ভালোবাসার_সমরাঙ্গন ||১৭||
সারিকা_হোসাইন
বিছানার উপর পা ঝুলিয়ে বসে আছে কোয়েল।পায়ে মোটা করে ব্যান্ডেজ বাধা।পা ফুলে টকটকে লাল হয়ে আছে।সেই সাথে গায়ে প্রচন্ড জ্বর।ডক্টর তাকে অলরেডি একটা ইনজেকশন দিয়েছে।আবার দুদিন পর আরেকটা।চৌদ্দ দিনে মোট পাঁচটি ইনজেকশন তাকে দিতে হবে।রুলি মেয়ের পাশে বসে রয়েছেন মুখ ভার করে।চোখে মুখে চিন্তার ছাপ স্পষ্ট।যদি কুকুরটা পাগল হয়?যদি জলাতংক রোগে মেয়েটি অদ্ভুত কুকুরের ন্যয় আচরণ করে তবে?
রেহনুমা প্লেটে একটু পোলাও মাংস এনে রুলির হাতে দিয়ে বলে উঠলো
“সৌম্য’র শ্বশুরবাড়ি থেকে খাবার পাঠিয়েছে।কোয়েলকে খাইয়ে দে রুলি।
রুলি চোখ মুখ কুঁচকে বলে উঠলো
“এমন কুকুর বাড়িতে পালা কি খুব জরুরি বড় আপা?এটা কি পাহারাদার নাকি মানুষ খুনের জন্তু?
রেহনুমা অনুতপ্ত মিশ্রিত গলায় বলল
“দুর্ঘটনা বশত হয়ে গেছে।কালু সচরাচর এমনটা করে না।কোয়েলকে কেনো আকস্মিক কামড়ালো সেটাই তো বুজতে পারছি না।
“নিশ্চিত কেউ উস্কে দিয়েছে।আমার তো মনে হয় মৌনতা করেছে এই কাজ।
তেজী গলায় বলল কোয়েল।রেহনুমা কপালে বিরক্ত ভাঁজ ফেলে বললো
“মৌনতা নিজেই কালুর থেকে দূরে পালিয়ে বেড়ায় কোয়েল।মৌনতা কে কালুকে উস্কে দেবে?তোর সাথে ওর ব্যাক্তিগত কোনো শত্রুতা আছে?
এবার থতমত খেলো কোয়েল।মেয়ের গ্যাড়াকলে পড়া অবস্থা দেখে রুলি ফস করে বলে উঠলো―
“এক কাজ করো আপা, কুকুরটাকে বিষ খাইয়ে মেরে ফেলো।যদি কোয়েলকে আবার কামড়ায় তখন?
বোনের মুখে এমন হিংস্র কথা শুনে আঁতকে উঠলেন রেহনুমা।তিনি উত্তেজিত ভঙ্গিমায় বললেন
“এসব কি বলছিস রুলি?মাহির সেই ছোট বয়স থেকে ওকে পালছে।কালুর প্রতি আমাদের সকলের গভীর ভালোবাসা।এই কথা আব্বা জানলেও রাগ করবে।যা হয়েছে তা নিছকই এক দুর্ঘটনা।
বলেই রেহনুমা চলে গেলেন।কিন্তু শান্ত থাকতে পারলো না রুলি।সে মনে মনে সিদ্ধান্ত নিলো ―
“যে কদিন এই বাড়িতে আছি সে কদিনে কালুর জীবন নরক বানিয়ে ছেড়ে দেব আমি।যতক্ষন কালুর মরা মুখ না দেখছি ততক্ষণ মনে শান্তি নেই।
নিজ ঘরে ঢুকে পোশাক পাল্টে বিছানায় আরাম করে শুলো মৌনতা।আজ ভোরে রণ চলে যাবে।ভাবতেই মনে দুঃখের মেঘ ভাসছে।দু চোখ জলে ভরে উঠছে।বুকে সূক্ষ চিনচিনে ব্যাথা।সটান শুয়ে বুকের উপর হাত ভাঁজ করে শুয়ে দেয়াল ঘড়িতে নজর বুলালো মৌনতা।ঘড়িতে রাত প্রায় একটার কাছাকাছি।বাড়ির সকলেই ঘুমিয়ে পড়েছে আরো অনেক আগেই।বিয়ে বাড়ি থেকেই রণ কোথায় যেনো হারিয়ে গিয়েছে।এখনো ফিরেনি।মৌনতা র মন খারাপ হলো রণ’র অভাবে।যদি মানুষটা তাকে না বলেই চলে যায় তখন?
প্রথম বারের মত মৌনতা অনুভব করলো তার একটা ফোন থাকা জরুরি।আজকে একটা ফোন থাকলে রণ’র খোঁজ নিতে পারতো অনায়াসেই।
মনের চাঞ্চল্যে শোয়া থেকে উঠে বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো মৌন।এরপর দৃষ্টি মেললো ওপাশের মুখোমুখি বেলকনিতে।রণ’র কক্ষ এখনো অন্ধ্যকার।তার মানে মানুষটা এখনো ফিরেনি।ঠোঁট কামড়ে রঙ হীন মুখে মৌনতা মনে মনে ভেবে উঠলো
“রণ ভাই গেলো কোথায়?জরুরি কল পেয়ে ওবাড়ি থেকেই চলে যায়নি তো আবার?না না এ হতেই পারে না।আমাকে না বলে কক্ষনোই যেতে পারে না রণ ভাই।
এমন সময় হুট করে রণ’র কক্ষের বাতি জ্বলে উঠলো।মৌনতার আধার মুখে আলো ফুটলো তাৎক্ষণিক।শুকিয়ে উঠা ঠোটেও ফুটলো প্রশস্ত হাসি।রণ’র কক্ষের বেলকনি খোলা।কক্ষের ফকফকে আলোয় রণ’র অবয়ব স্পষ্ট।গায়ের কালো শার্ট এক টানে খুলে ঝুড়িতে রাখলো রণ।মুহূর্তেই স্পষ্ট দৃশ্য মান হলো শ্যাম গড়নের পোক্ত লম্বা শরীর।জিম করা শক্ত শরীরের পেশী গুলো মৌনতার চোখ ধাঁধিয়ে দিলো।নির্লজ্জের মতো পলকহীন রণকে গিলে খেতে লাগলো মৌনতা।বাইরে প্রচন্ড গরম।থেকে থেকে ফুরফুরে হাওয়া বইছে।সেই হাওয়ায় ভেসে আসছে রণ’র শরীরের নেশালো গন্ধ।
রণ যখন প্যান্ট খুললো তখন লজ্জায় দুচোখ ঢেকে ফেললো মৌনতা।এরপর দৌড়ে ঘরে এসে বালিশে মুখ গুজে হেসে উঠলো।লজ্জায় তার মরে যেতে ইচ্ছে করছে।যেই মানুষটাকে দেখে কদিন আগেও ভয়ে সারা শরীর কাঁপত, যেই মানুষটার ভয়ে ঘর ছেড়ে বের হওয়া দুষ্কর ছিলো সেই মানুষটা আজ মৌনতার প্রাণেশ্বর।শুধুই কি তাই?মানুষটার পাশে থাকলে অদ্ভুত এক প্রশান্তি হৃদয়ে দোলা দেয়।মন বলে পৃথিবীর সবচাইতে নিরাপদ আর শান্তির জায়গা রণ ভাই।
মৌনতা নিজেকে সামলে পুনরায় বেলকনিতে গিয়ে দাঁড়ালো।বেলকনিতে দাড়াতেই দেখতে পেলো বারান্দায় দাঁড়িয়ে সিগারেট ফুকছে রণ।তার চোখ আসমানে নিবদ্ধ।যেনো বিশাল চিন্তার সাগরে ডুবে আছে সে।কিন্তু কিসের এতো চিন্তা?
ভাবনার সমাপ্তি করে সিগারেট ছুড়ে ফেললো রণ।এরপর মৌনতার বেলকনিতে তাকিয়ে বলে উঠলো
“আমার পোশাক পাল্টানো দেখে বড্ড খুশি হচ্ছিলি তাই না?কিছু দেখতে পেলি?
মৌনতা লজ্জায় আড়ষ্ট হয়ে মাথা নাড়লো।তাতে দুস্টু হেসে রণ বললো
“তোর মত আমার আকর্ষণীয় কিচ্ছু নেই।সব সমতল ভূমি।
মৌনতা ঠোঁট টিপে লজ্জানত মুখে শুধালো
“কোথায় গেছিলে ওবাড়ি থেকে?
“মিস করেছিস আমায়?
মৌনতা মাথা ঝাঁকালো।রণ লাফিয়ে বেলকনি থেকে নামলো এরপর বিলডিং এর বাড়তি অংশে পা দিয়ে ধীরে ধীরে মৌনতার বেলকনীর সামনে দাঁড়ালো।মৌনতা হাত বাড়িয়ে রণ’র হাত টেনে ধরলো।মৌনতার হাত ধরে উঠে এলো রণ।এরপর বললো
“চল আজ সারা রাত গল্প করবো।
মৌনতা ঠোঁট এলিয়ে হেসে বলে উঠলো
“তবে ছাদে চলো।
“তোর ঘরে কি সমস্যা?
মৌনতা উত্তর করবার আগেই শীৎকার মিশ্রিত গোঙানি কান্নার আওয়াজ ভেসে এলো।রণ জিভ কেটে তাৎক্ষণিক দুই হাতে মৌনতার কান চেপে বলে উঠলো
“আস্তাগফিরুল্লাহ! মৌন সোনা কিচ্ছু শুনিস নি তাই না?চল চল ভেতরে চল।ছোট মানুষের এসব শুনতে নেই।
বলেই মৌনতার কান চেপে ধাক্কা দিয়ে কক্ষের ভেতর ঢুকিয়ে বেলকনীর দরজা আটকে দিলো রণ।মৌনতা ইতস্তত করে বলে উঠলো
“ওটা ভাবীর গলা তাই না?এতো রাতে উনি কাঁদছে কেনো?
মৌনতার কথায় হো হো করে হাসতে ইচ্ছে হলো রণ’র ।কিন্তু হাসলো না।কোনো ভাবে হাসির শব্দ বাইরে গেলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।মৌনতার উপর আরোপ লাগবে।তাই নিজেকে সামলে রণ শুধালো
“তুইও এভাবে কাঁদতে চাস?
“আমি কাঁদবো কোন দুঃখে?
“তোকে কে বলেছে এটা দুঃখের কান্না?
“কান্না আবার সুখের হয় নাকি?হাসতে হাসতে কেউ কাঁদে?
মাথা ঝাকিয়ে রণ জবাব দিলো
“কাঁদে।
“কে কাঁদে?
“ঐযে অনু কাঁদছে।
মৌনতার হেঁয়ালি ভালো লাগলো না।সে প্রসঙ্গ পাল্টে বললো
“তুমি চলে গেলে আমার অনেক কষ্ট হবে রণ ভাই।তুমি ওখানে গিয়ে কোনো লেডি অফিসার এর সাথে কথা বলবে না কেমন?
“কথা বললে কি হবে?
“আমার কষ্ট হবে।
“আমি কথা বললে তুই জানবি?
“সদিচ্ছায় আমায় কষ্ট দেবে?
মৌনতার বিনুনি টেনে নিয়ে রণ হাতে পেঁচিয়ে বলে উঠলো
“তোকে কষ্ট দিলে আমি নিজেই মরে যাবো রে জান।
রণ’র ঘোর লাগা স্বরে মৌনতা গলে গেল।সে লাজুক লতার ন্যায় ঢলে পড়তে চাইলো।মৌনকে আরেকটু লজ্জা দিতে রণ বললো
“একবার ডাকতো!
“কি ডাকবো?
“জান।
লজ্জায় মৌনতার কান আর গাল লাল হয়ে উঠলো সেই সাথে গরম ধোয়া বেরুলো ।মৌনতা দুই গাল চেপে বলে উঠলো
“আমার শরম করে।আমি বলবো না।
“তাইলে জামাই বল।
“তুমি কি আমার জামাই?
“নয়তো কি?
“তুমি তো আমার প্রেমিক।
“তাইলে জান বল।প্রেমিক কে খুশি কর।দুনিয়ার কোনো বিষয়েই তো তোর জ্ঞান নেই।কোয়েল হলে এতক্ষন আমায় জান,প্রাণ সোনা,মানিক বলে চুমু দিয়ে ভরিয়ে ফেলতো।সেই সাথে আরো কত কি দিতো কে জানে?তোর সাথে প্রেম করে বড্ড লস আমার।শিখিয়েও তোকে লাইনে আনা যাচ্ছে না।ঘটে জ্ঞান বুদ্ধি কিচ্ছু নেই।যেমন পড়াশোনায় গাধা তেমনি প্রেম ভালোবাসাতেও আতেল।
মৌনতার ইগোতে লাগলো এই কথা।সে চোখে মুখে রণমূর্তি ফুটিয়েড বললো
“এই যে বললাম।
“কি বললি?
ইতস্তত করে মৌনতা মিনমিন করলো
“জান।
কান চুলকে রণ ভ্রু কুঁচকে বললো
“শুনতে পাইনি।কি বললি?
রণ’র কলার ধরে মাথা টেনে কানের কাছে মুখ নিয়ে জোড় গলায় মৌনতা বললো
“জান বলেছি জান।এবার শুনেছ?
রণ হা হা করে হেসে বলে উঠলো
রূহ পর্যন্ত পৌঁছে গেছেরে কলিজা।এবার শান্তি পাচ্ছি।এবার টুপ করে একবার চুমু খা দেখি?
“এসব করতে এতো রাতে আমার ঘরে এসেছো?
“এসব না বলে কাঁদালে খুশি হবি?
“কাঁদলে কেউ খুশি হয়?
“হয়।
“কিভাবে?
“যেভাবে বড় ভাই ভাবীকে খুশি করছে সেভাবে।
মৌনতা রণ’র বুকে কিল মেরে শুধালো
“এই তোমার গল্পের নমুনা?এসব পঁচা কথা বলে রাত পার করবে তুমি?
রণ এবার সিরিয়াস হলো।সে বললো
“কমান্ডো আর্মিদের গল্প শুনবি?
মৌনতা তাৎক্ষণিক মাথা ঝাকিয়ে রাজি হলো।রণ মৌনতার চুলে হাত বুলিয়ে বললো
“তোর চুল রুক্ষ হয়ে গেছে।তেল নিয়ে আয়।মাথায় বিলি কেটে দিতে দিতে গল্প বলি।
মৌনতা তেলের বোতল এনে রণ’র হাতে দিয়ে বিছানার নিচ থেকে টুল বের করে তাতে বসলো।রণ বসলো বিছানার উপর।এরপর মৌনতার জট পাকানো চুলের বিনুনি সযত্নে খুলে তাতে অল্প অল্প তেল মাখালো।আর বলতে লাগলো গল্প―
“আমাদের লাইফ নরমাল আর্মিদের মতো নয়।
“তবে কেমন রণ ভাই?
বিস্ময়ে জানতে চাইলো মৌনতা।
“কিছুটা পেঁচার মতো।
মৌনতার হাসি পেলো।
“আর্মি আবার পেঁচা হয় নাকি?
“হয়।
“কিভাবে?
“এবার আমি কোথায় যাবো জানিস?
“কোথায়?
“রাঙামাটি।
“তারপর?
“তারপর আমি পাহাড়ে জঙ্গলে,ঝর্ণায় নদীতে ঘুরে বেড়াব দিন রাত।ওখানে আমার যুদ্ধ হবে বিষাক্ত সাপ,পোকা মাকড়ের সাথে,দুর্গম পথের সাথে,ক্ষুধার্ত নিজের সাথে,সব শেষে মানুষের সাথে।একটা মিশন শেষ হতে পাঁচ,ছয় মাস সময় লাগে।মাঝে মাঝে আরো কম লাগে।মাঝে মাঝে আবার বেশীও লাগে।আমি ধরা পড়লে নিশ্চিত মারা যাব যদি সঠিক সময়ে আমার টিমকে কোনো খবর পৌঁছাতে না পারি।আমি রাতে ঘুমাতে পারি না।খুব কম খাবার খেয়ে ওই সীমান্ত অরণ্যে বেঁচে থাকতে হবে আমাকে।যখন তোরা পেট ভরে মাছ মাংস খেয়ে শান্তিতে ঘুমাবি তখন আমি
খাবো শুকনো মুড়ি খেজুর কিংবা প্রি কুকড রেশন ফুড।তাও পরিমানে খুব কম।পেট ভরে খাবার খাওয়া যায়না ওখানে।
“তুমি রান্না করে খেতে পারো না?
কিছুটা ব্যাথিত হয়ে শুধালো মৌনতা।রণ বললো
“নাহ।ধোয়া উঠতে দেখলে শত্রুপক্ষ আমার অবস্থান জেনে ফেলবে।তাছাড়া খাবারের গন্ধে ও আমার উপস্থিতি প্রকাশিত হবে।
“তাহলে যখন খুব খিদে পায় তখন কি করো?
“চুইংগাম খাই।
“মজা করছো
“তোর মনে হচ্ছে আমি এখন মজার মোডে আছি?আমার দুঃখ তোর কাছে মজা মনে হচ্ছে?
মৌনতা তাৎক্ষণিক মাথা নেড়ে বলে উঠলো
“আমি কষ্ট পাচ্ছি রণ ভাই।কিন্তু একটা কথা।
“তোর আবার কি কথা?
“এসব খেয়ে এমন শক্ত পোক্ত কি করে আছো তুমি?তোমার মাথা ঘুরে না ?
“সরকার আমাকে হাই প্রোটিনের খাবার দেয়,এনার্জি ড্রিংক দেয়,আরো অনেক পুষ্টিগুণ সমৃদ্ধ খাবার দেয়।মাঝে মাঝে জঙ্গলের ঘাস লতা পাতাও খাই।ওসব খেয়ে সুস্থ আছি আমি।কিন্তু তুই মরে যাবি।
মৌনতা ব্যাথিত শ্বাস ছেড়ে বললো
“এই চাকরি ছেড়ে দাও রণ ভাই।তোমার কথা শুনে আমার বুক ভেঙে কান্না পাচ্ছে।এবার তুমি চলে গেলে আমি ভাত খেতে পারবো না।
মৌনতার মাথায় তেল দেয়া শেষ করে রণ সটান শুয়ে গেলো মৌনতার নরম বিছানায় এরপর আড়মোড়া ভেঙে বললো
“দেশের শত্রু বধ করার মধ্যে কি যে আনন্দ!এটা তুই বুঝবি না।নে শরীর টা একটু টিপে দেতো।সারাদিন খুব চাপ গেছে।দুশো টাকা দেবো।
মৌনতা তপ্ত শ্বাস ফেলে রণ’র পা নিজের কোলে টেনে নিলো।এরপর সযত্নে মালিশ করলো।ধীরে ধীরে রণ’র মাথা নিজের কোলে নিয়ে বিলি কাটলো।মৌনতার কোমর জড়িয়ে ধীরে ধীরে চোখ বুঝলো রণ।ক্ষণকাল গড়াতেই গভীর ঘুমে তলালো সে।
রণ’র নিষ্পাপ ঘুমন্ত মুখের পানে অপলক তাকিয়ে রইলো মৌনতা।কিছুক্ষণ আগের বলা রণ’র কথা গুলো বার বার তার কানে বেজে চলেছে।মৌনতার চোখ গড়িয়ে টুপ করে এক ফোটা জল রণ’র কপালে পড়লো।তাৎক্ষণিক করপুটে সেই জল মুছে মৌনতা মুখ চেপে কেঁদে উঠলো।
সারা রাত এক বিন্দু ঘুমালো না মৌনতা।পুরোটা রাত সে কাঁদলো।রণ’র ঘুম ভাঙল মৌনতার কান্নার ঝাকুনিতে।থেকে থেকে কাঁপছে মেয়েটা।ব্যাথিত হলো রণ।সে উঠে বসে পরম ভালোবাসায় মৌনতা কে বুকে টেনে পিঠে হাত বুলিয়ে বললো
“কাদিস না।তুই কাঁদলে আমার যেতে অনেক কষ্ট হবে।আমার হৃদয়ে ভাঙনের ঢেউ উঠবে।আমি দুর্বল হয়ে যাবো।শত্রুপক্ষ সহযেই ঘায়েল করবে আমায়।
এমন সময় এলার্ম বেজে উঠলো রণ’র ফোনে।লম্বা দীর্ঘ শ্বাস ফেলে মৌনতার ঘরের দরজা খোলে নিঃশব্দে বেরিয়ে গেলো রণ।
পেছনে ফেলে গেলো মৌনতার অশ্রু সিক্ত বড় বড় মায়াবী কাতর দুটো চোখ।
ফজরের নামাজ পড়তে উঠলেন রেহনুমা।এমন সময় দেখলেন রণ’র ঘরে আলো জ্বলছে।কিছু হলো কি না ভেবে দৌড়ে ছেলের কক্ষে এলেন।এসে দেখলেন নিজের ব্যাগ কাঁধে নিয়ে জুতার ফিতে বাধছে রণ।রেহনুমার বুক ধক করে উঠলো।ছেলের কাছে এসে ছেলেকে চেপে ধরে কেঁদে উঠলেন তিনি।এই দৃশ্য নতুন নয়।প্রায় সময়ই ছুটি শেষ হবার আগেই ফিরে যেতে হয় রণকে।রেহনুমার অভ্যেস হয়ে গেছে এসব।কিন্তু আজ বাড়িতে বিশাল অনুষ্ঠান।বড় ছেলের বৌভাত।অথচ ছোট ছেলে থাকতে পারবে না।আনন্দের শামিল হতে পারবে না।ভেবেই রেহনুমা শব্দ করে কেঁদে উঠলেন।রেহনুমার কান্নায় আলো জ্বলে উঠলো পুরো মির্জা বাড়িতে।একে একে এলেন শায়লা,আদনান মির্জা,সাদনান মির্জা,আক্কাস চামেলি সব শেষে দেওয়ান মির্জা আর সৌম্য।শুধু এলো না মৌনতা।ইচ্ছে করেই এলো না সে।রণ’র বিদায় সহ্য করতে পারবে না সে।
রণ’র বাবা ব্যাথিত গলায় বলে উঠলো
“একটা বার জানাতে আজ সকালেই চলে যাবে।তবে সারাটা রাত তোমার সাথে কথা বলে পার করতাম।কবে ফিরবে তার তো ঠিক নেই।মন চাইলেও কথা বলতে পারি না।
রণ সহজ স্বীকারোক্তি তে বলল
“হুট করেই ফোন এসেছে।ছুটি বাড়ানোর অনেক চেষ্টা করেছি,অনুরোধ করছি।অফিসার গুলো পাশান।ছুটি দিলো না আব্বু।
শায়লা ভগ্ন গলায় বললেন
“নিজের যত্ন নিস।
“তা নেবো তোমার হিংসুটে মেয়েটা কোথায়?আমাকে বিদায় দিতে এলো না?
শায়লা মৌনতার ঘরের পানে তাকিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন
“কুম্ভকর্ণ।ওর কথা বাদ দে ।
ধীরে ধীরে সকলের থেকে বিদায় নিয়ে রণ বলে উঠলো
“দাদা ভাই আমি একান্তে তোমার সাথে একটু কথা বলতে চাই।
সম্মতি পেতেই রণ দেওয়ান মির্জাকে নিয়ে দেওয়ান মির্জার ঘরে এলো।এরপর ভনিতাহীন বললো
“মৌনতা কে দেখে রাখবে দাদা ভাই।ও শুধু তোমার নাতনি নয়।ও আমার কলিজা।দায়িত্ব টা আমি তোমার কাছেই দিয়ে যাচ্ছি।কেনো দিলাম তা অবশ্যই জানো।
বলেই হনহন করে বেরিয়ে মৌনতার ঘরে এলো রণ।
মেঝেতে দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদছে মৌনতা।হ্যাচকা টানে মৌনতা কে নিজের সাথে মিশিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ব্যাথিত গলায় রণ বললো―
“আসছি মৌন।ভালো থাকিস আর নিজের যত্ন নিস।আমাদের আবার দেখা হবে।আর যদি না ফিরি তবুও অপেক্ষায় থাকিস।মৃত্যুর ওপাড়ে তোর প্রতীক্ষায় রইবো আমি।না চাইতেও দেহটা টেনে নিয়ে যাচ্ছি সীমান্তের গহীন অরণ্যে।বুক ভর্তি তোর সাথে কাটানো সুন্দর সুন্দর মুহুর্ত বন্দি।দুর্গম অরণ্যে জোনাকির ন্যয় আলো দিয়ে ওগুলোই পথ দেখাবে আমায়।ঠিক বেঁচে থাকব আমি।অনেক ভালোবাসা তোর জন্য।ফিরে এসে সব উজাড় করবো।সইতে পারবি তো?
চলবে
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৭
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩১
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৬
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২৪