ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৭১
তাজরীন ফাতিহা
‘যার হারায় সেই বোঝে’ প্রবাদটা নিশাতের সাথে পুরোপুরি যায়। ইরা তার মাথার তালুতে পানি দিয়ে ম্যাসাজ করছে। ইনাবা হাত ডলে দিচ্ছে। নিশাত উদ্ভ্রান্তের মতো নাসির উদ্দিকে ফোন দিয়ে মারওয়ানের কথা জানিয়েছে। তিনি শুনে তৎক্ষণাৎ রওনা দিয়েছেন। নিশাতের মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হচ্ছে না। সে একেবারে ঠান্ডা হয়ে জমে আছে মনে হয়। হুট করে উঠে ওযু করে জায়নামাজে দাঁড়িয়ে এমনভাবে কান্না শুরু করল যেন কোনো জিনিস হারিয়ে গেলে বাচ্চা যেভাবে কান্না করে সেভাবে। কান্নার তোরে সূরা পড়তে পারছে না সে। নামাজ শেষে সিজদায় গিয়ে হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“ও আমার আল্লাহ আপনি আমাকে স্বামীহারা করবেন না, আমার সন্তানকে পিতৃত্ব থেকে বঞ্চিত করবেন না। আমার সন্তানের পিতাকে সহিসালামতে ফিরিয়ে দিন। আল্লাহ গো, ঐ মানুষটা এখনো সঠিক দ্বীনের বুঝ পায়নি। তাকে আপনি অবাধ্য বান্দা হিসেবে মৃত্যু দিয়েন না। আমি যে তার সাথে জান্নাতেও থাকতে চাই মাবুদ। আপনি কি আপনার অবাধ্য বান্দাকে জান্নাতে নেন? নিলে আমি আপনার কাছে তাকে চাইব না। কিন্তু যদি না নেন, মাবুদ আপনার তাকে ফিরিয়ে দিতেই হবে। আপনার ফিরিয়ে দেয়ার ক্ষমতা আছে সমগ্র সৃষ্টিকুলের বাদশাহ।
আমি সেই আল্লাহর কাছে আমার স্বামীকে ভিক্ষা চাইছি, যেই আল্লাহ ইব্রাহিম নবীর জ্বলন্ত আগুনকে শীতল করে দিয়েছিল, মুসা নবীকে অথৈ পানির ভেতরে রাস্তা করে দিয়েছিল, ইউনূস নবীকে মাছের পেট থেকে রক্ষা করেছিল, আইয়ুব নবীকে দীর্ঘ আঠারো বছর পর আরোগ্য দান করেছিল, মা সারাকে (ইব্রাহিম আঃ এর প্রথম স্ত্রী) নব্বই বছর বয়সে পুত্র সন্তানের সুসংবাদ দিয়েছিল, ইসমাইল (আঃ) কে কুরবানী হওয়া থেকে রক্ষা করেছিল। সবশেষে আমি বিশ্বব্রহ্মাণ্ডের প্রতিপালক ও সৃষ্টিকর্তার কাছে আর্জি জানালাম আমার স্বামীকে রক্ষা করার। আমি জানি, আমার আল্লাহ আমাকে নিরাশ করবেন না, আমাকে ফিরিয়ে দেবেন না।”
কাঁদতে কাঁদতে হেঁচকি উঠে গেছে নিশাতের। ইরা, ইনাবা নিশাতের কান্না শুনে ছুটে এল। সিজদাতে নিশাতের কান্নাকাটি ও কথাগুলো শুনে তাদের চোখ বেয়ে পানি গড়ালো। দুজনের হঠাৎ মনে হলো এই পৃথিবীতে তারা আল্লাহকে ঠিকমতো ডাকতেই শেখেনি। একজন বান্দা তো এমনই হওয়া উচিত। যে সমস্ত বিপদ আপদ, হাসি, কান্নায় মহান আল্লাহকে স্মরণ করবে সবার আগে। মানুষের কাছে না চেয়ে স্রষ্টার কাছে চাইতে হবে। কারণ মানুষের সৃষ্টিকর্তা তিনি। তিনিই পারেন সমস্ত বিপদ থেকে মানুষকে রক্ষা করতে। তিনিই পারেন তার এক সৃষ্টির অনিষ্টতা থেকে আরেক সৃষ্টিকে রক্ষা করতে।
_
মাহাবুব আলম মারওয়ানের খবর শুনে ছেলে আর বউকে রেখে রওনা হয়েছেন। তার বুকটা কাঁপছে ভীষণরকম। তার দুই সন্তান আজ বিপদে। মায়মুনা বেগম, মাহদী কাউকেই মারওয়ানের সংবাদ দেইনি সে। একটা জরুরী কাজের কথা বলে এসেছে। সে এত বছরে একবারও ভাঙেনি কিন্তু আজ কিছুতেই নিজেকে শক্ত রাখতে পারছেন না। নাসির উদ্দিন ফোন দিয়ে খবরটা জানিয়েছিলেন নয়তো নিশাত তাকে এই খবর দিতো না। মেয়েটা নিশ্চয়ই ভেঙে পড়েছে। নানা চিন্তায় তিনি অস্থির হয়ে উঠেছেন।
বাসায় এসে নিশাতকে ফ্লোরে শুয়ে থাকতে দেখে মাহাবুব আলমের বুক কেঁপে উঠল। অস্থির হয়ে বললেন,
“কি হয়েছে?”
ইনাবা ঘাড় ঘুরিয়ে চাইতেই ইরা দরজা বন্ধ করে এসে নিশাতকে দেখিয়ে বলল,
“বলল ওনার শ্বশুর।”
ইনাবা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“আমি চিনি।”
মানহার ননদকে দেখতে পেতেই মাহাবুব আলম বললেন,
“তুমি? তোমাকে নাকি হোস্টেল থেকে এত রাতে ছাড়বে না তাহলে এখানে কিভাবে?”
ইনাবা কিছু লুকোচুরি না করে বলল,
“আংকেল আমি একজন সিক্রেট এজেন্ট।”
ইরাকে দেখিয়ে বলল,
“সেও?”
ইনাবা মাথা নাড়িয়ে বলল,
“না, সে একজন গোয়েন্দার ওয়াইফ।”
মাহাবুব আলম আর কিছুই জিজ্ঞেস করলেন না। নিশাতের কাছে এগিয়ে গিয়ে ফ্লোরে বসলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিতেই নিশাত ঝরঝর করে আবার কেঁদে দিল। মাহাবুব আলম নিজেও আর শক্ত থাকতে পারলেন না। সারাদিনের এত এত চাপ, কষ্টে চোখের পানি ছেড়ে দিয়ে বললেন,
“আমাকে বলিসনি কেন?”
ভাঙা গলায় জবাব এল,
“আপনাকে আর কত প্রেশার দেব আব্বা? এমনিতেই মানহা, ওর হাজব্যান্ড সবার জন্য চিন্তায় শেষ। আবার আরেকটা টেনশন কি করে দেই আপনাকে?”
মাহাবুব আলম কাঁদতে কাঁদতে বললেন,
“আমার সব সন্তান আজ বিপদে। কাকে ছেড়ে কার কাছে যাই বল তো? আল্লাহ আমাকে কি পরীক্ষায় ফেলেছেন? আমি কিভাবে আমার সন্তানদের বিপদ চোখের সামনে দেখি বল।”
নিশাত নিজেকে শক্ত করে বলল,
“কাঁদবেন না আব্বা। কার জন্য কাঁদবেন? ঐ পাষাণের জন্য? যে বাবা, মা, ভাই, স্ত্রী, সন্তান কাউকে নিয়ে ভাবে না তাকে নিয়ে? সবসময় যেটা মনে চেয়েছে সেটাই করেছে। আগে কাজ করতো না বাপের টাকায় চলতো এখন কাজ করে নিজের জান দিয়ে। শান্তি কখনো দিয়েছে আমাদের? কখনো কি আমাদের জন্য ভেবেছে?”
মাহাবুব আলম এপর্যায়ে আরও জোরে কেঁদে উঠে বললেন,
“এই কথা বলিস নারে মা। আল্লাহ নারাজ হবেন। ও আমার টাকায় কোনোদিনও চলতো না। এই সংসারে খরচ হওয়া এক টাকাও আমার ছিল না। সব ছিল তার নিজের জমানো সম্বল। নিজের হাতে পরিশ্রম করে ইনকাম করা টাকা।”
নিশাত হতবাক হয়ে মাহাবুব আলমের দিকে তাকালো। মুখের শব্দ হারিয়ে গেছে তার। মাহাবুব আলম চোখের পানি ফেলতে ফেলতে বললেন,
“ছোটবেলা থেকেই ও ছিল অন্যরকম স্বভাবের। মানুষ যা করবে সে ঐ কাজটা করবে না। ঘুরিয়ে পেঁচিয়ে অন্যভাবে করবে। ও সবসময় নিজস্ব থিওরিতে চলতো। যেদিন প্রথম আমাকে ওর শিক্ষক দ্বারা অপমানিত হতে হয় সেদিনই ওর ভেতরের আগুন আমি দেখেছিলাম। অন্যান্য মানুষ যেখানে এই বয়সে হাত খরচার জন্য টিউশনি করাতো সেখানে সে বেছে নিয়েছিল ব্যবসাকে। এইযে আমার চালের আড়ৎ দেখিস না? এটাও কিন্তু আজাদের হাতের গড়া। একজন শিক্ষকের ছেলে হয়ে ওর এসব পাগলামো কর্মকাণ্ডে সকলে বিরক্ত হতো। ঐসময় নিজের উদ্যোগে আমাদের জমি থেকে ধান ভেঙে চালের ব্যবসা শুরু করে। সেই ব্যবসা রমরমা চলছিল। এরপর যখন পড়াশোনায় ব্যস্ত হয়ে গেল আমার হাতে সেসব ন্যস্ত করে সে আবার অন্য কাজ ধরল। যেমন ইলেকট্রিক দোকানে পার্টটাইম মেকানিকের কাজ করতো। ওর নাকি এসব কাজ ভালো লাগতো। এভাবে যত ইনকাম ও করেছে ছোটবেলা থেকে সব আমার কাছে জমা রেখেছে।”
নাসির উদ্দিন একটু থেমে আবার বলতে শুরু করলেন,
“গোয়েন্দা হওয়ার পর যে কয় টাকা ইনকাম করতো সব আমার কাছে পাঠিয়ে দিতো। কিছু টাকা নিজের খরচার জন্য রেখে সব আমাদের দিয়ে দিতো। আমার কাছে আজাদের অনেক টাকা জমা আছে। সেসবের হিসেব কষতে বসলে আমি হিসেব করে উঠতে পারব না। সবসময় গর্ব করে বলিস না, আমার শ্বশুরের টাকায় সংসার চলেছে। পুরোটাই মিথ্যা। বর্তমানে তোর শ্বশুরের ইনকামের পথ তোর স্বামীর হাতে গড়া, তোদের সংসারের সমস্ত খরচের টাকা তোর স্বামীর কষ্টের উপার্জনের। আমার নয়। আজাদ নিষেধ করেছিল এসব তোকে বলতে। ওর যখন চাকরি ছিল না প্রচুর হীনমন্যতায় ভুগতো। ফোন দেয়া বন্ধ করে দিয়েছিল আমাদের। মাঝে মধ্যে আমাকে ফোন দিয়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলত। ছেলের এই চাপা কষ্ট আমাকে ঘুমাতে দিতো না। তাই স্বামীকে কখনো ছোট করবি না। ও আসলে তোদের কখনো বোঝাতে পারেনা যে, তোদের জন্য ওর চিন্তা হয়। আসলে আমার আজাদটা এমনই। ত্যাড়া প্রকৃতির। ওকে সবাই সবসময় ভুল বোঝে। তুই অন্তত ওর প্রতি রাগ রাখিস না মা।”
নিশাত আর নিজেকে সামলাতে পারল না। কি অমানসিক কষ্ট যে তার হচ্ছে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে বোঝানো সম্ভব না। মারওয়ান আজাদ কিছু করুক আর না করুক। তার কাছে ঐ লোকটা সবসময়ই শান্তির। মুখে যত যাই বলুক ঐ লোকটাকে ছাড়া থাকতে পারবে না। সে হুড়মুড় করে উঠে নিজের রুমে গেল। নাহওয়ান বিছানায় গভীর ঘুমে মগ্ন। নিশাত পাগলের মতো কি যেন খুঁজতে লাগল। আলমারি খুলে তন্ন তন্ন করে খুঁজে সেই কাঙ্ক্ষিত ডায়েরিটা পেল। যেটায় প্রায়ই মারওয়ানকে কিছু লিখতে দেখতো সে। সে ডায়েরি উল্টাতেই প্রথম পৃষ্ঠায় দেখল মারওয়ানের লেখা,
“ডায়েরি লেখার ফায়দা কি আসলে? ইহাবটা হাতে ডায়েরি ধরিয়ে বলল, মন খারাপ হলে যেন ডায়েরি লিখি। কিন্তু আমার তো কখনো মন খারাপ হয়না। মন খারাপ আসলে কি? নিজের মনের মতো কিছু না হলেই যে খারাপটা লাগে সেটাকেই কি মন খারাপ বলে? তাহলে আমার মন খারাপের লিস্ট অনেক বড়। জীবনে আমার মনের মতো কিছুই হয়নি। মন যেটা চেয়েছে সেটার সবসময় উল্টো হতো। এজন্য আমি মনের অনুসারী নই, মস্কিস্কের অনুসারী। আমার মস্তিষ্ক যেটা বলে সেটাই আমি করি। মনের ধার আমি ধারি না। একে পাত্তা দেয়ার কোনো মানে নেই। ইউজলেস জিনিস।”
— আজাদ
নিশাত আজাদ নামের উপরে বড় দরদ নিয়ে হাত বোলালো। তার বুক ভেঙে কান্না আসছে। পরের পৃষ্ঠাগুলোতে কিছুই নেই। অনেকগুলো পৃষ্ঠার পর আবার লেখা পেল।
ফৌজিয়া নিশাত (লিলিপুট):
“ইনি আমার স্ত্রী। সাইজ লিলিপুটের মতো। বছর চার পাঁচ আগে তার সঙ্গে আমি বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হই। হুট করেই বিয়ে। বাবা, চাচারা বগলদাবা করে বিয়ের পিঁড়িতে বসিয়ে দিলেন। আমার আর না করার উপায় আছে? বাসর রাতে দেখি ছোটখাটো সাইজের একটা মেয়ে বসে আছে। ভেবেছিলাম ফাইভে পড়ে বোধহয়। মুহূর্তেই মেজাজ গিয়েছিল চড়াও হয়ে। বাপ, চাচারা আমাকে এইটুকু মেয়ে ধরিয়ে দিয়েছে? পরে অবশ্য জেনেছি সে অনার্স দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী। গায়ের রঙ আমার চেয়ে অনুজ্জ্বল। দেখতে ভীষণ মায়াবী। ছোটখাটো বলেছিলাম বলে নিজেকে নিজেই বেঁটে বলেছিল ছিল উত্তরটা আমার মোটেও পছন্দ হয়নি। এখন লিলিপুট ডেকে সেটার শোধ নেই। আরও বলবে নিজেকে বেঁটে? কেমন লাগে লিলিপুট শুনতে? কালো, বেঁটে এসব আমার কাছে ফ্যাক্ট নয়। আল্লাহর সৃষ্টি সবাই সুন্দর।
কি অদ্ভুত! ছয় বছর আগেও জানতাম না সে আমার অর্ধাঙ্গিনী হবে। অর্ধাঙ্গিনী মানে অর্ধেক অঙ্গ। কিন্তু এই লজিক লিলিপুট আর আমার ক্ষেত্রে খাটে না। আমার দেহাঙ্গ লম্বা আর তারটা খাটো। প্রশ্ন হলো দুজনের অঙ্গ মিক্সড হবে কি করে? তাহলে কি আমার একপাশের অঙ্গ লম্বা আরেকপাশের খাটো? ধুত্তুরি লজিকের গুষ্ঠি কিলাই!!
নিশাত এইটুকু পড়ে ঠোঁট প্রসারিত করল। আবার পড়া শুরু করল,
তাকে যদি জিজ্ঞেস করা হয় মারওয়ান আজাদ সম্পর্কে বলো? আমি শিওর সে একবাক্যে বলবে, আমি তাকে এখনো চিনতে পারিনি। ঘাউরা, ভাদাইম্মা, বিরিখোর বাদে তার যে একটা পরিচয় আছে সেটাই আমি ভাবতে পারিনা। যাইহোক, এই নারীর ধৈর্য মাশাআল্লাহ্! আমার মতো চিজের সংসার যে করতে পেরেছে, করছে সে সাধারণ কেউ না। প্রায় রাতেই ঘুম ভেঙে গেলে আমি সিগারেট খেতে উঠি আর এই ধৈর্যশীল মহীয়সী নারীকে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি। কিসের আশায় যে সে এই সংসার করে গেছে সেটা বিরাট এক প্রশ্ন।”
—- আজাদ
নিশাত ডায়েরিটা বুকে চেপে ধরলো। তার চোখের পানিতে পৃষ্ঠা ভিজে একাকার। আবার আরেক পৃষ্ঠা উল্টালো,
“আজকে সিগারেট খেয়ে মনের ভুলে তার গালে হাত বুলিয়ে দিয়েছিলাম। শুঁকে দেখি সিগারেটের গন্ধ আসছে। মুহূর্তেই জিহ্বায় কামড় দিয়ে ভেবেছি, লিলিপুট উঠে আজকে তুলকালাম কাণ্ড ঘটিয়ে ফেলবে। তক্তা টক্তাও বানিয়ে ফেলতে পারে। সিগারেটের ধোঁয়াই যে সহ্য করতে পারেনা সে নিজের গালে সেই ঘ্রাণ পেলে আমাকে কি আস্ত রাখবে? রেগে ফায়ার হয়ে যাবে। যদিও রাগলে তাকে সুন্দর দেখায়। আমার কাছে তার সবচেয়ে পছন্দের রূপ হলো রাগী রূপ। রেগে যখন চিল্লাচিল্লি করে দেখতে ভালোই লাগে তবে আজকে রাগানো যাবে না। বেশি রাগারাগি করলে মাথার তার ছিঁড়ে যেতে পারে, এমনিতেও অর্ধছিড়া। তাড়াহুড়ো করে গাল পানি দিয়ে ধুইয়ে দিয়েছি। কয়েকবার নড়েচড়ে উঠেছিল। তাই গামছা আর ছোঁয়াইনি। এখন উঠে না গেলেই হয়। পানি দেখলে আবার আরেক তেলেছমতি।”
—– আজাদ
নিশাত আবার ডুকরে কেঁদে দিল। লেখাগুলোর উপরে হাত ছোঁয়ালো। আবার দেখলো লেখা,
“ফৌজিয়া নিশাত অর্থ কি? ঘেঁটে টেটে দেখলাম ফৌজিয়া অর্থ বিজয়ী, সফল। আর নিশাত অর্থ আনন্দ, প্রাণচাঞ্চল্য। মেয়েটা আমার সংসার করে বিজয়ী হতে পেরেছে বলে মনে হয়না। কোনো আনন্দও পায়নি। দিনদিন চাঞ্চল্যও হারিয়ে ফেলছে। নাহ এটা ভারী অন্যায় হয়েছে। মেয়েটাকে একটু আনন্দ দেয়া উচিত।”
—- আজাদ
এইটুকু পড়ে নিশাত বুঝল কেন লোকটা তার সাথে মজা করতো, চুপচাপ হয়ে গিয়েছিল। তার কথায় সায় জানাতো, রাগারাগি, কঠোরতা কমিয়ে দিয়েছিল। নিশাতের মনে চাচ্ছে লোকটার বুকের মধ্যে লুকিয়ে যেতে। কিন্তু সেই এখন হারিয়ে গেছে। এতদিন চোখের সামনে দেখেও পাত্তা দিতো না আর এখন পাত্তা দেয়ার জন্য মনটা ছটফট করছে। কি এক নিয়তি! ডায়েরির মাঝখানের পৃষ্ঠায় কোনো লেখা নেই। শেষের দিকে লেখা,
ফাইয়াজ নাহওয়ান:
“ইনি আমার আন্ডা। শুদ্ধভাবে বললে আমার সন্তান। পটলের বাচ্চা, কবুতরের ছাও, পান্ডা। আমার ফাইয়াজ। ফাইয়াজ নামটা ওর মায়ের সঙ্গে মিলিয়ে রেখেছিলাম। ফৌজিয়া- ফাইয়াজ। বাবা চেয়েছিলেন আমার নামের সঙ্গে মিলিয়ে কোনো নাম রাখতে কিন্তু দীর্ঘ দশটা মাস যে সন্তানকে গর্ভে রাখলো, কষ্ট করলো সেই সন্তানের নাম আমার সাথে মিলিয়ে রাখাটা আমার পছন্দ হয়নি। তাই বাবার সাথে রাগারাগি করে ফাইয়াজ রাখি। এই নামে ডাকতেই আমি বেশি স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করি। ফাইয়াজকে ডাকলেই কেন যেন ফৌজিয়ার একটা ভাইব পাই।”
—– আজাদ
নিশাত ডায়েরি যত পড়ছে তত যেন মারওয়ানকে চিনতে পারছে। আগে যেটুকু চিনেছে, জেনেছে সবটুকুই যেন ভ্রম। মারওয়ান আজাদকে এত বছর সংসার করেও সে চিনতে পারেনি। ডায়েরি পড়ে মনে হচ্ছে, লোকটা তাকে অসম্ভব ভালোবাসে কিন্তু কোনোদিন প্রকাশ করেনি। হয়তবা তার প্রকাশের ধরনই এমন। সে কেন তা বুঝতে পারেনি। কোনোদিন কেন ফাইয়াজের নামের রহস্য উদঘাটন করেনি? টুকরো টুকরো লুকায়িত যত্ন গুলোর পরোয়া করেনি, হিসেবও করেনি? টপটপ করে গাল বেয়ে অশ্রু গড়াচ্ছে তার। মনে মনে বলল,
“আল্লাহ শুধু একবার ফিরিয়ে দাও।”
__
সারা দেশ তোলপাড়। উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া। ঘন্টা খানেক আগের অডিও রেকর্ড ও সাইফারের ছবি ছড়িয়ে পড়েছে পুরো মিডিয়াতে। ফেসবুক, ইনস্টাগ্রামে মুহূর্তের মাঝেই ছড়িয়ে পড়েছে সিক্রেট এজেন্ট আজারাক সাইফারের ছবি। সাইফারকে ফিরিয়ে দেয়ার দাবিতে ঝড় উঠে গেছে নেট পাড়ায়। সত্য পথে থাকলে কেন তাকে গুম? সাইফারকে সুস্থভাবে ফিরিয়ে না দিলে সরকারের জবাবদিহি করতে হবে এবং স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগ করতে হবে। এই শিরোনামে ফেসবুক এখন সরব হয়ে উঠেছে।
সকলে সাইফারকে সহিসালামতে ফিরিয়ে দেয়ার হ্যাশট্যাগ জারি করেছে। কয়েকদিন আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনৈতিকতা প্রকাশ পাওয়ায় এমনিতেই জনগণের বেশ ক্ষোভ ছিল। স্বৈরাচারের বিপক্ষে মুখ খুলতে গেলেই সবাইকে গুম করে ফেলা এ সরকারের অন্যতম বৈশিষ্ট্য। এজন্য অনেকে চিল্লাচিল্লি করলেও কেউ স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর পদত্যাগের দাবি জানাতে পারেনি। কিন্তু আজ কিছুতেই ছেড়ে দেবে না জনগণ। তাই যে নিজের জীবন ঝুঁকিতে রেখে সেই অনৈতিকতা প্রকাশ করেছে তাকে তুলে নিয়ে গিয়ে গুম করার প্রয়াসে প্রচণ্ড ক্ষিপ্ত জনতা।
যেই রেকর্ডটি এখন ভাইরাল হয়েছে সেটি মূলত নেওয়াজ শাবীরের ভয়েস ছিল। সে, জিনান আদহাম এবং মার্ভ জেন এটি করে দ্রুত পদক্ষেপ নিয়েছে। নাহলে সাইফারকে মেরে ফেলতে পারে। এখন সাইফারের ছবি এবং রেকর্ড প্রকাশ করায় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী কিছুটা হলেও দমবে। তাকে মেরে ফেলার স্পর্ধা করবে না। সাইফারকে মেরে ফেললে এখন ফেঁসে যাবে সে। সেই রেকর্ডটি হলো,
“আসসালামু আলাইকুম, আমি নিজের নাম, পরিচয় প্রকাশে অনিচ্ছুক। আজারাক সাইফার নামের একজন গোয়েন্দাকে কিছুক্ষণ আগে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর অনৈতিকতা প্রকাশ করার জন্য অফিস থেকে তুলে নিয়ে যাওয়া হয়েছে। স্ক্রিনে আপনারা তার ছবি দেখতে পাচ্ছেন। দয়া করে সবাই আওয়াজ ওঠান। আপনাদের প্রতিবাদেই আমরা একজন দেশপ্রেমিক গোয়েন্দা ভাইকে ফিরে পাবো।”
এরপর থেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় তুমুল পোস্টের পর পোস্টে সয়লাব হয়ে গেছে। আন্দোলনে নামার প্রস্তুতি নিয়ে সকলকে আহ্বান করেছে একদল। পুরো বাংলাদেশ আজ আবারও গরম হয়ে উঠেছে। ন্যায় ও সত্যের পক্ষে কোনোভাবেই ছাড় নয়। কিন্তু এতকিছু করেও স্বৈরাচার সরকার ও তার দোসরদের দমানো সম্ভব?
চলবে…..
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫৯ (৫৯.১+৫৯.২+৫৯.৩)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২৬+২৭
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৯,১০)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৩+৩৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ২২+২৩
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৫
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪১+৪২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১