নবরূপা
পর্ব_৩
কলমেঅনামিকাতাহসিন_রোজা
মেয়েরা কি জন্মগত ঢঙ্গি, নাকি জন্মের পর নিজেকে বাড়ির ছোট মেয়ে দেখে ও এত আদর পেয়ে ঢঙ্গি হয়, তা ভেবে পায়না ইরফান কবির। পৃথিবীতে যেমন এখনো অনেক জিনিসের রহস্য বিজ্ঞানীরা খুঁজে পায়নি, তেমনই তারা এ-ও খুঁজে পায়নি কেনো বড় ভাইদের জ্বালাতে ছোট বোনেরা এত পছন্দ করে, আর কেনোই বা ছোট বোন রা বড় ভাইদের দু চোখে সহ্য করতে পারে না। অথচ প্রয়োজনে গলায় ঝুলে পড়ে ‘ভাইয়া ভাইয়া’ বলে মুখে ফ্যানা তোলার বিশেষ দক্ষতা রয়েছে তাদের। এর জলজ্যান্ত প্রমাণ হলো ইরফান কবির ও তার ছোট বোন ইয়াশা কবির।
শীতের সকালে সূর্য নিজের সোনালী আবছা আলো ছড়ানোর পূর্বেই ইনায়া উঠে পড়ে, তামান্না এসে ঘুমন্ত ইরফানকে এক পলক দেখে তার পাশ থেকে ইনায়া কে নিয়ে বেরিয়ে পড়ে ঘর থেকে। প্রথমে ভেবেছিল ইরফান কে ডেকে দেবে। পরে থামলো, আজ শনিবার, একটু ঘুমিয়ে নিক। এমনিতেও তেমন কোনো কাজ নেই। ছুটির দিনগুলোতে একটু দেরি করেই ঘুম থেকে উঠে ইরফান। আর, সেই হিসেবে রাত জাগে।
ইনায়া কে ফ্রেশ করে খাওয়ানোর উদ্দেশ্যে তামান্না তাকে নিয়ে যাওয়ার সাথে সাথে ইরফানের ঘরের দরজার সামনে হেলেদুলে এসে দাঁড়ালো ইয়াশা। স্বভাবগত ভাবে সে মোটেই চঞ্চল নয়, বরং বাইরের যে কেও তাকে দেখে খুব ভদ্র ও শান্ত মেয়ে বলে প্রশংসা করে। এমনকি সে সত্যিই অনেক ম্যচিইউর্ড একটা মেয়ে বটে।
কিন্তু কোনো কারন ছাড়াই, কেনো যেন বাড়িতে ইয়াশার মাথায় জ্বীন চেপে বসে। নইলে কেনোই বা সে ঘুমন্ত ইরফানের দিকে চোখ সরু করে তাকিয়ে ফট করে এসে কম্বল টান মেরে ফেলে দেবে। রীতিমতো ঘুমের ঘোরে ভ্রুজোড়া কুঁচকে নিলো ইরফান। সে বেশ ভালোই জানে ঘরে কার আগমন ঘটেছে। ঘুমন্ত গলাতেই চোখ বুঁজে সে ধমক দিলো ইয়াশাকে,
—” ইয়াশার বাচ্চা, ট্রাকচাপা দিয়ে চ্যাপ্টা করে দেব বেয়াদব। সকাল সকাল মেজাজ খারাপ করাবি না। দূর হ। ঘুমাতে দে।”
ইয়াশা শুনলো না বড় ভাইয়ের কথা। দমলো না। বরং আরো খেপে গিয়ে এবারে ইরফানের মাথা দেয়া বালিশটাও টেনে ফেলে দিলো। এ পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে ঘুমুঘুমু চোখে তাকালো ইরফান। সকাল সকাল ইয়াশা কে সাজগোছ করে থাকতে দেখে অবুঝের ন্যায় রইলো।
কথায় বলে, মেয়েরা নাকি বাবার মত হয়। অথচ কেনো যেন ইয়াশার ক্ষেত্রে অন্যটা হয়েছে। তার ফুফু অত্যন্ত সুন্দরী মহিলা ছিলেন। বলতে গেলে, রূপের আগুনে ঝলসে যেন চারপাশ। ঠিক তেমনই সৌন্দর্যের অধিকারী হয়েছে ইয়াশা। এমনকি ফুফুর মত হালকা বাদামী রঙা চোখও পেয়েছে। মাঝে মাঝে অবশ্য ‘বিড়াল চোখী’ বলে সবাই ক্ষেপায় তাকে।
কিন্তু সত্যি বলতে, ছোট বোনটাকে ইরফান অনেক ভালোবাসে। তাই কম্বল বালিশ টেনে নেয়ায় সে একটা বড়সড় ধমক দেয়ার জন্য প্রস্তুতি নিলেও ছোটবোনের মলিন মুখ দেখে দমে গেলো। আরেকটু মনোযোগ দিতেই দেখলো, হালকা গোলাপি রঙের টু’পিস ও সাদা ওড়না গলায় জড়িয়ে দুহাত কোঁমড়ে গুঁজে দাঁড়িয়ে রয়েছে বিচ্ছুটা। চুল কোঁমড় পর্যন্ত হওয়ায় বিশাল একটা খোপাও লক্ষ্য করা যায়। যদিও ইরফান জানে, বাড়ির বাইরে পা রাখলেই এই খোপা খুলে চুল নিয়ে হাজারো রঙঢঙ করবে তার একমাত্র বোন।
ইরফান এবারে ধীরেসুস্থে উঠে বসলো। ভ্রু কুঁচকে জিজ্ঞেস করলো,
—” কী হয়েছে?”
রাগান্বিত কন্ঠ ইয়াশার,
—” তুমি কালকে হবু ভাবি পছন্দ করে এসেছো?”
বিরক্ত হলো ইরফান,
—” সকাল সকাল এসব প্রশ্ন করার জন্য আমার সাধের ঘুমটা নষ্ট করলি? কাছে আয় তো, একটা কষে থাপ্পড় মারি।”
ইয়াশা ঝটকা মেরে বসে পড়লো ইরফানের বিছানায়। এবারে নিজেই ইরফানের বুকে ধাক্কা মেরে রাগান্বিত গলায় বলল,
—” আমি তোমার সাথে কথা বলব না ভাইয়া। তুমি আমায় কোচিং এ যেতে বলে লুকিয়ে ভাবি পছন্দ করে এলে। আমি কতবার বলেছিলাম যে আমাকে নিয়ে যেও। অথচ তুমি আমার সাথে প্রতারণা করল। এটা তুমি ঠিক করোনি ভাইয়া।”
ইরফান এবারে ক্লান্ত ভঙ্গিতে বলল,
—” তোকে বললে তুই তো কোচিংটা মিস দিতি।”
—” হ্যাঁ অবশ্যই দিতাম। তো?”
—” এই জন্যই বলি নি।”
ইয়াশা ছলছল নয়নে তাকালো নিজের ভাইয়ের দিকে। এমনি অবশ্য মেয়েটা অনেক শক্ত, খুব সহজে কাঁদে না। এমন কি কোনো কিছুর জন্য জেদ ধরে রাগারাগি করে, কিন্তু কখনো কাঁদে না। তবে কেনো যেন ইরফানের ক্ষেত্রে একটুতেই কেঁদে ফেলে মেয়েটা। বড্ড দুর্বল বড় ভাইয়ের সামনে। বেচারা ইরফান এবার হার মানল। সেও তো ছোট বোনের চোখের পানি সহ্য করতে পারেনা। সে এবারে নিস্তেজ গলায় বলল,
—” আচ্ছা ঠিক আছে, সরি। এখন কী করতে হবে সেটা বল। এভাবে সকাল-সকাল সাজগোজ করে বসে আছিস কেনো?”
গিরগিটিও হয়তোবা এত তাড়াতাড়ি রূপ পাল্টায় না, যেভাবে ইয়াশা নিজের চোখের পানি মুছে খুশিতে গদগদ হয়ে বত্রিশ পাটি দাঁত বের করে হেসে ফেলল। খুশিতে আনন্দে লাফিয়ে উঠে বললো,
—” তেমন কিছু না। তুমি যেহেতু আমাকে কালকে নিয়ে যাওনি, সেই হিসেবে তোমাকে আজকে একটা শাস্তি দেব। সেই শাস্তিটা হলো আমার সাথে এখন শপিং মলে যেতে হবে।”
ইরফান জানতো এমন কিছুই হবে। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
—” কার্ড দিয়ে দেব। যা খুশি কিনে নিস। আমি যেতে পারব না।”
ইয়াশা আবারো হাসি নিভিয়ে ফেলল। ইরফান বিরক্তি নিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—” আমাকে কেনো যেতে হবে আশ্চর্য!”
—” কারন তোমাকে দরকার। আমি তোমার সাথেই যেতে চাই, প্লিজ ভাইয়া। প্লিজ প্লিজ!”
বলতে বলতে ইরফানের বাহু জড়িয়ে ধরলো ইয়াশা। আর না করতে পারলো না ইরফান। তবে ভ্রু কুঁচকে কিছু একটা ভাবলো। মনে করে দেখলো শপিং মলে তারও কাজ আছে। গেলে মন্দ হবে না।
“নীহারিকা ইসলাম” গত বছরেই জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়াশোনা শেষ করে বের হয়েছে। বিসিএস ক্যাডার হওয়ার ইচ্ছে ছিল তার। ইচ্ছে ছিল নিজের পায়ে দাঁড়ানোর। কিন্তু ভার্সিটি থেকে বেরোনোর পরপরই তাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য তার পরিবারের এই তোরজোড় দেখে মনে মনে বড্ড অভিমান করে বসলো মেয়েটা। আর বলতে পারল না তার ইচ্ছেটা, প্রকাশ করতে পারল না তার আকাঙ্ক্ষা। সবকিছু মাটি চাপা দিয়ে একের পর এক পাত্রের সামনে হাজির হতে থাকলো। মুখে না বললেও সে বুঝতে পারলো, তার বাবা-মা তাকে এখন বোঝা মনে করছে। জানে না কেন! শুধু কি গায়ের রংয়ের জন্যই, নাকি অন্য কোন কারণে কিছুই জানে না সে। কিন্তু এটা বুঝে যে তাকে যত তাড়াতাড়ি বাড়ি থেকে বের করে দিতে পারবে, একটা সংসারে তাকে ঢোকাতে পারবে, ততই ভালো। বিয়ের কথা পাকা হওয়ার পর থেকে তার বাবা মায়ের যে সস্থির শ্বাসটা নীহারিকা দেখেছে, সেটা আজ পর্যন্ত সে কখনো দেখেনি। তাই নিজের ভাগ্যের প্রতি পরিহাস করে হেসে সে আর কোন কিছুই ব্যক্ত করেনি। জীবনের স্রোতে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। আর কোন ইচ্ছে নেই তার। ইচ্ছে না থাকলে কোনো কিছুই হয় না। মনের সব ইচ্ছে মরে গিয়েছে।
রেবেকা বানুর বয়স হয়েছে। নাঈমুল ইসলাম এর থেকেও তার বয়স যেনো বেশি তাড়াতাড়ি বেড়েছে। নইলে কেনই বা এত তাড়াতাড়ি তিনি অসুস্থ হয়ে শয্যাশায়ী হওয়ার উপক্রম হবেন। ভদ্রমহিলার প্রায় প্রতিদিনই কোমড় ব্যথা থাকে, কাজ করতে পারেনা। নিলয় বাড়ির বড় ছেলে। সে তো চাইলেও সব কিছু করতে পারেনা, যেসব একজন গিন্নি করে। সে হিসেবে নীহারিকাকে বাড়ির মেয়ে হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে সব কাজ করতে হয়। এতে তার মোটেই বিরক্ত লাগে না, ভালোই লাগে। নিলয় বর্তমানে একটা কোম্পানিতে জব করছে, বেশ ভালো স্যালারি। পরিবার চালানোর সামর্থ্য হয়েছে। শুধুমাত্র তার জন্যই নিলয়ের বিয়েটাও আটকে রয়েছে। তার বিয়ে হওয়ার কয়েক মাসের মধ্যেই মনে হয় নিলয়ের বিয়েটাও হয়ে যাবে। তখন পরিপূর্ণ হবে পরিবার। সবাই কি তখন খুশি থাকবে? বাবা-মা কি স্বস্তির শ্বাস ফেলবে? সব অশান্তি কি তখন দূর হয়ে যাবে?— এসব ভাবতে ভাবতেই ফার্মগেটে এসে পৌঁছালো নীহারিকা। বাস থেকে নেমে দাঁড়িয়ে রইল ব্রিজের অপর পাশে।
নীহারিকা নিজের কাঁধের ব্যাগ থেকে ফোনটা বের করল। স্ক্রিনে নিজের মুখটা দেখার চেষ্টা করল, বারবার চুল ঠিক করল। ওড়না ঠিক করল। আজ সে প্রথমবারের মতো বড্ড সাহস করে লাল রংয়ের সালোয়ার কামিজ পড়েছে। বহুত শুনেছে সে, চাপা গায়ের রঙে নাকি লাল রঙের কাপড় মানায় না। তাই বরাবরের এই রঙা কাপড় পড়তে ভয় পায় সে, অস্বস্তি লাগে। আজ কোন এক দুর্ভাগ্যের ফলে তার অফ হোয়াইট কামিজটা পড়তে গিয়ে ছিঁড়ে গিয়েছে। এমনভাবে ছিঁড়েছে যে সেটা সেলাই করতে অনেক সময় লেগে যাবে।
তাই সবশেষে এই লাল রঙের সালোয়ার কামিজ পড়ে আসতে হয়েছে নীহারিকা কে। এমনকি আজ একটু ভিন্ন রূপও নিয়েছে। ক্লিপ দিয়ে চুল বেঁধে রেখেছে মাথার পেছনে, চোখে হালকা কাজল ছাড়া কোনো প্রসাধনী নেই, ঠোঁটে হালকা একটু লিপবাম দিয়েছে, বাম হাতে রয়েছে ঘড়ি। কানে ছোট্ট একজোড়া মানানসই দুল। একটু উঁচু হিল জুতো। ব্যাস! এটুকুই তার সাজ। তবুও যেন তার কাছে খুব বেশি মনে হয়। আসলে, আজ ইচ্ছে করেই একটু পরিপাটি হয়ে এসেছে সে। ইচ্ছে করেই একটু প্র্যাকটিস করছে পরিপাটি হয়ে চলাফেরা করার। নিজেকে সুন্দর দেখানোর জন্য, মার্জিত দেখানোর জন্য চেষ্টা করছে। কয়েকদিন পর বিয়ে হবে, তখন তো এটাসেটা করে বা অগোছালো হয়ে চলাফেরা করা যাবে না। তাই এখন থেকে নিজেকে প্রস্তুত করছে নীহারিকা।
কিছুক্ষণ পরেই রীতিমতো ছুটে এসে নীহারিকার কাঁধে হাত রেখে দাঁড়ালো একটা মেয়ে। উজ্জ্বল বর্ণের মেয়েটা হাঁপাতে হাঁপাতে বলল,
—” সরি রে, দেরি হয়ে গেছে।”
মেয়েটার নাম জ্যোতি। নীহারিকার একমাত্র বেস্ট ফ্রেন্ড। হাইস্কুল লাইফ থেকেই তাদের ফ্রেন্ডশিপ। কাল জ্যোতির বয়ফ্রেন্ড রাদের জন্মদিন। তাই সে বেশ জোর করেই নীহারিকা কে রাজি করিয়েছে রাদের জন্মদিন উপলক্ষ্যে তার জন্য শপিং করতে যাওয়ার জন্য। নীহারিকার প্রথমে ইচ্ছে করছিল না সকাল সকাল বের হতে। কিন্তু জ্যোতি তো নাছোড়বান্দা। ইমোশনাল ব্ল্যাকমেইল করে হলেও নীহারিকাকে আনবে সে।
মিরপুর থেকে মেট্রোরেলে ফার্মগেটে নেমে রীতিমতো ছুটে এসেছে জ্যোতি। তাই অনেকক্ষণ ধরে হাঁপালো সে। এরপরে হুট করে নীহারিকার দিকে তাকাতেই যেন হাজার ভোল্টেজের শক খেলো। রসগোল্লার মত চোখ দুটো বড় বড় করে দুই গালে হাত দিয়ে বলল,
—” হায় হায়! এ আমি কাকে দেখছি?
হোয়ার ইজ মাই বেস্টি? কাহা গ্যায়া উও কু”ত্তি?
আর, কে তুমি সুন্দরী?
তুমি কি মেয়ে, নাকি আকাশের কোনো লাল পরী?”
নীহারিকা চোখ সরু করে তাকালো,
—” অপমান করছিস, নাকি প্রশংসা করছিস?”
জ্যোতি এবারে সিরিয়াস হয়ে উঠল যেন। দুহাত বুকে গুঁজে বলে উঠলো,
—” সাহস থাকলে কথাটা আরেকবার বল তো।”
নীহারিকা নিজেও জানে, অন্তত জ্যোতি তাকে কখনো অপমান করে না। গায়ের রং তো দূরে থাক, কখনো তার খুঁতগুলো নিয়েও কোনো কথা বলে না। এজন্যই তো তারা হাই স্কুল থেকে বেস্ট ফ্রেন্ডস। তাই জ্যোতির কথাটায় সে এবারে অপ্রস্তুত হলো। ঘাবগে গিয়ে কোনো মতে জ্যোতির দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করল,
—’ আমাকে ঠিক লাগছে? খুব বেশি বিশ্রী দেখাচ্ছে না তো? “
জ্যোতি আশে পাশে তাকিয়ে সতর্ক হয়ে নিলো। নীহারিকার কানের কাছে এসে ফিসফিস করে বলল,
—” আমি ছেলে হলে তোকে নিয়ে এখনই কাজী অফিসে চলে যেতাম। তোরে হেব্বি লাগছে দেখতে মামা। তোরে দেখে আমি ক্রাশ খাইলাম।”
নীহারিকা ফিক করে হেসে ফেলল। জ্যোতি মেয়ে টাই এমন। বড্ড চঞ্চল, প্রাণবন্ত। তবে মনটা স্বচ্ছ, কাঁচের মত। আধুনিক যুগের সাথে তাল মিলিয়ে চললেও কেনো যেন নীহারিকার মত সাধারন মেয়েটাই তার বন্ধু। জ্যোতি এগিয়ে এসে নীহারিকার ওড়না আরো ভালো করে ঠিক করে দিলো৷ চুলের ক্লিপ টা খুলে দিলো। ঘন রেশমি কালো চুলগুলো ছড়িয়ে গেলো।এরপর বলল,
—” হ্যাঁ, এবার পারফেক্ট। তোকে আমি আগেই বলেছিলাম তোকে রেড ড্রেসে অনেক সুন্দর লাগবে। তুই তো কথাই শুনিস নি। দেখ তো এখন। কে বলেছে খারাপ লাগছে, কত সুন্দর লাগছে দেখতে। কারো নজর না পড়ুক!”
নীহারিকা ফিক করে হেসে ফেলল। ওর মাথায় গাট্টা মেরে বলল,
—” হয়েছে তোর চাপাবাজি? এবার চল তাড়াতাড়ি। কোথায় যাবি বল।”
জ্যোতি ঠোঁট বাঁকিয়ে ভাবলো কিছুক্ষণ। প্রথমে ভাবলো ভ্যাবলাকান্ত বয়ফ্রেন্ড টাকে ফুটপাত থেকে কাপড়চোপড় কিনে দিলেই হয়তো হবে। পরে ভাবলো, না থাক, বেচারা যেমনই হোক, তার বয়ফ্রেন্ড তো। লেভেল টা রাখাই ভালো। তাই জ্যোতি নীহারিকার হাত ধরে আনন্দ সিনেমা হলের সামনে গেলো। সেখানে একটা রিকশা ডেকে নিয়ে বলল,
—”মামা, বসুন্ধরা যাবেন?”
নীহারিকা আরো চোখ বড় করে তাকালো জ্যোতির দিকে। কিন্তু, এরমধ্যে জ্যোতি তাকে নিয়ে রিকশায় উঠেও বসলো। রিকশা চলতে শুরু করলে নীহারিকা মুখ কুঁচকে বলে উঠলো,
—” বসুন্ধরা যাবি, তা তুই আমাকে আগে বলবি না? তাহলে আমি আরেকটু ভালো করে আসতাম। এসব কাপড়চোপড় করে ওখানে যাওয়া যায়?”
জ্যোতি ভ্রু কুঁচকে বলল,
—’ কেনো যাওয়া যাবে না দোস্ত। ঠিকই তো আছে। ঝাক্কাস লাগছে তোকে ট্রাস্ট মি। যে কেও তুলেও নিয়ে যেতে পারে। এমন হলে আবার তোর হবু বর তো ভীষণ কষ্ট পাবে।”
নীহারিকা প্রথমে একটু থমকালো। ইরফান কবিরের কথা মনে পড়লো। পরমুহূর্তেই জ্যোতিকে মুখ ভেঙচিয়ে বলল,
—” কচু কষ্ট পাবে। যতসব আজেবাজে কথা!”
জ্যোতি ফিক করে হাসলো। কিন্তু পরমুহূর্তেই কিছু একটা মনে পড়লো তার। তড়িঘড়ি করে নীহারিকার দিকে ঘুরে বসে বলল,
—” এই ছেমড়ি, তোর হবু বরের ছবি কই দেখালি? আমায় দেখাবি না?”
নীহারিকা চমকে গেলো। এরপর বলল,
—” উনার ছবি আমি কোথায় পাব? নেই তো।”
চোখ সরু করলো জ্যোতি। চোখ দিয়ে ভস্ম করতে চাইলো নীহারিকা কে। ঠোঁটে শয়তানি হাসি লেপ্টে নিয়ে টেনে টেনে বলল,
—” সত্যি ছবি নেই, নাকি আমায় না দেখানোর পায়তারা করছিস হুম? দেখ দোস্ত, হবু দুলাভাই আমার বড় ভাইয়ের মত। আমি মোটেই নজর দেব না। তুই টেনশন করিস না। শুধু হালকার উপর ঝাপসা করে একটু ক্রাশ খেতে পারি। দ্যাটস ইট। নে, এবার দেখা তো। ফোন বের কর, ছবি দেখা।”
নীহারিকার অবস্থা এখন ছেড়ে দে মা কেঁদে বাঁচি। জ্যোতির জোরজবরদস্তির সাথে না পেরে সে অবশেষে ফোন বের করে গ্যালারিতে ঢুকলো। সাথে সাথেই জ্যোতি হাত থেকে ফোন ছিনিয়ে নিলো। আর নিজেই খুঁজে নিলো ইরফান কবিরের ছবি। নীহারিকার ফোনে আজ পর্যন্ত তার বাবা-ভাই বাদে কোনো ছেলের ছবি ছিল না, তাই হবু বরের ছবি বের করাটা অসাধ্য কিছু না। নীহারিকা লজ্জায় মুখ ঢাকার জায়গা খুঁজলো। সত্যি বলতে সে নিজেও এখনো দেখে নি ছবিটা ঠিক করে। কালকে রেবেকা বানু নাঈমুল ইসলামের ফোন থেকে হোয়াটসঅ্যাপে ছবিটা দিয়েছে নীহারিকা কে। কিন্তু নীহারিকা শুধু একবার সিন করেই রেখে দিয়েছে, আর গ্যালারিতে অটোমেটিক সেভ হয়ে রয়েছে। দ্বিতীয়বার আর দেখে নি এখনো। কেনো যেন লজ্জা লাগছিল ভীষণ। লোকটা ছবিতেও অনেক আকর্ষণীয়। সেই ছবিতে থাকা চোখগুলো সিংহের ন্যয়, তবুও তাকে টানছিল, তাই সেই চোখের দিকে তাকানোর আর সাহস হয়নি তার।
জ্যোতি রীতিমতো অবাক হয়ে তাকিয়ে রইলো ছবিটার দিকে। সাদা শার্ট পরিহিত লোকটার ছবিটা দেখেই যে কেও প্রেমে পড়ে যেতে বাধ্য। কে বলবে এই লোক এক বাচ্চার বাপ? জ্যোতি কিছুক্ষণ হা করে তাকিয়ে থেকে স্তব্ধ নয়নে সামনে তাকালো। ফোনটা নীহারিকার হাতে ফেরত দিয়ে হতবাক হয়ে বলতে থাকলো,
—” আমি কালকেই রাদের সাথে ব্রেকআপ করব দোস্ত। ওই শিয়ালের বাচ্চা তো ছাগলের তিন বাচ্চার মত দেখতে। অ্যারেঞ্জ ম্যারেজে যদি এত হ্যান্ডসাম শিয়াল পাওয়া যায়, তাহলে আমি কেনো এই ভ্যাবলাকান্ত রাদের সাথে সময় নষ্ট করছি? আই শুড অলসো গেট অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ। “
নীহারিকা বুঝলো বেচারা রাদের কপালে অকারনেই দুঃখ বিরাজ করছে৷ আর সেও খুব ভালো করে চেনে জ্যোতিকে। তাই দ্রুত ফোনটা ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখে নীহারিকা বোঝানোর ভঙ্গিতে বলল,
—” আরে, ব্যপার টা তো তেমন না। তোর পেছনে কি কম হ্যান্ডসাম ছেলে পড়ে আছে? তুই তো নিজেই তথাকথিত ভালুপেশে রাদ ভাইয়ার সাথে আছিস। তাই তোর তো গর্ব করা উচিত যে তুই এত্ত সুন্দরী হয়েও ছাগলের তিন নাম্বার বাচ্চার সাথে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিস।”
জ্যোতি যেন নিজের জ্যোতি ফিরে পেলো। ভাব নিয়ে বললো
—” ঠিক বলেছিস। আর এমনিতেও, আমি তো কিছু করতে পারব না। কেনো বল তো?”
নীহারিকা ভ্রু কুঁচকে তাকালো,
—” কেনো?”
জ্যোতি মলিন মুখ করে বলল,
—” কারন, কোনো কিছুইতেই কোনো কিছু হবেনা, তাই কোনো কিছু করে কোনো লাভ নেই।”
চলবে…
🦋 কেমন হয়েছে সবাই জানাবেন! আর ইরফান কবির চরিত্রটি কেমন লাগছে?👀 সবাই রেসপন্স করবেন। ইনশাআল্লাহ ১ হাজার+ রিয়েক্ট আসলে আগামীকালই পরবর্তী পর্ব দেব। নিয়মিত হচ্ছি গাইস🫠
Share On:
TAGS: অনামিকা তাহসিন রোজা, নবরূপা
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
নবরূপা গল্পের লিংক
-
নবরূপা পর্ব ৪
-
নবরূপা পর্ব ৬
-
নবরূপা পর্ব ১
-
নবরূপা পর্ব ৫(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
নবরূপা পর্ব ২
-
নবরূপা পর্ব ৮
-
নবরূপা পর্ব ৭