দিশেহারা (০৭)
সানা_শেখ
বেশ কিছুক্ষণ সময় অতিবাহিত হয়ে যায়। শ্রবণ চোখ মেলে তাকায়। পাশ থেকে ফোন হাতে নিয়ে ফ্ল্যাশ অন করে। ফ্লোরের দিকে ধরে দেখে সোহা এখনো আগের মতোই উল্টো ফিরে বসে আছে।
অন্ধকারের মধ্যে আলো জ্বলে উঠতে দেখে পেছন ফিরে তাকায় সোহা। লাইটের আলোয় চোখ ধাঁধিয়ে যায়, সাথে সাথেই আবার আগের মতো হয়ে বসে। এই শ্রবণ ওর দিকে এভাবে লাইট ধরে আছে কেন? সোহা দুই হাতে পরনের লেহেঙ্গা খামচে ধরে। মনের মধ্যে নানান রকম ভয় দানা বাঁধছে।
শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলে,
“ডাইনির বাচ্চা ডাইনি বিছানায় এসে ঘুমা।”
সোহা বলে না কিছু, আগের জায়গা থেকে নড়েও না। একই ভঙ্গিতে বসে আছে। শ্রবণ আজকে ওকে অনেকবার ডাইনির বাচ্চা ডাইনি বলেছে।
শ্রবণ ধৈর্য হারা হয়ে খ্যাপাটে গলায় বলে,
“আসবি নাকী ঘেটি ধরে নিয়ে আসতে হবে?”
সোহা বসা থেকে উঠে দাঁড়ায়। শ্রবণ আবার বলে,
“তুই ওই পাশে ঘুমাবি, ভুলেও আমার গায়ে ছোঁয়া দিবি না, দিলে লাথি দিয়ে সোজা নিচে ফেলে দেব।”
সোহা ধীর পায়ে বিছানার কাছে এগিয়ে আসে। রাগ হচ্ছে ভয়ও হচ্ছে। শ্রবণ ঝাড়ি দিয়ে বলে,
“বা/ল পরছস? ঝনঝন ঝনঝন করছে, ওই বা/ল ছাল সব খুলে বিছানায় উঠবি আর ভুলেও টাচ যেন না লাগে আমার গায়ে।”
সোহা সব জুয়েলারী খুলে একপাশে রেখে দেয়। ভয়ে ভয়ে বিছানায় উঠে কিনার ঘেঁষে শুয়ে পড়ে। ওর জন্য শ্রবণ দেড় হাত জায়গা দিয়েছে শোয়ার জন্য আর পুরোটা নিজের দখলে রেখে দিয়েছে। দু’জনের মাঝখানে বড়ো একটা কোলবালিশ দেওয়াল হয়ে আছে।
আলো অফ হয়ে যায়, পুনরায় পুরো রুমে অন্ধকার নেমে আসে। শ্রবণ কিছুটা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলে,
“আমার শৈশব গ্রাস করেছে তোর ডাইনি মা-খালা আর পুরো জীবন গ্রাস করবি তুই। মানুষ খাল কে’টে কুমির আনে আর আমি ডাইনি এনেছি, আস্ত একটা ডাইনি। শ’য়’তা’ন মেয়ে ঘুমা, একটা শব্দ হলে লাথি দিয়ে নিচে ফেলে দেব।”
সোহা চুপ করে থাকে। ও জানে একটা উত্তর করলে শ্রবণ ওকে লাথি দিয়ে নিচে ফেলবে না, গলা চেপে সোজা উপরে পাঠিয়ে দেবে। ম’র’তে না চাইলে ওর সামনে মুখ বন্ধ করেই থাকতে হবে।
সোহার অস্বস্তি হচ্ছে ভারি লেহেঙ্গা পরে শোয়ার কারণে, মেকআপও রিমুভ করা হয়নি। আবার পাশে শ্রবণ আছে।
রুমে বন্দী হওয়ার পর থেকে ভয়ে ভয়ে ছিল সোহা। কিন্তু এখন ভয়টা কমে এসেছে অনেক। আর যাই হোক শ্রবণ ওর কাছে আসবে না, এতেই ওর বিশাল স্বস্তি।
ক্লান্ত দুর্বল লাগছে, ঘুমেরা ভর করছে দুই চোখে।
ভুলেও শ্রবণের দিকে তাকায় না, নিজের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গায় জড়সড়ো হয়ে শুয়ে রইলো শ্রবণের বিপরীত দিকে কাত হয়ে।
শ্রবণ বুকের উপর বালিশ রেখে দুই হাতে জড়িয়ে ধরে আছে স্বভাবসুলভ। এটা ওর পুরোনো অভ্যাস, এভাবেই ঘুমায়। অন্ধকার রুম হলেও ওর চোখ দুটো খোলা। এখন আর ও এই দুনিয়ায় যেন নেই, নিজের আলাদা এক জগতে প্রবেশ করেছে। শ্বাস ফেলছে ধীরে ধীরে শব্দহীন।
শ্রবণের চোখ দুটো দিয়ে দুনিয়ার কারো জন্য কখনো পানি আসে না, নিজের জন্যও না। ওর চোখে পানি আসে শুধুমাত্র ওর মায়ের জন্য। মাকে অনেক বেশি ভালোবাসে শ্রবণ। এত গুলো বছরেও মায়ের জন্য বিন্দু পরিমাণ ভালোবাসা কমেনি বরং দিন দিন বেড়েই চলেছে।
হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ ব্যতীত কাউকে ভালোবাসতে পারে না শ্রবণ, দাদা বাদে এই বাড়ির কাউকেও না। এই বাড়ির মানুষ গুলোকে দেখলে ওর মাথায় আগুন ধরে যায়, খু’ন চেপে বসে মাথায়। ওর মনে হয় এই বাড়ির সবাই ওর শ’ত্রু। যারা শ’ত্রুর ঘরে জন্ম নিয়েছে তারাও শ’ত্রু।
শ্রবণের ডান চোখের কোনা দিয়ে পানি গড়িয়ে পড়ে। ঘাড় কাত করে বালিশের সাথে পানি টুকু মুছে নেয়। পুনরায় উপরের দিকে মুখ করে বিড়বিড় করে বলে,
“আম্মু, আমি আসতে চাই তোমার কাছে। এই দুনিয়া ভালো লাগছে না আমার। এই জীবন কেমন বিষাদ লাগে। তোমার কথা খুব মনে পড়ে আম্মু।”
সকালে শ্রবণের ঘুম আগে ভাঙে। চোখ বন্ধ রেখেই কাত হয়ে কোলবালিশ জড়িয়ে ধরতে যায় তখন ওর হাত সোহার গায়ের উপর পড়ে। তড়িৎ গতিতে হাত সরিয়ে নিয়ে লাফিয়ে উঠে বসে। রুম এখনো পুরোপুরি অন্ধকারে নিমজ্জিত হয়ে আছে। কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। নিচে নেমে দ্রুত লাইট অন করে। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে সোহা কোলবালিশ ঘেঁষে শুয়ে আছে। গায়ের পোশাক এলোমেলো, চুল গুলোও এলোমেলো হয়ে আছে। চোখ সরিয়ে নেয় শ্রবণ। ওর হাত গিয়ে সোজা সোহার উন্মুক্ত পেটের ওপর পড়েছিল। ট্রাউজারের সাথে দ্রুত হাত মুছতে শুরু করে। সশব্দে কয়েকটা গালী দেয় সোহাকে। অসভ্য মেয়ে, ঘুমিয়েছে কীভাবে!
বিছানার উপর থেকে একটা বালিশ হাতে তুলে নিয়ে সোহার গায়ে আলতো বাড়ি মে’রে গর্জন করে বলে,
“এই ডাইনির বাচ্চা অসভ্য ডাইনি ওঠ।”
আতঙ্কিত হয়ে লাফিয়ে শোয়া থেকে উঠে বসে সোহা। ভয়ে বড়ো বড়ো চোখ করে শ্রবণের দিকে তাকিয়ে থাকে। ওর পোশাকের অবস্থা দেখে উল্টো ফিরে ওয়াশরুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
“পোশাকের কী শ্রী, লেহেঙ্গা ঠিক করে বিছানা থেকে নাম নবাবের বাচ্চা।”
শ্রবণ ওয়াশরুমে প্রবেশ করে শব্দ করে দরজা লাগায়। দরজা লাগানোর শব্দে আবারো কেঁপে ওঠে সোহা।
শ্রবণের বলা কথা গুলো শুনে নিজের দিকে তাকায়।
নিজেকে দেখে চোখ দুটো বড়ো বড়ো হয়ে গেছে আবার।
দ্রুত লেহেঙ্গা ঠিক করে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। ওর ঘুমোনোর স্টাইল খুবই বাজে, খাটের একপাশ থেকে আরেকপাশে গড়াগড়ি করে ঘুমের ঘোরে। গায়ের পোশাক ঠিক থাকে না, প্লাজু পরলে তো উরুর উপর উঠে যায় রাতে। আজকে লেহেঙ্গা পরে ঘুমিয়েছিল। যদিও আজকে রাতে গড়াগড়ি করতে পারেনি। এই একটু জায়গার মধ্যে তো এ-কাত ও-কাত হতেও সমস্যা হচ্ছিল। রাতে লেহেঙ্গার দোপাট্টা দিয়েই ঢেকে ঢুকে শুয়েছিল, ঘুমের ঘোরে সব উল্টা পাল্টা হয়ে গেছে।
বেশ কিছুক্ষণ পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে শ্রবণ। বিছানার দিকে একবার তাকিয়ে সোহার দিকে তাকায়। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“তোর বাপ এসে বিছানা গুছিয়ে দিয়ে যাবে?”
সোহা দ্রুত বিছানা গোছাতে ব্যস্ত হয়ে পড়ে।
শ্রবণ ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। টিস্যু দিয়ে মুখ মুছতে গিয়েও থেমে যায়। ঘাড় ঘুরিয়ে সোহার দিকে একবার তাকিয়ে আবার আয়নার দিকে তাকায়।
কিছুক্ষণ একই ভঙ্গিতে আয়নার দিকে তাকিয়ে থেকে আবার সোহার দিকে তাকায়। গম্ভীর স্বরে বলে,
“যা গোছল কর।”
সোহা ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। শ্রবণ আবার বলে,
“শুনতে পাসনি আমার কথা? ওয়াশরুমে যা, গিয়ে গোছল করে আয়।”
“কেন?”
“আমি বলেছি তাই।”
সোহা দরজার দিকে তাকিয়ে আবার শ্রবণের দিকে তাকায়। শুকনো ঢোঁক গিলে বলে,
“দরজা খুলে দাও তাহলে।”
“আমার ওয়াশরুমে গোছল করবি।”
“আমার কাপড় চোপড় সব তো আমার রুমে। গোছল করে কী পরবো?”
শ্রবণ কাভার্ড খুলে নিজের টিশার্ট আর ট্রাউজার বের করে। সোহার দিকে এগিয়ে আসতেই সোহা এক কদম পিছিয়ে যায়।
শ্রবণ সোহার থেকে দুই হাত দূরত্বে দাঁড়ায়। নিজের টিশার্ট আর ট্রাউজার এগিয়ে দিয়ে বলে,
“এগুলো পরবি।”
“লা লাগলে না তো, বড়ো হবে।”
শ্রবণের শক্ত চোয়াল আরো শক্ত হয়।
“আমি জানতে চাইনি লাগবে কি লাগবে না, পরতে বলেছি পরবি নয়তো ড্রেস ছাড়াই থাকবি।”
সোহা দ্রুত টিশার্ট আর ট্রাউজার নিজের হাতে নিয়ে নেয়।
“যা।”
“টা টাওয়েল?”
“ব্যালকনিতে।”
সোহা ব্যালকনিতে এসে দড়িতে মেলে রাখা টাওয়েল হাতে নিয়ে রুমে ফিরে আসে। শ্রবণ ফোনে মেসেজ টাইপ করছে। সোহা দ্রুত ওয়াশরুমে প্রবেশ করে।
হাতে থাকা টিশার্ট আর ট্রাউজারের দিকে তাকায়। এগুলো ওর লাগবে? ট্রাউজার তো একাই খুলে পড়ে যাবে। আর টিশার্ট, ওর উরু পর্যন্ত ঢেকে দেবে।
শ্রবণের মতলব বুঝতে পারছে না সোহা। ওকে এখন গোছল কেন করতে বলছে?
“দশ মিনিটের মধ্যে বের হবি নয়তো আমি গিয়ে বের করবো স্পেশাল ভাবে।”
রুমের দরজা খুলে দেয় শ্রবণ। সোহা রুম থেকে বের হতেই মুখোমুখি হয় স্পর্শের। স্পর্শ থমকে দাঁড়িয়ে গেছে, ওর হৃৎস্পন্দনও যেন থমকে গেছে। অসহায় চোখে তাকিয়ে আছে সোহার দিকে।
সোহার ভেজা চুল গুলোর ডগা বেয়ে টপ টপ করে পানি গড়িয়ে পড়ছে ফ্লোরে। গায়ে শ্রবণের টিশার্ট আর ট্রাউজার। লেহেঙ্গার দোপাট্টা দিয়ে শরীর ঢেকে রেখেছে কোনো রকমে।
সোহা নিজেও তাকিয়ে আছে স্পর্শের মুখের দিকে। আজকের সকালটা অন্য রকম হওয়ার কথা ছিল।
শ্রবণ এসে সোহার পেছনে দাঁড়ায়। স্পর্শ চোখ তুলে বড়ো ভাইয়ের মুখের দিকে তাকায়। শ্রবণেরও ভেজা চুল গুলো থেকে ফোঁটায় ফোঁটায় পানি গড়িয়ে পড়ছে।
এই সব কিছুর মানে স্পর্শের কাছে পরিষ্কার।
শ্রবণ স্পর্শের দিকে তাকিয়ে থেকেই সোহার এক হাত মুঠো করে ধরে। ভয়ে কেঁপে ওঠে সোহা, ভীত সন্ত্রস্ত হয়ে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। শ্রবণ সোহাকে টেনে নিয়ে সোহার রুমের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
“আর কতক্ষন দাঁড়িয়ে থাকবি এভাবে? খিদে পেয়েছে তো। চেঞ্জ করে নিচে চল।”
শ্রবণের গলার স্বর শান্ত নরম। সোহা আর পেছন ফিরে তাকায় না। শ্রবণ ওকে টেনে নিয়ে ওর রুমে ঢুকে যায়।
ভেতরে এসে অগ্নি দৃষ্টি নিক্ষেপ করে সোহার মুখের দিকে। তীব্র রাগে যেন ফেটে যাবে এখনই। চেহারা লাল হয়ে গেছে মুহূর্তেই। দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“দেখেই প্রেম জেগে উঠেছে তাইনা? দৃষ্টি সরে না? দৃষ্টি বিনিময় হচ্ছিল? আরেকবার ওর দিকে তাকাবি তো তোর চোখ উপড়ে নেবো। বেহায়া মেয়ে একটা, বিয়ের পরেও আরেক ছেলের দিকে কীভাবে তাকাস? মায়ের মতোই চরিত্রহীন হয়েছিস নাকী?”
সোহা ফট করে চোখ তুলে তাকায় শ্রবণের দিকে।
“আমার মাকে টানছো কেন এখানে? কী করেছে আমার আম্মু? যা বলার আমাকে বলবে আমার আম্মুকে জড়িয়ে কিছু বলবে না।”
“কথা বলতে শিখে গেছিস তাহলে! কথা বলতে যখন শিখেছিস তখন তোর ডাইনি মাকেই জিজ্ঞেস করিস তার চরিত্র কেমন।”
সোহা নিচের দিকে তাকিয়ে থাকে। শ্রবণ ওর চোয়াল চেপে মুখ তুলে ধরে বলে,
“আরেকবার কোনো ছেলের দিকে তাকালে তোর চোখ আর চোখের জায়গায় থাকবে না, থাকবে তোর হাতে।”
ছেড়ে দিয়ে বলে,
“চেঞ্জ কর দ্রুত।”
সোহা রোবটের ন্যায় কাভার্ডের সামনে এসে দাঁড়ায়। ভেতর থেকে ড্রেস বের করে নিয়ে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। দুই চোখ বেয়ে ঝরঝর করে পানি গড়িয়ে পড়ছে। চোখের পানি মুছে দ্রুত ড্রেস চেঞ্জ করতে শুরু করে। দেরি হলে আবার নাজানি কী বলে আর করে।
স্পর্শের ওই কাতর চাহনি ওকে যন্ত্রণা দিচ্ছে। শ্রবণ নিজের প্ল্যানে সফল। শ্রবণের মতলব প্রথমে বুঝতে না পারলেও এখন বুঝতে পারছে।
ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে হেয়ার ড্রায়ার বের করে। শ্রবণ ওর দিকে তাকিয়ে বলে,
“সারা দিন এখানেই দাঁড়িয়ে থাকবো নাকী? চল এখন।”
“চুল গুলো শুকিয়ে যাচ্ছি আমি, তুমি যাও।”
“চুল শুকাবি না, চল আমার সাথে।”
সোহা হেয়ার ড্রায়ার রেখে চুল গুলো হাত খোঁপা করে নেয়। শ্রবণ এগিয়ে এসে খোঁপা করা চুল মুক্ত করে দেয়।
“এভাবেই যাবি তুই।”
“আমি এভাবে সকলের সামনে যেতে পারবো না।”
“তুই এভাবেই যাবি।”
ভীত সন্ত্রস্ত সোহা নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে ভয়ে ভয়ে বলে,
“তুমি এ এমন করছো কেন? আমি কী ক্ষতি করেছি তোমার? আমি এভাবে যাব না কারো সামনে।”
“বেশি কথা আমার পছন্দ নয় ভুলে যাসনি নিশ্চই? চল এখন।”
সোহাকে কিছু বলতে না দিয়ে ওর হাত টেনে ধরে রুম থেকে বের করে।
ড্রয়িং রুমে আসতেই দেখে ছোটো বড়ো সবাই উপস্থিত আছে। ওদের দু’জনকে দেখে সবাই ওদের দিকে তাকিয়ে আছে।
শ্রবণ সকলের দিকে একবার দৃষ্টি বুলায়। ওর পাশে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সোহা। সোহা কারো দিকে তাকাতে পারছে না। শ্রবণ ওর হাত ধরেই ড্রয়িং রুম পার করে ডাইনিং রুমে প্রবেশ করে। যাওয়ার আগে অবশ্য ওর দাদা সামাদ চৌধুরীকে ডেকে গেছে।
একটু পরেই সামাদ চৌধুরী ডাইনিং রুমে প্রবেশ করেন। মেড ওদের দু’জনের জন্য খাবার বাড়ছে।
সামাদ চৌধুরীকে দেখে শ্রবণ বলে,
“দাদা ভাই বসো।”
সামাদ চৌধুরী একটা চেয়ার টেনে বসেন। নাতির মুখের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“ভাই তুমি এমন একটি কাজ কেন করলে?”
শ্রবণ শান্ত দৃষ্টিতে দাদার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে কিছু সময় তারপর বলে,
“কেমন কাজ করেছি?”
“তুমি সোহাকে কেন বিয়ে করলে?”
“ইচ্ছে হয়েছিল।”
“তুমি ওকে বিয়ে করবে সেটা আমাকে আগে বলতে পারতে তাহলে এত কিছু হতো না।”
“আমি যদি আগে বলতাম আমি সোহাকে বিয়ে করতে চাই তাহলে তোমার দুই ছেলে আর ছেলের বউরা রাজি হতো?”
“আমি করাতাম।”
“তোমার পরিশ্রম কমিয়ে দিয়েছি দাদা ভাই।”
নাতির কথা শুনে সামাদ চৌধুরী আর কিছু বলার জন্য খুঁজে পেলেন না। এখন আর কিছু বলেও লাভ নেই।
“দাদা ভাই খাওয়া শুরু করো।”
“বাড়িতে আরো মানুষ আছে।”
“তুমি কী চাও আমি এখান থেকে উঠে যাই?”
“খাচ্ছি, তোমরাও খাও।”
“খাওয়া শুরু কর।”
সোহা নিচের দিকে দৃষ্টি রেখেই ভাত মেখে মুখে পুরে নেয়। মুখে নিলেও গলা দিয়ে নামছে না খাবার।
শ্রবণ স্বাভাবিকভাবে খেয়ে চলেছে।
সামাদ চৌধুরী দুজনের দিকে তাকিয়ে ধীরে ধীরে খাবার চিবুচ্ছেন।
শ্রবণ প্লেটের সবটুকু খাবার খেলেও সোহা অর্ধেক খেয়ে হাত ধুয়ে ফেলেছে। সামাদ চৌধুরী পুরোটা খেয়েছেন, উনি খাবার নষ্ট করা পছন্দ করেন না।
শ্রবণ উঠে দাঁড়ায়। সোহা বসে আছে এখনো। শ্রবণ ওর হাত ধরে টেনে দাঁড় করায় তারপর ডাইনিং রুম থেকে বের হয়।
আগের মতোই সবাই এখনো ড্রয়িং রুমে উপস্থিত আছে। স্পর্শ সোফায় বসে আছে মাথা নিচু করে। ওর পাশে ওর মা বসে ওকে কি কি যেন বলছে।
সোফার কাছাকাছি আসতেই স্পর্শের নানি শ্রবণের দিকে তাকিয়ে বলেন,
“শ্রবণ তুমি কীভাবে পারলে ছোটো ভাইয়ের হবু স্ত্রীকে বিয়ে করতে? বিবেক বলতে কিছু নেই তোমার?”
শ্রবণ কর্কশ গলায় বলে,
“না, আমার বিবেক বলতে কিচ্ছু নেই। আর কে ছোটো ভাই? স্পর্শ? স্পর্শ আমার কিচ্ছু হয় না। ও আমার ভাই না।”
বড়ো ভাইয়ের কথা শুনে মুখ তুলে তাকায় স্পর্শ। সোফা ছেড়ে উঠে দাঁড়িয়ে বলে,
“বার বার মিথ্যে কেন বলছো ভাইয়া? তুমি আমার বড়ো ভাই আর আমি তোমার ছোটো ভাই এটাই সত্যি।”
“পুরোটাই মিথ্যে কথা। তুমি ছোটো থেকে যা যা শুনে বড়ো হয়েছো সব মিথ্যে।”
“মিথ্যে না।”
“কেন মনে হচ্ছে মিথ্যে না? আমি কেনই বা তোমাকে মিথ্যে বলবো?”
“তুমি আমার ভাই না হলে তোমার চেহারার সাথে আমার চেহারার এত মিল কেন? আমাদের হাইট ওয়েটও প্রায় সমান সমান।”
“চেহারার সাথে, হাইট ওয়েটের সাথে মিল থাকে এমন অনেক মানুষ আছে।”
“তুমি কেন সত্যিকে মিথ্যে প্রমাণ করতে চাইছ?”
“যেটা সত্যি আমি সেটাই বলেছি।”
“তুমি বলছো আমি তোমার ভাই না?”
“হ্যাঁ।”
“তাহলে চলো ডিএনএ টেস্ট করবো আমাদের তিন জনের। ডিএনএ টেস্ট করলেই প্রমাণ হয়ে যাবে আমি কে হই তোমার আর এই বাড়ির।”
শ্রবণ শান্ত দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে স্পর্শের মুখের দিকে।
তনিমা চৌধুরী আতঙ্কিত হয়ে হাজব্যান্ডের দিকে তাকান। ওনারও চোখ মুখের ভাব পরিবর্তন হয়ে গেছে। শ্রবণ লক্ষ্য করেছে সবই।
“আচ্ছা চলো ডিএনএ টেস্ট করবো।”
তনিমা চৌধুরী বলেন,
“কোনো ডিএনএ টেস্ট করতে হবে না। এসবের কী প্রয়োজন।”
“প্রয়োজন আছে আম্মু।”
শামীম রেজা চৌধুরী বলেন,
“কোনো কিছুর প্রয়োজন নেই, তুমি আমার ছেলে এটাই সবচেয়ে বড়ো কথা।”
শ্রবণ বলে,
“ভয় পাচ্ছেন নাকী সত্যি সামনে চলে আসবে বলে?”
শামীম রেজা চৌধুরী কিছু বলতে উদ্যত হয়েছিলেন কিন্তু ওনাকে থামিয়ে দিয়ে স্পর্শ বলে,
“ভাইয়া চলো হসপিটালে, তুমিযে ভুল সেটা প্রমাণ হয়ে যাবে।”
“কে ভুল আর কে সঠিক সেটা আমি খুব ভালো করেই জানি। চলো হসপিটালে।”
স্পর্শ বাবার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আব্বু চলো।”
শামীম রেজা চৌধুরী বলেন,
“আমি কোথাও যাব না আর তুমিও যাবে না।”
শ্রবণ এগিয়ে এসে বাবার সামনে দাঁড়ায়। শামীম রেজা চৌধুরী কিছু বুঝে ওঠার আগেই হাত বাড়িয়ে ওনার মাথার চুল খামচে ধরে শ্রবণ। মুহূর্তেই কত গুলো চুল উঠে ওর হাতের মুঠোয় চলে আসে। বাইরের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলে,
“স্পর্শ আসো, ওই চৌধুরীকে আর প্রয়োজন নেই।”
স্পর্শ বড়ো ভাইয়ের পেছন পেছন এগিয়ে যায়। পেছন থেকে হতভম্ভ হয়ে দু’জনের যাওয়ার পথে তাকিয়ে আছে অনেকেই।
তনিমা চৌধুরী শামীম রেজা চৌধুরীর পাশে দাঁড়িয়ে চাপা ভয়ার্ত কন্ঠে বলেন,
“শ্রবণ তো সব সত্যি জানতে পেরে যাবে এবার। ডিএনএ টেস্ট করতে দেওয়া যাবে না কিছুতেই। তুমি আটকাও ওদের।”
চলবে…………..
অনেকেই প্রশ্ন করতে পারেন “সোহা কেন শ্রবণের সব কথা শুনছে? কেন প্রতিবাদ করছে না?”
আপনার সামনে একজন বন্দুক হাতে দাঁড়িয়ে আছে। আপনি জানেন এক কদম আগালে আপনাকে শুট করা হবে, যদি না আগান তবে কিছু করবে না। নিশ্চিত মৃত্যু জেনেও আপনি তখন আগাবেন? নাকী তার হাত থেকে বাঁচার জন্য সুযোগের অপেক্ষা করবেন?
বুদ্ধিমানদের আর কিছু বলতে হবে না আশা করছি। এর পরেও যাদের সমস্যা তারা পড়বেন না।
নেক্সট পার্ট আগে আগে পড়তে সানা শেখ পেজ টি ফলো দিয়ে রাখবেন সবাই ধন্যবাদ।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১৫
-
দিশেহারা পর্ব ২২
-
দিশেহারা পর্ব ৩৭
-
দিশেহারা পর্ব ২১
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ২
-
দিশেহারা পর্ব ৪২
-
দিশেহারা পর্ব ১২
-
তোমার সঙ্গে এক জনম গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ৪৩
-
দিশেহারা পর্ব ৩৬