ভালোবাসার_সমরাঙ্গন||৩০||
দেওয়ান মির্জার হঠাৎ হার্ট অ্যাটাকের খবর শুনে সৌম্য’র শশুর বাড়ীর মানুষ জন উদ্ভ্রান্তের ন্যয় হসপিটালে এসে উপস্থিত হলো।সৌম্য নিজেও ছুটে এলো ঢাকা থেকে।শায়লা আর মৌনতা সমানে কেঁদে চলেছে।আজকে তাদের জন্যই দেওয়ান মির্জার এই হাল।আদনান মির্জা আর রেহনুমার সামনে মুখ দেখাতে পারছে না শায়লা।এদিকে রণ মৌন দুজন দুজনকে ভালোবাসে সেই ঘোর থেকেই বেরুতে পারছে না রেহনুমা।সকালের ঘটনা খানা তার কাছে একটা অদ্ভুত স্বপ্ন মনে হচ্ছে।রণ সৌম্য দৌড়ে চলেছে বিভিন্ন টেস্টের কাগজ নিয়ে।হসপিটালের বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে চুপিসারে কাঁদছেন সাদনান মির্জা।তিনি বিশাল এক গোলকধাঁধায় ফেঁসে গিয়েছেন।একমাত্র মৃত্যুও যদি এটার সমাধান হতো তবে তিনি নিজের প্রাণ কোরবানি দিতেন।কিন্তু এই ভয়ানক গোলকধাঁধার সঙ্গে মির্জা বাড়ির প্রত্যেকটি প্রাণ জড়িয়ে আছে।সাদনান মির্জা সকলের প্রাণ বাঁচানোর জন্য নিজের মেয়েকে কোরবানি করতেই প্রস্তুত হয়েছেন।কিন্তু ভেতরের খবর কেউ জানেনা বিধাতা ছাড়া।হৃদয় হীন পাষন্ড এক অন্ধকার জগতের হিংস্র মানব সাজানো গোছানো সব কিছু ধ্বংস করে দেবার জন্য উদগ্রীব হয়ে উঠেছে।অবশ্যই এতে সাদনান মির্জার অপরাধ রয়েছে।সেই বিশাল অপরাধ হচ্ছে মানুষটার অন্ধকার জগতের পাপ স্বচক্ষে দেখে ফেলেছেন তিনি।সাদনান মির্জার ভাবনার মাঝেই শো শো শব্দে হসপিটালের মাঠে প্রবেশ করলো কালো রঙের এক খানা গাড়ি।গাড়িটা দেখে ভয়ে জড়সড় হয়ে একটা গাছের আড়ালে দাঁড়ালেন সাদনান মির্জা।কয়েক সেকেন্ড পরই গাড়ি থেকে নামলো অতীব ফর্সা,আকর্ষণীয় গম্ভীর এক যুবক।তাকে দেখে সাদনান মির্জার বুক কেঁপে উঠলো।পালাতে চাইলেন সাদনান মির্জা।কিন্তু পা জোড়া সাথ দিলো না।মুখে কপটতার হাসি ঝুলিয়ে লম্বা পা ফেলে প্যান্টের দু পকেটে হাত গুঁজে ধেয়ে এলো যুবক।দাঁড়ালো সাদনান মির্জার সম্মুখ বরাবর।সাদনান মির্জার পা থেকে মাথা পর্যন্ত ক্যাপচার করলো সে।সাদনান মির্জার হাত ফুলে মোটা হয়ে আছে।বাপের দুশ্চিন্তায় নিজের হাতের ব্যথা ভুলের গেছে বোধ হয়।ইমারজেন্সি প্লাস্টার করা প্রয়োজন।হাতটা উল্টো দিকে ঘুরে আছে।সাদনান মির্জার এহেন শোচনীয় অবস্থায় যুবক মুখে সহানুভূতির “চু”জাতীয় শব্দ তুললো।অতঃপর প্রশস্ত হেসে বলে উঠলো
“আজকালকার জামানা কি হতে কি হয়ে যাচ্ছে হু?ভাতিজা কি পারে চাচার গায়ে এভাবে হাত তুলতে?পারিবারিক শিক্ষাদীক্ষার অভাব হলে যা হয় আরকি।
বলেই নিজের সহযোগীকে আদেশ দিলো
“যাও সিকান্দার যাও, শশুর মশাইয়ের হাতটা ঠিক করে আনো।মেয়ের জামাই হয়ে শশুরের এতো দুঃখ কষ্ট আমি যে সইতে পারছি না।
বলেই ঠোঁট টিপে হেসে ভেতরে ঢুকলো।যাবার আগে চোখের কালো চশমা খুলে নিজের ক্রুর চোখ জোড়া সাদনান মির্জাকে দেখাতে ভুললো না।যুবকের আভিজাত্য ভয়ানক চলনে অসহায়ের ন্যয় তাকিয়ে রইলো সাদনান মির্জা।নীরবে সব কিছু মুখ বুজে সয়ে নেয়া ছাড়া তার কাছে দ্বিতীয় কোনো পথ খোলা নেই।
কিছুক্ষণ আগেই জ্ঞান ফিরেছে দেওয়ান মির্জার।তেমন আশঙ্কাজনক কিছুই ঘটেনি।জোরে চিৎকার দেবার কারনে প্রেসার হাই হয়ে ছোট স্ট্রোক এসেছে।যেহেতু দেওয়ান মির্জা হার্টের পেশেন্ট তাই শরীর এতো রক্তচাপ নিতে পারেনি।বিধাতা এবারের মতো তাকে অল্পতেই বাঁচিয়ে নিয়েছেন।কিন্তু ভবিষ্যতে এমন হলে লাইফ রিস্ক হয়ে যাবে।
দেওয়ান মির্জাকে ভালো করে পরখ করে ডিউটি ডক্টর সৌম্য আর রণকে সব কিছু বুঝিয়ে প্রস্থান নিলো।এমন সময় ভেতরে প্রবেশ করলো নোমান শাহরিয়ার।নোমানকে দেখে রণ আজ কোনো প্রতিক্রিয়া দেখালো না।সৌম্য সৌজন্য হাসি বিনিময় করে টুকটাক এটা সেটা জিজ্ঞেস করলো।নোমান নিখুঁত জবাব দিয়ে দেওয়ান মির্জার বিছানার পাশের চেয়ারে বসলো এরপর দেওয়ান মির্জার হাত নিজের করপুটে বন্দি করে নমনীয় গলায় বলল
“এখন কেমন লাগছে দাদু?
নোমানের কথা বার্তা,মুখের হাসি,আর ব্যাক্তিত্ব সব সময়ই দেওয়ান মির্জাকে প্রসন্ন করে।আজও তার ব্যাতিক্রম হলো না।দেওয়ান মির্জা মাথা ঝাকিয়ে অল্প হেসে বললো
“এখন ভালো লাগছে।ভালোই ভালোই বাড়ি যেতে পারলেই বেঁচে যাই।
“এতো তাড়াতাড়ি তো বাড়ি যেতে দেবো না দাদু ভাই….
নাটকীয় গলায় কথাটি বললো নোমান।সেই কথার স্বরে আদনান মির্জা চোখ ঘুরিয়ে তাকালেন নোমানের প্রতি।ঘটনা পাল্টে দিতে নোমান তড়িঘড়ি করে বলে উঠলো
“এসব উপজেলা হসপিটালের কোনো ভরসা নেই।আমার মতে দাদুকে শহরের একটা বড় হসপিটালে নেওয়া উচিত।অনেক সময় যান্ত্রিক ত্রুটিতে ভুল রিপোর্ট আসে।
বলেই সকলের পানে সুন্দর স্বাভাবিক দৃষ্টি মেললো নোমান।এমন সময় মৌনতার উপর নজর পড়লো তার।মেয়েটা কেঁদে কেটে লাল টমেটো হয়ে গেছে।নাকের ডগা টকটকে লাল।চোখ দুটো ফোলা ফোলা।এলোমেলো চুলের গোলগাল মুখটা দেখতে বেশ লাগছে।ইচ্ছে করছে জাপ্টে ধরে আদর দিতে।নোমান দৃষ্টি সরাতে চাইলো।মনে নিষিদ্ধ বাসনা জাগ্রত হচ্ছে।কিন্তু মৌনতার সৌন্দর্য নোমানকে আকৃষ্ট করলো প্রবল ভাবে।ব্যর্থ হলো নোমান।সব কিছু অগ্রাহ্য করে মৌনতার পানেই ঠাঁয় তাকিয়ে রইলো।
এমন সময় ভেতরে প্রবেশ করলো রণ।হাতে পরীক্ষিত রিপোর্ট আর হসপিটাল থেকে রিলিজের কাগজপত্র।ভেতরে ঢুকেই নোমানের লোভাতুর দৃষ্টি রণ’র নজরে লাগলো।নোমান কে অনুসরণ করে সেদিকে তাকাতেই নির্জীব মৌনতা কে নজরে পড়লো।পাশের সোফায় পা গুটিয়ে বসে এক মনে কেঁদে চলেছে মেয়েটা।রণ ‘র ক্রোধ বাড়লো তরতর করে।স্বীয় স্ত্রীর পানে পরপুরুষের এহেন কামনার নজর কোন সুপুরুষ সইবে?রণ ধমকে উঠলো উঁচু আওয়াজে
“বসে বসে কাঁদছিস কোন শোকে?দাদা ভাই কি মরেছে?নাকি তোর জামাই মরেছে?
রণ’র ধমকে কেঁপে উঠলো মৌনতা।সে ধরফরিয়ে বসা থেকে উঠে দাঁড়ালো।অতঃপর মাথা নত করে শায়লার পিছনে গিয়ে দাঁড়ালো।নোমানের কানে যেন রণ’র সেই গর্জন মুরগির পালকের ডগা দিয়ে সুড়সুড়ি দেবার মত লাগলো।সে তবুও বেহায়া তাকিয়েই রইলো।রণ নোমান কে আরেকপলক দেখে কাজের ছেলে আক্কাস কে বলে উঠলো
“ওকে বাড়ি নিয়ে যা আক্কাস।আমাদের ফিরতে সন্ধ্যা হবে।সারাদিন মরা কান্না কেঁদে চলেছে।পানি টুকু মুখে তুলছে না পর্যন্ত।ও এখানে থেকে আরো ঝামেলা পাকাচ্ছে।আমার মেজাজ চটে যাচ্ছে মুহূর্তে মুহূর্তে।কখন যেন গলা টিপে মেরে ফেলি নিজেও জানিনা।
মৌনতা ফ্যাসফ্যাসে গলায় বলল
“দাদু ভাইকে সাথে না নিয়ে আমি ফিরবো না।মরে গেলেও না।তোমার ইচ্ছে হলে আমার গলা টিপে ধরতে পারো।
মৌনতার কথায় রণ’র মস্তিষ্ক দাউদাউ করে জ্বলে উঠলো।স্বামীর মুখে মুখে তর্ক?এতো বড় স্পর্ধা হয়েছে এই মেয়ের?বিয়ের রাত পাড় না হতেই?বেক্কল মেয়েটা কি জানে তার আকস্মিক এই রাগের হেতু?নিকৃষ্ট দুটো দৃষ্টি যে তাকে গিলে গিলে খাচ্ছে তার খেয়াল রেখেছে এই মেয়ে?
রণ’র চোখে রক্ত জমলো ।সে তেড়ে গিয়ে মৌনতার গালে সপাটে এক চড় মেরে বসলো।ফর্সা গালে তাৎক্ষণিক দাগ পড়লো।কেঁপে উঠলো মৌনতা ।সেই সঙ্গে বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেলো নোমান।মুঠি বদ্ধ হলো তার শক্ত হাত।ফর্সা সাদা চেহারা মুহূর্তেই টকটকে লাল হলো।চোয়ালে চোয়াল চেপে গেলো, চোখে জ্বললো আগুন।ইচ্ছে হলো বুলেটের এক আঘাতে রণ’র বুক এফোড় ওফোড় করতে।নোমান ভুলে গেলো এটা হসপিটাল আর মির্জা বাড়ির ব্যাক্তিগত বিষয়।সে গলা উঁচিয়ে বললো
“হাউ ডেয়ার ইউ?
“শায়লা রণ’র অগ্নি মূর্তি চেহারা অনুসরণ করে সামনে তাকালো।সেই সাথে ভেসে এলো নোমানের তেজী গলা।চতুর শায়লা সব অনুমান করে শক্ত গলায় বললেন
“আমার সঙ্গে বাড়ি চল মৌন।আব্বা যথেষ্ট সুস্থ।সৌম্য আর রণ পারবে উনাকে বাড়ি নিয়ে যেতে।
বলেই মৌনতার হাত চেপে ধরে হনহন করে হাঁটা ধরলেন।
নোমান শাহরিয়ার পিছু পিছু তেড়ে গেলো।কিন্তু ততক্ষণে শায়লা করিডোর পেরিয়ে লিফট ধরেছেন।রণ পেছন থেকে নোমানের পেছনে দাঁড়িয়ে ভারী গলায় বলে উঠলো
“পাখি আর পাখি নেই নোমান শাহরিয়ার।পাখি এখন আমার বিয়ে করা বউ।খুব শীঘ্রই অফিসিয়াল এনাউন্সমেন্ট পাবেন।দাওয়াত মিস করবেন না কিন্তু!এমন শাহী খানা সব বিয়েতে জুটে না জানেন তো?
চলবে
(পর্ব টা ছোট করে দেবার জন্য দুঃখিত।মুগ্ধ কে স্কুলে ভর্তি করানো নিয়ে এই কদিন খুব ব্যস্ত ছিলাম।কাল থেকে নিয়মিত গল্প পাবেন আশাকরি)
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৬
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৮
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩২