Golpo romantic golpo প্রেয়সীর অনুরাগ

প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৮


প্রেয়সীর_অনুরাগ

লেখনিতে —#সাদিয়াজাহানসিমি

পর্ব_০৮

রাফসার গাড়ি দিয়ে সকলে আজ পরীক্ষা দিতে এসেছিল। ওরা আলাদা করে আর গাড়ি ভাড়া করেনি। করতে চেয়েছিল, তবে রাফসা দেয়নি। স্কুলের কাছে সবাই একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল আজ, রাফসার গাড়ি সবাইকে সেখান থেকে গাড়িতে তুলে নেয়। স্কুলের সামনে গাড়ি আসতেই সকলে একে একে করে নেমে পড়ল। রাফসা নিজেও নামে। এই গরমে মাথা ঘুরাচ্ছে। সকালে তেমন কিছু খেয়ে আসেনি। চিন্তায় খাবার গলা দিয়ে নামেনি। আশরাফুল সাতারুল একসাথে যাবে।ওরা বলল।”আমরা যাই। পরবর্তী পরীক্ষা আবার তিনদিন পর। আল্লাহ হাফেজ। ফোনে কথা হবে।”

মেয়েরা মাথা নাড়িয়ে সায় দিল। ওরা চলে যায়। সাবিকুন বলল।”ভাই, আমি যাই। ভালো লাগছে না। খুব জার্নি হলো আজ।”

সায়মাও বললো।”হ্যাঁ খুব খারাপ লাগছে। চলে যাই।”

ওরা বিদায় নিয়ে চলে যাবেই, তক্ষুনি একটা ছেলে হাজির হয়। হ্যাংলা পাতলা গড়নের একটা ছেলে। গায়ের রং ফর্সা। হাতে বড়সড় একটা প্যাকেট। ছেলেটা হাতের প্যাকেটা রাফসার পানে বাড়িয়ে দিয়ে বলল।”আসসালামু আলাইকুম ভাবী। এটা আপনার। ধরুন।”

রাফসা ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে রইল। ভাবী ডাকছে কাকে। ডানে বামে তাকিয়ে কাউকে খুঁজলো। তবে, ওরা তিনজন ছাড়া কেউ নেই। এই ভরদুপুরে কোনো মেয়ে বাইরে না থাকারই কথা। পুরো রাস্তা শুধু ওরাই দাঁড়িয়ে আছে। আর মাঝেমধ্যে কয়েকজন মানুষ আসা যাওয়া করছে। রাফসা ছেলেটার পানে তাকিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল।”কাকে ভাবী ডাকছেন আপনি? এখানে আমরা কেউই বিবাহিত না।”

“আপনাকেই দিচ্ছি ভাবী। অন্য কাউকে না। ভাই বলেছে দিতে।”

সায়মা সাবিকুন দুজনে টাশকি খেয়ে গোল গোল চোখে সব দেখছে। ওরাও বুঝতে পারছে না কিছু। রাফসা ছেলেটার ভুল ভাঙ্গাতে মৃদু হেসে বলে।”আপনার কোথাও ভুল হচ্ছে ভাইয়া। আপনার ভাই যাকে দিতে বলেছে, আমি সে না। সঠিক মানুষ কে খুঁজে দিয়ে দিন। এটা আমার না।”

ছেলেটা নিজের কথায় অনড়। একপাও টলল না নিজ কথা থেকে ‌। এসে পর্যন্ত মাথা নিচু করেই রেখেছে। একবারের জন্যও মাথা তুলে চায়নি। মিনমিন করে বলল।”আমার ভুল হচ্ছে না ভাবী। ভাইয়া আপনার কথাই বলেছে।”

রাফসা এতো করে বলার পরও শুনছে না দেখে মুহূর্তেই মেজাজ বিগড়ে গেল। দাঁত খিচে দাঁড়িয়ে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করছে। চোখ বন্ধ করে একবার লম্বা শ্বাস ফেলে। তারপর চোখ খুলে ঠান্ডা গলায় বলল।

“দেখুন ভাইয়া। আমি যথেষ্ট ঠান্ডা আছি। আপনায় আমি বারবার করে বলছি।এটা আমার না, এবং আমি অবিবাহিত। প্লিজ যান এখান থেকে।”

ছেলেটাও তাও এক পা টলেনি। ঠাঁই দাঁড়িয়ে রইল মাথা নিচু করে। হাতটা এখনো বাড়িয়ে রেখেছে।

“আপনার নামই তো রাফসা। তাইনা ভাবী? আমি কোনো ভুল করছি না। এটা আপনার জন্যই ভাই পাটিয়েছে।”

ব্যাস ওদের মধ্যে যেন বোমা ফাটলো। সায়মা সাবিকুন হতব্হিল হয়ে গেল। রাফসা নিজেও চমকেছে। ও তো বিয়েই করেনি। তাহলে জামাই আসলো কোথা থেকে। সব মাথার উপর দিয়ে যাচ্ছে।
“দেখুন আমার না হওয়া সম্মানিত দেবর, আমি রাফসা তা ঠিক। তবে, আপনার ভাইয়ের বউ রাফসা নই। আমি এখনো বিয়ে করিনি ভাই। হুদাই বিবাহিতা ব্লেম দিবেন না।”

ছেলেটা না পেরে প্যাকেটটা রাফসার সামনে নিচে রেখে উঠে দাঁড়ায়। ও বুঝতে পেরেছে, সহজে নিবে না। উল্টো ঘুরে চলে যেতে যেতে বলল।
“ফরাজী বাড়ির ছোট মেয়ে সাদিয়া ফরাজী রাফসা আমাদের ভাইয়ের বউ। আমাদের ভাবী। আসি ভাবী।”

ছেলেটা কথাটা বলতেই মাথা ঘুরে উঠলো রাফসার। কি হচ্ছে সব গুলিয়ে যাচ্ছে। নাম , বংশ সব ঠিকঠাকই তো বললো। কিন্তু কোন ভাইয়ের বউ বানিয়ে দিয়ে গেল।রাগে গজগজ করতে করতে চেঁচিয়ে বলল।

এই আবাল,এই , সব আবাল কি আজ আমার সামনে পড়বে বলেছে পণ করেছে নাকি। সকালে কোন কুফার মুখ দেখে উঠেছি। আজ বোধহয় আবাল দিবস। আবালের দল কোনখানের।”

রাফসা রাগে গজগজ করছে। সাবিকুন সায়মা ওর দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। ওদের এই দৃষ্টিতে আরো রাগ হয় রাফসার। খেকিয়ে বলল।”তোদের আবার কি হলো রে আবাল। এমন করে চেয়ে আছিস কেন?”

ওর ধমকে সোজা হয়ে দাড়ালো দুজনে। সায়মা সন্দিহান কন্ঠে বলল।”এই সাদু, ওই ছেলে তোকে ভাবী ডাকলো কেন রে? তুই কি আমাদের থেকে কিছু লুকোচ্ছিস?”

রাফসা তেতে উঠল। রাগে যেন মাথা খারাপ হয়ে যাবে। ওদের সামনেই জিজ্ঞেস করল, আর এখন বলছে কি লুকিয়েছে।
“চুউপপ, গাঁদা আবাল। সর সামনে থেকে। মাথা নষ্ট করে দিল আবালের দলেরা ‌।”

চলে যেতে নিয়েও রাফসা থেমে গেল। থম মেরে দাঁড়িয়ে প্যাকেটটার পানে তাকিয়ে রইল। কিছু একটা ভেবে প্যাকেটটা তুলে নিল। ভালোই ভারী। তারপর গটগট পায়ে গাড়িতে উঠে বসে। এদিকে বেকুবের মতো তাকিয়ে রইল সাবিকুন সায়মা।

গাড়ি চলতে শুরু করেছে। রাফসা থম মেরে তাকিয়ে রইল প্যাকেটের পানে। হাত দিয়ে খোলার চেষ্টা করছে। তবে বিধিবাম, খুলতে পারছে না। অনেক কষ্টে টেনে ছিঁড়ল। পরিশ্রম হয়েছে বেশ । ভেতরে আলাদা আলাদা প্যাকেট। একটা প্যাকেট হাতে তুলে নিয়ে খুলল। আর তাতেই চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল ওর। খাবার রাখা আছে তাতে। পিৎজা, বার্গার, চাওমিন। এগুলো ওর পছন্দের তালিকায় আছে। পছন্দের খাবার। এগুলো একপাশে রেখে অপর প্যাকেটটা খুলে। একটা দামী ব্র্যান্ডের ওয়াচ। কালো ফিতের।

রাফসা পুরোই হতবাক। কে পাঠিয়েছে এসব! মাথা কাজ করছে না। ঘড়িটা একপাশে রেখে একটা বার্গার তুলে নেয় হাতে। যেই দিয়েছে, না খেলে গুনাহ হবে। কোন বেচারা পাঠিয়েছে আল্লাহ জানে।

;

আনের আস্তানাটি বাইরে থেকে একেবারেই নিরীহ—শহরের প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা পুরোনো একটি দালান, দেয়ালের রঙ ঝরে পড়েছে, জানালার গ্রিলগুলোতে মরিচা। দিনের আলোয় কেউ তাকিয়েও দেখে না। কিন্তু রাত নামলেই সেই বাড়িটা যেন অন্য এক রূপ নেয়। অন্ধকারের ভেতর লুকিয়ে থাকত ভয়ংকর সব রহস্য, যেগুলোর নাম কেউ উচ্চারণ করতে সাহস পায় না।
আন—এই নামটা আন্ডারওয়ার্ল্ডে ফিসফিস করে বলা হয়। সে ছায়ার মানুষ। প্রকাশ্যে ব্যবসায়ী, সমাজে সম্মানিত মুখ। অথচ তার আস্তানার ভেতরে চলে মানুষের জীবনের সবচেয়ে নোংরা বাণিজ্য।
দোতলার নিচে সাউন্ডপ্রুফ করা ঘর—যেখানে কান্নার শব্দ বাইরে পৌঁছায় না। সেখানে আটকে রাখা হয় অচেনা মেয়েদের, যাদের স্বপ্ন ছিল সাধারণ—ভালো চাকরি, বিদেশে সুন্দর জীবন। প্রতারণার ফাঁদে পড়ে তারা এসে পৌঁছায় এই অন্ধকার ঠিকানায়।
রাত গভীর হলেই আস্তানার ভেতর অদ্ভুত নড়াচড়া শুরু হয়। কালো কাঁচের গাড়ি এসে থামে নিঃশব্দে। দরজা খুলে, আবার বন্ধ হতো—কেউ কিছু দেখে না। ভেতরে কাগজে-কলমে চলে “ডকুমেন্টেশন”, কিন্তু বাস্তবে সেগুলো ছিল মানুষের পরিচয় মুছে ফেলার প্রক্রিয়া। নাম বদলে যেত, অতীত হারিয়ে যেত, আর শুরু হতো এক নিষ্ঠুর যাত্রা—বিদেশের অচেনা বন্দিশালার দিকে।
আনের আস্তানার আরেকটি অংশ ছিল আরও ভয়ংকর। বেজমেন্টে আলো সবসময় আধো-অন্ধকার। সেখানে বাতাসেই একটা তীব্র গন্ধ—রাসায়নিক আর পচা ধাতুর মিশ্র গন্ধ। এখানে চলত নিষিদ্ধ মাদকের কারবার। ছোট ছোট প্যাকেট, লোহার আলমারি, ডিজিটাল লক—সবকিছু ছিল নিখুঁতভাবে সাজানো। বাইরে থেকে বোঝার কোনো উপায় ছিল না যে এই নীরব ঘরগুলোই শহরের ড্রাগ নেটওয়ার্কের হৃদয়।
হিরোইনের এই ব্যবসা শুধু টাকার খেলা ছিল না, ছিল ক্ষমতার প্রদর্শন। আন জানত—ভয়ই তার সবচেয়ে বড় অস্ত্র। যারা একবার এই আস্তানার ভেতরের সত্য দেখে ফেলত, তারা হয় চুপ হয়ে যেত, নয়তো হঠাৎ করেই শহর ছেড়ে “হারিয়ে” যেত।
সবচেয়ে ভয়ংকর ছিল রাত তিনটার পরের সময়টা। তখন পুরো দালান নিস্তব্ধ, অথচ ভেতরে ভেতরে চলত সবচেয়ে বড় লেনদেন। ক্যামেরার লাল আলো জ্বলত, মনিটরে ভেসে উঠত বিভিন্ন দেশের নাম—কোড ভাষায় কথা চলত। প্রতিটি সংকেত মানে ছিল কারও জীবনের দিক বদলে যাওয়া।
কিন্তু রহস্য যেমন গভীর হয়, তেমনই সেখানে ফাটলও তৈরি হয়। আনের আস্তানার দেয়ালগুলো যেন সব দেখেছে—চোখে দেখা যায় না এমন রক্ত, চাপা কান্না, আর অভিশপ্ত চুক্তি। কেউ কেউ বলে, গভীর রাতে নাকি ওই বাড়ির জানালার ভেতর থেকে এখনো ছায়ামূর্তি দেখা যায়—যেন আটকে থাকা আত্মারা মুক্তির অপেক্ষায়।
এই আস্তানা শুধু একটি ভবন ছিল না—এটা ছিল অন্ধকারের রাজ্য, যেখানে আলো ঢুকলেই সবকিছু ধসে পড়ার অপেক্ষায়।

বেইজমেন্টে এসে থামে কালো গাড়ি। দিনের বেলায় সচরাচর এখানে কাউকে দেখা যায় না। দেখা পাওয়া খুব মুশকিল। গাড়ি থেকে নেমে আসে এক তাগড়া যুবক। হাতের শিরা উপশিরা টান টান হয়ে ফুলে আছে। হাতে ব্রেসলেট। চোখে রোদচশমা পরে আছে সে ‌ । চিবুক শক্ত করে এগিয়ে গেল দোতলায়। পেছনে তার দশ পনেরো জন গার্ড। দোতলার একটা ঘরে এসে দাঁড়ায়। শক্ত হাত দিয়ে দরজার কপাট ঘুরিয়ে খুলল। ক্যাঁচ ক্যাঁচ করে দরজাটা খুলে গেল। ভেতরে প্রবেশ করে সেই যুবক। ভেতরে যেন রাজনীতি দলের মিলনমেলা আজ।

সোফায় বসে আছে বিরোধী দলের পার্টি। যেন কোনো বড়সড় ষড়যন্ত্র করছে সকলে। যুবকটি ধীরে এগিয়ে যায় সেদিকে। তাকে দেখে সকলে দাঁড়িয়ে পড়ে। কাদের মোল্লা হাত বাড়িয়ে একগাল হেসে বলল।”ওয়েলকাম, তোমাকে তো দেখাই যায় না। কোথায় থাকো?”

যুবকটি কুটিল হেসে সোফায় বসে হাত পা ছড়িয়ে বলল।”ইন্টারেস্টিং, আমার রাজ্যে আমাকেই স্বাগতম জানানো হচ্ছে। ভেরি ইন্টারেস্টিং।”

কাদের মোল্লার হাসি বন্ধ হয়ে যায়। মুখটা থমথমে হয়ে গেল। বাকিরা ঠোঁট চেপে হেসে উঠলো। কাদের মোল্লা এতে ভীষণ অপমানিত বোধ করে। যুবকটি এক আঙ্গুল উঁচিয়ে,ইশারা করে বললো।”বসুন। আপনাকে এখানে বিনোদন দিতে আনা হয়নি।”

এ দফায় আরো অপমানিত হলেন। মুখটা থমথমে করে বসে পড়ে। সবাই নীরবতার মাঝে বিরাজ করছে। ওদের এখানে কথা বলার কলিজা নেই। সিংহের গুহায় সিংহ একাই কথা বলে। আর বাকিরা শুনে। যুবকটি পায়ের উপর পা তুলে দুলাচ্ছে। একটা ছেলে এসে ওয়াইনের গ্লাস সামনে রাখলো। ওয়াইনের গ্লাসটা হাতে তুলে নিল সে, ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখল সেটা। তারপর আচমকা দূরে ছুঁড়ে মারে গ্লাসটা। কাঁচের গ্লাসটা ঝনঝন করে ভেঙে গেল। সবাই স্তম্ভিত। ছেলেটা ভয়ে কাঁপছে। যুবকটি রক্তচক্ষু নিয়ে তাকিয়ে বলল।

“এখানে কি ওয়াইনের অভাব পড়ছে? একগ্লাসে আমার কচুও হবে না। এতো এতো ওয়াইন কোথায় গেল। আমাকে এনে দিচ্ছিস এক গ্লাস।”

ছেলেটা ভয়ে কাঁপছে। কোনো রকম তুতলিয়ে বলল।”মাফ করবেন স্যার। ভুল হয়েছে। আমি এক্ষুনি নিয়ে আসছি।”

আন পায়ের উপর পা তুলে বসে রইল। সবাই চুপচাপ। কাদের মোল্লা বলল।”আনিস সিকদার সাহেব, ওনি কি এইবার ইলেকশনে জিততে পারবে? ফরাজী বাড়ির সকলেই রাজনীতির সঙ্গে জড়িত। ওরা সৎ ও বটে। জনগণ কি সাহেবকে ভোট দেবে?”

ছেলেটা কয়েক বোতল ওয়াইন নিয়ে হাজির হয়। একটা বোতল হাতে নিয়ে তা খুলে ঢকঢক করে পুরোটাই গিলল। ঠোঁটে বাঁকা হাসি। ফিঙ্গার রিং গুলো হাতে ছুরির মতো ধারালো। ব্রেসলেটটা ঢিলে করতে করতে বলল।

“এইবার সিকদার বাড়ি এমপি হবে। কেউ আটকাতে পারবে না। সব দয়ালের খেলা।

“ফরাজী বাড়িকে এতো সহজে দমানো যাবে না। এখানে অনেক বড় খেলা হচ্ছে। আমরা তা ধরতে পারছিনা।

আন দাবার গুটি গুলো নড়াচড়া করতে করতে কুটিল হেসে বলল।”টাকার পাওয়ার খাটাও। জনগণ এমনিতেই ভোট দেবে। নয়তো ভোটকেন্দ্রে গড়বড় করতে হবে।”

হাফিজ উদ্দিন মুখ খুললেন। “আমার মনে হয় ওই বাড়ির ব্যক্তি বেঈমানি করবে। নিজের বাড়ির ক্ষতি কে চায় বলুন।”

আনের কোনো রিয়েকশন নেই। চোখ মুখ ঠান্ডা। আরেক বোতল ওয়াইন নিয়ে ঢকঢক করে নিমিষেই শেষ করে দেয়। কামাল নামের এক ব্যক্তি এসে বলল।”স্যার , পাশের ঘরে একটা সুন্দরী মেয়ে আনা হয়েছে আপনার জন্য। আপনি যেতে পারেন রুমে। “

কথাটা শুনতেই যেন মাথার রগ কর্তন করে উঠলো। শিরা উপশিরা ফুলে উঠেছে। জিভ দিয়ে ঠোঁটের অগ্রভাগে ভিজিয়ে শয়তানি হাসি দেয়। ঘাড় ঘুরিয়ে কামালের পানে তাকিয়ে শান্ত স্বরে বলল।

“আজ থেকে আমার জন্য কোনো নারী আসবে না। সব নিষিদ্ধ। ব্যবসায় তুলে দে সে মেয়েকে।

তারপর সোফায় ঠেশ দিয়ে বসে দুই হাত প্রসারিত করে হেসে উঠলো।
“আমার একান্ত নারীর আগমন ঘটেছে আমার জীবনে। সে ব্যতীত আর কোনো নারীর দরকার নেই।”

কামাল হেসে উঠলো। মুখ ফুসকে বলল।”সে কি কোনো খাশা মা,,,,

আর কথা শেষ করতে পারেনি কামাল। তার আগেই কালবৈশাখী ঝড়ের বেগে উঠে ওর সামনে দাঁড়ায় । গ্ৰীবাদেশে হাত দিয়ে জোরে চেপে ধরলো। হিশহিশ করে বলল‌।
“আমার নারীর নামে বাজে কথা । এই মুখ আমি আর রাখবো না। গলার রগ টেনে ছিঁড়ে ফেলবো একদম।”
এই কেউ ছুরি দে,

সবাই ভয় পেয়ে দাড়িয়ে গেল। ভয়ে হাত পা কাঁপছে সবার। আতঙ্কে কাঁপছে সকলে। এই মানব সহজে রাগে না। একবার রেগে গেলে সব ধ্বংস করে দেয়। সবাই ভয়ে ঢোক গিলছে।

কাউকে ছুরি দিয়ে না দেখে আবার চিৎকার করে বলল।”কুওার বাচ্চারা শুনিস না কি বলছি। তোদের টাকা দিয়ে কেনো রেখেছি‌?’

একজন ছেলে ভয়ে ভয়ে ছুরি তুলে দেয়। ছুরিটা হাতে নিয়েই কামালের গলায় চালায়। অনবরত টান দিতে থাকে ‌। কামাল বাঁচার জন্য ছটফট করছে। এদিকে সবাই হকবাক। চোখ যেন কোটর থেকে বেরিয়ে আসার উপক্রম। গা গুলিয়ে উঠলো ঘৃণায়।

রগ কেটেও ক্ষান্ত হয়নি। ঠোঁটের উপর ছুরি চালিয়ে ঠোঁটজোড়া কেটে নিল। তারপর দূরে কোথাও ছুঁড়ে মারে। দাঁড়িয়ে ঘাড় বাঁকিয়ে পেছনে তাকিয়ে পৈশাচিক হাসি দেয়। ঠোঁট কামড়ে বলল।”আমার নারীর ব্যপারে ভাবলেও খারাপ হবে। আর এই কুওার বাচ্চা তো খারাপ কথা বলতে চেয়েছে।”

সবাই আতঙ্কে কথা বলছে না। যুবকটি ছুড়ি ফেলে দিয়ে লাশের উপর পা ফেলে বেরিয়ে পড়ে বেইজমেন্ট থেকে।

পেছনে রেখে গেছে কয়েক জোড়া বিস্ময়কর দৃষ্টি। কাদের মোল্লা এইবার হড়হড় করে বমি করে দিল। এতোক্ষণ অনেক কষ্টে চেপে রেখেছিল। বাকিদের মাথায় ঘুরছে কে সে নারী। যেই নারীর জন্য আজ অন্য নারীর সাথে জড়ায়নি।

:
:
সন্ধ্যায় ফরাজী বাড়ির আড্ডা মেলা শুরু হয়। ছোট বড় সকলেই থাকে। তবে এর মধ্যে রাফসা অনুপস্থিত। ও প্রয়োজনী ব্যতীত খুব একটা রুমের বাইরে পা রাখে না। আজ পরীক্ষা দিয়ে এসে খাওয়া-দাওয়া করে রুমে ঢুকেছে আর বের হয়নি।

রাফসা ঘুম থেকে উঠে বসে । মাথাটা ধরে আছে প্রচন্ড পরিমাণের। মাগরিবের আজান পার হয়ে গেছে। আর নামাজ পড়া হলো না। ঘুমে চোখ মেলতে পারছে না। ওয়াশরুমে গিয়ে ফ্রেশ হয়ে আসে। তারপর নিচে চলে যায়। রোহান জারা জায়িন ঊষা ওরা বসে আড্ডা দিচ্ছে আর পকোড়া খাচ্ছে। রাফসাকে ডেকে ঊষা পাশে বসায়।
” পরীক্ষা তো ভালো হচ্ছে তাই না রাফসা?”

রাফসা মাথা নাড়িয়ে বলল।”হ্যাঁ। খুব ভয়ে ছিলাম। সব কমন পড়েছে।”

রোহান ফোন বের করে উদ্যানকে ভিডিও কলে আনে। ও হসপিটালে কাজ করছে। রোহান আওয়াজ বিহীন ক্যামেরা তাক করে ওদের দিকে। রাফসা মাথায় কাপড় দিয়ে বসে আছে। চোখ মুখ ফোলা ফোলা। পকোড়া খাচ্ছে। উদ্যান চোখ ফিরিয়ে নেয়। গমগমে কন্ঠে বলল।”সন্ধ্যায় পড়াশোনা চাঙ্গে উঠিয়ে আড্ডা দেওয়া হচ্ছে?”

এতো মাস পর হঠাৎ উদ্যানের কন্ঠে শরীর দুলে উঠলো ষড়োশী কন্যার। হাত থেকে পকোড়া পড়ে গেল। মাথা নিচু করে ফেলল। অজান্তেই বুকটা কাঁপছে। হাত কাঁপছে। দীর্ঘ ছয় মাস পর ভয়েসটোনে হঠাৎ দিশেহারা লাগছে। হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল। পা গুটিয়ে ঘরের দিকে যেতে থাকে। পেছনে সবাই ডাকলেও শোনেনি।

রুমে এসে দরজা আটকে লম্বা লম্বা কয়েকটা শ্বাস ফেলে। ঘেমে গেছে। নিজেকে শান্ত রাখার চেষ্টা করছে। ওই পাষাণ লোককে সরিয়ে ফেলেছে মন থেকে। আর ভালোবাসা নেই ওনার প্রতি। আর ভালোবাসবে না।

“নারী তার শখের পুরুষকে ভুলে যাওয়ার ক্ষমতা নিয়েও জন্মায়।”

রাফসা নিজেকে শান্ত করে। সব কিছু থেকে ভুলিয়ে রাখতে পড়তে বসে। তবে পড়ায় মন বসছে না। কিছু ক্ষণ হাঁটাহাঁটি করে। পুনরায় পড়তে বসে। এইবার পড়ায় কিছুটা মন বসে। তবে মনটা খচখচ করছে।

.
.
সেইদিনের পর কেটে গেছে একমাস। অনেক কষ্টে রাফসা নিজেকে সামলেছে। আজ জীববিজ্ঞান পরীক্ষা ছিল। পরশু শেষ পরীক্ষা, বাংলাদেশ ও বিশ্বপরিচয়। ওরা হল থেকে বেরিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ছেলেরা এখনো আসেনি। ওরা কিছুটা দূরে দাড়ায়। কয়েকজন ছাএ ছাএী আছে।

পনেরো পার হয়ে গেলেও আশরাফুল সাতারুল আসেনা। এইদিকে ওরা অসহ্য হয়ে উঠেছে গরমে। মাথা গরম হয়ে আছে। একটা ছেলে এসে ওদের সামনে দাঁড়ায়। এই ছেলেটা কেমন যেন ঘুরঘুর করছে কদিন ধরে। ওরা এতোটা পাওা দেয়নি কখনো। আশরাফুল এর মাধ্যমে ছেলের সাথে পরিচয় হয়েছে।

ছেলেটা রাফসাকে হাত উঁচিয়ে হাই বলল।রাফসা প্রতিউওরে কিছু বলেনি। হাসেনিও পর্যন্ত। ছেলেটা এইবার বন্ধুর থেকে এক গুচ্ছ গোলাপ নিয়ে রাফসার পানে বাড়িয়ে দেয়। লজ্জা মাখা কন্ঠে বলল।”রাফসা তোমাকে দেখার পর আমার মনের ঘন্টা বেজে গেছে। আমি তোমাকে ভালোবাসি রাফসা।”

ওরা মোটেও অবাক হয়নি। আগেই বুঝতে পেরেছিল ছেলের মতলব। রাফসা বিরক্ত হয়ে তাকালো।

ছেলেটা ফুলগুলো বাড়িয়ে রেখেছে। রাফসা তা না নিয়ে সরাসরি ওর দিকে তাকিয়ে বলল।”আমায় ডিস্টার্ব করবেন না।”

ছেলেটার হাসি মুখ কুঁচকে যায়। হাসিটা ধপ করে বন্ধ করে ফেলল। অনুনয় করে বলল।”প্লিজ রাফসা, আমি সত্যি তোমাকে ভালোবাসি। আই লাভ ইউ।”

রাফসা ঠান্ডা গলায় বলল।”দুঃখিত। আমি বিবাহিতা।”

এইভাবে একটা ছোটখাটো বোম ফাটলো ওদের মাঝে। আশরাফুল সাতারুল এসে দাঁড়িয়েছে কিছু মুহূর্ত। ওরা দাঁড়িয়ে ছিল। রাফসার কথায় সকলে বেশ অবাক।

ছেলেটা অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল।”তোমার বিয়ে হয়েছে? আমি বিশ্বাস করি না।”

“না করলে নেই। আমার সামনে আসবেন না আর।”

তারপর গটগট পায়ে স্থান ত্যাগ করে। ওর পেছন সবাই ছুটে। ছেলেটা অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল।ছেলেটাও বন্ধুদের নিয়ে চলে গেল।

তক্ষুনি একটা ছেলে বেরিয়ে এলো। ওই ছেলেটার পানে তাকিয়ে পকেট থেকে ফোন বের করে কল লাগায় কোথাও।

“ভাই , ভাবীকে আজ এক ছেলে প্রেমের প্রস্তাব দিয়েছে।
ভাবী রিজেক্ট করেছে।”

ওপাশ থেকে কিছু শোনা যায় নি।

“আচ্ছা ভাই, আমি ছেলেটার ব্যবস্থা নিচ্ছি। আপনি টেনশন করবেন না।”

কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল। তারপর ছুটলো সেই পানে।

চলবে…?

পরবর্তী পর্ব ২ হাজার রিয়েক্ট পূর্ণ হলে আসবে। আমি ততদিনে রেস্ট নিলাম। গল্প পড়ে চলে যায়। তাই এই নিয়ম।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply