাকবি না? আদু ভাই আবার কী? নামটা শুনলেই মনে হয় আমি কোনো আলুর বস্তা!”

​নৌশি ড্রেসিং টেবিলের আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজের চুলগুলো একটু ঠিক করে নিয়ে খিলখিল করে হাসল। বলল, “আরে নামটা তো দারুণ কিউট! শুনলেই কেমন জানি ‘আদু আদু’ আদর ভাব আসে। তুই আসলে এসব বুঝবি না ।”

​ঠিক সেই মুহূর্তেই আদনানের ফোনটা খাটের ওপর থেকে ‘টুং টাং’ শব্দে বেজে উঠল। নৌশি গলা বাড়িয়ে বলল, “তোর ফোনে কেউ কল করছে।”

​ভেতর থেকে আদনান গর্জে উঠল, “খবরদার কল ধরবি না! আমি বের হয়ে ব্যাক করব।”

​নৌশির চোখের তারা চিকচিক করে উঠল। আদনান বারণ করেছে মানেই হলো, এই কলটা ধরা এখন তার নাগরিক দায়িত্ব! সে বাঁকা হেসে ফোনটা হাতে নিল। স্ক্রিনের দিকে তাকাতেই দেখল নাম সেভ করা ‘স্বপ্না’। আর নামের পাশে বড় বড় দুটো লাল টুকটুকে হার্ট ইমোজি!
​নৌশির মাথায় তখন শয়তানি বুদ্ধি কিলবিল করছে। সে কলটা রিসিভ করেই একদম বিড়ালছানার মতো মিষ্টি গলায় বলল, “হ্যালো… কে বলছেন?”

​ওপাশ থেকে এক তরুণী অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল, “হ্যালো! আপনি কে? আর আদনান কোথায়?”

​নৌশি মনে মনে হাসল, ‘এবার বাছাধন যাবে কোথায়!’ সে শান্ত গলায় বলল, “আমি আদনানের কাজিন। আপনি কি রিনা আপু বলছেন?”

​মেয়েটা ভুরু কুঁচকে বলল, “না।”
​নৌশি এবার অভিনয়ের পরের ধাপে গেল। একটু আশ্চর্য হওয়ার ভান করে বলল, “ওহ! আচ্ছা… তার মানে আপনি লিজা আপু! আহা, সরি সরি। আসলে কালই তো আদনান ভাইয়া আপনার সাথে আমাকে পরিচয় করিয়ে দিল। আমি তো কী সুন্দর ভাবি ভাবি বলে ডাকলাম আপনাকে মনে নেই?”

​ওপাশ থেকে স্বপ্নার রক্তচাপ তখন আকাশে চড়ে গেছে। সে চিল চিৎকার করে বলল, “কীহ! লিজা? রিনা? এই আদনানের বাচ্চার আসলে কয়টা গার্লফ্রেন্ড আছে শুনি?”

​নৌশি এবার মোবাইলটা একটু দূরে সরিয়ে নিজের হাসিটা দমিয়ে নিল। তারপর খুব দরাজ গলায় বলল, “আরে বেশি না! গুনে গুনে এই ধরেন বারো-চৌদ্দটা হবে। আমি তো বলি ভাইয়া টিম করে একটা ফুটবল ম্যাচ খেলো গার্লফ্রেন্ডদের নিয়ে, কিন্তু সে তো শোনেই না!”

​আদনান তখন তোয়ালে দিয়ে মাথা মুছতে মুছতে ওয়াশরুম থেকে বের হয়েই থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল। দেখল নৌশি তার ফোনের ওপর হাত রেখে হাসিতে লুটিয়ে পড়ছে। আদনানের মনে হলো, তার পায়ের তলা থেকে আজ মাটিটা সত্যিই সরে যাচ্ছে!

আদনান তোয়ালে ফেলে দিয়ে ঝড়ের বেগে ছুটে এসে নৌশির হাত থেকে ফোনটা ছিনিয়ে নিল। কোনোমতে হাঁপাতে হাঁপাতে বলল, “হ্যালো… হ্যালো স্বপ্না! শোনো আমার কথা…”

​ “ব্লাডি বাস্টার্ড! তুই একটা আস্ত চিটার! তুই শালা কয়টার সাথে প্রেম করিস? রিনা আর লিজা কারা? ওরা কি তোর ফুটবল টিমের মেম্বার?”

​আদনান মুখ খোলার আগেই স্বপ্না শেষ বাণটা মারল, “আজ থেকে তোর সাথে আমার সব শেষ! জাস্ট গেট লস্ট!” বলেই খটাস করে কলটা কেটে দিয়ে আদনানকে ব্লক করে দিল।

​আদনান পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। পাশে তাকিয়ে দেখে নৌশি সোফায় গড়াগড়ি খেয়ে হাসছে।
​আদনানের মাথায় তখন রক্ত চড়ে গেছে। সে দাঁত কিড়মিড় করে এক লাফে গিয়ে নৌশির চুলের মুঠি ধরে ফেলল। নৌশিও কি কম? সে-ও ‘আঁউ’ করে চিৎকার দিয়ে আদনানের চুল খামচে ধরল। আদনান রাগে কাঁপতে কাঁপতে বলল,
“তোর সমস্যা কী রে ডাইনি? তুই কি কসম খেয়েছিস যে আমাকে কোনোদিন প্রেম করতে দিবি না? এই নিয়ে গুনে গুনে সাতটা রিলেশন ভাঙলি তুই!”

​নৌশি চুল না ছেড়েই জেদি গলায় বলল,
“বেশ করেছি! সাতটা কেন, সত্তরটা ভাঙব! তোর মতো ‘আদু ভাই’দের প্রেম মানায় না।”

​আদনান গর্জে উঠল, “ওরে তিন আঙুলের নাদানের বাচ্চা! আমি প্রেম করলে তোর সমস্যা কি?”

​নৌশি দ্বিগুণ তেজে চেঁচিয়ে উঠল, “খবরদার! আমাকে নাদান ডাকবি না আদুর বাচ্চা! আর আমি তিন আঙুল হতে যাব কেন? আমি পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি লম্বা, বুঝলি? মেপে দেখিস!”

​আদনান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে বলল, “পাঁচ ফুট দুই ইঞ্চি? ওই তো আমার হাঁটুর নিচেই পড়ে থাকিস তুই!”

​নৌশি যখন দাঁতে দাঁত চেপে আদনানকে কামড় দেওয়ার প্রস্তুতি নিচ্ছে, ঠিক তখনই ঘরের দরজায় মিতু এসে দাঁড়াল। মিতু বেশ কড়া গলায় ধমক দিয়ে বলল, “কী সমস্যা তোমাদের? এটা কি নিজেদের বাড়ি পেয়েছ? মনে রেখো, আমরা এখানে বেড়াতে এসেছি। বাইরে থেকে তোমাদের এই বাঁদুরে ঝগড়া শোনা যাচ্ছে। লজ্জা করে না?”

​আদনান অভিযোগের সুরে বলতে শুরু করল, “মিতু ভাবি, তুমি জানো এই নৌশি আজ কী করেছে? ও আমার…”

​মিতু হাত তুলে তাকে থামিয়ে দিয়ে ঝাড়ি দিল, “থাক, আর বলতে হবে না। তোমাদের সারাদিন এই ইঁদুর-বেড়াল লড়াই লেগেই থাকে। এখন চুপ করো দুজন!”

​ভাবির ধমকে কাজ হলো। আদনান চুল ছেড়ে দিয়ে নৌশির দিকে আঙুল উঁচিয়ে বলল, “তোকে কাল দেখে নেব, নাদানের বাচ্চা!”
★★★
দুপুরের খাওয়া-দাওয়া শেষ করে সবাই ড্রয়িংরুমে আড্ডায় বসেছে। মিতু, তৃণা, আরিয়ান, নৌশি এমনকি রিনিও আছে সেখানে। রিনি মেয়েটার স্বভাবটাই যেন একটু বেশি উটকো। সে বারবার সুযোগ পেলেই আরিয়ানের গা ঘেঁষে বসার চেষ্টা করছে, যা উপস্থিত কারোরই নজর এড়াচ্ছে না।
​রিনির এই আদিখ্যেতা দেখে নৌশি রীতিমতো বিরক্ত। সে মিতুর কানের কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিস করে বলল, “ভাবি, এই রিনি মেয়েটাকে দেখছ? মনে হচ্ছে এখনই কষে একটা লাগিয়ে দিই!”

​মিতু সাবধান করে দিয়ে বলল, “আরে চুপ করো! কেউ শুনে ফেলবে তো, তখন আরেক অশান্তি হবে।”

​কিন্তু রিনির যেন কোনোদিকেই ভ্রুক্ষেপ নেই। সে হঠাৎ সবাইকে চমকে দিয়ে একদম সরাসরি আরিয়ানকে প্রশ্ন করে বসল, “তা আরিয়ান, তৃণার সাথে তোমার বন্ডিং কেমন যাচ্ছে? আই মিন, সিরিয়াসলি তোমার কি ওকে পছন্দ হয়েছে?”

​কথাটা শুনে ড্রয়িংরুমে একটা থমথমে নীরবতা নেমে এল। সবাই রিনির অভদ্রতায় ভ্রু কুঁচকে তাকালো, কিন্তু রিনির মুখে বিন্দুমাত্র সংকোচ নেই। আরিয়ান কিছুটা অবাক হয়ে পালটা প্রশ্ন করল, “মানে?”

​রিনি বাঁকা হাসি হেসে বলল, “মানে তুমি এত হ্যান্ডসাম, এত হট একটা ছেলে! তোমার পাশে এমন একটা শ্যামলা আর সাধারণ মেয়েকে যে কেন বাবা বিয়ে দিল, আমি ভেবেই পাচ্ছি না।”

​নিজের আপন বড় বোনের মুখে এমন অপমানজনক কথা শুনে তৃণার মাথাটা লজ্জায় আর অপমানে নুয়ে পড়ল। গায়ের রং নিয়ে মানুষের এই হাজারো বিদ্রূপ তার পিছু ছাড়ছে না। আরিয়ান একবার আড়চোখে তৃণার নিচু হয়ে থাকা মুখটার দিকে তাকালো।
​ঠিক তখনই পরিস্থিতির হাল ধরল নৌশি। সে রিনির দিকে তাকিয়ে একদম মিষ্টি গলায় বিষ ঢেলে দিয়ে বলল,
“তা রিনি আপু, তুমি তো বিয়ের দিন কোন এক ছেলের হাত ধরে পালিয়েছিলে! সেখান থেকে আবার কবে ফিরলে? আর সেই ছেলেটাই বা কোথায়?”

​নৌশির এই গোলার মতো প্রশ্নে রিনি একেবারে থতমত খেয়ে গেল। ঘরের পরিবেশ মুহূর্তেই পালটে গেল। রিনি আমতা আমতা করে কোনোমতে বলল,
“কই… আমি তো পালিয়ে যাইনি!”

​নৌশি এবার একগাল হেসে ব্যঙ্গভরা কণ্ঠে বলল, “ওহ! পালিয়ে যাওনি? তাহলে কি বিয়ের আসর ফাঁকা রেখে ওই মাঝরাস্তায় ঘুরতে গিয়েছিলে? তা হাওয়া বদল কেমন হলো?”

​নৌশির এমন মোক্ষম জবাবে রিনি একেবারে চুপসে গেল।রিনি নিজের নির্লজ্জতা ঢাকতে এবার গলা উঁচিয়ে বলে উঠল, “আমি যার সাথেই যাই না কেন, সেটা বড় বিষয় নয়। আমি গিয়েছিলাম, আবার ফিরে এসেছি কারণ ওই ছেলেটা ভালো ছিল না। জীবনে কোনো ভুল হলে সেটা দ্রুত শুধরে নেওয়া ভালো। তাই আরিয়ানকে বলছিলাম, ওর সাথে তৃণার বিয়েটাও তো একটা বড় ভুল ছিল। তাই সেই ভুলটা কি এখন…”

​রিনির কথাটা আর শেষ হলো না। তার আগেই আরিয়ান হঠাৎ সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়াল। সবার সামনেই সে তৃণার হাতটা শক্ত করে নিজের হাতের মুঠোয় নিল। তারপর তৃণার একদম গা ঘেঁষে দাঁড়িয়ে রিনির চোখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল,
“কী যেন বলছিলে? তৃণার সাথে আমার বন্ডিং নেই? কে বলেছে তোমাকে এই কথা?”

​রিনির কথা যেন গলার মাঝেই আটকে গেল। তৃণা বিস্ময়ে হা করে আরিয়ানের দিকে তাকিয়ে রইল। আরিয়ান এবার তৃণার দিকে ঘুরে তাকালো, তার দৃষ্টিতে এক অদ্ভুত মায়া। সে অত্যন্ত মিষ্টি স্বরে সবার সামনে বলল,
“চলো বউ, আমরা ঘরেই যাই। এখানে বসে আড্ডা দিয়ে কোনো লাভ নেই। তার চেয়ে বরং আমরা নিজেদের মতো কিছু পার্সোনাল সময় কাটাই গে, চলো।”

​রিনির মুখটা দেখার মতো হলো। সে মনে মনে বিড়বিড় করল, ‘তার মানে কি তৃণার সাথে আরিয়ানের সত্যি সত্যিই সুসম্পর্ক হয়ে গেছে? আমার সব চাল কি তবে উল্টে যাচ্ছে?’

​আরিয়ান প্রায় সবাইকে অবাক করে দিয়ে তৃণার হাত ধরে টেনে নিজের রুমে নিয়ে এলো। ঘরে ঢোকার পরও তৃণা স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার কানে তখনো বাজছে সেই ডাকটা ‘বউ’। আরিয়ানের কণ্ঠে এই ডাকটা শোনার পর তৃণার বুকের ভেতরটা কেমন যেন মোচড় দিয়ে উঠল। মনে হলো এই ছোট্ট একটা শব্দের আড়ালে যেন অন্য রকম কোনো অনুভূতি লুকিয়ে ছিল।

​রুমে ঢুকেই আরিয়ান তৃণার হাতটা ছেড়ে দিল। তৃণা তখনো ঘোরলাগা চোখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে দেখে আরিয়ান অবহেলার সুরে বলল, “ড্রয়িংরুমে যেটা করেছি, সেটা শুধু ওই রিনির মুখ বন্ধ করার জন্য। না হলে ও তোমাকে আরও অপমান করত। জাস্ট ইট! এটাকে অন্য কোনোভাবে নেওয়ার বা সিরিয়াস ভাবার কোনো কারণ নেই।”

​আরিয়ানের এই শীতল কথায় তৃণার ঘোর মুহূর্তেই কেটে গেল। পরক্ষণেই এক বুক দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে সে বলল,
“এসব অপমান তো আমার গা সওয়া। আপনার ওইভাবে অভিনয় করার কোনো প্রয়োজন ছিল না। আর কয়েকদিন পর তো ডিভোর্স দিয়েই দেবেন, তখন তো সবার সামনে আপনার এই ‘বউ’ ডাকটা চরম মিথ্যে হয়ে যাবে। তাহলে এখন এত রং ঢং করার মানে কী?”

আরিয়ানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। মনে মনে বিড়বিড় করে বলল, ‘আসলে এই মেয়েমানুষগুলোই এমন, ভালো কাজের কোনো দাম নেই। উল্টো সবকিছুর নেতিবাচক মানে বের করবে।’
​আরিয়ান এবার সরাসরি প্রশ্ন করল,
“তোমার মা-বোনকে আসার পর থেকেই দেখছি তোমার সাথে অন্যরকম আচরণ করছে। তুমি প্রতিবাদ করো না কেন? কিছু বলো না কেন ওদের?”

​তৃণা এক চিলতে তাচ্ছিল্যের হাসি হাসল। শান্ত গলায় বলল, “আপনিও তো আমার সাথে ঠিক একই আচরণ করেন। আমি কি আপনাকে কিছু বলতে পারি? জানেন তো, সবসময় সবকিছুর সমাধান খুঁজতে হয় না। মাঝে মাঝে চুপ করে তাকিয়ে দেখতে হয়, মানুষের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে কে কেমন রং দেখায়।”

​তৃণার মুখে এমন দার্শনিক কথা শুনে আরিয়ানের রাগ চরমে পৌঁছাল, যদিও সে তা প্রকাশ করল না। জেদের বশে বলে উঠল, “আমার খারাপ আচরণ থেকে তো খুব শীঘ্রই মুক্তি পেয়ে যাবে। ডিভোর্স হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করো। আমি অলরেডি উকিলের সাথে কথা বলেছি।”

​ডিভোর্সের কথা শুনেও তৃণার মধ্যে কোনো ভাবান্তর দেখা গেল না। সে তো আগে থেকেই জানত এমনটাই হবে। সে খুব সহজভাবে জিজ্ঞেস করল,
“আপনি যাকে ভালোবাসেন, সে কি খুব সুন্দরী?”

​তৃণার মুখে ওই মেয়েটির কথা আসতেই আরিয়ানের মাথায় যেন আগুন জ্বলে উঠল। সে দাঁতে দাঁত চেপে বিষাক্ত স্বরে বলল,
“হ্যাঁ, সে সুন্দর। অনেক বেশি সুন্দর। হাজার হলেও তোমার মতো কালো বা কুৎসিত না। আর তোমার মা-বোন তোমার সাথে যেরকম আচরণ করে, তা একদম ঠিক। তোমার মতো মেয়েরা এমন ব্যবহার পাওয়ারই যোগ্য!”

​বলেই আরিয়ান ঝট করে ওপাশ ফিরে তাকাল। তৃণার বুকে আরিয়ানের কথাগুলো তীরের মতো বিঁধল। মানুষটা এতটা নিষ্ঠুর হতে পারে? এর আগে অনেক কথা শুনেছে, কিন্তু আজ কেন জানি বুকটা ফেটে কান্না আসছে। চোখের জল গড়িয়ে পড়ার আগেই সে তা মুছে ফেলল। তার খুব ইচ্ছে করছিল পাল্টা কিছু বলতে, কিন্তু গলা দিয়ে কোনো কথা সরল না। সে ধীর পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল।
​তৃণা চলে যেতেই আরিয়ান দরজার দিকে তাকাল। একটা অদ্ভুত অস্বস্তি আর অপরাধবোধ তাকে ঘিরে ধরল। কিন্তু তার রাগটা বড্ড বেশি, রেগে গেলে হিতাহিত জ্ঞান থাকে না।

চলবে…

Share On:



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 


0 Responses

Leave a Reply