প্রেমবসন্ত_২
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
৫.
চারদিক তখন হালকা কুঁয়াশায় ঢাকা। দিগন্তজোড়া মাঠের ওপর সাদা চাদরের মতো কুঁয়াশা বিছানো।রেখা বেগম নিধির ঘরের দরজায় কড়া নাড়লেন।বেশ কিছুক্ষণ পর কায়নাত ঘুমঘুম চোখে দরজা খুলে দেখল বড় চাচি দাঁড়িয়ে।সে আঁচল টেনে নিয়ে ভালো করে শরীরে জড়িয়ে নিল।রেখা বেগম ঘরে ঢুকলেন।নিধি আর নিশা দুজন দুজনকে জড়িয়ে ধরে ঘুমাচ্ছে।তিনি পিছু ফিরে কায়নাতের দিকে তাকালেন।
“মা তোমায় নিচে ডাকছে।”
কায়নাত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।মা আবার কে?ওকে এভাবে তাকিয়ে থাকতে দেখে রেখা বেগম বললেন,
“দাদি ডাকছে তোমায়।”
“আমাকে?কেন?”
“জানি না।”
কায়নাত মাথা নাড়িয়ে বলল সে আসছে।রেখা বেগম ঘর থেকে বেরিয়ে গেলেন।কায়নাত হাত মুখ ধুয়ে শাল জড়িয়ে নিল গায়ে।তারপর দরজা খুলে বাইরে পা বাড়াল।নিচে নেমে দেখল আতিয়া বেগম,লতা বেগম,রেখা বেগম সহ কিছু আত্মীয় মহিলারা ছিলেন।সে শুষ্ক ঠোঁট কামড়ে এগিয়ে গেল।আতিয়া বেগম এগিয়ে এলেন কায়নাতের কাছে।
“চল,বাইরে যাব।”
কায়নাত চোখ তুলে সদর দরজার দিকে তাকাল।কুঁয়াশায় ঢেকে আছে চারপাশ।এই শীতের মধ্যে দাদি কোথায় যেতে চাচ্ছেন?
“কোথায় যাব?”
“প্রশ্ন করিস না।”
কায়নাত বাধ্য মেয়ের মতন দাদির পিছু নিল।এই কড়া শীতে মেয়েটার মুখখানা ঠাণ্ডায় লাল টুকটুকে হয়ে এলো।শরীরে কাঁপুনি ধরতেই একটু গুটিয়ে নিল নিজেকে।চৌধুরী বাড়ি থেকে তারা বেশ দূরে এলো।বটতলার মাঠ পেরিয়ে একটু দূরে সরু রাস্তায় উঠতেই কায়নাতের কপালে ভাঁজ পড়ল ঝাঁপসা কুঁয়াশার মধ্যে এক নারীকে দেখে।ধীরে ধীরে মহিলা এগিয়ে এলেন তাদের নিকট।কায়নাতের চোখের সামনে ওই মহিলার বদন স্পষ্ট হতেই কায়নাত দৌঁড়ে গিয়ে ঝাঁপটে জড়িয়ে ধরল।মিলি বেগম এসেছেন মেয়েকে দেখতে।তিনি কায়নাতকে বুকে জড়িয়ে ধরতেই ফুঁপিয়ে উঠলেন।কায়নাত ভাঙা গলায় বলল,
“মা,কেমন আছো তুমি?”
মিলি বেগম কণ্ঠ শক্ত করলেন।
“ভালো আছি।তুই ভালো আছিস?”
“তোমাকে ছাড়া ভালো থাকি কী করে,মা?”
মিলি বেগম মেয়ের চিবুক উঁচিয়ে ধরলেন।ভ্রু কুঁচকে বললেন,
“কেনরে?শ্বশুর বাড়ির মানুষ বুঝি ভালো নয়?”
আতিয়া বেগম হেসে ফেললেন।
“তোমার কী তাই মনে হয় মিলি?তোমার বোন পাথর হতে পারলেও আমরা কিন্তু পাথর না।”
“কিযে বলেন চাচি।মেয়েটা একটু দুষ্টু,বুঝিয়ে শুনিয়ে নিবেন।বড্ড ভালোবাসি যে ওকে।খুব কষ্ট হয় মেয়েকে ছাড়া থাকতে।”
কায়নাত ঠোঁট ভেঙ্গে কেঁদে উঠল।মিলি বেগম মেয়ের মাথায় হাত বুলিয়ে দিলেন।মেয়েটাকে কেমন বউ বউ লাগছে দেখতে।খুব করে দোয়া করলেন তিনি মেয়ের জন্য।আতিয়া বেগম জোর করলেন মিলি বেগমকে নিয়ে চৌধুরী বাড়ি যেতে।আতিয়া বেগমের জরাজরিতে কাজ হলো না।মিলি বেগমকে বাড়ি ফিরতে হবে।সোহেল মির্জা যদি একবার জেনে যান তিনি কায়নাতের সাথে দেখা করতে এসেছেন তাহলে কেলেঙ্কারি হয়ে যাবে।সেদিন বিয়ে ভেঙে যাওয়ায় বাড়িতে ঝামেলা হয়েছিল বেশ।
তিনি আতিয়া বেগমের হাত মুঠোয় নিয়ে ভেজা গলায় বললেন,
“ওকে আমি পেটে ধরিনি ঠিকই,কিন্তু আমি ওকে নিজের মেয়ের মতোই বড় করেছি চাচি।আমি জানি আপনাদের কাছে ও ভালো থাকবে,ওইটুকু ভরসা আমার আছে।ওর ভুল গুলো মাফ করে দিয়ে শিখিয়ে পড়িয়ে নিবেন।আমার হাতে আজ সময় নেই,শুধু শেষ অনুরোধ করব।আমার মেয়েকে একটু দেখে রাখবেন।”
আতিয়া বেগম ভরসার হাত শক্ত করে আঁকড়ে ধরলেন।মিলি বেগম মুচকি হেসে মেয়েকে বুকে টেনে নিয়ে বললেন,
“সংসার জীবন সহজ নয় শুভু।জীবনে যেমন দুঃখ আসে,তেমন সুখও আসে।পড়াশোনা ছাড়বি না।সংসারের পাশাপাশি পড়াশোনা চালিয়ে যাবি।যদি জীবনটা ভীষণ ক্লান্ত লাগে,তাহলে মায়ের বুকে চলে আসবি।আমার দুয়ার তোর জন্য আজীবনের জন্য খোলা।আমার হাতে সময় নেই সোনা।আমাকে যেতে হবে।”
কায়নাত হুহু করে কেঁদে উঠল।এত কষ্ট কেন হয় মায়েদের ছেড়ে থাকতে?মাকে ছাড়া যে থাকতে বড্ড কষ্ট হয় তার।মায়ের শরীরের ঘ্রাণে কায়নাতের বুকটা ভরে উঠল হাহাকারে।আঙুলের ফাঁকে মায়ের আঁচল চেপে ধরে সে হু হু করে কাঁদছে।মিলি বেগমের চোখে জল চিকচিক করছে,তবুও নিজেকে শক্ত রাখলেন।চোখের জল গিলে নিয়ে মেয়ের কপালে চুমু খেয়ে ধীরে ধীরে নিজেকে ছাড়িয়ে নিলেন।
“আর কাঁদিস না শুভু।”
কায়নাত মায়ের আঁচল টেনে বলল,
“মা,আরেকটু থাকো না প্লিজ!এই একবারের জন্য?”
মিলি বেগম মুখ ফিরিয়ে নিলেন,চোখের পানি সামলে বললেন,
“থাকতে মন চায় রে মা,কিন্তু পারব না।ভালো থাকিস,নিজেকে সামলে রাখিস।”
আতিয়া বেগম এগিয়ে এসে কায়নাতের কাঁধে হাত রাখলেন।মিলি বেগম ধীরে ধীরে কুঁয়াশার ভেতর মিলিয়ে গেলেন।পেছন ফিরে মেয়ের দিকে শেষবারের মতো তাকিয়ে একফোঁটা অশ্রু গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।কায়নাত নির্বাক দাঁড়িয়ে রইল,মায়ের পিছু তাকিয়ে কেবল কাঁদছে।মায়ের ছায়াটুকুও যখন আর দেখা গেল না,তখন সে হাঁটু গেড়ে বসে পড়ল মাটিতে।
“মা,আমার মা…”
আতিয়া বেগম দীর্ঘশ্বাস ফেললেন।বাড়ি ফেরার পথে কায়নাত একবারও পেছনে তাকাল না।তবুও মনে হলো,কুয়াশার ফাঁক দিয়ে মা যেন এখনো তাকিয়ে আছে ওর দিকে,চোখে স্নেহ,ঠোঁটে একফোঁটা হাসি নিয়ে।
চৌধুরী বাড়িতে ফিরে নিধি আর নিশার ঘরে ঢুকতেই নিশা মশারির ভেতর থেকে চোখ মেলে বলল,
“তুমি কোথায় গিয়েছিলে কায়নাত?”
কায়নাত শাল খুলে বিছানার কোণে গিয়ে বসে পড়ল।গলার স্বর ভারী হয়ে এলো।
“মায়ের কাছে।”
নিধি আধো ঘুমে চোখ খুলে বসে পড়ল,
“তোমার মা?কখন এসেছেন?”
কায়নাত মৃদু হাসল,চোখের জল চেপে।
“ভোরবেলায় এসেছিলেন কুঁয়াশার মধ্যে।”
নিশা বলল,
“উনি কোথায়?”
কায়নাত কোনো উত্তর দিল না।চুপচাপ জানালার বাইরে তাকিয়ে রইল।দিগন্তজোড়া কুঁয়াশায় যেন এখনো ভাসছে মায়ের সেই হাসিটা।
ভোরের আলো ফোটার সাথে সাথে সে ধীরে ধীরে মশারির ভেতর গিয়ে নিধি-নিশার মাঝখানে শুয়ে পড়ল।চোখ বন্ধ করেও বুকের ভেতরটা কাঁপছে এক অদ্ভুত শূন্যতায়।
নিশা আর নিধি মুখ দেখাদেখি করল।কায়নাত চোখজোড়া বন্ধ রেখেই কম্পিত স্বরে বলল,
“আমার মায়ের পেটে একটা পুঁচকু সোনা বড় হচ্ছে।মা বলেছিলেন ওই বাবুকে সবার প্রথমে কায়নাত কোলে নিবে।”
নিশার মন খারাপ হয়ে গেল।নিধি পাশে শুয়ে বলল,
“তোমার মা বাবার ব্যপারে কিছু বলবে?”
“কী বলব?কাউকে নিয়ে আমার কিছু বলার নেই।”
•
নরম আলোয় মুখরিত চারপাশ।দোতলার দক্ষিণ পাশের শেষের ঘরটার দরজা এখন অব্দি খোলেনি।অর্ণ ঘুমিয়ে আছে এখনো।নিশা এসে ভাইকে ডেকে গেছে কয়বার।এবার বিরক্ত হয়ে দরজায় এসে জোরে থাপড়াতে শুরু করল।ভেতর থেকে অর্ণ ধমক দিয়ে বলল,
“নিশু,থাপড়ে সব গুলো দাঁত ভেঙে ফেলব।বিরক্ত করছিস কেন?”
নিশা বলল,
“আজ নাকি বড় দাদির বাড়ি যাবে সবাই।আম্মু তোমাকে ডাকছে ভাইয়া।”
“বিরক্ত করিস না।যা দরজার সামনে থেকে।”
মেয়েটা তবুও থামল না।দরজায় কড়া নাড়লে অর্ণ এক সময় বিরক্ত হয়ে দরজা খুলে দিলো।কটমট চোখে নিশাকে দেখতেই নিশা উল্টো পথে দৌঁড়ে গেলো।যাওয়ার আগে চিৎকার করে বলল,
“আব্বুকে বলে কিন্তু মার খাওয়াব ভাইয়া।”
অর্ণ ছোট বোনের কাজে ভীষণ বিরক্ত।ঘরে গিয়ে আর ঘুমানো হলো না।বিছানা গুছিয়ে ওয়াশরুমে ঢুকল।খানিকক্ষণ পর বেরিয়ে রেডি হয়ে একদম ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।সিঁড়ির নিকটে আসতেই কোত্থেকে যেন ঝড়ের বেগে কেও এসে ঠাস করে বারি খেলো তার সাথে।
“হোয়াট ননসেন্স?”
রেগে এহেন বাক্য শুধিয়ে অর্ণ পাশে তাকায়।কায়নাত দাঁত চেপে নিচে বসে আছে।অর্ণ ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে থাকে।কায়নাত চোখ উঁচিয়ে অর্ণকে এমন করে তাকিয়ে থাকতে দেখে ঝাঁঝাল গলায় বলে,
“চোখ নেই আপনার?আমাকে ধাক্কা দিলেন কেন?”
অর্ণ বুক টানটান করে ট্রাউজারের পকেটে হাত গুঁজে দাঁড়ায়।
“ধাক্কাটা কে দিয়েছে?আপনি নাকি আমি?”
“অবশ্যই আপনি।”
কায়নাত কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল।মুখ বাঁকিয়ে সিঁড়িতে পা রেখে একবার পিছু ফিরে ধমক দিয়ে বলল,
“আপনার বড় ভাইয়ের বউ আমি।সম্মান দিয়ে কথা বলবেন।যত্তসব!”
সে হনহন করে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নেমে গেল।অর্ণ ভ্রু কুঁচকে রেখেছে।মেয়েটা কী বলে গেল?অর্ণ তার দেবর হয়?মেয়েটার যে মাথার জয়েন্ট ঢিলা সে ব্যপারে আর সন্দেহ নেই তার।সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই দেখল এক একজন রেডি হয়ে বস্তা গাট্টি বেঁধে তৈরি হয়ে বসে আছে।বড় দাদিকে সেদিন প্রেম আনতে গেলেও রাহেলা বানু আসেননি।বলেছেন সবাইকে গিয়ে নিয়ে আসতে।
অর্ণ নিচে নামল গাম্ভীর্য বজায় রেখে।আদি চোখে সানগ্লাস পড়ে গায়ে কালো হুডি জড়িয়ে অর্ণর সামনে এসে বুক বেঁধে দাঁড়াল।মাথাটা উঁচু করে বলল,
“হেই মামু।কেমন আছো?”
অর্ণ ঘাড় ঝুঁকিয়ে নিচে তাকায়।আদিকে দেখে কপাল কুঁচকে বলে,
“তুমি কখন এসেছ?”
“রাতে।”
“গুড!”
অর্ণ গম্ভীর হয়ে সোফায় গিয়ে বসল।আদি ঠোঁট বাঁকিয়ে সবার দিকে তাকাল।রাহেলা বানুর বাড়িতে সব ভাই বোনেরা যাচ্ছে।দুদিন বোধহয় সেখানেই থাকা হবে।বাড়ি থেকে সবাই বের হলো।নাজনীন ভাই গাড়ি ঠিক করে দিয়েছেন।তাই আর অসুবিধা হলো না।চৌধুরী বাড়ি থেকে গাড়িতে রাহেলা বানুর বাড়ি যেতে প্রায় আধ-ঘণ্টার মতো লাগে।দুইটা অটো ঠিক করা হয়েছে।কায়নাত প্রেম যে গাড়িতে উঠেছে,সেটায়’ই উঠেছে।দুজন সামনা-সামনি বসেছে।অর্ণ তার বন্ধুদের সাথে অন্য গাড়িতে।প্রেম ভ্রু কুঁচকে চোরা চোখে কায়নাতের দিকে তাকাল।দমটা যেন আঁটকে আসছে এই পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়ে।
গাড়িটা তখন গ্রামের সরু রাস্তা ধরে এগোচ্ছে। বাইরে সাদা কুঁয়াশা,শীতের নরম হাওয়ায় চুলগুলো মুখে এসে পড়ছে কায়নাতের।সে শাল টেনে নিল গায়ে।রাহেলা বানুর শ্বশুর বাড়ি পৌঁছাতে বেশি সময় লাগল না।সবাই বাড়ির সামনে নেমে দেখল পুরনো যুগের মতো একতলার দালান বাড়ি।বাড়িটা বিশাল বড়।মাটির ঘর আছে বাড়ির দুইপাশে।বিশাল বড় উঠোনে শুকনো মরিচ রোদে দেয়া হয়েছে।সুহা তাড়াতাড়ি ওড়না দিয়ে নাক ঢেকে বলল,
“নাক মুখ জ্বলে যাবে তো।এই অবেলায় কে মরিচ শুকাতে দিয়েছে?”
নিধি বোনের মাথায় টোকা মেরে বলল,
“বেশি কথা বলিস তুই।”
ওরা বাড়িতে ঢুকল।বাড়ির ভেতর থেকে রাহেলা বানুর ছেলের বউ,নাতবউ সবাই বেরিয়ে এলেন।ওদের সবাইকে দেখে ব্যস্ত হয়ে পড়লেন।কায়নাত ঘুরে ঘুরে সব কিছু দেখছিল।বাড়িটা ভীষণ সুন্দর।নুসরাত ছেলেকে নিয়ে বড্ড জ্বালায় আছে।এত দুষ্টু হচ্ছে দিনদিন,যা বলার বাইরে।আদি মায়ের হাতের মুঠোয় থেকে সরে আসার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করেছে।
“ছাড়ো না মা?”
নুসরাত চোখ গরম করল।
“আদি,কতবার বলেছি দুষ্টুমি করবে না?”
“দুষ্টুমি কোথায় করছি?”
শেহের এসে নুসরাতের পাশে সোফায় বসল।শান্ত চোখে নুসরাতের রাগান্বিত মুখশ্রী দেখে আদিকে কাছে টেনে নিয়ে বলল,
“Adi, why are you being naughty?”
আদি ড্যাবড্যাব করে শেহেরের দিকে তাকাল।চোখ ঘুরিয়ে আবার নাক কুঁচকে বলল,
“তুমি স্টুপিড শেহের ভাই।তোমার কত বড় সাহস,তুমি আমায় গাঁধা বললে?”
শেহের হতভম্ব হয়ে বলল,
“তোকে গাঁধা কখন বললাম?”
“মাত্রই না বললে?”
শেহের আদির কান চেপে ধরল।
“ভালো করে পড়ালেখাটা শিখ গর্ধব।আর আমি তোর ভাই নই মামা হই।চোয়ালে দুটো দিলে বেয়াদবি বেরিয়ে যাবে।”
নুসরাত তাল মিলিয়ে বলল,
“অপেক্ষা করছ কেন?পিঠের মধ্যে কয়েকটা বসিয়ে দাও।যত দিন যাচ্ছে ততই ফাজিল হচ্ছে।”
আদি মায়ের দিকে গাল ফুলিয়ে তাকাল।চোখের সানগ্লাসটা নামিয়ে মায়ের কোলের উপর রেখে বলল,
“তোমার বাপের টাকায় খাই বলে খোঁচা মারছ দিন-রাত?আমাকে তোমার আর ভালোলাগে না তাই না?খালি মারি মারি করো কেন?”
বলতে বলতে ঢঙ করে আবার কেঁদেও ফেলল।নুসরাত ছেলের এই নাটকে বিরক্ত,ভীষণ বিরক্ত!এসব প্রত্যেকদিনের কাহিনি।শেহের আদির নাকে কান্না দেখে বলল,
“ভেবেছিলাম তুই মানুষ হবি,এখন দেখছি মামুদের মতোই মীরজাফর হচ্ছিস।তুই চোখের সামনে থেকে যা আব্বা।”
আদি সরে দাঁড়াল।মায়ের কোলের উপর থেকে সানগ্লাস নিয়ে চোখে পড়ে নিল।
“তোমাদের কাছে থাকতে আমার বয়েই গেছে।আমি ভেরি ব্যস্ত,সো আমাকে ডিসটাব করবা না।”
“আগে ডিস্টার্ব উচ্চারণটা ভালো করে শিখ।সর সামনে থেকে।”
অপমানে বেচারা আর দাঁড়িয়ে থাকতে পারল না।গটগট করে সরে গেল সেখান থেকে।শেহের বাড়ির এদিক ওদিক পর্যবেক্ষণ করল।নিধিরা সবাই কাছেই আছে।আত্মীয়দের সাথে আলাপ আলোচনায় ব্যস্ত তারা।নুসরাত ব্যাগ থেকে ফোন বের করে কিছু একটা করছে।
“দিন কাল কেমন যাচ্ছে রাতপাখি?”
নুসরাত চোখ তুলে তাকায়।
“দেখছোই তো,আদিকে নিয়ে ভীষণ চিন্তায় আছি।”
“ও বাচ্চা মানুষ।এত টেনশন করো না।”
“ওকে বাচ্চা বলে ভুল করছ।স্কুল থেকে প্রত্যেকটা দিন বিচার আসে ওর নামে।একটা বাচ্চা এতটা বিচ্ছু হয় কী করে বলতে পারো?”
শেহের হাসল।দূরে দুষ্টু আদিকে দেখে স্থির চোখে তাকিয়ে রইল।এই বাচ্চাটাকে সে ভীষণ ভালোবাসে।নুসরাতের পেটে যখন আদি এলো,তখন এই সংবাদ শুনে বোধহয় সেই বেশি খুশি হয়েছিল।আফসোস,বাচ্চাটা তার নয়।শেহের দীর্ঘশ্বাস ফেলল।
আদি ফুপিদের পাশে এসে ঘুরঘুর করছে।কায়নাত ভ্রু কুঁচকে বাচ্চাটাকে দেখছে।সকাল থেকে বাড়ির প্রত্যেকটা মানুষকে এত জ্বালিয়েছে বলার বাইরে।নিশার ওড়না গলা থেকে টেনে নিয়ে কোলে রেখেছে সে।নিশা রেগে ফিরল তার দিকে।
“আদি,এসব কেমন বেয়াদবি?জামা কাপড় ধরে টানছিস কেন?”
আদি বলল,
“বাড়ির বাইরে চলো তাহলে।”
“আমরা কাল অব্দি এখানে আছি।এর মধ্যে অনেক জায়গায় ঘুরব।”
“এখনই চলো।”
সদর দরজার বাইরে,উঠোন থেকে স্বার্থ চিৎকার করে বলল,
“ওই আদি,বাইরে আয়।”
আদি নিশার ওড়না ফুপির কাছে দিয়ে দৌঁড়ে গেল।কায়নাত সেদিকে তাকাল।লম্বাটে এক পুরুষ উঠোনে দাঁড়িয়ে আছে রোদের আড়ালে।মাথার কালো চুল গুলো রোদে চিকচিক করছে।কায়নাত ঠোঁট কামড়ে দৃষ্টি সরালো।লোকটা সুন্দর!কিন্তু তার স্বামী আছে।কিন্তু স্বামীকে তো স্বামী বলে মনে হচ্ছে না।জাউরা ব্যাটাকে বলবে কী করে,সে তার বউ হয়?
•
দুপুরে খাওয়া দাওয়া হলো বেশ ভালোই।সবাই রেস্ট নিচ্ছে এই মুহূর্তে।স্বার্থ মেহরাবের সাথে বাড়ির বাইরে বের হয়েছে সিগারেট খাবে বলে।ওদের বাইরে যেতে দেখে নিশাও এসেছিল পিছু পিছু।বাড়ি থেকে কিছুটা দূরে একটা বাঁশঝাড় আছে।আপছা ছাঁয়ায় দাঁড়িয়ে দুজন ঠোঁটে সিগারেট ধরিয়েছে।এই ভরদুপুরে আশেপাশে একটা মানুষও নেই।নিশা নাক ছিঁটকালো।ওদের নিকটে এগিয়ে যেতেই দুজন তাড়াহুড় করে সিগারেট ফেলে দিলো।মেহরাব শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে তাড়া দিয়ে বলল,
“ওয়াশরুমে যেতে হবে এখনই।স্বার্থ থাক,আমি যাই।”
মেহরাব চলে যেতেই নিশা ভ্রু কুঁচকে ফেলল।
“তুমি এসব খাও?”
স্বার্থ মাথা চুলকে বলল,
“মাঝে মধ্যে।”
“কেন খাও?”
“তোকে কেন বলব?কী চাই?এখানে কী করছিস তুই?”
নিশা এগিয়ে গিয়ে পাশে বাঁশের ব্রেঞ্চে বসল।পা ঝুলিয়ে বলল,
“এখানে বসো তো স্বার্থ ভাই।”
স্বার্থ পাশে গিয়ে দুরত্ব রেখে বসল।নিশা দূরে একটা পুকুর পাড়ে বাচ্চাদের দিকে নজর রেখে বলল,
“তোমার কোনো গার্লফ্রেন্ড আছে?”
স্বার্থ দৃষ্টি নত করে ঠোঁট কামড়ে হাসে।
“আছে।”
নিশা চমকে তাকায়।গলায় যেন কথা আঁটকে গেল মেয়েটার।দুরুদুরু বুক নিয়ে কম্পিত গলায় বলে,
“কে সে?”
“আমার যত্নে পোষা পাখি।”
“সে দেখতে খুব সুন্দর?”
“খুব।একটু বেশিই সুন্দর!কিছুটা বাচ্চা বাচ্চা স্বভাব,গুলুমুলু,কিছুটা দুষ্টু,আবার সময়ে খুব বেশি বুঝদার।”
“ওহ!”
নিশা নেমে দাঁড়াল।পায়ে জুতা পড়ে বাড়ির পথে হাঁটা ধরল।স্বার্থ চোখ তুলে দেখল মেয়েটার বিষণ্ণ পথ পাড়ি দেয়া।নিশা ধীরে ধীরে বাড়ির দিকে হেটে যায়।হাওয়ার স্পর্শ তার গায়ে ঠাণ্ডা লাগাচ্ছে,কিন্তু মনটা ভীষণ উত্তেজনা আর অদ্ভুত বিষণ্ণতায় ভরপুর।
বিকেল বেলা সবাই ঘুরতে বের হবে।উঠোনের এক কোনায় প্রেম দাঁড়িয়ে ফোন টিপছিল।মেয়েরা সাজগোজ করতে ব্যস্ত।অর্ণ উঠোনেই চেয়ার পেতে বসেছিল চোখ বন্ধ করে।হঠাৎ গুটি গুটি পায়ে কায়নাত বের হলো বাড়ি থেকে।প্রেমকে দেখে লাজুক হেসে এগিয়ে এলো নিকটে।প্রেম ফোন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে সামনে কায়নাতের দিকে তাকিয়ে শুকনো ঢোক গিলে মুচকি হাসে।মায়ের থেকে কাল রাতে ভাইয়ের বিয়ের ব্যপারে শুনবার পর থেকে কায়নাতের এহেন লাজুক ভাব ভঙ্গি তার মাথায় ঢুকছে না।
“কিছু বলবেন ভাবি?”
কায়নাত গম্ভীর হলো প্রেমের কথা শুনে।বউকে কেও ভাবি ডাকে?অর্ণ চোখ তুলে ওদের দিকে তাকাল।কায়নাত বলল,
“আপনার বিয়ে হয়েছে কখনো?”
“নাতো।আমি সিঙ্গেল।”
কায়নাত লাজুক কণ্ঠে বলে,
“আরে না,আপনার সাথেই না আমার বিয়ে হয়েছে?”
প্রেম কায়নাতের মুখে এমন কথা শুনে হতভম্ব হয়ে বলল,
“ভাবি,এসব কী বলেন?”
“আরে হ্যা,আমাদের বিয়ে হয়েছে।আপনিই আমার জামাই।”
“আসলেই?আপনাকে আমি বিয়ে করেছি?”
কায়নাত লাজুক হেসে ঘনঘন মাথা নাড়ায়।প্রেম বলে,
“কবে বিয়ে করেছি?”
“আমি যখন ছোট ছিলাম।”
“আপনি ছোট কবে ছিলেন?”
“যখন আমি ছোট ছিলাম।”
“ওই যখনটা কখন?”
কায়নাত বিরক্ত হলো।চোখ পাকিয়ে বলল,
“আরে ভাই,আপনার সাথেই আমার বিয়ে হয়েছিল।আমি আপনার বিয়ে করা বউ।ছোট বেলায় না আমার সাথে আপনার বিয়ে হলো?”
“আমি আসলেই আপনাকে বিয়ে করেছি?আমার তো কিছু মনে পড়ছে না ভাবি।”
“ধুর,আমি আপনার ভাবি হবো কেন?বউ হই বউউউ!”
(তোমরা নাইস,নেক্সট ছাড়া আর কিছু কমেন্ট করতে পারো না?এত বড় গল্প লিখে এসব কমেন্ট দেখলে মেজাজ খারাপ হয়।তোমরা নেক্সট নাইস না বললেও নেক্সট পর্ব আসবে।অনুভূতি শেয়ার করার ট্রাই করবা।আবার যদি কেও এসব কমেন্ট করছো খবর আছে😾😤
পেইজ যারা ফলো করেননি ফলো করুন।বেশি বেশি কমেন্ট করুন,পেইজের রিচ ডাউন।)
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮