ভালোবাসার_সমরাঙ্গন ||১২||
সারিকা_হোসাইন
দুপুরের পরে পরেই মির্জা বাড়ি ভরে গেল অতিথি সমাগমে।ঢাকা থেকে এলেন রেহনুমার ছোট বোন আর তার দুই ছেলে মেয়ে।শায়লার বাপের বাড়ি থেকেও এলেন সকলে।নিকট আত্মীয় স্বজন যারা রয়েছে কাউকেই বাদ দেননি দেওয়ান মির্জা।একদম জাল দিয়ে ছেঁকে ছেঁকে মাছ ধরার মতো ধরে এনেছেন সবাইকে।নিস্তব্ধ ঠান্ডা মির্জা বাড়ি মুহূর্তেই চাঁদের হাটে রূপান্তরিত হলো।বাড়িতে কারোর বসে আড্ডাবাজি করার ফুসরত নেই।সন্ধ্যায় মেয়ের বাড়িতে গায়ে হলুদ রয়েছে।ছেলে মেয়েরা সবাই ওখানে আমোদ ফুর্তি করতে যাবে।ফিরবে রাতের বেলা।আর বড়রা যাবে একেবারে কাল বিয়েতে বর যাত্রী হয়ে।
মৌনতা তার মামাতো বোন সিমিকে নিয়ে গরু দেখতে বাইরে বেরিয়ে এলো।বড় বড় নয়’টা গরু কিনেছেন দেওয়ান মির্জা ।বড় নাতির বিয়ে উপলক্ষে।একেকটার চাইতে একেকটা বড়।চামেলির বাবা কুতুব আর আক্কাস মিলে সেগুলোর যত্নআত্তি নিয়ে ব্যস্ত।মৌনতা যখন গরুর কাছে এলো তখন হেহে করে হেসে আক্কাস বলে উঠলো
“সাবধান অফামনি,গরুর কাছে আইয়েন না।নাল জামা পিনছেন আফনে।গরু এক্ষনি আফনেরে গুঁতায়া ভুঁড়ি বাইর কইরা ফালাইবো।মরদ গরু লাল রঙ দেখলেই ক্ষেইপ্পা যায়।
আক্কাসের কথায় আজ ক্ষেপলো না মৌন।সে দূরত্ব বজায় রেখে দাঁড়িয়ে গরু গুলোর তামাশা দেখলো।এমন সময় সিমি শুধালো
“মৌনপু তোমার বিয়েতে কয়টা গরু জবাই হবে?
দেওয়ান মির্জা হেসে তাৎক্ষণিক উত্তর দিলেন
“আঠারো টা।একমাত্র নাতনি বলে কথা।
কথায় কথায় আরো কিছু হাসি ঠাট্টা হলো।এর মধ্যে মৌনতা মিনমিন করে বলে উঠলো
“আরো বেশি।দুই পক্ষের গরু হিসেব করতে হবে।
মৌনতার কথা কেউ আমলে নিলো না।সিমি কে নিয়ে মৌনতা বসার ঘরে পা বাড়ালো।রেহনুমার ছোট বোনের ছোট মেয়েটা বড্ড সুন্দর।মৌনতার খুব ইচ্ছে জেগেছে তার সাথে কথা বলতে।বিদেশিদের মতো ফটফট করে ইংরেজি বুলি আওড়ায় মেয়েটা।গায়ের রঙ দুধের মতো।লাল লাল চুল।সব সময় বিদেশিদের মতো শার্ট প্যান্ট পরে ঘুরে বেড়ায়।কি সুন্দর কথা তার।মৌনতা তার থেকে কয়েকটা ইংরেজি শিখে রণকে অবাক করে দেবে।মনে মনে ভেবে রেখেছে মৌন।শুধু তাই নয়।মেয়েটার সাথে সখ্যতা গড়ে মেয়েটার মতো স্মার্ট ও হবে।কিন্তু তার আগে মেয়েটার নাম জানা জরুরি।
মৌনতা সিমি কে বলল
“চল সিমি আমরা ওই সুন্দরী আপুটার কাছে যাই।
চতুর সিমি সুন্দরী আপু সম্বোধনেই বুঝে ফেললো মৌনতা কার কথা বলছে।তাই সে ফট করে বলে উঠলো
“তুমি যাও আমি যাব না।মেয়েটা সাংঘাতিক অহংকারী আর দেমাগী।ওসব মেয়ের সামনে গেলে আমার রাগ উঠে যায়।
বলেই নিজের বড় বোনের ওখানে দৌড়ে গেলো সিমি।ওখানে সবাই হাসি রসের কৌতুক জুড়েছে।মাহির আর মুইন ও আছে সেই আড্ডায়।মুইন কে সিমির একটু একটু পছন্দ।মানুষটার সান্নিধ্য এতদিন বাদে মনে অদ্ভুত এক শিহরণ জাগাচ্ছে।
সিমি চলে যেতেই ড্রয়িং রুমে ঢুকলো মৌন।ঢুকেই দেখতে পেলো রেহনুমা বউয়ের জন্য কেনা শাড়ি গহনা টেবিলে সাজিয়ে নিজের বোন আর ভাগ্নিদের দেখাচ্ছেন।শায়লা কাজের ফাঁকে ফাঁকে তাদের চা নাস্তা দিচ্ছেন।
মৌনতা রেহনুমার কাছে গিয়ে গা ঘেষে বসে বলল
“শাড়িটা তো খুব সুন্দর হয়েছে বড় মা।তুমি পছন্দ করেছ বুঝি?
মৌনতার কথায় ঠোঁট টিপে হেসে রেহনুমা জবাব দিলেন
“সেকি তুই দেখিসনি আগে এই শাড়ি?রণ এনেছে ঢাকা থেকে।
রেহনুমার বোন রুলি তাৎক্ষণিক বলে উঠলো
“বড় আপা যাই বলো রণ’র পছন্দ কিন্তু লাজবাব।ওর পছন্দ অপছন্দ করার সাধ্যি কারোর নেই।ওর পছন্দ লাখে একটা।
মৌনতা কথা খানা শুনে লাজুক হেসে ইতিউতি তাকিয়ে রণকে খুজলো।সকাল থেকে মানুষটা লাপাত্তা।কোথায় গিয়ে ঘাপটি মেরে আছে কে জানে?
মৌনতা গহনা গুলো হাতে নিয়ে দেখলো।আর উচ্ছসিত হয়ে বলল
“ভাবীকে খুব সুন্দর লাগবে বড় মা।গহনা গুলোও খুব সুন্দর হয়েছে।
কথায় কথায় রেহনুমার বোন রুলি বলে উঠলো
“আপা কিছু মনে না করলে একটা কথা জিজ্ঞেস করবো?
রেহনুমা অনুর ঝুমকা জোড়া মৌনতার কানে ধরে আনমনে বললো
“কি কথা বল?
“কোয়েল কে তোমার কেমন লাগে?
কোয়েলের নাম শুনলেই রেহনুমা তপ্ত শ্বাস ফেলে কোয়েলের পানে তাকালেন।পাঁচ ফুট চার ইঞ্চি উচ্চতার অতীব ফর্সা সুন্দরী রমণীর পানে তাকিয়ে ঠোঁট প্রশস্ত করে রেহনুমা বললেন
“ওকে ভালো লাগবে না এমন মানুষ পৃথিবীতে আছে?আমার ভাগ্নি তো কোটিতে একটা।
কথাটি শুনে খুশিতে গদগদ হয়ে চেয়ার ছেড়ে রেহনুমার একদম পাশ ঘেষে বসে গেলো কোয়েল।মৌনতা অবাক হয়ে মেয়েটাকে দেখলো।হাসলে কি সুন্দর টোল পরে দুই গালে।মৌনতা ফিস ফিস করে কোয়েলকে বললো
“তুমি খুব সুন্দর কোয়েল আপু।সিনেমার নায়িকা দের মতো।
কোয়েল নিজেও মৌনতার গাল টিপে বললো
“তুমি কম কিসে ফেল্টু রানী?
কোয়েলের কথায় মৌনতার মুখের হাসি উবে গেলো।অপমান বোধ হলো।না পারলো স্বস্থানে বসতে না পারলো উঠতে।এমন সময় রুলি বলে উঠলো
“যদি রণ’র জন্য কোয়েলকে সাধি তবে মানা করবে আপা?
রেহনুমা জবাব না দিয়ে অবাক বিস্ময়ে তাকিয়ে রইলেন।সেই সাথে মৌনতা কেমন ডাঙ্গায় তোলা মাছের মতো ছটফট করে উঠলো।রুলি চারপাশে কিছু না অবলোকন করে পুনরায় বলে উঠলো
“কোয়েল কম্পিউটার সায়েন্স নিয়ে পড়ছে।বেশ মেধাবী তা তো তুমি জানোই।চাইলেই বিদেশে ভালো ক্যারিয়ার গড়তে পারবে।একজন আর্মি মেজরের বউ হবার সকল যোগ্যতা ওর আছে।চেনা জানা নিজেদের মধ্যে বিয়েটা হলে কেমন হয় আপা?
রেহনুমা তাৎক্ষনিক কোনো জবাব দিতে পারলেন না।এমন সময় এগিয়ে এলেন আদনান মির্জা।পাশ দিয়েই কোথাও যাচ্ছিলেন বোধ হয়।কথাগুলো শুনে তিনি থেমে দাঁড়িয়ে হাসি মুখে বলে উঠলেন
“বউ মা হিসেবে কোয়েলকে পেলে আমি দুই পায়ে রাজি হয়ে যাবো শালী সাহেবা।আরো আগে তোমার মনের কথা খানা জানালে দুই ছেলের বিয়ে এক সাথেই দিয়ে দিতাম।বড্ড দেরি হয়ে গেলো।এখন রণ আবার যখন ছুটিতে আসবে তখন শুভ কাজ সারতে হবে।
মৌনতা সকলের হাসি খুশি আনন্দ ভরা কথা গুলো কেন জানি নিতে পারলো না।তার চিৎকার করে প্রতিবাদ করতে ইচ্ছে হলো।বলতে ইচ্ছে করলো
“রণ ভাই আমায় পছন্দ করে।তোমরা এসব বলো না।আমার কষ্ট হচ্ছে।
কিন্তু বলতে পারল না মৌনতা।তার কন্ঠনালী বিষিয়ে উঠলো।ঠোঁট আর থুতনি কেঁপে উঠলো।সেই সাথে টলমলে হলো বড় বড় কাজল কালো দুই চোখ।
রেহনুমা হঠাৎ বলে উঠলেন
“রণকে একবার জিজ্ঞেস করা প্রয়োজন এই বিষয়ে রণ’র বাবা।আমি এখনই কোনো ধরনের পাকা কথা দিতে পারব না।তবে কোয়েলকে আমার বেশ পছন্দ।এমন মেয়ে যেকেউ লুফে নেবে।তাছাড়া আমাদের পছন্দ অগ্রাহ্য করার মতো ছেলে রণ নয়।
বড় বোনের কথায় রুলি ঠোঁটের কোণে হাসির রেখা ধরে রেখেই বলতে লাগলো
“তুমি এবারই কথা বলে রেখো বড় আপা।ছেলে আবার পঁচা শামুকে পা কেটে বসে থাকবে।তখন গিলতেও পারবে না উগলাতেও পারবে না।আর্মি ক্যাপ্টেন ,সোলজার মেয়ে গুলো বড় অফিসারদের ফাঁসাতে আঠার মতো চিপকে থাকে।যদিও রণ বিচক্ষণ।কিন্তু বলা তো যায়না!
বলতে বলতে মৌনতার পানে তাকিয়ে বলে উঠলো
“শায়লা আপা বললো মৌনতার জন্য নাকি পাত্র খোঁজ করা হচ্ছে?আমার ভাসুরের ছেলে দুবাই থাকে।বিশাল বড় পারফিউম এর বিজনেস ওদের।ছেলে দেখতে শুনতে লাখে এক।মৌনতা যথেষ্ট মিষ্টি একটা মেয়ে।তোমরা চাইলে আমি আমার ভাসুরের সাথে কথা বলতে পারি।
রুলি আর রেহনুমার কথায় মৌনতার কেমন দম বন্ধ লাগলো।সে উঠে দাঁড়াতে চাইলো।কিন্তু পায়ে কে যেনো বেড়ি পরিয়ে দিয়েছে।মৌনতা প্যারালাইজড মানুষের ন্যয় শক্তিহীন বসে রইল।এমন সময় ক্লান্ত ভঙ্গিতে ঘরে ঢুকলো রণ।রণকে দেখেই রেহনুমা কে ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো কোয়েল।এরপর দৌড়ে গিয়ে রণ’র হাত চেপে ধরে বলে উঠলো
“ভাইয়া!
কোয়েলকে দেখে বেশ খুশি হলো রণ।ছোট খালামনির মেয়েটা ছোট বেলা থেকেই বড্ড আদুরে তার।বোনের মতো স্নেহ করে রণ তাকে।তাই মেয়েটার হাত চেপে ধরা বিশেষ কিছু মনে করলো না রণ।রণ আলগোছে মৌনতার নত বদন টা দেখে কপাল কুঁচকে বলে উঠলো
“এক গ্লাস শরবত বানিয়ে দিয়ে যা মৌন।গলাটা শুকিয়ে কাঠ হয়ে গেলো।তাড়াতাড়ি কর।
মৌনতা কোনো মতে উঠে দাঁড়িয়ে রান্না ঘরে চলে গেলো।শায়লা খুব ব্যস্ত।মৌনতার পানে তাকানোর ফুসরত নেই তার।মৌন যখন লেবু কেটে গ্লাস গুছালো এমন সময় কোয়েল উচ্ছসিত গলায় বলল
“আমাকে দাও।আমি নিয়ে যাবো।
বলেই তাড়াহুড়ো করে শরবতে চিনি মিশিয়ে গ্লাস নিয়ে চলে গেলো কোয়েল।মৌনতা লেবুর খোসা হাতের মুঠোয় পুড়ে শক্ত হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো।নিঃশব্দে তার গাল গড়িয়ে ঝড়ে পড়লো এক ফোটা জল।এমন সময় শায়লা বলে উঠলো
“কিরে কাঁদছিস কেনো মা?
মৌনতা হকচকিয়ে বলে উঠলো
“ওকিছুনা মা।চোখে লেবুর ঝাঁজ গিয়েছে।
শায়লা বিশ্বাস করলো না কথাটা।কিন্তু আর ঘাটাল ও না।চুপচাপ চামেলিকে নিয়ে রান্নার কাজে মন দিলো।
মৌনতা নিঃশব্দে রান্না ঘর ত্যাগ করে তার বাবার রুমে গেলো।বিয়েতে কি কি রান্না হবে তা নিয়ে সাদনান মির্জা বাবুর্চির সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন।মৌনতা কে দেখে তাড়াতাড়ি কথা শেষ করে লাইন কেটে আদুরে গলায় বললেন
“কিরে মা?কিছু বলবি?
মৌনতা তার বাবার কোলে বসে ভগ্ন গলায় বলল
“তোমায় একবার জড়িয়ে ধরি আব্বু?
বলেই বাবার কাঁধে মাথা রেখে ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠলো মৌন।মেয়ের আকস্মিক কান্নায় ব্যস্ত হলেন সাদনান মির্জা।মেয়ের মাথায় হাত বুলাতে বুলাতে তিনি ব্যস্ত গলায় বললেন
“কি হয়েছে মা?কেউ হাসি তামাশা করেছে?
মৌনতা কিছুক্ষণ কেঁদে বলে উঠলো
“আমি একদিন তোমার মুখ উজ্জ্বল করবো আব্বু।তুমি দেখো এবার ঠিক পাশ করবো আমি।
সাদনান মির্জা ধরেই নিলেন অতিথির মধ্যে কেউ তার মেয়েকে ফেল বিষয়ক কিছু বলে অপমান করেছে।তাই সাদনান মির্জা মনে মনে মেয়ের জন্য কষ্ট পেলেন।অতঃপর বললেন
“ফেইল পাশে কি আসে যায় মা?আমার মেয়ের মতো সহজ,সরল আর সুন্দর মনের কটা মানুষ এই পৃথিবীতে আছে?যার মন সুন্দর সেই প্রকৃত মানুষ।ভালো রেজাল্ট করলেই কি ভালো মানুষ হওয়া যায়?
বাবার কাঁধে নাকের জল মুছে মৌন উঠে দাঁড়ালো।এরপর বললো
“আমি তোমাকে খুব ভালোবাসি আব্বু।
মেয়ের হাত টেনে হাতে চুমু খেয়ে সাদনান মির্জা এক হাজার টাকার একটা নোট গুঁজে দিয়ে বলে উঠলেন
“যাহ বাড়ির ছোট ছোট বাচ্চাদের নিয়ে আনন্দ কর।কেউ বাধা দিবে না আজ।
কিন্তু মৌনতার মনে কোনো আনন্দ ধরা দিলো না টাকা গুলো পেয়েও।সে টাকা টা মুঠোয় পুড়ে নিজ কক্ষে এসে বেলকনিতে দাঁড়ালো।রণ কোয়েলের সাথে হেসে হেসে কথা বলছে।এই দৃশ্যে মৌনতার বুকে অসহনীয় ব্যাথা হলো।সে সরে আসতে চাইলো।তার আগেই রণ বেলকনিতে এসে ডেকে উঠলো
“আমার ঘরে আয় মৌন।কোয়েলের সাথে তোকে আলাপ করিয়ে দেই।
মৌনতা গেলো না।সে নিজ কক্ষে ঢুকে ধাম করে দরজা লাগিয়ে বালিশে মুখ গুজে কেঁদে উঠলো।মৌনতার এমন ঐদ্ধত্বে রণ’র চোয়াল শক্ত হলো।কোয়েল বলে উঠলো
“মেয়েটা কেমন যেনো।কারো সাথে মিশতে জানে না।বড় চাচ্চুর ছেলের সাথে মা ওর বিয়ের কথা বলছে।কিন্তু আমার মনে হচ্ছে ও ওই ফ্যামিলতে এডজাস্ট ই করতে পারবে না।গেঁয়ো ভুত একটা।
রণ শক্ত মুখে বলে উঠলো
“মৌনতা তোর অনেক ছোট কোয়েল।ছোটদের কেউ এভাবে কথা বলে না!স্নেহ করতে হয়।আর তোর কাজিন এর সাথে আমরা ওকে বিয়েই দেবো না।কারন তোর ভাইয়েরই এডজাস্ট করার এবিলিটি নেই মৌনতার সাথে।
কোয়েল মুখ বাকিয়ে বলে উঠলো
ঢং
সারাটা দুপুর ঘরেই চুপচাপ পরে রইলো মৌনতা।বাইরে বেরুলো না।তার খুঁজ ও কেউ করলো না।মেহমানে ভর্তি সারা বাড়ি।তাদের আপ্যায়ন রান্না বান্না করেই কুল পাওয়া যাচ্ছে না।তন্মধ্যে সবাই উত্তেজিত গায়ে হলুদের আনন্দে।বিকেলের পরে পরে সবাই তৈরি হতে বসে গেলো অনুদের বাড়ি যাবার জন্য।কিন্তু মৌনতা ঘর থেকে বের হলো না।শায়লা দরজায় জোরে জোরে কড়া নেড়ে ডাকলো মৌনতা কে।মায়ের ডাকে চোখ মুখ মুছে মৌনতা দরজা খুললো।মেয়ের চোখ মুখের অবস্থা দেখে শায়লা চেপে ধরলেন শক্ত করে
“কি হয়েছে মৌন খুলে বল।আমি সব ঠিক করে দেবো।মাকে বলবি না?
মায়ের ভরসায় মাকে জড়িয়ে শব্দ করে কেঁদে উঠলো মৌনতা।এরপর ভাঙা অস্ফুট গলায় বলল
“রুলি আন্টি রণ ভাইয়ের সাথে উনার মেয়ের বিয়ের কথা বলছে।বড় মা,বড় বাবা সবাই কোয়েলকে পছন্দ করে।কিন্তু মা ,আমিও রণ ভাইকে পছন্দ করি।দুপুরে কথা গুলো শোনার পর থেকে আমার খুব কষ্ট হচ্ছে।আমি মানতে পারছি না।
শায়লা বিস্ফারিত নজরে মেয়ের পানে তাকিয়ে মৌনতার মুখ চেপে ধরলেন।এরপর শক্ত গলায় বলে উঠলেন
“খবরদার মৌন।এই কথা যেনো বড় আপা বা বড় মির্জা কারো কানে না যায়।তাহলে ভাববে আমি তোকে লেলিয়ে দিয়েছি।ওদের ছেলের ভবিষ্যৎ উজ্জ্বল।তোকে ওরা গ্রহণ করবে না।পড়ে সম্পর্কে ফাটল ধরবে।এই কথা ভুলেও আর মুখ দিয়ে বের করবি না।তোর বাবা জানলে তোকে মেরে কেটে নদীতে ভাসিয়ে দেবে।সাবধান আর যেনো দু’কান না হয় এই কথা।এমনিতেই সমাজে তোকে নিয়ে নানান হাসি ঠাট্টা।
মৌনতা পলক ঝাপ্টে মাথা ঝাকাতেই মেয়ের মুখ ছেড়ে দিয়ে শায়লা বলে উঠলো
“আজ থেকে রণ’র আশেপাশে জাবি না।গেলে আমি ভুলে যাবো তুই আমার সন্তান।
মৌনতার জন্য গায়ে হলুদের একটা বাসন্তী লেহেঙ্গা এনেছে রণ ।সেটা হাতে নিয়ে বেশ কয়েকবার পরখ করে বেলকনীর দরজায় উকি দিয়েছে।দরজা বন্ধ।বাইরেও বেরোয়নি সে।আর সহ্য করতে না পেরে মৌনতার ঘরের সামনে এসে দাড়ালো রণ।এমন সময় মৌনতার ঘর থেকে বেরিয়ে এলো শায়লা।কোনো দ্বিধা না রেখে রণ শুধালো
“মৌনতা সারাদিন ধরে ঘরে কি করছে ছোট মা?
চতুর শায়লা কোনো প্রকার ইতস্তত না করে জবাব দিলো
“শরীরটা আজ আবার খারাপ করেছে।মাথা ব্যথার বিছানায় পরে রয়েছে।
রণ ব্যকুল হয়ে বলল
“ওষুধ দাওনি?একটু পর আমরা সবাই ভাইয়ার শ্বশুরবাড়ি যাবো।
শায়লা ধাতস্থ করে বললো
“দিয়েছি কমছে না।তোরা যা বাবা।মৌন বাড়িতেই থাকুক।তোরা আনন্দ কর।
রণ শায়লাকে উপেক্ষা করে ঘরে ঢুকে বলে উঠলো
“সকালেও তোকে ভালো দেখেছি।হঠাৎ মাথা ব্যথাটা কিসের মৌন?
মৌনতা জবাব না দিয়ে পাশ ফিরে শুয়ে বলে উঠলো
“কথা বলতে ভালো লাগছে না রণ ভাই।সব সময় তোমার হম্বিতম্বি মূলক কথার জবাব দেবার জন্য আমি বসে থাকি না।
‘তোর সাহস খুব বেড়েছে তাই না?
“তাতে তোমার কি যায় আসে?
“আমার সাথে এভাবে কথা বলার সাহস কে দিয়েছে তোকে?
“তোমাকে দেখে ভয় পেতে হবে কোন দুঃখে?কোন হরিদাস পাল তুমি?আর আমি অসুস্থ জেনেও কেনো বিরক্ত করছো আমায়?আমাকে বিরক্ত না করলে কি তোমার দিন শুভ হয় না?
“আমি বিরক্ত করছি তোকে?
কাতর গলায় শুধালো রণ।
মৌনতা ফট করে জবাব দিলো
“নয়তো কি?
রণ চোখে আগুন জ্বালিয়ে শায়লার সামনে দাঁড়িয়ে বলে উঠলো
“তোমার মেয়ে আজ থেকে আমার সামনে পড়লে গলা টি পে মেরে ফেলব ছোট মা।মেয়েকে সামলে রেখো।
বলেই হনহন করে বেরিয়ে গেলো রণ।চোখে জমা জল মুছে শায়লা নিজের স্বামীর ঘরে গিয়ে কম্পিত গলায় বলে উঠলেন
“একটা পাগলের সাথে হলেও মৌনতার বিয়ের ব্যবস্থা করো মাহিরের আব্বা।নয়তো মুখে চুনকালি পড়বে।বড় আপার সামনে মুখ দেখাতে পারব না আমি।আমার মেয়ে পঁচা শামুক।রণ জেনে বুঝে সেই শামুকে পা কাটতে চাইছে।আবেগ দিয়ে জীবন চলবে না।আমার সহজ সরল মেয়েটার মুখে কপটতার তকমা লাগতে দিবো কি করে আমি?
চলবে….
Share On:
TAGS: ভালোবাসার সমরাঙ্গন, সারিকা হোসাইন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন গল্পের লিংক
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ১৮
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৪
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২০
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৫
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৭
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ২
-
ভালোবাসার সমরাঙ্গন পর্ব ৩২