দিশেহারা পর্ব ১
“সকলের সামনে ওকে কিস করবে নয়তো ডান্স করবে। দুইটার মধ্যে যেকোনো একটা করলেই হলো। নাউ ফাস্ট।”
র্যাগিং এর শিকার হয়ে মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে আছে সোহা। ওকে যা করতে বলা হচ্ছে সেগুলো ও জীবনেও করবে না। একটা ছেলে কে কেনো কিস করবে? কেনই বা শত শত মানুষের সামনে নাচবে? সিনিয়র বলে যা ইচ্ছে হবে তাই করাবে ওকে দিয়ে?
সামনে দাঁড়িয়ে থাকা সিনিয়রদের মধ্যে থেকে একজন ধমকের সুরে বলে,
“এই মেয়ে কী বলছি শুনতে পাচ্ছো না? কিস করো ওকে।”
সোহা মাথা তুলে তাকায়। যেই ছেলে কে কিস করতে বলছে তার দিকে এক নজর তাকায়। ওর চোখ দুটো পানিতে টুইটুম্বর হয়ে গেছে। সামনে দাঁড়িয়ে থাকা দুজনের মুখ ভঙ্গি গম্ভীর, একজনের মুখ একটু বেশিই গম্ভীর হয়ে আছে। বাকিদের ঠোঁটে হাসি ফুটে আছে।
সাহায্যের আশায় একজনের মুখের দিকে তাকিয়ে রইলো সোহা, তবে যার দিকে ও তাকিয়ে আছে সে ওর দিকে ভুলেও তাকাচ্ছে না। গম্ভীর চোখ মুখে ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে আছে সে।
“কিস করো নয়তো ডান্স করো। তোমার জন্য আমরা সারা দিন এখানে দাঁড়িয়ে থাকবো না।”
সোহা শুকনো ঢোঁক গিলে জিহ্বা দিয়ে শুষ্ক ওষ্ঠ জোড়া ভিজিয়ে জড়ানো গলায় বলে,
“আপনারা এমন করছেন কেন আমার সাথে? আমাকে যেতে দিন এখান থেকে।”
পাশ থেকে একজন বলে,
“সোনা মনি তোমাকে যেতে দিতেই তো চাইছি, আমরা যা করতে বলছি দ্রুত সেটা সেরে ফেললেই তো হয়।”
“আমি ওনাকে কিস করবো না।”
“ঠিক আছে ডান্স করো।”
“ডান্স করতে পারি না।”
“তাহলে কিস করো, এটা করা একদম সহজ।”
কথা গুলো বলে ছেলে টা দাঁত বের করে হাসে। সোহার শরীর রীতিমতো থরথর করে কাঁপতে শুরু করেছে। জীবনে এই প্রথম এমন পরিস্থিতির শিকার হয়েছে। সহজ সরল ভীতু একটা মেয়ে। কি করে এদের হাত থেকে রক্ষা পাবে সেটাও বুঝতে পারছে না। ওকে এখান থেকে যেতেই দিচ্ছে না কেউ, ঘেরাও করে রেখেছে সবাই।
“এই মেয়ে কথা কানে যাচ্ছে না? দ্রুত করো।”
সোহা থেমে থেমে ভয় জড়ানো গলায় আবার বলে,
“আ আমি এসব কিছুই করতে পা পারবো না। আমাকে যেতে দিন।”
“আজ পর্যন্ত আমাদের হাত থেকে কেউ রক্ষা পায়নি, তুমিও পাবে না। এই দুটোর একটা যদি করতে না পারো তাহলে এক হাজার বার কান ধরে উঠবস করো।”
চমকে ওঠে সোহা। এক হাজার বার কান ধরে উঠবস করতে হবে! এক হাজার বার কান ধরে উঠবস করলে ও হাঁটতে পারবে?
“সোনা মনি দ্রুত করো।”
ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থাকা যুবক ঘাড় ঘুরিয়ে ফ্রেন্ড হাসান মাহবুবের দিকে তাকায়। এভাবে তাকাতে দেখে হাসান বলে,
“দেরি হয়ে যাচ্ছে, ওই দুটো যখন করবে না তখন কান ধরে উঠবস করুক।”
যুবক টা পুনরায় ফোনের স্ক্রিনে তাকায়। ফোনের মধ্যে কি করছে কে জানে!
সোহার দু’চোখ বেয়ে পানি গড়িয়ে পড়তে শুরু করে।
খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে এদের কথা না শুনলে এদের হাত থেকে নিস্তার নেই। আর সামনে গম্ভীর হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা পাষাণ লোক টাও ওকে সাহায্য করবে না। কাঁধের ব্যাগ নামিয়ে রেখে দুই হাতে দুই কান ধরে। নিচের দিকে দৃষ্টি রেখে উঠবস করতে শুরু করে। কয়েক জন ছেলে কাউন্ট করছে জোরে জোরে সুর ধরে।
উঠবস করতে করতে অপমানে, দুঃখে, কষ্টে ফুঁপিয়ে ওঠে সোহা। এতক্ষণে এসে সামনে দাঁড়িয়ে থাকা গম্ভীর পুরুষ শ্রবণ চৌধুরী ফোনের স্ক্রিন থেকে চোখ সরিয়ে সোহার দিকে তাকায়। ফোন পকেটে ভরে দুই হাত প্যান্টের পকেটে গুঁজে সিনা টান টান করে রাখে।
একশ পর্যন্ত হতেই এতক্ষণ গম্ভীর হয়ে চুপ চাপ থাকা শ্রবণ গম্ভীর বিরক্তি মাখা স্বরে বলে,
“এর ন্যাকা কান্না শুনতে ভালো লাগছে না, এটাকে দূর কর এখন। অন্য টা কে সামনে আন।”
শ্রবণের সব ফ্রেন্ড ওর দিকে তাকায় অবাক হয়ে। শ্রবণ বলছে এখনই ছেড়ে দিতে! সিরিয়াসলি?
হাসান সোহা কে বলে,
“এই মেয়ে যাও এখন।”
সোহা কান ছেড়ে ব্যাগ তুলতে তুলতে অভিমান ভরা দৃষ্টিতে শ্রবণের দিকে তাকায় একবার। চোখাচোখি হতেই চোখ নামিয়ে নিয়ে ব্যাগ হাতে সকলের মধ্যে থেকে বেরিয়ে গেটের দিকে এগিয়ে যায় চোখের পানি মুছতে মুছতে। আজকে আর ক্লাস করবে না। আশে পাশের সবাই ওর দিকে তাকিয়ে আছে, অনেকে হাসাহাসি করছে। গত সপ্তাহ থেকে রেগুলার ভার্সিটিতে আসা যাওয়া করে কোনো সমস্যা হয়নি। আজকে গেট পেরিয়ে ভেতরে প্রবেশ করতেই দু’জন ছেলে ওকে ভয় দেখিয়ে এখানে নিয়ে এসেছিল।
শ্রবণ নিজেই সোহা কে দুটো অপশন দিয়েছিল হয় কিস করবে নয়তো ডান্স করবে। সোহার মুখের দিকে তাকিয়েও দেখেনি, ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে থেকেই বলেছিল কথা গুলো।
সোহা চোখের পানি মুছতে মুছতে বাড়ির ভেতর প্রবেশ করে। কেঁদেকেটে চোখ মুখ লাল হয়ে গেছে। এখনো হেঁচকি তুলছে সমানে।
সোফায় বসে থাকা সোহার দাদা সামাদ চৌধুরী নাতনির মুখের দিকে তাকিয়ে চমকে ওঠেন। অবাক হয়ে বলেন,
“সোহা কী হয়েছে দাদু ভাই? এভাবে কাদঁছো কেন আর ভার্সিটি থেকে ফিরে আসলে কেন?”
সোহা ফোঁপাতে ফোঁপাতে পুরো ঘটনা খুলে বলে। বেচারি কান্নার কারণে ঠিক মতো বলতেও পারছে না।
সামাদ চৌধুরী বিস্ময় নিয়ে বলেন,
“শ্রবণ তোমাকে এসব করতে বলেছে?”
“হ্যাঁ।”
“শ্রবণ ভার্সিটিতে র্যাগিং করে?”
“হ্যাঁ, খুবই বাজে বাজে কাজ করতে বলে। আমি আর ওই ভার্সিটিতে যাব না।”
“রুমে গিয়ে চেঞ্জ করে ফ্রেস হও, আমি দেখছি।”
“তুমি ভাইয়া কে কিছু বলো না, কিছু বললে আরো রেগে যাবে আমি তোমাকে বলেছি বলে।”
“আমি দেখছি তুমি যাও, ভয় পাওয়ার কিছু নেই। প্রয়োজনে আমি তোমাকে ভার্সিটিতে নিয়ে যাব আবার নিয়ে আসবো।”
সোহা চোখের পানি মুছতে মুছতে সিঁড়ির দিকে এগিয়ে যায়।
সামাদ চৌধুরী রুমে এসে নিজের ফোন হাতে নিয়ে শ্রবণের ফোনে কল করেন। রিং হওয়ার একটু পরেই রিসিভ হয়।
“আস-সালামু আ’লাইকুম দাদা ভাই”
“ওয়া আ’লাইকুমুস-সালাম।”
“কেমন আছো?”
“আলহামদুলিল্লাহ, তুমি কেমন আছো?”
“ভালো।”
“তুমি ভার্সিটিতে কী করেছো আজ?”
“কী করেছি?”
“সোহা কে র্যাগ দিয়েছো কেন?”
“কে সোহা?”
“সোহা কে চিনতে পারছো না তুমি?”
“না।”
“তোমার চাচাতো বোন সোহা।”
“সরি দাদা ভাই; আমি কোনো চাচাতো বোন কে চিনি না।”
“শ্রবণ।”
“আমি তোমাকে ছাড়া আর কাউকে চিনি না ওই বাড়ির। অন্য কিছু বলার থাকলে বলো নাহয় রাখছি, আমি এখন ক্লাসে আছি।”
“তুমি ভার্সিটিতে মেয়েদের র্যাগিং করো?”
“শুধু মেয়েদের না ছেলেদেরও করি।”
“এসব কেনো করো?”
“আমাকেও করা হয়েছিল।”
“বিকেলে বাড়িতে আসবে আজ।”
“সময় হলে আমি নিজেই যাব।”
“তোমার বাবা তোমাকে কিছু বলেনি?”
“কে বাবা? আমার মায়ের সাথে সাথে বাবাও ম’রে গেছে।”
“আমি বলছি তোমাকে, তুমি বিকেলে বাড়িতে আসবে।”
“চেষ্টা করব। রাখছি এখন, ভালো থেকো।”
ফোন কে’টে দিয়ে রাগে দাঁত কটমট করে শ্রবণ। বাড়িতে গিয়ে ওর নামে দাদার কাছে নালিশ দেওয়া হয়েছে? আজকে তো শুধু কান ধরে উঠবস করেছে, পরের বার….
রাগে বসা থেকে উঠে গটগট করে হেঁটে ক্লাস থেকে বেরিয়ে যায়। ওর ফ্রেন্ডরা পেছন থেকে তাকিয়ে থাকে। এভাবে বেরিয়ে গেলো কেন? কী হলো আবার?
চলবে………
দিশেহারা (০১)
সানা_শেখ
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১৮
-
দিশেহারা পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ৫
-
দিশেহারা পর্ব ১৩
-
দিশেহারা পর্ব ৭
-
দিশেহারা গল্পের লিংক
-
তোমার সঙ্গে এক জনম গল্পের লিংক
-
দিশেহারা পর্ব ৩৮
-
দিশেহারা পর্ব ২৩
-
দিশেহারা পর্ব ৩১