পিদিমজ্বলারাতে. ১৩ ✍️ #রেহানা_পুতুল
গালভরা হাসি দিয়ে রাবেয়া বলল,
“সাথিরে আমি পিচ্চিকাল হইতেই জানি। তৌসিফ, সংসার জীবনে শান্তিতে থাকব সাথির মতো ঠান্ডা মেজাজের বউ পাইলেই। তবে কথা হইলো আমার তো কোনো আপত্তি নাই। কিন্তু তৌসিফ ও বাকিদের কথা আমি বলতে পারুম না।”
সিমা প্রসন্ন হেসে বলল,
“তাতো সত্যই ভাবি। তবে আমার যদ্দুর মনে হয় তৌসিফ আপনার কথা অমান্য করব না। বাকিটা মালিকের ইচ্ছা। আমি বইন হিসেবে আপনেরে কইলাম ভাবি। আপনে কথা লাড়ায়েন না। তৌসিফ যখন বাড়ি আইবো, তখন আমাদের পক্ষ হইয়া তার দাদায় প্রস্তাব দিব ভাইজানের কাছে।”
“আইচ্ছা কমু না।”
সিমা, একমাত্র মেয়ের ভরসাস্থল হিসেবে তৌসিফকে কল্পনা করে গোপনে সুখের প্রমোদ গোনে। দু’চার দিন পর ঘরের উত্তপ্ত পরিবেশ কিছুটা শান্ত হয়ে উঠল। তবুও ভিন্ন হওয়ার ব্যাপারটা মর্জিনা কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না। তার কাছে সব ধোঁয়াশা ঠেকছে। স্পষ্ট লাগছে কেবল তৌসিফের বিয়ের বিষয়টা। তারজন্যই তৌসিফ ভিন্ন হয়ে যাচ্ছে মা,বাবাকে নিয়ে। মায়ের বিষয়টা হলো কেবল শক্তপোক্ত বাহানা মাত্র। আর কিছুই না।
তৌসিফকে কেন নবনীর বাবা বাসায় যেতে বলেছে,এটা জানার জন্য সেদিন রাতেই সে একাধিকবার ফোন দিল নবনীকে। কিন্তু নবনীর কোনো সাড়া পেল না। মেসেজ দিল। তাও কোনো রিপ্লাই পেল না। তৌসিফ যারপরনাই বিরক্ত হলো নবনীর উপরে। এবং বুঝল নবনীর থেকে কোনো সাড়া পাবে না সে। তাই সে আর বৃথা চেষ্টা করল না নবনীর সাথে যোগাযোগে করার।
তিনদিন পর তৌসিফ নবনীর পিতাকে মোবাইলে ফোন করল অনিচ্ছাসত্ত্বেও। বড় মানুষ। ফোন না দিলে,না গেলে অভদ্রতা প্রকাশ পায়।
নজরুলকে সে মার্জিত স্বরে বলল,
“আংকেল আমি কাল সন্ধ্যার পরে আসবো। তার আগে সুযোগ নেই। অফিস থাকে আমার।”
“কোনো সমস্যা নেই বাবা। ঠিক আছে। কাল এসো। আসলে আলাপ হবে।”
তৌসিফ তার বলা নিদিষ্ট সময়ে চলে গেল নবনীদের বাসায়। যেতে কিনে নিয়ে গেল কয়েকরকমের ফল ও মিষ্টান্ন। বাসা চিনতে অসুবিধা হলো না তার। কেননা এটা নবনীদের নিজস্ব কেনা ফ্ল্যাট। কয়েকবছর আগে তৌসিফ একবার গিয়েছে তাদের বাসায়। ডোরবেল বেজে উঠতেই হেল্পিং হ্যান্ড শেফালী উড়ে গিয়ে গেট খুলে দিল। তৌসিফকে দেখেই মেয়েটি মুচকি মুচকি হাসছিল। তৌসিফ সেদিকে ভ্রুক্ষেপ করল না।
নজরুল হাস্যোজ্জ্বল ভঙ্গিতে এগিয়ে এল। তৌসিফ তাকে নম্র স্বরে সালাম দিল। তিনি প্রাণখোলা হাসি দিয়ে তৌসিফকে বসতে বললেন। কুশলাদি বিনিময় করলেন। তৌসিফ দু-হাতের ব্যাগদুটো ড্রয়িংরুমের সেন্টার টেবিলের উপর রেখে বসল। নবনীর মা হামিদা এল। তৌসিফ তাকে দেখেই বসা থেকে দাঁড়িয়ে গেল। মাধুর্য গলায় সালাম দিল। আগের তৌসিফ আর আজকের তৌসিফকে দেখে হামিদার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেল।
নজরুল ভিতরের রুমে গেলে হামিদা উৎসুক হয়ে চাপাস্বরে বলল,
“আমি তো পুরাই অবাক এই ছেলেকে দেখে। মাশাল্লাহ! যেমন মিষ্টি ব্যবহার তেমনই অমায়িক! দেখতেও স্মার্ট! সুদর্শন! মনটাও তো বড়! কতকিছু আনল। কে বলবে এই ছেলে মধ্যবিত্ত পরিবারের? তার গেটাপ দেখে তো আমাদের ক্লাসেরই মনে হয়।”
নজরুল হেসে ফেলল। কৌতুক করে বলল,
“কাজি ডেকে আনব গিয়ে? ওদের বিয়ে পড়িয়ে দিব?”
“পাত্রী হসপিটাল থেকে আজ আসবেই না হয়তো।”
বলে হামিদা ব্যস্ত পায়ে রান্নাঘরে চলে গেল। শেফালীকে দিয়ে ট্রে ভর্তি নাস্তা পাঠিয়ে দিল। শেফালী তখনও মুচকি মুচকি হাসছে। তৌসিফ ধরে নিল এই মেয়ের হাসির ব্যারাম আছে। নয়তো অকারণে এমন বোকা বোকা হাসি কেন দিবে সে। নাস্তার বহর দেখে তৌসিফ মুগ্ধ হলো। একসাথে এতো বাহারি পদের নাস্তা সে এর আগে কোনোদিন চোখে দেখেনি। খেতেও পারে নি। চাকরি করে সব টাকা সে গ্রামে পাঠিয়ে দেয়। হিসাব করে নিজের জন্য কিছু রাখে। একইভাবে পরিবারের জন্য হিসেব করে চলেছে তার পিতা জাহেদও।
তৌসিফের পাশে এসে বসল হামিদা ও নজরুল। হামিদা তাড়া দিয়ে স্নেহময়ী সুরে তৌসিফকে নাস্তা নিতে বললেন। তৌসিফ তার প্রিয় ডিমের পুডিং কেটে এক চামচ মুখে পুরে দিল। বলল,
“আন্টি,আংকেল আপনারাও নিন। নবনী এখনো আসেনি বাসায়?”
হামিদা আলুলায়িত কণ্ঠে বলল,
“আসেনি বাবা। তুমি আসবে জানে। চলে আসবে।”
“নাহ,সমস্যা নেই। এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম। আন্টি আপনার না দুই মেয়ে? ছোটজন কোথায়?”
“ছোটজন ছোট বলেই কারো সামনে যেতে লজ্জা পায়। নবনী আসলে তার সাথে আসবে।”
হালকা হেসে বলল নজরুল।
নবনীর জন্মের ১৫ বছর পর তার আরেকটি বোন হয়েছে। নাম নূহা৷ ক্লাস ফোরে পড়ে সে।
“ওকে ডাক দেন। গল্প করি ওর সাথে। আংকেল আমাকে যে জরুরী আসতে বললেন?”
স্মিত হেসে বলল তৌসিফ।
“ওহ বলব। সময় আছে৷ তুমি রাতের খাবার খেয়ে তবেই যাবে। তোমার জন্য রান্না হয়েছে।”
বলল নজরুল। হামিদা উঠে গেল রান্নাঘরের দিকে। সে জোর আপত্তি করল খাবনা বলে। কিন্তু আয়োজন সম্পুর্ন হয়ে গিয়েছে। সুতরাং তার চেষ্টা নিঃষ্ফলন!
নজরুল উঠে গিয়ে নূহাকে নিয়ে এল হাত ধরে। বলল,
“আম্মু,ও তৌসিফ। তোমার ভাইয়া হবে। নবনীর বন্ধু। সালাম দাও।”
নূহা মিনমিন স্বরে সালাম দিল তৌসিফকে। তৌসিফ নূহার সাথে তার পড়াশোনা বিষয়ক গল্প জুড়ে দিল। নূহার ও তৌসিফের আলাপচারিতা জমে উঠল। রাত হয়ে যাচ্ছে। নবনীর জন্য অপেক্ষা করা যাচ্ছে না। তারা তৌসিফকে খাবার দিয়ে দিল। খাবার শেষ করেই তারা প্রসঙ্গ তুলতে চায়। তৌসিফ, নজরুল,নূহা বসে একসঙ্গে খেয়ে নিল। হামিদা এক প্লেটে সব নিয়ে নিজের রুমে গিয়ে খেয়ে নিল। শেফালী খেয়ে নিল রান্নাঘরে চৌকিতে বসেই।
নৈশভোজের মেন্যু দেখে তৌসিফ দ্বিতীয়বারের মতো দ্বিগুন চমক খেল। কাহিনী কি? এ দেখি সত্যি সত্যিই জামাই আদর। তৌসিফ সংকোচপূর্ণ মনে খেয়ে উঠলো। ডেজার্ট হিসেবে ছিল ফিরনি ও দই। ভরপুর খেয়ে সবাই ড্রয়িংরুমে বসে আছে। তখন নবনী বাসায় প্রবেশ করল। গায়ে জড়ানো মেডিক্যাল ইউনিফর্ম। নজরুল হেসে বলল,
ওই যে আমাদের ডাক্তার সাহেবা এসে গিয়েছেন। নবনী এক ঝলক দেখল তৌসিফকে। কোনো কথা বলল না। না দেখার ভান করে তার রুমে চলে গেল। মনে মনে ভিমরি খেয়ে বলল, এ দেখি বিয়ের পাত্র সেজে আসল। এক্কেবারে শার্ট, প্যান্ট,সু,হাতে ঘড়ি পরে? হুহ! মা,বাবার তাড়া পেয়ে নবনী ফ্রেস হয়ে খেয়ে নিল ঝটপট। মায়ের ডাকে নবনী ড্রয়িংরুমে গিয়ে সোফার এককোণে বসল। তার চোখেমুখে খেলা করছে লাজুক লাজুক ভাব। কথা তুললেন নজরুল নিজেই।
তিনি তৌসিফকে বলল,
“বাবা,তোমার এমনিতেই রাত করে ফেলেছি, নবনীর জন্য অপেক্ষা করতে করতে। ও আরো আগে আসলে তোমার এতক্ষণে চলে যাওয়া হতো। যাইহোক কথা ছাপিয়ে লাভ নেই। এখন যুগ আধুনিক। নবনী ও তুমি দুজনেই শহরে বাস করো। সুতরাং জড়তা না রেখে আমরা যে যা বলব এখন ; তা স্পষ্ট করে স্বচ্ছতা বজায় রেখে কথাগুলো বলব। কারণ আস্ত জীবনের বিষয় এটা। তোমার বাবা হাসপাতালে থাকতে নবনীর জন্য তোমার বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছে। সেটা কথাপ্রসঙ্গেই দিয়েছে কিন্তু। হুট করে বলেনি উনি। তো তারপর জানলাম নবনীও তোমাকে বেশ পছন্দ করে। এবং আমরা সবাই তার পছন্দকে গুরুত্ব দিয়েছি। এখন সরাসরি তোমার মত জানতে চাই?”
তৌসিফ ভারি দ্বিধায় পড়ে গেল। অস্বস্তি কাজ করছে তার। যদিও কিছুক্ষণ আগেই সে এমনকিছু ধারণা করতে পেরেছে তাদের আতিথেয়তা দেখে। রাখঢাক করলে তার চলবে না। তারা যদি সরাসরি বলতে পারে,সে ছেলে হয়ে কেন পারবে না। তৌসিফ গলা ঝেড়ে নিয়ে বলল,
“আংকেল, আন্টি আমাকে ক্ষমা করবেন। আমি নবনীকে ব্যক্তি হিসেবে, বন্ধু হিসেবে যথেষ্ট পছন্দ করি। কিন্তু আমার সাথে চিরদিন বাস করতে পারবে না সে। কারণ আমি মিডেল ক্লাস ফ্যামিলি বিলং করি।”
নবনী স্থির হয়ে বসে আছে নিচু মাথায়। নজরুল আহত গলায় বললেন,
“উঁচু নিচুর ভেদাভেদ আমরা করি না বাবা। মাটির নিচে সবার হিসেব এক। বিচার এক। তাহলে মাটির উপরে ভেদাভেদ করা কী ঠিক আমরা মুসলমান হিসেবে? যেহেতু পছন্দ করই তাকে, তাহলে আর বাধাটা কোথায়?”
“আংকেল, বিষয়টা উঁচু নিচুর নয়। আমি বলতে চাচ্ছি নবনী আমার লাইফে,আমার পরিবারের সাথে এডজাস্ট হয়ে চলতে পারবে না। আপনারা দেখেন,আমি সেদিন তাকে কল দিলাম একটা কারণে, মেসেজ দিলাম। কিন্তু সে গ্রাহ্যই করল না। গুরুত্বই দিল না৷ কলব্যাকও করেনি পরে। কেন? সে ডাক্তার। আর আমি এক ছাপোষা মানুষ। এতেই কী ক্লিয়ার হয় না সব? তাহলে সে কীভাবে চলবে আমার লাইফে এসে?”
নবনী তৌসিফের উপরে ফুঁসে উঠছে গোপনে। গাল ফুলিয়ে বসে আছে। হামিদা নবনীকে জিজ্ঞেস করলে সে সত্যতা স্বীকার করল। নজরুল বলল,
“কেন ফোন ধরিস নি ওর?”
“আব্বু এর জবাব আমি তাকে দিব পরে। এখানে বলতে পারব না। স্যরি।”
গোমড়া মুখে বলল নবনী।
“আচ্ছা তা না হয় বুঝলাম। এটা বল তুই আমাদের সবার সামনে,তৌসিফের ভয়টা যেখানে অর্থাৎ তুই তার লাইফে এডজাস্ট করে চলতে পারবি না, এটা কতটা সত্যি?”
“এটা জিরো পার্সেন্টও সত্যি নয়। আমি তার লাইফে নয় শুধু যার লাইফেই যাব, তার কল্পনার চেয়েও বেশি এডজাস্ট করে চলতে পারব।”
আলহামদুলিল্লাহ! বলে হামিদা বলল,
“বাবা, শুনলে তো আমার যোগ্য মেয়ের যোগ্য জবাব? দরকার হলে ওর রুমে গিয়ে তোমরা আলাপ করে নাও।”
তৌসিফ উঠে দাঁড়াল। বলল,
“আমার দেরী হয়ে যাচ্ছে আন্টি। নবনীর মুখের কথার মূল্য দিলাম। আমি ওর সাথে বাইরে দেখা করব। পরে আপনাদের জানাব।”
ব্যক্তিত্বপূর্ণ কণ্ঠে বলল তৌসিফ। বিদায় নিয়ে চলে গেল সে। নবনী নিজের রুমে গিয়ে কেঁদে ফেলল। বিছানার চাদর খামচে ধরে নিজের রাগ ঝাড়ল। কেন তৌসিফ তার সাথে একটি কথাও বলল না? কেন সে এতটা কঠিন হৃদয়ের?
রাবেয়া পুকুর পাড়ে একাকী বসে আছে। আজকাল তার পিঠ ও কোমর ব্যথাটা বেড়ে গিয়েছে৷ এবার ডাক্তার না দেখিয়ে আর রক্ষা নেই। সে মধ্যদুপুরের নিঃসঙ্গ ডাহুকের মতো একাকী বসে আছে। দৃষ্টি গভীর! মুখচ্ছবি মলিন! তৌসিফের বহুকথা তাকে গভীর ভাবনায় নিমজ্জিত করল। নিজের জীবন নিয়ে সে এভাবে কখনই চিন্তাও করে নি। কতটা সরল আর বোকা সে।
এই জীবনের বাইরেও যে একটা আড়ম্বরপূর্ণ, জমজমাট উপভোগের জীবন হতে পারে কোনো নারীর,তা সে জানতই না। বুঝতও না। ভাবতো নারীর জীবন মানেই শ্বশুরবাড়ি চৌহদ্দি ও রান্নাঘর। তার মা ও মুরুব্বিরা তাই বলতো এবং তারাও সেভাবেই চলতো শ্বশুরবাড়িতে।
“ভাবি আপনে এইখানে বইসা রইছেন? আর আমি বিছরাতাইছি আপনারে।”
সিমার কথায় ভাবনার ইতি ঘটে রাবেয়ার।
“কি হইছে? ক্যান খুঁছস আমারে?”
বিরস গলায় বলল রাবেয়া।
“ভাবি,আপনে আমার ধর্মের বইন। জাত বইন। খোদার কিরা লাগে দ্বিতীয় কান কইরেন না। নইলে গলায় ফাঁস দিমু আমি। একটা গোপন কথা কমু আইজ আপনারে। তাও কইতাম না। কিন্তু কইতে মন ও বিবেক তাড়া দিল।”
রাবেয়ার এক হাত চেপে ধরে আদ্রকণ্ঠে বলল সীমা।
রাবেয়া অদ্ভুত ও বিষম খাওয়া চোখে জা সিমাকে দেখে। আস্বাস দিয়ে বলল,
“কী বিষয়ে? কার কথা? বল? কাউরে কমু না।”
সিমা চোরের মতো এদিক সেদিক চায়। হাঁসফাঁস করে। কাঁপা কাঁপা স্বরে বলতে লাগল,
…..
চলবে..১৩
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে গল্পের লিংক
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৭
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১২