প্রণয়ে_গুনগুন
পর্ব_৩
মুন্নিআক্তারপ্রিয়া
প্রণয়ের চোখ থেকে যেন আ’গু’ন ঝড়ছে। কটমট করে তাকিয়ে আছে গুনগুনের দিকে। দাঁত কিড়মিড় করে বলল,
“মা’র’লে কেন?”
গুনগুনও রুক্ষকণ্ঠে বলল,
“সিগারেট ছুঁ’ড়ে মারলেন কেন? গতকাল তো খুব বড়ো বড়ো ডায়ালগ ঝাড়লেন। আপনি নাকি মেয়েদের খুব সম্মান করেন? একটা কথা ভালোমতো বলে দিচ্ছি, আমাকে অন্যসব মেয়েদের মতো আলাভোলা, ভীতু ভাববেন না একদম। বখাটেদের কীভাবে যোগ্য জবাব দিতে হয় সেটা আমার খুব ভালো করেই জানা আছে।”
প্রণয়ের ইচ্ছে করছিল গুনগুনের হাতটা মোচড় দিয়ে ভে’ঙে দিতে। কিন্তু সে পারছে না। মেয়েদের গায়ে হাত তোলার অভ্যাস তো তার নেই। এছাড়া এমনিও সে মা’রা’মা’রিও পছন্দ করে না।
মাসুদ এবার এগিয়ে এলো। গুনগুনকে উদ্দেশ্য করে বলল,
“মাইয়্যা, তোমার হাত কিন্তু খুব বেশি চলতাছে।”
গুনগুন মাসুদকে ধমক দিয়ে বলল,
“চুপ! গতকাল থা’প্প’ড় খেয়ে মন ভরেনি? এখন আবার আসছেন?”
মাসুদ ক্ষেপে গেল। প্রণয় ওকে আটকে গুনগুনকে বলল,
“এখনই আমার চোখের সামনে থেকে চলে যাও।”
“আপনার চোখের সামনে বসে থাকার ইচ্ছেও নেই আমার। শুধু সাবধান করে দিচ্ছি, আমার পিছু ছাড়েন।”
প্রণয় কিছু বলল না। গুনগুন চলে যাওয়ার পর দোকান থেকে সিগারেট নিয়ে খেতে লাগল। রাস্তায় আজও বেশ মানুষজন ছিল। সবাই দেখেছে। কেউ মুখে কিছু না বললেও গুনগুনের সাহস দেখে বারংবার শুধু অবাক হচ্ছে এবং এটাও ভাবছে যে না জানি গুনগুনের কপালে কোন দুর্ভোগ আছে!
রাতে শিশিরকে পড়িয়ে তিন তলায় নিজেদের ফ্ল্যাটে যেতেই ওসমান গণির সাথে দেখা হলো গুনগুনের। গুনগুনের বাবা তিনি। কথা কম বলা স্বল্পভাষী, রুক্ষ স্বভাবের মানুষ। প্রায় সময় রেগেই থাকেন। তার সব রাগ গুনগুনের ওপরেই। আজও মনে হচ্ছে রেগে আছে। গুনগুন কোনো পাত্তা দিল না। সে নিজের রুমে চলে যাচ্ছিল। তখন ওসমান গণি বললেন,
“দাঁড়া।”
গুনগুন দাঁড়াল। পালটা কিছু জিজ্ঞেস করল না। তিনি নিজে থেকেই বললেন,
“কী শুরু করেছিস তুই?”
গুনগুন এবার প্রশ্ন করল,
“কী করেছি?”
“কী করেছিস সেটা তুই খুব ভালো করেই জানিস। নতুন এলাকায় আসতে না আসতেই ঝামেলা বাঁধিয়ে দিয়েছিস। তুই কি আমাকে কোথাও শান্তিতে একটু থাকতে দিবি না?”
গুনগুন নিশ্চুপ। তিনি বললেন,
“এলাকার বখাটে ছেলেদের মে’রেছিস কেন?”
“অ’স’ভ্যতামি করেছিল তাই।”
“ওদের সভ্যতা শেখানোর জন্য তো আর তোকে নিয়ে এখানে আসিনি। তোর জন্য চোরের মতো আগের এলাকা ছেড়ে এত দূরে আসতে হয়েছে। এখন আবার এই এলাকাও ছাড়ার প্ল্যান করতেছিস?”
পাশ থেকে তখন সুমনা বেগম বললেন,
“তোমাকে তো আমি আগেই বলেছিলাম, ঐ ছেলের সাথেই ওর বিয়ে দিয়ে দাও। তখন তো শোনো নাই আমার কথা। এখন বোঝো কেমন লাগে।”
ওসমান গণি হুংকার ছুঁড়ে বললেন,
“আর যেন কখনো কোনো ঝামেলায় না দেখি তোকে। তাহলে আমার চেয়ে খারাপ আর কেউ হবে না।”
গুনগুন কয়েক সেকেন্ড বাবার দিকে তাকিয়ে থেকে বলল,
“আমি তোমাকে কখনো বলিনি চোরের মতো এলাকা ছেড়ে আসতে। তুমি নিজে থেকে এসেছ। আমি অন্যায়, অপরাধকে ভয় পাই না। আমার সাথে যে যেমন আচরণ করবে, তেমনটাই ফেরত পাবে। এভাবে যদি আমাকে তুমি মানতে না পারো তাহলে বলে দাও বাড়ি ছেড়ে চলে যাব আমি।”
ওসমান গণির মাথা নষ্ট হয়ে যাচ্ছে রাগে। মেয়ের বাড়াবাড়ি রকমের রাগ-জেদ তার সহ্য হয় না। মাঝে মাঝে সত্যিই ইচ্ছে হয়, বাড়ি থেকে বের করে দিতে। কিন্তু পারেন না অদৃশ্য কোনো কারণেই। অফিস থেকে বাড়ি ফেরার পথে চায়ের দোকানদার তাকে ডেকে গতকাল এবং আজকের ঘটনাটি জানিয়ে সাবধান করেছেন এবং গুনগুনকেও সাবধান করতে বলেছেন। কিন্তু গুনগুন যেরকম তেজি, ওকে দমিয়ে রাখাও তো এত সহজ নয়। কে আটকাবে ওকে?
মাসুদ শরীর দুলিয়ে খিলখিল করে হাসছে। সাথে হাসছে বাকি বন্ধুরাও। একমাত্র প্রণয়-ই রাগ করে বসে আছে। রাগে এখনো তার হাত-পা কাঁপছে।
মাসুদ হাসতে হাসতে বলল,
“এখন কেন রাগ করছিস? গতকাল আমার কেমন লেগেছিল বুঝেছিস এবার? শুধু তো গুনগুন মা’রে’নি। তুইও মে’রে’ছি’স আমাকে। ডাবল থা’প্প’ড় খেয়েছি। গুনগুনের উচিত ছিল তোকে আরও একটা থা’প্প’ড় দেওয়া।”
প্রণয় অগ্নিদৃষ্টিতে তাকাতেই মাসুদ হাসি আটকানোর চেষ্টা করল। পরক্ষণেই আবার হাহা করে হাসি শুরু করল। হাসতে হাসতে বলল,
“মাইয়্যাডার হাত পুরা ট্রেনের গতিতে চলে।”
প্রণয় এবার ক্ষেপে গিয়ে বলল,
“আর একটা কথা বললে লা’ত্থি মেরে ঘর থেকে বের করে দেবো। সামনে থেকে দূর হ এখন।”
“আমার লগে এমন করস ক্যান? তোর গুনগুন-ই তো মা’র’ছে তোরে। থাক, রাগ করিস না।”
“যাবি তুই? সবগুলা বের হ এখন ঘর থেকে।”
রুম থেকে বের হতে হতে মাসুদ বলল,
“থা’প্প’ড়ের টেস্ট কেমন আছিল রে দোস্ত?”
প্রণয় এবার পায়ের জুতা খুলে ছুঁড়ে মা’র’ল মাসুদের দিকে। মাসুদ দৌঁড়ে সরে গেল তখন।
আবার একটুপর-ই মাসুদ উঁকি দিল রুমে। গুটিগুটি পায়ে এগিয়ে প্রণয়ের পাশে বসল। কণ্ঠস্বর যথাসম্ভব নিচু করে জিজ্ঞেস করল,
“মেজাজ কি বেশি খারাপ?”
“আবার মজা নিতে এসেছিস?”
“আব্বে না! কিন্তু তুই শা’লা ওরে কিছু বললি না ক্যান? উলটা আবার বললি চলে যেতে!”
“কী বলতাম?”
“কী বলতি মানে? সঙ্গে সঙ্গে একটা থা’প্প’ড় লাগিয়ে দিলি না ক্যান?”
“আমার মা ছোটোবেলায় শিখিয়েছিল, মেয়েদের গায়ে হাত তুলতে হয় না। কা’পু’রু’রা মেয়েদের গায়ে হাত তুলে ওদের শাসন করতে চায়, নিজের আধিপত্য জাহির করতে চায়।”
মাসুদ বাঁকা হাসি দিয়ে বলল,
“শা’লা! এত নীতিবাক্য মাইন্যা চললে হইব? ঐ মাইয়্যা তো একবার আইসা জিগাইলও না কিছু। ভালো-মন্দ না জিগাইয়াই ধাম কইরা থা’প্প’ড় দিয়া দিল। তুই তো আর ইচ্ছা কইরা সিগারেট ছুঁ’ই’ড়া মা’র’স নাই।”
“এসব তো তোদের জন্যই হচ্ছে। গতকালের ঘটনার জন্য আজকে এই ঘটনা ঘটল। ও তো ভাবছে, আমি ইচ্ছে করেই কাজটা করছি।”
“ওরে শা’লা! সব দোষ এখন মাসুদ ঘোষ? যেখানে যা-ই হোক দোষ এসে পড়ে আমার ঘাড়ে।”
“দোষ তো তোর আছেই।”
“ঐ ব্যাটা আমার লগে এত না গ্যাঁজাইয়া যা ওরে গিয়া দুইটা থা’প্প’ড় দিয়া আয়। মাথা, মন দুইডাই ঠান্ডা হইব।”
প্রণয় নাকের পাটা ফুলিয়ে বলল,
“মা’রা’র হইলে তখনই মারতাম। সমস্যা নাই, আমার গায়ে হাত তুলছে না? এর প্রতিশোধ নেব আমি অন্যভাবে। প্রণয়রে এখনো ও চিনে নাই।”
মাসুদ শ্লেষাত্মক কণ্ঠে বলল,
“হাহ্! কিন্তু আমি ঐ মাইয়্যারে চিনছি। ছোটো ঝাঁঝওয়ালা মরিচগুলা আছে না? একদম ঐ মরিচ। মুখের চেয়ে হাত চলে বেশি। ধারেকাছে গেলেই দুমদাম খালি মা’ই’র। ঝাঁঝ আর ঝাঁঝ!”
প্রণয় বিরক্ত হয়ে বলল,
“এই যা তো মাসুদ, সর এখান থেকে।”
“হ ভাই পারো তো খালি এখন আমার লগেই। তোমার গুনগুনরে তো আর কিছু কইতে পারবা না।”
“তুই যাবি?”
“যাইতাছি। তোমার থা’প্প’ড়ে’র রানিরে সামলাইয়া রাইখো।”
“থাক তুই। তোর যাওয়া লাগবে না। আমিই যাইতাছি বাইরে।”
প্রণয় রাগ করে একাই বাইরে গিয়ে রাস্তায় হাঁটতে লাগল। এই পর্যন্ত কতগুলো যে সিগারেট খেয়েছে তার কোনো হিসাব নেই। তবুও রাগ কমছে না। কীভাবে এর শোধ তোলা যায় সেটাই ভাবছে এখন হাঁটতে হাঁটতে।
গুনগুনের আজ একটা ভাইবা ছিল। খুব ভালো দিয়েছে ভাইবা। এজন্য মনটাও ভালো লাগছে। শিহাবের আজ স্কুল ছুটি। এই সময়ে বাড়িতেই আছে। গুনগুন তাই ওর জন্য চকোলেট নিয়ে এসেছে আসার সময়। রিকশা দিয়ে গলিতে ঢোকার সময় দেখে শিহাব ও আরো কয়েকজন ছেলে মিলে ব্যাডমিন্টন খেলছে রাস্তায়। এত জনবহুল এলাকা যে আশেপাশে এই রাস্তা ছাড়া খোলা কোনো জায়গাও নেই। মাঠ আছে সেটাও অনেকদূরে। বাচ্চারা তাই রাস্তাতেই খেলে। বড়োরাও কিছু বলে না।
মাসুদ গুনগুনকে দেখে বলল,
“ঐযে তোর থা’প্প’ড়ে’র রানি আইতাছে। কালা শাড়িতে কিন্তু সুন্দর-ই লাগতাছে।”
প্রণয় চোখ গরম করে তাকাল। এরপর আবার ঠিকই তাকাল গুনগুনের দিকে। মেজাজ খারাপ হচ্ছে আবার। চোখ ফিরিয়ে নিল প্রণয়।
শিহাব গুনগুনকে দেখে দৌঁড়ে গেল। বায়না করতে লাগল,
“চলো না আপু খেলি?”
গুনগুন বলল,
“না রে, আমি এখন টায়ার্ড।”
“একটু আপু?”
গুনগুন রাজি হয়ে গেল। জামিল ও মাসুদ বলাবলি করছে,
“এই মাইয়্যা হাসতেও পারে? ওরে আল্লাহ্! দেখ পোলাপানের লগে কেমনে হাইসা কথা কয়।”
প্রণয় চরম বিরক্ত হয়ে বলল,
“তোদের কি কথা বলার মতো আর কোনো টপিক নাই? সারাক্ষণ গুনগুন, ঘ্যানঘ্যান। বিরক্ত…”
কথা শেষ করার আগেই শাটলকক এসে লাগল প্রণয়ের পিঠে। প্রণয় থেমে গিয়ে অবাক হয়ে পেছনে তাকাল। শাটলকক শিহাব মেরেছে, গুনগুন না। মাসুদ উচ্ছ্বাসিত হয়ে বলল,
“এই শা’লা! পাইছি এবার ক্যাচাল করার টপিক।”
প্রণয় কোনো কথা না বলে শাটলকক নিয়ে সোজা গুনগুনের সামনে দাঁড়াল। জিজ্ঞেস করল,
“রাস্তা কি খেলার জায়গা?”
“কোথায় খেলব সেই পারমিশন তো আপনার থেকে নেব না।”
“নতুন এসে খুব বেশি উড়তেছ। কিছু বলছি না বলে, নিজেকে রানি ভিক্টোরিয়া ভেবো না।”
“আপনিও নিজেকে আলেকজান্ডার দ্য গ্রেট ভাবা বন্ধ করেন।”
প্রণয় দাঁতে দাঁত পিষে বলল,
“রাস্তায় খেলা যাবে না বলছি যখন খেলা যাবে না। রাস্তা তোমার বাপের না।”
গুনগুন এদিক-ওদিক তাকিয়ে বলল,
“রাস্তায় তো আপনার বাপের নামও লেখা দেখতেছি না।”
প্রণয় রাগ, জেদ আর কন্ট্রোল করতে না পেরে গুনগুনের হাত থেকে র্যাকেটটি নিয়ে আছাড় দিয়ে ভে’ঙে ফেলল। মাসুদ পাশ থেকে খুশিতে আত্মহারা হয়ে বলল,
“ঠিক হইছে, একদম ঠিক হইছে। বে’য়া’দ’ব মেয়ে একটা!”
গুনগুনও এবার রাগে-জিদ্দে প্রণয়ের হাত থেকে শাটলকক ছোঁ মেরে কেড়ে নিয়ে মাসুদের দিকে ছুঁ’ড়ে মারল।
শেলী চৌধুরী বাজার করে রিকশা নিয়ে ফিরছিলেন। আবার ওদের একসাথে দেখে ঘটনা আন্দাজ করতে পারলেন তিনি। চটজলদি রিকশা থেকে নেমে এগিয়ে গিয়ে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে এখানে?”
প্রণয় রাগে ফুসে উঠে বলল,
“আন্টি, এই মেয়ে কিন্তু দিনদিন খুব বাড়তেছে। এলাকায় আসতে না আসতেই একটার পর একটা ঝামেলা করতেছে। এখনো কিছু বলিনি। কিন্তু ধৈর্যের সীমা লঙ্ঘন করলে কিন্তু আর কোনো ছাড় দেবো না।”
ঝগড়া-ঝাটি কী নিয়ে লেগেছে সেসব কিছু বিস্তারিত জানতে চাইলেন না তিনি। গুনগুন ও শিহাবকে নিয়ে বাড়ির দিকে যেতে লাগলেন। প্রণয় পেছন থেকে বলতে লাগল,
“আর একদিন কোনো ঝামেলা করলে একদম এলাকা ছাড়া করে ছাড়ব।”
গুনগুন জবাব দেওয়ার জন্য দাঁড়াতে চাইলে শেলী চৌধুরী এবার ধমক দিয়ে বললেন,
“চুপচাপ আমার সাথে চলো। আর একটাও কথা বলবে না।”
প্রণয়ের রাগ কিছু কমলেও, সবটা কমেনি। সে জড়ো হওয়া লোকদের ধমক দিয়ে বলল,
“ঐ মিয়া, দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কী দেখেন আপনারা? তামাশা দেখেন? যান এখান থেকে।”
সবাই চলে যাওয়ার পর ভিড় কমল। মাসুদ চোখ-মুখ কুঁচকে বলল,
“এই মা’র’কু’টে মেয়েটা খালি আমারে মা’রে ক্যান? পাইছে কী আমারে? আমার শরীর কি সরকারি নাকি বুঝলাম না। কখনো গালে মা’রে, কখনো সিনায় মা’রে। কী এক মুসিবত!”
প্রণয় কোনো জবাব দিল না। সে ভাবছে অন্যকিছু। গুনগুনকে আর বাড়তে দেওয়া যাবে না। ওর ডানা কা’ট’তে হবে এখনই।
.
.
প্রণয় বন্ধ টং এর দোকানে বসে আছে। ওর সাথে আছে মাসুদ এবং বাকি বন্ধুরা। একের পর এক সিগারেট খেতে খেতে অপেক্ষা করছে গুনগুনের বাবার জন্য। এক সময় বিরক্ত হয়ে প্রণয় বলল,
“এই ব্যাডা কী কাজ করে রে? এখনো আসে না ক্যান?”
মাসুদ মাথা চুলকিয়ে বলল,
“তা তো জানিনা।”
“তুই ওর বাপে রে চিনস তো? শিওর তুই এখনো বাসায় আসে নাই?”
“হ ব্যাটা!”
কয়েক সেকেন্ড বাদেই মাসুদ লাফিয়ে উঠে বলল,
“ঐযে ঐযে আইতাছে।”
ওসমান গণি কাছাকাছি আসতেই সবাই সামনে গিয়ে পথরোধ করে দাঁড়াল। প্রণয় নাক-মুখ দিয়ে সিগারেটের ধোঁয়া বের করে বলল,
“গুনগুন আপনার মেয়ে?”
ওসমান গণি ভ্রু কুঁচকে পালটা জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমরা কারা?”
“যা জিজ্ঞেস করছি উত্তর দেন। বাড়তি কথা পছন্দ না একদম।”
ওসমান গণি কিছুটা দমে গিয়ে বললেন,
“হ্যাঁ, গুনগুন আমার মেয়ে। কী হয়েছে?”
মাসুদ পাশ থেকে বলল,
“আপনের মাইয়্যা খুব বাড় বাড়ছে। এত তেজ কিন্তু ভালা না। কখন তুইল্যা নিয়া গুম কইরা দিমু টের পাইবেন না।”
প্রণয় মাসুদকে থামিয়ে বলল,
“যদি এলাকায় থাকার ইচ্ছা থাকে তাহলে আপনার মেয়েকে বলবেন ভালোমতো চলতে। আসার পর থেকে বে’য়া’দ’বি করে যাচ্ছে। আমাদের সঙ্গে পাঙ্গা নিচ্ছে। মেয়ে মানুষ হতে হয় নরম, কোমল। এত তেজ, অহংকার ভালো না। আমার আবার ধৈর্য কম। যদি একবার মাথা গরম হয়ে যায় তাইলে ভুলে যাব সামনে কোনো মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে নাকি কোনো ছেলে। আজকে আপনাকে একা ডেকে বলতেছি কথাগুলো। এরপর যদি আবার বাড়াবাড়ি করে তাইলে আপনার মেয়ের মান-সম্মান নিয়ে টান তো দেবোই সাথে আপনারও। আপনার একটা ছোটো ছেলেও তো আছে, না? কেমন হয় যদি আগে ওরেই গুম করে ফেলি?”
ওসমান গণি ঠান্ডার মধ্যেও ঘামতে লাগলেন। প্রতিবার তাকে এসব সমস্যার মুখোমুখি হতে হয়। আগের এলাকাতেও তিনি গুনগুনের জন্য অনেক ঝামেলায় পড়েছিলেন। যদিও সেসব ঝামেলার কারণ ভিন্ন ছিল। কিন্তু এই ছেলেগুলোও অন্যরকম সাংঘাতিক। ফাঁকা বুলি ছাড়ার মতো ছেলে মনে হচ্ছে না। তিনি ঠিক কী জবাব দিলে ওদের মন ভরবে সেটাও তিনি জানেন না।
প্রণয় সিগারেটটি মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে বললেন,
“কথাগুলো মাথায় রাইখেন।”
ওসমান গণি রাগে কাঁপতে কাঁপতে বাড়িতে ঢুকলেন। নিজের রুমে না গিয়ে সোজা গুনগুনের রুমে চলে গেলেন।
গুনগুন নেক্সট প্রেজেন্টেশনের স্লাইড বানাচ্ছিল। বাবাকে এভাবে রুমে আসতে দেখে কিছু বলারও সুযোগ পেল না সে। তার আগেই তিনি গুনগুনের হাত ধরে টেনে বাইরে নিয়ে এলেন। ফ্ল্যাটের দরজা খুলে বললেন,
“তোকে নিয়ে এত যন্ত্রণা আর আমি সহ্য করতে পারছি না। প্রতিদিন ভালো লাগে না আর এত অশান্তি। বেরিয়ে যা বাড়ি থেকে।”
গুনগুন বিস্ময় নিয়ে তাকিয়ে আছে। বাবার সঙ্গে তার সম্পর্ক ভালো না হলেও, সে অন্তত এটা কখনো কল্পনাও করেনি যে, ওর বাবা ওকে বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারে। গুনগুন নিজে অনেকবার বলেছে বাড়ি থেকে বের করে দিতে, ওসমান গণিও অনেকবার রাগ করে বলেছিলেন বের করে দেবেন কিন্তু তিনি এমন কিছু কখনোই করেননি। শুধু বলা পর্যন্তই ছিল। গুনগুনের ধারণা ছিল, ওর বাবা ওর মাকে ভালো না বাসলেও মনের এক কোণে ওর জন্য একটুখানি হলেও মায়া আছে, ভালোবাসা আছে। কিন্তু গুনগুন আজ ভুল প্রমাণিত হলো। আজ আর মুখে নয়, কাজেই প্রমাণ করে দিলেন যে গুনগুন একা। ভীষণ একা! এই দুনিয়ায় যার মা নেই, তার আসলে আর কেউই নেই! এই চরম তিক্ত সত্য কথাটা যেন গুনগুন আরো একবার খুব তীব্রভাবে অনুভব করতে পারল।
সুমনা বেগম পাশ থেকে জিজ্ঞেস করলেন,
“কী হয়েছে?”
ওসমান গণি চিৎকার করে বললেন,
“কী হবে? ওর জন্য রাস্তার বখাটে ছেলেরা এসে আমাকে থ্রে’ট করে যায়।”
এরপর গুনগুনের দিকে তাকিয়ে বললেন,
“তোর মতো মেয়েরে জন্ম দিয়েই ভুল করছি আমি। তোর জন্য এখন আমার পরিবার, ছেলেকে হারাতে পারব না। এখনই তুই বাড়ি থেকে বেরিয়ে যা।”
গুনগুন ভীষণ শক্ত মনের মেয়ে। অথচ তবুও চোখদুটো আজ ছলছল করছে। তার আত্মসম্মানবোধও প্রবল। ঝাপসা দৃষ্টিতে বাবার দিকে তাকিয়ে বলল,
“ঠিক আছে। বাড়ি ছেড়ে চলে যাব আমি। সকাল হলেই চলে যাব। শুধু রাতটা থাকতে দাও।”
গুনগুনের চোখের পানি দেখেও ওসমান গণির মন গলল না। অথচ একটা সময়ে এই গুনগুন-ই ছিল তাঁর চোখের মণি। তিনি পুনরায় বজ্রকণ্ঠে বললেন,
“আর এক সেকেন্ডও নয়! এক্ষুনী বের হয়ে যা।”
“এত রাতে আমি কোথায় যাব?”
“কোথাও যাওয়ার জায়গা না থাকলে জা’হা’ন্না’মে যা। তবুও আমাকে শান্তি দে।”
“বললাম তো আমি সকাল হলেই চলে যাব।”
ওসমান গণি আর কথা না বাড়িয়ে গুনগুনের হাত ধরে টেনে তিনতলা থেকে সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামতে লাগলেন। গুনগুনকে অনেকটা টেনে-হিঁচড়ে একদম বাড়ির মেইন গেইটের বাইরে নিয়ে বললেন,
“আর কখনো তোর মুখ দেখাবি না।”
গেইট লাগিয়ে চলে গেলেন তিনি। দরজার সামনে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে গুনগুন। পায়ের নিচের মাটিটাকে বড্ড শূন্য লাগছে। মায়ের ওপর অভিমান হচ্ছে খুব, কেন তিনি সাথে করে নিয়ে গেল না গুনগুনকে?
গুনগুনের থেকে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল প্রণয়। সিগারেট নিতে বের হয়েছিল। ওসমান গণি শেষে কী কী বলেছেন তা প্রণয় শোনেনি। তবে এতটুকু বুঝতে পেরেছে যে, তিনি গুনগুনকে বাড়ি থেকে বের করে দিয়েছেন।
চোখের পানি মুছে গুনগুনকে এদিকে আসতে দেখে অন্ধকারে একটা গাড়ির আড়ালে লুকিয়ে পড়ল প্রণয়। একটা চায়ের দোকান ছাড়া সব দোকান বন্ধ। পুরো রাস্তা জনমানবহীন। দু, একটা কুকুর রাস্তায় শীতে গুটিসুটি হয়ে শুয়ে আছে। এত রাতে মেয়েটা যাচ্ছে কোথায়? গুনগুন নিজেও জানে না সে কোথায় যাচ্ছে কিংবা কোথায় যাবে। ওর কাছে ফোনও নেই যে কারো সাথে যোগাযোগ করবে। বান্ধবীদের বাড়িও এখান থেকে অনেকদূরে। এত রাতে একা কীভাবে যাবে সে জানে না। যেতে পারলেও ওদের পরিবারের অনেকের প্রশ্নের মুখোমুখি হতে হবে এখন। গুনগুন সেসব চাইছে না। সে কোনো উপায় খুঁজে পাচ্ছে না যে কী করবে!
হাঁটতে হাঁটতে গুনগুন অনেক দূর চলে গিয়েছে। সামনের রাস্তাগুলো একদম ফাঁকা এবং ভালোও নয়। অনেক মাতাল ছেলেদের আনাগোনা ওদিকে। প্রণয় এতক্ষণ নিশ্চুপ দাঁড়িয়ে থাকলেও এবার দৌঁড়ে গেল গুনগুনের কাছে। পায়ের শব্দ শুনে সচকিত হয়ে পেছনে তাকাল গুনগুন। প্রণয়কে দেখে বিস্ময় ও রাগ নিয়ে বলল,
“আপনি!”
প্রণয় সোজাসাপ্টা প্রসঙ্গে গিয়ে বলল,
“ওদিকে যেও না। খারাপ ছেলেরা সব ওখানে।”
গুনগুনের হাসি পেল খুব। এক খারাপ ছেলে অন্যদের বলছে খারাপ। একটু আগেই ওর বাবাকে থ্রে’ট করে এখন ভালো মানুষ সাজা হচ্ছে। গুনগুন তাচ্ছিল্যের সুরে বলল,
“আপনিও তো খারাপ।”
“দেখো আমি ভালো না খারাপ সেই প্রমাণ আমার তোমাকে দেওয়ার ইচ্ছে নেই একদম। তবুও যেচে পড়ে তোমাকে হেল্প করতে এসেছি কেন জানিনা। তোমার ভালোর জন্যই বলছি, ওদিকে যেও না। মানুষরূপী কু’কু’রের পালগুলো তোমায় পেলে একদম ছিঁ’ড়ে খাবে। সবাই কিন্তু প্রণয় নয় যে, তোমাকে ছেড়ে দেবে।”
“ফর গড সেইক, আপনার ভালো মানুষ সাজার নাটকটা বন্ধ করুন প্লিজ! আমার সাথে আজ যা হয়েছে সব আপনার জন্যই হয়েছে।”
“এজন্য আমি মোটেও দুঃখিত নই। তুমি আমাকে বাধ্য করেছ।”
“আপনার প্রতিশোধ নেওয়া হয়েছে? এবার আপনি যান। বাসায় গিয়ে আনন্দ করুন।”
গুনগুন আবার হাঁটা শুরু করেছে। ওর গায়ে বাসায় পরার একটা পাতলা শাল। এতে শীত মানছে না। ঠান্ডায় জমে যাচ্ছে একদম। প্রণয় গুনগুনের শালের এক কোণা টেনে ধরল। গুনগুন বিস্ময়ের সর্বোচ্চ চূড়ায় পৌঁছে গিয়ে বলল,
“আপনার এত বড়ো সাহস! শাল ছাড়ুন আমার।”
প্রণয় শাল ছাড়ল না। বলল,
“পেছনের ঐ বাড়িতে আমার এক পরিচিত মেয়ে ফ্রেন্ড থাকে। আজকের রাতটা ওর বাসায় থাকো। সকালে যেখানে ইচ্ছে চলে যেও।”
“আমি বলেছি, আমার শাল ছাড়ুন।”
এবার গুনগুন থা’প্প’ড় দিতে গেলে প্রণয় হাত ধরে ফেলল। রাগে গুনগুনের দুগাল চেপে ধরে বলল,
“এই মেয়ে, এত সাহস কই পাও তুমি? দিন-দুপুরে না হয় মানা যায়। এই রাতেও ফাঁকা রাস্তায় সাহস দেখাতে এসেছ? প্রতিবার কিছু বলি না বলে সাহস বেড়ে গেছে তোমার?”
চলবে…
[রি-চেক করা হয়নি। ভুলত্রুটি থাকতে পারে। আর হ্যাঁ, ‘হ্যাপি নিউ ইয়ার’ আমার ভালোবাসার পাঠকরা। সর্বদা ভালো থাকুন, হাসি-খুশি থাকুন দোয়া করি।]
Share On:
TAGS: প্রণয়ে গুনগুন, মুন্নি আক্তার প্রিয়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তুমি অজান্তেই বেঁধেছ হৃদয় গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৮
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ১
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৭
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৫
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৬
-
প্রণয়ে গুনগুন গল্পের লিংক
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ৪
-
প্রণয়ে গুনগুন পর্ব ২