রোদ্দুরেরছেঁড়ামানচিত্র
পব_১৮
কলমে #নিলুফানাজমিননীলা
★★★
মির্জা বাড়িটা বিশাল বিস্তৃত জায়গা নিয়ে তৈরি। বাড়ির পেছনের দিকে রয়েছে এক বিশাল বাগান। সেখানে আম, জাম, কাঁঠালের ভিড়ে আরও কত যে গাছগাছালি তার ইয়ত্তা নেই। সন্ধ্যা ঘনিয়ে এসেছে, এমন সময় আদনান কানে হেডফোন গুঁজে ডিস্কো গানে তাল মেলাতে মেলাতে বাগানের পথ দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল। শরীর নাচিয়ে তার সে কী ছন্দ!
হঠাৎ এক বিশাল আম গাছের নিচ দিয়ে যাওয়ার সময় কোত্থেকে যেন একটা তেঁতুল টুপ করে তার গায়ে পড়ল। আদনান অবাক হয়ে নাচ থামাল। কান থেকে হেডফোন সরিয়ে হাতে তুলে নিল বস্তুটা। খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তার চক্ষু চড়কগাছ আরে, এ তো আস্ত একটা তেঁতুল! অথচ মির্জা বাড়ির এই ত্রিসীমানায় কোনো তেঁতুল গাছ নেই। বাড়ির মহিলারা বিশ্বাস করেন তেঁতুল গাছে ভূত থাকে, তাই ও গাছ কেউ ভুলেও লাগায় না।
আদনান একটা শুকনো ঢোক গিলল। সন্ধ্যার ঝাপসা আলোয় তার মনে হলো, কোনো পেত্নী বোধহয় কোথাও থেকে তেঁতুলটা নিয়ে এসে এখন এখানেই আস্তানা গেড়েছে। এই ভেবেই আদনানের হাঁটু দুটো থরথর করে কাঁপতে শুরু করল। ঠিক তখনই ওপরের ডাল থেকে একটা ভুতুড়ে আওয়াজ ভেসে এল
“হাউ মাউ কাউ, মানুষের গন্ধ পাউ!”
ভয়ে আদনানের শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। সে অতি কষ্টে মাথা তুলে ওপরের দিকে তাকাল। তাকাতেই তার আত্মা শুকিয়ে যাওয়ার জোগাড়! গাছের একটা ডালে ধবধবে সাদা পোশাক পরা কী যেন একটা জবুথবু হয়ে বসে আছে। আদনান দুই হাত জোড় করে কাঁপা কাঁপা গলায় বলে উঠল,
“দয়া করো পেত্নী আপা! খোদার কসম আমি তোমার কোনো ক্ষতি করতে আসিনি। আমাকে যেতে দাও!”
আদনানের অবস্থা দেখে ওপরের সেই মূর্তিটি ফিকফিক করে হাসতে লাগল। হাসি থামিয়ে সে ধীরে ধীরে ডাল বেয়ে নিচে নামতে শুরু করল। আদনানের তখন পালানোর শক্তিটুকুও নেই, সে ঠায় দাঁড়িয়ে কাঁপছে। সাদা পোশাক পরা সেই রহস্যময়ী যখন গাছ থেকে একেবারে মাটিতে নেমে এল, আদনান আর সহ্য করতে পারল না ভয়ে চোখ উল্টে ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল।
সাদা পোশাক পরা ‘পেত্নী’ আসলে ছিল নৌশি। আদনানকে ওভাবে ধপাস করে মাটিতে লুটিয়ে পড়তে দেখে নৌশি প্রথমে ঘাবড়ে গেল। সে দ্রুত মুখ থেকে সাদা কাপড়টা সরালো। আদনানের মতো সাহসী দাবি করা ছেলে এভাবে অজ্ঞান হয়ে গেছে দেখে সে প্রথমে একটু হাসল। কিন্তু পরক্ষণেই তার মনে হলো সত্যিই কি অজ্ঞান হয়ে গেল?
নৌশি দৌড়ে আদনানের কাছে গিয়ে তার মুখ নাড়াতে লাগল,
“কিরে আদু ভাই! সামান্য ভয় পেয়ে এভাবে অজ্ঞান হয়ে গেলি নাকি? ওঠ!”
কিন্তু আদনানের কোনো সাড়া নেই। নৌশি বারবার ডাকল, ধাক্কা দিল, কিন্তু আদনান যেন পাথরের মতো নিথর। এবার নৌশির মনে এক অজানা ভয় চেপে বসল। সে কাঁপতে কাঁপতে আদনানের নাকের কাছে হাত রাখল। নিঃশ্বাস পড়ছে না! নৌশি আঁতকে উঠল। তার দুচোখ বেয়ে হু হু করে জল নামল। সে কেঁদে উঠল,
“এই আদু, ওঠ না! কী হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন?”
নৌশি পাগলের মতো কান্নাকাটি শুরু করল। কাউকে ডাকার মতো শক্তিও সে পাচ্ছে না। সে চোখ বন্ধ করে আদনানের পুরো মুখ আঁকড়ে ধরে শব্দ করে কাঁদতে লাগল। ঠিক তখনই এক গম্ভীর আর চেনা কণ্ঠস্বর ভেসে এল,
“কিরে নাদানের বাচ্চা! কী হয়েছে শুনি?”
কণ্ঠস্বর শুনে নৌশি চটজলদি চোখ খুলল। দেখল আদনান এক চোখ খুলে মুখে এক বিটকেল বাঁকা হাসি ঝুলিয়ে রেখেছে! অর্থাৎ, এতক্ষণ যা হলো সবটাই ছিল আদনানের পালটা নাটক। নৌশির পুরো মুখ কান্নায় লাল হয়ে গেছে। আদনানকে বেঁচে থাকতে দেখে সে আবারও ফোঁপাতে ফোঁপাতে কেঁদে উঠল। আদনান উঠে বসে হাসতে হাসতে বলল,
“কিরে, এভাবে কাঁদছিস কেন? তুই ভয় দেখাতে পারিস, আর আমি একটু মজা করলেই যত দোষ?”
নৌশি যেন এবার হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলল। সে হুট করেই আদনানের বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আদনানের বুকে মাথা রেখে তার সে কী কান্না! নৌশিকে এভাবে ভেঙে পড়তে দেখে আদনান ভীষণ অবাক হলো। তার তামাশা করার মুডটা মুহূর্তে ম্লান হয়ে গেল। সে মায়ায় পড়ে নৌশির মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করতে করতে বলল,
“আচ্ছা বাবা সরি, একদম সরি। আর কখনো এমন মজা করব না, কেমন? থাম এবার।”
নৌশি কিছুক্ষণ একইভাবে ফুপিয়ে কাঁদছিল। হঠাৎ যখন তার হুশ ফিরল যে সে কার বুকে মাথা রেখে আছে, অমনি সে এক ঝটকায় আদনানকে ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দিল। নিজের ওড়নায় চোখ মুছতে মুছতে রাগে ফেটে পড়ল নৌশি,
“তুই আসলেই একটা পচা ছেলে! মৃত্যু নিয়ে কেউ এভাবে নাটক করে, বল?”
আদনান কাঁচুমাচু মুখে বলল,
“বললাম তো সরি। কিন্তু তুই যেভাবে কাঁদছিলি…” নৌশি চোখ বড় বড় করে তাকাতেই আদনান আবার টিপ্পনী কেটে বলল, “এমন ভাবে কাঁদছিলি যেন এইমাত্র একদম বিধবা হয়ে গেলি!”
কথাটা শোনামাত্র নৌশি রাগে অগ্নীশর্মা হয়ে আদনানের বুকে আরও একটা জোরে ধাক্কা মারল। তারপর গটগট করে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করল। আদনান এক হাতে মাটিতে ভর দিয়ে আধশোয়া অবস্থায় নৌশির চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে রইল আর তার মুখে লেগে রইল সেই মুচকি হাসি।
★★★
রাহি বেগম দেখলেন নৌশি হন্তদন্ত হয়ে বাড়ির ভেতর ঢুকছে। তাকে দেখেই তিনি প্রশ্ন করলেন,
“কোথায় গিয়েছিলি এতক্ষণ?”
নৌশি কিছুটা অপ্রস্তুত হয়ে উত্তর দিল,
“বাগানে গিয়েছিলাম।”
রাহি বেগম চিন্তিত মুখে বললেন,
“তোর ভাবি কোথায় রে? দুপুর থেকে তো মেয়েটাকে একবারও রুম থেকে বের হতে দেখলাম না।”
নৌশি পাল্টা প্রশ্ন করল, “কোন ভাবি? মিতু ভাবি?”
রাহি বেগম কিছুটা বিরক্ত হয়েই বললেন,
“হ্যাঁ। তুই তো তৃণাকে সব সময় ‘বউমনি’ বলে ডাকিস, তাই মিতুর কথাই বলছি। কোথায় সে?”
নৌশি মাথা নেড়ে জানাল,
“আমি ঠিক জানি না। দুপুরের আগে একবার দেখেছিলাম, তারপর আর দেখিনি।”
রাহি বেগম নিচের ড্রয়িংরুমের দিকে তাকিয়ে দেখলেন রোহান সবার সাথে খুব স্বাভাবিকভাবে বসে গল্প করছে। নিজের ছেলের এই উদাসীনতা দেখে তিনি এক দীর্ঘশ্বাস ফেললেন। সেখানে আর এক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে না থেকে তিনি দ্রুত সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠতে লাগলেন। মাঝপথে তৃণার সাথে দেখা হলে তিনি তাকেও একই প্রশ্ন করলেন,
“মিতুকে দেখেছো কোথাও?”
তৃণা অবাক হয়ে বলল, “না তো বড়মা!”
রাহি বেগমের অস্থিরতা আরও বেড়ে গেল। তিনি দ্রুত মিতুর রুমের দিকে পা বাড়ালেন। তৃণা কৌতূহলী হয়ে রাহি বেগমের পেছন পেছন গেল। ঘরের ভেতর ঢুকে রাহি বেগম চারদিকে চোখ বোলালেন। হঠাৎ ঘরের এক অন্ধকার কোণে নজর যেতেই তিনি থমকে দাঁড়ালেন। দেখলেন, মিতু দুই হাঁটু ভাঁজ করে সেখানে গুটিসুটি মেরে বসে আছে।
মিতু এতটাই জড়সড় হয়ে বসে আছে যে, তাকে দেখে মনে হচ্ছে কোনো এক ভয় পেয়ে আসা ছোট্ট শিশু। মিতুর এমন করুণ অবস্থা দেখে রাহি বেগম আঁতকে উঠলেন। তিনি কালক্ষেপণ না করে দ্রুত মিতুর সামনে মেঝেতে বসে পড়লেন এবং মিতুর কাঁধে হাত দিয়ে পরম মমতায় জিজ্ঞেস করলেন,
“মিতু মা! কী হয়েছে তোমার? এমন করে বসে আছো কেন?”
মিতু রাহি বেগমের কণ্ঠস্বর পেয়ে ধীরে ধীরে চোখ খুলল। তৃণা ততক্ষণে ঘরে ঢুকে রাহি বেগমের পেছনে এসে দাঁড়িয়েছে। মিতুর চোখ দুটো লাল হয়ে আছে, যা দেখে রাহি বেগম দ্বিতীয়বার আঁতকে উঠলেন। তিনি কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই মিতু অবোধ শিশুর মতো রাহি বেগমকে জড়িয়ে ধরে হু হু করে কেঁদে উঠল। রাহি বেগম তাকে বুকে টেনে নিয়ে শান্ত করার চেষ্টা করছেন, কিন্তু মিতুর কান্না যেন থামার নয়। তৃণা কিছুই বুঝতে পারছে না, তবে মিতুর এই বুকফাটা আর্তনাদ দেখে তার নিজের চোখও বারবার ভিজে উঠছে।
রাহি বেগম মিতুর মুখটা নিজের হাতের আঁজলায় তুলে পরম মমতায় জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে মা? আমায় খুলে বলো।”
মিতু ভাঙা এবং রুদ্ধ কণ্ঠে বলে উঠল, “মা, আমি খুনি! আমি আমার নিজের সন্তানের খুনি!”
রাহি বেগম মুহূর্তের মধ্যে মিতুর ঠোঁটে আঙুল চাপা দিয়ে তাকে থামিয়ে দিলেন। ব্যাকুল হয়ে বললেন,
“ছিঃ মা! এসব কী বলছ তুমি? আমরা সবাই জানি সেদিন কী হয়েছিল। তুমি নিজেকে কেন দোষারোপ করছ?”
মিতু এবার আরও হাহাকার করে উঠল,
“মা, আমি আমার সন্তানকে রক্ষা করতে পারিনি, সব দোষ আমার! আজ রোহান আমাকে বলল আমি নাকি তার রক্তকে ধ্বংস করেছি। ও মা, আপনিই বলুন না, আমি কি সত্যিই আমার সন্তানকে মেরেছি? আমি কি সত্যিই খুনি?” মিতুর কণ্ঠস্বর যন্ত্রণায় কাঁপছে।
রাহি বেগম বারবার তাকে চুপ করতে বললেও মিতু শান্ত হলো না। হঠাৎ তৃণা লক্ষ করল মিতু খুব জোরে জোরে এবং ঘন ঘন শ্বাস নিচ্ছে। তৃণা দ্রুত মিতুকে ধরতে গেল। তৃণার প্রশ্নবোধক দৃষ্টি দেখে রাহি বেগম বললেন,
“মিতুর শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে।”
তৃণা চমকে উঠে বলল, “বড় মা, দ্রুত মিতু ভাবির নেবুলাইজারটা নিয়ে আসুন!”
রাহি বেগম হন্তদন্ত হয়ে চারদিকে খুঁজলেন, কিন্তু হঠাৎ মনে পড়ল মিতু গতকালই বলেছিল ওষুধ শেষ হয়ে গেছে। তিনি বিফল হয়ে ফিরে আসতেই তৃণা চিৎকার করে উঠল, “প্লিজ সবাইকে ডাকুন! ভাবিকে এখনই হাসপাতালে নিয়ে যেতে হবে।”
তৃণা দেখল মিতুর পুরো শরীর কাঁপছে, প্রতিটি নিঃশ্বাস নিতে তাকে রীতিমতো যুদ্ধ করতে হচ্ছে। তৃণা মিতুকে নিজের বুকের সাথে জড়িয়ে ধরল,
“শান্ত হও ভাবি, কিচ্ছু হবে না তোমার।”
কিন্তু মিতু আচ্ছন্ন অবস্থায় বারবার শুধু একটা কথাই বলে যাচ্ছে, “আমি খুনি না… আমি আমার সন্তানের খুনি না…”
রাহি বেগম ওপর থেকে আর্তনাদ করে সবাইকে ডাকতে শুরু করলেন। সেই চিৎকার শুনে রোহান সবার আগে দৌড়ে ঘরে এল। ঘরে ঢুকেই মিতুর এই মুমূর্ষু অবস্থা দেখে সে থমকে গেল। এক মুহূর্তের জন্য রোহান অনুভব করল তার বুকের ভেতরটা যেন ভেঙে চুরমার হয়ে যাচ্ছে। সে সব রাগ-অভিমান ভুলে দৌড়ে গিয়ে মিতুকে দুই হাতে আগলে ধরল এবং আর্তকণ্ঠে ডাকল, “মিতু! কী হয়েছে তোমার? মিতু, তাকাও আমার দিকে!”
মিতুর ছটফটানি দেখে রোহানের ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছিল। মিতু অবশ হয়ে আসা হাতে রোহানের টি-শার্টটা খামচে ধরে শেষবারের মতো বুক ভরে দম নেওয়ার চেষ্টা করছিল। সাধারণত পুরুষরা সবার সামনে কাঁদে না, কিন্তু আজ রোহানের চোখের বাঁধ ভেঙে গিয়েছে। তার সেই কান্না উপস্থিত কারো চোখ এড়ালো না। এক মুহূর্ত দেরি না করে রোহান মিতুকে পাঁজাকোলে তুলে নিয়ে হাসপাতালের দিকে ছুটল। মিতুর চোখের দৃষ্টি ক্রমশ ঝাপসা হয়ে আসছিল, আর রোহান বারবার ওর কানে কানে বলছিল, “তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে তাই না? আর একটু ধৈর্য ধরো মিতু, আমরা পৌঁছে গেছি।”
অর্ধচেতন অবস্থায় মিতুর ঠোঁটজোড়া বারবার নড়ছিল। সে শুধু একটা কথাই বলতে চাইছিল, “আমি খু’নি না… আমি আমার সন্তানকে…” কিন্তু বাক্যটা পূর্ণ করার আগেই সে নিস্তেজ হয়ে পড়ল।
হাসপাতালে পৌঁছানোর কিছুক্ষণের মধ্যেই বাড়ির সবাই হাজির হলো। আরিয়ানও খবর পেয়ে ছুটে এসেছে। মিতুকে তড়িঘড়ি করে ইমার্জেন্সি রুমে নিয়ে যাওয়া হলো। রোহান বাইরে দরজার কাঁচের ওপাশে চাতক পাখির মতো চেয়ে আছে। ভেতরে মিতুর মুখে অক্সিজেন মাস্ক পরানো হয়েছে, তার শরীরটা সাদা চাদরের ওপর বড় অসহায় দেখাচ্ছে। রোহান ডুকরে কেঁদে উঠল। সে বারবার মহান আল্লাহর কাছে আরজি জানাচ্ছিল, “হে আল্লাহ, আমার মিতুকে তুমি কেড়ে নিও না।”
করিডোরের এক কোণে রাহি বেগম বসে ডুকরে কাঁদছিলেন। হঠাৎ তার মনে পড়ে গেল মিতুর সেই আর্তনাদ “মা, রোহান আমাকে খুনি বলেছে!”মুহূর্তের মধ্যে রাহি বেগমের শোক রাগে পরিণত হলো। তিনি হিতাহিত জ্ঞানশূন্য হয়ে উঠে দাঁড়ালেন এবং হনহনিয়ে গিয়ে রোহানের সামনে দাঁড়ালেন।
রোহান কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাহি বেগম তার গালে সজোরে ‘ঠাস ঠাস’ করে চড় বসিয়ে দিলেন। রোহান নড়ল না, প্রতিবাদও করল না,শুধু মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইল। রাহি বেগম চিৎকার করে উঠলেন,
“ছিঃ রোহান! তোকে আমার সন্তান বলতে লজ্জা লাগছে। তুই কীভাবে পারলি একটা মায়ের মাতৃত্বকে এভাবে অপমান করতে? যে মেয়েটা চার বছর ধরে নিজের ভেতরে একটা শোকের পাহাড় বয়ে বেড়াচ্ছে, তাকে তুই খুনি বললি?”
বলেই তিনি আবারও রোহানের গালে চড় বসালেন। তৃণা আর আরিয়ান দৌড়ে এসে রাহি বেগমকে জাপ্টে ধরল। আরিয়ান গম্ভীর গলায় বলল, “বড় মা, শান্ত হও। এটা হাসপাতাল।”
তৃণা রাহি বেগমকে সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করতে করতে মিতুর রুমের দিকে তাকাল।
ঠিক তখনই একজন নার্স ইমার্জেন্সি রুম থেকে বেরিয়ে এসে ভ্রু কুঁচকে বললেন, “প্লিজ! আপনারা শান্ত হোন। এখানে এভাবে চিৎকার-চেঁচামেচি করবেন না। ভেতরে পেশেন্টের অবস্থা আশঙ্কাজনক, আপনাদের এই শব্দে তার সমস্যা হতে পারে।”
নার্সের কথায় পুরো করিডোরে এক পিনপতন নীরবতা নেমে এল। রাহি বেগম কান্নায় ভেঙে পড়লেন আর রোহান দেয়ালের সাথে হেলান দিয়ে ধপ করে মেঝেতে বসে পড়ল।
আরিয়ান অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে রাহি বেগমকে সান্ত্বনা দিয়ে রোহানের পাশে গিয়ে বসল। রোহান তখন বিধ্বস্ত, তার দুই চোখ রক্তবর্ণ। আরিয়ানকে দেখা মাত্রই সে পাগলের মতো তার হাত চেপে ধরল। অবরুদ্ধ কণ্ঠে আর্জি জানাল, “আরিয়ান, বল না আমার মিতুর কিছু হবে না? ও সুস্থ হয়ে ফিরে আসবে তো?”
আরিয়ান দীর্ঘশ্বাস ফেলে রোহানের কাঁধে হাত রাখল। তাকে পাশের বেঞ্চে বসিয়ে শান্ত গলায় বলল,
“হ্যাঁ ভাইয়া, ও সুস্থ হয়ে যাবে। কিন্তু তুমি আজ যা করেছো, তার ব্যাখ্যা কী? তৃণা আমাকে সব বলেছে। তুমি কেন ভাবিকে খু’নি বললে, সেটা আমার মাথায় আসছে না। তুমি কি আসলেই জানো সেদিন কী হয়েছিল?”
রোহান প্রশ্নবোধক দৃষ্টিতে আরিয়ানের দিকে তাকাল। আরিয়ান বলতে শুরু করল, “তুমি ইংল্যান্ড যাওয়ার ঠিক এক মাস পরেই আমরা জানতে পারি মিতু ভাবি মা হতে চলেছে। তোমার সন্তান ভাবির গর্ভ এই সংবাদে পুরো বাড়ি উৎসবে মেতেছিল। তুমিও জানতে,সবচেয়ে খুশি তো তুমি হয়েছিলে।ভাবি সারাদিন তোমার সাথে কথা বলত আর অনাগত সন্তানের স্বপ্ন দেখত। কিন্তু ভাবির যখন পাঁচ মাস, তখন হুট করেই একদিন আজকের মতোই তীব্র শ্বাসকষ্ট শুরু হয়। অবস্থা এতটাই খারাপ হয়েছিল যে তাকে দ্রুত হাসপাতালে নিতে হয়েছিল। ডাক্তাররা আপ্রাণ চেষ্টা করেছিলেন, কিন্তু মিতু ভাবিকে বাঁচাতে গিয়ে তোমার সন্তানকে বাঁচানো সম্ভব হয়নি।”
রোহানের চোখের পলক পড়ছে না। সে পাথরের মতো স্থির হয়ে শুনছে। আরিয়ান আবার বলল, “বাড়ির সবাই তোমাকে তখনই জানাতে চেয়েছিল। কিন্তু মিতু ভাবি আমাদের হাত ধরে কসম দিয়েছিল। বলেছিল তুমি বিদেশে একা আছো, এই খবর শুনলে তুমি ভেঙে পড়বে, হয়তো নিজের কোনো ক্ষতি করে বসবে। কয়েকদিন পরেই তো তোমার বাড়ি ফেরার কথা ছিল, ভাবি চেয়েছিল তুমি সামনে এলে নিজের বুকে মাথা রেখে সে শোক ভাগ করে নেবে। সে তোমাকে আগলে রাখতে চেয়েছিল ভাইয়া!”
রোহান যেন আকাশ থেকে পড়ল। সে হন্তদন্ত হয়ে দাঁড়িয়ে চিৎকার করে উঠল, “এই কথাটা তোরা আগে কেন বলিসনি আমাকে? কেন আমাকে অন্ধকারে রাখলি?”
আরিয়ান শান্ত কিন্তু কঠিন স্বরে বলল,
“কীভাবে বলতাম ভাইয়া? ওই ঘটনার ঠিক দুদিন পর থেকেই তো তুমি ভোল পাল্টে ফেললে। কারো সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলে, মিতু ভাবির ফোন ধরা বন্ধ করলে। এমনকি ভাবির নাম নিলেও তুমি কল কেটে দিতে। দিনের পর দিন ভাবি ফোন করে কেঁদেছে, তুমি ধরোনি। আজ তুমি ভাবিকে প্রশ্ন করছ? উল্টো আমাদের বলো ইংল্যান্ডে এমন কী হয়েছিল যে তুমি হুট করে পাল্টে গেলে? কেন তুমি ভাবিকে ঘৃণার চোখে দেখতে শুরু করলে?”
তার কানে তখন মিতুর সেই শেষ কথাগুলো বাজছে ‘আমি খুনি না… আমি আমার সন্তানের খুনি না…’। সে বুঝতে পারল, দীর্ঘ চার বছর সে এক মস্ত বড় ভুল আর মিথ্যে অপবাদের বোঝা বয়ে বেরিয়েছে, যা আজ তার মিতুকে মৃত্যুর দুয়ারে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে।
রোহান আর কোনো কথা বলতে পারল না। তার পা দুটো যেন মাটির সাথে মিশে যেতে চাইছে। সে টলমল পায়ে আবারও ইমার্জেন্সি রুমের দরজার সামনে গিয়ে দাঁড়াল। ঠিক সেই মুহূর্তে ডাক্তার বেরিয়ে আসলেন। সবার উদ্বিগ্ন মুখের দিকে তাকিয়ে তিনি অভয় দিয়ে বললেন, “ভয়ের কিছু নেই, পেশেন্ট এখন বিপদমুক্ত। তবে উনাকে পূর্ণ বিশ্রামে রাখতে হবে। আগামীকালই আপনারা উনাকে বাড়ি নিয়ে যেতে পারবেন।”
সবাই স্বস্তির দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রোহান আর নিজেকে আটকে রাখতে পারল না, সে প্রায় ঝড়ের বেগেই রুমের ভেতরে ঢুকে পড়ল। একজন নার্স তাকে বাধা দিতে গেলে ডাক্তার ইশারায় থামিয়ে দিয়ে বললেন,
“যেতে দাও ওকে।”
রোহান অতি সাবধানে মিতুর বিছানার পাশে রাখা টুলটায় বসল। মিতুর মুখে তখনো অক্সিজেনের মাস্ক লাগানো, মুখটা একদম রক্তহীন ফ্যাকাসে হয়ে আছে। মিতুর এই বিধ্বস্ত রূপ দেখে রোহানের বুকের ভেতরটা আবার হাহাকার করে উঠল। সে অতি সন্তর্পণে মিতুর একটা হাত নিজের দুই হাতের মুঠোয় পুরে নিল। নিজের উষ্ণ ঠোঁট মিতুর হাতে ছুঁয়ে দিয়ে সে গুমরে কেঁদে উঠল।
কাঁপাকাঁপা কণ্ঠে রোহান বিড়বিড় করে বলতে লাগল, “মিতু… ও মিতু! শুনতে পাচ্ছো? আমার নীলাঞ্জনা! তোমাকে তো আমি এই নামেই ডাকতাম, তাই না? আমায় কি ক্ষমা করবে না? একবার চোখ খোলো প্লিজ। তোমার রোহান চিরকাল তোমারই ছিল মিতু, শুধু ভুল মানুষের বিষাক্ত কথায় আমার মনটা বিষিয়ে গিয়েছিল। আমি আজও তোমাকেই ভালোবাসি। আমায় ক্ষমা করো নীলাঞ্জনা!” সে মিতুর হাতে কপাল ঠেকিয়ে অঝোরে কাঁদতে লাগল।
অতীতের সেই কালো দিনগুলো চলচ্চিত্রের মতো তার চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগল। ভার্সিটিতে থাকাকালীন মিতুর সহপাঠী রিনা তাকে পাগলের মতো পছন্দ করত, কিন্তু রোহান তাকে কখনোই পাত্তা দেয়নি। তার মনে কেবল মিতুরই বসবাস ছিল। বিয়ের পর স্কলারশিপ পেয়ে ইংল্যান্ড যাওয়ার সময় রোহান মিতুকে ছেড়ে যেতে চায়নি, মিতুই জোর করে পাঠিয়েছিল তার স্বপ্নপূরণের জন্য। সেখানে যাওয়ার পর যখন মিতুর মা হওয়ার খবর পেল, রোহানের সে কী আনন্দ!
কিন্তু সেই সুখ ছিল ক্ষণস্থায়ী। একদিন হঠাৎ এক অচেনা নাম্বার থেকে হোয়াটসঅ্যাপে কল আসে। রিনা তাকে জানায়, মিতু নাকি অন্য সম্পর্কে জড়িয়ে নিজের গর্ভের সন্তান নষ্ট করে দিয়েছে। রোহান প্রথমে বিশ্বাস করেনি, কিন্তু যখন বাড়িতে কল করে রিনার কথার সত্যতা পেল যে মিতুর বাচ্চা নষ্ট হয়ে গেছে, তখন তার পুরো পৃথিবী উল্টেপাল্টে গেল। যে মিতুকে জীবনের চেয়ে ভালোবাসতো, তাকেই সে মনে মনে চরম ঘৃণা করতে শুরু করল। মানুষের মন যখন একবার ভেঙে যায়, তখন ধ্রুব সত্যকেও মরীচিকা মনে হয়। রোহান সেই বিষাক্ত মরীচিকার পেছনেই চারটা বছর অন্ধ হয়ে ছুটেছিল, যার চরম মূল্য আজ মিতু দিতে বসেছে।
★★★
বড়রা সবাই মিতুকে বিপদমুক্ত দেখে বাড়ি ফিরে গেছেন, কিন্তু রোহান এখনো মিতুর বিছানার পাশে পাথর হয়ে বসে আছে। আরিয়ান আর তৃণা হাসপাতালের করিডোরের একটা বেঞ্চে বসে রইল। এই অবস্থায় রোহানকে একা ফেলে যাওয়ার সাহস তাদের কারোরই হলো না।
রাত বাড়ছে, সেই সাথে বাড়ছে তৃণার চোখের ঘুম। তৃণা বারবার হাই তুলছে দেখে আরিয়ান নিচু স্বরে বলল,
“এত রাত জাগার অভ্যাস নেই তোমার। আমার উরুতে মাথা রেখে কিছুক্ষণ ঘুমিয়ে নাও।”
তৃণা আরিয়ানের দিকে একবার আড়চোখে তাকাল। তারপর মুখ ঘুরিয়ে বিড়বিড় করে বলল, ‘পুরুষ মানুষ তো, সব সময় শুধু ফায়দা লুটতে চায়!’
কথাটা তৃণা খুব আস্তে বললেও আরিয়ানের কানে পৌঁছাতে একদম দেরি হলো না। আরিয়ান ভ্রু কুঁচকে খেপে গিয়ে বলল, “কী বললে তুমি? আমি ফায়দা লুটতে চাইছি? তোমাকে একটু আরাম দিতে চাওয়াটা কি ফায়দা লোটা হলো?”
তৃণা সাথে সাথে জিভে কামড় দিয়ে তটস্থ হয়ে বলল, “না না, ওভাবে বলিনি। সরি!”
এরপর বেশ কিছুক্ষণ দুজনেই চুপচাপ বসে রইল। এক সময় ক্লান্ত তৃণা চেয়ারের পেছনে মাথা ঠেকিয়েই গভীর ঘুমে তলিয়ে গেল। আরিয়ান খেয়াল করল ঘুমের ঘোরে তৃণার মাথাটা বারবার ঝুলে পড়ছে। সে খুব সাবধানে, অতি মমতায় তৃণার মাথাটা নিজের বুকের সাথে মিশিয়ে নিল, যাতে ঘুমে তার কোনো কষ্ট না হয়। তৃণা যেন ঘুমের ঘোরেই এক পরম নিরাপদ আশ্রয় খুঁজে পেল,সে অবচেতন মনেই আরিয়ানের বুকে মুখ গুঁজে দিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে রইল।
আরিয়ান নিজের ফোনটা পাশে রেখে একদৃষ্টিতে তৃণার শান্ত মুখটার দিকে তাকিয়ে রইল। এই মুহূর্তে মেয়েটাকে একদম কোনো নিষ্পাপ শিশুর মতো লাগছে। কিছু এলোমেলো চুল তৃণার কপালে আর গালে এসে পড়েছে। আরিয়ান নিজের আঙুল দিয়ে খুব আলতো করে চুলগুলো সরিয়ে দিল। এবার তৃণার মুখটা চাঁদের আলোর মতো স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।
আরিয়ান অপলক তাকিয়ে থাকতে থাকতে হঠাৎই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ল। কোনো কিছু না ভেবেই সে অত্যন্ত কোমলভাবে তৃণার কপালে নিজের উষ্ণ ওষ্ঠের স্পর্শ দিল। সেই স্পর্শে তৃণা ঘুমের ঘোরেই একটু কেঁপে উঠল। সেই কাঁপন আরিয়ানের হৃদয়েও একটা জোরালো ঢেউ তুলল। আরিয়ান বিদ্যুৎবেগে নিজেকে সরিয়ে নিয়ে চোখ বন্ধ করে ফেলল। নিজের মনকে নিজেই প্রশ্ন করল এ কী করলে আরিয়ান? কেন করলে?
কিন্তু ভেতর থেকে কোনো পরিষ্কার উত্তর এল না। শুধু এক অদ্ভুত ভালো লাগার অনুভূতি তার সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ল। আরিয়ান আবারও তৃণার ঘুমন্ত মুখের দিকে তাকাল এবং তার অজান্তেই ঠোঁটের কোণে এক চিলতে মিষ্টি হাসি ফুটে উঠল।
চলবে…
(আমার কাছে আরিয়ান আর তৃণাই শুধু মেইন ক্যারেক্টার নই।আমার কাছে গল্পের সব জুটিই মেইন ক্যারেক্টার।)
Share On:
TAGS: নিলুফা নাজমিন নীলা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১৫
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৭
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৪
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২১
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ১০
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৩
-
রোদ্দুরের ছেঁড়া মানচিত্র পর্ব ২৫