প্রেমবসন্ত_২ ।২৭.২।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
দুপুরটা নিস্তব্ধ অথচ ভরা।রোদ্দুর যেন সোনালি চাদর মেলে ধরেছে পুরো গ্রাম জুড়ে।মাটির পথে সূর্যের আলো পড়ে ঝিলমিল করছে,ধুলো উড়ে গিয়ে বাতাসে মিশে আলো হয়ে ফিরছে।আমগাছের পাতায় পাতায় ঘুমন্ত ছায়া,খেজুরতলার নীচে অলস সময় বসে আছে।
দূরে পুকুরের জল নিঃশব্দে চকচক করে,যেন দুপুরের চোখে জমে থাকা একফোঁটা আলো।ঘাম আর আলো মিশে গ্রামের শরীরে লেগে থাকে সোনালি এক গল্পের মতো।হঠাৎ করেই কেমন অতিরিক্ত গরম পড়া শুরু হয়েছে।কায়নাত অর্ণর ঘর পরিষ্কার করছিল।কোমরে আঁচল গুঁজে ছোট্ট মেয়েটা কেমন গিন্নি সেজেছে আজ।বধূ সেজেছে অর্ণ চৌধুরীর।সে বারান্দার ময়লা ঝাঁড়ু দিয়ে পরিষ্কার করে আঁচল দিয়ে কপাল মুছল।নিচে দেখা যাচ্ছে আজগর চৌধুরী কাদের সাথে যেন আলোচনায় মগ্ন বাগানে বসে।কায়নাত দৃষ্টি সরাল। অর্ণর ময়লা কাপড় গুলো ছোট্ট ছোট্ট হাত দিয়ে ধুইয়ে সোজা উঠে এলো ছাদে।রোদের প্রখরতায় শরীর জ্বলে উঠল তার।খালি পায়ে যেন ছাদে দাঁড়িয়ে থাকা শাস্তি মনে হচ্ছে।সে অর্ণর কালো পাঞ্জাবী দড়িতে দিতেই অনুভব করল পায়ে ঠান্ডা লাগছে।সে ফট করে পাশে তাকায়।ছোট্ট আদিকে এখানে দেখে অবাক হয়ে বলে,
“তুমি পানি পেলে কোথায়?”
আদি মিনমিন করে বলল,
“মা মায়ের জন্য নিতে বলেছিল।”
“তাহলে আমার পায়ে ঢেলে দিলে কেন?”
“তোমার এখানে দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে না?”
কায়নাতের মায়া হলো।ঠোঁট টিপে হেসে আদির চুল এলোমেলো করে দিয়ে আবার জামা কাপড় ছড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
“খুব ভালো।সব সময় এমন লক্ষ্মী হয়ে থাকবে,বুঝলে?তা তুমি হঠাৎ ছাদে এলে কেন?”
কায়নাত আদির কোনো জবাব না পেয়ে কপাল কুঁচকে পেছনে তাকাল।চোখে পড়তেই বুকের ভেতরটা কেমন ধক করে উঠল।লম্বাটে অবয়বে অর্ণ দাঁড়িয়ে আছে,কপালে ভাঁজ,দৃষ্টি স্থির—ঠিক যেন রোদের ভেতর দাঁড়িয়ে থাকা কোনো অচেনা ছাঁয়া।
কায়নাত থতমত খেয়ে গেল।হাতের কাপড়টা আলগা হয়ে পড়েছে খেয়াল করে তড়িঘড়ি আঁচল টেনে বুকে ঠিক করল।গলার ভেতরটা শুকিয়ে এলো।চোখ নামিয়ে নরম স্বরে বলল,
“আপনি কখন এলেন?”
অর্ণ এক পা এগিয়ে এলো।ছাদের রোদের ভেতর তার ছাঁয়াটা কায়নাতের পায়ের কাছে এসে থামল।কণ্ঠে ক্লান্তি আর বিরক্তির মিশেল,
“এই রোদে দাঁড়িয়ে কী করছো?”
কায়নাত ঠোঁট কামড়ে ধরল।নিজেকে সামলে নিয়ে বলল,
“কাপড় দিচ্ছিলাম।নিচে তো রোদ নেই।”
হঠাৎ করেই অর্ণর দৃষ্টি নেমে এলো কায়নাতের পায়ে।রোদের তাপে লালচে হয়ে ওঠা খালি পা দুটো যেন ছাদের রুক্ষতার সাথে যুদ্ধ করে দাঁড়িয়ে আছে।এক মুহূর্ত দেরি না করে সে নিজেই ঝুঁকে পড়ল।বালতির ভেতর ভেজা কাপড়গুলো তুলে নিয়ে দড়িতে ছড়িয়ে দিতে শুরু করল নিঃশব্দে।
কায়নাত হতভম্ব।এমনটা সে কল্পনাও করেনি।তড়িঘড়ি বলে উঠল,
“না, না-আপনি রাখুন।আমি পারব।”
অর্ণ থামল না।উল্টো কণ্ঠটা একটু কঠিন হলো,
“চুপ।এই রোদে আর দাঁড়াতে হবে না তোমাকে।নিচে যাও।”
কায়নাতের গাল গরম হয়ে উঠল।সে এক পা পিছিয়ে গেল,আঁচলের প্রান্তটা শক্ত করে মুঠোয় ধরল।অর্ণ একে একে কাপড় ঝুলিয়ে দিচ্ছে—কালো পাঞ্জাবী,সাদা শার্ট—তারপর হঠাৎ করেই কায়নাতের নিজের জামাকাপড়ও দড়িতে তুলে দিল।
মেয়েটার লজ্জায় চোখ তুলতে পারছে না।অর্ণ তার শাড়ি দড়িতে সুন্দর করে মেলে দিয়ে ক্লিপ লাগিয়ে দিল।কাপড় নাড়ানো শেষ হলে বালতি হাতে নিয়ে গেটের দিকে যেতে যেতে বলল,
“কারোর দিকে এভাবে নজর দিতে নেই।এতে মোহাব্বত বেড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা বেশি থাকে।”
ধীরে ধীরে অর্ণর কালচে ছাঁয়া মিইয়ে গেল।কায়নাত পিছু ফিরে তাকিয়ে রইল সেদিকে খানিকক্ষণ।লাজে যেন গাল দুটো টমেটোর মতো হয়ে এসেছে।সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতেই দোতলায় দেখতে পেল নিধি দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ।কায়নাত এগিয়ে গিয়ে পাশে দাঁড়াল।
“কী হলো ননদীর?ওমন মুখটা কালো কেন?”
নিধি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“ভালো লাগছে না কায়নাত।দাদা যে কেন বিয়ে নিয়ে ভাবছেন।”
কায়নাত মজা করে বলল,
“তোমাকে তো তাও এখন বিয়ে দিতে চাচ্ছে,কিন্তু আমাকে কখন বিয়ে দেয়া হয়েছে জানো?”
“মজা করছি না।”
কায়নাত মাথা নাড়ল।আড়চোখে অর্ণর ঘরের দিকে তাকিয়ে বলল,
“ছেলে ভালো হলে অমত করার কারণ দেখছি না আমি।আর দাদা বলেছেন এখন শুধু আকদ করিয়ে রাখবেন।”
“কিন্তু আমি এখন এসবে জড়াতে চাচ্ছি না।”
“তাহলে দাদার সাথে কথা বলো।”
“আমার ভয় হয়।”
কায়নাত বুঝল সেটা।নিধিকে সান্ত্বনা দিয়ে ঘরে ফিরে এলো সে।অর্ণ বিছানায় লম্বা হয়ে শুয়ে আছে মধ্যখানে।চোখ দুটো বন্ধ।ফ্যানের বাতাসে তার এলোমেলো চুল গুলো খিলখিল করছিল।কায়নাত হাসল।ওয়াশরুম থেকে বালতিতে পানি এনে পুরো ঘর মুছে ফেলল।
আজ কাজের শেষ নেই।সব কাজ সেরে সময় নিয়ে গোসল সেরে এলো সে।বিশাল ঘরটা আলোয় চিকচিক করছে তখন।ঝাড়বাতির নরম আলো দেয়াল বেয়ে নেমে এসে মেঝেতে গিয়ে থেমেছে,ঘরের ভেতর ছড়িয়ে আছে একধরনের পরিপাটি সৌখিনতা।কায়নাত ভেজা চুল আঁচলের এক কোণে মুছতে মুছতে বিছানার দিকে তাকাল।অর্ণ নিঃশব্দে শুয়ে আছে,চোখ দুটো বন্ধ,শ্বাসের ওঠানামা সমান।ফ্যানের বাতাসে তার চুলগুলো কপালের ওপর এলোমেলো হয়ে নড়ছে।
কায়নাত ধরে নিল,সে ঘুমিয়ে পড়েছে।পায়ের শব্দ চেপে রেখে ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল।বিছানার এক পাশে সাবধানে বসে পড়ল সে,যেন শব্দ হলেই নীরবতা ভেঙে যাবে।মুহূর্তের দ্বিধার পর খুব আস্তে গা এলিয়ে শুয়ে পড়ল পাশে।শরীরটা ক্লান্তিতে ভারী,তবু বুকের ভেতর অদ্ভুত এক হালকা কাঁপুনি।লোকটার কাছে আসা যেন বিশ্ব যুদ্ধের সমান।
কায়নাত চুপচাপ ছাদের দিকে তাকিয়ে রইল।ফ্যানের বাতাসে ভেজা চুল শুকোতে শুকোতে গালে হালকা শিরশির লাগছে।মনে হলো,এই ঘর,এই আলো,এই নীরবতা—সব মিলিয়ে যেন কোনো অনুচ্চারিত গল্পের শুরু।সে অজান্তেই মুচকি হাসল।হাসিটা খুব ছোট,খুব নিজের।পাশেই তার স্বামী শুয়ে আছে ছোট্ট শিশুর ন্যায়।
কায়নাত খুব ধীরে পাশ ফিরল। সাবধানতা তার সমস্ত শরীরজুড়ে।অর্ণ তখনও চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে,শ্বাসের ছন্দ শান্ত,গভীর।ফ্যানের বাতাসে ঘরের আলোটা কাঁপতে কাঁপতে নরম হয়ে আসছে।
সে একটু এগিয়ে এসে অর্ণর কপালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে দিল।পর-মুহূর্তে লজ্জায় অর্ণর বুকে গুটিয়ে এলো কায়নাত।পরিচিত উষ্ণতায় বুকটা ভরে উঠল তার,মনে হলো অনেকটা পথ হেঁটে অবশেষে ঘরে ফেরা।দিন শেষে,এই বুকের এক কোনায়’ই তো তার সুখ।সকল ক্লান্তির শেষ ঠিকানা।
দিনের মধ্যাংশ কিছুটা এমনই থাকে।নরম তুলোর মতো মোলায়ম।আজ যেন পুরো চৌধুরী বাড়ির মানুষদের মনটা বড্ড ফুরফুরে।মাশফিক চৌধুরীর ঘরটা বেশ পুরনো দিনের জিনিস দিয়ে সাজানো।তবু সব কিছুতে সৌখিনতার ছাপ।জারা চুপটি করে বসে আছে পালঙ্কে।মাসফিক চৌধুরী বেহরুজ বেগমকে বসতে বললেন পাশে।তিনি বসলেই মাশফিক চৌধুরী নরম গলায় বললেন,
“শোনো আম্মু,কষ্ট পেয়েছ এটা আমি বুঝতে পারছি।কিন্তু এসব ঘটনা আমাদেরও অজানা ছিল।”
জারা মুচকি হেসে বলল,
“ভয় পাবেন না আঙ্কেল।”
“ভয় পাচ্ছি না।আমার খারাপ লাগছে তোমার কথা ভেবে।আন্টি আর আঙ্কেলকে মাফ করে দিয়ো।”
জারা মাথা নাড়িয়ে নরম গলায় বলল,
“এসব কী বলছেন আঙ্কেল?আগামীতে কী হবে এটা আল্লাহ ছাড়া কেউ জানেন না।আমার ভাগ্যে ছিল না বলেই আমি পাইনি।এসব নিয়ে আমার কোনো আফসোস না।বরং আমি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করি,আল্লাহ যা করেন ভালোর জন্যই করেন।তবে হ্যা,একটা আফসোস আমার আছে।আপনাদের মতো এত সুন্দর একটা পরিবার আমার হলো না।”
বেহরুজ বেগম জারার মাথায় হাত বুলিয়ে বললেন,
“বউ নয়,মেয়ে হয়ে থেকো আমাদের কাছে।কে বলেছে আমরা তোমার পরিবার নই?”
জারা খুশি হলো।বেহরুজ বেগম মন ভরে দোয়া করলেন মেয়েটার জন্য।তিনি ভেবেছিলেন এসব নিয়ে ভীষণ ঝামেলা হবে ওদের মধ্যে।কিন্তু তেমন কিছুই হয়নি।জারা গুটি গুটি পায়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এলো।এতক্ষণ হাসি-খুশি থাকলেও ঠোঁটের কোণায় লেগে থাকা হাসি টুকু মিইয়ে গেল বিষণ্ণতায়।বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এসে হাঁটতে হাঁটতে পুকুরের কাছে এলো।বিশাল বড় পুকুরের মধ্যে ঝকঝক করছে পরিষ্কার পানি।কী সুন্দর চারপাশে ফুলের বাহার।ওপাশ দিয়ে এক অবয়ব হেঁটে আসছে তার নিকট।জারা কপাল কুঁচকে পাশে ফিরল।আদালকে দেখতে পেয়ে বলল,
“কোত্থেকে এলে?”
আদাল তার মুখো-মুখী হয়ে অন্যপাশে বসে ঠোঁটে দারুণ হাসি টেনে বলল,
“আমার কথা বাদ দাও।আজ চড়ুই পাখির হলো কী?মন খুব বেশি খারাপ?”
জারা দুইপাশে মাথা নাড়ায়।বলে,
“তোমাদের পরিবারটা ভীষণ সুন্দর।আমার কেন যে এমন একটা পরিবার নেই।”
আদাল ঠোঁট টিপে হাসল।জারা ভ্রু কুঁচকে দেখল সেই হাসি।চার জন ভাই একই রকম তাল গাছের মতো লম্বা মনে হয় তার কাছে।প্রেম আর অর্ণকে প্রায় যমজ মনে হলেও আদাল আর আয়মান কিছুটা ভিন্ন।নরম আলোয় আদালের হাসি চওড়া হলো সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে।জারা দৃষ্টি সরিয়ে নিল।মুখ ফুলিয়ে বলল,
“হাসবে না একদম।তোমার হাসি আমার সহ্য হচ্ছে না।”
আদাল শব্দ করে হেসে উঠল এবার।জারার অভিমানী চোখ কুঁচকে এলো সঙ্গে সঙ্গে।আদাল হাসি চেপে বলল,
“রাগলে কিন্তু বেশ লাগে তোমায়।”
“মার খেতে ইচ্ছে হয়েছে তোমার?বিরক্ত করছো কেন?”
আদাল ঠোঁটের কোণে লুকোনো হাসিটা আর ধরে রাখতে পারল না।পুকুরের জলে পড়া বিকেলের আলোটা যেন তার চোখে এসে খেলছিল।সে সামান্য সামনে ঝুঁকে, গলা নামিয়ে বলল,
“এই যে রাগী চড়ুই, এত রাগ জমিয়ে রাখো কী করে? উড়ে যাবে একদিন,খেয়ালও থাকবে না তখন।”
জারা ভ্রু কুঁচকে তাকাল।চোখে অভিমান, ঠোঁটে নীরবতা।কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“আমি চড়ুই না।আর উড়ে যাওয়ার দরকারও নেই আমার।”
“তা হলে কী?” আদাল কৌতুকের স্বরে বলল, “রাজহাঁসী? নাকি দোয়েল?”
একটু থেমে সে যোগ করল,
“দোয়েলই ভালো।মন খারাপ হলে চুপচাপ বসে থাকে, আবার একটু ভালো লাগলেই গান ধরে গলায়।”
জারা মুখ ঘুরিয়ে পুকুরের দিকে তাকাল।জলের ঢেউয়ে আকাশের নীলটা ভেঙে ভেঙে যাচ্ছে।নরম গলায় বলল,
“তুমি সবকিছুকেই হালকা করে ফেলো, তাই না?”
আদাল এবার গম্ভীর হলো।হাসিটা নরম হয়ে এলো এবার।
“সবকিছু না,তোমার মনখানা ছাড়া বাকি সব।ওটা হালকা করলে উড়ে যাবে।”
জারা চমকে তাকাল।কিছু বলতে গিয়েও থেমে গেল।তারপর বিরক্তির ভান করে বলল,
“বেশি কথা বলো না।নইলে সত্যিই মারব।”
আদাল হেসে উঠে পুকুরের পাড় থেকে একটা ছোট কাঁকর তুলে জলে ছুড়ে দিল।ঢেউ উঠল গোল গোল।
“মারলেও মন্দ হয় না।চড়ুইয়ের মার তো আদর মাখাই হয়।তাই না?”
জারা ওড়নার কোণা মুচড়ে দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল,
“হয়েছে,এবার থামো।ভালো লাগছে না আমার।তোমরা ঢাকা যাবে কবে?”
“দুদিন পর হয়তো চলে যাব।”
“ওহ!”
জারা ভাবল,সে এবার ঢাকা ব্যাক করে বাইরে চলে যাবে।ফ্যামিলি বিডিতে থাকলেও তার গুরুত্ব তাদের কাছে নেই বললেই চলে।মেয়েটা উঠে দাঁড়াল।ওর দেখাদেখি আদাল উঠতেই জারা নিচু গলায় বলল,
“আমায় গ্রাম ঘুরিয়ে দেখাবে?”
আদাল কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল,
“কেন নয়?”
জারার চোখে হঠাৎ করেই যেন আলো জ্বলে উঠল।এতক্ষণ যে মেয়েটা মনখারাপের ভারে নুয়ে ছিল, সে এক নিমেষে হালকা হয়ে গেল।ঠোঁটের কোণে লুকিয়ে থাকা হাসিটা আর চাপা থাকল না।
জারা আর দেরি করল না।ওড়নাটা কাঁধে ঠিক করে নিয়ে এক পা এগিয়ে এলো।বিকেলের নরম আলো তখন চারপাশে ঢেলে পড়েছে।পুকুর পাড় ছেড়ে দুজন হাঁটতে হাঁটতে ঢুকে পড়ল বিশাল বাগানের ভেতর।
বাগানটা যেন কোনো গল্পের পাতা।দু’পাশে আম,জাম,কাঁঠালের সারি—পাতার ফাঁক দিয়ে সূর্যের আলো মাটিতে ছোপ ছোপ হয়ে পড়েছে।হালকা বাতাসে পাতাগুলো মরমর করে শব্দ তুলছে,মাঝে মাঝে পাখির ডাক ভেসে আসছে দূর থেকে।
জারা হাসল।এই হাসিটা আর আগের বিষণ্ণ হাসি নয়—খোলামেলা,হালকা।হাঁটতে হাঁটতে সে হঠাৎ থেমে একটা ফুলের গাছের দিকে তাকাল।আদালও থামল।
“এই ফুলটার নাম কী?”
“শিউলি।ভোরে সবচেয়ে সুন্দর হয়।”
জারা মাথা নাড়ল।
“সবকিছুরই যেন আলাদা সময়ে আলাদা সৌন্দর্য।”
আদাল একপলক তাকাল জারার দিকে।কিছু বলতে গিয়েও বলল না।হাঁটা শুরু করল আবার।
বাগান পেরোতে পেরোতে চৌধুরী বাড়ির বড় গেটটা চোখে পড়ল।লোহার গেটের গায়ে পড়া আলোটা তখন সোনালি হয়ে উঠেছে।দুজন পাশাপাশি দাঁড়িয়ে এক মুহূর্ত থামল।
জারা মনে মনে ভাবল,এই অচেনা জায়গাটা আজ হঠাৎ করেই খুব আপন লাগছে।আর তার পাশে থাকা মানুষটাকেও কেমন যেন আলাদা করে আপন মনে হচ্ছে।
আদাল গেটের দিকে এগোতে এগোতে বলল,
“চলো।এটাই তো শুরু।”
জারা হালকা হেসে মাথা নাড়ল।দুজন একসাথে বিশাল বাগান পেরিয়ে চৌধুরী বাড়ির গেট দিয়ে বাইরে বেরিয়ে গেল—বিকেলের আলো,নরম হাওয়া আর অনুচ্চারিত অনুভূতিগুলোকে সঙ্গে নিয়েই।এখন কী বলা যায়,তাদের নতুন সূচনার নতুন মিস্টিমাখা বিকেল?
__
“কী হয়েছে?”
অর্ণর প্রশ্নে কায়নাত মাথা নাড়িয়ে বলল,
“পায়ে একটু ব্যথা পেয়েছিলাম।ঠিক হয়ে যাবে।”
অর্ণ হাত বাড়িয়ে হঠাৎ কায়নাতের পা টেনে ধরতেই সে চমকে উঠে বলল,
“পা ধরছেন কেন?ছাড়ুন!”
অর্ণ গম্ভীরতা দৃঢ় রেখে চোখ তুলে তাকাল ভীতু চোখ জোড়ায়।অর্ণ মনোযোগ দিয়ে কায়নাতের পা ধীরে ধীরে সামঞ্জস্য করে দিল। প্রতিটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গকে যত্নের ছোঁয়ায় মিলিয়ে, যেন পায়ের ছোট্ট আঙুল পর্যন্ত জানে কোথায় কতটা সাবধানী হতে হবে। কায়নাত চোখ বড় করে তাকিয়ে রইল, লজ্জা আর বিস্ময়ের মিশ্রণে তার গাল টমেটোর মতো লাল হয়ে উঠল।
একটু কাঁপুনি বুকে ছড়িয়ে গেল, কিন্তু সেই স্পর্শে তার মধ্যে যেন এক অদ্ভুত প্রশান্তি জমল। ফ্যানের হালকা বাতাসে ভেজা চুলগুলো আঁচলের কোণে এলোমেলো হয়ে নরমভাবে নড়ছে। অর্ণের হাত এখনও পায়ের পাশে।
শেষ মুহূর্তে অর্ণ পা নামিয়ে নিয়ে একটু পিছনে হটল, কিন্তু দৃষ্টি থেকে কায়নাতকে সরাতে পারল না। সে লাজের মধ্যে নিজেকে শান্ত করার চেষ্টা করল, ঠোঁট কামড়ে ধরল, হাত ছোট করে আঁচল মুঠে ধরল।
পায়ে আর ব্যথা নেই।অর্ণ হালকা কেঁশে ঘরের বাইরে পা বাড়াল।
ছোট্ট আদি দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ছিল এতক্ষণ।মামু দরজা খুলতেই ফিঁক করে হেসে ফেলল।
অর্ণ কপাল কুঁচকে বলল,
“দরজার সামনে কী করছো?”
“তোমার কাছে এসেছি।”
“তাহলে দরজায় নক করনি কেন?”
আদি ঠোঁট উল্টোল।সে এতক্ষণ নাজনীনের ঘরে গিয়ে তাদের ঝগড়া দেখছিল।অর্ণ ঝুঁকে এসে ওকে কোলে নিয়ে মুখে লেগে থাকা খাবার মুছিয়ে দিল ঘরে এসে।কায়নাত চোখ ছোট ছোট করে তাকিয়ে তাদের দিকে।আদিকে কী সুন্দর কোলে নিয়ে আদর করে লোকটা।অথচ তাকে ধারের কাছেও ঘেঁষতে দেয় না।
(২.৫k রিঅ্যাক্ট পূরণ করবেন।গত পর্বের রেসপন্স এতততত খারাপ।বই অর্ডার করেছেন?প্রি-অর্ডার শেষ হলে কিন্তু দাম বাড়বে🙆♀️)
মলাট_বই: #প্রেমবসন্ত
প্রি_অর্ডার:৪৫০৳
শুধুমাত্র প্রি-অর্ডারকারী পাবেন,
-রঙিন পুস্তানি
-ইলাস্ট্রেশন
-স্পেশাক বুকমার্ক
-লেখকের চিঠি
অর্ডার করুন আপনার পছন্দের যেকোনো বুকশপ কিংবা নয়া উদ্যোগ প্রকাশনীতে।
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৭
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৫
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৪
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৬
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৯