রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পর্ব_২২
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
সকালের খাবার বানাতে রান্নাঘরে সকলেই ব্যস্ত। যে যার মতো কাজ সামলাচ্ছে। মিতু রুটি সেঁকছে, আর তৃণা চা আর কফি বানাচ্ছে। দুই জা-এর মধ্যে হালকা গল্প চলছে আর সেই সাথে চলছে হাতের কাজ। মিতুর মুখে আজ ভোরের শিশিরের মতো এক চিলতে হাসি লেগেই আছে। তৃণা কিছুক্ষণ মিতুর দিকে তাকিয়ে থেকে হেসে দিয়ে বলল,
“ভাবি, আজ কী এমন হলো যে মুখ থেকে হাসি একদম সরছেই না?”
তৃণার প্রশ্নে মিতু কেমন যেন লজ্জা পেয়ে গেল। সে উত্তর না দিয়ে রুটি উল্টানোতে মন দিল। তৃণা আবারও একটু ঝুঁকে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইয়ার সাথে রাগ-অভিমান তবে সব কমে গেছে?”
মিতু এবার আর লুকোতে পারল না। লাজুক হেসে মাথা উপর-নিচ নেড়ে সায় দিল, যার অর্থ হ্যাঁ, সব ঠিক হয়ে গেছে। তৃণা নিজেও মনে মনে খুশি হয়ে মুচকি হাসল।
এরই মাঝে রান্নাঘরে এসে উপস্থিত হলো নৌশি। সচরাচর নৌশি এত সকালে ঘুম থেকে ওঠে না। কিন্তু আজ কোচিং আছে বলে তৈরি হয়ে চলে এসেছে। তৃণা ওকে দেখে অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল,
“এত সকালে নৌশি? রেডি হয়ে কোথায় যাচ্ছো?”
নৌশি মুখটা কিছুটা ভার করে বলল,
“বউমনি, দুনিয়ায় যারা পড়াশোনা করে এদের জন্য শান্তি হারাম। দেখো না, এত সকালে এই ঘন কুয়াশার মাঝে কোচিংয়ে যেতে হচ্ছে!”
নৌশির কথা শুনে মিতু আর তৃণা দুজনেই হেসে ফেলল। হাসাহাসির মাঝেই নৌশির নজর হঠাৎ মিতুর গলার দিকে গেল। সেখানে ছোট ছোট লালচে দাগ, অনেকটা এলার্জির মতো দেখাচ্ছে। নৌশি অবাক হয়ে মিতুর একদম কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“ভাবি, ওসব কী হয়েছে গলায়?”
নৌশির কথায় মিতু যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে দ্রুত হাত দিয়ে গলার দাগগুলো লুকানোর চেষ্টা করতে লাগল। এবার তৃণাও উৎসুক হয়ে এগিয়ে আসল। দাগগুলো দেখে সেও বেশ অবাক হয়ে একই কথা জিজ্ঞেস করল।
মিতু কোনো উত্তর দিতে পারল না, লজ্জায় আর অস্বস্তিতে
চোখ বন্ধ করে নিল। নৌশির মাথায় হঠাৎ দুষ্টু বুদ্ধি খেলে যেতেই সে তৃণার দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারা করল। দুজনের চোখাচোখি হতেই তারা খিলখিল করে হেসে উঠল।
এদিকে মিতু তখনো গলার দাগগুলো আড়াল করতে মরিয়া। ঠিক সেই মুহূর্তেই রান্নাঘরের দরজায় এসে দাঁড়াল রোহান। মিতু রোহানের দিকে তাকিয়ে নিঃশব্দে চোখ রাঙিয়ে ওকে মনে মনে শাসাতে লাগল।
তখনি চা নেওয়ার জন্য রাহি বেগম রান্নাঘরে ঢুকলেন। সবাইকে এভাবে জটলা পাকিয়ে হাসাহাসি করতে দেখে তিনি কিছুটা অবাক হলেন। কিন্তু পরক্ষণেই তার নজর মিতুর গলার দিকে যেতেই তিনি আঁতকে উঠলেন,
“আরে মিতু মা! গলায় কী হয়েছে তোমার? এসব দাগ কিসের?”
মিতু এবার আর পারছে না, ইচ্ছে করছে লজ্জায় মাটির ভেতর ঢুকে যেতে। সে কোনোমতে তোতলামি করে জবাব দিল,
“আ… আসলে মা, হঠাৎ কেমন যেন এলার্জি হয়েছে।”
রাহি বেগম চিন্তিত মুখে রান্নাঘর থেকে বেরোতে যাচ্ছিলেন। তখনই দরজায় রোহানকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তিনি থমকে গেলেন। রোহান তখনো নিজের মনেই মুচকি মুচকি হাসছিল। কিন্তু রাহি বেগমের নজর যখন রোহানের গলার দিকে গেল, তখন তিনি যেন আকাশ থেকে পড়লেন। সেখানেও ঠিক মিতুর গলার মতোই ছোট ছোট লালচে দাগ!
তিনি মহাবিস্ময়ে বলে উঠলেন,
“তোরও এলার্জি হয়েছে রোহান? দুজনের একসাথে একই জায়গায় এলার্জি হলো কীভাবে?”
রোহান এতক্ষণ হাসছিল, কিন্তু মায়ের প্রশ্ন শুনে তার হাসি মুহূর্তেই হা হয়ে গেল। সে আমতা আমতা করে টিশার্টের কলার দিয়ে নিজের গলা ঢাকার এক ব্যর্থ চেষ্টা চালাচ্ছে। আর এদিকে মিতু লজ্জায় আর থাকতে না পেরে শাড়ির আঁচল দিয়ে পুরো মুখটাই ঢেকে ফেলেছে। নৌশি আর তৃণা তখন হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ের ওপর লুটিয়ে পড়ার দশা
ড্রয়িংরুমে ইকবাল মির্জা মানে রোহানের বাবা খবরের কাগজ হাতে বসে ছিলেন। রাহি বেগম হন্তদন্ত হয়ে স্বামীর কাছে গিয়ে বললেন,
“ওগো শুনছো? রোহান আর মিতু দুজনেরই মারাত্মক এলার্জি হয়েছে। তোমার কাছে কি এলার্জির কোনো ট্যাবলেট আছে?”
মিতু আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না। রোহানের দিকে একবার চরম লজ্জা আর রাগী চোখে তাকিয়ে সে দ্রুতপায়ে সিঁড়ি বেয়ে উপরে নিজের রুমে দৌড়ে পালাল।
ইকবাল মির্জা স্ত্রীর কথা শুনেই পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারলেন। তিনি অস্বস্তিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে ফিসফিস করে স্ত্রীকে বোঝানোর চেষ্টা করলেন,
“আহা রাহি! এবার একটু থামো তো। সবার সামনে কী শুরু করলে এসব? দিনদিন কি তোমার বুদ্ধি একদম লোপ পাচ্ছে?”
রাহি বেগম স্বামীর এমন বিরক্তিকর আচরণে অবাক হয়ে তার পাশে ধপ করে বসলেন। গলার স্বর চড়িয়ে বললেন,
“এসব কী বলছো তুমি? বুদ্ধি লোপ পেতে যাবে কেন? আমি নিজের চোখে দেখে এলাম। এলার্জিতে দুজনেরই গলার দিকটা একদম লাল হয়ে দাগ হয়ে গেছে। নিশ্চয়ই এলার্জি হয়েছে।আর এমনিতেই তো মিতির কিছুটা এলার্জির সমস্যা আছে!”
ইকবাল মির্জা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। নিজের সরলমনা স্ত্রীকে এই বয়সে এসে ‘এলার্জি’র আসল রহস্য বোঝানো তার পক্ষে অসম্ভব। তিনি আর কথা না বাড়িয়ে বিরক্তি নিয়ে সোফা ছেড়ে উঠে নিজের ঘরের দিকে হাঁটা দিলেন।
রাহি মির্জা একা সেখানেই বসে রইলেন আর ভাবতে লাগলেন, বাড়ির লোকগুলোর হয়েছেটা কী? ছেলে-বউয়ের অসুখ দেখেও কারোর কোনো চিন্তাই নেই!
★★★
আজ অনেকটা বেলা হয়ে গেছে, অথচ আরিয়ানের কোনো সাড়াশব্দ নেই। গতকাল রাতেই সে বলছিল শরীরটা খুব একটা ভালো লাগছে না, ঘুমিয়েছিলও অনেক রাত করে। ইদানীং আরিয়ানের শরীরটা প্রায়ই বিগড়ে যাচ্ছে, হয়তো মনের গহীনে চেপে রাখা সেই দীর্ঘদিনের মানসিক বিধ্বস্ততা তাকে ভেতর থেকে কুরে কুরে খাচ্ছে।
তৃণা ধোঁয়া ওঠা কফির মগটা নিয়ে রুমে ঢুকতেই দেখল আরিয়ান তখনো অঘোরে ঘুমাচ্ছে। তৃণা আলতো করে ডাকল,
“শুনছেন? উঠুন, অনেক বেলা হয়েছে।”
কিন্তু আরিয়ান নড়ল না। তৃণা মগটা পাশের টেবিলে রেখে আরিয়ানের পাশে গিয়ে বসল। এবার সে আরিয়ানের কাঁধে হাত দিয়ে ডাকার চেষ্টা করতেই চমকে উঠল। হাতের স্পর্শে মনে হলো সে কোনো এক উত্তপ্ত আগ্নেয়গিরি ছুঁয়ে ফেলেছে! হাড়কাঁপানো জ্বরে আরিয়ানের পুরো শরীর পুড়ে যাচ্ছে।
তৃণা কয়েক মুহূর্তের জন্য হতভম্ব হয়ে রইল। মানুষের শরীর এতটা উত্তপ্ত হতে পারে? সে নিজের দুশ্চিন্তা সামলাতে না পেরে আরিয়ানের কপালে হাত রাখল জ্বর এতটাই তীব্র যে তার নিজের হাতটা পর্যন্ত গরমে শিউরে উঠছে। তৃণা দিশেহারা হয়ে রুম থেকে বেরোতে চাইল কাউকে ডাকার জন্য, কিন্তু সে এক পা বাড়ানোর আগেই একটা তপ্ত হাতের শক্ত বাঁধন অনুভব করল।
আরিয়ান জ্বরের ঘোরেই তৃণার হাতটা নিজের দুই হাতের মুঠোয় শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তার বন্ধ চোখ দুটো কাঁপছে, মুখ দিয়ে অস্ফুট কিছু কথা বেরিয়ে আসছে। সে তৃণার হাতটা নিজের গালের কাছে টেনে নিয়ে অত্যন্ত করুণ আর কাতর স্বরে বিড়বিড় করে বলছে,
“যেও না… প্লিজ, আমাকে ছেড়ে যেও না।”
আরিয়ানের সেই কম্পিত স্বর আর হাতের স্পর্শে তৃণার হৃদস্পন্দন যেন এক মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। এই সেই রাগী মানুষটা, যে বাইরের দুনিয়ার কাছে এক দুর্ভেদ্য পাহাড়ের মতো অটল, অথচ জ্বরের ঘোরে সে আজ এক অবুঝ শিশুর মতো অসহায়। তৃণার বুকের ভেতরটা কেমন যেন দুমড়ে-মুচড়ে উঠল। আরিয়ানের প্রতি এতদিনকার সেই চাপা অভিমান মুহূর্তেই জল হয়ে গলে পড়ল। সে বিছানার এক কোণে বসে অন্য হাত দিয়ে আরিয়ানের কপাল থেকে অবাধ্য চুলগুলো সরিয়ে দিল। তৃণা অনুভব করল।
তৃণা আর ঘর থেকে বের হতে পারল না। আরিয়ানের হাতের বাঁধন আলগা করার সাধ্যও তার নেই। সে নিচু হয়ে আরিয়ানের কপালে হাত রেখে অত্যন্ত কোমল স্বরে বলল, “কোথাও যাব না আমি। এই তো আমি আপনার পাশেই আছি।”
আরিয়ানের কণ্ঠস্বরটা এতটাই অসহায় শোনাল যে তৃণার বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠল। সে আরিয়ানের কপালে, মুখে হাত দিয়ে অনুভব করল জ্বরের সেই প্রচণ্ড দাপট। আরিয়ানকে একটু শান্তি দেওয়ার আশায় তৃণা তার মাথার কাছে বসল। নিজের হাঁটু ভাঁজ করে খুব যত্ন নিয়ে সে আরিয়ানের মাথায় আঙুল বুলাতে লাগল।
হঠাৎ করেই আরিয়ান পাশ ফিরে এক ঝটকায় তৃণাকে জড়িয়ে ধরল। জ্বরের ঘোরে সে তখন নিজের নিয়ন্ত্রণে নেই। কাঁপতে থাকা স্বরে সে আর্তনাদ করে উঠল,
“আমি মারিনি!বাঁচাও ওদের! প্লিজ ওদের বাঁচাও!”
আরিয়ানের পুরো শরীর তখন থরথর করে কাঁপছে। তার অবয়বে ফুটে উঠেছে এক বীভৎস আতঙ্কের ছাপ। তৃণা কোনো উপায়ন্তর না দেখে আরিয়ানকে আগলে ধরল, তাকে শান্ত করার চেষ্টা করল। কিন্তু আরিয়ান তখন ছোট বাচ্চাদের মতো তৃণাকে জড়িয়ে ধরে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল। তৃণা বুঝতে পারছে না সে এখন কী করবে। ঘর থেকে বেরিয়ে কাউকে ডাকার মতো পরিস্থিতিও নেই, আরিয়ান তাকে এমনভাবে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে ধরে আছে যে ছাড়িয়ে যাওয়ার কোনো পথ খোলা নেই।
প্রথম কয়েক মুহূর্ত তৃণার ভীষণ অস্বস্তি হচ্ছিল, হৃদপিণ্ডের গতি যেন বেড়ে গিয়েছিল কয়েক গুণ। কিন্তু পরক্ষণেই আরিয়ানের কান্নাভেজা সেই আকুতি দেখে তার সব অস্বস্তি উবে গেল। সেখানে কেবল একরাশ মমতা আর মায়া জন্ম নিল। আরিয়ান আস্তে আস্তে তার হাতের বাঁধন শিথিল করে আনল, তবে তপ্ত ঠোঁটে এখনো অসংলগ্ন কিছু বিড়বিড় করে চলেছে সে।
তৃণা স্থির দৃষ্টিতে এই কঠোর মানুষটার মুখচ্ছবির দিকে তাকিয়ে রইল। মানুষ কতটা গভীর শোক আর কষ্ট বয়ে বেড়ালে এতগুলো বছর পরেও সেই বীভৎস স্মৃতি মনে করে এভাবে ভেঙে পড়তে পারে? তৃণা আজ অনুভব করল, আরিয়ানের এই পাথরের মতো কঠিন ব্যক্তিত্বের আড়ালে লুকিয়ে আছে এক রক্তাক্ত অতীত। তার মনে হলো, আরিয়ানের এই অসীম কষ্টের দহনের কাছে তার নিজের ছোটখাটো অভিমানগুলো বড্ড তুচ্ছ। লোকটার প্রতি এক অজানা টান তৃণার চোখ দুটোও আজ ভিজে এল।
★★★
নৌশি কাঁধে ব্যাগটা ঝুলিয়ে বাড়ি থেকে বেরিয়ে এল। বাইরে তখন ঘন কুয়াশার চাদর বিছানো। ঘড়ির কাঁটায় বেলা আটটা বেজে গেছে অথচ চারপাশটা দেখে মনে হচ্ছে সবে ভোর পাঁচটা বাজে। কুয়াশার কারণে সামনের পথটুকুও ঘোলাটে দেখাচ্ছে। কিছুটা সামনে এগোতেই হঠাৎ করে পথের মাঝখানে কেউ একজন কোত্থেকে লাফ দিয়ে তার সামনে চলে আসল।
নৌশি প্রচণ্ড চমকে গিয়ে কয়েক কদম পিছিয়ে গেল। ভয় কাটিয়ে সামনে নজর দিতেই দেখল আদনান তার দিকে তাকিয়ে দাঁত বের করে খিলখিল করে হাসছে। নৌশি মুহূর্তেই ভীষণ বিরক্ত হয়ে চেঁচিয়ে উঠল,
“বাড়িতেও একটু শান্তি দিস না, এখন বাইরে বের হলেও শান্তি দিবি না? এভাবে বাঁদরের মতো লাফাচ্ছিস কেন রে?”
আদনান হাসতে হাসতেই প্রতিবাদ করল,
“খবরদার! একদম বাঁদর বলবি না। তা এত সাতসকালে কোথায় যাচ্ছিস শুনি?”
“গতকাল থেকে তো একশবার বলেছি যে আজ কোচিং আছে।” বলেই নৌশি হনহনিয়ে হাঁটতে শুরু করল।
আদনানও নাছোড়বান্দার মতো নৌশির পাশাপাশি তাল মিলিয়ে হাঁটতে লাগল। কিছুক্ষণ পর সে গম্ভীর মুখে বলল, “এত সকালে এই ঘন কুয়াশার মাঝে কোচিং যাচ্ছিস, তোর ভয় করে না? যদি তোকে ভূতে ধরে?”
নৌশি মুখ ভেঙচে বলল,
“হ্যাঁ, ভূতে আমাকে ধরবে তার আগেই তুই বল এত হাড়কাঁপানো শীতের মাঝে তুই আমার সাথে সাথে কোথায় যাচ্ছিস?”
আদনান এবার কিছুটা চুপ হয়ে গেল। মনে মনে ভাবল, এখন কি সত্যি কথা বলা ঠিক হবে? আদনান মূলত এসেছে নৌশিকে রাস্তায় নিরাপত্তা দেওয়ার জন্য। এই ঘন কুয়াশা আর জনশূন্য রাস্তায় মেয়েটার একা যাওয়া একদম ঠিক হবে না এই চিন্তা থেকেই আসা। কিন্তু সত্যিটা বললে নৌশি নিশ্চিত ওকে নিয়ে ব্যঙ্গ করে আকাশ কাঁপিয়ে হাসবে। তাই আদনান গলা ঝেড়ে বলল,
“এই তো… স্বাস্থ্যই সকল সুখের মূল। সকালে একটু এক্সারসাইজ করা ভালো, তাই বেরিয়েছি।”
নৌশি থামল এবং আদনানের দিকে চরম অবিশ্বাসের ভঙ্গিতে তাকাল। তারপর বাঁকা হেসে বলল,
“যে আদু ভাই কিনা ঠান্ডার ভয়ে সাত দিনে একদিনও ঠিকমতো গোসল করে না, সে কিনা এই হাড়কাঁপানো কুয়াশায় মর্নিং ওয়াক করতে বেরিয়েছে? ভাইরে, তোর কথা শুনে হাসব না কাঁদব ভেবে পাচ্ছি না। বড্ড হাস্যকর!”
আদনান নৌশির ব্যঙ্গাত্মক কথায় মোটেও পাত্তা দিল না। সে উল্টো বেশ সিরিয়াস মুখভঙ্গি করে বলল,
“আরে ছাড় তো ওসব! শুন নাদানের বাচ্চা, আমাকে একটা দরকারি অ্যাডভাইস দে তো।”
নৌশি এবার অবাক হয়ে থামল। কপালে ভাঁজ ফেলে বলল, “তোর মতো আদু ভাইকে আমি অ্যাডভাইস দেব? কিসের অ্যাডভাইস শুনি?”
“তুই যেহেতু মেয়ে, তাহলে তো মেয়েদের মনস্তত্ত্ব ভালো বুঝিস। কাউকে ইমপ্রেস করতে গেলে আসলে ঠিক কী কী করতে হয় বল তো? মানে, কীভাবে কথা বললে বা কী করলে একটা মেয়ে ইমপ্রেস হবে?”
নৌশি এবার চোখ বড় বড় করে তাকাল। চরম বিস্ময় নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“আবারও? আবারও কোনো মেয়েকে পটানোর চেষ্টা করছিস তুই?”
আদনান কলার ঝাঁকিয়ে বুক ফুলিয়ে বলল,
“অবশ্যই! ছেলেদের আসল কাজই তো এটা। চেষ্টা না করলে কি আর জীবন চলে?”
নৌশি রাগে দাঁত কিড়মিড় করে উঠল। গজগজ করতে করতে বলল,
“আমি তো এটাই বুঝি না যে, আমাদের বংশে এত সব ভালো ভালো মানুষের মাঝে তোর মতো এই ফালতু আদু ভাইয়ের জন্ম কী করে হলো! একদিন পর পর একটা ছেড়ে আরেকটা ধরিস, তোর লজ্জা করে না?”
আদনান হাত নেড়ে প্রতিবাদ জানাল,
“এই শোন, এরকম মিথ্যে এলিগেশন দিবি না একদম। আজ পর্যন্ত একটা মেয়েও আমি পটাতে পারিনি। কেন জানি না, কোনো মেয়ের সামনে গিয়ে কথা বলতে গেলেই আমার হাসি পায়।পটাতে পারিনি এটা বললেও ভুল হবে প্রেম হয় কিন্তু ভালোবাসা হয় না।”
হাঁটতে হাঁটতে আর এই ঝগড়া চালিয়ে যেতে যেতেই তারা কোচিংয়ের গেটের সামনে এসে পৌঁছে গেল। নৌশি রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে আদনানের দিকে তাকিয়ে বলল,
“শোন, তোর কোনো অ্যাডভাইস লাগবে না। তুই সোজা গিয়ে পুকুরের জলে ঝাঁপ দে। দেখবি যার জন্য ঝাঁপ দিবি, সেই মেয়েটা পাড়ে দাঁড়িয়ে কাঁদতে কাঁদতে বলবে, ওরে আল্লাহ গো! এই বোকা ছেলেটা আমাকে ভালোবেসে পানিতে ঝাঁপ দিয়ে ঠান্ডায় মারা গেল! এর চেয়ে ভালো ইমপ্রেস করার উপায় আর নেই।”
বলেই নৌশি আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না, গটগট করে কোচিংয়ের ভেতর ঢুকে গেল। আদনান কিছুক্ষণ হা করে সেই দিকে তাকিয়ে থেকে বিড়বিড় করল, “মেয়েটা কি আসলেও আমাকে মরতে বলল নাকি আইডিয়া দিল?”
★★★
ডাক্তার এসে আরিয়ানকে দেখে গেছেন। জ্বর প্রায় ১০৪ ডিগ্রির কাছাকাছি ছিল, যা দুপুরের দিকে কিছুটা কমেছে। এতক্ষণ বাড়ির সবাই আরিয়ানের ঘরের আশেপাশে ভিড় করে ছিল। যৌথ পরিবারের এই এক সৌন্দর্য কারও সামান্য অসুখ হলেও বাকিদের মুখে অন্ন রোচে না, দুশ্চিন্তায় সকলে অস্থির হয়ে পড়েন। মায়মুনা বেগমও এসেছিলেন, কিন্তু কোমরের ব্যথার কারণে বেশিক্ষণ বসে থাকতে না পেরে শুতে গেছেন।
সবাই চলে যাওয়ার পর তৃণা পরম মমতায় আরিয়ানের সেবা করছে। গরম পানিতে কাপড় চুবিয়ে সে আরিয়ানের মুখ এবং হাত-পাগুলো মুছে দিয়েছে। আরিয়ান এখন বিছানার পিঠে হেলান দিয়ে কপালে হাত রেখে চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে। জ্বরের ঘোরে মুখটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।
তৃণা এক বাটি গরম স্যুপ নিয়ে ঘরে প্রবেশ করল। তৃণা খাবারের বাটি হাতে ঘরে ঢুকতেই আরিয়ান নাক কুঁচকে চোখ মেলল। কিছুটা বিরক্তির স্বরে বলল,
“তোমাকে খাবার আনতে কে বলেছে? হুহ?”
তৃণা শান্ত গলায় উত্তর দিল, “কেউ বলেনি। তবে আপনার এখন খাওয়া উচিত। সকাল থেকে পেটে দানা-পানি কিছু পড়েনি, এভাবে থাকলে শরীরটা আরও ভেঙে পড়বে।”
আরিয়ান এবার একটু শান্ত হলো। তৃণার একগুঁয়েমির সামনে সে বেশিক্ষণ বিরক্ত থাকতে পারল না। কিছুক্ষণ পর সে বলল,
“ঠিক আছে খাব। তার আগে একটু ল্যাপটপটা দাও তো। অফিসের একটা ইম্পর্ট্যান্ট কাজ বাকি ছিল…”
আরিয়ান কথা শেষ করার আগেই তৃণা চোখের ইশারায় তাকে থামিয়ে দিল। হাত থেকে বাটিটা টেবিলের ওপর রেখে শক্ত গলায় বলল,
“কোনো ইম্পর্ট্যান্ট কাজ এখন চলবে না। জ্বরে শরীরটা পুড়ে যাচ্ছে আর আপনার এখনো কাজের চিন্তা? আগে স্যুপটা খেয়ে নিন, তারপর বিশ্রাম। কাজ করার জন্য বাকি জীবন পড়ে আছে।”
আরিয়ান অবাক হয়ে তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল। এই প্রথম মেয়েটি তার সামনে এত অধিকার নিয়ে কথা বলছে।
তৃণা খাবারের বাটিটা নিয়ে আরিয়ানের একদম সামনে এসে বসল। চামচে করে কিছুটা স্যুপ তুলে খুব সাবধানে ফু দিয়ে আরিয়ানের মুখের সামনে ধরল। কিন্তু আরিয়ান তখনো একগুঁয়েমি করে মুখ বন্ধ করে আছে। তার এই জেদ দেখে তৃণা এবার একটু রাগী স্বরে, প্রায় ধমকের সুরেই বলে উঠল,“হা করুন বলছি!”
হঠাৎ তৃণার এমন কড়া শাসন দেখে আরিয়ান ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেল এবং বাধ্য ছেলের মতো সাথে সাথে খাবারটুকু মুখে পুরে নিল। আরিয়ানের এমন ভয়ার্ত আর অপ্রস্তুত কাণ্ড দেখে তৃণা নিজের হাসিটা কোনোমতে চেপে রাখল। আরিয়ান খাবারটা গিলে নিয়ে ধীর আর ক্লান্ত কণ্ঠে বলল,
“এসব কেন করছো তৃণা? এরকম অতিরিক্ত আদিখ্যেতা আমার একদম পছন্দ না।”
তৃণা তার কথার কোনো উত্তর দিল না। মগ্ন হয়ে পুরো স্যুপটা খাইয়ে দিল। এরপর একটা নরম টাওয়াল দিয়ে খুব যত্ন করে আরিয়ানের মুখটা মুছে দিল। কাজ শেষ করে সে আরিয়ানের একদম কাছে মুখ নিয়ে ফিসফিসিয়ে বলল,
“আর মাত্র কয়েকটা দিন একটু সহ্য করে নিন রাগি সাহেব। তারপর আর আপনার বিরক্ত হতে হবে না… আমি তো চলেই যাবো!”
কথাটা শুনে আরিয়ানের বুকটা যেন হঠাৎ ধক করে উঠল। সে পলকহীন দৃষ্টিতে তৃণার দিকে তাকিয়ে রইল। আজ আরিয়ান মনে মনে স্বীকার করতে বাধ্য হলো এই মেয়েটার চোখের মায়ায় আলাদা এক মোহ আছে, যা দিন দিন তাকে আচ্ছন্ন করে ফেলছে। সেই মোহের ঘোরেই আরিয়ান হঠাৎ অবচেতন মনে বলে উঠল,
“তুমি বড় সুন্দর শ্যামলিনী!”
তৃণার হাত জোড়া থমকে গেল। সে যেন নিজের কানকে বিশ্বাস করতে পারছে না। বিস্ময় ভরা চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
“কী?”
আরিয়ান নিজের কথা শুনে নিজেই চমকে উঠল। ভীষণ থতমত খেয়ে অপ্রস্তুত ভঙ্গিতে এদিক-ওদিক তাকিয়ে চোখ ঘুরিয়ে বলল,
“না… মানে বলছি, সবকিছুর জন্য ধন্যবাদ।”
আরিয়ানের এই অপ্রস্তুত অবস্থা দেখে তৃণা খিলখিল করে হেসে উঠল। সেই হাসিতে ঘরটা যেন উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হাসি থামিয়ে সে খুব শান্ত গলায় বলল,
“আমরা মানুষরা বড় অদ্ভুত, তাই না? নিজেদের গহীনে পুষে রাখা সহস্র অনুভূতির কথা স্বীকার করতেও আমরা ভীষণ কুণ্ঠাবোধ করি। আমাদের শব্দরা অভিমানে ঠোঁটের কোণে এসে থমকে দাঁড়ায়। অথচ দিনশেষে আমরা মূলত এই অব্যক্ত ভালোবাসা আর অনুভূতির রেশ টুকু সম্বল করেই নিজেদের বাঁচিয়ে রাখি।”
চলবে…
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৬
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪