পিদিমজ্বলারাতে. ১৪ ✍️ #রেহানা_পুতুল
রাবেয়া অদ্ভুত ও বিষম খাওয়া চোখে জা সিমাকে দেখে। আস্বাস দিয়ে বলল,
“কী বিষয়ে? কার কথা? বল? কাউরে কমু না।”
সিমা চোরের মতো এদিক সেদিক চায়। হাঁসফাঁস করে। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলতে লাগল,
“আপনার আমার ছোট দেবর সম্পর্কে। জাবেদ একটা খাটাইশ ভাবি! নোংরা! বাজে!”
রাবেয়ার সর্বাঙ্গ কেঁপে উঠে বিস্তারিত না শুনেই। তার অনুভূতিরা ঘৃণায় রি রি করে উঠে। তার শক্ত চাহনি নিবদ্ধ হলো সিমার মুখপানে। সীমা রাবেয়ার হাত চেপে ধরল। স্বইচ্ছায় বলতে লাগল,
“ভাবি এতদিন চুপ মাইরা ছিলাম। শরমে মুখ খুলিনাই। কিন্তু ট্যাবলেটের বিষয় নিয়া যা দেখলাম আর বুঝলাম তাতে আমার মনে হইলো, এই অমাইনষে এইটা করতেই পারে। যদিও কারণটা আমার বুঝে আসে না। সাথির বাপ বিদেশ যাওনের পর এই খবিশ আমার শরিল হাতাইতো ভাবি।”
“তুই বাধা দিতি না?”
অবশ কণ্ঠে বলল রাবেয়া।
“কি কন ভাবি। এইটা তো রাইতের সময় করতো সে। সাথি তখন ছোট ছিল। ওই তখন বিয়া করেনাই। আইজ কাইলকার কথা না এইটা। এটা কইরতো রাইতে আমি ঘুমাইলে। প্রথম দুইদিন তো বুঝতেই পারিনাই? মনে করলাম স্বপ্নে দেখতাছি। পরে এক রাইতে আমি জাইগা যাই। তার হাত খামচাইয়া ধইরা ফেলি। তখন সে কিন্তু পালাইয়া যাওনের চেষ্টা করেনাই ভাবি। মাটি থেইকা আমার পায়ের জুতা নিয়া বাড়ি মারতে গেলাম,অমনি জুতা টান মাইরা নিয়া নিল ওই। হিসহিসাইয়া কইল, ভাই বাইরে। তুমি একলা। ভাবলাম তুমি আরো খুশী হইবা আমার উপরে। কইমা যাইতাছে নাকি তোমার শরীলের কিছু? খারাপ কিছুই তো করিনাই। দেবর হিসেবে সামান্য হাতের পরশ বুলাইলাম তোমার গায়ে। কইলাম, আমি সবাইরে জানাইয়া দিমু। ওই ডর তো পাইলই না ভাবি,বরঞ্চ কেমন কইরা জানি রহস্যের হাসি দিল। অবশ্য আর কোনোদিন সাহস করেনাই আগানোর। ওই যে বুইঝা গ্যালো, আমারে ভাঁজে আনন যাইব না। তাই।
আমি আম্মারে ঘুরায়া ফিরায়া কইছি হালকা কইরা। উনি কানেই তুলল না। আমলেও নিল না। বিশ্বাসও করলেন না আমার মুখের কথা। ভাবি, এইটা শরমের কথা। ইজ্জতের বিষয়। তাই হজমে রাইখেন।
আপনারে জানানোর উদ্দেশ্যে আমার একটাই। তৌসিফ যদি তার বিষয়ে কোনো একশান নিতে যায় যেই কোনভাবেই, আপনে বাধা দিয়েন না। ভাইরেও বুঝায়েন যেন বাধা না দেয়। মোটকথা তৌসিফ যা করতাছে বাপ,মার ভালোর জন্যই করতাছে।”
উদ্বিগ্ন স্বরে কথাগুলো বলে স্বস্তির দম ছাড়ল সিমা। রাবেয়া ক্লাসের অনুগত ছাত্রীর মতো অতি মনোযোগের সহিত শুনল সব। ঝিম মেরে বসে রইলো সে। একটু পরেই প্রলম্বিত শ্বাস ফেলে বলল,
“তোর আগে এই সংসারে আমি আসছি। তোরে তোর বিয়ার দিন থেইকাই দেইখা আসতাছি। তোর স্বভাব চরিত্র সম্বন্ধে আমার জানা আছে। জামাল ভাই কতটা বছর ধইরা বিদেশ করতাছে। তুই ইজ্জতের সহিত ঘর,সংসার করতাছস। তুই কইছস। আমি শুনছি। প্যাটের কথা প্যাটেই থাকবই। বোম মারলেও এইসব মন্দ কথা আমার থেকে বাইর হইব না। ময়লা যতই ঘাঁটাঘাঁটি করা হয় দুর্গন্ধ ছড়ায়।”
মেয়ের গলা শুনে সিমা উঠে চলে যায়। রাবেয়া ওভাবেই বসে থাকে। তারও মনে পড়ে গেল অতীতের কিছু কথা। আচমকা হুট করে রাবেয়ার মনে একটা বিষয় উদিত হলো। এতটা বছর সিমা এই কথাগুলো বলল না। তবে আজ বলল কেন? এই ভিতরে সাথির জন্য জামাই হিসেবে সে তৌসিফকে পছন্দ করল। তাতে রাবেয়া মত দিল। তাই বুঝি নিজের জীবনের লুকানো কথাগুলো বলে রাবেয়ার আরো আপন হওয়ার চেষ্টা করল সিমা।
রাবেয়ার সরল মনের ভাবনাটা দীর্ঘস্থায়ীতে রূপ নিল না। রাবেয়া উঠে গিয়ে ঘরে যায়। জাহেদের পাশে বসে। একটু একটু করে জাহেদ সুস্থ হয়ে উঠছে। রাবেয়ার দিক হতে স্বামী সেবার কোনো ত্রুটি বা গাফলতি হচ্ছে না। ঘরের কাজও সে আগের মতই করছে দু-হাত খুলে প্রাণের সমস্তটা উজাড় করে দিয়ে। যদিও তৌসিফ মানা করে দিয়েছে৷ সবসময় সবার সব কথা ধরতে হয় না।
সেদিন রাতেই প্রথম তৌসিফের কল্পনায় ঠাঁই পেল নবনী নামের মেয়েটি। তৌসিফ অনুধাবন করতে পারল নবনী তাকে প্রচন্ডরকম ভালোবাসে। নবনীকেও সে ভালোবাসে। তবে তার অনুভূতি হলো একজন মানুষ হিসেবে, বন্ধু হিসেবে। ব্যস। ব্যবধানটা এখানেই৷ তবে হ্যাঁ, এটা সত্যি, যতটুকু আছে ততটুকুও সে কখনও নবনীর সামনে প্রকাশ করেনি। বেশ কিছুক্ষন পর সে নবনীর মুঠোফোনে ফোন না দিয়ে একটা মেসেজ দিল।
“ডাক্তার আপা কাল সকালে ফ্রি আছেন? আমি আসব।”
এমন চাঁছাছোলা নিরস ছোট্ট একটা মেসেজ দেখে নবনীর রা* গ অভিমান,অনুযোগ চুইয়ে চুইয়ে পড়ছে তৌসিফের উপর। সে হাতের মোবাইলখানাকে আস্তে করে ছুঁড়ে মারল। মিনিট পাঁচেকের ব্যবধানে সেটা আবার তুলে নিল হাতে। কোনো রিপ্লাই দিল না। তার বিশ্বাস, তবুও তৌসিফ আসবে তারজন্য। তবে মনে মনে ঠিকই রিপ্লাই দিয়েছে। ” হ্যাঁ আসো।”
তৌসিফ একটু পরপর মোবাইলের স্ক্রিনের দিকে তাকাচ্ছে। কিন্তু কোনো মেসেজ আসেনি নবনীর মোবাইল হতে। তবে তৌসিফ এটা ঠিকই বুঝতে পেরেছে কাল নবনী তার অপেক্ষায় থাকবে। পরেরদিন তৌসিফ হাসপাতালের সামনে চলে গেল। নবনীকে কল দিলো। নবনী বুঝতে পারল। ফোন কেটে দিল। নাকের ডগায় এসে থাকা চশমাটা চোখ বরাবর ঠেলে দিল। এপ্রোনের উপরে ভাঁজ হয়ে থাকা ওড়নাটা গুছিয়ে মেলে দিল বুকের উপরে। মুখস্ত্রীতে ভারিক্কি ভাব আনল। বের হয়ে গেল হাসপাতালের গেটের বাইরে। নবনী কয়েক পা হেঁটে এদিক ওদিক তৌসিফকে খুঁজল। পেলনা। একটু এগিয়ে যেতেই চোখে পড়ল অদূরে একটা নিরিবিলি সরু গলির প্রবেশ মুখে তৌসিফ দাঁড়িয়ে আছে। নবনী মার্জিতভাবে তৌসিফের সামনে দাঁড়াল।
“কেমন আছ নবনী?”
ঈষৎ হেসে জিজ্ঞেস করলো তৌসিফ।
“আলহামদুলিল্লাহ ভালো আছি। তুমি?”
“ভালো না থাকলে এখন আমাকে দেখতে পেতে না। আমি দেখা করতে চেয়েছি দুটো কারণে। এক,তোমার মা,বাবাকে সেদিন বললে,আমার ফোন, মেসেজের রেসপন্স কেন দাও নি তা আমাকে বলবে৷ এখন বলো?”
গুরুগম্ভীর স্বরে বলল তৌসিফ।
“পরে বলছি এটা। বাকি কারণ শুনতে চাই?”
দৃষ্টি সরিয়ে ম্লানমুখে বলল নবনী।
তৌসিফ গলা ছেড়ে কাশল। গলায় বাঁধা টাইয়ের গিঁটকে আরেকটু মজবুত করে নিল হাত দিয়ে। দুরূহ গলায় বলল,
“আমার জীবনে না জড়ালে হয় না নবনী? মানে, আমার শংকা সেই এক জায়গাতেই আটকে আছে। ইমোশনাল হয়ে এখন যতই বলো তুমি,বাস্তবে কী আদৌ তুমি খাপ খাইয়ে চলতে পারবে আমার জীবনে?”
নিমিষেই নবনীর মৌনাকাশে মেঘের ঘনঘটা শুরু হলো। তার প্রাণ চঞ্চল ভাষারা স্থবির হয়ে গেল। তৌসিফ সম্পর্কে সে গতরাতে ভাবল কী আর এখন হলো কী। সে প্রত্যাশা করেছিলে,তৌসিফের হাতে থাকবে একগুচ্ছ সদ্য ফোটা গোলাপ। নয়তো এক থোকা শুভ্র রজনীগন্ধা। নবনী উদাস অথচ দৃঢ় কণ্ঠে জবাব দিল।
“যেই ভালোবাসার সম্পর্ক শুরু করতে হলে, কাঠগড়ার আসামীর মতো স্বীকারোক্তি দিতে হয়। মৌখিক চুক্তিবদ্ধ হতে হয়। এমন সম্পর্ক না শুরু করাই ভালো। পরিচয়ের,চেনাজানার এতটা বছর পরে এসেও আমার নিশ্চিত করতে হবে তোমাকে যে,আমি কেমন চলব তোমার লাইফে এসে। এটা আমার জন্য বড় ব্যথার! এবং নিজের কাছে নিজে ছোট হয়ে যাওয়ার!”
একদমে বাক্যগুলো আওড়েই ত্রস্ত পায়ে নবনী চলে গেল হাসপাতালের ভিতরে। তৌসিফ পিছন দিয়ে ডাকল। নবনী না শোনার ভান করল। ফোন দিল। রিসিভ করল না। তৌসিফ ভারমুখে তার অফিসে চলে গেল। তারপর সেও আর যোগাযোগ করার চেষ্টাটুকু করল না নবনীর সাথে। সে ঠিক করল বিষয়টা এবার পরিবারকে জানানো দরকার। সে নিজে নিজে ডিসিশন নিতে পারছে না। পরিবারের মতামত নেওয়া জরুরী!
হেমন্তের আগমন হলো। উত্তর বায় হয়ে ঝিরিঝিরি বাতাস বয়। নয় শীত নয় উষ্ণ! মাখো মাখো পরিবেশ! এমন সময়কেই তৌসিফ ঘর করার জন্য উপযুক্ত মনে করল। শীত আসার আগেই ঘর সম্পূর্ণ করতে হবে। শীতে বেলা ছোট। রাজমিস্ত্রীরা ফাঁকি দিবে শীতের ছুতোয়। জগতে ফাঁকি কে না দেয়। সুযোগ পেলে পোষা প্রাণীটিও ফাঁকি দেয়। তাই তৌসিফ সাতদিনের জন্য ছুটি নিয়ে গ্রামে আসল। মা,বাবার সাথে আলাপ করে কাঠের মিস্ত্রিদের খবর দিল। ঘরের মাফজোখ হলো। সেই মিস্ত্রিদের সাথে নিয়ে ঘর তৈরির সরঞ্জামাদি কিনল। সিদ্ধান্ত হলো সে সম্পূর্ণ ফুল টিনের চারচালা ঘর করবে।
দাদার ভিটার যৌথ ঘরটি হলো বেড়ার ঘর। নতুন ঘরের যেদিন খুঁটি দিবে চারকোণায়,সেদিন রাবেয়া নারকেল,আতপ চাল ও বাটালি গুড় দিয়ে নিজ হাতে ক্ষীর রান্না করলো। নাস্তার বড় পিরিচে করে চামচ সহযোগে সবাইকে পরিবেশন করে দিল। সবাই খেল। কেউ কেউ খেল মনের সবটুকু উচ্ছ্বাস ঢেলে। আর কেউ কেউ খেল বিরস মুখে তৌসিফের মন রক্ষার্থে।
তখন এক সন্ধ্যায় তৌসিফ তার মা,বাবার রুমে গেল। এই ভিতরে ঘটে যাওয়া নবনীর বিষয়ে সব বলল। শুনে জাহেদের খুশীর সীমা রইল না। তিনি আহ্লাদে আটখানা হয়ে গেলেন। বিনা দ্বিধায়,বিনা বাক্যে,বিনা যুক্তিতে রাজী হয়ে গেল। আবেগী গলায় ছেলেকে বললেন,
“মেয়েটারও তো আত্মসম্মান আছে। সেতো তার মা,বাবার সামনে বললই তোরে,এডজাস্ট করে চলবে। আর কি চাস তুই? ডাক্তার বউ পাবি এটা কত বড় সৌভাগ্যের। মেয়েটার সাথে ভালো করে কথা বল। আন্তরিকতা দেখা। একহাতে তালি কখনো ভালো করে বাজে না। দুই হাতের প্রয়োজন হয়।”
পাশে বসা থেকে রাবেয়া বেঁকে বসল। এক বাক্যে সে না করে দিল। চনচনে সুরে স্বামী ও ছেলের দিকে চেয়ে বলল,
“তোরা বাপ ছেলে তো লোভে পইড়া গ্যাছত। আশপাশ তো ভাবসনাই। উপর নিচে সম্পর্ক করা একেবারেই ঠিক নয়। বিয়েসাদী করতে হয় সমানে সমান। এইটা তো কোনো প্রেমপিরিতি না। তাছাড়া তোর কথায় বুঝলাম, ওই মেয়েই তোরে বেশী পছন্দ করে।”
জাহেদ বিরক্ত গলায় বলল,
“তাহলে তুমি খোঁজো পাত্রী। যাও।”
“খুঁজতে হইব না। পাত্রী আমি রেডি কইরা রাখছি। কেবল আপনারা বাপ ছেলে হ্যাঁ কইলেই বিয়া হয়। আমি জানি তৌসিফ আমার পছন্দরে ফালাইতে পারব না।”
“কার কথা বলছ তুমি মা?”
আশ্চর্য সুরে জানতে চাইল তৌসিফ।
বেড়ার বাইরে থেকে এদের কথা শুনতে পেল সলিমুল্লাহ। সে জাহেদের রুমে গেল। রাবেয়া ছেলের জবাব দিতে গিয়েও পারল না। সলিমুল্লা নাতির দিকে তাকিয়ে বলে উঠল,
“তোর মায়ের পছন্দই আমার পছন্দ। সেই পাত্রীকেই তুই নতুন ঘরে তুলিস ভাই।”
তৌসিফ অদ্ভুত ও বিস্মিত চোখে একবার মায়ের দিকে একবার দাদার পানে চাইল।
চলবে..১৪
বইটই ডাওনলোড করা না থাকলে নিচের লিংকে কাজ হবে না। ই-বুকগুলোর ফ্রি পাতাটুকু পড়ে নিবেন আগে।
#সামাজিক #storytelling #writer #bengalistory #lifelessons #genre #lovestory #twist #loveyourself #mystery #twist
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২
-
পিদিম জ্বলা রাতে গল্পের লিংক
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৮
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১০