দিশেহারা পর্ব ৩৪
সানা_শেখ
সোহা শ্রবণের বুকে মুখ গুঁজে চার হাত পা দিয়েই ওকে আঁকড়ে ধরে আছে। শ্রবণের বাইকের স্প্রিড আগের মতোই রয়েছে এখনও। ঝড়ের বেগে ছুটে চলেছে বাইক। সোহার জান যায় যায় অবস্থা।
বুকে মুখ গুঁজে রেখেই বলে,
“দোহাই লাগে স্প্রিড কমাও।”
“শক্ত করে ধরে রাখ।”
“ভয় লাগছে আমার।”
“আমি আছি।”
সোহা কথা বাড়ায় না আর, খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে শ্রবণ বাইকের স্প্রিড কমাবে না। আগের চেয়েও আরও শক্ত করে আঁকড়ে ধরে।
ফ্ল্যাটের কাছাকাছি আসতেই বাইকের স্প্রিড কমে। যখন স্প্রিড একদম কমে যায় তখন বুক থেকে মুখ তুলে আশেপাশে নজর বুলায় সোহা। চলে এসেছে।
বিল্ডিং-এর সিকিউরিটি ওদের দু’জনের দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতেই বাইক বেজমেন্টে এসে পৌঁছায়। সোহা দুই পা নামিয়ে নেয়। এতক্ষণ দুই পা দিয়ে শ্রবণের কোমর পেঁচিয়ে ধরে ছিল। এমনভাবে বসে ছিল যে মনে হচ্ছিল বাইকে নয় শ্রবণের কোলে বসে ছিল চার হাত পা দিয়ে পেঁচিয়ে ধরে।
শ্রবণকে ছেড়ে দিলেও বাইক থেকে নামতে পারছে না। আগে শ্রবণকে নামতে হবে তার পরেই ও নামতে পারবে।
“নাম।”
“কীভাবে নামবো? আগে তুমি নামো।”
শ্রবণ বাইক থেকে নেমে দাঁড়ায়। দুই হাতে সোহাকে আগলে ধরে বাইক থেকে নামিয়ে দেয়। ছেড়ে দিতেই ঠাস করে আছড়ে পড়ে নিচে। কিয়ৎক্ষণ-এর জন্য ওর দিকে তাকিয়ে রইলো শ্রবণ। সোহা নিজেও হা হয়ে গেছে এভাবে পড়ে গিয়ে।
শ্রবণ গালি দিয়ে হেলমেট খুলে বাইক জায়গা মতো রেখে ডেকে রাখে। হেলমেট দুটো এক হাতে নেয়। সোহার দিকে তাকিয়ে রাগী স্বরে বলে,
“উঠবি নাকী এখানে এভাবেই বসে থাকবি?”
সোহা উঠে দাঁড়ায়। হাত পা এখনো কাঁপছে। এমন ভয় দেখিয়েছে যে এখনো স্বাভাবিক হতে পারছে না।
শ্রবণ সোহার পেছনে দাঁড়িয়ে কিছুটা ঝুঁকে কর্কশ স্বরে বলে,
“গলা ধর শক্ত করে।”
সোহা শক্ত করে জড়িয়ে ধরে শ্রবণের গলা। শ্রবণ এক হাতেই সোহাকে পাঁজা কোলে তুলে নেয়। সোহা ভয় পেয়ে আরও শক্ত করে ধরে।
শ্রবণ ওকে কোলে নিয়ে ধুপধাপ পা ফেলে লিফটের দিকে আগায়। সোহা শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে আছে। শ্রবণের চোখমুখ বরাবরের মতো গম্ভীর আর রাগী রাগী হয়ে আছে।
লিফটে উঠে এখন আর বাটন চাপতে পারছে না শ্রবণ। দুই হাত বন্ধ। সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে ধমক দিয়ে বলে,
“বাটন চাপ।”
সোহা দ্রুত গলা থেকে এক হাত সরিয়ে বাটন চাপে তারপর আবার জড়িয়ে ধরে শ্রবণের গলা।
“এত ভয় কী খেয়ে আসে?”
“এত জোরে কেউ বাইক চালায়?”
“আগামীকাল আবার তোকে নিয়ে রাইডে বের হবো।”
সোহা চমকে ওঠে শ্রবণের কথা শুনে। দ্রুত দুদিকে মাথা নেড়ে বলে,
“আ আমি আর জীবনেও তোমার বাইকে উঠবো না। আজকে একটুর জন্য জানে বেঁচে ফিরেছি।”
“এই, শ’য়’তা’নের বাচ্চা, আমার বাইকে না উঠলে কোন ব্যাডার বাইকে উঠবি?”
“অন্য ছেলের বাইকে কেন উঠবো?”
“তোর মা যেই কারণে অন্য পুরুষদের বিছানায় যেত।”
সোহা ফ্যালফ্যাল করে শ্রবণের মুখের দিকে তাকিয়ে রইল। চোখ জোড়া পানিতে টুইটুম্বর হয়ে গেছে। বুকের ভেতর চাপা কষ্ট পাহাড় সম হয়ে ওঠে। তাকিয়ে থাকতে থাকতেই চোখ থেকে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
শ্রবণ ফ্ল্যাটের দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়। সোহাকে কোল থেকে নামিয়ে বাম হাতে দিয়ে ধরে রেখে পকেট হাতড়ে চাবি বের করে দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করে। সোহা নিজেকে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করে আস্তে আস্তে হেঁটে রুমের দিকে এগিয়ে যায় শ্রবণকে রেখেই।
শ্রবণ দরজা লাগিয়ে হেলমেট দুটো স্টাডি রুমে রেখে বেডরুমে আসে।
সোহা বিছানায় বসে আছে, চোখের পানি মুছছে একটু পর পর।
শ্রবণ কিছু না বলে চেঞ্জ করে ফ্রেশ হয়ে আসে। সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“নাটক বন্ধ করে ফ্রেশ হয়ে এসে ঘুমা।”
সোহা বিছানা ছেড়ে নেমে ধীরে পায়ে হেঁটে ওয়াশরুমে প্রবেশ করে। দরজা লাগিয়ে দিয়ে ফুঁপিয়ে কেঁদে ওঠে। জোরে কান্না বের হতে নিলে দুই হাতে মুখ চেপে ধরে। এতদিন ধরে চামাচাপা দিয়ে রাখা যন্ত্রণাগুলো আবার জেগে উঠেছে। মায়ের এই রূপ সোহা এখনো মেনে নিতে পারে না। দুঃখে, কষ্টে, লজ্জায়, ঘৃণায়, রাগে, অভিমানে এখন পর্যন্ত মায়ের সঙ্গে একটা কথাও বলেনি আর। যোগাযোগ করার চেষ্টাও করেনি, অবশ্য যোগাযোগ করার সাহসও হয় না শ্রবণের ভয়ে। শ্রবণ কঠিন গলায় বলে দিয়েছে ও কোনোদিন যেন ওর মায়ের সঙ্গে যোগাযোগ করার সাহসও না দেখায়।
কিছুক্ষণ কাঁদার পর নিজেকে শক্ত করার চেষ্টা করে।
ওর মায়ের জন্যই শ্রবণের কাছ থেকে আরও বেশি কষ্ট পায়।
ফ্রেশ হয়ে বেরিয়ে আসে ওয়াশরুম থেকে। শ্রবণ রুম অন্ধকার করে শুয়ে পড়েছে। বিষন্ন সুরে গাওয়া গান সোহার কানে ভেসে আসে।
“আরে…আতর গোলাপ চন্দন মাইখা
সবাই মোরে যাইবো রাইখা,
চুপি সারে একলা ঘরে কলমি
ফুলের সুভাশ নেবো…।
আমি মাটির একখান ঘর বানাবো
খেঁজুর পাতার ছাওনি দিবো
বাঁশের খুটির বেড়া দিয়ে
মহা কালের ঘুম ঘুমাবো….।
আরে…ছাইড়া যাইবো ইটের শহর
মাটির ঘরে কাটবে রে প্রহর।
আরে…ছাইড়া যাইবো ইটের শহর
মাটির ঘরে কাটবে প্রহর,
মন মহাজন ডাকলে পরে চোখ
খুলিয়া সোহাগ নেবো…।”
গান শেষ না করেই শ্রবণ থেমে যায়। মৃদু স্বরে বলে,
“আসছিস না কেন?”
সোহা দ্রুত ওড়না দিয়ে হাতমুখ মুছে অনুমান করে অন্ধকারে হাতড়ে বিছানার কাছে এগিয়ে আসে। আস্তে ধীরে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে নিজের জন্য বরাদ্দকৃত জায়গায়।
শ্রবণ সোহার শরীর ঘেঁষে আসে। সোহাকে নিজের দিকে ফিরিয়ে ওর বুকে মুখ গুঁজে দেয়। হাত ধরে নিজের মাথায় রেখে মৃদু স্বরে বলে,
“ভাল্লাগছে না, হাত বুলিয়ে দে।”
কথাগুলো বলে জড়িয়ে ধরে সোহাকে। সোহা চুলে হাত বুলিয়ে দিতে শুরু করে। দু’চোখ বেয়ে আবার গড়িয়ে পড়ে পানি।
চুলে হাত বুলাতে বুলাতে ডুকরে কেঁদে ওঠে। দ্রুত চেষ্টা করে কান্না বন্ধ করতে কিন্তু পারছে না।
বুকে মুখ গুঁজে রেখেই ধমকে ওঠে শ্রবণ। কর্কশ গলায় বলে,
“কান্না বন্ধ করবি নাকি কানের নিচে খাবি একটা? এমনিতেই ভাল্লাগছে না, মা’র খেতে না চাইলে চুপ কর।”
সোহা কান্না বন্ধ করার চেষ্টা করে। নিজেকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য হা করে লম্বা লম্বা শ্বাস নেয়। শ্রবণ হাতের বাধন শক্ত করে। সোহার হৃৎস্পন্দনের অস্বাভাবিক শব্দ স্পষ্ট শুনতে পাচ্ছে।
ক্লাস শেষ করে শ্রবণের কাছে যাওয়ার জন্য সেদিকেই এগিয়ে যাচ্ছে সোহা। হঠাৎ কারো মুখে নিজের নাম শুনে স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে যায়, কন্ঠস্বর অতি পরিচিত। ঘুরে তাকায় পেছনে। এতগুলো দিন পর নিজের মাকে দেখে বুকের ভেতরটা হুহু করে ওঠে। অভিমানে মুখ ফিরিয়ে নিয়ে হাঁটা শুরু করে আবার। রিতা বলে,
“সোহা, ওই ভদ্র মহিলা তো তোমাকে ডাকছে।”
সোহা কথা বলে না।
অনিমা চৌধুরী দ্রুত পায়ে এগিয়ে আসতে আসতে বলেন,
“সোহা, দাঁড়া।”
সোহা দাঁড়ায় না। অনিমা চৌধুরী এক প্রকার দৌড়ে এগিয়ে আসেন সোহার কাছে। সোহার হাত টেনে ধরে দাঁড় করান।
“কী হয়েছে তোর? ডাকছি শুনছিস না কেন?”
সোহা নিজের হাত ছাড়িয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে বলে,
“হাত ছাড়ো আমার।”
“এভাবে কথা বলছিস কেন?”
“হাত ছাড়ো, ছোঁবে না তুমি আমাকে।”
“সোহা।”
“কী হয়েছে? বেঁচে আছি নাকি মরে গেছি সেটাই দেখতে এসেছো? বেঁচে আছি আর খুব ভালো আছি। হাত ছাড়ো আমার, আর কোনোদিন আসবে না আমার সামনে। তোমাকে দেখে আমার নিজের প্রতিই ঘৃণা হচ্ছে। তোমার মতো মা আর স্ত্রী দুনিয়ার কারো না হোক।”
ঝাড়া দিয়ে হাত ছাড়িয়ে নিয়ে দ্রুত পায়ে সামনের দিকে এগিয়ে যায়। ওর পেছন পেছন এগিয়ে যায় রিতা। একবার সোহার মুখের দিকে তাকাচ্ছে আবার উল্টো ফিরে অনিমা চৌধুরীর দিকে তাকাচ্ছে।
অনিমা চৌধুরী স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সোহা ওনার সঙ্গে এভাবে আর এসব বললো বিশ্বাসই করতে পারছেন না।
পেছন থেকে আরও কয়েকবার ডাকেন কিন্তু সোহা ফিরেও তাকায় না। আশেপাশে তাকিয়ে দেখেন অনেকেই তাকিয়ে আছে ওনার দিকে। ওনার পরনে অফিসের ফরমাল ড্রেস। দেখে বোঝাই যাচ্ছে অফিস থেকে সরাসরি এখানেই এসেছেন।
সোহা শ্রবণের কাছাকাছি এসে দাঁড়ায়। শ্রবণ বসা থেকে উঠে ওর কাছে এগিয়ে আসে। সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“কী হয়েছে? চোখ মুখ এমন কেন?”
সোহা কথা বলতে পারে না। চেহারা লাল হয়ে গেছে, চোখ দুটো পানিতে টুইটুম্বর। দেখে মনে হচ্ছে এখনই কেঁদে ফেলবে।
“কেউ কিছু বলেছে?”
সোহা দু’দিকে মাথা নেড়ে বলে,
“না।”
“তাহলে কী হয়েছে?”
সোহা ফুঁপিয়ে ওঠে, কোনো রকমে বলে,
“বাসায় যাব।”
শ্রবণ দাঁতে দাঁত চেপে তাকিয়ে থাকে সোহার মুখের দিকে। ইচ্ছে করছে ঠাস করে দুটো লাগিয়ে দিতে। জিজ্ঞেস করছে কী হয়েছে কিন্তু মুখ দিয়ে কথা বের হচ্ছে না। রিতার দিকে তাকিয়ে বলে,
“রিতা, কী হয়েছে?”
“একজন ভদ্র মহিলা এসেছেন।”
শ্রবণের কপালে কয়েকটা ভাঁজ পড়ে।
“কে এসেছে?”
“আমি তো চিনিনা, ভাইয়া।”
“দেখতে কেমন?”
“ফরসা, লম্বা, সুন্দরী স্মার্ট। ফরমাল ড্রেস পরনে।”
শ্রবণ আন্দাজ করতে পারে কে এসেছে। সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“অনিমা এসেছে?”
উপর নিচ মাথা নাড়ায় সোহা। শ্রবণ দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“কোথায় ওই কু’ত্তা’র বাচ্চা?”
“ফ্ল্যাটে রেখে আসো আমাকে।”
“ওই ডাইনির বাচ্চা তোকে কী বলেছে?”
সোহা চোখের পানি মুছতে মুছতে জড়ানো গলায় বলে,
“বলেনি কিছু।”
শ্রবণ সোহার হাত ধরে গাড়ির দিকে আগায়। রিতা হাসানের দিকে তাকিয়ে বলে,
“অনিমা মানে ওই ভদ্র মহিলা কে?”
“সোহার মা, শ্রবণের শাশুড়ি।”
“সোহা ওর মায়ের সঙ্গে ওইভাবে রূঢ় হয়ে কথা বলল!”
“বাড়িতে যা।”
“তুমি যাবে না?”
“না, আমার ক্লাস আছে।”
রিতা ঘুরে গেটের দিকে হাঁটা ধরে।
গেটের বাইরে এসে দেখে অনিমা চৌধুরী গাড়ির কাছে দাঁড়িয়ে আছেন। রিতা অবাক হয়ে কিছুক্ষন তাকিয়ে থাকে অনিমা চৌধুরীর দিকে। ওনাকে দেখে মনেই হচ্ছে না বড়ো বড়ো দু’জন সন্তান আছে ওনার।
অনিমা চৌধুরীর সামনে দিয়েই শ্রবণের গাড়ি বেরিয়ে যায়। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখা ছাড়া কিছুই করতে পারেন না।
রিতার ভীষণ আগ্রহ হচ্ছে সোহা শ্রবণ আর ওদের বাড়ির পুরো ঘটনা জানার জন্য। কী হয়েছে ওদের বাড়িতে? সোহা কেন ওর মায়ের সঙ্গে ওইভাবে কথা বলল? শ্রবণ কেন নিজের বাড়ি থাকা সত্ত্বেও ফ্ল্যাটে থাকে? প্রশ্নগুলো গিজগিজ করছে মাথার ভেতর কিন্তু উত্তর দেওয়ার মানুষ নেই। হাসানকে কিছু জিজ্ঞেস করলেও লাভ হবে না, ওই ব্যাটা ওর কোনো কথার উত্তর সহজে দিতে চায় না, আর এইসব কথার উত্তর তো আরও দেবে না।
সোহাকে ফ্ল্যাটে রেখেই আবার বেরিয়ে যায় শ্রবণ। সোহা ব্যাগ রেখে বেড রুমে এসে হিজাব খুলে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে।
গতরাত থেকে এমনিতেই ভালো লাগছে না। চাপা কষ্টে দম বন্ধ হয়ে আসতে চায়। আজকে চোখের সামনে মাকে দেখে আর অমন ব্যবহার করে এসে এখন আরও কষ্ট হচ্ছে। এই কষ্ট না সহ্য করতে পারে আর না তো কাউকে বলতে পারে।
বালিশে মুখ গুঁজে গুমরে গুমরে কাঁদতে থাকে।
কিছুক্ষণ পর কান্না বন্ধ করার চেষ্টা করে আল্লাহর কাছে অভিযোগের সুরে বলে,
“আল্লাহ, এমন জীবন কেন দিলে আমাকে? এমন একজন মানুষের গর্ভে কেন আমার জন্ম হলো? ওর মতো একজন মানুষকে কেন আমার জীবনে দিলে? আমি এসব আর সহ্য করতে পারছি না।”
গোসল সেরে বেরিয়ে আসে সোহা। চুল শুকিয়ে ব্রাশ করে বেঁধে নেয়। ব্যালকনির দরজা লাগিয়ে জানালা লাগায়া। সন্ধ্যা হয়ে আসছে ধরণীর বুকে। দুপুরে খাওয়া হয়নি, খিদে পেয়েছে। কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়েছিল, একটা বাজে স্বপ্ন দেখে ঘুম ভেঙে গেছে।
হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে। সোহা দরজার দিকে তাকায়। কে এসেছে? শ্রবণ আসলে তো কলিং বেল বাজাবে না। অনিমা চৌধুরী আসলো কী? নাকি অন্য কেউ? কে হতে পারে?
চিন্তা ভাবনা করতে করতে রুম থেকে বেরিয়ে আসে। দরজার দিকে তাকিয়ে দেখে পাশের ফ্ল্যাটের সেই ভদ্র মহিলা দরজা খুলে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। ওনাকে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সোহার চোখ কপালে? উনি দরজা খুললেন কীভাবে? চাবি কোথায় পেলেন? এটা কী মানুষ নাকি ভর সন্ধ্যা বেলা মানুষের রূপ ধরে কোনো ভূত প্রেত দাঁড়িয়ে আছে?
ভয়ে সোহার বুকের ভেতর কম্পন সৃষ্টি হয়। হাত পা কাঁপতে শুরু করেছে। উল্টো ঘুরে দৌড় দেবে বেডরুমের দিকে সেই মুহূর্তে ভদ্র মহিলা বলেন,
“কেমন আছো, সোহা?”
সোহা কম্পিত স্বরে বলে,
“ভা ভালো, আপনি কেমন আছেন আন্টি?”
“ভালো। এভাবে কথা বলছো কেন?”
“আ আপনি দরজা খুললেন কীভাবে?”
“দরজা তো আগে থেকেই খোলা ছিল। দরজা খোলা দেখেই ভাবলাম তোমার সঙ্গে গল্প করে যাই।”
কথা বলতে বলতে ভদ্র মহিলা ভেতরের দিকে এগিয়ে আসেন। ওনার সঙ্গে কথা বলে সোহার মনে হচ্ছে না উনি ভূত। মানুষই মনে হচ্ছে।
সোহা সোফা দেখিয়ে বলে,
“আন্টি, বসুন।”
ভদ্র মহিলা সোফায় বসেন। সোহা এগিয়ে গিয়ে দরজা ভিজিয়ে দিয়ে এসে নিজেও বসে সোফায়। ভদ্র মহিলা আশেপাশে নজর বুলিয়ে বলেন,
“শ্রবণ ফ্ল্যাটে নেই?”
“না, বাইরে রয়েছে।”
“ওহ। বেশ কিছুদিন আগে একটা ছেলে এসেছিল তোমাদের ফ্ল্যাটে, কে সে?”
“ছেলে?”
“হ্যাঁ, কিছুটা শ্রবণের মতো দেখতে।”
“ও, আপনি বোধহয় স্পর্শ ভাইয়ার কথা বলছেন আন্টি।”
“ওই ছেলের নাম স্পর্শ?”
“হ্যাঁ।”
“কে হয় তোমার?”
“চাচাতো ভাই।”
“শ্রবণ তোমার কাজিন?”
“হ্যাঁ।”
“স্পর্শ আর শ্রবণ ভাই?”
“হ্যাঁ।”
“তোমরা প্রেম করে বিয়ে করেছ?”
“না।”
“এমনটাই ধারণা করেছিলাম আমি। শ্রবণের যা স্বভাব, ওকে দিয়ে প্রেম ট্রেম হবে না।”
ভদ্র মহিলার কথা শুনে ওনার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে সোহা। ভদ্র মহিলা আবার বলেন,
“তোমাদের বাড়ি কোথায়?”
“কাছেই।”
“বাড়িতে না থেকে আলাদা থেকো কেন? বাড়িতে কোনো ঝামেলা হয়েছে? শ্রবণ তো অনেক বছর ধরে এখানেই থাকে একা একা। ওর সঙ্গে কোনো ঝামেলা?”
“আন্টি, চা খাবেন নাকি কফি?”
“আরেহ, এসবের কোনো প্রয়োজন নেই।”
“কেনো প্রয়োজন নেই? আপনি বলুন কি খাবেন।”
“আচ্ছা, এত করে যখন বলছো তখন চা নিয়ে আসো।”
“আচ্ছা আন্টি, আপনি একটু বসুন আমি এখনই চা বানিয়ে নিয়ে আসছি।”
সোহা সোফা ছেড়ে উঠে দ্রুত রান্না ঘরের দিকে এগিয়ে আসে। বিড়বিড় করে বলে,
“শুধু শুধু কী এই মহিলাকে দেখতে পারে না নাকি? নাড়ি নক্ষত্র সব জানতে চলে এসেছে।”
সসপ্যানে পানি বসিয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। মহিলার কথার উত্তর যেন না দিতে হয় সেজন্যই কৌশলে এড়িয়ে উঠে এসেছে।
দুই কাপ চা বানিয়ে সোফার কাছে এগিয়ে আসে আবার। এক কাপ ভদ্র মহিলাকে দিয়ে অন্য কাপ নিজে নিয়ে বসে সোফায়। ভদ্র মহিলা চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে বলেন,
“তুমি তো দারুন চা বানাও।”
“ধন্যবাদ, আন্টি।”
“বাচ্চা কাচ্চা হবে কবে তোমাদের?”
মহিলার কথা শুনে লজ্জা পায় সোহা। কথার উত্তর না দিয়ে চায়ের কাপে চুমুক দেয়।
ভদ্র মহিলা আবার বলেন,
“এখনকার দিন-কাল ভালো না। এখনকার ছেলেমেয়েরা সহজে বাচ্চাও নিতে চায় না। যখন বাচ্চা নিতে চায় তখন হয় না। পিল টিল কিছু খেয়ও না আর, পরে কিন্তু বাচ্চা হবে না। একটা হয়ে যাক তারপর নাহয় লম্বা গ্যাপ দিলে।”
সোহা একটা কথাও বলে না, মহিলার দিকে তাকায়ও না। শ্রবণের বলা কিছু পুরোনো কথা স্মরণ হয়েছে। বুকের ভেতরটা ভারি হয়ে আসে আবার।
“কী ভাবছো এত?”
“কিছু না, আন্টি।”
“বেশি ভাবা-ভাবি বাদ দিয়ে বাচ্চা একটা নিয়েই ফেলো। পরে কিন্তু সমস্যা হবে।”
সোহা জোর পূর্বক একটু হাসে শুধু।
ভদ্র মহিলার চা শেষ হতেই ওনার ফোন বেজে ওঠে। ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে বলেন,
“তোমার আংকেল এসেছেন বোধহয়। যাই আজকে, অন্যদিন আবার আসব।”
ভদ্র মহিলা বেরিয়ে যান ফ্ল্যাট থেকে। সোহা দরজা লাগিয়ে বেডরুমে চলে আসে।
বিছানায় বসে একদৃষ্টে তাকিয়ে থাকে ফ্লোরের দিকে।
শ্রবণ ফ্ল্যাটে প্রবেশ করার জন্য দরজা খুলতে গেলে পারে না খুলতে। চাবি দিয়ে দরজা খুলছে না। বুঝতে পারে ভেতর থেকে লাগানো রয়েছে। চোয়াল শক্ত করে এক নাগাড়ে কলিং বেল চাপতে শুরু করে।
মিনিট পার হওয়ার আগেই দরজা খুলে যায়। ভেতরে প্রবেশ করে দরজা লাগিয়ে আগুন চোখে তাকায় সোহার মুখের দিকে। ওর চাহনি দেখেই সোহার আত্মা শুকিয়ে গেছে। বাজখাঁই গলায় বলে,
“এই ডাইনির বাচ্চা, দরজা ভেতর থেকে লাগিয়েছিস কেন?”
“তু তুমি দরজা খুলে রেখেই চলে গিয়েছিলে সেজন্য ভেতর থেকে লাগিয়েছিলাম।”
শ্রবণের গলার স্বর কিছুটা নিচু হয়।
“দরজা খুলে রেখে গিয়েছিলাম?”
“হ্যাঁ।”
শ্রবণ ঘুরে দরজার দিকে তাকায়। দরজা খুলে রেখেই চলে গিয়েছিল? হতে পারে, তাড়াহুড়োয় হয়তো ভুলে গিয়েছিল।
স্টাডি রুমের দিকে এগিয়ে যেতেই সোফার সামনে থাকা টি টেবিলের ওপর নজর পড়ে। সোহার দিকে কপাল ভ্রু কুঁচকে তাকিয়ে বলে,
“এখানে দুটো চায়ের কাপ কেন?”
“ওই পা পাশের ফ্ল্যাটের আন্টি এসেছিলেন।”
“ওই অসভ্য মহিলা?”
“হ্যাঁ।”
“দরজা খুলেছিস কেন আর ওই মহিলাকে ফ্ল্যাটে ঢুকতে দিয়েছিস কেন?”
“আমি তো জানতাম না দরজা খোলা রেখেই তুমি চলে গেছ। আন্টি কলিং বেল বাজানোর পর রুম থেকে বেরিয়ে এসে দেখি দরজা খোলা। দরজা খোলা দেখে অবাক হয়েছিলাম। আমি কিছু বলার আগেই আন্টি নিজে থেকেই ভেতরে ঢুকে গেছেন।”
“কী কী বলেছে?”
“ওই আমরা বাড়িতে না থেকে এখানে কেন থাকি এসবই জিজ্ঞেস করছিলেন আর —”
“আর কী?”
সোহা হাত কচলাতে শুরু করে। শ্রবণের ধমক খেয়ে নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে বলে,
“আর বলছিলেন দ্রুত বাচ্চা নিতে, পরে নাকি হবে না, সমস্যা হবে।”
চলবে…………
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১
-
দিশেহারা পর্ব ২২
-
দিশেহারা পর্ব ৪২
-
দিশেহারা পর্ব ৮
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ২৩
-
দিশেহারা পর্ব ৩১
-
দিশেহারা পর্ব ১৯
-
দিশেহারা পর্ব ৩
-
তোমার সঙ্গে এক জনম গল্পের লিংক