প্রেয়সীর_অনুরাগ
লেখনিতে —#সাদিয়াজাহানসিমি
পর্ব_০৬
ফ্লাইট থেকে নামার পর উদ্যান ধীরে ধীরে টার্মিনাল ছাড়িয়ে বাইরে এলো। কাঁচের দরজা স্বয়ংক্রিয়ভাবে খুলে যেতেই ঠান্ডা, পরিষ্কার বাতাস এসে মুখে লাগলো। আকাশটা নীল , অদ্ভুতভাবে নীরব।
উদ্যান বাইরে বেরিয়ে আসতেই, একজন ছুটে এসে জড়িয়ে ধরল। উদ্যান হেসে নিজেও জড়িয়ে ধরল। উদ্যান হেসে বলল।”ওয়েলকাম না করে, জড়িয়ে ধরছিস শালা। তোর তো দেখি ভদ্রতা নেই।”
জিহাদ ওকে ছেড়ে দাঁড়ায়। ওরা দুজন বেস্ট ফ্রেন্ড। জিহাদ সুইজারল্যান্ড এসেছে প্রায় এক বছর। পড়াশোনার জন্যই এসেছে। জিহাদ ভ্রু কুঁচকে বলল।”আমি তোর শালা, নাকি তুই আমার শালা? ডাক্তারি পড়ে কি তোর মাথা গেল?”
উদ্যান বাহুতে চাপড় মেরে বলল।”আমি তোর শালা না। সমন্ধি হই বেয়াদব। আর আমার সাথে বেয়াদবি করলে, বোন বিয়ে দিব না তোর কাছে।”
এই কথা শুনে জিভ কাটে জিহাদ। কানে হাত দিয়ে বলল।”মাফ করে দেন বড় ভাই। আমি আপনার পায়ে পড়ি। এতো বড় অবিচার করবেন না, প্লিজ। আপনার বোন ছাড়া আমার কোনো উপায় নেই।”
“হ্যাঁ। আর নাটক করিস না। দেবো না বোন।সর, সামনে থেকে।”
জিহাদ নিজের গাড়ি নিয়ে এসেছে। উদ্যান গাড়ির পানে এগিয়ে যায়। গাড়ি কিনে জিহাদ উদ্যানকে দেখিয়েছিল। তাই চিনতে অসুবিধা হয়নি। উদ্যানের পেছনে জিহাদ ও ছুটে। উদ্যান ফন্ট সিটে বসে পড়ে। জিহাদ ডাইভিং করবে। গাড়ির ধোঁয়া উড়িয়ে বেরিয়ে পড়ে এয়ারপোর্ট থেকে।
গাড়ি ধীরে ধীরে এয়ারপোর্টে ছেড়ে বেরিয়ে পড়ল। পরিপাটি রাস্তা, দুই পাশে সারি সারি সবুজ গাছ, কোথাও বিশৃঙ্খলের লেশমাত্র নেই। রাস্তার ধারে ছোট ছোট ঘর, ঢালু ছাদের লাল কালি।মনে হয় প্রতিটা ঘর যেন ছবি হয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
কিছু দূর যেতেই দৃশ্য বদলাতে লাগল। শহরের সৌম্যতা পেছনে ফেলে সামনে খুলে গেল প্রকৃতির বিশাল ক্যানভাস। দূরে তুষার ঢাকা পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে নিঃশব্দ প্রহরীর মতো। পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে আসা সূর্যের আলো চোখে পড়তেই উদ্যানের বুকের ভেতর অদ্ভুত এক শীতল শান্তি জমে উঠল।
গাড়ির ভেতর কোনো কথা নেই। শুধু ইঞ্জিনের মৃদু শব্দ , আর কাঁচের ওপারে ছুটে চলা দৃশ্যপট। উদ্যান জানালার দিকে তাকিয়ে রইল। গাড়ির নিস্তব্ধতা ভেঙে জিহাদ বলল।
“তো? আমার ভাবীর কি খবর? তাকে ছেড়ে চলে আসলি। কেমন লাগছে।”
উদ্যানের ধ্যান ভাঙ্গে জিহাদের কথায়। চোখের সামনে ভেসে উঠলো মায়াবী মুখটা। বুকের বাঁ পাশটা চিনচিনে ব্যথা করছে। জিহাদের পানে ঠান্ডা গলায় বলল।”প্লিজ। আমার রুহির কথা জিজ্ঞেস করিস না। বুক কেঁপে উঠে। ওকে ছেড়ে আসতে, আমার দুনিয়া কেঁপে উঠেছিল।”
জিহাদ বুঝতে পারছে মনের অবস্থা। মনের মানুষ ছেড়ে আসা এতো সহজ না। সামনের রাস্তায় চোখ রেখে বলল।”কবে ঘরে তুলবি ভাবীকে? ভাবীর অভাবে তো পাগল হয়ে যাবি। এতো বছর থাকবি কিভাবে?”
উদ্যানের দুনিয়া যেন ঘুরছে। মুখ ফুটে কিছু বলতে পারছে না কষ্টের কথা। আবেগ জড়ানো কন্ঠে বলল।”দেশে ফিরে যাই। ওকে আমি হালাল করে ঘরে তুলব। খুব শীঘ্রই।”
“আরো অনেক বছর। আর,,
উদ্যানের দিকে তাকালো কথাটা শেষ না করে। উদ্যান নিজেও কপাল কুঁচকে তাকায়।
“তার কথা জিজ্ঞেস করছি। কেমন আছে সে?”
উদ্যানের মুখ থমথমে হয়ে গেল। স্বাভাবিক কন্ঠে বলল।”ভালো।”
দুজনের মধ্যে আর কোনো কথা নেই। পুনরায় নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে।গাড়ি ছুটছে তার গন্তব্যে।
.
.
রাফসা দরজা আটকে বারান্দায় এসে দাড়ালো। রাস্তার ধারে চোখ যেতেই বুক কেঁপে উঠলো। গতকাল রাতের কথা মনে পড়তেই শরীর অসাড় হয়ে আসছে। চোখ কিছুটা ভিজে আসছে। ঠোঁট কামড়ে কান্না আটকানোর চেষ্টা করল। তবে, চোখ বেঈমানি করছে খুব। কিছু সময় একা নিরালা বসে রইল। তারপর ফ্রেশ হতে চলে যায়। একেবারে গোসল করেই বেরিয়েছে। শরীর পাতলা লাগবে কিছুটা। চোখ মুখ শুকিয়ে আছে।ঊষা ঘুম থেকে উঠে বসে। আশেপাশে তাকিয়ে রাফসাকে খুঁজল। তখনই খট করে দরজা খুলে বের হল রাফসা। ঊষা ভ্রু কুঁচকে জড়ো কন্ঠে বলল।”এতো সকালে গোসল করেছিস কেনো? ঠান্ডা লাগবে তো।”
“এতো সকাল না আপু। দশটা বাজছে। শরীরটা ভারী লাগছে, তাই গোসল করেছি। এখন হালকা লাগছে।”
সময়ের কথা শুনে চোখ কপালে উঠে গেল ঊষার। এতো বেলা পর্যন্ত ঘুমিয়েছে। তড়িঘড়ি করে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। রাফসাকে বলল।” তুই নিচে যা। আমি ফ্রেশ হয়ে আসছি।”
রাফসা মাথা নাড়ল। ঊষা ফ্রেশ হতে চলে যায়। রাফসা বিছানা গুছিয়ে রাখে। আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে মুখমণ্ডল দেখে। চেহারার বেহাল দশা। ভেজা চুলগুলো আঁচড়ে ছেড়ে দেয়। মুখে ময়শ্চারাইজার লাগিয়ে নিল।ওড়নাটা নিয়ে মাথায় লম্বা করে ঘোমটা টেনে নেয়। দীর্ঘশ্বাস ফেলে রুম ত্যাগ করে।
আজ ড্রইং রুমে যেন প্রাণ নেই। পুরো ফরাজী বাড়িটা প্রাণহীন হয়ে উঠেছে। নিস্তব্ধতা বিরাজ করছে। গৃহিণীরা নাস্তা তৈরি করে অতিথিদের দিচ্ছে। অতিথি বলতে, উদ্যানের মামার বাড়ির লোকজন। ওরা কাল থেকে গিয়েছে। আজ চলে যাবে বিকেলে।রাফসা ধীরে কদম ফেলে নিচে নেমে আসে। ডাইনিং টেবিলে চোখ যায়। অতিথিরা নাস্তা করছে। তবে প্রতিদিনের মত আজ একজনকে চোখে পড়ছে না। এতো এতো মানুষের ভিড়ে একটা মানুষের অভাব যে। রাফসা সোফায় গিয়ে বসল। হুমাইরা ফরাজী মেয়েকে দেখে ছুটে আসে। কাল রাতে না খেয়ে ছিল। জোড়াজুরি করেও খাওয়াতে পারেনি। তাই ছুটলেন মেয়ের পানে। রাফসার সামনে এসে মেয়ের চেহারা দেখে অবাক হয়ে গেল উনি। এক রাতেই মেয়ের চেহারার পানে তাকানো যাচ্ছে না। উৎকণ্ঠা হয়ে জিজ্ঞেস করল।”কি হয়েছে আম্মু? তোমার চোখ মুখের এই অবস্থা কেনো?”
রাফসা মৃদু কন্ঠে বলল।”তেমন কিছু না আম্মু। রাতে ঘুম হয়নি ভালো। তাই এমন দেখাচ্ছে।”
হুমাইরা ফরাজী এইবার কন্ঠ জোড়ালো করে বলল।”না খেয়ে থাকার কারণে হয়েছে। কাল রাতেও খাসনি। এখনো কতটা বেলা হয়েছে। সেই খবর আছে তোর?”
রিশান মায়ের কথা শুনে উঠে আসল। ও এখন খেতে চায়নি। কিন্তু মেহমানরা জোর করে বসিয়ে দিয়েছে। রিশান এগিয়ে এসে বলল।”আম্মু তুমি নাস্তা নিয়ে আসো। যাও।”
হুমাইরা ফরাজী রাগে গজগজ করতে করতে চলে গেল। রিশান বোনের সাথে বসে। ওর দিকে তাকিয়ে বলল।”কি হয়েছে রাফসু? তোর শরীর ভালো নেই? শরীরের এই অবস্থা কেনো?”
ভাইয়ের কথায় মৃদু হাসে। সবাই শরীরের দিক দেখছে । কিন্তু ভেতরটা কেউ দেখছে না। মনে মনে ভাবে।
“শরীর তো ভালো হয়ে যাবে। কিন্তু, মনের অসুখ কি করে সারবে।
মুখে বলল।”কিছু হয়নি ভাইয়া। শুধু শুধু চিন্তা করছো। রাতে ঘুম হয়নি ভালো।”
রিশান ভ্রু কুঁচকে বলল।”তোর ঘুম হয়নি? তোকে ঘুমাতে দিলে তো সারাদিন ঘুমাতে পারবি।”
রাফসা আবার হাসে। আগের দিন তো এখন আর নেই। আগের দিন, আর আজকের দিনের মধ্যে আকাশ পাতাল পার্থক্য।হুমাইরা ফরাজী নাস্তা নিয়ে আসে। টেবিলে রেখে বলল।”সব যেন খাওয়া হয়। বেঁচে গেলে একটা মাইর মাটিতে পড়বে না।”
থমথমে গলায় কথাটা বলে ওনি চলে যায়। রিশান নাস্তার প্লেট থেকে পরোটা তুলে নেয় হাতে। ডিম দিয়ে ছিড়ে রাফসার মুখে ধরে। রাফসা বাধ্য মেয়ের মত হা করে খাবারটুকু মুখে পুরে নিল। চিবোতে কষ্ট হচ্ছে। যেন কোনো পাথর খেতে দিয়েছে। একটা পরোটা খাওয়া হলে রিশান আরেকটা পরোটা নেয়। রাফসা বাঁধা দিয়ে বলল।”ভাইয়া আর খেতে পারব না। প্লিজ।”
রিশান বোনের মুখের দিকে তাকিয়ে রেখে দেয়। জোর করে খাওয়ালে বমি করে দিবে। পানির গ্লাস তুলে নিজের হাতেই খাইয়ে দিল। তারপর টিস্যু দিয়ে মুখ মুছে দিয়ে বলল।”এখন রুমে যাওয়ার দরকার নেই। এখানে বসে থাক। মানুষের ভিড়ে থাকলে খারাপ লাগবে না। “
রাফসা মাথা নাড়ল। রিশান মৃদু হাসে। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে উঠে দাড়ালো। দু কদম সামনে ফেলে পুনরায় পেছনে ফিরে। ঠান্ডা গলায় বলল।”এভাবে ভেঙে পড়িস না। নিজেকে গড়ে তোল। যাতে আর কেউ ভাঙতে না পারে।”
কথাটা বলেই উল্টো ঘুরে চলে যায়। রাফসা মাথা তুলে তাকায়। ভাইয়ের কথায় অবাক হয় বেশ। বুঝতে পারলো না। কথাটার মানে। ভাইয়া কি কিছু জানে? রাফসা হাত মুষ্টিবদ্ধ করে ধরে রাখে।
.
.
.
ঘরটায় নরম আলো জমে আছে। জানালার পর্দা আধখানা সরে, সকালের ম্লান রোদ ঢুকে পড়েছে ভেতরে। আলোটা গিয়ে থেমেছে বিছানার পাশে রাখা কাঠের টেবিলের ওপর। ঘরটায় একধরনের নীরবতা, যে নীরবতা ঘুমন্ত মানুষের নিঃশ্বাসে ধীরে ধীরে ভেঙে যায়।
বিছানার মাঝখানে আভিয়ান ঘুমিয়ে আছে গভীরভাবে। সাদা চাদরটা তার শরীরের ওপর এলোমেলোভাবে পড়ে আছে—কাঁধ থেকে একটু সরে গিয়ে বুকের শক্ত গঠনটা স্পষ্ট করে তুলেছে। ঘুমের মধ্যেও তার বুক উঠানামা করছে ছন্দে ছন্দে, শান্ত কিন্তু দৃঢ়। মুখটা একদিকে ঘোরানো, চোখের পাতা বন্ধ, লম্বা পাপড়িগুলো গালের ওপর ছায়া ফেলেছে। কপালের একপাশে কয়েক গোছা চুল নেমে এসেছে, ঘুমে এলোমেলো হয়ে আরও সুন্দর লাগছে।
তার শরীরের গঠন যেন নিজের মধ্যেই এক ধরনের শক্তি ধরে রেখেছে। প্রশস্ত কাঁধ, দৃঢ় বাহু—যেন কাজ করতে অভ্যস্ত শরীর, অথচ এখন ঘুমে শান্ত। হাত দুটো বিছানার পাশে ঢিলে হয়ে পড়ে আছে, আঙুলগুলো একটু বাঁকানো। কবজির শিরাগুলো স্পষ্ট, কিন্তু তাতে কোনো রুক্ষতা নেই—বরং ঘুমের নরমতায় ঢাকা পড়েছে সবকিছু।
ঘুম ভাঙার মুহূর্তটা ধীরে আসে। প্রথমে ভ্রু দুটো সামান্য কুঁচকে যায়, যেন কোনো অচেনা স্বপ্ন তাকে ছুঁয়ে গেছে। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ নড়াচড়া—একটা নিঃশ্বাস ভারী হয়ে ওঠে। তারপর চোখের পাতা কাঁপে, ধীরে ধীরে খুলে যায় চোখ। ঘুম জড়ানো দৃষ্টিতে সে কিছুক্ষণ ছাদের দিকে তাকিয়ে থাকে, যেন বাস্তব আর স্বপ্নের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে।
আভিয়ান হাতটা তুলে চোখে ঘষে, শরীরটা একটু মোচড় দেয়। ঘরটা আবার ভরে ওঠে তার উপস্থিতি। শরীরের দৃঢ়তা আর ঘরের আবহ মিলিয়ে তৈরি হয় এক অনুচ্চারিত টান। শোয়া থেকে উঠে বসে। ঠোঁটে মুচকি হাসি। চুলগুলো ঠিক করতে করতে বলে।”মায়াবী। তোমার নামে দিন শুরু করলাম। আমার মায়াবী। কবে এমন একটা সকাল আসবে? যেদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে তোমাকে আমার পাশে দেখবো। আর কতদিন অপেক্ষা করতে হবে জানিনা। তুমি যে এখনো ছোট। তবে, খুব করে চাই সে দিনটা যেন খুব শীঘ্রই আসে।”
মুখে তার স্নিগ্ধ হাসি। মায়াবীর নামে দিন শুরু করতে পেরে যেন অনেক খুশি।
.
.
.
রাফসা ড্রইং রুমে বসে থাকেনি। বোরিং লাগছিল। তাই হাঁটতে হাঁটতে বাগানে চলে আসে
বাড়ির বাগানটা সকালের আলোয় ধুয়ে গেছে। নরম রোদ পাতার ফাঁক গলে মাটিতে ছায়ার নকশা এঁকে দিচ্ছে। চারপাশে রঙিন ফুলের সারি—গোলাপ, জুঁই, রজনীগন্ধা—সব মিলিয়ে বাতাসে মিষ্টি একটা গন্ধ ভাসছে। সেই সুবাসের মাঝেই ধীরে ধীরে বাগানে পা রাখে রাফসা।
হাওয়ায় ওর চুল উড়ছে। কালো ঘন চুলগুলো কখনো কাঁধ ছুঁয়ে যায়, কখনো গালের পাশে এসে নাচে। বাতাস যেন ইচ্ছে করেই ওকে ঘিরে খেলছে। প্রতিটা পদক্ষেপে চুলের ঢেউ আর ওর চলার ছন্দ মিলে যায় এক অদ্ভুত সুরে। রোদ্দুর এসে পড়েছে ওর গায়ে, শ্যামলা ত্বকে আলোটা আরও গভীর হয়ে উঠেছে—যেন মাটির রঙের সঙ্গে রোদের মেলবন্ধন।
ফুলের মাঝে দাঁড়িয়ে রাফসাকে ঠিক মানুষ মনে হয় না। মনে হয় যেন বাগানের ভেতর থেকেই জন্ম নিয়েছে সে—একটা পরির মতো, কিন্তু মাটির কাছাকাছি থাকা পরি। ওর চোখে আছে নরম দীপ্তি, গভীর অথচ শান্ত। ঠোঁটের কোণে ক্ষীণ হাসি, যা ফুলের পাপড়ির মতোই নরম। শ্যামলা গায়ের সঙ্গে ওর উপস্থিতি এমনভাবে মিশে গেছে যে ফুলগুলোও যেন একটু নত হয়ে তাকিয়ে আছে ওর দিকে।
ওর চলনে কোনো তাড়াহুড়ো নেই। পাতার ওপর পা পড়লে হালকা শব্দ হয়, আর সেই শব্দের সঙ্গে মিশে যায় পাখির ডাক। ফুলের ডাল ছুঁয়ে গেলে পাপড়ি কেঁপে ওঠে, ঠিক যেমন বাতাসে ওর চুল কেঁপে ওঠে। মুহূর্তের জন্য মনে হয়—বাগানটা শুধু বাগান নয়, এটা রাফসার জন্য তৈরি একটা স্বপ্নের জায়গা।
এই বাগানে, এই আলোতে, এই বাতাসে রাফসা যেন গল্পের এক জীবন্ত দৃশ্য। শ্যামলা রঙের গভীরতা, উড়ন্ত চুলের স্বাধীনতা আর ফুলের মাঝে দাঁড়ানো এক জীবন্ত পরী।
বাগানের গোলাপ গাছগুলো উদ্যানের হাতে লাগানো। রাফসার পছন্দের তালিকায় এই ফুল সর্বপ্রথম। উদ্যান রাফসাকে একদিন রেজাল্টের জন্য অনেক বোকেছিল। রাগ করে রাফসা উদ্যানের সাথে কথা বলা বন্ধ করে দেয়। উদ্যান রাফসাকে খুশি করতে গোলাপ গাছের চারা এনে নিজের হাতে লাগায়। রাফসাকে টেনে বাগানে এনে গাছগুলো দেখিয়ে বলল।”রাগ করছিস কর। যদি রাগ দেখানোর জন্য আমি কখনো না থাকি। তাহলে এই গোলাপ গাছের কাছে আমার নামে অভিযোগ করবি।”
ছোট রাফসা সেদিন এই কথার মানে বুঝেনি। গাছগুলো দেখে খুশিতে আত্মহারা হয়ে পড়ে। সকাল বিকাল যত্ন করতো। গাছের ফুলগুলো ছুঁয়ে দিয়ে মৃদু হেসে বলে।”সে তো নেই আমার কাছে। সেদিন যদি বুঝতে পারতাম — আমি তাকে হারিয়ে ফেলবো। তাহলে শক্ত করে চেপে ধরে রাখতাম। কখনো হারিয়ে যেতে দিতাম না। তোরা কিন্তু তার মতো হারিয়ে যাস না।”
রাফসা কথা বলার মাঝেই পেছনে কারো উপস্থিত টের পায়। পেছনে ফিরে উদ্যানের মামাতো ভাইকে তাকিয়ে থাকতে দেখে। অনিক আহসান নাম। মোটেই সুবিধার না। চরিএে দোষ আছে। রাফসা ওকে দেখে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে নিলেই ওর সামনে ঢাল হয়ে দাঁড়ায়। বাকা হেসে বলল।”এতো তাড়া কিসের সুন্দরী? আমার সাথেও একটু কথা বলো।”
রাফসা বিরক্ত হয়ে চোখ মুখ কুঁচকে বলল।”সামনে থেকে সরুন ভাইয়া। যেতে দিন।”
অনিক বাঁকা হেসে বলল।”ভাইয়া মানে কি জানো?”
রাফসা ভ্রু কুঁচকে তাকায়। ওর দৃষ্টি দেখে অনিক বলল।”ভাইয়া অর্থ সাইয়া। আমি মাইন্ড করব না। কিন্তু মাঝে মাঝে তো জান সোনাও বলতে পারো। আই হ্যাভ নো প্রবলেম।”
রাফসা শাসিয়ে আঙুল তুলে বলে।”খবরদার। বেয়াদবি করবেন না আমার সাথে। আমি মেয়ে এতোটাও ভোলাভালা নয়।”
অনিক ভয় পাওয়ার ভান করে দুহাত সেরেন্ডার করে বলে।”ওমা ভয় পেয়েছি তো। আমি একটা মাসুম বাচ্চা। এমন করে ভয় দেখানোর কি প্রয়োজন বেবি?”
রাফসা বিরক্ত হয়ে বলল।”আবাল কোনখানের।”
তারপর গটগট করে যায়। অনিক পেছন থেকে তাকিয়ে বাঁকা হাসে।
.
সব অতিথির নাস্তা করা শেষে বাড়ির গৃহিণীরা নাস্তা করতে বসে। আজ অনেক বেলায় নাস্তা করছে। ড্রইং রুমে সবাই বসে আড্ডা দিচ্ছে। রাফসা দরজা দিয়ে ভেতরে ঢুকে। এমন সময় রোহান মোবাইল নিয়ে দৌড়ে এসে বলল।”উদ্যান ফোন করেছে।”
রাহেলা ফরাজী খাবার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালো। সবাই এক নিমিষেই শান্ত হয়ে গেলো। উদ্যান ফোন করেছে শুনে বুকটা ধক করে উঠল রাফসার। উদ্যান একে একে খুঁজে সবার সাথে কথা বলছে।রোহান ফোন নিয়ে বলল।”তোর পৌঁছাতে কোনো সমস্যা হয়নি তো?”
“না। কোনো সমস্যা হয়নি।”
রোহানের চোখ পড়ে রাফসার পানে। ওর দিকেই তাকিয়ে আছে।সবার সাথেই কথা বলেছে, রাফসা ছাড়া। তাই উদ্যানকে বলল।”সবার সাথেই কথা বলেছিস। রাফসার সাথে,,,,
রোহানের কথা শেষ করতে না দিয়েই উদ্যান বলল।”রাখছি। পরে ফোন দিবো। খুব টায়ার্ড।”
কথাটা বলেই ফোন কেটে দিল। ভিডিও কলে থাকায় শুনতে পেয়েছে।রাফসা এই কথায় মুখে মলিন হাসি ফুটে উঠল। ও বুঝতে পেরেছে, বাহানা দিয়ে ফোন কেটে দিয়েছে।রাফসা আর দাঁড়ায়নি। রুমের দিকে যেতে যেতে মনে আওড়ালো।
“পাষাণ হৃদয়হীন পুরুষ —
তুমি সবার সাথে কথা বললে,
শুধু বললে না আমার সাথেই…!!”
চলবে…?
রাফসাকে ন্যাকা লাগলে স্কিপ করুন।রিচেক দেয়নি। বানান ভুল হলে মেনশন করবেন। আর গল্পটি ভালো লাগলে আপনার বন্ধুদের শেয়ার করবেন।
Share On:
TAGS: প্রেয়সীর অনুরাগ, সাদিয়া জাহান সিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৯
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৮
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৪
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৭(প্রথমাংশ + দ্বিতীয়াংশ)
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২
-
প্রেয়সীর অনুরাগ গল্পের লিংক
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৫(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১০