পিদিমজ্বলারাতে. ১৫ ✍️ #রেহানা_পুতুল
সলিমুল্লা নাতির দিকে তাকিয়ে বলে উঠলেন, “তোর মায়ের পছন্দই আমার পছন্দ। সেই পাত্রীকেই তুই নতুন ঘরে তুলিস ভাই।”
তৌসিফ অদ্ভুত ও বিস্মিত চোখে একবার মায়ের দিকে একবার দাদার পানে চাইল। অবাক চোখে একরাশ কৌতুহল নিয়ে জানতে চাইলো,
“তারমানে আপনাদের মাঝে সেই পাত্রী নিয়ে বোঝাপড়া হয়েছে?”
রাবেয়া ও জাহেদ নিরব হয়ে আছে। সলিমুল্লা বললেন,
“তোর মায়ের সাথে আমার কোনো কথা হয়নাই সেইসব ব্যাপারে। আমি ওইপাশ থেইকা তার কথা শুইনাই বুঝছি কার কথা কইতাছে সে।”
“কার কথা দাদা?”
সঠিক উত্তরের আশায় মাষ্টারের মতো করে বলল তৌসিফ।
সলিমুল্লা বললেন,
“তোর বড় চাচা জামাল তোরে অত্যন্ত পছন্দ করে ছোটবেলা থেইকাই। তাই ওর ইচ্ছা সাথিরে তোর লগে বিয়া দেওনের। আমারে বইলা রাখছে তোগো কাছে প্রস্তাব দেওনের লাইগা তাগো হইয়া। তুই চইলা যাওয়ার আগে আমিই কথাটা তুলতাম। এখন তো কওয়া হই গ্যালোই। এবার তোরা চিন্তাভাবনা কইরা আমারে জানাইস।”
সলিমুল্লা থামলেন। জাহেদ ও তৌসিফ বিষম খেল শুনে। এমন কিছু কখনই তাদের মাথায় আসে নি। রাবেয়া অবাক হল না। যেহেতু আগে থেকেই সে জানে। জাহেদ নিজে কিছু বলল না। তার ইচ্ছে, তৌসিফের লাইফ তৌসিফের সিদ্ধান্ত। তাই যা বলার সেই বলুক। তৌসিফ উত্তেজিত হল না। অন্য সময়ের মতো ক্ষিপ্র আচরণ করল না দাদার সঙ্গে। বাবা,মায়ের নিরবতা দেখে সে মুখ খুলল।
শীতল অথচ বুদ্ধিদীপ্ত মেজাজে বলল,
“দাদা,আপনি প্রস্তাব দিয়েছেন। আমরা শুনেছি। আমরা চিন্তাভাবনা করে আপনাকে রেজাল্ট জানাব।”
সলিমুল্লা প্রসন্ন চোখে নাতির দিকে চাইলেন। কেননা নাতির জবাবে তিনি সন্তুষ্ট হলেন বেশ। নয়তো মনে মনে একটু চিন্তিত ছিলেন,না জানি গত সময়গুলোর মতো তৌসিফ তেজী ঘোড়া হয়ে উঠে।
তিনি নরম গলায় বললেন,
” কোনো অসুবিধা নাই ভাই। বিয়ের মতো চিরদিনের সম্পর্কের বিষয়ে সিদ্ধান্তটা সময় নিয়া নেওনই উচিত। তোরা জানাইস আমারে।”
সলিমুল্লা উঠে গেলেন নিজের রুমে। তৌসিফ উঠে গিয়ে নিজেদের রুমের দরজা বন্ধ করে দিল। বিছানায় উঠে বাবার পাশে আধশোয়ার মতো হয়ে বসল। সে দেখল তার বাবা,মা এখনো চুপ হয়ে আছে। কোনো কথা বলছে না।
তৌসিফ তার বাবাকে স্পষ্ট সুরে জিজ্ঞেস করলো,
“বাবা, দাদার প্রস্তাবের উত্তর কী আপনার কাছে? না-কি সময় নিবেন উত্তর দেওয়ার জন্য।”
“সময় নেওয়ার কিছুই নাই। আমি কিছুতেই এটা চাই না। ঘরের ভিতর বাড়তি সম্পর্ক সৃষ্টি করার মানেই হয় না। তোর মা হয়তো মনে করবে নবনী মেয়েটার জন্য আমি এটা বলছি। তা কিন্তু নয়। তুই যদি নবনী মেয়েটাকে বিয়ে না করিস,তবুও আমি এটা চাই না। সাথি আমার ভাতিজি। সেই হিসেবে এমনিতেই ওরে যথেষ্ট স্নেহ করি। তাই বলে পুত্রবধূ হিসেবে মেনে নিব,তা অসম্ভব! আমি বোকা কিনা তোদের চোখে, তা জানি না। তবে সত্যি বলতে আমার চক্ষুলজ্জাটা বেশী। তাই তোর মায়ের সাথে পরিবারের লোকজনের কিছু ভুলত্রুটি দেখলেও না দেখার ভান করে এড়িয়ে গেছি। তোর মাকেও প্রশ্রয় দিই নি। সেসব দিক দিয়ে আমি অপরাধী!”
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললেন জাহেদ। তৌসিফ বাবার হাতের উপর হাত রাখল। বলল,
“ভুল মেডিসিন খাইয়ে আপনাকে যে শারিরীকভাবে অক্ষম করে দিচ্ছিলো আপনার ছোটভাই,তা বিশ্বাস করেন?”
“বাবা,যেহেতু এখনও কোন প্রত্যক্ষ প্রমাণ মিলেনাই,তাই এটা নিয়ে আমি নিশ্চিত নয়। তবে একবারে যে অবিশ্বাস করছি,বিষয়টা কিন্তু তাও নয়। ডাক্তারের কথা তো আর ভুল বা মিথ্যা হতে পারে না।”
দ্বিধান্বিত স্বরে বলল জাহেদ।
“সেটার প্রমাণ তো আমি নিবই। ভাববেন না সময়ক্ষেপন হচ্ছে বলে বা ঘর করা, পরবর্তীতে বিয়ে করা,এসবের ব্যস্ততায়, আনন্দে আমি এটা বেমালুম ভুলে যাব কিংবা বাদ দিব। তা কখনই হবে না বাবা। আপনার র * ক্ত আমার শরীরে বহমান। আপনি যেমন পরিবারের প্রতি ডেডিকেটেড ছিলেন,তেমনি আমিও। পার্থক্যটা হলো আপনি উচিত অনুচিতের, ন্যায় অন্যায়ের প্রতিবাদ করতেন না। আমি করি এবং ভবিষ্যতেও করব। ইনশাআল্লাহ।”
সাথিকে নিয়ে বলা স্বামীর কথাগুলো শুনে রাবেয়া গোমড়া মুখ করে বসে আছে। তা টের পেল জাহেদ ও তৌসিফ। তৌসিফ তার মুঠোফোন থেকে ছোট ভাই তানভিরকে ফোন দিল। সাথির বিষয়টা বলে তার মত জানতে চাইল। নবনীর বিষয়টাও ভাইকে বলল। সব শুনে তানভির বলল,
“বড় ভ্রাতা,আমি মাফও চাই। দোয়াও চাই। গৃহের অন্দরে বাড়তি সম্বন্ধ মানেই বাড়তি বিড়ম্বনা। জানিয়া শুনিয়া গৃহের মাঝে অতিরিক্ত ঝঞ্জাট সৃষ্টি হইবার পথকে সুগম করিয়া দেওয়া কোনো বুদ্ধিমানের পরিচায়ক নহে। সুতরাং আমি পিতার সুযোগ্য পুত্র হিসেবে কহিতে চাই, সলিমুল্লার উক্ত প্রস্তাবখানা প্রত্যাখ্যান করিলাম হাসিমুখেই। নবনী মেয়েটাকে আমার বেশ মনে ধরিয়াছে। পিতা মাতা দিনে দিনে রোগাক্রান্ত হইয়া যাইতেছে। তাই এই গৃহে ডাক্তার বধূর বিকল্প অন্য কেহই হইতে পারে না। আপনারা পিতাপুত্র মিলিয়া মাতাজানকে বুঝাইয়া নেন নিজ দায়িত্বে। আমি রাখিলাম ভ্রাতা। আমার বিদ্যা গ্রহণ বাদ দিয়া এতক্ষণ কথা কহিলাম।”
তানভির ফোন রেখে দিল। লাউড স্পিকারে ছিল বলে রাবেয়া ওপাশ হতে বলা ছোট ছেলের সব কথা শুনল। বিরস মুখে বলল,
“ওই এমন কইরা কথা কয় ক্যান? ঠিকভাবে কথা কইতে পারে না?”
তৌসিফ খাট থেকে নেমে গেল। মোড়া নিয়ে মায়ের গা ঘেঁষে বসল। মায়ের পিঠের উপর দিয়ে হাত বাড়িয়ে মাকে জড়িয়ে ধরল। আবেগপ্রবণ গলায় বলল,
“মা,তুমি দেখলে তো,বাবা,তানভির,আমি চাই না সাথি আমাদের ঘরের বড় পুত্রবধূ হোক। বাবার সুরে আমিও বলতে চাই,একটা ভিখারির মেয়েকে বিয়ে করব,তবুও সাথিকে নয়। চাচাতো বোন হিসেবে ওর প্রতি আমার অনেক ভালোবাসা আছে। সেটা সারাজীবন থাকবে। কিন্তু ভিন্নভাবে গ্রহন করা সম্ভব নয়। তুমি যদি ভাব নবনীর জন্য। তা চরম ভুল হবে মা। নবনীকে সেই চোখে আমি কখনই দেখিনি। আজও দেখি না। ফিউচার কী হবে তা আমরা কেউই জানি না। জন্ম,মৃত্যু, বিয়ে এই তিন সরাসরি আল্লাহর হাতে। এই নিগুঢ় সত্য বাক্যটি তো তুমিও জানো মা।
এখন হয়তো প্রশ্ন করতে পারো কেন সাথির বিষয়ে আমাদের সবার ঘোর আপত্তি? আমি তোমাকে তা বুঝিয়ে বলছি। তুমি তো আমার কেবল সরল মা-ই নয়,বোকা মা-ও। কেবল খাটতেই পারো সংসারের জন্য। সূদুরপ্রসারী কোন কিছুই ভাবতে পার না। না নিজেকে নিয়ে,না আমাদেরকে নিয়ে।”
“এত বছর পর আমারে তোর সিধা মনে হইলো?”
অনুযোগের সহিত বলল রাবেয়া।
শুনে জাহেদ ও তৌসিফ ঠোঁট ভিড়িয়ে মুচকি হেসে ফেলল। তৌসিফ মায়ের প্রশ্নের জবাব দিল সুচারুময়ভাবে।
“হ্যাঁ, মনে হলো। খুব মনে হলো। তুমি আমার ভালো মা! সুন্দর মা! মিষ্টি মা! স্নিগ্ধ মা! লক্ষী মা! আদুরে মা! ধৈর্যশীলা মা। কিন্তুউউ…বোকা মা! সরল মা! তোমার ভাষায় সিধা মা। নয়তো কেন তুমি চাচীর কথায় পটে গেলে? কেন তোমার সাদা অন্তর এদের কালারূপ দেখতে পেল না? কেন তুমি এদের স্বার্থবাদিতার হিসেবটা বুঝলে না মা? আজ পর্যন্ত এই তোমাকে ঘরের কাজে কখনো উল্লেখযোগ্যভাবে সাপোর্ট দিয়েছে বড় চাচী? দেয়নাই। সাথির এজমা রোগ আছে। অন্যখানে বিয়ে হলে সাথি কাজ করতে হবে। এতে সে অসুস্থ হয়ে পড়বে। পরের বাড়ি দোষ ধরে কাজ না করলে। এমন কি ঘন ঘন অসুস্থ হয়ে পড়লে তারা সাথিকে তুলেও দিতে পারে বাপের বাড়ি। এই সম্ভাবনা কিন্তু উড়িয়ে দেওয়া যায় না মা। কিন্তু এখানে বিয়ে হলে এই রিস্ক বা সম্ভাবনা কিছুই নেই। তাই তারা আমাদের ঘরকেই নিরাপদ ও উপযুক্ত মনে করল সাথির জন্য।
ভাবো একবার এসব। তোমার সাথে বড় চাচী যত খাতির দেখিয়ে চলে,তার উদ্দেশ্যে আগে না বুঝলেও এখন বুঝলাম। আর তোমার শ্বশুর মিয়া তো চাইবেই তাদের পক্ষ নিয়ে। উনার পাঞ্জাবির পকেট প্রায়ই গরম হয় সৌদির রিয়ালে। সবকিছু মিলিয়ে ওরা তাদের সুবিধার জন্যই আমাদের কাঁধে সাথিকে তুলে দিতে চেয়েছে। তাদের স্থানে তারা রাইট। কারণ প্রতিটি মা, বাবাই তার সন্তানের কল্যাণ চায়। কিন্তু তাকে বিয়ে করলে আমাদের বিন্দুমাত্র সুবিধা নেই মা। বরং সমস্যার পাল্লা ভারি হতে থাকবে। একটু ঠান্ডা মাথায় ভাবো মা। সুতরাং দাদার প্রস্তাবে ক্যান্সেল। তোমরা কিছু বল না তাকে। আমিই জানাব ঢাকায় যাওয়ার আগেই।”
রাবেয়া ছেলের কথাগুলো শুনে কোনো প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করল না। কেবল ঠায় বসে রইল নির্জীবের ন্যায়। সিমাকে সে কীভাবে চোখ দেখাবে। বড় মুখ করে কত আশা দিয়েছিল তাকে। অথচ এখন হলো টা কী। এমন ভাবনায় রাবেয়ার ভিতরে অস্থিরতা শুরু হলো।
তৌসিফ উঠে দাঁড়াল। বেরিয়ে গেল ঘর থেকে। কাচারি ঘরের সামনে গিয়ে একটা সিগারেট জ্বালিয়ে নিল। পরপর কয়েকটি টান দিলো। লম্বা করে ধোঁয়া ছাড়ল আবছায়া আলোর মাঝে। আধ পোড়া সিগারেটটি মাটিতে ফেলে পিষে নিল স্যান্ডেলের তলা দিয়ে ঢলে ঢলে। তৌসিফের মতো করে জাহেদও রাবেয়াকে বুঝিয়ে নিল। রাবেয়া বুঝল কি-না তা জাহেদ বুঝতে পারল না। কারণ রাবেয়া নিঃশ্চুপ থেকে বেরিয়ে গেল রুম হতে। স্বামীর কথার কোন প্রতিউত্তর দিল না।
তার পরেরদিন বিকেলের বাড়ির বাইরে নিরিবিলি পরিবেশে তৌসিফ দাদার সাথে দেখা করল। এবং তার মত জানিয়ে দিল। শান্ত ও নমনীয় স্বরে বলল,
“দাদা,বড় কাকা ও চাচীকে জানিয়ে দিবেন আমি সাথিকে বিয়ে করব না। কিন্তু আমি যতটুকু পারি,সবসময় পাশে থাকব তাদের। ঘরের ভিতর সম্পর্ক ডাবল করতে চাই না। চাচীকে বলবেন যেন আমার মাকে ভুল না বুঝে। আমার মা চেয়েছিল। কিন্তু আমরা বাকি তিনজন রাজী নই বলে মায়ের চাওয়া ব্যর্থ হলো। কেন করব না তাকে বিয়ে, এর কৈফিয়ত দেওয়ার কোন প্রয়োজন মনে করছি না। মাফ করবেন।”
নিমিষেই সলিমুল্লার উজ্জ্বল মুখখানি অনুজ্জ্বল হয়ে গেল। পরক্ষণেই আঁধারে ছেয়ে গেল ঘন মেঘের রূপ ধারণ করে। তৌসিফ লুঙ্গির এককোণ ধরে হেঁটে চলে গেল বাজারের দিকে। সলিমুল্লা বাড়িতে গিয়ে সিমাকে জানিয়ে দিল বিষয়টা। সিমা পরেরদিন মনির মোবাইলের মাধ্যমে স্বামীকে জানাল বিষয়টা। জামাল দেরি করল না। রাতেই মনির ফোনে ফোন করল। পিতার সাথে কথা বলল বেশ কিছুক্ষণ।
এদিকে নতুন ঘর তোলা হচ্ছে তৌসিফদের। মিস্ত্রিরা রোজ সকাল আটটায় আসে। বিকেল শেষ করে তারা যায়। পরেরদিনও তারা এলো। কাজ করতে লাগল। ঘরের রুমে রুমে খুঁটি গাঁড়া হচ্ছে। তৌসিফ নাস্তা খেয়েই বড় মার্কেটে চলে গেল। ঘরের জন্য কিছু জিনিস কিনতে হবে বলে।
কাজ সেরে তৌসিফের বাড়ি ফিরতে বিকেল হয়ে গেল। কিন্তু উঠানে পা দিয়েই সে ঘরের যে পরিবর্তিত দৃশ্যপট দেখতে পেল, তার জন্য সে কোনভাবেই প্রস্তুত ছিল না। এবং তা তার কল্পনারও বাইরে ছিল।
চলবে..১৫
#সামাজিক #storytelling #writer #bengalistory #lifelessons #genre #lovestory #twist #loveyourself #mystery #twist
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে গল্পের লিংক
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪