পিদিমজ্বলারাতে. ১০ #রেহানা_পুতুল ✍️
জাবেদের মুখের সামনে আঙুল তুলে বজ্রনিনাদ কণ্ঠে বলল তৌসিফ। জাবেদও মনে মনে প্রতিজ্ঞা করে নেয়, তৌসিফকে দেখে নিবে বলে।
তৌসিফ ঘরের চৌকাঠ পেরিয়ে উঠানে চলে যায় ঠাস ঠাস পায়ে। বসার ঘরে বাকি সবাই একই অবস্থানে আছে৷ জাবেদ র ক্ত চক্ষু নিয়ে মারমুখী কণ্ঠে পিতা,বড় ভাই,ভাবির দিকে তাকিয়ে বলল,
“দেখলেন তার ধৃষ্টতা? এতো দুর্বিনীত আচরণ কোথায় শিখল সে? এতো উগ্র মেজাজই বা কবে থেকে হলো এই ছেলেটার? আমার ভাই, ভাবি তো কাদা মাটির মতো।”
পাশ থেকে খুকী অসহিষ্ণু স্বরে বলে উঠলো,
“সঙ্গ দোষেই এমন হইছে। আমি সিউর কইরা কইতে পারুম।”
উঠানে দাঁড়ানো থেকে চাচার কথাগুলো শুনতে পেল তৌসিফ। সে লম্বা লম্বা পা ফেলে আবার ঘরের ভিতর প্রবেশ করল। সেন্টার টেবিলের উপর থেকে ছোট্ট কাঠের ফুলদানিটা হাতে নিল। ছুঁড়ে মারল উঠানের শেষ প্রান্ত বরাবর। তার এমন বেয়াড়াপনায় জাহেদ,রাবেয়াসহ সবাই ত্যক্তবিরক্ত! বিতৃষ্ণায় সবার অন্তর ছেয়ে গিয়েছে। তবুও কেউ তাকে তা নিয়ে কিছু বলল না। সবার চোখে এখন তৌসিফ একটা ক্ষ্যাপাটে কুকুরের মতো। গায়ে ঢিল ছুঁড়লে পরিস্থিতি আরো নাজুক হয়ে যাবে।
তৌসিফ চাচার দিকে চেয়ে অবিনীত স্বরে বলল,
“ইয়েস! আমার বাবা কাদা মাটির মতো। সরলতা ও শান্ত থাকাই তার চরিত্রের অন্যতম বৈশিষ্ট্য! এবং পরিবারের জন্য অকাতরে সব বিলিয়ে দেওয়াই ছিল যার একমাত্র ধর্ম! আর আমার মা? তিনিও বেশ কাদামাটির। এটা একদম সত্যি! আরো আছে তো। তিনি পতিভক্তি সতীসাধ্বী রমনী! গৃহকার্যে নিপুনা! ধৈর্যশীলা অনুগত গৃহবধু! যেমনটি পুরুষশাসিত সমাজ আর শ্বশুরবাড়ির লোকেরা চায়। তিনি মমতাময়ী জননী! খুব খাটতে পারে স্বামীর সংসারে। অতিথি সেবায় যার জুড়ি মেলা ভার! এই বিশেষণগুলোর তকমা ছাড়া আর কী জুটেছে আমার মায়ের জীবনে? এই দুজন মানুষের ভালোমানুষীর সুযোগ নিয়ে তাদের নিঃশেষ করে দিয়েছেন আপনারা সবাই। গোসলের পর ধোয়া কাপড় থেকে যেমন করে নিংড়ে নিংড়ে পানি ঝরিয়ে ফেলা হয়,তদরূপ এই দু’জন মানুষের জীবন থেকে শখ,সুখ,আনন্দ,উপভোগ কেড়ে নিয়েছেন ডাকাতের ন্যায় অমানবিক হয়ে। কারণ আপনারা স্বার্থবাদী! নিজেরটা ষোল আনাই বুঝে নিতে জানেন। অন্যেরটা এক আনাও না।”
মর্জিনা মুখে ঝামা ঘসে কাঁদোকাঁদো স্বরে বললেন,
“এইদিন দেখার আগে আমার মরণ হইল না ক্যান?”
“মরণ আপনার কথায় চলে না দাদী। যার কথায় চলে, সে যখন চাইবে, তখনই মরণ হবে সবার।”
বলল তৌসিফ। সে ভাইকে নিরস গলায় বলল,
“কিরে বসে আছিস কেন? আমিনের বাড়ি যা। ডেকে নিয়ে আয়। চিনিস তো?”
তানিভর উঠে বেরিয়ে গেল আমিন আনতে। সলিমুল্লা স্ত্রীকে ধমকে উঠলেন। শান্তসুরে নাতিকে জিজ্ঞেস করলেন,
“তুই বয় ভাই। একটু শান্ত হ। কথা কই আমরা।”
“কীভাবে শান্ত হই? কীভাবে? আপনি ঘরের কর্তা। সবার আস্থা। কিন্তু বে-ইনসাফের কথা বললেন। যেটা আপনার মুখে শোভা পেল না। আমার বাবা যদি সেদিন অসুস্থ না হতো, আমরা দুই ভাই যদি দ্রুত বাবাকে হসপিটালে না নিতাম। তখন সিচুয়েশন হয়তো অন্যরকম হয়ে যেত। নয়তো কয়েকমাস পরে হলেও হতো। ডাক্তার তাই বলল আমাদের। এই মেডিসিন খাওয়ানোর ফলে, বাবার শরীর ক্রমশ দুর্বল হয়ে যাচ্ছে। ক্ষুধা মন্দা হয়ে যাচ্ছে। শরীরের ভিতরের কিছু সেল ডেড হয়ে যাচ্ছে৷ যার ফলস্বরূপ হতো বাবার মৃত্যু। আমার মা হতো বিধবা। আমরা হতাম এতিম। কাদের জন্য আমার বাবা, মা এতটা বছর এতো ত্যাগ দিল? খেটে মরল? আর আপনি বলছেন আমি শান্ত হতে? নো। নেভার! আমি উত্তাল ঢেউ! সমুদ্রের গর্জন! ট্যাবলেট খাওয়ানোর রহস্য ভেদ করা ছাড়া শান্ত কিছুতেই হব না আমি! কিছুতেই না।”
ঘরের বিপজ্জনক পরিস্থিতি কীভাবে স্থিতিশীল হবে। তা কেউই বুঝে উঠতে পারছে না। জাবেদ আত্মবিশ্বাসী সুরে বড় ভাই, ভাবিকে জিজ্ঞেস করল,
“ভাইজান,ভাবি আপনাদের কী মনে হয় ট্যাবলেটের বিষয়ে? না-কি ছেলের কথায় সুর মেলাবেন? কখনও কী এমন কোন কিছু আমার ও মনির মাঝে দেখেছেন?আচরণে,শ্রদ্ধায়,গুরুত্বে,সম্মানে,
ভালোবাসায়? বলেন?”
জাহেদ অবশ কণ্ঠে বলল,
“আমি এখন কোনো সদুত্তর দিতে পারব না। বিষয়টা নিয়া আমি চিন্তাভাবনা করতেছি।”
রাবেয়া দৃষ্টিকে অন্যদিকে তাক করে মেঘমুখে বলল,
“আমি আমার ছেলের কথা,বিশ্বাস করছি। ঘরের মানুষের নামে অহেতুক মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার মতো ছেলে জন্ম দিইনি। সেই শিক্ষাও আমি দিইনি আমার দুই ছেলেকে!”
তৌসিফ ও তানভির মায়ের দিকে চাইল সজল চোখে। মায়ের প্রতি শ্রদ্ধায় মাথা নুয়ে এলো দুই ভাইয়ের। সলিমুল্লা বলল,
“সঠিক প্রমাণ বাইর হইলে আমি অবশ্যই বিচার করমু। তোরে কথা দিলাম।”
তানভির ও তৌসিফ কৃতজ্ঞতার চাহনি নিক্ষেপ করলো দাদার মুখপানে। মর্জিনা নাতিকে জিজ্ঞেস করল,
“ট্যাবলেটের বিষয়ে আমার কাছে ধোঁয়াশা লাগতাছে। কিছুই মগজে ধরতাছে না। তুই কী সত্যই জুদা হইয়া যাইবি?”
“হ্যাঁ দাদী।”
“কারণ টা খোলাসা করবি?”
“কারণটা হলো একমাত্র আমার মা। আপনার বড় পুত্রবধূ রাবেয়া।”
সবাই হোঁচট খেল খানিকটা। তৌসিফের কথাটা পুরোপুরি বিশ্বাস হল না তাদের। তারা বুঝে নিল রাজনীতির চালের মতন মাকে সাইনবোর্ড বানাল তৌসিফ। মূল উদ্দেশ্য হলো তার বউ। সেজন্যই সে আলাদা হতে উঠেপড়ে লেগেছে। অনেকক্ষন বসে থাকার জন্য জাহেদের কোমর ব্যথা আরম্ভ হলো। তিনি উঠে গেলেন নিজেদের রুমে। তাকে ধরে নিল রাবেয়া। তিনি শুয়ে পড়লেন। রাবেয়া পা চালিয়ে মিটসেফের সামনে গেল। ফলের ঝুড়ি বের করে পানি ও বটি নিয়ে বসল। মালটা কেটে নিল। আনার খুলে নিল পিরিচে। তাকে সাহায্য করল সাথী। স্বামীকে নিয়ে দিল খেতে।
আসরের আজান শুরু হলো। তাই নামাজ পড়ার জন্য প্রত্যেকে উঠে চলে গেল। তৌসিফ বাড়ির পাঙ্গন ছেড়ে বাইরে গেল। নিরিবিলি রাস্তার একপাশে গিয়ে ঘাসের উপর বসল। পকেট হতে সিগারেটের প্যাকেট বের করল। একে একে পুরো প্যাকেট খালি করে ফেলল। দোকানে চলে গেল সে। ক্ষুধা লেগেছে। পেট চনমনিয়ে উঠেছে। কালুর দোকানের গরম গরম গুলগুলা ও মালাই চা খেল দাঁড়িয়ে। কিছু গুলগুলা ও মুচমুচে জিলাপি কিনে নিল বাড়ির জন্য।
সন্ধ্যা মিলিয়ে গেল। ঝুপ করে পৃথিবীতে আঁধার নেমে এলো। তৌসিফের বুকের ভিতর দারুন হতাশা,ক্ষোভ,ঘৃণা পরিবারের মানুষদের উপর। মা,বাবার উপরেও কম নয় জেদ। সে আলো আঁধার মাড়িয়ে বেশ সময় অতিক্রম করে বাড়ি ফিরে এল। মা,বাবার রুমে ঢুকল। দেখল ভাই তানভিরও বসে আছে পাশে। তৌসিফ দরজা বন্ধ করে দিল ভিতর থেকে। সে জিজ্ঞেস করার আগেই তানভির বলল,
“আমিন বাড়িতে নেই। তার বউয়ের কাছে বলে আসছি। সকালে যেন আসে আমাদের বাড়ি।”
“আচ্ছা ঠিকাছে৷ নে ধর খা। গরম আছে।” বলে কাগজের প্যাকেটটি সে মা,বাবা,ভাইয়ের সামনে বিছানার উপরে রাখল। রাবেয়া প্যাকেটটি হাতে নিয়েই অসহায় কণ্ঠে বলল,
“কী আনছিস?”
“তোমার পছন্দের গুলগুলা,ও জিলাপি। খাও।”
তানভির নিয়ে খেতে লাগল। জাহেদও গুলগুলা ছিঁড়ে মুখে পুরে দিল। রাবেয়া ছেলের মুখের দিকে তাকালেন। বুঝলেন ছেলের মন কিছুটা শান্ত আছে এখন ক্ষোভ ঝাড়তে পারল বলে। সে বলল,
“খাড়া সবাইরে দিয়া আসি।”
“একদম না মা। কারো জন্য আনিনাই আমি। আমরা আলাদা হয়ে গিয়েছি। আলাদা খাবো সবকিছু। সুবিচার পাই নি আমি কারো কাছে। চারজনের হিসেব করে আনছি। আমি খেয়ে আসছি নাস্তা। বাকিজন সাথী। কারণ সে সেদিন নিরপেক্ষ থেকেছে ক্লিপের বিষয়ে। চাইলেই ও মিথ্যা বলতে পার তো। ওর জন্য জিলাপি আর গুলগুলা দাও। দিয়ে আসি।”
ছেলের কড়া কথায় রাবেয়া আর জোর করতে পারল না অন্যদের দেওয়ার জন্য। নিজের মুখে পুরে দিল জিলাপি ভেঙে। সাথির জন্য দুটো গুলগুলা ও তিন পিস জিলাপি দিল তৌসিফের হাতে। তৌসিফ বেরিয়ে গেল। তানভিরের খুব ইচ্ছে করল ফুফাতো বোন মাইমুনা ও চাচাতো ভাই অভ্রকে ডেকে এগুলো দিতে। রাবেয়া মানা করল কপট রাগ দেখিয়ে।
“আরেহ, ওদের দিলেই তো বাকিরা জাইনা যাইব। এতে সমস্যা হইব। খুবই বাজে বিষয় এইটা। নইলে আমি নিজেই দিতাম। কোনদিন এইভাবে আমরা কিছু খাইনাই আইজ পর্যন্ত! তাড়াতাড়ি খাইয়া নে। প্যাকেট জানালা দিয়া ফালাইয়া দিমু। তাইলে তারা কেউই আর কইতে পারব না।”
“সেটাও কথা।”
বলল তানভির ও তার বাবা।
তৌসিফ সাথির রুমে গেল। সাথি রুমে একা। দেখল সাথি গাল ফুলিয়ে আছে। পড়ার টেবিলে বসে আঁকিবুঁকি করছে কি জানি। সাথির হাত টেনে ধরে গুলগুলা ও জিলাপিগুলো দিলো সে। সাথি মুহূর্তেই সেগুলো ফেলে দিল মেঝেতে।
গুমোট কণ্ঠে বলল,
“আপনার এসব আমি খাব না। আপনি আমার শখের ফুলদানি ফেলে দিয়েছেন। ফুলগুলো নষ্ট করেছেন। আপনি একটা নিষ্ঠুর মানুষ! পাষাণ!”
তৌসিফ মাটি থেকে গুলগুলা ও জিলাপি নিয়ে জোর করে সাথির মুখে পুরে দিল। গমগমে স্বরে বলল,
“আমার উপর সাহস দেখানোর দুঃসাহস তোর হয় কী করে? এই কয়দিনে আমাকে চিনিস নি?এর চেয়ে সুন্দর ফুলদানি ও ফুল তোকে এনে দিব আমি। কালই। আর তোর বুকে ওড়না থাকেনা কেন আমি বাড়িতে থাকলে? অসভ্য কোথাকার! সব সময় যেন বুক ঢাকা থাকে। এগুলো খাবি তুই এখন। আমি কারো জন্য না এনে তোর জন্য আনলাম। আর তুই খাবি না?”
“আমি আমার রুমে আছি। ওড়না কেন পরব? আপনি চোখ সামলাতে পারেন না?”
তৌসিফ চোখ কটমট করে বেরিয়ে গেল রুম থেকে৷ দরজা চাপিয়ে দিয়ে বাইরে থেকে ফাঁক দিয়ে ভিতরে তাকাল। দেখল সাথি নাস্তা ফেলে দিল বাইরে তার জানালা দিয়ে। তৌসিফ দরজা ঠেলে ফের ভিতরে গেল। বলল,
“ফেলে দিলি? নাহ? মনে রাখিস।”
ঘরের পরিবেশ উত্তপ্ত! আগ্রাসী! জিঘাংসু! অভ্র রুমে নেই। সেই সুযোগে জাহেদ রুমের দরজা বন্ধ করে দিল৷ দেয়ালেরও কান আছে। সে দাঁত কিড়মিড়িয়ে চোখ রাঙিয়ে স্ত্রীকে বলল,
“তোর জন্যই এই বিপদের মুখে পড়ে গেলাম। ট্যাবলেটের পাতা রাখার আর জায়গা পেলি না?”
মনি নিরীহ স্বরে বলল,
“ওই যে আমাগো রুমে আইসা ড্রেসিং টেবিল খুলব তা কে জানে? ধরা তো পইড়াই গেলাম। এবার কী হইবো?”
জাহেদ বিজ্ঞের সুরে বলে উঠল,
“আর বেশী বাড়াবাড়ি করলে আমি এই ছেলেরেই দুনিয়া থেকে সরায়া দিব।”
“আল্লাগো! কী কন? এইটা মাইনষের কাজ হইবো?”
“খুব হইবো৷ তার বাপের থেকে অনেক পুরানা শোধ নিতে চাইছি। সেটায় যখন সফল হতে পারলাম না তার ছেলের জন্য৷ তাই তার বদলে সেই শোধ তার ছেলের থেকেই নিব আমি। অনেক বাড়াবাড়ি করতাছে সে।”
খুব সচেতনভাবেই নিঃশব্দে কথাগুলো আওড়ালো জাবেদ। মনি তার মুখের অভিব্যক্তির দিকে ঠায় চেয়ে রইলো অবোধের ন্যায়। পরক্ষণেই বলল,
“কিছু ভাবতাছেন মনে হয়? নতুন কোন ফন্দি?”
চলবে…১০
Share On:
TAGS: পিদিম জ্বলা রাতে, রেহানা পুতুল
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৪
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৯
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১১
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৫
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ৩
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৬
-
পিদিম জ্বলা রাতে পর্ব ১৪