প্রেমবসন্ত_২ ।২১।
হামিদাআক্তারইভা_Hayat
শীতের রাত নামলেই গ্রামের আকাশটা অন্যরকম হয়ে ওঠে।চারপাশে নেমে আসে কুঁয়াশার নরম চাদর।চাঁদ থাকলেও আলোটা ঝাপসা, যেন কেউ ইচ্ছে করেই ঢেকে রেখেছে।দূরের খালপাড় থেকে ভেসে আসে শেয়ালের ডাকে হাহাকার, মাঝেমধ্যে কুকুরের টানা ঘেউ ঘেউ সেই নীরবতা কেটে দেয়।
মাটির ঘরগুলোর চালের উপর শিশির জমে।খেজুর গাছের পাতায় টুপটাপ করে পানি পড়ার শব্দ শোনা যায়।কেউ কেউ আগুন জ্বালিয়ে উঠোনে বসে হাত সেঁকে, লালচে আগুনের আলোয় মুখগুলো অচেনা ছাঁয়ায় ভরে যায়।চুলায় বসা হাঁড়ি থেকে ধোঁয়া উঠে কুয়াশার সাথে মিশে যায়।
শীতের রাতে গ্রামের পথগুলো ফাঁকা থাকে।কেবল দূরে কোনো লণ্ঠনের মিটিমিটি আলো দুলতে দুলতে এগোয়।মাঝে মাঝে হালকা পায়ের শব্দ, তারপর আবার নিস্তব্ধতা।ঘরের ভেতরে কম্বলের নিচে মানুষ গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ে, কিন্তু চোখে ঘুম আসে দেরিতে।শীতের রাত ভাবনাকে বেশি জাগিয়ে তোলে।
কায়নাত শুয়ে আছে অর্ণর ঘরে।এই ঘরে অর্ণর অস্তিত্ব আছে।ধূসর রঙের মোটা কম্বল থেকে লোকটার শরীরের ঘ্রাণ ভেসে আসছে।কী অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে তার।মেয়েটা কম্বল মুরি দিয়ে দাদির ফোন বের করল বালিশের নিচ থেকে।আতিয়া বেগম জোর করে ফোন দিয়ে বলেছিলেন রাতে দরকার হতে পারে।কায়নাত জানে দাদি কেন ফোন দিয়েছে।মেয়েটা বাটন ফোন ঘেঁটে ঘেঁটে অর্ণর নাম্বার বের করল।এখন বেশ রাত হয়েছে।লোকটা কী ঘুমাচ্ছে?একবার কল করবে?শুকনো ঢোক গিলে সে নাম্বারে কল লাগাল।খানিকক্ষণ পর ওপাশ থেকে অর্ণর ঘুমঘুম কণ্ঠস্বর ভেসে এলো,
“হ্যালো!”
কায়নাত আঁচল চেপে নিচু গলায় বলে,
“শুনছেন?”
“শুনছি।”
“ঘুমাচ্ছিলেন?”
“হুমমমম!”
অর্ণ যে ঘুমের ঘোরে কথা বলছে,বেশ বুঝতে পারল সে।তার নিজেরই কেমন নেশা লেগে যাচ্ছে লোকটার কথা শুনে।শুষ্ক ঠোঁট ভিজিয়ে নিল সে।
“খেয়েছেন রাতে?”
ওপাশ থেকে কোনো উত্তর এলো না।আবার ঘুমিয়ে গেছে বোধহয়।কিশোরীর পরাণ ছটফট করছে ভীষণ।ওপাশে নিঃশব্দতা।কায়নাত কিছুক্ষণ ফোনটা কানে চেপে ধরে রইল।শ্বাসের শব্দও নেই।বুকের ভেতরটা কেমন খালি খালি লাগল।
“শুনছেন?”
আরেকবার খুব আস্তে ডাকল সে।
কিছুক্ষণ পর ধীর, ভারী নিঃশ্বাসের শব্দ ভেসে এলো।তারপর অর্ণর গলা ঘুমে জড়ানো,
“ঘুমাও সোনা।”
চোখ বড় বড় হয়ে এলো কায়নাতের।সে মুখে আঁচল চাপল লজ্জায়।লোকটা ঘুমের মধ্যেই কী এসব বলছে?পেটের মধ্যে প্রজাপতির মতো কিছু উড়ছে মনে হলো।লজ্জায় গাল দু’টো লাল টুকটুকে হলো।
কায়নাত কিছুক্ষণ কথা বলতে পারল না।ফোনটা কানে চেপে ধরে রইল।ওপাশে অর্ণর নিঃশ্বাসের শব্দ নিয়মিত, গভীর।সে সত্যিই ঘুমিয়ে পড়েছে মনে হয়।
“সোনা”এই শব্দটা কায়নাতের বুকের ভেতর কোথাও নরম করে বিঁধে রইল।অর্ণ কখনও মুখে আদর করে কথা বলে না, জানে সে।তাই তো এই একটুকু শব্দ এতটা ভারী লাগছে।
মেয়েটা ধীরে কম্বলের ভেতর গুটিয়ে নিল নিজেকে।মোটা কম্বলের ভাঁজে অর্ণর গায়ের উষ্ণ গন্ধটা যেন আরও ঘন হয়ে উঠল।চোখ বন্ধ করতেই মনে হলো, লোকটা এই ঘরেই আছে,একদম পাশে।
হঠাৎ ওপাশ থেকে আবার অর্ণর গলা ভেসে এলো,
“তুমি কোথায়?”
“খুলনা।”
“খুলনা কেন?”
কায়নাত কপাল কুঁচকে ফেলল।ঘুমে লোকটার মাথা গেছে।সে ফোনটা কানে রেখেই চোখ বন্ধ করল।কুঁয়াশায় ঢাকা গ্রামের শীতের রাত তখন আর শূন্য লাগল।ওপাশে অর্ণর নিঃশ্বাস চলতে থাকল অনেকক্ষণ।কখন যে ফোনটা হাত থেকে ঢিলে হয়ে গেল, সে নিজেও টের পেল না।
পূর্ণিমার আলো কুঁয়াশা ভেদ করে জানালায় পড়ে রইল।আর সেই আলোয়, প্রথমবারের মতো কায়নাত ঘুমোল—ভয় নয়, অপেক্ষা নিয়ে।অদ্ভুত হলেও দু’জনের হৃদয় জুড়েছিল বহু বছর আগে।আজ এত বছর পরও তাদের মধ্যকার শক্ত দেয়াল ভাঙেনি।এক অভিমানী কিশোরী,যে অজান্তেই আঁটকে গেছে এক ছিন্ন সুতোর মাঝে।অন্যদিকে এক শক্ত হৃদয়ের পুরুষ,যে হয়তো ইচ্ছে করেই নিজেকে বেঁধে রেখেকে সেই সুতোর মাঝে।
মধ্যরাতের কাছা-কাছি সময় তখন।নাজনীন নিজের ঘরের বিছানায় মাথা চেপে বসে আছে চুপচাপ।ওয়াশরুম থেকে পানির শব্দ আসছে থেকে-থেকে।জয়া গেছে গোসল করতে।মেয়েটার শরীর খারাপ হয়েছিল।খানিকক্ষণ আগেই নাজনীন নিচে গিয়ে গরম পানি করে এনে দিয়েছে।খানিকক্ষণ পর জয়া বের হলো।দেখল,নাজনীন ঘুমঘুম ভাব নিয়ে বসে আছে বিছানায়।সে ভেজা কাপড় ওয়াশরুমে রেখেই দরজা চাপিয়ে এগিয়ে এলো নিকটে।নাজনীন ওকে দেখতে পেয়েই গম্ভীর গলায় বলল,
“অসুবিধা হচ্ছে?”
জয়া লাজুক গলায় বলে,
“ঠিক আছে।আপনি জেগে আছেন কেন?ঘুমিয়ে পড়ুন।”
“শখ করে জেগেছি?”
জয়া দাঁত কিরমির করে বলল,
“আমি বলেছিলাম উঠতে?আমাকে ধমকাচ্ছেন কেন?”
নাজনীন আশ্চর্য না হয়ে পারল না।একটু আগেও এই মেয়ে পেটে ব্যাথায় গুনগুন করছিল।বেচারা লম্বা একটা শ্বাস ফেলল।একটু হলেও যেন অর্ণর কষ্ট সে বুঝতে পারছে।কায়নাত তবুও তো যা-তা কিন্তু এই বিচ্ছু সীমার বাইরে।মাঝে মধ্যে নাজনীনের মনে হয় তুলে এক আছাড় মারতে।একটা মাত্র বাচ্চা বউ দেখে কিছু বলতেও পারে না সে।
জয়া রেগে ভেজা চুল নিয়েই বিছানায় উঠে নাজনীনের বালিশে মাথা রাখল।নাজনীন ধমক দিতেই বেচারি হকচকিয়ে উঠে বসল।
“ভেজা চুল নিয়ে বালিশে মাথা রাখছিস কেন?”
জয়া মুখ কালো করে বলল,
“ঠান্ডা লাগছে আমার।”
“তুলে এক আছাড় মারব।আজ ২দিন পর গোসল করেছিস।নেহাত তোকে আমি বিয়ে করেছি,নাহলে সত্যি তোকে এই বাড়ি থেকে বের করে দিতাম।”
“এত অপমান আল্লাহ সইবে না।আসছে আমার মহা পুরুষরেহ!এই শীতে কে প্রত্যেকদিন গোসল করে?”
“সবাই করে,তুই বাদে।এই,যা তাড়াতাড়ি মাথা মুছে আয়।বেশি বকবক করলে সত্যি ঘর থেকে বের করে দিব।”
জয়া আর কথা বাড়াল না।মুখ বাঁকিয়ে বিছানা থেকে নামল।তোয়ালে তুলে নিয়ে মাথায় জোরে জোরে ঘষতে লাগল।চুল থেকে পানি ঝরে পড়ে মেঝেতে ছোট ছোট দাগ তৈরি করছে।ঠান্ডায় কাঁপছে সে, তবুও একটুও শব্দ করছে না।
নাজনীন তাকিয়ে দেখল।মেয়েটার ঠোঁট কাঁপছে, গাল দু’টো ফ্যাকাশে।হঠাৎ নিজের উপরেই বিরক্ত হলো।সে উঠে এসে তোয়ালেটা জয়ার মাথা থেকে নিজের হাতে নিয়ে নিল।
“এইভাবে ঘষতে নেই।চুল উঠে যাবে।”
জয়ার চুল কায়নাতের মতো এত বড় নয়;তবে বেশি ছোটও নয়।কোমরের নিচে নেমেছে লম্বা চুল গুলো।
নাজনীন ভালো করে চুল মুছিয়ে দিয়ে জয়ার কানটা হঠাৎ চেপে ধরল।মেয়েটা আতঙ্কে চিৎকার করে বলল,
“আপনার বাড়া ভাতে ছাই দিয়েছি?আমি কিন্তু দাদার কাছে গিয়ে বলব আপনি আমায় মারেন।”
“তুই কী শান্ত হয়ে থাকতে পারিস না জয়া?একটুও কি ভয় নেই মনে?আমার সাথে কিন্তু একা থাকিস তুই!”
“তো?আমার কী মুখ নেই?চিৎকার শুরু করলে পুরো গ্রাম একজায়গায় হবে।”
নাজনীন এই পর্যায় বিরক্ত হয়ে ছেড়ে দিল ওকে।কবে যে এর ঘটে বুদ্ধি হবে কে জানে!বেচারা বাচ্চা বউয়ের তেজের কারণে কাছেও যেতে পারে না।এদিক থেকে ওদিক একটু হাত ধরলেই হলো,পুরো ঘর চিৎকার করে মাথায় তুলে ফেলে।
নাজনীন বিছানায় ফিরে গিয়ে চুপচাপ শুয়ে পড়ল। জানালার ফাঁক দিয়ে চাঁদের আলো ঢুকে মেঝেতে ফিকে রেখা এঁকে রেখেছে।জয়া তোয়ালে নামিয়ে মাথার চুল আলগা করে ছেড়ে দিল।ভেজা চুলের ঠান্ডা এখনো ঘাড়ে লেগে আছে।সে ধীরে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ল, পিঠ ফিরিয়ে।
ঘরে কিছুক্ষণ নিস্তব্ধতা।শুধু দুই জনের নিঃশ্বাসের শব্দ।নাজনীন চোখ বন্ধ করে আছে, কিন্তু ঘুম আসছে না।অজান্তেই বুকের ভেতর ভারী একটা ভাব জমে আছে।এই বাচ্চা মেয়েটাকে নিয়ে সে নিজেও বুঝতে পারে না—রাগ করবে, না মায়া করবে।একটা দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো তার বুক থেকে।
“শোন।” অল্পস্বরে বলল সে।
জয়া কোনো উত্তর দিল না।তবু সে জেগে আছে নাজনীন সেটা বুঝতে পারছে।
“কাছে আয় তো একটু।ঠান্ডা লাগছে আমার।”
জয়া কপাল কুঁচকে বলল,
“ঠান্ডা আমারও লাগছে।আমার কাছে আসতে বলেছি আপনাকে?আপনার বুঝি খুব দরদ উপড়ে পড়ছে?”
নাজনীন হেসে ফেলল,একদম অনিচ্ছাকৃতভাবে।
“দরদ না থাকলে এত ঝামেলা সহ্য করতাম?”
জয়া চুপ করে গেল।কথাটা কেমন যেন গায়ে লাগল।সে পাশ ফিরে তাকাল না, কিন্তু বুকের ভেতর কোথাও একটা নরম অনুভূতি খচখচ করে উঠল।ঘরের ভেতর আবার নীরবতা নামল।শীতের রাত যেমন ধীরে ধীরে মানুষের ভেতরে ঢুকে পড়ে, তেমনি এই নীরবতাও ঢুকে পড়ল দু’জনের মাঝখানে।
সেই রাতেই কেউ প্রথমবার অপেক্ষা নিয়ে ঘুমোল,
কেউ দায়িত্বের ভারে নিঃশব্দে জেগে রইল,
আর কারো বুকের ভেতর,
ভাঙতে থাকা দেয়ালে চুপিচুপি ধরল ফাটল।
•
ভোরের পাখি গুলো জেগে উঠেছে।বাগানে বড় শিমুল গাছের ডালায় বসে শব্দ করছে তারা।শীত আগের মতো নেই।এখন রোদ উঠলেই বেশ গরম লাগে।ফজরের আযান দিয়েছে কিছুক্ষণ আগে।কায়নাত নামাজ শেষে হাতে তাজবীহ নিয়ে বারান্দায় এগিয়ে গেল।ঝাপসা কুঁয়াসায় দেখতে পেল আতিয়া বেগম বাগানে কিছু একটা করছেন।এই অন্ধকারে দাদিকে দেখেই সে ঘরে ফিরে এলো।তাজবীহ রেখে আঁচল মাথায় চাপল।মোটা শালটা গায়ে জড়িয়ে বের হলো তৎক্ষণাৎ।সিঁড়ি বেয়ে নামতে নামতে মেয়েটার চোখ হঠাৎ আঁটকে এলো পুরো মহলে।আজ প্রথম তার মনে হলো চৌধুরী বাড়িটা বিশাল বড়।কেমন যেন জমিদারদের মতো করে সাজ-সজ্জা সব কিছুর।সে সদর দরজা ঠেলে বাইরে বের হতেই বাগানে মুরগির ঘরের গাছে দাদিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে অবাক হলো।এই সময়ে তো মুরগি ছাড়ার কথা নয়।
কায়নাত এগিয়ে যেতেই আতিয়া বেগম কায়নাতকে দেখে মুচকি হাসলেন।
“এত সকালে বাইরে কী করছিস?”
কায়নাত বলল,
“তোমায় দেখেই না এলাম এখানে।তুমি কী করছো?”
“এই সময়ে তোর দাদার সাথে হাঁটতে যাই আমি।আজ বোধহয় উনি আসবেন না।যাবি আমার সাথে?”
কায়নাত কী মানা করার মেয়ে?সে হেসে জবাবে বলল,
“চলো যাই।”
দু’জনে গেট পেরিয়ে গ্রামের রাস্তায় উঠল।ভোরের আলো তখনও পুরোপুরি ফোটেনি।আকাশটা ধূসর আর নীলের মাঝামাঝি রঙে থমকে আছে।চারপাশে কুঁয়াশা এমনভাবে ছড়িয়ে আছে যেন কেউ তুলোর আস্তরণ বিছিয়ে দিয়েছে জমিনের উপর।
মাটির রাস্তা ভিজে ভিজে।রাতের শিশিরে নরম হয়ে আছে ধুলো।খালি পায়ে হাঁটলে ঠান্ডাটা সরাসরি গায়ে এসে লাগার মতো।রাস্তার দু’পাশে খেজুর আর তাল গাছগুলো দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চুপ প্রহরীর মতো।পাতার ফাঁকে ফাঁকে জমে থাকা শিশির হঠাৎ হঠাৎ টুপ করে পড়ছে,শব্দটা কুঁয়াশার ভেতরেও স্পষ্ট। দূরে নদীর দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস বইছে, গায়ে কাঁটা দিচ্ছে।
আতিয়া বেগম ধীরে ধীরে হাঁটছেন।বয়সের ভারে পা একটু ধীর, কিন্তু ভঙ্গিতে কোনো ক্লান্তি নেই।কায়নাত তার পাশে হাঁটছে।শালের ভেতরেও সে শীতটা টের পাচ্ছে, তবু মনটা অদ্ভুতভাবে হালকা।
“ভোরের হাওয়া শরীর ভালো করে,মনটাও পরিষ্কার হয়।”আতিয়া বেগম বললেন হালকা গলায়।
কায়নাত মাথা নাড়ল।চারপাশের দিকে তাকিয়ে তার বুকের ভেতর কোথাও একটা প্রশান্তি জমে উঠছে।এই গ্রাম, এই রাস্তা সবকিছু এত চেনা, তবু আজ যেন নতুন।
রাস্তার পাশে সর্ষে ক্ষেত।হালকা কুঁয়াশার ভেতর দিয়ে হলুদ ফুলগুলো অস্পষ্ট দেখা যাচ্ছে।মাঝে মাঝে কোনো পাখি ডানা ঝাপটে উড়ে উঠছে, কুঁয়াশা কেটে মুহূর্তের জন্য রঙ ছড়িয়ে আবার মিলিয়ে যাচ্ছে।বাঁশঝাড় থেকে ভেসে আসছে পাখির কিচিরমিচির—ভোরের নিজেদের মতো আলাপ।
আতিয়া বেগম থেমে একবার চারপাশটা দেখলেন।চোখে মুখে একধরনের মায়া।তিনি হঠাৎ জিজ্ঞেস করলেন,
“একটা কথা বলব রে?”
কায়নাত বলল,
“অনুমতি নিচ্ছ কেন?বলো না কী বলবে?”
“শ্বশুর বাড়ির সবার সাথে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়েছে?”
“হুম।সবাই ভীষণ ভালো।”
“আর অর্ণ?”
কায়নাত ঠোঁট চেপে কিছুক্ষণ চুপ থেকে বলল,
“আচ্ছা দাদি,স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কটা কেমন হওয়া উচিত?”
আতিয়া বেগম কায়নাতের দিকে তাকালেন।হাঁটার গতি একটু কমে এলো।কুঁয়াশার ভেতর দিয়ে সূর্যের আলো তখন ধীরে ধীরে গাছের ফাঁক গলে পড়ছে।মাটির রাস্তায় লম্বা ছায়া পড়েছে দু’জনের।
“স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক?” ধীরে বললেন তিনি।
“এইটা কোনো বইয়ের নিয়মে হয় নারে।”
কায়নাত চোখ নামিয়ে হাঁটতে থাকল।শালের কোণটা আঙুলে প্যাঁচাতে প্যাঁচাতে বলল,
“তাহলে কিসে হয়?”
আতিয়া বেগম হালকা হাসলেন।সে হাসিতে অভিজ্ঞতার ভার।
“সময় লাগে।সহ্য লাগে।আর লাগে একে অপরকে বুঝবার ইচ্ছা।”
“কিন্তু যদি কেউ কিছু না বলে?সব নিজের ভেতর আঁটকে রাখে?”
আতিয়া বেগম তাকালেন নাতনির মুখের দিকে।কুঁয়াশায় ভেজা সেই মুখে স্পষ্ট দ্বিধা।
“সব মুখে প্রকাশ করলেই কী প্রমাণ হয় ভালোবাসা?কিছু সময় অপর পাশের মানুষটার কাজ-কর্ম দেখেও বুঝে নিতে হয় সবটা।”
কায়নাত বুকের ভেতর হালকা একটা কাঁপুনি টের পেল।মনে পড়ে গেল রাতের ফোনকলটা।‘ঘুমাও সোনা’ শব্দটা যেন আবার কানে বাজল।
“সব ভালোবাসা মুখে বলা যায় না দাদি?” প্রশ্নটা বেরিয়ে এলো অজান্তেই।
আতিয়া বেগম হাঁটতে হাঁটতেই মাথা নাড়লেন।
“সব ভালোবাসা বলা হলে সহজ হয়ে যেত।কিন্তু কিছু ভালোবাসা নীরবেই শক্ত হয়।পাথরের মতো—ভাঙতে সময় লাগে, কিন্তু ভেঙে গেলে আর জোড়া লাগে না।”
কায়নাত আর কিছু বলল না।সরষে ক্ষেতের দিকে তাকিয়ে রইল।হলুদ ফুলগুলোর উপর তখন সূর্যের আলো পড়েছে।কুয়াশা পাতলা হয়ে আসছে, রঙগুলো স্পষ্ট হচ্ছে।
“ভয় পাস না।যেখানে দায়িত্ব আছে,সেখানে অনুভূতিও থাকে।শুধু পথটা একটু লম্বা।”
আজ তীব্র রোদ উঠেছে।সকালে নাস্তা সেরেছেন সবাই।কায়নাতের সাথে কাল জারা এসেছিল।মেয়েটা কোনো ভাবেই ঢাকায় থাকল না।কায়নাতের মনে হলো মেয়েটা ভীষণ মিশুক।যেমন মিষ্টি ব্যবহার,ঠিক তেমন কথা-বার্তা।জয়া,মাহি,সুহা আর কায়নাত বসেছিল বাগানে।জারা ঘরের বারান্দায় বসে কারোর সাথে যেন ফোনে কথা বলছে দো’তলায়।জয়া তাকে দেখে কায়নাতকে প্রশ্ন করল,
“উনি তোর সাথে এলো কেন?চাচি আসতে দিল?”
কায়নাত বলল,
“আত্মীয় হয়।আসতেই পারে।”
“আমরা তো জীবনে দেখিনি উনাকে।কেমন আত্মীয় হয়?”
“আম্মুর সম্পর্কে ভাগ্নি হয় বলেছেন।”
জয়া দাঁত দিয়ে নখ কামড়ে ফের তাকাল উপরে।মেয়েটার বয়স তাও ২৪-২৫ এর কাছা-কাছি হবে।দেখতে বেশ সুন্দর।বাঙালি মেয়েদের মতোই গায়ের পোশাকে শালীলতা আছে।
জয়া আবার কায়নাতের দিকে তাকাল।চোখে স্পষ্ট কৌতূহল, সঙ্গে অল্প অস্বস্তিও।
“ঢাকায় থাকলে তো আত্মীয়রা আসেই,কিন্তু হুট করে এখানে?”
কায়নাত বুঝতে পারল প্রশ্নটা নিছক নয়।সে শান্ত গলায় বলল,
“উনি নিজেই আসতে চেয়েছেন।আম্মু না করেনি।”
জারা সম্পর্কে তার নিজেরও খুব বেশি জানা নেই।শুধু জানে মেয়েটা অকারণ বেশি স্বচ্ছন্দ, আর সেই স্বচ্ছন্দতাই কোথাও যেন চোখে লাগে।
ঠিক তখনই দো’তলা থেকে বাড়ির বাইরে নেমে এলো।হালকা রঙের কুর্তি, চুলগুলো খোঁপা করা।চেহারায় কোনো বাড়তি সাজ নেই, তবু চোখে পড়ে।
“তোমরা এখানে?” নামতেই হাসিমুখে বলল সে।
“রোদটা কিন্তু আজ খুব কড়া।”
জয়া হেসে বলল,
“গ্রামে তো রোদ উঠলে আর উপায় থাকে না।”
জারা কায়নাতের পাশে এসে বসল।স্বাভাবিক ভঙ্গিতে বলল,
“কাল রাতে খুব ঠান্ডা ছিল, তাই না?আমি তো ঠিকমতো ঘুমোতেই পারিনি।”
কায়নাত মাথা নাড়ল।
“শীতের রাত এখানে এমনই।”
জারা একটু থেমে চারপাশটা দেখল।
“বাড়িটা খুব সুন্দর।একদম অন্যরকম শান্তি আছে।”
এই কথায় জয়ার মুখটা সামান্য শক্ত হয়ে গেল।সে বুঝতে পারছে না কেন, কিন্তু এই প্রশংসাটুকুও তার ভালো লাগছে না।
ঠিক তখনই ভেতর দিক থেকে নাজনীন বেরিয়ে এলো।সাদা পাঞ্জাবি, চোখেমুখে সেই চিরচেনা গম্ভীর ভাব।সে উঠোনে বসা সবাইকে একনজর দেখে থেমে গেল।ভাব-ভঙ্গি কিছুটা ছোট ভাই অর্ণর মতো।এই দুই ভাইয়ের মতো গম্ভীর তাদের বংশে আর তিনটে আছে কিনা সন্দেহ।
জারা প্রথমেই উঠে দাঁড়াল।
“আপনি নাজনীন ভাই, তাই না?”
নাজনীন হালকা মাথা নাড়ল।
“জি।”
“আমি জারা।কাল এসে আপনার সাথে দেখা হয়নি।নিশাদের থেকে আপনাদের ব্যপারে অনেক কথা শুনেছি।”
“বসুন।”
নাজনীন চোখ ঘুরিয়ে জয়ার দিকে তাকাল।জয়া চোখ পাকিয়ে তাকিয়ে আছে।নাজনীন বুঝল না হঠাৎ মেয়েটা এমন রেগে গেল কেন।সে চেয়ারে বসার আগে জয়া তাড়াহুড়ো করে এগিয়ে এসে নাজনীনের হাত চেপে ধরে বলল,
“তুমি আবার বাইরে এলে কেন?আমাকে লাগবে তো?চলো ভেতরে গিয়ে তোমার প্রয়োজনীয় সব কিছুর ব্যবস্থা করে দিচ্ছি।”
নাজনীন হতভম্ব হয়ে বাচ্চা বউয়ের কাণ্ড দেখল।বলে কী এই মেয়ে?কায়নাত ঠোঁট চেপে হাসল ছোট বোনের কাণ্ড দেখে।জারা আশ্চর্য হলো।কিছুটা অবাক গলায় বলল,
“তোমরা ভাই-বোন না?”
জয়া মুখ কালো করে নাজনীনের হাত চেপে ধরে বলল,
“কোন দিক দিয়ে ভাই-বোন মনে হয়?উনি আমার জামাই।”
জারা যেন কথা বলতেই ভুলে গেল।তার জানা মতে নাজনীন অর্ণর থেকেও বড়।আর জয়া সবে কিশোরী।মেয়েটা কিছু বলার আগেই জয়া টানতে টানতে নাজনীনকে বাড়ির দিকে নিয়ে গেল।
কায়নাতের চোখ গিয়ে ঠেকেছে জারার মুখে।মেয়েটা এখনও ঠিক স্বাভাবিক হতে পারেনি।একটু আগের আত্মবিশ্বাসী ভঙ্গিটা কোথায় যেন খসে পড়েছে।
“ও খুব অল্প বয়সে বিয়ে করেছে মনে হয়?”
কায়নাত মাথা নাড়ল।
“হুম।”
ভেতরে, নাজনীন বিরক্ত গলায় বলল,
“এইভাবে হাত ধরে টানিস কেন?”
জয়া দরজা বন্ধ করেই মুখ ঘুরিয়ে বলল,
“আপনি বাইরে এসে ওর সাথে কথা বলছিলেন কেন?”
“ও কে?”
“ওই জারা!”
নাজনীন কপাল কুঁচকে তাকাল।
“আত্মীয় মেয়ে।কথা বললে সমস্যা কী?”
জয়া ঠোঁট কামড়ে ধরল।কথাটা যেন পছন্দ হলো না।
“ও আপনাকে ভাই বলছে না কেন?”
“আমি সবার ভাই নাকি?”
জয়া রেগে নাজনীনের বুকে ধাক্কা দিয়ে হনহন করে উপরে উঠে গেল।শরীরটা যেন জ্বলে যাচ্ছে তার।মেয়েটা এত হিংসুটে সেটা নাজনীনের জানা ছিল না।
সময়টা সন্ধ্যার পর।কাল কায়নাত দাদার সাথে কলেজে যাবে।একটু আগেই শাশুড়ির সাথে কথা হয়েছে।মেয়েটার মনটা খুব ভার।আজ সারাদিন অর্ণ তাকে একটাও কল করেনি।সে আজ অভিমান করে আর কল করল না তাকে।মধ্যরাতে ঘুম এসেছিল চোখে।শীত কমে এসেছে অনেকটাই।শরীর গুটিয়ে শোয়ার সময় মনে হয়েছিল কারোর শক্ত বাঁধনে আবদ্ধ সে।
কায়নাতের একটা অভ্যাস আছে।সে সব সময় না পারলেও তাহাজ্জুদ নামাজটা আদায় করার চেষ্টা করে।আজ কেন যেন ঘুমটা ভেঙে গেল গভীর প্রহরে।নাকে কেমন অদ্ভুত একটা ঘ্রাণ এসে বাড়ি খাচ্ছে।সে পিটপিট করে চোখ খুললো।অন্ধকারে কিছু দেখা যাচ্ছে না।তবে খুব বুঝতে পারল সে কারোর বাহুর মধ্যে আবদ্ধ।কায়নাত ভয়ে চিৎকার করে উঠতেই শক্ত বাহুটা মুহূর্তেই ঢিলে হয়ে গেল।
“চুপ!আমি।”
ঘুমঘুম, কিন্তু পরিচিত সেই কণ্ঠস্বর কানে আসতেই কায়নাত যেন হঠাৎ থমকে গেল।বুকের ভেতর ছুটে চলা ভয়টা এক ঝটকায় অন্য কিছুর সাথে ধাক্কা খেল—অবিশ্বাস, বিস্ময়, আর এক অদ্ভুত প্রশান্তি।
“আপনি?”
গলাটা কেঁপে উঠল তার।
অন্ধকারে সে দেখতে পেল লোকটার ছাঁয়া।জানালার ফাঁক দিয়ে ঢোকা ম্লান আলোয় চেনা অবয়ব।
কায়নাত হঠাৎ সরে এসে বসে পড়ল।বুকের উপর হাত চেপে ধরল।
“আপনি এখানে কী করছেন?”
অর্ণর মেজাজ খারাপ হলো।কাঁচা ঘুমটা এভাবে ভেঙে যাওয়ায় তিরিক্ষি মেজাজে বলল,
“খাব তোমায় তাই এসেছি।”
কায়নাত নাক ছিঁটকে আঁচল মুখে চেপে বলে,
“ছিঃ,নষ্ট পুরুষ।”
[২.৫k রিঅ্যাক্ট দাও।আজকে কত বড় পর্ব দিলাম😒
নিচে আমার গল্পের গ্রুপের লিংক দিয়ে দিচ্ছি সবাই এড হও]
চলবে…?
Share On:
TAGS: প্রেমবসন্ত সিজন ২, হামিদা আক্তার ইভা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১০
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.২
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৯
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৬(প্রথমাংশ +শেষাংশ)
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ১৩
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ৮
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ পর্ব ২৭.১
-
প্রেমবসন্ত সিজন ২ গল্পের লিংক