নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচৌধুরী
পর্ব ৭১ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
সময় কখনো কারও জন্য দাঁড়িয়ে থাকে না। সে কারো দুঃখ, কারো না বলা অনুভূতি বোঝে না সে তার আপন গতিতেই বইতে থাকে।
কেটে গেছে বেশ কিছু দিন। এই কয়দিনে খান বাড়িতে যেন এক অদ্ভুত নীরবতার ধুলো জমেছে। আরশি-শিহাব আর আরফা-নেহাল যার যার মতো চলে গেছে। তুরা আর রৌদ্রের সম্পর্ক এখন বেশ স্বাভাবিক আর প্রাণবন্ত। কিন্তু তিথি আর আয়ানের সম্পর্কটা যেন এক ভাঙা পথে এসে দাঁড়িয়েছে। আয়ান আগের মতো একটুও তিথিকে বিরক্ত করে না, এক প্রকার কথাই বলে না। রাত বাড়লে সে নিজের বিছানা ছেড়ে সব সময় সোফাতেই ঘুমায়। তিথি যদি কখনো সামনে পড়ে যায়, আয়ান এমনভাবে পাশ কাটিয়ে চলে যায় যেন সে কোনো অচেনা কেউ। আয়ানের এই অবিশ্বাস্য বদলে যাওয়াটা কেন জানি তিথি মেনে নিতে পারছে না। যে মুক্তির জন্য সে এক সময় ছটফট করত, সেই মুক্তি এখন তাকে শান্তি দিচ্ছে না, বরং এক অসহ্য যন্ত্রণা দিচ্ছে যা সে স্পষ্ট অনুভব করতে পারছে। আর রৌদ্র আর আয়ান এখন অফিসের কাজেই অসম্ভব ব্যস্ত থাকে।
দুপুরের সময় তিথি রুমে শুয়ে আছে। বেশ কয়েকদিন ধরে তার শরীরটা ভালো যাচ্ছে না কেমন যেন মাথা ঘুরায়, বারবার বমি বমি পায়। ভেবেছিল বিষয়টা তনুজা খানকে বলবে, কিন্তু পরক্ষণেই ভাবল হয়তো ঋতু পরিবর্তনের কারণে শরীরটা একটু অসুস্থ হয়েছে। তবে তিথিকে একটা দুশ্চিন্তা কুরে কুরে খাচ্ছিল এই মাসে তার পিরিয়ড হয়নি, অনেকদিন আগেই ডেট ওভার হয়ে গেছে। তিথি সিদ্ধান্ত নিল আজ বান্ধবীর বাসায় যাওয়ার নাম করে সে একবার ডাক্তারের কাছে যাবে।
যেই ভাবা সেই কাজ। বাড়ির বড়দের কাছ থেকে বিদায় নিয়ে সে সোজা ডাক্তারের চেম্বারে চলে এল। ডাক্তার তিথির সমস্যার কথা শুনে তাকে একটা প্রেগন্যান্সি কিট দিয়ে ওয়াশরুম থেকে স্যাম্পল নিয়ে আসতে বললেন। তিথিও ডাক্তারের কথামতো কাজ শেষ করে কিটটি ডাক্তারের হাতে এনে দিল। ডাক্তার কিটের দিকে তাকিয়ে চোখ বড় বড় করে অবাক হয়ে বললেন।
” একি দেখছি আমি।”
তিথি অবাক হয়ে ডাক্তারের দিকে তাকাল। ডাক্তার তখন হাসিমুখে আনন্দিত গলায় বললেন।
“অভিনন্দন! আপনি মা হতে যাচ্ছেন। আপনি প্রেগন্যান্ট?।”
ডাক্তারের কথা শুনে তিথির মাথায় যেন আস্ত আকাশটা ভেঙে পড়ল। তার চোখের পাপড়িগুলো অসম্ভবভাবে কাঁপতে শুরু করল। শরীরটা যেন এক মুহূর্তের জন্য অবশ হয়ে এল। যে আয়ানের কাছ থেকে সে প্রতিনিয়ত মুক্তি চেয়েছে, আজ সেই আয়ানের ভালোবাসার ফসল তার শরীরের ভেতর তিলে তিলে বড় হচ্ছে। এই খবরে তিথি খুশি হবে নাকি কাঁদবে, তা সে ভেবে পাচ্ছে না। বুকের ভেতরটা এক অজানা আশঙ্কায় মোচড় দিয়ে উঠল।
তিথি কোনো রকমে নিজেকে সামলে নিয়ে ডাক্তারের কাছ থেকে বিদায় নিল। বাড়িতে এসে কারো সাথে কোনো কথা না বলে, কারো দিকে না তাকিয়ে সে সোজা নিজের রুমে চলে এল। দরজাটা বন্ধ করে বিছানায় লুটিয়ে পড়ে হাউমাউ করে কেঁদে দিল সে। বালিশে মুখ গুঁজে তার সেই কান্নার শব্দ যেন ঘরের দেয়ালগুলোতে প্রতিধ্বনিত হতে লাগল।
এখন সে কী করবে? আয়ানকে কি বলবে এই খবরটা? কিন্তু আয়ান যদি এখন মুখ ফিরিয়ে নেয়? তিথি আয়ানকে কম আঘাত করেনি শুধু কথার বাণে বিদ্ধ করাই নয়, সে আয়ানের গায়ে হাত পর্যন্ত তুলেছে। অথচ আয়ান একবারের জন্যও পাল্টা আঘাত করেনি, এমনকি কারো কাছে কোনো অভিযোগ পর্যন্ত জানায়নি। আয়ানের সেই সহ্যশক্তি আর নীরবতা এখন তিথির কাছে পাহাড়সম অপরাধের বোঝা মনে হচ্ছে।
আয়ানের এই এড়িয়ে চলাটাও তিথি এখন আর কোনোভাবেই সহ্য করতে পারছে না। তার বুক ফেটে কান্না আসছে, ভীষণ কষ্ট হচ্ছে। নিজের ওপরই চরম ঘৃণা হচ্ছে তার। আজ তার খুব ইচ্ছে করছে আয়ান যখন রুমে আসবে, তখন তাকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে বলতে “আয়ান, আমি আর মুক্তি চাই না,আমি তোমাকেই চাই। আমাদের এই অনাগত সন্তানকে সাথে নিয়ে আমি তোমার হয়েই সারাজীবন থাকতে চাই।”
[রাত ৮:০০ খান বাড়ি]
রৌদ্র আর আয়ান অফিস থেকে আজ তাড়াতাড়ি ফিরল। প্রচণ্ড কাজের চাপে দুজনেই বেশ ক্লান্ত। তারা এসেই ড্রয়িংরুমের সোফায় গা এলিয়ে দিল। এদিকে তুরারও গত কয়েকদিন ধরে শরীরটা একদমই ভালো যাচ্ছে না সারাক্ষণ বমি বমি ভাব, কিছু মুখে দিলেই উগরে আসছে। সে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে রৌদ্রকে আসতে দেখে নিচে নামার জন্য পা বাড়াল। কিন্তু রুম থেকে বের হয়ে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে যেই কয়েক পা এগিয়েছে, অমনি পুরো পৃথিবীটা তার চোখের সামনে বনবন করে ঘুরে উঠল। মাথা চক্কর দিয়ে তুরা ফ্লোরে ধপ করে বসে পড়ল এবং পরক্ষণেই গলগল করে বমি করে দিল।সোফায় বসা রৌদ্র তুরার এই অবস্থা দেখে পাগলের মতো ছুটে এল। তুরাকে আগলে ধরে অস্থির হয়ে বলতে লাগল।
“কী হয়েছে তুরা? এভাবে বমি করছো কেন? শরীর কি খুব খারাপ লাগছে?”
তুরার বমির শব্দ শুনে তনুজা খান রান্নাঘর থেকে ছুটে এলেন। তিনি তুরার পাংশুটে মুখ আর ঠান্ডা হাত-পা দেখে বেশ ঘাবড়ে গেলেন। রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে তাগাদা দিয়ে বললেন।
“রৌদ্র, তাড়াতাড়ি ডাক্তারকে কল দে! তুরার হাত-পা এমন বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে কেন?”
রৌদ্র আর এক মুহূর্ত দেরি না করে সাথে সাথে তাদের ফ্যামিলি ডক্টরকে ফোন দিল। কিছুক্ষণের মধ্যেই ডাক্তার চলে এলেন। রৌদ্র তুরাকে কোলে করে তুলে নিয়ে রুমে এনে শুইয়ে দিল। ডাক্তার আসার পর সবাইকে রুম থেকে বেরিয়ে যেতে বললেন,শুধু রৌদ্রকে থাকতে দিলেন। ডাক্তার তুরাকে খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে পরীক্ষা করলেন। তুরার রক্তচাপ বেশ কম। ডাক্তার সরাসরি তুরার দিকে তাকিয়ে নিচু স্বরে প্রশ্ন করলেন।
“মিসেস তুরা, আপনার পিরিয়ড হয় না কতদিন ধরে?”
তুরা কিছুটা লজ্জা পেলেও পরিস্থিতি বুঝে খুব আস্তে করে উত্তর দিল।
“এই মাসে হয়নি, অনেক দিন হয়ে গেছে ডেট পার হয়েছে।”
ডাক্তারের মুখে মুহূর্তেই খুশির ঝলক ফুটে উঠল। তিনি যা সন্দেহ করেছিলেন, তা-ই ঠিক। ডাক্তার এবার সরাসরি রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন।
“মিস্টার রৌদ্র, আপনি আপনার পরিবারের সবাইকে এই রুমে ডেকে আনুন তো।”
রৌদ্রের বুকটা ধক করে উঠল। সে অস্থির হয়ে বলল।
“কেন ডাক্তার? তুরার কী হয়েছে? ও ঠিক আছে তো? কোনো বড় সমস্যা নয় তো?”
ডাক্তার শান্ত গলায় হেসে বললেন।
“আপনি আগে সবাইকে ডাক দিন, আমি সবার সামনেই বলছি।”
রৌদ্র ডাক্তারের কথা মতো একছুটে গিয়ে সবাইকে ডেকে আনল। আনোয়ার খান, আশিক খান আর তনুজা খান সবাই অস্থির হয়ে রুমে ঢুকলেন। সবার চোখেমুখে চরম উৎকণ্ঠা। ডাক্তার সবার দিকে একবার তাকালেন, তারপর সরাসরি আনোয়ার খান আর আশিক খানের দিকে তাকিয়ে মুখে চওড়া হাসি ফুটিয়ে বললেন।
“আপনারা দাঁড়িয়ে আছেন কেন? তাড়াতাড়ি গিয়ে মিষ্টি নিয়ে আসুন! দাদা আর নানা হওয়ার খুশিতে বাড়িতে নতুন অতিথি আসতে চলছে। মিস্টার আব্রাহাম খান রৌদ্র বাবা হতে যাচ্ছেন, আর আপনারা দুজনেই প্রমোশন পেয়ে দাদা আর নানা হতে যাচ্ছেন!”
ডাক্তারের মুখ থেকে এই অমৃত বাণী শোনা মাত্রই ঘরের গুমোট পরিবেশটা মুহূর্তেই আনন্দ আর উচ্ছ্বাসে ভরে উঠল। খুশিতে তনুজা খানের চোখ ছলছল করে উঠল। সবাই সমস্বরে বলে উঠলেন। “আলহামদুলিল্লাহ!” আনোয়ার খান আর আশিক খান তো আনন্দে একে অপরকে জড়িয়ে ধরলেন।
কিন্তু রৌদ্র? সে যেন এক পলকে পাথরের মতো জমে গেল। তার চারপাশের সব শব্দ যেন ফিকে হয়ে এল। কথা বলার মতো সামান্য শক্তিটুকুও সে হারিয়ে ফেলেছে। ডাক্তার কী বললেন? সে বাবা হতে যাচ্ছে! তার আর তুরার ভালোবাসার একটা ছোট্ট প্রতিচ্ছবি এই পৃথিবীতে আসতে চলছে? এখন তাকেও কেউ আধো আধো বুলি দিয়ে ‘বাবা’ বলে ডাকবে?
এই অভাবনীয় খুশিতে রৌদ্র যেন নড়াচড়া করতেও ভুলে গেল। সে শুধু অপলক দৃষ্টিতে বিছানায় শুয়ে থাকা তুরার দিকে তাকিয়ে রইল, যার চোখে তখন আনন্দ আর লজ্জার এক অদ্ভুত মিশ্রণ। রৌদ্রের মনে হলো, আজ সে পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ ধন হাতে পেয়েছে।
ডাক্তার চলে গেলেন। আনোয়ার খান আর আশিক খান খুশিতে আত্মহারা হয়ে রাতেই মিষ্টি আনতে বেরিয়ে পড়লেন। বাড়ির পরিবেশটাই যেন এক লহমায় বদলে গেল। আয়ানও খুব খুশি হলো যদিও সে বাবা হওয়ার বাস্তব অভিজ্ঞতা জানে না, তবে রৌদ্রের মুখের ওই চওড়া হাসি দেখে সে বুঝতে পারল এই অনুভূতিটা আসলে কতটা স্বর্গীয় হয়।
তুরার সাথে সবাই একে একে দেখা করল,রৌশনি খান তো নাতিনাতনির আসার কথা ভেবে তাকে অনেক আদর করলেন। তুরা লজ্জায় কুঁকড়ে আছে, সে চোখ তুলে একবারও রৌদ্রের দিকে তাকাতে পারছে না। ধীরে ধীরে যখন সবাই ঘর থেকে বেরিয়ে গেল, তখন রুমে শুধু রৌদ্র আর তুরা।
রৌদ্র এতক্ষণ নিজেকে কোনোমতে ধরে রেখেছিল। এবার সে ধীরে ধীরে পা বাড়িয়ে তুরার কাছে এল। তারপর হুট করেই এক ঝটকায় তুরার পেট জড়িয়ে ধরে হাঁটু গেঁড়ে বসে পড়ল। পাগলের মতো আবোলতাবোল বকতে শুরু করল।
“তুরা, আমি বাবা হবো, তাই না? সত্যি তো? এইখানেই কি আমার অংশ বড় হচ্ছে? পৃথিবীতে আসার পর সে আমাকে ‘বাবা’ বলে ডাকবে তো?”
রৌদ্রের এই দিশেহারা পাগলামি দেখে তুরার ঠোঁটে এক চিলতে মায়াভরা হাসি ফুটে উঠল। সে পরম মমতায় রৌদ্রের এলোমেলো চুলে হাত বোলাতে বোলাতে মৃদু স্বরে জিজ্ঞেস করল।
“আপনি খুশি হয়েছেন তো?”
রৌদ্র আর নিজেকে সামলাতে পারল না। খুশিতে তার চোখ ফেটে জল বেরিয়ে এল। সে ফুঁপিয়ে কাঁদতে কাঁদতে ধরা গলায় বলল।
“আমি তোমাকে বলে বোঝাতে পারব না তুরা, তুমি আমাকে আজ কী দিয়েছ! সব থেকে বড় সুখটা তুমি দিয়েছ! আমি আজ নিজের জীবনের থেকেও বেশি খুশি হয়েছি।”
রৌদ্র নিজের চোখের পানি মুছে নিয়ে তুরার কপালে গভীর এক চুমু খেল। তারপর তুরার দুটো হাত নিজের হাতের মুঠোয় শক্ত করে নিয়ে আবেগী গলায় বলল।
“জানি না কেন, এতদিন বুকের ভেতর কোথায় যেন একটা সূক্ষ্ম শূন্যতা অনুভব করতাম। আজ বুঝতে পারছি, সেই ফাঁকা জায়গাটা ছিল বাবা হওয়ার আকাঙ্ক্ষার। আজ আমি সত্যি সত্যি বাবা হতে যাচ্ছি তুরা! আজ আমি নিজেকে পুরোপুরি পূর্ণ মনে করছি। আই লাভ ইউ তুরা, আই লাভ ইউ সো মাচ!”
রৌদ্র যেন হিতাহিত জ্ঞান হারিয়ে ফেলেছে। সে তুরার হাত জড়িয়ে ধরে তার হাতে পাগলের মতো চুমু খেতে লাগল। তুরা অবাক হয়ে দেখছে রৌদ্রের এই রূপ। সে জানত রৌদ্র খুশি হবে, কিন্তু এতটা? বাবা হওয়ার আনন্দ যে একটা মানুষকে এভাবে কাঁদিয়ে দিতে পারে, তা সে আজ প্রথম দেখল। রৌদ্রের এই পবিত্র পাগলামি দেখে তুরার নিজের চোখও ভিজে উঠল।
খান বাড়িতে এখন উৎসবের আমেজ। সবার মুখে হাসি, সবার মনে আনন্দ। কিন্তু এই প্রদীপ জ্বালানো হাসির নিচে যে আরও একটা প্রদীপ জ্বলছে, তা কেউ টেরই পেল না। এত হাসি-আনন্দের মাঝে লুকানো রয়ে গেল আরেকটা বিশাল সুখবর।এই বাড়িতে শুধু রৌদ্র-তুরার সন্তানই নয়, চুপিচুপি ডানা মেলছে আরও এক নতুন প্রাণ তিথির গর্ভে বেড়ে ওঠছে আয়ানের অংশ।
তিথিও তুরার খবরটা জানতে পেরে মনে মনে ভীষণ খুশি হলো। এক মুহূর্তের জন্য তার মনে হলো আজ যদি সে তার নিজের খুশির খবরটা সবাইকে দিত, তবে পুরো খান বাড়িতে আজ তাকে নিয়েও আনন্দের উৎসব বয়ে যেত। কিন্তু সেই সাহস তিথির হলো না। অপরাধবোধ তাকে আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে রেখেছে।
আজ তিথি মনে মনে শক্ত প্রতিজ্ঞা করেছে যাই হয়ে যাক, সে আয়ানের সাথে কথা বলবেই। এভাবে দিনের পর দিন একজনের অস্তিত্বকে অস্বীকার করে বেঁচে থাকা যায় না। এভাবে থাকলে সে নিজেই দম আটকে মারা যাবে সে।
রাত এখন নিস্তব্ধ। চারদিকে কোনো কোলাহল নেই, শুধু ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যাচ্ছে। আয়ান বুকে হাত ভাঁজ করে ব্যালকনিতে দাঁড়িয়ে আছে। তার শূন্য দৃষ্টি আকাশের নক্ষত্রদের মাঝে কী যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে। তিথি গুটি গুটি পায়ে ব্যালকনিতে এসে দাঁড়াল। আয়ান কারো উপস্থিতি বুঝতে পেরেও নড়ল না, আগের মতোই পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। তিথি সাহস সঞ্চয় করে অনেক কষ্টে খুব নিচু স্বরে ডাক দিল।
“আ-আ-আয়ান।”
তিথির গলাটা থরথর করে কাঁপছে। আয়ান তিথির কণ্ঠ শুনেও তার দিকে ফিরল না। সামনের দিকে তাকিয়েই খুব শীতল গলায় বলল।
“কিছু বলবি?”
আয়ানের এই ভাবলেশহীন নিস্পৃহতা তিথি আর সহ্য করতে পারল না। তার ভেতরের সব রাগ, অভিমান আর জেদ মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। সব অপরাধ স্বীকার করে নিয়ে সে এক ছুটে গিয়ে আয়ানকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। আয়ানের পিঠে মুখ গুঁজে কান্নায় ভেঙে পড়ে বলল।
“আয়ান, আমাকে ক্ষমা করে দাও! আমি এখন বুঝতে পারছি আমি তোমাকে কতটা আঘাত দিয়েছি। আমি সত্যিই অনেক বড় ভুল করে ফেলেছি আয়ান, প্লিজ তুমি আমাকে ক্ষমা করো। কেন জানি তোমার এই চুপচাপ থাকা আমি একদমই মেনে নিতে পারছি না। আমার খুব কষ্ট হচ্ছে, বুকে অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে। প্লিজ আয়ান, তুমি আগের মতো হয়ে যাও, আমাকে বকা দাও, শাসন করো কিন্তু এভাবে চুপ থেকো না।”
তিথির চোখের জলে আয়ানের টি শার্টের পেছনটা ভিজে একাকার হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু আয়ান এক চুলও নড়ল না। কোনো প্রতিক্রিয়া দেখাল না সে। এটাই হয়তো কঠিন বাস্তবতা মানুষ যখন চুপ হয়ে যায়, যখন ভেতর থেকে হারিয়ে যায়, তখনই অন্যরা তার কদর বুঝতে শুরু করে। আয়ান খুব ঠান্ডা আর নির্লিপ্ত গলায় বলল।
“একদম ভালো লাগছে না তিথি।তোর কান্না বড্ড বিরক্ত লাগছে। আমায় ছাড়। কান্না করতে হলে বাইরে গিয়ে কর।”
তিথি আজ দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। আয়ানের এই তাচ্ছিল্য আর শীতল ব্যবহার যে তার প্রাপ্য, সেটা সে খুব ভালো করেই জানে। আয়ান তাকে ছেড়ে দেওয়ার কথা বললেও তিথি তার বাঁধন আরও শক্ত করল। সে আয়ানের পিঠের সাথে লেপ্টে থেকে ডুকরে কেঁদে উঠল। তার কান্নায় আজ কোনো অভিনয় নেই, আছে শুধু এক বুক হাহাকার।
“ছাড়ব না! যতক্ষণ না তুমি আগের মতো আমাকে শাসন করছো, বকা দিচ্ছো ততক্ষণ আমি তোমাকে ছাড়ব না। আয়ান, প্লিজ সত্যি আমার খুব খুব কষ্ট হচ্ছে, বিশ্বাস করো! আমার বুকটা ফেটে যাচ্ছে। আমি তোমার কাছ থেকে মুক্তি চেয়েছিলাম ঠিকই, কিন্তু ওটাই ছিল আমার জীবনের সবথেকে বড় ভুল। এই মুক্তি আমাকে শান্তি দেয়নি আয়ান, বরং তার থেকেও দিগুণ যন্ত্রণা দিচ্ছে। আমি আর মুক্তি চাই না, আমি তোমাকে চাই। আমার সেই আগের আয়ানকে চাই।”
তিথির আকুতি শুনে আয়ান এক কর্কশ খিলখিল হাসিতে ফেটে পড়ল। সেই হাসিতে কোনো আনন্দ নেই, ছিল কেবল বিষাদ আর অবজ্ঞা। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল।
“কী বললি? বুকে কষ্ট হচ্ছে? অসহ্য যন্ত্রণা হচ্ছে? তো সেটা আমার কাছে কেন বলছিস? যেখানে গেলে তোর ভালো লাগবে, শান্তি পাবি, সেখানে যা। তোর মুক্তি দরকার ছিল, তুই তো তা পেয়েই গিয়েছিস! তবে আবার কেন আমার কাছে এসেছিস? শুনে রাখ তিথি, মন এমন একটা জিনিস যা সবসময় একরকম থাকে না। আমারও একটা মন ছিল, যেই মনটা মনে-প্রাণে শুধু তোকেই চাইত। কিন্তু সেই মনটা এখন কেমন জানি হয়ে গেছে। এখন তোকে দেখলে সেই মনটা একদম স্থির আর চুপ হয়ে যায়, আগের মতো আর পাগলামি করে না। মনে হয়, তোর ব্যবহারে আমার মনটাও আজ মরে গিয়ে চুপ হয়ে গেছে।”
আয়ানের এই কথাগুলো তিথির কানে তপ্ত সিসার মতো বিঁধল। আয়ান আর এক মুহূর্ত দাঁড়াল না। সে খুব নির্লিপ্ত গলায় যোগ করল।
“যাই হোক, এসব ফালতু কথা বলে আর সময় নষ্ট করতে চাই না। আমার ভীষণ ঘুম পাচ্ছে। ছাড় আমায়।”
বলেই আয়ান এক ঝটকায় তিথির বাঁধন ছাড়িয়ে রুমে চলে এল। সোফায় গিয়ে গুটিসুটি মেরে শুয়ে পড়ল সে, তিথির দিকে ফিরেও তাকাল না। তিথি ব্যালকনিতে একা দাঁড়িয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে লাগল। তার কান্না দেখার মতো আজ কেউ নেই। আজ সে হাড়ে হাড়ে টের পাচ্ছে তার করা ভুলের মাশুল কতটা ভয়াবহ। যেই আয়ান সারাক্ষণ তাকে জ্বালিয়ে মারত, যে তার চোখের এক ফোঁটা পানি দেখলে পুরো বাড়ি মাথায় তুলত, সেই আয়ান আজ তার অঝোর কান্না দেখেও একটুও বিচলিত হলো না। মানুষ কতটা গভীর আঘাত পেলে এভাবে জ্যান্ত পাথর হয়ে যায়, তিথি আজ তা চোখের সামনে দেখতে পাচ্ছে।
তিথি নিজের পেটে আলতো করে হাত রাখল। চোখের জল মুছে বিড়বিড় করে বলল।
“বাবু দেখো তোমার বাবা আমার উপর রাগ করে আছে?তুমি তাড়াতাড়ি এসে তোমার বাবাকে বলে দাও না তোমার মাম্মামকে মাফ করে আগের মতো কাছে টেনে নিতে আগের মতো শাসন করতে, জানো তোমার মাম্মামের খুব কষ্ট হচ্ছে বুকে অনেক ব্যথা করছে যেই ব্যথার ঔষধটা শুধু তোমার বাবার কাছেই আছে কিন্তু আজ আমার অপরাধে সে আমাকে সেই ঔষধ দিচ্ছে না।”
রানিং…!
বাচ্চারা কারেন্ট ছিল না গো তাই দেরি হলো আজ🥺
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩১
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২১