নির্লজ্জ_ভালোবাসা
লেখিকাসুমিচোধুরী
পর্ব ৬৮ (❌কপি করা নিষিদ্ধ❌)
পরদিন সকালে খান বাড়িতে সাজসাজ রব। আজ সবাই মিলে আরফার শ্বশুরবাড়িতে যাবে, তাই সকাল থেকেই হুড়োহুড়ি আর ব্যস্ততা। রৌদ্র শাওয়ার শেষ করে তোয়ালে দিয়ে শরীর মুছতে মুছতে রুমের ভেতরে এল। এসে দেখল তুরা একটা ধবধবে সাদা শাড়ি পরে তৈরি হওয়ার চেষ্টা করছে। তুরা সবেমাত্র শাড়ির কুঁচিগুলো হাতের মুঠোয় গুছিয়ে নিয়ে পেটে গুজতে যাবে, ঠিক তখনই রৌদ্রের স্থির চাউনি পড়ল তুরার উন্মুক্ত ফর্সা পেটের দিকে।
তুরার সাথে রৌদ্রের চোখাচোখি হতেই মুহূর্তের জন্য তুরা থমকে গেল। রৌদ্রের ওই নেশালো চাউনি দেখে তুরার হাত থেকে শাড়ির কুঁচিগুলো ফসকে নিচে পড়ে গেল। তুরা দ্রুত রৌদ্রের দিকে পিঠ দিয়ে ঘুরে দাঁড়িয়ে মেকি রাগ দেখিয়ে বলল।
“আপনি এইভাবে কেন দাঁড়িয়ে আছেন? দেখছেন তো আমি শাড়ি পরছি! লজ্জা করে না? বের হোন রুম থেকে।”
রৌদ্র কোনো কথা বলল না, শুধু ঠোঁটের কোণে একটা বাঁকা হাসি ফুটিয়ে ধীরপায়ে তুরার পেছনে গিয়ে দাঁড়াল। তুরাকে এক ঝটকায় নিজের দিকে ঘুরিয়ে নিতেই তুরা লজ্জায় আর রাগে ফট করে চোখ বন্ধ করে ফেলল। মুখ ঝামটা দিয়ে বলল।
“অসভ্য পুরুষ! লজ্জা-শরম সব কি ধুয়ে খেয়েছেন? তাও সামনে দাঁড়িয়ে আছে!”
রৌদ্র এবার খুব কাছ থেকে তুরার দিকে তাকাল। সাদা শাড়িতে তুরাকে আজ পরীর মতো লাগছে। তুরার ফর্সা পেটের ভাঁজে রৌদ্রের চোখ আটকে যেতেই রৌদ্র একটা লম্বা শ্বাস নিল। নিজেকে সামলানো দায় হয়ে পড়ছে ওর জন্য। রৌদ্র আলতো করে নিচে নামল এবং তুরার হাত থেকে শাড়িটা টেনে নিয়ে নিজেই নিপুণ হাতে কুঁচিগুলো গুছিয়ে দিল। তারপর অতি সাবধানে সেই কুঁচিগুলো তুরার নাভির নিচে গুঁজে দিতেই তুরা শিউরে উঠল। এক অদৃশ্য শিহরণ বয়ে গেল তুরার শরীরে।
রৌদ্র তুরার কাঁধের ওপর আঁচলটা টেনে দিয়ে নিচু স্বরে বলল।
“এবার চোখ খোলো। এইভাবে চোখ বন্ধ করে আমার মাথা নষ্ট করো না, নাহলে গরম কমাতে আমাকে আবার শাওয়ার নিতে ঢুকতে হবে।”
তুরা ফট করে চোখ খুলে রাগে কিছু বলতে চাইল, কিন্তু রৌদ্র তার আগেই সরে গিয়ে আলমারি থেকে নিজের জন্য একটা সাদা শার্ট আর প্যান্ট বের করে নিল। রৌদ্র রেডি হয়ে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে যখন চুল ঠিক করতে যাবে, অমনি তুরা সামনে এসে দাঁড়াল। রৌদ্রের হাত থেকে চিরুনিটা কেড়ে নিয়ে নিজের হাতের তোয়ালে দিয়ে রৌদ্রের ভেজা চুলগুলো মুছতে শুরু করল। রৌদ্র স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে পরম আবেশে দেখছে তার পাগলি বউয়ের এই যত্ন।
রৌদ্রের চুল সেট করে দিয়ে তুরা নিজেও আয়নার সামনে দাঁড়াল। দু-হাতে রেশমি চুড়ি পরল, চোখে গাঢ় কাজল দিল, কানে ঝুমকো আর ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক। তুরা যখন কপালে একটা ছোট্ট সাদা পাথরের টিপ পরছে, তখন আয়নায় দেখল রৌদ্র ঠিক পেছনে দাঁড়িয়ে একদৃষ্টে তার দিকে তাকিয়ে আছে। সেই দৃষ্টিতে আজ আবার সেই পুরোনো নেশা। তুরা টিপটা ঠিক করতে করতে আয়নাতেই রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বলে উঠল।
“সারাক্ষণ কি আপনার মাথায় এই অসভ্যতামী করার ধান্দা থাকে?।”
তুরার কথায় রৌদ্র তুরাকে পেছন থেকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তুরার গালে একটা গভীর চুমু খেয়ে রৌদ্র আবেশে বলল।
“তুমি এতটাই মিষ্টি যে তোমাকে সারাক্ষণ শুধু কাছে পেতেই ইচ্ছে করে। আচ্ছা, তুমি এত আদুরে কেন বলো তো? সারাক্ষণ খালি তোমাকে আদর করতে মন চায়।”
তুরা লজ্জায় লাল হয়ে গেল। রৌদ্রের শক্ত বাহুবন্ধন থেকে ছাড় পাওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি করতে করতে তুরা বলল।
“আমি জানি না, ছাড়েন আমায়! আপনার লজ্জা-শরম দিন দিন কমছে।”
রৌদ্র তুরাকে আরও নিবিড়ভাবে বুকের সাথে লেপ্টে ধরল। আয়নায় নিজেদের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে রৌদ্র হঠাৎ খুব গম্ভীর আর আকুল গলায় বলল।
“ও বউ, বলো না আমি কবে বাবা হব? আমার না বড্ড বাবা ডাক শুনতে ইচ্ছে করছে। কবে তোমার শরীরে আমার অস্তিত্ব আসবে? কবে আমাদের মাজে একটা ছোট্ট রৌদ্র বা ছোট্ট তুরা আসবে?”
রৌদ্রের এমন আবেগঘন আর সরাসরি প্রশ্নে তুরা মুহূর্তেই স্থির হয়ে গেল। তুরার ধস্তাধস্তি থেমে গেল। এক অদ্ভুত ভালোলাগা আর আবেশে তুরার মনটা ভরে উঠল। তুরা আয়নায় রৌদ্রের চোখের দিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল।
“আল্লাহ যেদিন চাইবেন, সেই দিনই সব হবে। এখন ছাড়েন, অনেক দেরি হয়ে যাচ্ছে।”
রৌদ্র তুরার গালে আবারও একটা লম্বা চুমু দিয়ে তুরাকে ছেড়ে দিল। এবার রৌদ্র দ্রুত হাতে নিজের শার্টের হাতা দুটো ভাঁজ করে নিল, বাঁ হাতে দামী ঘড়িটা পরল। চুলে জেল দিয়ে খুব সুন্দর করে সেট করে নিল রৌদ্র। সব শেষে পারফিউম স্প্রে করে চোখে একটা ব্ল্যাক সানগ্লাস দিল। রৌদ্র যখন পূর্ণরূপে একজন হিরোর মতো তৈরি হলো,তুরা পাশে দাঁড়িয়ে বুকে হাত ভাঁজ করে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল রৌদ্রের দিকে।
রৌদ্রের এই ‘হিরো’ সাজটা তুরার কেন যেন পছন্দ হলো না। তুরা হুট করে রৌদ্রের সানগ্লাসটা টান দিয়ে খুলে নিল আর হাত বাড়িয়ে রৌদ্রের পরিপাটি করা চুলগুলো একদম এলোমেলো করে দিয়ে বলল।
“এই যে, বাইরে যাওয়ার জন্য এত হিরো সাজার দরকার নাই। অন্য মেয়েরা তাকিয়ে থাকুক তা আমি চাই না। আমি আপনাকে এই এলোমেলো চুলেই দেখতে চাই।”
তুরার এই অধিকারবোধ দেখে রৌদ্র শব্দ করে হেসে দিল। রৌদ্র নিজে হাত দিয়ে চুলগুলো আরও ঘেঁটে দিয়ে বলল।
“এই নাও, তোমার ইচ্ছামতো অগোছালো হলাম। এবার খুশি তো?”
রৌদ্রের ঘন, সিল্কি আর জরাজরা চুলগুলো কপালে এসে পড়ায় রৌদ্রকে এখন আগের চেয়েও বেশি কিউট আর আকর্ষণীয় লাগছে, যা তুরা স্পষ্ট বুঝতে পারল। তুরা মনে মনে ভাবল, এই মানুষটাকে যেভাবে রাখা হয় সেভাবেই মারাত্মক লাগে! তুরা এবার চিরুনিটা নিয়ে আবারও সুন্দর করে রৌদ্রের চুলগুলো গুছিয়ে দিল। খুব খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে তুরা সন্তুষ্টির হাসি দিয়ে বলল।
“হুমম, এইবার ঠিক আছে।এইবার আমার পারফেক্ট হাজব্যান্ড লাগছে।”
তুরার মুখে নিজের প্রশংসা শুনে রৌদ্রের মনটা খুশিতে ভরে উঠল। রৌদ্র এবার একদম ছোট বাচ্চাদের মতো আবদারের স্বরে বলল।
“তাই বুঝি? তাহলে পারফেক্ট হাজব্যান্ড হওয়ার পুরস্কার হিসেবে গালে একটা পাপ্পি দাও।”
রৌদ্রের এমন নির্লজ্জ আবদার শুনে তুরা দুষ্টুমিভরা হাসল। তুরা হাত দিয়ে ইশারা করে রৌদ্রকে একটু নিচু হতে বলল। রৌদ্র ভাবল তুরা বোধহয় সত্যিই আজ সোহাগ করবে, তাই রৌদ্র বাধ্য ছেলের মতো মাথাটা হালকা নিচু করল।সুযোগ পেয়ে তুরা কালক্ষেপণ করল না। রৌদ্রের গালে একটা আলতো পাপ্পি দিয়েই ছোঁ মেরে রৌদ্রের শার্টের কলারটা সরিয়ে দিল। পর মুহূর্তেই রৌদ্রের ঘাড়ের ওপর বসিয়ে দিল এক শক্ত কামড়! কামড় দিয়েই তুরা শাড়ির কুঁচি সামলে নিয়ে হাসতে হাসতে রুম থেকে এক দৌড়ে বেরিয়ে গেল।
আকস্মিক ব্যথায় রৌদ্র “আহহ” করে চিৎকার দিয়ে উঠল। এক হাত দিয়ে ঘাড় চেপে ধরে রৌদ্র আয়নার দিকে তাকিয়ে দেখল সেই জায়গাটা লাল হয়ে আছে। তুরা ততক্ষণে দরজার ওপাশে চলে গেছে। রৌদ্র দাঁত কিড়মিড় করে তুরার চলে যাওয়ার পথের দিকে তাকিয়ে চেঁচিয়ে বলল।
” কুত্তি রে আজকে খালি তোরে একা পেয়ে লই, এই কামড়ের শোধ তো আমি তুলবই তুলব! তখন কিন্তু আর কান্নাকাটি করে মাফ পাবি না।”
তনুজা খানের রুম থেকে নীল শাড়ি পরে বেরিয়ে এল তিথি। তিথি নিজে শাড়ি পরতে জানে না,তাই তনুজা খানের কাছ থেকে শাড়িটা পরে নিল। নীল রঙের এই শাড়িতে তিথিকে এক অদ্ভুত মায়াবী লাগছে। তিথি নিজের খোলা চুলগুলো ঠিক করতে করতে গুটিগুটি পায়ে রুমের দিকে যাচ্ছিল।
ঠিক সেই মুহূর্তেই আয়ান পুরোপুরি রেডি হয়ে হাতে ফোন স্ক্রল করতে করতে নিজের রুম থেকে বেরিয়ে আসছিল। দুজনেই যার যার চিন্তায় এতটাই মগ্ন ছিল যে কেউ কাউকে খেয়াল করেনি। ফলস্বরূপ,মাঝপথে এসে দুজনে একে অপরের সাথে বেশ জোরে ধাক্কা খেল। ধাক্কার চোটে আয়ানের হাত থেকে ফোনটা ফ্লোরে পড়ে গেল আর তিথিও তাল সামলাতে না পেরে পেছনের দিকে পড়ে যেতে নিল।
কিন্তু আয়ান ক্ষিপ্র গতিতে এগিয়ে এসে তিথির কোমর জড়িয়ে ধরল। তিথি ভয়ে আঁতকে উঠে চোখ বন্ধ করে ফেলল এবং বাঁচার তাগিদে আয়ানের শার্টের কলারটা শক্ত করে খামচে ধরল। তিথির হৃৎপিণ্ড ধুকপুক করছে, আতঙ্কে তিথি বড় বড় শ্বাস নিতে লাগল।
আয়ানও বড় বড় শ্বাস নিতে নিতে তিথির ওই বুজে থাকা মায়াবী চোখের দিকে তাকাল। মুহূর্তে আয়ান যেন পাথরের মতো থমকে গেল। চারপাশের সব কোলাহল, ফোন পড়ে যাওয়া কিংবা আরফাদের বাড়ি যাওয়ার তাড়া সব কিছু আয়ানের মাথা থেকে মুছে গেল। পুরো পৃথিবীটা থমকে দাঁড়িয়েছে কেবল তাদের দুজনের জন্য। আয়ান অপলক দৃষ্টিতে তিথির নিষ্পাপ মুখের দিকে তাকিয়ে রইল, যেন এই মুখটি সে জনম জনম ধরে দেখেও তৃপ্ত হতে পারবে না।
তিথির গায়ের হালকা পারফিউমের ঘ্রাণ আর তার ওই নীল শাড়ির মায়া আয়ানকে এক অজানা রাজ্যে নিয়ে গেল। আয়ান নিজেও বুঝতে পারছে না, এই মেয়েটার চোখের ওই বন্ধ পাতায় এমন কী জাদু আছে যা আয়ানকে বার বার এতটা আচ্ছন্ন করে ফেলছে।
সত্যিই সময় কিভাবে বদলে যায়! একটা সময় ছিল যখন আয়ানের সাথে তিথির সামান্য ধাক্কা লাগত আয়ান রেগে আগুন হয়ে যেত,তিথিকে কড়া গলায় বকত,এমনকি রাগের মাথায় শাসন করতেও দ্বিধা করত না। অথচ আজ সেই উদ্ধত আয়ানই পাহাড়ের মতো শান্ত। তিথির দিকে তাকিয়ে থাকা আয়ানের ওই চোখের কোণে আজ কোনো ঘৃণা নেই, বরং একরাশ মায়া টলমল করছে। আয়ানের মোহগ্রস্ত দৃষ্টি যেন বলছে নিথর হয়ে এভাবেই তিথিকে দেখে পুরোটা জীবন পার করে দেওয়া যায়।
বেশ কিছুক্ষণ পর তিথি ধীরে ধীরে চোখের ভারী পাতা দুটো মেলল। চোখ খুলতেই আয়ানের ওই অতলান্ত মায়াভরা চোখ জোড়া সামনে পড়ল। তিথিও অপলক কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইল, যেন আয়ানের চোখের ওই গভীরতায় তিথি যেন ডুবে যাচ্ছে। হুট করে ঘোর কাটতেই তিথি হুরমুর করে সোজা হয়ে দাঁড়াল। লজ্জায় আর কাঁপাকাঁপি বুকে কোনো কথা না বলে বড় বড় পা ফেলে তিথি দ্রুত নিজের রুমের দিকে পালিয়ে গেল। আয়ান দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে তিথির চলে যাওয়া দেখল এবং ঠোঁটের কোণে এক চিলতে বিজয়ী হাসি ফুটিয়ে ফ্লোর থেকে ফোনটা তুলে নিয়ে নিচে নেমে এল।
ধীরে ধীরে খান বাড়ির সবাই রেডি হয়ে বাড়ির উঠোনে জড়ো হতে লাগল। আরশি আর শিহাবও ধীরপায়ে বেরিয়ে এল ওরা আজ ম্যাচিং করে কালো পোশাক পরেছে। কালো শাড়িতে আরশিকে যেমন মায়াবী লাগছে, শিহাবকেও কালো শার্টে ঠিক ততটাই ড্যাশিং মনে হচ্ছে।
তুরা রৌশনি খানের সাথে কোনো একটা বিষয় নিয়ে হাসিমুখে গল্প করছিল। হঠাৎ তুরার নজর গেল বাড়ির সদর দরজার দিকে, যেখান দিয়ে রৌদ্র খুব ভাব নিয়ে হেঁটে আসছে। রৌদ্রকে দেখামাত্রই তুরার চোখ দুটো ছানাবড়া হয়ে গেল! রৌদ্রের বাম গালে লিপস্টিকের সেই টকটকে লাল চিহ্নটা একদম স্পষ্ট ফুটে আছে, যা তুরা কিছুক্ষণ আগে নিজের অজান্তেই এঁকে দিয়েছিল। রৌদ্রের এমন বেহায়া দশা দেখে তুরা এক হাত কোমরে আর অন্য হাত কপালে ঠেকিয়ে বিড়বিড় করে বলতে লাগল।
“এই লোকটা কি সব লজ্জা শরম একবারে ধুয়েমুছে সাফ করে দিয়েছে? বাড়ি থেকে বের হওয়ার আগে মুখটা কি একবারও আয়নায় দেখে আসতে পারল না?”
তুরার এমন ছটফটানি দেখে আরশি কাছে এগিয়ে ভ্রু কুঁচকে বলল।
“কিরে তুরা? কী হয়েছে? একা একা নিজের সাথে কীসের ঝগড়া করছিস?”
তুরা অপ্রস্তুত হয়ে নিজেকে সামলে নিল এবং আড়চোখে রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বলল।
“না মানে… আসলে কিছু না আপু, এমনি।”
রৌদ্র কাছে আসতেই শিহাবের বাজপাখির মতো তীক্ষ্ণ নজরে রৌদ্রের গালের ওই লাল দাগটা ধরা পড়ল। শিহাব ঠোঁট কামড়ে হাসি চেপে রৌদ্রের দিকে এগিয়ে গেল। রৌদ্রকে এক হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে একটু আড়ালে সরিয়ে নিয়ে ফিসফিস করে শিহাব বলল।
“আরে শালা! দিনদুপুরে এত রোমান্স করিস ভালো কথা, কিন্তু অন্তত আয়নায় একবার নিজের চেহারাটা তো দেখে আসবি। এই ছাপ নিয়ে তো একদম ইন্টারন্যাশনাল হিরো হয়ে গেছিস।”
রৌদ্র কিছুই বুঝতে না পেরে আকাশ থেকে পড়ল। শিহাব রৌদ্রের কাঁধে হাত ভর দিয়ে হাসি চেপে রেখে বলল।
“তোর গালে স্পষ্ট লিপস্টিকের দাগ রে ভাই! মনে হচ্ছে তুরা ভাবি একদম সিলমোহর মেরে তোকে নিজের রিজার্ভ প্রপার্টি বানিয়ে রেখেছে। সবার সামনে মানসম্মান যাওয়ার আগে ওটা জলদি মুছে ফেল।”
শিহাবের কথায় রৌদ্র বাম হাত দিয়ে গালে হালকা ঘষা দিতেই আঙুলে লাল রঙের আভা দেখতে পেল। রৌদ্র তৎক্ষণাৎ তুরার দিকে তাকাতেই দেখল তুরা রাগী চোখে তার দিকে তাকিয়ে আছে। রৌদ্র মোটেও ঘাবড়াল না, বরং সবার সামনেই তুরাকে একটা ‘ফ্লাইং কিস’ দিয়ে পকেট থেকে টিস্যু বের করে গাল মুছে নিল। রৌদ্রের এমন নির্লজ্জ আচরণে তুরা লজ্জায় মাথা নিচু করে ফেলল।
সবাই একে একে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল। শিহাব আরশিকে নিয়ে নিজের গাড়িতে উঠে পড়ল। আনোয়ার খান রৌদ্রের দিকে তাকিয়ে বললেন।
“রৌদ্র, তুই তুরাকে নিয়ে আয়। আর বাকিরা বাড়ির বড় গাড়ি দিয়ে আসুক।”
আনোয়ার খানের কথামতো রৌদ্র তুরাকে নিয়ে নিজের গাড়ির দিকে এগোলো। আনোয়ার খান এবার আয়ানকেও নির্দেশ দিলেন।
“আয়ান, তুইও তিথিকে নিয়ে আয়।”
তিথি আয়ানের সাথে যেতে মোটেও রাজি ছিল না। সে দ্রুত বলে উঠল।
“না না চাচা, আমি তোমাদের সাথেই যাব।”
কিন্তু আয়ান তিথির কোনো ওজর-আপত্তি শুনল না। সবার সামনেই হুট করে তিথিকে কোলে তুলে নিল আয়ান। তিথি অপ্রস্তুত হয়ে হাত-পা ছুড়লেও আয়ান সোজা গিয়ে তিথিকে নিজের গাড়ির সামনের সিটে বসিয়ে ডোর লক করে দিল। তিথি রাগে ফেটে পড়ে কিছু বলতে যাবে, তার আগেই আয়ান ড্রাইভিং সিটে বসে খুব কড়া আর রাগী চোখে তিথির দিকে তাকিয়ে বলল।
“একটা কথা বলে দেখ, তাহলে তোকে এখানেই রেখে চলে যাব।”
আয়ানের ওই তপ্ত চাউনি দেখে তিথি দমে গেল। সে আর কথা বাড়ানোর সাহস পেল না। মুখ গোমড়া করে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইল। আয়ান গাড়ি স্টার্ট দিল।
খান বাড়ির গাড়িগুলো একে একে সারিবদ্ধভাবে শিকদার বাড়ির সদর দরজায় এসে থামল, খান বাড়ির গাড়ি দেখে শিকার বাড়ির চারদিকে যেন আনন্দের হিল্লোল বয়ে গেল। কন্যাপক্ষ সাগ্রহে গেটের সামনে এসে দাঁড়িয়েছে, খান বাড়ির অতিথিদের বরণ করে নেওয়ার ধুম লেগে গেল। বাড়ির ভেতর তখন উৎসবের ব্যস্ততা কেউ আপ্যায়নে মত্ত, কেউবা হাসিগল্পে। কিন্তু এত আনন্দের মাঝেও একজনের মনে বিষাদের ছায়া ঘনিয়ে আছে, আর সে হলো সৃজনী।
কাল বাড়িতে ফেরার পর থেকেই সৃজনী নিজেকে একরকম ঘরবন্দি করে ফেলেছিল। কেঁদে কেঁদে চোখের কোল ফুলিয়ে ফেলেছে। নেহাল বারবার জানতে চেয়েছে, কেন সৃজনী কাউকে কিছু না বলে হঠাৎ কাল চলে এসেছিল, কিন্তু সৃজনী কোনোমতে এড়িয়ে গেছে। সৃজনী আপ্রাণ চেষ্টা করছে সবার সামনে নিজেকে স্বাভাবিক ও হাসিখুশি রাখার, কিন্তু যখনই রৌদ্রের সেই বিবাহিত হওয়ার সত্যটা মনে পড়ছে, বুক ফেটে কান্না আসছে। জীবনে কোনোদিন কাউকে সেভাবে পছন্দ হয়নি সৃজনীর, রৌদ্রই প্রথম যে সৃজনীর মনে ঠাঁই করে নিয়েছে। অথচ সেই মানুষটাই কি না পরকাল থেকে অন্য কারও হয়ে আছে! এটা যেন সৃজনীর কাছে এক দুঃসহ যন্ত্রনা।
সৃজনী তার কাজিনদের সাথে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছে, কিন্তু তার চোখ বারবার চলে যাচ্ছিল সদর দরজার দিকে। হঠাৎ দেখল রৌদ্র আর তুরা পাশাপাশি হেঁটে আসছে। দুজনের পরনে সাদা ম্যাচিং পোশাক, যেন একে অপরের জন্যই তৈরি কোনো এক স্বর্গীয় জুটি। রৌদ্র মাঝেমধ্যে আড়চোখে তুরার দিকে তাকাচ্ছে আর ঠোঁটের কোণে রহস্যময় হাসি খেলছে যা সৃজনীর তীক্ষ্ণ নজরে ধরা পড়ল। দৃশ্যটা দেখা মাত্র সৃজনীর বুকটা যেন হাহাকার করে উঠল, ভেতরটা দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে। তবুও অনেক কষ্টে নিজেকে পাথর করে দাঁড়িয়ে রইল সৃজনী।
ভেতরে আরফাকে লাল বেনারসিতে কনের সাজে ড্রয়িং রুমের সোফায় বসিয়ে রাখা হয়েছে। সবাই নতুন বউয়ের রূপের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। তুরা আরফাকে দেখামাত্রই চঞ্চল পায়ে ছুটে গেল এবং তাকে জড়িয়ে ধরে আহ্লাদে বলল।
“আপু, আমরা এসে পড়েছি।”
আরফা অত্যন্ত খুশি হয়ে তুরাকে পালটা জড়িয়ে ধরল। হাসিমুখে জিজ্ঞেস করল।
“বাড়ির সবাই কই রে?”
“সবাই আসছে আপু, পেছনেই আছে।”
ধীরে ধীরে খান বাড়ির বড়রা থেকে শুরু করে সবাই আরফার সাথে দেখা করল। নেহালও সবার সাথে অত্যন্ত ভদ্রভাবে কুশল বিনিময় করল। হঠাৎ রৌদ্রের পকেটে থাকা ফোনটা বেজে উঠল। স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখল সুইজারল্যান্ড থেকে কল এসেছে। অফিসের জরুরি কল বুঝতে পেরে রৌদ্র কাউকে কিছু না বলে দ্রুত একটু নির্জন জায়গার খোঁজে বাড়ির পেছনের ফাঁকা লনটার দিকে চলে গেল।
সেখানে গিয়ে রৌদ্র বেশ কিছুক্ষণ অফিসের কাজ নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথা বলল। কথা শেষ করে যখনই রৌদ্র ঘুরে দাঁড়াল, দেখল কিছুটা দূরে সৃজনী একা দাঁড়িয়ে আছে। রৌদ্রকে ফিরতে দেখে সৃজনী একটু এগিয়ে এল। রৌদ্র কিছু একটা বলতে যাবে, তার আগেই সৃজনী ঠোঁটের কোণে একটা ম্লান হাসি ফুটিয়ে নরম স্বরে বলল।
“কেমন আছেন?”
রৌদ্রের ঠোঁটের কোণে এক চিলতে অমায়িক হাসি ফুটে উঠল। সৃজনীর চোখের দিকে তাকিয়ে খুব সহজ গলায় সে উত্তর দিল।
“ভালো, তুমি কেমন আছো?”
সৃজনী একটা তপ্ত দীর্ঘশ্বাস ফেলল। উদাস দৃষ্টিতে মাটির দিকে তাকিয়ে বিড়বিড় করে বলল।
“আমি ঠিক কেমন আছি, তা কেবল আমিই জানি। আর কেউ সেটা জানে না, জানবেও না।”
রৌদ্রের কপালে সূক্ষ্ম চিন্তার ভাঁজ পড়ল। সে কিছুটা অবাক হয়ে ভ্রু কুঁচকে তাকাল সৃজনীর দিকে। কৌতুকভরা গলায় জিজ্ঞেস করল।
“কেন? তোমার আবার কী হলো? কোনো সমস্যা হয়েছে নাকি?”
সৃজনী মুহূর্তে নিজেকে সামলে নিয়ে ঠোঁটে একটা ফিকে হাসি টেনে আনল। কণ্ঠস্বর স্বাভাবিক করার আপ্রাণ চেষ্টা করে বলল।
“আরে না না, তেমন কিছু না। যাই হোক, একটা কথা বলি আপনার বউ তুরা কিন্তু বড্ড ভাগ্যবতী!”
রৌদ্রের মুখটা এবার গর্বে আর আদুরে এক হাসিতে উজ্জ্বল হয়ে উঠল। চোখ দুটো চিকচিক করে উঠল ভালোবাসার আবেশে। সে হালকা হেসে জিজ্ঞেস করল।
“হঠাৎ এই কথা আর তুরার সাথে তোমার কথা হয়েছে?।”
রৌদ্র আর সৃজনী এভাবেই টুকটাক কথা চালিয়ে যেতে লাগল। রৌদ্রের প্রতিটি হাসিমুখের কথা আর সহজ ভঙ্গি সৃজনীর মনে অদ্ভুত এক দহন তৈরি করছিল, যা সে হাসি দিয়ে ঢেকে রাখার চেষ্টা করছিল।
এদিকে বাড়ির ভেতরে উৎসবের আমেজ তুঙ্গে। কিন্তু তুরা সবার মাঝে থেকেও হঠাৎ খেয়াল করল রৌদ্র তার আশেপাশে কোথাও নেই। তুরা একটু অবাক হলো এত মানুষের ভিড়ে রৌদ্র তাকে একা রেখে কোথায় যেতে পারে পুরো বাড়ি হন্যে হয়ে খুঁজেও রৌদ্রের দেখা পেল না তুরা। অস্থিরতা নিয়ে সে বাড়ির বাইরে বেরিয়ে এল, কিন্তু সেখানেও রৌদ্র নেই। তুরা যেন আকাশ থেকে পড়ল! রৌদ্র কোনো কথা না বলে হঠাৎ কোথাও চলে গেল।
হাঁটতে হাঁটতে তুরা যখন বাড়ির পেছনের নির্জন লনটার দিকে এগিয়ে এল, তখন আচমকা তার শরীরের রক্ত যেন হিম হয়ে গেল। তুরা পাথরের মতো এক জায়গায় থমকে দাঁড়িয়ে পড়ল।
সামনেই গাছের ছায়ায় ঘেরা একটা নিরিবিলি জায়গায় সৃজনী আর রৌদ্র দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। রৌদ্রের মুখে সেই চেনা সুন্দর হাসি। দূর থেকে দুজনের কথা বলার ভঙ্গি দেখে যে কারো মনে হবে, যেন কোনো প্রেমিক প্রেমিকা সবার আড়ালে নিভৃতে নিজেদের একান্ত মুহূর্ত কাটাচ্ছে।
তুরার বুকের ভেতরটা এক নিমিষে দুমড়েমুড়ড়ে গেল। কালই তো সৃজনী বলেছিল সে রৌদ্রকে খুব ভালো করে চিনে,আর রৌদ্র ও তাকে খুব ভালো করে চিনে৷ আর আজ রৌদ্র সবার আড়ালে এভাবে হাসিমুখে তার সাথে গল্প করছে! তুরার চোখের মণি স্থির হয়ে এল,নিঃশ্বাস নিতে কষ্ট হচ্ছে তার। রৌদ্র কি তবে তাকে ঠকাচ্ছে? যে মানুষটাকে তুরা নিজের অস্তিত্বের চেয়েও বেশি বিশ্বাস করেছিল, সেই কি না আজ অন্য এক মেয়ের সামনে এভাবে মেতে আছে? অভিমানে আর সন্দেহে তুরার পৃথিবীটা যেন মুহূর্তে ওলটপালট হয়ে গেল।
তুরা আর এক মুহূর্ত সেখানে দাঁড়িয়ে থাকার মতো শক্তি পেল না। তার মনে হলো চারপাশের বাতাস ক্রমশ ভারী হয়ে আসছে। সে দ্রুত ঘুরে দাঁড়িয়ে উল্টো পথে হাঁটা দিল এবং প্রায় দৌড়ানোর ভঙ্গিতে বাড়ির ভেতরে চলে এল।
ভেতরে ঢুকতেই সামনে তনুজা খানকে দেখতে পেয়ে তুরা আর নিজেকে সামলাতে পারল না।সে ঝটপট গিয়ে তনুজা খানকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরল। তুরার বুকের ভেতরটা তখন হাহাকারে ফেটে যাচ্ছে। এত মানুষের ভিড়ে সে চিৎকার করে কাঁদতে পারছে না, আবার পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার মতো ধৈর্যও তার অবশিষ্ট নেই। অবাধ্য চোখ দুটো যেন আজ বেইমানি শুরু করেছে তনুজা খানের কাঁধে মাথা রাখতেই ফোঁটা ফোঁটা গরম অশ্রু গড়িয়ে পড়ল।
তনুজা খান তুরার শরীরের কাঁপুনি আর চোখের পানি দেখে অস্থির হয়ে পড়লেন। তিনি দ্রুত তুরার কাঁধ ধরে তাকে নিজের থেকে আলাদা করে সোজা হয়ে দাঁড় করালেন। মেয়ের চোখে পানি দেখে তিনি বিচলিত কণ্ঠে বললেন।
“তুরা! কী হয়েছে তোর? তুই কাঁদছিস কেন? কেউ কি কিছু বলেছে তোকে?”
তুরা বুঝতে পারল এভাবে ভেঙে পড়লে সবাই জেনে যাবে। সে তৎক্ষণাৎ হাতের উল্টো পিঠ দিয়ে চোখের পানি মুছে ফেলল এবং মুখে একটা ম্লান হাসি ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করে স্বাভাবিক গলায় বলল।
“কিছু হয়নি মা,।চোখে বোধহয় ধুলোবালি বা অন্য কিছু পড়েছে, তাই জল আসছে।”
রাত গভীর হয়েছে। আরফা আর নেহালকে নিয়ে এবার খান বাড়িতে ফিরে যাওয়ার পালা। একে একে সবাই গাড়িতে উঠতে শুরু করেছে। সারাটা দিন তুরা এক অদ্ভুত নিস্তব্ধতা পালন করেছে। রৌদ্রের সেই দৃশ্যটা দেখার পর থেকে সে আর কারও সাথে কোনো কথা বলেনি সারাক্ষণ তনুজা খান আর রৌশনি খানের সাথে ছায়ার মতো লেগে ছিল। রৌদ্রও তুরার এই এড়িয়ে চলাটা খেয়াল করেছে, কিন্তু বড়দের সাথে থাকায় সেভাবে কাছে গিয়ে ডাকার সুযোগ পায়নি।
এদিকে তিথি একা একা ফোনে ছবি তুলতে তুলতে বাড়ির বাইরে খোলা জায়গায় এল। হঠাৎ এক যুবক এগিয়ে এসে তিথির পাশে দাঁড়াল। ছেলেটা বেশ পরিপাটি, মুখে অমায়িক হাসি। সে তিথিকে লক্ষ্য করে বলল।
“হাই! আমি সাজ্জাদ, নেহাল ব্রোর মামাতো ভাই। তুমি নিশ্চয়ই আরফা ভাবির বোন হও?”
তিথি সৌজন্যমূলক একটা হাসি দিয়ে বলল।
“জ্বি, আমি তার চাচাতো বোন। অর্থাৎ ভা…”
তিথি কথাটার বাকিটুকু আর শেষ করল না। সাজ্জাদ মুগ্ধ দৃষ্টিতে তিথিকে পর্যবেক্ষণ করে বলল।
“তুমি করে বলে ফেললাম, কিছু মনে করো না। তোমাকে এই নীল শাড়িতে কিন্তু অনেক সুন্দর লাগছে!”
তিথি কিছুটা লজ্জিত হয়ে হাসল। নিচু স্বরে বলল।
“ধন্যবাদ।”
সাজ্জাদ এবার একটু ইতস্তত করে মাথা চুলকিয়ে জিজ্ঞেস করল।
“ইয়ে মানে… আসলে তোমার নামটা কি জানতে পারি?”
তিথি নামটা বলার জন্য মুখ খোলার উপক্রম করতেই পেছন থেকে এক গম্ভীর আর ভারী কণ্ঠস্বর ভেসে এল।
“মিসেস তিথি খান!”
তিথি আর সাজ্জাদ দুজনেই চমকে পেছনে ফিরে তাকাল। দেখল আয়ান দাঁড়িয়ে আছে, তার চোখেমুখে আগ্নেয়গিরির মতো রাগ। আয়ান স্থির পায়ে এগিয়ে এসে কোনো কথা না বলে তিথিকে এক ঝটকায় নিজের দিকে টেনে আনল এবং এক হাত দিয়ে শক্ত করে তার কোমর জড়িয়ে ধরল। সাজ্জাদের দিকে তীক্ষ্ণ চোখে তাকিয়ে আয়ান ঘোষণা করল।
“ও মিসেস আয়ান খান।”
তিথি আয়ানের এই আকস্মিক আচরণে হতভম্ব হয়ে গেল। সে সাজ্জাদের সামনে লজ্জা পেয়ে আয়ানের হাত থেকে ছাড়া পাওয়ার জন্য ধস্তাধস্তি শুরু করল। কিন্তু আয়ান এক চুলও নড়ল না, বরং হাতের বাঁধন আরও শক্ত করে চেপে ধরল।
সাজ্জাদ কিছু না বুঝে বিভ্রান্ত হয়ে বলল।
“জ্বি? আসলে আপনার কথা ঠিক বুঝতে পারছি না।”
আয়ান একবার ছটফট করতে থাকা তিথির দিকে তাকাল, পরক্ষণেই সাজ্জাদের চোখের ওপর চোখ রেখে খুব স্পষ্ট স্বরে বলল।
“মিসেস তিথি খান বুঝো না? ও বিবাহিত। শী ইজ মাই ওয়াইফ! এবার রাস্তা ছাড়ো।”
আয়ানের এই বিস্ফোরক দাবিতে তিথির নড়াচড়া থেমে গেল। সাজ্জাদ অপ্রস্তুত হয়ে অপরাধীর মতো সেখান থেকে সরে দাঁড়াল। আয়ান রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে তিথিকে প্রায় টেনেই গাড়ির দিকে নিয়ে যেতে লাগল।
তিথি আয়ানের শক্ত বাঁধন থেকে মুক্তি পাওয়ার জন্য আপ্রাণ ছটফট করতে করতে আর্তনাদ করে উঠল।
“আয়ান ছাড়ো আমায়! সমস্যা কী তোমার? আমার জীবন নিয়ে কেন তুমি এত টানাটানি করছো? ছাড়ো বলছি? বিরক্তিকর আর ভালো লাগে না।”
আয়ান কোনো কথা না শুনে তিথিকে টেনে হিঁচড়ে গাড়ির কাছে নিয়ে এল। অধিকাংশ অতিথিই চলে গেছে, আর বাকিরা বাড়ির ভেতরে ব্যস্ত। ফাঁকা রাস্তায় তখন শুধু তাদের দুজনের উত্তপ্ত নিঃশ্বাসের শব্দ। আয়ান তিথিকে গাড়ির বডির সাথে সজোরে চেপে ধরে দাঁতে দাঁত চেপে বলল।
“কী করেছি আমি? তুই আমার ওয়াইফ, সেই পরিচয়টাই তো ওই ছেলের কাছে দিয়েছি। এতে তোর এত লাগে কেন? বুঝতে পারিস না তুই কার?”
তিথির শরীরের ভেতরটা তখন রাগে জ্বলছিল। আয়ান তাকে কী ভেবেছে? যখন যা ইচ্ছে করবে আর সে পুতুলের মতো তা মেনে নেবে? তিথি এবার নিজের গায়ের সবটুকু শক্তি এক করে এক ঝটকায় আয়ানকে সরিয়ে দিল। আয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই তিথি ডান হাত উঁচিয়ে আয়ানের গালে ‘ঠাস’ করে এক থাপ্পড় বসিয়ে দিল। রাগে কাঁপতে কাঁপতে তিথি চিৎকার করে উঠল।
“এত বেহায়া পুরুষ কেন তুমি? আমি তোমাকে ঘৃণা করি আয়ান, ঘৃণা করি! এই সহজ কথাটা কি তোমার মাথায় ঢোকে না? তবুও কেন আমার জীবন নিয়ে এভাবে ছিনিমিনি খেলছো?”
আয়ান মুহূর্তেই পাথর হয়ে গেল। গালের জ্বলুনিটা ছাপিয়ে তার মনের ভেতরটা যেন ওলটপালট হয়ে গেল। তিথি তাকে থাপ্পড় মারবে, তা সে স্বপ্নেও কল্পনা করেনি। আয়ান স্থির চোখে তিথির দিকে তাকিয়ে খুব নিচু কিন্তু ভাঙা গলায় বলল।
“তিথি, তুই আমাকে মেরেছিস? আমি কিছু মনে করিনি, কিন্তু তুই তুই এমন কেন করছিস? আমি তো শুধু তোকে চাই তিথি, কেন আমায় বুঝতে পারছিস না?”
তিথি এবার যেন আরও বেশি ফুঁসে উঠল। সে ঝাপট দিয়ে বলল।
“আমি বুঝতে চাই না তোমাকে! জাস্ট ঘৃণা লাগে তোমাকে দেখলে।”
কথাটা বলেই তিথি আঙুল উঁচিয়ে আয়ানের চোখের ওপর চোখ রেখে চরম চূড়ান্ত কথাটি বলে দিল।
“শোনো আয়ান, আমি মুক্তি চাই! আমি তোমার সাথে থাকতে চাই না। দয়া করে আমাকে জাস্ট মুক্তি দাও তুমি!”
তিথির গলার শেষ কথাটুকু চিৎকারে রূপ নিয়ে নিস্তব্ধ রাস্তায় প্রতিধ্বনি তুলল। আয়ানের কলিজায় কেউ যেন বিষাক্ত তীর ছুড়ে মারল। আয়ান আবারো এক ঝটকায় তিথিকে গাড়ির সাথে চেপে ধরল। তার চোখ দুটো রক্তবর্ণ হয়ে উঠেছে, কণ্ঠস্বর কাঁপছে অভিমানে আর প্রচণ্ড ক্ষোভে। সে কাঁপা কাঁপা গলায় বলল।
“কী… কী বললি তুই?”
তিথি দমে না গিয়ে আয়ানের চোখের দিকে তাকিয়ে অবিচল গলায় বলল।
“মুক্তি চাই তোমার কাছ থেকে! শুনতে পাও না? নাকি বেহায়া পুরুষের মতো জোর করেই আমার ওপর অধিকার খাটাবে? শোনো আয়ান, একটা সম্পর্কে দুজনের মন থাকতে হয়। কিন্তু আমার মন নেই তোমার ওপর,তোমাকে যাস্ট আমার বিরক্ত লাগে ঘৃনা লাগে। আমি তোমার সাথে থাকতে চাই না। প্লিজ তুমি আমাকে মুক্তি দাও আমাকে আমার মতো করে বাঁচতে দাও প্লিজ।”
আয়ান স্থির চোখে তিথির দিকে তাকিয়ে রইল। তার বুকের ভেতরটা যেন দুমড়েমুচড়ে যাচ্ছে, আজ প্রথম সে হাড়ভাঙা যন্ত্রণায় বুঝতে পারল প্রিয় মানুষের দেওয়া আঘাত পৃথিবীর সবচাইতে বিষাক্ত আঘাত। আয়ানের দম বন্ধ হয়ে আসছে, চারপাশের বাতাস যেন ফুরিয়ে গেছে। হঠাৎ আয়ানের শক্ত দুচোখ ছাপিয়ে ফোঁটা ফোঁটা অশ্রু গড়িয়ে পড়ল। একটা পুরুষ ঠিক কতটা অপমান আর আঘাত পেলে এভাবে সবার অলক্ষ্যে ভেঙে পড়ে, তা আজ আয়ানের চোখের লোনা জলেই স্পষ্ট।
মুহূর্তে আয়ান তিথির গাল দুটো শক্ত করে চেপে ধরল। তার কণ্ঠস্বর কাঁপছে, কিন্তু দৃষ্টিতে এক বুক অভিমান। সে অস্ফুট স্বরে বলল।
“আমি তো বেশি কিছু চাইনি রে তিথি, শুধু তোকে চেয়েছি। আমার এই সব পাগলামি কেন জানিস? শুধু তোকে নিজের করে পাওয়ার জন্য। আমার এই রাগ, এই শাসন সবই ছিল তোকে সারাজীবন আকড়ে রাখার জন্য, যাতে তুই অন্য কোথাও চলে না যাস। কিন্তু আমি জানতাম না,আমার এই ভালোবাসা এই পাগলমি তোর কাছে শেষমেশ বিরক্তির কারণ হয়ে দাঁড়াবে।”
তিথি মুহূর্তের জন্য থমকে গেল। আয়ানকে সে চেনে এক জেদি আর রাগী পুরুষ হিসেবে,যে সবসময় নিজের আধিপত্য বজায় রাখে। সেই আয়ান আজ তার সামনে কাঁদছে! আয়ানের চোখের ওই জল তিথির বুকটাকে যেন একটু হলেও নাড়িয়ে দিল। কিন্তু তিথি কিছু বলার সুযোগ পাওয়ার আগেই আয়ানের কণ্ঠস্বর এক তীব্র হাহাকারে ফেটে পড়ল, অথচ সেই স্বরে মিশে রইল পাহাড়সম কঠিনতা। সে বলে উঠল।
“পুরুষ সবসময় বেহায়া হয় না তিথি। তাদেরও একটা হৃদয় আছে, তাদের বুকেও চাবুকের মতো আঘাত লাগে। নিস্তব্ধতায় সেখানেও ব্যথা জমে পাহাড় হয়। আর সেই ব্যথাগুলো তোদের মতো কিছু নারীর বোঝার ক্ষমতা থাকে নাহ। আর কী বললি তুই? মুক্তি চাস তাই তো?”
কথাটা বলেই আয়ান তিথিকে সজোরে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিল এবং চিৎকার করে আকাশ-বাতাস কাঁপিয়ে বলল।
“যাহহহহহহহহ! দিলাম তোকে মুক্তিইইইই!”
কথাটা বলেই আয়ান হাতের উল্টো পিঠে চোখের পানি মুছে এক ঝটকায় গাড়িতে উঠে পড়ল। পরক্ষণেই ইঞ্জিনের গর্জন তুলে ফুল স্পিডে গাড়ি চালিয়ে সে রাস্তার নিকষ কালো অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।তিথি স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল জনশূন্য রাস্তার মাঝখানে। তার চারপাশটা হঠাৎ করেই খুব শান্ত হয়ে গেছে, কিন্তু মনের ভেতরটা কেন জানি এখন আর আগের মতো হালকা লাগছে না। মুক্তি তো সে পেল, কিন্তু এই মুক্তির স্বাদ কেন এতটা নোনা।
রানিং…!
Share On:
TAGS: নির্লজ্জ ভালোবাসা, সুমি চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২৫
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১৯
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৩৩
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫৭
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৪৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৫০
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ৬
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ২
-
নির্লজ্জ ভালোবাসা পর্ব ১০