প্রেয়সীর_অনুরাগ
লেখনিতে —#সাদিয়াজাহানসিমি
পর্ব_১০
প্রকৃতির সকাল মানেই এক অনাবিল প্রশান্তি,এক নির্মল সৌন্দর্যের উৎসব। ভোরের প্রথম আলোর রেখা যখন আকাশের অন্ধকার ছেদ করে আসে, তখন পুরো প্রকৃতি যেন নতুন প্রাণে জেগে ওঠে। রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে পাখিরা কলতান তোলে, শালিক, দোয়েল, বুলবুল কিংবা কোয়েলের কন্ঠে ভেসে আসে এক অনন্য সুর। শিশির ভেজা ঘাসের উপর হেঁটে গেলে ঠান্ডা স্নিগ্ধ হৃদয়কে অন্যরকম অনুভূতি দেয়। প্রকৃতি চলছে তার গতিবিধির মাধ্যমে, বয়ে চলে আপনমনে। দেখতে দেখতে সে কাঙ্ক্ষিত দিনটি চলেই এলো। আজ রাফসার এইচএসসি পরীক্ষার রেজাল্ট বের হবে। এ প্লাস এলেই মেডিকেলের জন্য প্রিপারেশন নিবে ধুমচে।
ভোর চারটা,,
সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারেনি রাফসা। এপাশ – ওপাশ করতে করতে মাঝ রাতে ঘুমিয়েছে। রেজাল্টের টেনশনে ঘুম হারাম হয়ে গেছে। খাওয়া দাওয়া পর্যন্ত করতে পারছে না ঠিকমত। টেনশনে মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে। যদিওবা পরীক্ষা ভালো দিয়েছে, তবুও মনের মধ্যে একটা ভয় কাজ করছে। রাফসা পরীক্ষা দিয়ে এসে কখনো মিলিয়ে দেখেনি এমসিকিউ কয়টা হয়েছে। প্রশ্ন এনে ফেলেছে এক কোণে,তার আর কোনো হদিস পাওয়ার সম্ভাবনা ছিল না। ওর কথা একটাই, আজকে বাসায় এসে প্রশ্ন মিলিয়ে যদি দেখি পরীক্ষা তেমন ভালো হয়নি,তাহলে তো পরবর্তী পরীক্ষাগুলো খারাপ হবে। আগের পরীক্ষা খারাপ হওয়ার জন্য পরের গুলোতে ফোকাস করতে পারবে না।
আজান দেওয়ার আগেই রাফসার ঘুম ভেঙ্গে গেল। দু – তিন ঘণ্টা আগেই ঘুমিয়েছে। পর্যাপ্ত পরিমাণ ঘুম না হওয়ায় মাথাটা ভার হয়ে আছে। লাল রঙের জিরো লাইট জ্বলছে রুমে। গভীর নীরবতার ভেতর ঘরটা নিঃশব্দ হয়ে আছে, শুধু জিরো লাইটের মৃদু আলো ছায়ার মতো দেয়াল ছুঁয়ে আছে। সেই নরম আলো সরাসরি এসে পড়েছে ওর মুখের উপর—চোখের পাতার ফাঁক গলে আলোটা যেন ওকে ধীরে ধীরে জাগিয়ে তোলে।
চোখ মেলে তাকাতেই রাফসা কিছুক্ষণ স্থির হয়ে থাকে। ঘুম আর জাগরণের মাঝামাঝি এক অদ্ভুত অনুভূতি। বুকের ভেতর ধীর শ্বাস-প্রশ্বাস, কানের কাছে নিজের নিঃশ্বাসের শব্দই যেন সবচেয়ে স্পষ্ট। বালিশে এলোমেলো ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো আলোয় হালকা ঝিলমিল করছে। চোখ দুটো একটু কুঁচকে আসে, আলোটা সহ্য করতে গিয়ে।
ধীরে ধীরে ও পাশ ফিরে শুয়ে থাকা অবস্থায় উঠে বসে। ঘড়ির দিকে তাকায়—ভোর চারটা। বাইরে তখনো রাতের শেষ অন্ধকার লেগে আছে। জানালার ফাঁক দিয়ে আসা বাতাসে হালকা শীতলতা, আর সেই নীরব ভোরে রাফসার মনে অজানা এক ভাবনার ঢেউ উঠে যায়। ঘুম ভেঙে গেলেও মনটা যেন এখনো স্বপ্নের আবেশ ছাড়তে চায় না।এর মধ্যেই ফজরের আযানের ধ্বনি ভেসে আসে।
রাফসা বেড থেকে পা গুলো নিচে নামাতে নামাতে দুই হাত উঁচিয়ে, লম্বা ছাড়ানো চুলগুলো পেঁচিয়ে খোঁপা করে নিল। বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়, সুইচবোর্ডের কাছে গিয়ে এনার্জি লাইক জ্বালিয়ে দিল। মুহূর্তেই পুরো ঘর ফকফকা আলোয় ভরে উঠে। রাফসা ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যায়।দশ মিনিট বাদে ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে। ফজরের নামাজ আদায় করার জন্য ওযু করে নিল।সাদা হিজাবটা মাথায় পড়ে নেয়। জায়নামাজ বিছিয়ে সালাত আদায় করে নিল।আধ ঘন্টা কুরআন তেলাওয়াত করল। সবশেষে নিজের জন্য দোয়া চাইল।
সবশেষে রাফসা উঠে দাঁড়ায়। জায়নামাজ ভাঁজ করে রেখে দেয়। পা পর্যন্ত সাদা হিজাবে রাফসাকে সাদা কবুতরের ন্যায় দেখাচ্ছে। ইতোমধ্যে ভোরের আলো আধো আধো করে ফুটছে। অন্ধকার মিলিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। রাফসা বারান্দায় গিয়ে দাঁড়ায়। রেলিং ধরে দূর আকাশের পানে চেয়ে রইল। ফজরের সালাত আদায় করায় মনটা হালকা লাগছে অনেক। বারান্দায় বিশ মিনিটের মতো ছিল। তারপর রুমে চলে আসে। হিজাবটা খুলে আলমারিতে ভাঁজ করে তুলে রাখে। এলোমেলো রাফসা এখন অনেকটা গোছালো হয়ে গেছে। ড্রেসিং টেবিলের সামনে দাঁড়িয়ে হাত খোঁপা করা চুলগুলো ছেড়ে দিল। হাত বাড়িয়ে চিরুনি তুলে চুলে চালায়। কোমর ছাড়িয়ে নেমে আসা চুলগুলো সযত্নে আঁচড়ে ছেড়ে দেয়। রুম থেকে বেরিয়ে কিচেনে গিয়ে নিজের জন্য এক কাপ কফি বানিয়ে নিল। কফির কাপ হাতে নিয়ে গুটিগুটি পায়ে ছাদের দিকে পা বাড়ায়।
ভোরের আলো ধীরে ধীরে অন্ধকারকে সরিয়ে নিয়েছে। আকাশের গায়ে হালকা নীলের সঙ্গে মিশে আছে সোনালি আভা। সেই সময় রাফসা ছাদের সিঁড়ি বেয়ে ওপরে উঠে আসে। পায়ের নিচে ঠান্ডা সিমেন্ট, চারপাশে নিস্তব্ধতা—যেন পুরো শহরটা এখনও আধঘুমে।
পূর্ব আকাশে সূর্যটা মাথা তুলে দাঁড়িয়েছে। প্রথম আলো ছড়িয়ে পড়তেই ছাদের চারপাশ রঙিন হয়ে ওঠে। সূর্যের সোনালি রোশনিতে রাফসার মুখটা উজ্জ্বল হয়ে যায়, চোখে পড়ে একধরনের প্রশান্তি। গভীর শ্বাস নিয়ে সে সামনে তাকিয়ে থাকে—ভোরের সেই নির্মল সৌন্দর্যে মনটা ধুয়ে-মুছে যাচ্ছে।
হালকা বাতাস বইছে। রাফসার কোমর অবধি লম্বা চুলগুলো বাতাসে উড়ে যাচ্ছে এলোমেলোভাবে। কখনো চুল এসে ছুঁয়ে যাচ্ছে ওর গাল, কখনো পিঠের উপর নরম ঢেউয়ের মতো দুলছে। সেই মুহূর্তে রাফসাকে মনে হয় প্রকৃতিরই একটা অংশ—ভোরের আলো, নীল আকাশ আর উড়ন্ত চুলের মাঝে দাঁড়িয়ে থাকা এক শান্ত সত্তা।
দূরে পাখিরা ডানা মেলে উড়ে যায়, ভোরের প্রথম ডাক ছড়িয়ে পড়ে চারপাশে। ছাদের কিনারায় দাঁড়িয়ে রাফসা চোখ বুজে কিছুক্ষণ থাকে। সূর্যের উষ্ণতা গায়ে লাগছে, বাতাসের স্পর্শে বুক ভরে যাচ্ছে নতুন দিনের আশ্বাসে। সেই ভোরে রাফসার চারপাশে শুধু আলো আর নীরব সৌন্দর্য—যেন নতুন শুরুটা তাকে নিঃশব্দে আলিঙ্গন করে নিচ্ছে। কফির কাপে চুমুক দিয়ে আবেশে চোখ বুজে ফেলল রাফসা। ঠান্ডা স্বচ্ছ বাতাসে রাফসার শরীর যেন মোমের মতো গলে পড়ছে। দূর আকাশে পাখি উড়ে বেড়াচ্ছে। ভোরের শান্ত স্নিগ্ধ শোভন পরিবেশে রাফসা গুনগুন করে গান গেয়ে উঠে।
Jis raah pe, hai ghar tera
Aksar wahan se
Haan main Hoon guzara
Shayed yahin Dil main Raha
Tu mujko ko mil jaye
Kya pata…..
Kya hai yeh silsala
Janu na, main janu na
Dil….
Sambhal ja zara
Phir mahabbat Karne
Chala hai tu
Dil…
Yahin ruk ja zara
Phir mahabbat Karne
Chala hai tu
গানটা গেয়ে নিঃশব্দে আকাশ পানে একদৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল রাফসা। বুকটা ভার লাগছে হঠাৎ করে। কিছু পাওয়ার আকাঙ্ক্ষা, কিছু হারানোর বেদনা। সেই প্রায় তিন বছর আগে ফেলে এসেছে সব। বুকে পাথর চেপে গড়ে তুলেছে নিজেকে তিলে তিলে। শত ক্লান্ত শুষে নিয়েছে। আজকের রাফসা হয়ে উঠা এতো সহজ ছিল না। নারীর ধৈর্য্য আকাশ পরিমাণ,সেই প্রমাণ বোধহয় রাফসা বহুবার পেয়েছে। আজ অনেকদিন পর সেই পাষাণ পুরুষের কথা মনে পড়ছে। আগের মতো আর ভালোবাসা কাজ করে না তার প্রতি। তবুও কিশোরী বয়সের প্রথম প্রেম — প্রথম ভালোবাসা ভুলে যাওয়া এতোটাও সহজ না।বুকের এখ কোণে হয়তো আজো চিনচিনে ব্যথা অনুভব করে, তার কথা মনে হলে।
উদ্যান ঘুমিয়ে আছে নিজের ঘরে। ভোরের আলো পর্দার ফাঁক গলে মেঝেতে পড়েছে, ঘরটায় নীরবতা। ধীরে ধীরে ওর ঘুম ভাঙে। চোখ মেলে ছাদের দিকে তাকিয়ে কয়েক সেকেন্ড স্থির থাকে, একটা নতুন দিনের প্রস্তুতি যেন সেখানে।
বিছানা ছেড়ে উঠে ওয়াশরুমে যায় উদ্যান। কল খুলতেই ঠান্ডা পানির শব্দে ঘুমের রেশ কেটে যায়। জল গড়িয়ে পড়ে কাঁধ, বুক আর পিঠ বেয়ে। পরিষ্কার পানির ছোঁয়ায় শরীরটা সজীব হয়ে ওঠে। আয়নার সামনে দাঁড়ালে দেখা যায় পরিশ্রমে গড়া শরীর—পেটের ওপর স্পষ্ট ছয়টি পেশির রেখা, বুক আর কাঁধের পেশি টানটান। গোসল শেষে তোয়ালে দিয়ে মাথা আর শরীর মুছতে মুছতে বেরিয়ে আসে।তার আত্মবিশ্বাসটা আরও দৃঢ় হয়।
তারপর আলমারির সামনে দাঁড়ায় উদ্যান। পড়ার জন্য বেছে নেয় হালকা নীল রঙের একটি শার্ট—পরিপাটি, কিন্তু স্বচ্ছন্দ। ভেতরে সাদা ভেস্ট, নিচে গাঢ় নীল জিন্স। পায়ে কালো লেদার জুতো। কবজিতে ধাতব ঘড়ি, হালকা সুগন্ধি—সব মিলিয়ে একটা শান্ত, দৃঢ় উপস্থিতি।
আয়নায় শেষবার নিজেকে দেখে উদ্যান। চোখে একরাশ স্থিরতা, মুখে নির্ভার ভাব। দরজা খুলে বেরিয়ে আসে ।
জিহাদ ড্রইং রুমে বসে ফোন টিপতে ব্যস্ত। আশেপাশে কেউ নেই যেন। উদ্যান এগিয়ে এসে ওর সামনে দাঁড়াল। সামনে কাউকে দাঁড়াতে দেখে চোখ তুলে তাকায় জিহাদ। উদ্যানকে নিজের সামনে ভ্রু কুঁচকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে উঠে দাঁড়ালো। পকেটে ফোন ঢুকিয়ে বলল। “আজ এতো তাড়াতাড়ি উঠে পড়লি যে? রাতেই তো ডিউটি করে ফিরলি। তাও এতো সকালে উঠেছিস, কিন্তু কেন?”
উদ্যানের কুঁচকানো ভ্রু যুগোল শিথিল হলো যেন হঠাৎ। জিভ দিয়ে ঠোঁটের অগ্রভাগে ভিজিয়ে নিল। ঠোঁট কামড়ে চোখ ঝাপটে ঘনঘন পলক ফেলল। “কাজ আছে, তাই উঠে পড়েছি। শপিং মলে যাবো। তুই যাবি,নাকি ঘুমবি?”
জিহাদ ভ্রু নাচিয়ে জিজ্ঞেস করে। ” সবে নয়টা বাজছে, তুই এতো সকালে শপিং মলে গিয়ে করবিটাই বা কি? বাই এনি চান্স, তুই কি ডেট করতে যাচ্ছিস? ও মাই গড, তাহলে তোর রুহির কি হবে ব্রো? এই ছিল তোর মনে? শালা তোকে আমি কতটা লয়াল ভেবেছিলাম। তুই তো দেখি তলে তলে টেম্পু চালাচ্ছিস।”
জিহাদের অতিরিক্ত কথায় কপালে বিরক্তিকর ভাঁজ ফুটে উঠল উদ্যানের। জিভ দিয়ে গাল ঠেললো। হাত ঘড়ি থেকে টাইম দেখে শান্ত স্বরে বলল। ” রেস্টুরেন্টে গিয়ে আগে ব্রেকফাস্ট করব। দ্যন, কিছু কেনাকাটা করব। আই থিংক, আজ সারাদিন লাগবে। তুই যেতে চাইলে আয়। নয়তো আমি একাই চলে যাচ্ছি। “
জিহান ওমনি লাফিয়ে উঠলো। উদ্যানকে কিছু বলতে না দিয়ে ছুটল রুমের পানে। উদ্যান সেদিকে তাকিয়ে চলে গেল বাইরে।
;
;
বেলা একটা বাজছে। দুইটায় রাফসার রেজাল্ট পাবলিশড হবে। অতিরিক্ত টেনশনে হাত পা ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে রাফসার। রুমে পাইচারি করছে অনবরত। ঠোঁট কামড়ে ধরে রেখেছে। সেই সময় দরজা খুলে ভেতরে ঢুকে মাইশা ঊষা । রাফসা তখনো ওদের খেয়াল করেনি। অনবরত এদিক ওদিক হাঁটছে। মাথা নিচু করে ফ্লোরের দিকে তাকিয়ে আছে। মাইশা ওকে দেখে মুখ টিপে হাসে খানিক। পা টিপে টিপে রাফসার পেছনে গিয়ে দাঁড়ালো। জোরে চিৎকার করে উঠল। অন্যমনস্ক রাফসার কোনো ধ্যান ছিল না। হঠাৎ চিৎকারে ধরফরিয়ে উঠল। পুরো শরীর কেঁপে উঠল। পেছনে ফিরে মাইশাকে দেখে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। মুহূর্তেই খানিক রাগ দেখিয়ে বলল।” আপু,ভয় পেয়েছি তো আমি। এভাবে কেউ ভয় দেখায়! মেরে ফেলতে চাইছো নাকি?”
মাইশা হেসে ওকে জড়িয়ে ধরে। রাফসা নিজেও হাত বাড়িয়ে ধরল। মাইশা হেসে বলল। “সাইন্সের স্টুডেন্ট আবার ভয় পায়? ওরা তো খুব সাহসী হয়।”
“হুম, সাইন্সের স্টুডেন্টদের তো মানুষ মনে হয় না।ওরা তো জিন ভূত। “
মাইশা ওকে ছেড়ে দাঁড়ায়। ঊষা এগিয়ে এসে কোমড় হাত রাখে। রাফসা ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করল। “তোমার আবার কি হলো? রেগে আছো কেনো?”
ঊষা হাত বাড়িয়ে রাফসার কান টেনে ধরল। যদিওবা আস্তে ধরেছে, তবুও রাফসা চেঁচিয়ে বলল। “আপুউউউ, ব্যথা পাচ্ছি। কি হয়েছে,সেটা তো বলবা।”
ঊষা এইবার একটু জোরে কান টেনে ধরল। মুখ বাঁকিয়ে বললো। “সোনামণি, রেজাল্ট কি তোর একাই দিবে? রেজাল্টের টেনশন তোর একাই হয়, আর কারো হয় না? সবাই কি তোর মত, খাওয়া দাওয়া ছেড়ে এভাবে দেওয়ানা হয়ে ঘুরে?”
রাফসা সকালে নাস্তা করেনি। হুমাইরা ফরাজী অনেক ছুটেছে ওর পেছনে। তবে খাওয়াতে পারেনি। রাফসা খাবে খাবে করে বেলা করেছে। তবে এখনো পর্যন্ত খায়নি। সেই সকালে এক কাপ কফি খেয়েছিল। রিশান থাকলে অবশ্য আদরের সাথে খাওয়াতো। মা যথেষ্ট আদর করলেও ভাইয়ের কাছে আবদারের ঝুড়ি নিয়ে বসতে পারে।
” আপুউউ, ছাড়ো বলছি। আমি এখন খাবো না। একটু পরে রেজাল্ট বের হবে। এখন গলা দিয়ে খাবার নামবে না। একেবারে রেজাল্ট দেওয়ার পর খাবো। প্লিজ, ছাড়ো আপু।”
ঊষা ছেড়ে দিল কান। রাফসা হাত দিয়ে কান ঘষতে ব্যস্ত। মাইশা হেসে গড়াগড়ি খাচ্ছে। রাফসা রাগি চোখে তাকাল ওর দিকে। তবুও হাসছেই। ঊষা নিজেও মুখ চেপে হাসছে। রাফসার সাথে মাইশার চোখাচোখি হলেই ,বেচারির হাসি থেমে যায়। কোনো রকম সামলিয়ে ঠোঁট চেপে বলল। “রাগ করিস না। একটু পরে রেজাল্ট বের হবে। বড়দের থেকে দোয়া নে।”
রাফসা ঠোঁট বাঁকিয়ে ভেংচি কাটলো। তারপর তিনজন একসাথে আড্ডা দিতে ব্যস্ত হয়ে পড়ল।
একটা ছাপ্পান্ন বাজছে। আর চার মিনিট পর দুটো বাজবে। ফরাজী বাড়ির সকলেই ড্রইং রুমে উপস্থিত। সবাই খুব এক্সাইটেড। বিশেষ করে রাফসা,ওর হাত কাঁপছে। বুক ধড়ফড় করছে। রিশান কিছু ক্ষণ আগেই হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসেছে বাড়ীতে। বোনের রেজাল্ট ও নিজে দেখবে। সোফায় এক কোণায় বসেছে রিশান, ওর পাশেই বোনকে বসিয়ে রেখেছে। হুমাইরা ফরাজী সোফার পিছনে দাঁড়িয়ে মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত করছে। ওনি বুঝতে পারছে মেয়ের অবস্থা। দুটো বাজতেই রিশান ফোন নিল। তা দেখে ভয়ে রাফসা এইবার শব্দ করে কেঁদে উঠলো। ভাইয়ের হাত শক্ত করে চেপে ধরলো। ঊষা ওপাশ থেকে উঠে এসে রাফসার সামনে দাঁড়িয়ে ওকে ধরে। ভয়ে রাফসা এইবার ঊষাকে জড়িয়ে ধরল। রিশান ইতোমধ্যে রেজাল্ট বের করে ফেলেছে। চোখ তুলে বোনের পানে তাকালো। সবাই উৎসুক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। হুমাইরা ফরাজী টেনশনে তাড়া দিয়ে বলল। “আমার আম্মুর রেজাল্ট কি হয়েছে? বল, ও ভয় পাচ্ছে তো। “
রিশান বোনকে টেনে বুকে জড়িয়ে ধরে। মাথায় হাত বুলিয়ে শান্ত স্বরে বলল। ” গোল্ডেন ফাইভ।”
মুহূর্তেই সকলে চেঁচিয়ে উঠল। রাফসা হতভম্ব হয়ে ভাইয়ার বুক থেকে মাথা তুলে তাকাল। রিশান তা দেখে মুচকি হেসে ফোনটা বোনের সামনে ধরে। রাফসা ঘাড় বাঁকিয়ে তাকালো। ঠোঁট কামড়ে হেসে আস্তে করে উচ্চারণ করে।” আলহামদুলিল্লাহ।”
এই রেজাল্ট সবার আশায় ছিল না। রাফসা নিজেও আশা করেনি কখনো। সবাই রীতিমতো অবাক। হুমাইরা ফরাজী মেয়ের পাশে বসে ওকে জড়িয়ে ধরে। রাফসা হাসছে আজ মন খুলে। সবসময় মুখে হাসি বিদ্যমান থাকলেও তা কখনো মন থেকে হাসেনি। সেইদিনের পর থেকে রাফসা মন থেকে প্রাণ খুলে দুবার হেসেছে। একবার এসএসসি রেজাল্ট দেখে, আর আজকে আরেকবার।রোহান চেঁচিয়ে বলল।” এই মিষ্টির ব্যবস্থা কর। আমাদের রাফসা এতো ভালো রেজাল্ট করেছে। “
একে একে সবাই রাফসাকে অভিনন্দন জানায়। হুমাইরা ফরাজী রাফসার বাবাকে কল করে মেয়ের খবর জানিয়েছে। তিনি ওদিক থেকে এতোক্ষণ মেয়ের রেজাল্টের আশায় ছিল। মাহিন হাজির হয় হাত ভর্তি মিষ্টি নিয়ে। ফরাজী বাড়িতে যেন আজ উৎসবের বন্যা।
রাজীব ফরাজী দলের সবাইকে মিষ্টি বিলিয়ে দিচ্ছে। মেয়ের রেজাল্ট দেখে গর্বে ওনি আত্মহারা। বাইরে গরিব অসহায় লোকজনদের মিষ্টি দিতে বলে ওনি। কয়েকজন ছেলে মিষ্টির প্যাকেট নিয়ে বেরিয়ে পড়ল। কয়েকজন কে মিষ্টি দিতেই সামনে বিরোধী দলের নেতাকর্মীর ছেলেরা সামনে পড়ে। ওদের হাতেও মিষ্টির প্যাকেট। দুইদল মুখোমুখি হয়ে গেল। বিরোধী দলের ছেলে রানা ওদের দেখে ব্যঙ্গ করে হেসে বলল।”কি ,আজ কাল আমাদের কপি করছিস মনে হয়? তোরাও রাস্তায় মিষ্টি দিচ্ছিস? যেই শুনলি,আভিয়ান ভাই অসহায় লোকজনদের মিষ্টি দিচ্ছে,ওমনি তোরাও চলে এলি।”
রাজীব ফরাজীর দলের আরাফাত দাঁত কিড়মিড় করে বলে।”আমাদের খেয়ে দেয়ে কাজ নেই তো, তোদের কপি করতে যাবো। রাজীব আঙ্কেলের মেয়ে পরীক্ষায় ভালো রেজাল্ট করেছে,তাই ওনি মিষ্টি খাওয়াচ্ছে।”
রানা চমৎকার হেসে বলল।”বাহ্,আজ আমাদের ভাবীর রেজাল্ট বের হয়েছে। আভিয়ান ভাই সেই খুশিতে মিষ্টি দিচ্ছে। দেখলি,আমরা শএু পক্ষ হলেও কত মিল আমাদের।”
আরাফাত আর কথা বাড়ায়নি। ওদের পাশ কেটে দলবল নিয়ে সামনে এগিয়ে গেল।
পরের দিন সকালে রাফসা খানিক দেরি করেই উঠে। কাল একটু দেরি করেই ঘুমিয়েছে। সকলে মিলে অনেক রাত পর্যন্ত সজাগ ছিল। রাফসা উষা মাইশা ওরা একসাথে রাফসার রুমে ঘুমিয়েছে। ওরা দুজন নাক টেনে ঘুমাচ্ছে। রাফসা উঠে বসে। মোবাইল হাতে নিয়ে সময় দেখে দশটা বাজছে। রাফসা চোখ কপালে। আড্ডা দেওয়ার পর গ্ৰুপ করে কথা বলেছিল অনেকক্ষণ। ওদের এ প্লাস এসেছে। ওরা ভালো পড়াশোনায়। তবে আশরাফুল সাতারুল ওদের মেয়েরা মোটিভেট করেছিল অনেক। ওরা যদি ভালো রেজাল্ট না করে তাহলে আলাদা হয়ে যাবে। মেডিকেল চান্স পেতে ভালো রেজাল্ট করতে হবে। ছেলেরা সেই অনুযায়ী যথেষ্ট পড়াশোনা করেছে। যদিওবা ওরাও ভালো, কিছু শয়তানির কারণে পিছিয়ে পড়ে।
রাফসা উঠে ফ্রেশ হয়ে নিল। কালো কুর্তি শরীরে জড়ানো। চুলগুলো আঁচড়ে দুপাশে সামনে এনে রাখলো।ওরা এখনো ঘুমাচ্ছে। রাফসা রুম থেকে বেরিয়ে আসে। নিচের দিকে তাকিয়ে ঢং করে হাঁটছে। মনটা আজ বেশ ফুরফুরে। হাসতে হাসতে গান গাইছে কিছুটা জোরে।
বন্ধু রে তুই কাছে থাকলে
মনে থাকে সুখ
তোরে ছাড়া চাইনা দেখতে অন্য কারো মুখ
বন্ধুরে, বন্ধু তুই প্রথম,তুই শেষ
তোরে আমি ভালোবাসি, জানে সারা দেশ
বন্ধুরেএএএ
গানটা গাইতে গাইতে আচমকা কারো প্রশস্ত বুকে গিয়ে ধাক্কা খায়। রাফসার গানের সুর থেমে গেছে। নাকটা বোধহয় চ্যাপ্টা হয়ে গেছে। চোখ তুলে উপরে তাকালো।
রাফসা হঠাৎ করেই থেমে যায়। শক্ত অথচ স্থির সেই বুকের স্পর্শে যেন সময় এক সেকেন্ডের জন্য থমকে দাঁড়ায়। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষটা যেন নীরব উপস্থিতির এক দৃঢ় প্রতিমা। চাপ দাঁড়িতে তার মুখ আরও গম্ভীর হয়ে উঠেছে, ফর্সা চুলগুলো এলোমেলোভাবে কপালের উপর পড়ে আছে, যেন বাতাস নিজে হাতে সাজিয়ে দিয়েছে। ছয় ফুট লম্বা সুঠাম দেহ, ছাপ্পান্ন ইঞ্চির বুক আর স্পষ্ট সিক্স প্যাক, সব মিলিয়ে তার শরীরের গঠন চোখে পড়ার মতো, তবু তাতে কোনো অহংকার নেই, আছে কেবল আত্মবিশ্বাসের নীরব ভার।
উদ্যানের চোখ দুটো শান্ত, গভীর—সেই চোখে তাকিয়ে রাফসার বুকের ভেতর অদ্ভুত এক কাঁপুনি জাগে। কোনো তাড়া নেই, কোনো অস্থিরতা নেই; শুধু একটুখানি থমকে থাকা, দুই মানুষের মাঝখানে জমে থাকা নিঃশব্দ মুহূর্ত। আলো-ছায়ার খেলায় তার মুখের রেখাগুলো আরও স্পষ্ট হয়ে ওঠে, আর রাফসা অনুভব করে—এই তাকিয়ে থাকা শুধু দেখা নয়, যেন অনেক না বলা কথার ভার বহন করছে। চারপাশের শব্দ মিলিয়ে যায়, পৃথিবী সংকুচিত হয়ে আসে এই এক ফ্রেমে—রাফসা আর উদ্যান, মুখোমুখি, নিঃশ্বাসের ।
উদ্যান রাফসার চোখে চোখ রেখে হাস্কিস্বরে বলল।”তারপর?”
উদ্যানের ভয়েস টোনে মৃদু শরীর কেঁপে উঠল রাফসার। উদ্যানের চোখ থেকে চোখ সরিয়ে ওকে পাশ কাটিয়ে যেতে যেতে বলল।” ডিজগাস্টিং বয়।”
উদ্যান ঘাড় ঘুরিয়ে রাফসার যাওয়ার পানে তাকিয়ে রইল।
চলবে…?
আজকে বড় বড় মন্তব্য না করলে পরের পার্ট দেবো না। ২.৫ k লাইক করে দিও পাখিরা 🥹
রিচেক দেয়নি।
Share On:
TAGS: প্রেয়সীর অনুরাগ, সাদিয়া জাহান সিমি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৪
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৩
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৮
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৯
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৫(প্রথমাংশ + শেষাংশ)
-
প্রেয়সীর অনুরাগ গল্পের লিংক
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ২
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ১
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৭(প্রথমাংশ + দ্বিতীয়াংশ)
-
প্রেয়সীর অনুরাগ পর্ব ৬