ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৭৪
তাজরীন ফাতিহা
পুরো নাম ইনাম আরশান ভুঁইয়া। মাহবুব আলম ডাকেন আফসীন বলে। মেয়ের আফরিন নামানুসারে রেখছেন আফসীন। শ্বশুরের দেখাদেখি নিশাতও আফসীন ডাকে। মাহাবুব আলমের বড় আদরের ডাক আফসীন। তার আফরিনের অংশ আফসীন। বাবাদের কাছে মেয়েরা অসম্ভব আদরের রাজকন্যা হয়। মাহাবুব আলমের কাছেও মানহা বেশ আদরের, কলিজার টুকরা। ইনামের বয়স এগারো মাস। পরিবারের ছোট সদস্য হওয়ায় তার আদরের কমতি নেই কোনো। ইনামের সাথে সবচেয়ে বেশি সখ্যতা পরিবারের বড় সন্তান ফাইয়াজ নাহওয়ানের। ছোট ভাইকে এইটুকু বয়সেই বেশ দেখে দেখে রাখে সে। চোখের আড়াল করতে চায়না মোটেও। পাঁচ বছর বয়সেই বেশ দায়িত্বশীল গাম্ভীর্যে পরিপূর্ণ নাহওয়ান। তাই বলে দুষ্টুমি করতে বাদ রাখেনা। ছোট ভাইয়ের পিছনে লেগে থাকাই পাঁচ বছর বয়সী ফাইয়াজ নাহওয়ানের প্রধান কাজ।
এই যেমন এখন সে খুবই দক্ষতার সহিত ইনামের হাতে কলম দিয়ে আকিজুঁকিতে ব্যস্ত। ইনাম শুয়ে শুয়ে বড় ভাইয়ের আঁকা দেখছে আর নানা ধরনের শব্দ করছে,
“বা বা, বাব্বা, মা মা, দা দা, বুস…ও..এ”
নাহওয়ান কিছু আঁকায় ব্যস্ত ছিল। ইনামের মুখে এসব শব্দ শুনে বলল,
“বাবাকে ডাকছ? ভাইয়া ডাকোতো।”
ইনাম গোলগোল চোখে বড় ভাইকে দেখছে। যেন কথাটা বুঝতে পেরেছে। ফিচফিচ করে হেঁসে গড়াগড়ি খেল। গড়াগড়ি করতে গিয়ে হাত ছুটে যাওয়ায় নাহওয়ানের আঁকা নষ্ট হয়ে গেল। নাহওয়ান তা দেখে শাসন করে বলল,
“আরে নষ্ট করে ফেললে তো। কত কষ্ট করে একটা বাড়ি এঁকেছি। পুরো নষ্ট করে দিলে।”
ইনাম ভাইয়ের ধমক শুনে তাকিয়ে মুখে আঙুল ভরে শব্দ করতে লাগল। যেন বুঝাচ্ছে ধমক দিচ্ছ কেন? আমি তো একটু গড়াগড়িই খেয়েছি। নাহওয়ান কোমরে হাত রেখে ইনামকে শাসাতে চাইল। ইনাম ছলছল চোখে চেয়ে ঠোঁট উল্টে কেঁদে উঠতেই নিশাত তৎক্ষণাৎ এসে বলল,
“কি হলো? ভাই কাঁদছে কেন নাহওয়ান?”
নাহওয়ান মুখ নামিয়ে বলল,
“স্যরি মা, ভাইকে একটু বকা দিয়েছি।”
নিশাত তাড়াহুড়ো করে ইনামকে কোলে নিয়ে বলল,
“কেন?”
নাহওয়ান নিজের বই দেখিয়ে বলল,
“এটা দেখে একটা বাড়ি আঁকছিলাম ভাইয়ের হাতে। হুট করে নড়ে উঠে পুরো নষ্ট করে দিয়েছে। তাই বকেছি।”
ওদিকে ইনাম নিশাতের কোলে উঠে কাঁদতে কাঁদতে নাহওয়ানের দিকে ইশারা করে বোঝালো, ভাইয়া বকা দিয়েছে। নিশাত ইনামকে আদর করতে করতে চুমু খেল। তারপর মিছেমিছি নাহওয়ানকে ধমক দিয়ে বলল,
“ও কি এসব বোঝে? সুন্দর করে বললেই হতো। ভাইকে আদর করে দাও।”
নাহওয়ান এগিয়ে এসে ইনামকে আদর করল। ইনাম অভিমানে মুখ ঘুরিয়ে নিল। যেন বোঝাতে চাইল তোমার আদরের দরকার নেই। নিশাত ইনামকে নিয়ে বিছানায় বসল। গালে গাল ঠেকিয়ে আদর করতে লাগল। ইনামের গায়ের ঘ্রাণ নিল। বেবি লোশন আর পাউডারের ঘ্রাণ। যা একটু আগে নিশাতই মাখিয়ে দিয়েছিল। ইনাম নিশাতের গালে কামড়ে গালা লাগিয়ে দিল। নিশাত তা বুঝে বলল,
“দুষ্টু পাখি, মামণিকে লালা লাগিয়ে দিয়েছেন?”
ইনাম ফিচফিচ করে হেসে আবারও গাল কামড়ে দিল। নাহওয়ান মায়ের পাশে বসে বসে ভাইকে আদর করা দেখছে। তার ছোট্ট মনটা হঠাৎ মায়ের আদর পাওয়ার জন্য মরিয়া হয়ে উঠল। এগিয়ে এসে মায়ের গা ঘেঁষে বসল। কিন্তু নিশাতের সেদিকে একদম খেয়াল নেই। সে ব্যস্ত ইনামকে নিয়ে। তা দেখে নাহওয়ানের মনটা খারাপ হলো একটু। সে বিছানা থেকে নেমে জানালার পাশে দাঁড়াল। মন খারাপ হলেই সে জানালার কাছে চলে যায়।
নাহওয়ান প্রতিদিন নিয়ম করে জানালা দিয়ে একদৃষ্টিতে রাস্তার দিকে চেয়ে থাকে। কখনো বা দাদার হাত ধরে রাস্তায় গিয়ে ঘণ্টার পর ঘন্টা দাঁড়িয়ে কাঙ্ক্ষিত মানুষটিকে খোঁজে। যেন কারো জন্য চাতক পাখির ন্যায় প্রতীক্ষায় রয়েছে সে। কিন্তু যার অপেক্ষার প্রহর প্রতিনিয়ত সে গুণে চলেছে সেই বাবা নামক ছত্রছায়াটির অস্তিত্ব কোথাও পাওয়া যায়না। হয়তবা পাওয়া যাবেও না কিন্তু ছোট্ট প্রাণটি কি অত কিছু বোঝে? তার ধ্যান, জ্ঞান তো একমাত্র বাবাতেই সীমাবদ্ধ। আচ্ছা, সেই প্রতীক্ষিত ব্যক্তি কি জানে একটা ছোট্ট প্রাণ তার অপেক্ষায় বহুদিন ধরে অপেক্ষারত?
_
12 Northolt Road, Harrow,
North West London,
United Kingdom
একটি বিলাসবহুল ডিট্যাচড হাউজের লিভিং রুমে একজন ষাটোর্ধ্ব ব্যক্তি নিউজপেপার পড়ছেন। যদিও তাকে ষাটোর্ধ্ব মনে হয়না। এ বয়সেই সে যথেষ্ট ফিট। তার নীল চোখজোড়া পত্রিকার ইংরেজি লেখাগুলোর উপরে নিবদ্ধ। সামনে গ্রীন টি রাখা। তাতে একটু পর পর চুমুক দিচ্ছেন। খানিক পর সেখানে তিরিং বিড়িং করতে করতে উপস্থিত হলো একজন মেয়ে। লোকটার উদ্দেশ্যে প্রশ্ন ছুড়ল,
“আর ইয়্যু বিজি ফাদার-ইন-ল?”
(আপনি কি ব্যস্ত শ্বশুর মশাই?)
লোকটা পত্রিকা থেকে মুখ তুলে মেয়েটির দিকে চাইল। যে বর্তমানে উৎসুক হয়ে তার দিকে চেয়ে আছে। সে মুচকি হেসে বললেন,
“নো, ইয়াং লেডি।
পত্রিকা বন্ধ করে মেয়েটাকে পাশে বসার নির্দেশ দিলেন।
“আমি বাংলা জানি।”
মেয়েটি নড়েচড়ে বসে বলল,
“আমি জানি তো।”
“তাহলে ইংরেজিতে ফর্মালিটি করছ কেন?”
“এমনি।”
“তোমার উনি উঠেছেন?”
মেয়েটা মন খারাপ করে বলল,
“না। জানো কি হয়েছে ফাদার-ইন-ল?”
লোকটাও উৎসুক হয়ে জবাব দিল,
“কি হয়েছে?”
“উঠতে বললাম আমাকে বলে, আরেকবার ডাকলে নাকি ঘাড় ধাক্কা দিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেবে। সবসময় আমাকে বকে।”
“ভেরি ব্যাড। হি ডিজার্ভস পানিশমেন্ট।”
“তুমি বলো কি শাস্তি দেবে?”
“উঠুক ঘুম থেকে। এর একটা উচিত জবাব দিতে হবে।”
“ভালোভাবে দেবে, ঠিক আছে?”
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পিছন থেকে একজনের গম্ভীর কন্ঠ শোনা গেল,
“হোয়াট আর ইউ টু হুইসপারিং ফর? আয়েম শিওর ইউ আর কুকিং সামথিং আপ অ্যাবাউট মি।”
(দুজনে কানে কানে কি গুজুর গুজুর করছ? নিশ্চয়ই আমাকে নিয়ে কোনো ত্যানা পাকাচ্ছ।)
মেয়েটি মুখ চুপসে রাখল। পিছন থেকে পুরুষটি এসে তার মাথায় গাট্টা মেরে সামনের সোফায় আসন করে বসল। মেয়েটি নিজের শ্বশুরের দিকে চেয়ে বলল,
“ফাদার-ইন-ল কিছু বলো? আবারও মেরেছ?”
সামনের পুরুষটি ভেঙিয়ে বলল,
“ফাদার-ইন-ল কিছু বলো? ঢং দেখলে বাঁচি না। পাপা বলো।”
মেয়েটি ঠোঁট ফুলিয়ে শ্বশুরের দিকে চাইতেই তিনি বললেন,
“জিহাম, তোমার স্পর্ধা কত আমার ডটার-ইন-লকে বকছ?”
“তোমরা দুজন কি শুরু করেছ ড্যাড? ডটার-ইন-ল, ফাদার-ইন-ল? স্বাভাবিক হও তো দুজন।”
জোসেফ আহেমদ এবার নড়েচড়ে বসে শাসনের ভঙ্গিতে বললেন,
“তুমি কেন আমার বাউমাকে বকেছ?”
“ওটা বাউমা না, বৌমা। তোমাকে বাংলা বলতে কে বলেছে? ইংরেজিতে বলো।”
মেয়েটি এবার সটান দাড়িয়ে বলল,
“তোমাকে এখানে আসতে কে বলেছে? শ্বশুর, বৌমার কথার মাঝে তুমি নাক গলাচ্ছ কেন? পাপা তোমাকে শাসন করছে সেখানে তুমি আবার তার ভুল ধরছ?”
“ইরা!”
“ধমকাবে না। তোমাকে আমি ভয় পাই?”
জিনান দাঁত কিড়মিড় করতে করতে বলল,
“বেয়াদব মেয়ে। রাতের বেলা চুরি করে যে ড্যাডের জন্য বানানো ডোনাট খেয়ে ফেলো সেটা এখন বলি?”
ইরা ছলছল চোখে চেয়ে বলল,
“বলেই তো দিয়েছ। আর কি বলবে?”
জোসেফ আহেমদ তব্দা খেয়ে বললেন,
“কি বলছ? আমি তো এতদিন ভেবেছি ইঁদুরের কাজ।”
“ইঁদুরের কাজই তো। আমাদের ঘরের সবচেয়ে বড়সড় ইঁদুর।”
ইরা আর এক মুহুর্ত না দাঁড়িয়ে হনহনিয়ে চলে গেল। জোয়েফ আহমেদ ডাকতে চাইলেন জিনান মানা করে বলল,
“ডেকো না তো ড্যাড। কিছুক্ষণ গাল টাল ফুলিয়ে মৌনব্রতে বসবে।”
“লাইক ইওর মম।”
“হবেনা ফুপির বৈশিষ্ট্য তো পাবেই। একমাত্র ভাইঝি বলে কথা।”
তাদের কথার মাঝে ইরা আবারও ধুপধাপ পা পেলে এগিয়ে এসে বলল,
“তুমি সবসময় চাও, পাপা আর আমার মধ্যে একটা দাঙ্গা বাজাতে। কোনোদিন আমাদের মধ্যে ভালো সম্পর্ক দেখতে পারো না। তুমি একটা গিরিঙ্গিবাজ লোক।”
জিনান চোখ সরু করে দাঁড়িয়ে যেতেই ইরা দুকদম পিছিয়ে জোসেফ আহেমদের উদ্দেশ্যে বলল,
“দেখো পাপা, আমাকে এখন আবার মারবে।”
জিনান রাগান্বিত গলায় বলল,
“এই পল্টিবাজ মেয়ে তোমাকে আমি কখন মারি?”
ইরা গাল ফুলিয়ে বলল,
“মারো না? মাথায় ঠোঁসা দাও, কান ধরো, ঘাড় ধরো, গালে চিমটি কাটো এগুলো মারা না?”
জিনান ফোঁস করে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“ড্যাড এই মেয়েকে এখান থেকে যেতে বলবে?
জোসেফ আহমেদ মুচকি হেসে বললেন,
“না যেতে বলব না। আমার কাছে আসো বাটারফ্লাই।”
ইরা জোসেফ আহমেদের মুখে বাটারফ্লাই ডাক শুনে উড়তে উড়তে গিয়ে তার পাশে বসল। জোসেফ আহমেদ তার মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন। ইরা তার হাত জড়িয়ে ধরে কাঁধে মাথা রেখে জিনানকে মুখ ভেঙালো। জিনান এসব দেখে বলল,
“আরও মাথায় ওঠাও। এই মেয়ে দুনিয়ার সেয়ানা। আমাকে জ্বালিয়ে পুড়িয়ে কয়লা বানিয়ে দিল। শি টোটালি বার্নড মি।”
জোসেফ আহেমদ হেসে বললেন,
“বাদ দাও জিহাম। হোয়াইটচ্যাপেল কবে যাচ্ছ?”
“পরশু।”
পরস্পরের কথা বিনিময়ের সমাপ্তি ঘটলো। যে যার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়ল। জিনান আদহাম ওরফে জিহাম অভ্রের পিতা জোসেফ আহমেদ যিনি লন্ডনের একজন বাসিন্দা। জন্মসূত্রে তিনি মুসলিম হলেও পরবর্তীতে খ্রিস্ট ধর্ম অনুসরণ করা শুরু করেছিলেন। পরবর্তীতে জিনানের মা অবন্তী হাসানের সাথে পরিচয় হওয়ার পর নিজ উদ্যোগে বিয়ের প্রস্তাব দেন। অবন্তী হাসান পড়াশোনার উদ্দেশ্যে Uk এসেছিলেন। জোসেফ আহমেদের সেই প্রস্তাব তিনি নাকচ করে দিয়েছিলেন। বিধর্মী কারো সাথে বিয়ে ইসলাম ধর্মে জায়েজ নেই বলে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছিলেন তিনি। জোসেফ আহমেদ ভীষণ কষ্ট পেয়েছিলেন। এরপর আবার নিজ ধর্ম ইসলামে ফিরে যেতে তৎপর হয়ে ওঠেন তিনি। ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করে তবেই অবন্তী হাসানের সামনে দাঁড়ান। অবন্তী হাসান আর ফিরিয়ে দেননি। মা, বাবা ও একমাত্র ভাইয়ের সাথে আলাপ করে এই বিয়েতে রাজি হয়েছিলেন। অবন্তী হাসানের সাথে বিয়ের পর জোসেফ আহমেদের পিতা, মাতা মারাত্মক খুশি হয়েছিলেন। পুত্রকে ধর্মান্তরিত হতে দেখে যতটা না কষ্ট পেয়েছিলেন আবার মুসলিম হওয়াতে এর থেকে দ্বিগুন খুশি হয়েছিলেন। অবন্তী হাসানকে তারা এজন্য বেশ আদর করতেন।
অবন্তী হাসান মারা যাওয়ার পর জিনান বাংলাদেশে আসে। নানা, নানির আবদারে এখানেই মায়ের পরিবারের সাথে থাকা শুরু করে বিশ বছর বয়সী জিহাম অভ্র। পুত্রের সাথে জোসেফ আহমেদও এসেছিলেন তবে তিনি বাংলাদেশে থাকেননি বেশিদিন। পুত্রকে জোরও করেননি তার সাথে লন্ডন যাওয়ার জন্য। জিনান বাংলাদেশে স্থায়ী হতেই চেয়েছিল তবে সাইফারকে সাহায্য করার জন্য নেওয়াজ শাবীর, মার্ভ জেন, রুবানা আজমেরী এবং তাকে সাসপেন্ড করে দেয়া হয়। এছাড়াও সরকারী হুমকি ধমকি তো ছিলই। নিজেদের জীবন নিয়ে তাদের পরোয়া না থাকলেও পরিবারের কথা চিন্তা করে সকলেই লন্ডনে চলে আসার সিদ্ধান্ত নেয়।
__
ইমতিয়াজ ভুঁইয়া, উর্মি ভুঁইয়া আর উজান ভুঁইয়া বসে বিভিন্ন বিষয় নিয়ে আলাপ করছিলেন। তারা পুরো পরিবারসহ লন্ডনে চলে এসেছে। এখানে তাদের বাড়ি কেনা ছিল। এই যে পাঁচতলা বিশিষ্ট বাড়িটি রাস্তার পশ্চিমাংশে দাঁড়িয়ে আছে তার পুরোটাই তাদের কেনা। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ব্যবসায়িক লেনদেনের জন্য আগে থেকেই লন্ডনে বাড়ি কিনে রেখছিলেন। উজান ভুঁইয়া চাননি এখানে থাকতে। কিন্তু ইমতিয়াজ ভুঁইয়ার জোরাজুরিতে পরে আর আপত্তি ওঠাননি। এই বাড়ির চার তলায় উজান ভুঁইয়ার পুরো পরিবার থাকেন আর পাঁচ তলায় ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ও তার পরিবার থাকেন। তাদের সামনের বাড়ির তিন ও চার তলায় যথাক্রমে নাসির উদ্দিন ও মাহাবুব আলমের পরিবার ভাড়া থাকেন। তাদেরকে নিজ বাড়িতে থাকার অফার করেছিলেন ইমতিয়াজ ভুঁইয়া কিন্তু উভয়ই একযোগে না করে দিয়েছেন।
উজান ভুঁইয়া চেয়েছিলেন একটা নিরিবিলি পরিবেশে স্ত্রী, সন্তান নিয়ে বসবাস করতে। সেদিন সাইফারের মুখে তাহমিদের পরিচয় শুনে ভীষণ শক পেয়েছিলেন তিনি। বড় ভাইয়ের দেয়া এই প্রতারণা ও আঘাত তিনি কিছুতেই ভুলতে পারেননি। এতগুলো বছর যে সন্তানের জন্য হাহাকার, স্ত্রীর কষ্ট দেখে চলেছিলেন হুট করে যদি শোনেন সেই সন্তান বেঁচে আছে তাহলে কেমন রিয়েকশন দেয়া উচিৎ তিনি জানেন না। সম্পত্তির জন্য নিজের ভাইয়ের সঙ্গে এমন জঘন্য প্রতারণা কে করতে পারে? নিজ সন্তানকে চোখের সামনে দেখে হুহু করে কেঁদে উঠছিলেন। সাইফার যখন তাহমিদকে জেল থেকে ছাড়িয়ে আনতে সাহায্য করেছিল সেদিন থেকেই তার প্রতি কৃতজ্ঞতায় উজান ভুঁইয়ার চোখ ভরে উঠেছিল। তাই সাইফারের বিপদে তার পরিবারকে সাথে নিয়েই দেশ ত্যাগ করেছিলেন তারা। এখন অবশ্য সাইফারের পরিবার আলাদা থাকে। কিন্তু লন্ডনে আসার পরে হিমশিম যেন খেতে না হয় তার জন্য ইমতিয়াজ ভুঁইয়া ও উজান ভুঁইয়া তাদের থাকার ব্যবস্থা থেকে শুরু করে সবধরনের সুযোগ সুবিধা দিয়ে সাহায্য করেছিলেন।
কলিং বেলের আওয়াজ হতেই উর্মি ভুঁইয়া ডেকে বললেন,
“নাবা দেখো তো কে এসেছে?”
ইনাবা শুয়ে ছিল। মায়ের কথায় ওড়না মাথায় পেঁচিয়ে দরজা খুলে দিতেই দৃশ্যমান হলো একজোড়া পুরুষালি পায়ের। ইনাবা মুখ তুলে সামনে চাইতেই তাহমিদকে নজরে এল। সে মুখ কঠোর করে ভেতরে চলে গেল। তাহমিদ ভেতরে এসে গলা খাঁকারি দিয়ে বলল,
“বাবা?”
উজান ভুঁইয়ার দিল ঠান্ডা হয়। এই ডাক শোনার জন্য কতগুলো বছর অপেক্ষা করেছিল সে। তাহমিদ প্রথম প্রথম তাদের মেনে নিতে পারছিল না। ছোটবেলার ট্রমা, জা*রজ সন্তান এসব তার উপরে ভীষণ বাজে প্রভাব ফেলেছিল। তাই হুট করেই আসল পিতা, মাতার সান্নিধ্যে এলেও নিজেকে মানিয়ে নিতে পারেনি। পরে অবশ্য আস্তে ধীরে মানিয়ে নিয়েছে পরিবারের সাথে। উজান ভুঁইয়া ছেলের দিকে চেয়ে বলল,
“বলো বাবা।”
“মা বলল সুপারমার্কেটে যেতে হবে নাকি?”
“ও হ্যাঁ, আমি তো ভুলেই গেছি। উর্মি এখন যাই রাতে আসবো।”
“আচ্ছা এসো। কিন্তু এখন কিছু খেয়ে তারপর যাবে।”
“এখন সময় নেই রে, আরেকদিন।”
“কোনো কথা শুনছি না। বসো তো তুমি। নাবা টেবিলে নাস্তা দাও তো।”
ইনাবা জানালো সে ব্যস্ত এখন পারবে না। উর্মি ভুঁইয়া নিজেই উঠে নাস্তা দিলেন। উজান ভুঁইয়া ও তাহমিদ সেন্ডউইচে কামড় দিল। উর্মি ভুঁইয়া চা নিয়ে এলেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে আবার আলোচনা শুরু করলেন। একটুপর ইনাবা তৈরি হয়ে বাইরে যেতে নিলে উর্মি বললেন,
“কোথায় যাচ্ছ?”
ইনাবা মায়ের দিকে না তাকিয়েই রুম থেকে বেরিয়ে যেতে যেতে বলল,
“আরশানকে দেখতে।”
উর্মি ভুঁইয়া ডেকে বললেন,
“শোনো, তাহমিদকে নিয়ে যাও। ও কয়েকদিন ধরে দেখতে চেয়েছিল।”
ইনাবা বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোমরা নিয়ে যাও। আর এমনিতেও সে ছোট বাচ্চা পছন্দ করেনা। দেখা যাবে ইনামকে কোলে দিতেই আছাড় দিল তখন?”
উর্মি ভুঁইয়া চোখ কঠিন করে বললেন,
“নাবা!”
ইনাবা আর কিছু বলল না। মায়ের কঠিন দৃষ্টি বলে দিচ্ছে আরেকটা কথা বললে তার খবর আছে। উজান ভুঁইয়া বললেন,
“থাক না। আমরা নাহয় পরে দেখে আসব। ও এখন যাক।”
তাহমিদও সায় জানিয়ে বলল,
“আমি পরে দেখে আসব। এখন প্রয়োজন নেই আন্টি। তুমি যাও।”
ইনাবা দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“আপনি আমাকে তুমি বলেন কেন? আপনি বলতে পারেন না? তুমি বলা কেমন ম্যানারস? অবশ্য আপনার মধ্যে ম্যানারস আছে বলে মনে হয়না।”
উর্মি উঠে এসে মেয়ের গালে সজোরে চড় মেরে দিলেন। আরেকটা চড় দিতে উদ্যত হতেই তাহমিদ এসে থামিয়ে দিল। ইনাবা ছলছল চোখে মায়ের দিকে চেয়ে আছে। উজান ভুঁইয়া বললেন,
“এতবড় মেয়ের গায়ে হাত দিলি?”
উর্মি কঠিন চোখে ইনাবার দিকে চেয়ে বলল,
“বেয়াদব কোথাকার। কার সাথে কিভাবে কথা বলতে হয় সেটাও শেখোনি? ও তোমাকে আপনি বলবে কেন? তাহমিদ তোমার ছোট? ও তোমার কত বড় ধারণা আছে? বেশি আদরে একদম মাথায় উঠে নাচছো।”
ইনাবা জিদ দেখিয়ে বলল,
“হ্যাঁ এখন এই লোককে সবাই কোলে করে রাখো। আমার কোনো কথার গুরুত্বই তোমাদের কাছে নেই।”
বলেই কাঁদতে কাঁদতে বাসা থেকে বেরিয়ে গেল। তাহমিদও পিছু পিছু বেরিয়ে গেল। উর্মি ভুঁইয়া ধপ করে চেয়ারে বসলেন। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া বললেন,
“থাক রাগারাগি কোরো না তো। প্রেশার বেড়ে যাবে।”
ইনাবা চোখ মুছে গেট দিয়ে বেরোতে নিলেই তাহমিদ ডেকে উঠল। ইনাবা শক্ত গলায় বলল,
“আপনি আমার পিছু পিছু আসছেন কেন? মাইর খাইয়ে শান্তি হয়নি?”
তাহমিদ এগিয়ে এসে বলল,
“স্যরি, আমার জন্য তোমাকে মানে আপনাকে কথা শুনতে হলো। আপনি কি এখনো আমার উপরে আগের কাহিনীর জন্য রেগে আছেন?”
“না।”
“তাহলে?”
“আমি রেগে আছি আপনার সঙ্গে বাবা, মা আমার বিয়ে ঠিক করেছে সেজন্য।”
তাহমিদ একটু ধাক্কা খেল যেন। ঠোঁটে জোর করে হাসি ফুটিয়ে বলল,
“আপনি না চাইলে হবেনা বিয়ে।”
“আমার চাওয়া না চাওয়ায় এখানে কিছু হবেনা। তারা সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলছেন।”
“আচ্ছা, আমিই নাহয় মানা করে দেব।”
“সত্যি?”
তাহমিদ আশ্বস্ত করল ইনাবাকে। ইনাবা খুশি হয়ে বলল,
“ধন্যবাদ।”
“একটা প্রশ্ন করতে পারি?”
“জি করুন।”
“আপনার কোনো পছন্দ আছে?”
“আপাতত নেই।”
“আচ্ছা, আমি তাহলে যাই।”
“আরশানকে দেখতে যাবেন না?”
তাহমিদ একটু হেসে বলল,
“অন্য একদিন। আপনি যান।”
ইনাবা আর কথা না বাড়িয়ে করেই চলে গেল। তাহমিদ সেই গমনপথে চেয়ে রইল। ঠোঁটে ঝুলছে তাচ্ছিল্যের হাসি। হয়তবা নিজের অতীত ভেবেই সেই তাচ্ছিল্যতা।
_
“তোমরা এখানে?”
ইহাব মাথা ঘুরিয়ে দেখল ইনাবা দাঁড়িয়ে। মানহা ছেলেকে বুকের কাছে আগলে বসে রয়েছে। এবার একসপ্তাহের জন্য হাসপাতালে ভর্তি ছিল সে। ডাক্তার দেখিয়ে সবেই ফিরেছে। ছেলের চিন্তায় অস্থির অস্থির লাগছিল। শ্বাসকষ্ট ও তলপেটে ব্যথার কারণে মাসে একবার ডাক্তারের শরণাপন্ন হতে হয় মানহাকে। ইনাম হওয়ার সময় মাত্রাতিরিক্ত রক্তক্ষরণে মাঝে মাঝেই তলপেট ব্যথা করে তার। এজন্য ডাক্তারের পরামর্শ নিতে হয় তাকে। ডাক্তার বলেছে সবকিছু মেইনটেইন করে চলতে পারলে কয়েকদিনের মধ্যেই পুরোপুরি সুস্থ হয়ে যাবে সে। মানহা ডাক্তারের পরামর্শ অনুযায়ী এখন চলে। ইনাম মায়ের কোলে একদম মিশে গেছে। মায়ের মুখে হাত দিয়ে গালে গাল লাগিয়ে লালা লাগিয়ে দিল। তারপর বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে দিয়ে বলতে লাগল,
“বা বা বা বা।”
ইহাব ছেলেকে কোলে নিতেই সে শান্ত হয়ে বাবার কোলে পড়ে রইল। ইহাব নিজের অংশকে চটকে চটকে আদর করল। গালে গাল লাগিয়ে নাকে নাক ঘষলো। ইনাম বাবার আদরে ফিচফিচ করে হাসল। ইহাব ছেলেকে হাতের তালুতে নিয়ে পেটে নাক চেপে আদর করতে লাগল। ইনাবা ভাইয়ের পাশে বসল। ইনামকে দেখে হাত বাড়িয়ে দিতেই ইনাম ফোকলা দাঁতে হাসল। ইনাবা ভাইস্তাকে জোর করে নিল। ইনাম কতক্ষণ মোচড়ামুচড়ি করে ফুপির ঘাড়ে মাথা ফেলে রাখল। নাহওয়ান এক গ্লাস পানি এনে মানহাকে দিল। মানহা হেসে পানি নিয়ে বলল,
“আমার আব্বাটা ফুপির জন্য পানি এনেছে?”
নাহওয়ান মুখ টিপে হাসল। ইহাব বলল,
“এই রসগোল্লা আমার পানি কই?”
নাহওয়ান বলল,
“জগে।”
ইহাব পায়ের উপর পা উঠিয়ে আদেশ করার ভঙ্গিতে বলল,
“নিয়ে আসো যাও।”
নাহওয়ান পানি এনে দিতেই ইহাব খপ করে তাকে ধরে বলল,
“পালাচ্ছিলে কই সমুন্দির বেটা।”
নাহওয়ান ইনোসেন্ট হেসে বলল,
“কোথাও না।”
ইহাব নাহওয়ানকে দুই ঠ্যাংয়ের মধ্যে আটকে পানি খেয়ে গ্লাসটা সামনের টেবিলে রাখল। তারপর বলল,
“দাঁড়াও কয়টা চুমু খাই।”
নাহওয়ান আতঙ্কিত গলায় ইনামকে দেখিয়ে বলল,
“ভাইকে খাও, আমি না।”
“কি তুই না? দেখি মুখ থেকে হাত সরা। বিসমিল্লাহ বলে চুম্বন শুরু করি।”
নাহওয়ান ইহাবের কাছ থেকে প্রাণপণে ছাড়া পেতে চাইল। মানহার দিকে চেয়ে ছলছল চোখে বলল,
“ফুপ্পি, চুমু ফুপা খালি চুমায়।”
ইহাব নাহওয়ানের মাথার চুল এলোমেলো করতে করতে বলল,
“আমার নাম চুমু ফুপা,
এখন দেব উম্মা উম্মা।”
মানহা বলল,
“আপনার কি খেয়ে দেয়ে কাজ নেই?”
“আছে।”
“তো সেটা করুন বাচ্চাটাকে জ্বালাচ্ছেন কেন?”
“সেটাই তো করছি। তোমার লাগবে নাকি?”
মানহা ইহাবের সাথে আর কথা বলল না। এমন বদমাইশ লোক সে জীবনেও দেখেনি। ইনাবা এখানে নেই। সে ভাইস্তাকে কোলে নিয়েই নিশাতের সাথে দেখা করতে গেছে। ইহাব বিসমিল্লাহ বলতেই নাহওয়ান চেঁচিয়ে বলল,
“ওরে বাবা।”
চলবে….
(আসসালামু আলাইকুম।)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭৩
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৩+৪৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪১+৪২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৯+৪০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৯+৩০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৩+৩৪