ভবঘুরে_সমরাঙ্গন
পর্ব_৬৬
তাজরীন ফাতিহা
“শুনুন নাহওয়ানের মুসলমানি করাবেন কবে?”
মারওয়ান চিত হয়ে শুয়ে নাহওয়ানকে বুকের উপর নিয়ে ঠ্যাংয়ের উপর ঠ্যাং দোলাচ্ছিল। নিশাতের কথায় দুলুনি থামিয়ে বলল,
“যখন মনে চায় করাও। আমাকে জিজ্ঞেস করছ কেন?”
“তো কাকে জিজ্ঞেস করব?”
“আমি বাদে যাকে ইচ্ছে করো।”
“কেন?”
“কারণ মুসলমানি আমি করাবো না। যারা করাতে পারবে তাদেরকে বলো।”
“ইতরামি করবেন না। ছেলের বয়স কত হয়েছে খেয়াল আছে?”
“না।”
“তা খেয়াল থাকবে কেন? সারাক্ষণ বদ বুদ্ধি ঘুরলে বউ, বাচ্চার প্রতি খেয়াল থাকবে না এটাই স্বাভাবিক।”
মারওয়ান গম্ভীর স্বরে বলল,
“মহিলাদের মতো বেশি কথা বলবে না। আই ডোন্ট লাইক বেশি কথা। বয়স কত হয়েছে তাই বলো?”
“তিন বছর হয়ে গেছে।”
“সেকি! আমি তো এই আন্ডার সাইজ দেখে ভেবেছিলাম দুই বছরও হয়নি।”
“আপনি তো ভাববেনই। আমাকে মাথামোটা বলে অথচ নিজে যে মাথামোটা প্রো-ম্যাক্স সেটা বলেনা। বিয়ে, বউ, বাচ্চার কত বছর হলো এসব গুরুত্বপূর্ণ জিনিস গুলোই ভুলে বসে আছে।”
“তোমার বয়স জেনে আমার কী লাভ? আমি কি তোমার সাথে আবার নিকাহ বসব নাকি?”
“বয়স জানতে নিকাহ বসতে হবে কেন? বউয়ের বয়স তো এমনিতেই জানা উচিত।”
“স্যরি ব্রো আয়েম নট ইন্টারেস্টেড।”
“ব্রো? আচ্ছা আমার বয়স বাদ দিলাম বলুন তো আমাদের বিবাহের বয়স কত হলো?”
“ওটা তো সবার আগেই ভুলে যাওয়া উচিত। কখনো শুনেছ, কেউ কারো জ*বাই দিবস মনে রেখেছে?”
নিশাত হতবাক গলায় শুধাল,
“জ*বাই দিবস মানে?”
“জ*বাই দিবস মানে বোঝো না? ইট মিনস কতল হওয়া, খ্যাঁচ করে গলা কেটে ফেলা। কতক্ষণ তড়পিয়ে সোজা উপরে।”
নিশাত কটমটিয়ে বলল,
“আমি বললাম কি আর আপনি বলেন নি?”
“আমি আরও ডিটেইলসে বললাম তাও বোঝোনি?”
“তারমানে আপনি আমাদের বিবাহের দিনকে জ*বাই দিবস মিন করছেন ?”
“মিন করছি আবার কি? পানির মতো ফকফকা পরিষ্কার সত্য কথা বলছি। নো ডাউট আ’ম নট অ্যা টাউট।”
নিশাত রাগে চুপ হয়ে গেল। অভদ্রলোকটা আবার ছন্দ মিলাচ্ছে। মারওয়ান নিশাতের থেকে চোখ সরিয়ে নাহওয়ানের দিকে চেয়ে বলল,
“এই আন্ডা পান্ডা খৎনা করবি?”
নাহওয়ান ফিচ করে হেসে মাথা নাড়িয়ে বলল,
“কৎনা কব্বো। বিশি বিশি কব্বো।”
মারওয়ান মুখ মুচড়ে বলল,
“হাহ বেশি বেশি করবে! একবার করে দেখো বাছা, বুঝবে কত কাঁচিতে কত ছ্যাঁচা।”
নাহওয়ান গোলগোল চোখে চেয়ে বলল,
“চেচা কি?”
“ছ্যাঁচা বুঝিস না? আঘাত।”
“আগাত?”
“ধুরু, খালি প্রশ্ন করে। ওটা বাদ। বুঝবি কত ধানে কত চাল।”
নাহওয়ান ফিক করে হেসে বলল,
“চাল তেকে ভাতু হয়।”
“হ্যাঁ ঐ চালে ভাত, জর্দা, ফিরনি, পায়েস, বিরিয়ানি, পোলাও সব হবে।”
“মুজা মুজা হবে।”
মারওয়ান হাই তুলে বলল,
“অনেক।”
নাহওয়ান ফোকলা হেসে লাফাতে লাফাতে বলল,
“কৎনায় বিশি বিশি মুজা হবে।
মারওয়ান শুয়ে থেকেই জবাব দিল,
“লাফাস না বেশি। করলে পর চেগাইয়া থাকবি আর ভ্যাঁ ভ্যাঁ করবি।”
নাহওয়ান তাকিয়ে রইল বাবার দিকে। নিশাত বলল,
“আপনি ছেলেকে এসব কি বলছেন?”
“বাস্তবতা বলছি।”
“আপনাকে বলতে বলেছে কেউ?”
“আমি বলছি। তুমি নাক গলাচ্ছ কেন? ছেলেদের কষ্ট তোমরা বুঝবে না। খালি তো পারো চিল্লাতে।”
“আচ্ছা? ছেলেদের খুব কষ্ট? বাচ্চা কখনো পেটে নিয়েছেন? কষ্ট কাকে বলে জানেন?”
“শুরু হয়ে গেছে।”
নিশাত ভ্রু কুঁচকে বলল,
“কী?”
“ফিলোসফি।”
“হ্যাঁ আপনারটা বাস্তবতা আর আমারটা ফিলোসফি? বেডা মানুষ নিজেরটুকু খুব ভালো বোঝে।”
মারওয়ান বিরক্ত হয়ে বলল,
“একবার বলেছি না মহিলা মানুষের মতো বেশি কথা বলবে না। না বুঝে হুদাই চিল্লাবা না। ফিলোসফি অর্থ জানো? এটার অর্থ দর্শন। ইট মিনস যুক্তিভিত্তিক অনুসন্ধান করা, জীবন নিয়ে চিন্তাভাবনা করা। তোমার কথাটা জীবনভিত্তিক এজন্যই ফিলোসফি বলেছি। বুঝেছ মূর্খ নারী?”
নিশাত রাগে কথা বলতে ভুলে গেল। মারওয়ানের দিকে শক্ত চোখে চেয়ে বলল,
“হ্যাঁ এই পৃথিবীর সবচেয়ে জ্ঞানী পুরুষ আপনি। আপনার সাথে তর্ক করা আমার মোটেও উচিত হয়নি।”
“বোঝার জন্য ধন্যবাদ।”
“আপনি কি কোনোদিন ভালো হবেন না?”
“না। কজ খারাপরা খারাপ থেকে ভালো হয়, ভালোরা কখনো ভালো হয়না। আমি অলরেডি ভালো। আর কত ভালো হবো?”
নিশাত একটা নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“আপনার সাথে অহেতুক তর্ক করতে চাচ্ছি না। মুসলমানি কবে করাবেন তাই বলুন।”
মারওয়ান হঠাৎ সিরিয়াস হয়ে বলল,
“আজকেই করিয়ে ফেলি। আমাকে ছুরি, কেঁচি, ব্লেড সব এনে দাও। আল্লাহু আকবার বলে ঘ্যাচ করে একটা পোচ মেরে দেই।”
নিশাত আঁতকে উঠে বলল,
“সেকি! আজকেই কেন? আর আপনাকে দিয়ে আমার কোনো ভরসা নেই। আমার মাসুম ছানাটাকে কষ্ট দেবেন উল্টো।”
“কষ্ট না উল্টো আরাম দেব। বুঝতেও পারবে না কি থেকে কি ঘটেছে। এক পোচে গুরত্বপূর্ণ জিনিস কতল, কেচ্ছা খতম।”
নিশাত হতাশ হয়ে বলল,
“এই লোকের সাথে এতক্ষণ বেগার এতগুলো কথা বললাম। পুরোই সময় নষ্ট।”
_
উর্মি ভুঁইয়া অনেকদিন পর বাগানে হাঁটতে এসেছেন। তার নিজের হাতে লাগলো গাছগুলো ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখছেন। সে একদৃষ্টিতে সামনে তাকিয়ে তার জীবনের কথা ভেবে চলেছেন। আচ্ছা, সে সুস্থ স্বাভাবিক হলে খুব বেশি ক্ষতি হতো? এত রোগে আক্রান্ত হলো কেন? উর্মি ভুঁইয়া বুঝতে পারে, অনেক কিছুই সে ভুলে যায়। মনে রাখতে পারেনা। কেমন যেন জটিল একটা পর্যায়ে সে দাঁড়িয়ে আছে। চারদিকে শুধু অন্ধকার আর অন্ধকার। সেই অন্ধকারে কোনো আলোর উৎস নেই। তাকে কেউ পছন্দ করেনা এটা সে বোঝে। সকলে তাকে করুণা করে। তার বুক থেকে একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।
নিয়তি তুমি পাষাণ বড়,
কোথা থেকে কোথায় নিচ্ছ বলো?
বিধাতা আমায় করেছে শ্রান্ত,
নিজেকে হারিয়ে হয়েছি বিভ্রান্ত।
~ তাজরীন ফাতিহা
পিছন থেকে কেউ ডাকল,
“আম্মু?”
উর্মি ভুঁইয়ার ভাবনায় ছেদ ঘটলো। পিছু ফিরে দেখল মানহা দুইটা কাঁচের বোয়াম নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি একটু অবাক হলেন। ইনাবা সেদিন ফোন দিয়ে বলেছিল, অসুস্থ অবস্থায় মানহার সাথে নাকি জঘন্য ব্যবহার সে করেছিল। অথচ এসবের কিছুই তার মনে নেই। এই মেয়েটাকে সে মারাত্মক পছন্দ করে। তার শাশুড়ি তাকে অপছন্দ করতো বিধায় এই মেয়েটাকে নিজের মেয়ের মতো আগলে রাখতে চেয়েছিল অথচ সে নাকি খুব বাজে জঘন্য ব্যবহার করেছে মানহার সঙ্গে। উর্মি ভুঁইয়া বিশ্বাস করতে চান না। যাকে সে এত পছন্দ করে তার সাথে খারাপ ব্যবহার সে কেন করবে? একটা কারণ তো থাকতে হবে?
মানহা আবারও ডেকে উঠল,
“আম্মু?”
উর্মি ভুঁইয়া এগিয়ে এসে বললেন,
“বলো।”
“উনি আজকে ভাইয়ার বাসায় যাবেন তাই আমি চাচ্ছিলাম ভাবিকে এক বোয়াম আচার দেব। আপনি নাকি সার্ভেন্টদের আমার জন্য আচার তৈরি করতে নির্দেশ দিয়েছিলেন? সেখান থেকে আমি কি এক বোয়াম ভাবির জন্য পাঠাতে পারি?”
উর্মি ভুঁইয়ার মুখ গম্ভীর হয়ে গেল। মানহা বেশ ভয় পেল। শাশুড়িকে তার কেন যেন এখন খুব ভয় লাগে। প্রথম প্রথম লাগতো না। বেশ আগ্রহ নিয়েই মিশতো সে। এখন মনে হয় কিছু বললেই মারবে তাকে। যদিও সবাই বলেছে উর্মি ভুঁইয়া আগের মতোই হয়ে গেছেন তবুও মানহার বেশ ভয় লাগে। তার মুড কখন আবার পরিবর্তন হয়ে যায় বলা মুশকিল। মানহা তো এখনো তার স্বভাব চরিত্র সম্পর্কে অবগত নয় তাই ভয় লাগাটা অস্বাভাবিক নয়। কথাটা বলে সে ভুল করলো না তো? উর্মি ভুঁইয়া গম্ভীর মুখে বললেন,
“শুধু আচার দেবে?”
মানহা একটু থতমত খেয়ে বলল,
“জ.. জি।”
“প্রয়োজন নেই। এসময়ে অনেক আচার খেতে ইচ্ছে করে তাই তুমিই খাও।”
মানহা মুখ কালো করে ধীরে বলল,
“আচ্ছা।”
উর্মি ভুঁইয়া আবারও প্রকৃতি দেখায় মনোনিবেশ করলেন।
মানহা মন খারাপ করে রুমে ঢুকতেই দেখল ইহাব আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে শার্ট কনুই পর্যন্ত ভাঁজ করছে। মুখে কি যেন আওড়াচ্ছে। মানহার খুব খারাপ লাগছে। ভাবিকে কত আগ্রহ নিয়ে এই প্রথম কিছু পাঠাতে চাইলো অথচ..। ইহাব রেডি হতে হতে আয়নায় কয়েকবার মানহাকে দেখে নিল। পারফিউম স্প্রে করে হাতে ঘড়ি পড়তে পড়তে বলল,
“কি অবস্থা? আমার সন্তানের মায়ের মন খারাপ কেন? বকেছে কে?”
মানহা কিছু বলল না। ঘাড় ঘুরিয়ে বলল কেউ বকেনি। ইহাব পরিপাটি হয়ে এগিয়ে এসে মানহার পাশে বসে বলল,
“কে বকেছে? কে বকেছে?
আম্মু বকেছে?
আম্মুর মুখে বকা ছিল ছুঁড়ে মেরেছে,
উফ! মানহা মণির বড্ড লেগেছে।
মানহা মুখ ভার করে বলল,
“আম্মু বকেছে আপনাকে কে বলল?
“কেউ না, তবে এই বাড়িতে বর্তমানে আম্মু ছাড়া তো তোমাকে কেউ বকেনা তাই ধারনা করলাম মাত্র। ভুলও হতে পারে। ব্যাপার না। তবে যেই বকুক বকেছে তো নাকি?”
ইহাব মানহার পাশে বসতেই পারফিউমের ঘ্রাণে পুরো ঘর সুবাসে ভরে গেছে। মানহা নাক কুঁচকে বলল,
“আপনি আর এসব পারফিউম দেবেন না। কেমন গন্ধ আসছে। মাথা ঘুরাচ্ছে। সরুন।”
ইহাব নিজের শরীর শুঁকে বলল,
“কই গন্ধ? মাত্র শাওয়ার নিয়ে বেরোলাম। আলমারি থেকে নতুন শার্ট বের করে পড়লাম। গন্ধ কিসের?”
“এত হিস্ট্রি তো জানতে চাইনি। বললাম তো পারফিউমের ঘ্রাণ। মাথা ধরে যায়। আমার কাছে ভালো লাগেনা। আপনি দেবেন না বলেছি দেবেন না। এত কথার তো কোনো মানে নেই।”
“আচ্ছা আচ্ছা কুল। বলব না কথা। মন খারাপ কেন?”
“এমনি।”
ইহাব মানহার গা ঘেঁষে বসে বলল,
“আমি চলে যাচ্ছি তাই?”
“জানি না।”
“বুঝেছি। আজকের ভেতরেই চলে আসার চেষ্টা করব। ঢাকায় একটা কাজ পড়ে গেছে। খুব তাড়াতাড়ি আসার চেষ্টা করব। রাগ করেনা ইন্টু পিন্টুর মা।”
“মানা করেছি না এসব নামে ডাকতে। ইন্টু পিন্টু কি?”
“আমার দুই মেয়ে।”
“মেয়ে হবে জানলেন কিভাবে?”
“জানি আমি সব।”
“কচুর মাথা জানেন। দেখবেন উল্টোটা হবে।”
“উল্টাপাল্টা কথা বলবে না। আমার ইন্টু পিন্টুই হবে।”
“আচ্ছা দেখা যাক। হলে তো দেখবোই।”
ইহাব আর কোনো কথা না বাড়িয়ে ঝুঁকে মানহার পেটে লম্বা একটা চুমু খেল। বলল,
“বায় বায় ইন্টু পিন্টু। পাপা দ্রুত আসবো। মায়ের মতো আবার মন খারাপ কোরো না, অভিমানী হইয়ো না। ঠিকআছে?”
মানহার ইদানিং শুধু কান্না পায়। মনে হয় চিৎকার করে কাঁদতে পারলে ভালো লাগতো। ইতোমধ্যে চোখ ছলছল করতে শুরু করেছে। ইহাব কতক্ষণ মানহার উদরে হাত বুলিয়ে একা একাই বকবক করল। তারপর উঠে বসে মানহার দিকে চাইতেই দেখল ছলছল চোখে মেয়েটা তার দিকে চেয়ে আছে। সে মাথাটা বুকে চেপে অনেকক্ষণ আদর করে কপালে চুমু খেয়ে বলল,
“কাঁদছ কেন? আদর করে দিয়েছি না? কান্না বন্ধ করো।”
মানহার কান্না থেমে গেলে ইহাব কাধে ব্যাগ ঝুলিয়ে নিল। ব্যাগে একসেট পোশাক আর দরকারি কিছু কাগজপত্র আছে। সে আগে আগে বের হয়ে যেতে নিলে মানহা ডাকল,
“শুনুন।”
ইহাব পিছু ফিরে চাইতেই মানহা ভাঙা গলায় বলল,
“দ্রুত আসবেন। আমার একলা ঘুমাতে ভয় লাগে।”
ইহাব মুচকি হেসে মাথা নাড়ল। ঘুরে চলে যেতে নিলে মানহা আবারও বলল,
“একা একা আমার ভালো লাগেনা।”
ইহাব থেমে গিয়ে ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“একা একা নাকি আমাকে ছাড়া ভালো লাগেনা।”
মানহার কি হলো এই সামান্য কথাটায় তার বুক ভেঙে কান্না চলে আসলো। ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“আপনাকে ছাড়া ভালো লাগেনা।”
ইহাব এগিয়ে এসে মানহাকে জড়িয়ে ধরে বলল,
“কি হয়েছে তোমার? এভাবে কাঁদছো কেন? আমি চিরদিনের জন্য যাচ্ছি নাকি?”
মানহা ইহাবের বুকে মুখ লুকিয়ে শার্ট আঁকড়ে ধরে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বলল,
“জানি না। কিচ্ছু জানি না।”
মানহা ইহাবকে এগিয়ে দিতে মেইন দরজা পর্যন্ত আসলো। ইহাব বউকে জড়িয়ে ধরেই সিঁড়ি থেকে নেমেছে। মা, বাবার কাছে আগেই বলেছে। তারাও নিচে। ইমতিয়াজ ভুঁইয়া, উর্মি ভুঁইয়া দুজনই হলরুমে বসা। ছেলে এখনই রওনা হবে শুনে এগিয়ে এলেন তারা। ইহাব মানহাকে ছেড়ে দিল। নিজস্ব গাড়িতেই ঢাকা যাবে আজ। মানহা চোখ মুছে থমথম চেহারায় ইহাবের দিকে চেয়ে রইল। গাড়ি ভর্তি বিভিন্ন জিনিস উঠাতে দেখে খানিক অবাক হলো সে। ইহাবও বেশ অবাক হয়েছে। মানহা সেসব নিয়ে ভাবলো না। বলল,
“আমি তাহলে উপরে যাই। পৌঁছে কল দিয়েন।”
ইহাব সম্মতি জানালো। মানহা বলেই চলে যেতে নিলে উর্মি ভুঁইয়ার একটা কথায় পা জোড়া থমকে গেল।
“তোমার ভাবির জন্য আচারের সাথে পিঠা, ক্ষেতের সবজি সব দিয়ে দিয়েছি। মনে করে সব দিও কিন্তু।”
ইহাব একটু অবাক হয়ে বলল,
“ভাবি কে?”
“মানহার ভাবি তোমার কি হয়? তোমার বন্ধুর বউ তোমার কি হয়?”
ইহাব বোকার মতো বলল,
“ভাবি।”
“তাহলে বোকার মতো এই প্রশ্ন করছ কেন ভাবি কে?”
ইহাব থতমত খেল। মাকে প্রায় অনেকদিন পর আগের রূপে দেখে তার ভালোই লাগছে। সারাজীবন যেন এমনই থাকে মনে মনে এই প্রার্থনা করল। মানহা ছলছল চোখে উর্মি ভুঁইয়ার দিকে তাকাতেই তিনি বললেন,
“বোকা কোথাকার। আত্মীয় স্বজনের বাড়িতে কেউ শুধু আচার পাঠায়?”
মানহা কেঁদে ফেলতেই উর্মি ভুঁইয়া দু’হাত প্রসারিত করে ইশারা করলেন। মানহা দৌঁড়ে এসে উর্মি ভুঁইয়াকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল,
“আম্মু আপনি অনেক ভালো।”
“এতদিন নিশ্চয়ই খারাপ বলেছিস?”
_
মারওয়ান দরজা খুলে দিতে না দিতেই তার গায়ের উপর কেউ হামলে পড়ল।
“ইয়ার আমি বাবা হবো, ইয়ে।”
মারওয়ান ইহাবকে নিজের থেকে ছাড়িয়ে বিরক্তি নিয়ে বলল,
“এটা এমন গায়ে পড়ে বলতে হবে কেন? আমি তো পরশু জেনেই এসেছি।”
“আরে সেদিন তো তোকে কাছেই পাইনি। এজন্যই তো সাত সমুদ্র তের নদী পেরিয়ে এলাম।
তুই আমি কাছাকাছি
আলাপ হবে দিবানিশি..”
মারওয়ান তাকে থামিয়ে দিয়ে বলল,
“তোর এই রং ঢং অন্য জায়গায় করতে পারিস?”
“নো, নেভার, না। তোর সাথেই করব।”
মারওয়ান বিরক্তিসূচক শব্দ করল। ইহাব পাত্তা না দিয়ে আবারও বলল,
“ফিলিংস কেমন শ্লা ব্রো?”
“কিসের জন্য?”
“মামা হচ্ছেন সেজন্য।”
“নো ফিলিংস।”
ইহাব আশ্চর্যান্বিত গলায় বলল,
“নো ফিলিংস?”
মারওয়ান গম্ভীর মুখে সম্মতি জানালো। ইহাব কোমরে এক হাত রেখে দাঁতে দাঁত চেপে বলল,
“চুমু দিলে ফিলিংস জাগবে। দেব?”
মারওয়ান নাক শিটকে বলল,
“তোর চুমুতে বমির ফিলিংস জাগবে। ভাইরাস, ব্যাকটেরিয়ার সংক্রমণ বেশি।”
“একটা খেয়েই দেখ, খুব টেস্টি। মিথ্যা বলছি না সত্যি।”
মারওয়ান কয়েক হাত দূরে দাঁড়িয়ে বলল,
“উল্টাপাল্টা কিছু করবি না। তোর চরিত্রে সমস্যা আছে। সবাইকে চুমাইতে চাস। এটাতো খারাপ লক্ষণ।”
ইহাব কিছু বলতে নিলে রুম থেকে নাহওয়ান দৌঁড়ে এল। পরনে সেন্ডুগেঞ্জি, প্যান্ট। ইহাবকে দেখে ‘ওরে বাবা চুমু পুপা’ বলে উল্টো ঘুরে দৌড় দিতে নিলে ইহাব চট করে নাহওয়ানকে কোলে তুলে কয়েকটা চুমু খেয়ে বলল,
“কোথায় পালাচ্ছিলেন?
নাহওয়ান ছলছল চোখে বাবার দিকে চেয়ে বলল,
“বাবা চুমায়। বিশি বিশি চুমায়। কুতাও সান্টি নাই।”
মারওয়ান বলল,
“ওকে ছাড় তো। এসব চুমাচুমি অন্য জায়গায় গিয়ে কর। আমার ছাওকে ছাড়।”
“উহু তা বললে তো হবেনা। তোকে চুমুতে না পারলে কি হয়েছে? তোর এই রসগোল্লাকে চুমায়ে চ্যাপ্টা করে ফেলব।”
নাহওয়ান ইহাবের কোল থেকে নামার জন্য লাফাতে, দাফাতে লাগলো। শেষ পর্যন্ত না পেরে জোরে কেঁদে উঠলো। মারওয়ান বিরক্তি নিয়ে বলল,
“কোনো দরকার আছে ছাওটাকে কাদানোর? এর যন্ত্রণায় অতিষ্ঠ হয়ে ছাওটা দৌড় দিতে নিয়েছিল অথচ যেই লাউ সেই কদু। মানে একটা মানুষ এতো চুমাইতে পারে কেমনে? বিরক্ত লাগেনা?”
ইহাব কান্নারত নাহওয়ানকে চটকে চটকে চুমু দিতে লাগলো। নাহওয়ান বাবার দিকে হাত বাড়িয়ে ছলছল চোখে চেয়ে আছে। মারওয়ান রাগান্বিত হয়ে এগিয়ে এসে ইহাবের কোল থেকে নাহওয়ানকে ছিনিয়ে নিল। ইহাব ঠাস করে মারওয়ানের গালেও চুমু বসিয়ে দিল। মারওয়ান গাল মুছে বলল,
“ওয়াক থু থু।”
বাপের দেখাদেখি নাহওয়ানও বলল,
“ওয়াক তু ওয়াক তু।”
ইহাব দুই বাপ বেটার কর্মকাণ্ড দেখে হাসতে হাসতে গড়াগড়ি খাওয়ার দশা। মারওয়ান বাথরুমে গিয়ে গাল ধুলো। নাহওয়ানও বাবার পিছুপিছু গিয়ে তার দেখাদেখি গাল ডলে ডলে ধুতে ধুতে বলল,
“বিশি বিশি চুমায়। ওয়াক তু, ওয়াক তু।”
মারওয়ান মাফলার মুখে পেঁচিয়ে ইহাবকে নাস্তা এনে দিল। নাহওয়ানের মুখেও ছোট্ট মাফলার প্যাঁচানো। ইহাব ভ্রু কুঁচকে বলল,
“তোদের এই অবস্থা কেন?”
“কি অবস্থা?”
“মনে হচ্ছে ঠাডা পড়া শীত পড়েছে। অথচ যে গরম লাগছে আজকে। এই দশা কেন তোদের?”
মারওয়ান রোবটিক গলায় বলল,
“সেইফটি।”
“কিসের সেইফটি?”
মারওয়ান বেশ বিরক্তি নিয়ে বলল,
“তোর চুমার।”
ইহাব হাসতে হাসতে বিছানায় শুয়ে পড়ে বলল,
“এজন্য এই রসগোল্লারও এমন হালত করবি?”
“হ্যা হ্যা করিস না তো। নাস্তা খা। ও আমার দেখাদেখি মাফলার পরেছে। ওকে আমি পরাইনি। তবে ভালোই করেছে কখন কোন দিক দিয়ে তোর চুমুর অ্যাটাক আসে বলা তো যায়না।”
ইহাব ভ্রু নাচিয়ে বলল,
“আচ্ছা গালে না হয় না দিলাম অন্যান্য অঙ্গপ্রতঙ্গ তো খালি আছে।”
ইহাব আবারও নাহওয়ানের দিকে এগিয়ে আসতে নিলে বাচ্চাটা বাবার গায়ে সেঁটে বলল,
“বাবা আবাল আচে।”
মারওয়ান ইহাবকে উদ্দেশ্যে করে বলল,
“কেন রে তোর ওকে জ্বালাতে হবে? শান্তি মতো নাস্তাটা খা না। জ্বালাস নাতো আর।”
ইহাব মারওয়ানের কথার থোড়াই কেয়ার করল না। নাহওয়ানের দিকে এগিয়ে আসতে লাগল। নাহওয়ান বলল,
“বাবা চুমু পুপা তামে না।”
“না থামলে আবার থু দিয়ে দে।”
নাহওয়ান বাবার কথা অনুসরণ করে বলল,
“ওয়াক তু, ওয়াক তু। দূর হ, কালি বিশি বিশি চুমায়।”
ইহাব তা দেখে ‘তবে রে রসগোল্লা’ বলে নাহওয়ানকে ধরতে নিলে বাচ্চাটা ফুড়ুৎ করে দৌড় লাগিয়েছে।
_
ব্ল্যাক ভাইপারের সামনে আজারাক সাইফার (এসি) গালে এক আঙুল ঠেকিয়ে শান্ত চাহুনি ফেলে চেয়ে আছে। ভাইপার নিজেও ঠান্ডা দৃষ্টিতে চেয়ে। কয়েকদিনের জেলের টর্চারে শরীর, চেহারা একদম ভেঙে গেছে। মাথায় বিদ্যমান অল্প সাদা চুলগুলোও ঝরে পড়েছে মনে হচ্ছে। এমনিতেই চুলের উপস্থিতি নেই বললেই চলে তবুও যে কয়টা ছিল সেগুলোর উপস্থিতিও এখন অনাহুত। ভাইপারের থেকে নজর সরিয়ে তাহমিদের দিকে চাইল। সে বর্তমানে টেবিলে শক্তি দিয়ে চাপ দিয়ে চলেছে। আশেপাশে তার বিন্দুমাত্র আগ্রহ নেই। সাইফার জোরে নিঃশ্বাস ফেলে বলল,
“মাঝেমধ্যে খুব অবাক হই জানেন, পৃথিবীতে মানুষ খারাপ হয় হুদাই। এর পিছনে লজিক নেই কোনো। আচ্ছা সে কষ্ট পেয়ে ভালো মানুষ হয়না কেন? তাকে খারাপই হতে হবে কেন? কষ্ট পেয়েছে পরবর্তীতে যেন অন্য কেউ তার দ্বারা কষ্ট না পায় এমন কেন হতে পারে না? মানুষের মাথায় আল্লাহ ব্রেইন ঠিকই দিয়েছে কিন্তু এর কার্যক্রম বোঝার সক্ষমতা সবাইকে দেয়নি। ব্রেইনলেস কান্ডকারখানা।”
এপর্যায়ে তাহমিদ কথা বলে উঠল,
“তাহলে তো বলতে হয় আপনিও ব্রেইনলেস। কষ্ট পেয়ে এই হালত হয়েছিল কেন? সবকিছুই কিন্তু জানি। আপনার তো হওয়া উচিত ছিল আদর্শবান স্বামী, পুত্র, ভাই ব্লা ব্লা ব্লা।”
সাইফার মাথা নাড়িয়ে সম্মতি জানিয়ে বলল,
“সঠিক বলেছেন।”
তাহমিদ তাচ্ছিল্য হেসে বলল,
“তবে একটা কথা ঠিক বলছেন। পৃথিবীতে মানুষ আসলে হুদাই খারাপ হয়। ওর খারাপ হইতে মন চায় তাই হয়। পৃথিবীতে সবাই ভালো হইলে খারাপ হইব কে? ভালোর কদর বুঝানোর জন্য হইলেও খারাপ হওয়া লাগে।”
সাইফার নড়েচড়ে বসে বলল,
“কথাবার্তায় আঞ্চলিক ভাষার টোন, ব্যাপারটা ইন্টারেস্টিং। আপনি আধ্যাত্মিক টাইপের কেউ?”
“কথাটা ব্যাঙ্গাত্মক ভাবে বললেন বুঝলাম।। তবে আমি ঐ টাইপের কেউ না।”
“অবশ্য কথা আধ্যাত্মিক টাইপ বললেও কাজকর্মে সাক্ষাৎ শয়তান। নাহলে একটা শিশুকে এভাবে চড় মারতে পারে কেউ? কথাগুলো ভাবলে তোকে আমার কেটে ফেলতে ইচ্ছে করে। শুধুমাত্র নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করেছি নয়তো তোকে কি যে করতাম সেটাই ভাবি।”
তাহমিদ হাসল। ফ্যাকাশে হাসি। হাসিতে কোনো প্রাণ নেই। বলল,
“এইটুকু চড় থাপ্পড়ে কার কি হয়? মনুষ্যজাতি এতটাও দুর্বল নয়। কেউ কেউ পৃথিবীতে সোনার চামচ মুখে দিয়ে বড় হয় আবার কেউ লাথি উষ্ঠা খেতে খেতে শক্তপোক্ত হয়ে বড় হয়। আচ্ছা আল্লাহর এ কেমন ইনসাফ? একজন এত আরাম আয়েশে বড় হবে আরেকজন শুধু কষ্ট পেয়েই দুনিয়া থেকে বিদায় নেবে?
“আল্লাহর ইনসাফের উপর প্রশ্ন তোলা বোকামি। আমি মনে করি, আল্লাহ যা করেন এর পেছনে অবশ্যই কোনো কারণ আছে। এমনি এমনি তিনি কিছু করেন না। হতে পারে পথটা আমাদের জন্য অমসৃণ কিন্তু ফল অত্যাধিক মধুময়।”
তাহমিদ হাসল। কোনো উত্তর করল না। জেলে কয়েকদিন তুমুল টর্চার করা হয়েছে। মুখ, ঠোঁট থেঁতলে গেছে। তাহমিদের এসবে বিশেষ ভাবান্তর নেই। সে একমনে টেবিলে হাত মুষ্ঠিবদ্ধ করে বারি মারছে। সাইফার সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে চেয়ে বলল,
“আচ্ছা, আমার কেন যেন মনে হয় আপনি ভাইপারের হয়ে কাজ করেন না। আপনার আলাদা একটা সোর্স আছে। কী সেটা? আপনি নিজেকে যেমন দেখান আদতে আপনি তেমন নন। প্রশ্ন হলো, আপনি আসলে কেমন?”
চলবে…..
(আসসালামু আলাইকুম।)
ফটো ক্রেডিট: @Israt Jahan (Tasnim)
Share On:
TAGS: তাজরীন ফাতিহা, ভবঘুরে সমরাঙ্গন
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩৯+৪০
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৩১+৩২
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৪৯.১+৪৯.২)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৭১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ১৭+১৮
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৬১
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব (৫৬.১+৫৬.২)
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৩+৪৪
-
ভবঘুরে সমরাঙ্গন পর্ব ৪৭+৪৮