দিশেহারা (২০)
সানা_শেখ
কল কা’টা’র তিন মিনিট পরেই রুমে প্রবেশ করে শ্রবণ। বিছানার দিকে তাকিয়ে দেখে সোহা ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে আগা গোড়া ঢেকে বসে আছে উল্টো ফিরে।
শ্রবণ ধমক দিয়ে বলে,
“ওই, এভাবে বসে আছিস কেন?”
ভয় পেয়ে চিৎকার করে ওঠে সোহা। আতঙ্কিত হয়ে খাটের হেডবোর্ডের সঙ্গে ঠেকে গেছে। উবু হয়ে বসে ভূ’ত ভূ’ত বলে চিৎকার করতে থাকে সমান তালে।
শ্রবণ বিরক্ত হয়ে আরেক ধমক দিয়ে বলে,
“চুপ করবি নাকী লাথি দিয়ে পাঁচ তলা থেকে নিচে ফেলে দেব?”
শ্রবণের কথাগুলো বোধহয় শুনতে পায়নি সোহা। শ্রবণ ধৈর্য হারা হয়ে বিছানায় উঠে সোহার উপর থেকে ব্ল্যাঙ্কেট টেনে সরিয়ে নেয়। খামচে ধরেও ব্ল্যাঙ্কেট আটকে রাখতে পারে না সোহা। ভয়ে ওর চিৎকার বেড়ে গেছে আরও।
শ্রবণ সোহাকে সোজা করার চেষ্টা করে দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“মুখ বন্ধ করবি নাকী দেবো কানশা বরাবর একটা?”
সোহা কাঁদতে কাঁদতে মুখ তুলে শ্রবণের মুখের দিকে তাকায়। ভয়ে আরও জোরে চিৎকার করে ওঠে। কাঁদতে কাঁদতে মিনতি করে বলে,
“মে’রে ফেলবেন না আমাকে, আমি ছোটো মানুষ।”
“এই, কী হয়েছে তোর? এমন করছিস কেন?”
“কে আপনি?”
“শ’য়’তা’ন বেডি তোর জামাই আমি। নিজের জামাইকেও চিনিস না? চিনবি কীভাবে, মনের মধ্যে তো অন্য বেডাদের ঢুকিয়ে রাখিস।”
সোহা কম্পিত হাত বাড়িয়ে শ্রবণের গালে হাত রাখে, এটা সত্যিই শ্রবণ নাকী ওর রূপ ধরে জ্বীন ভূ’ত এসেছে? শ্রবণ নিজের গাল থেকে ঝাড়ি দিয়ে সোহার হাত সরিয়ে দেয়। সোহা কাঁদতে কাঁদতে আবার বলে,
“তুমি সত্যিই ভাইয়া?”
“এ্যাই নেশা-পানি কিছু খেয়েছিস? এমন উদ্ভট আচরণ করছিস কেন নাকী ভূতে ধরেছে এই ভরা সন্ধ্যায়?”
“তুমি না বললে তোমার ফিরতে দেরি হবে তাহলে এত দ্রুত কীভাবে আসলে?”
শ্রবণ বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। শার্টের বোতাম খুলতে খুলতে ড্রেসিং টেবিলের সামনে এসে দাঁড়ায়। শ’য়’তা’ন মেয়ে চিৎকার চেঁচামেচি করে দিলো মাথা ব্যথা বাড়িয়ে। এমনিতেই ভালো লাগছে না।
হাতের ঘড়ি, শার্ট, প্যান্টের পকেট থেকে ফোন, ওয়ালেট সব বের করে রেখে দেয়।
টাওয়েল হাতে প্রবেশ করে ওয়াশরুমে। গোসল করে এখন মাথা ঠাণ্ডা করবে।
সোহার কল যখন রিসিভ করেছিল তখন শ্রবণ ফ্ল্যাটের লিফটের সামনে দাঁড়িয়ে ছিল।
অফিসে গিয়ে শামীম রেজা চৌধুরীকে পায়নি, উনি প্রজেক্টের কাজে দেশের বাইরে চলে গেছেন, কবে ফিরবেন ঠিক নেই। আরও দু’দিন পর যাওয়ার কথা থাকলেও হুট করে গত রাতে টিকেট কে’টে চলে গেছেন। শ্রবণ স্পষ্টই বুঝতে পারছে উনি মূলত ওর কাছ থেকে বাঁচার জন্যই দ্রুত পালিয়ে গেছেন। পালিয়ে গেছেন তো কী হয়েছে? কত দিন ওখানে পড়ে থাকবেন? দেশে তো ফিরতেই হবে, তখন দেখে নেবে ওনাকে।
অফিস থেকে ফিরে সারাদিন বন্ধুদের সঙ্গেই ছিল, দুপুরে ওদের সঙ্গেই রেস্টুরেন্টে খেয়েছে। মাথা ব্যথা বেড়ে গিয়েছিল তার উপর সোহা ফ্ল্যাটে একা একা রয়েছে, এই মেয়ে যা ভীতু সেটা শ্রবণের চেয়ে ভালো আর কেউ বোধহয় জানে না। দেখা যাবে ভয়ে ম’রে নিজেই ভূ’ত হয়ে গেছে। এই দুটো কারণেই মূলত রাতের আগে ফিরে এসেছে নয়তো মাঝরাতে ফিরত। ফিরে এসে তো মাথা ব্যথা আরও বেড়ে গেল।
সোহা থম ধরে বসে আছে। কী ঘটে গেল একমুহুর্তের মধ্যেই! আরেকটু হলেই তো ওর আত্মারাম খাঁচাছাড়া হয়ে যেত। ও-তো ভেবেই নিয়েছিল কোনো দুষ্ট জ্বীন বা ভূ’ত শ্রবণের রূপ ধারণ করে এসেছে ওকে মা’রতে।
দীর্ঘ সময় ধরে গোসল করার পর ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে শ্রবণ। দরজা খোলার আওয়াজ পেয়ে সেদিকে নজর দেয় সোহা। সদ্য গোসল করার কারণে শ্রবণের চকচকে ফরসা দেহ আরও চকচক করছে। চুলগুলো ভালোভাবে মোছেনি, এলোমেলো ভেজা চুলগুলো থেকে টুপটাপ পানি গড়িয়ে পড়ছে। গায়েও পানি বিদ্যমান রয়েছে এখনো।
আলমারি থেকে ট্রাউজার বের করে পরে নেয়। শরীর আর চুল ভালোভাবে মুছে একটা ধূসর রঙের টিশার্ট গায়ে জড়ায়।
এগিয়ে এসে বিছানায় উঠে আলগোছে উপুর হয়ে শুয়ে পড়ে সোহার পাশে নিজের বালিশে।
সোহা পাশে বসে তাকিয়ে থাকে শ্রবণের দিকে। ওকে কোনো প্রশ্ন করার সাহস হচ্ছে না ওর।
চুপচাপ নীরবতায় পেরিয়ে গেছে প্রায় আধা ঘন্টা। সোহা নিজের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করে বলে,
“খাবে না?”
শ্রবণ উত্তর দেয় না। সোহা পুনরায় বলে,
“ঘুমিয়ে পড়েছ? খাবে না?”
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে সোহার দিকে তাকায়। ঘুমায়নি, চোখ বন্ধ করে ছিল।
শ্রবণকে তাকাতে দেখে মিনমিন করে বলে,
“খাবে না?”
“কী খাব? রান্না করেছিস?”
সোহা মাথা নেড়ে বলে,
“হ্যাঁ, রেঁধেছি।”
শ্রবণ অবাক হয়ে বলে,
“সত্যিই রেঁধেছিস?”
“হ্যাঁ।”
“কি কি?”
“করলা আর ডাল ছিল না তাই মাংস, ডিম ভুনা, মাছ ভাজি আর ভাত রান্না করেছি।”
“রান্না ভালো হয়েছে?”
সোহা শুকনো ঢোঁক গিলে বলে,
“খেয়ে দেখো।”
“যদি ভালো না হয় তাহলে তোকে কি করবো আমি নিজেও জানি না।”
কথা বলতে বলতে শোয়া থেকে উঠে বসে শ্রবণ। কপালে ছড়িয়ে থাকা চুলগুলো পেছনে ঠেলে দিয়ে বিছানা থেকে নেমে দাঁড়ায়। সোহার দিকে তাকিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে বলে,
“আপনাকে কী কোলে তুলে নিয়ে যেতে হবে?”
সোহা দ্রুত বিছানা ছেড়ে নেমে বাইরের দিকে এগিয়ে যায়। শ্রবণ আগায় সোহার পেছন পেছন।
চেয়ার টেনে বসে শ্রবণ।
সোহা ওর মুখের দিকে তাকিয়ে মিনমিন করে বলে,
“সব ঠান্ডা হয়ে গেছে, তুমি একটু বসো আমি গরম করে নিয়ে আসি।”
“যা।”
সোহা একে একে সব গরম করে নিয়ে আসে। অদক্ষ হাত হওয়ায় বেশ সময় লেগে গেছে সব গরম করতে।
প্লেট ধুয়ে এনে শ্রবণের জন্য খাবার বেড়ে দেয়। শ্রবণ মাছ, ডিম ভুনা কিছুই নেয়নি শুধু মাংস দিতে বলেছে।
গম্ভীর চোখে মুখে সোহার মুখের দিকে তাকিয়ে প্লেটে হাত দেয় খাওয়ার জন্য।
সোহা মনে মনে আল্লাহকে ডাকছে।
প্রথম লোকমা মুখে পুরে স্থির হয়ে যায় শ্রবণ। কপাল ভ্রু কুঁচকে সোহার মুখের দিকে তাকায়। ওর মুখের দিকে তাকিয়ে থেকেই মুখের খাবার শেষ করে আবার মুখে পুরে দেয়।
ভয়ে সোহার হাত মৃদু কাঁপছে সঙ্গে ঘামছেও।
শ্রবণ প্লেটের দিকে তাকিয়ে গম্ভীর স্বরে বলে,
“তোকে কে রান্না করে দিয়েছে?”
“কেউ না।”
“মিথ্যে বলছিস কেন?”
“সত্যিই কেউ দেয়নি, তুমি তো বাইরে থেকে দরজা লাগিয়ে রেখে গিয়েছিলে, বাইরে থেকে কেউ ভেতরে কীভাবে আসবে বন্ধ দরজা দিয়ে?”
“রান্না শিখলি কীভাবে?”
“ইউটিউব থেকে।”
শ্রবণ আর কিছু না বলে খাওয়া চালিয়ে যায়। মন্দ হয়নি রান্না, ভালোই লাগছে খেতে। প্রথমবার হিসেবে অনেক ভালো রেঁধেছে।
শ্রবণের খাওয়া অর্ধেকের বেশি শেষ তখন সোহার দিকে চোখ পড়ে আবার। কপাল ভ্রু কুঁচকে রেখে গম্ভীর স্বরে বলে,
“খেয়েছিস?”
দু’দিকে মাথা নাড়ে সোহা।
“দুপুরে খাসনি?”
“না।”
“কেন?”
“তোমার জন্য অপেক্ষা করছিলাম।”
“কেন? জামাইয়ের জন্য দরদ উথলে পড়ছিল নাকী?”
সোহা চুপ হয়ে থাকে।
“খেতে বোস।”
সোহা দ্রুত চেয়ার টেনে বসে খাওয়ার জন্য। খিদেয় ওর পেট চোচো করছে। এতক্ষণ শ্রবণের ভয়ে বসছিল না।
শ্রবণ খাওয়া শেষ করেই বসা থেকে উঠে রুমের দিকে পা বাড়ায়। সোহা পেছন থেকে বলে,
“আগেই যেও না, একটু এখানে বসে থাকো।”
শ্রবণ ঘাড় কাত করে সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কেন?”
“ভয় লাগে, দুই মিনিট বসো আমার খাওয়া হয়ে যাবে।”
শ্রবণ দুই সেকেন্ডও দাঁড়ায় না, ধুপধাপ পা ফেলে রুমের দিকে এগিয়ে যায়। সোহা পেছন থেকে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে থাকে। একটু দাঁড়ালে কী হতো?
ভয়ে ভয়ে দ্রুত খাওয়া শেষ করে সোহা। প্রায় দৌড়ে দৌড়ে বাকি খাবার ফ্রিজে তুলে রেখে দেয়। ডাইনিং টেবিল না গুছিয়ে রেখে এক দৌড়ে রুমে প্রবেশ করে। শ্রবণ গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আছে, হয়তো ঔষুধ খেলো। সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“কিরে ম্যারাথন রেসে অংশ নিয়েছিস নাকী?”
সোহা দু’দিকে মাথা নাড়িয়ে শোয়ার জন্য বিছানা ঠিক করে দেয়। শ্রবণ পানির গ্লাস রেখে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে। মাথা ব্যথা কমলেও একে বারে কমেনি, জ্বর উঠবে বোধহয়। মাথা কেমন ঝিমঝিম করছে দুপুরের পর থেকে। জ্বর আসলেই সাড়ে সর্বনাশ।
সোহা কপাল ভ্রু কিঞ্চিৎ কুঁচকে তাকিয়ে আছে শ্রবণের দিকে। আজকে এত দ্রুত শুয়ে পড়ল!
সোহাকে নিজের দিকে তাকিয়ে থাকতে দেখে শ্রবণ ধমক দিয়ে বলে,
“চোখ দিয়ে গিলে খাবি নাকী এখন? খাবার খেয়েছিস তো; এখন ঘুমা, ডাইনির দুই নাম্বার বাচ্চা।”
সোহা ফ্রেশ হয়ে এসে রুমের লাইট অফ করে ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে বিছানায় উঠে ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে বুক পর্যন্ত ঢেকে শুয়ে পড়ে। ওর এখন ঘুম আসছে না তাই উল্টো ফিরে ফেসবুক লগইন করে। রিলস্ দেখা ছাড়া দেখার মতো আর কিছু নেই ওর।
রান্নার কথা খেয়াল হতেই ঘাড় ঘুরিয়ে শ্রবণের দিকে তাকায়। রান্না নিয়ে অনেক ভয়ে ছিল কিন্তু শ্রবণ সেরকম কিছু বলেনি বা করেনি। রান্না হয়তো ওর কাছে ভালো লেগেছে তাই চুপচাপ আছে।
ঘাড় ঘুরিয়ে নেয় আবার। ফেসবুক থেকে বেরিয়ে ইউটিউবে প্রবেশ করে রান্নার ভিডিও দেখার জন্য।
শ্রবণ উপুর হয়ে দুই হাতে মাথার চুল টেনে ধরে রেখেছে। এই মাথাটা বরাবর ওর সঙ্গে বেইমানি করে, এত যন্ত্রণা দেয় ওকে যা বলার মতো না। মাঝে মধ্যে ইচ্ছে করে শরীর থেকে মাথা আলাদা করে ফেলতে।
না থাকবে মাথা আর না করবে ব্যথা।
ঘড়ির কাঁটা ঘুরতে ঘুরতে রাতের শেষ প্রহরে চলে এসেছে।
শ্রবণের ছটফটানি আর হালকা গোঙানির আওয়াজে সোহার ঘুম হালকা হয়ে আসে। কান খাঁড়া করতেই আওয়াজ আরও স্পষ্ট হয়। চোখ মেলে তাকায় অন্ধকারের মধ্যে। শ্রবণ তো ঘুমের মধ্যে এমন শব্দ করে না, এখন পর্যন্ত সোহা শোনেনি। মাঝেমধ্যে চিৎকার করে ওঠে শুধু।
ফোনের ফ্ল্যাশ অন করে বিছানা ছেড়ে নেমে দাঁড়ায়। ঘুরে এসে রুমের লাইট অন করে শ্রবণের দিকে তাকায়। কেমন যেন অদ্ভুত আচরণ করছে আজ।
কয়েকবার ডেকেও সাড়া পায় না শ্রবণের কাছ থেকে। গায়ে হাত দেয় ধাক্কা দিয়ে ডাকার জন্য কিন্তু গায়ে হাত দিয়ে চমকে ওঠে সোহা। জ্বরে শ্রবণের গা পুড়ে যাচ্ছে। কপালে হাত রেখে জ্বরের মাত্রা আরও ভালোভাবে বুঝতে পারে সঙ্গে এটাও বুঝতে পারে এই মাত্রাতিরিক্ত জ্বরের কারণে এমন অদ্ভুত আচরণ করছে ঘুমের মধ্যে।
গায়ে ধাক্কা দিয়ে আরও কয়েকবার ডাকার পর পিটপিট করে তাকায় শ্রবণ। জ্বরের কারণে চোখ মেলতে পারছে না।
নিজের রুমে মেয়ে মানুষ দেখে জ্বরের ঘোরেই বকা দিয়ে বলে,
“এই মহিলা, আপনি আমার রুমে কী করছেন? বের হন আমার রুম থেকে। আমার ফ্ল্যাটে আসার সাহস হলো কীভাবে আপনার? ভেতরে কীভাবে আসলেন?”
সোহা শ্রবণকে ছেড়ে সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। ও মহিলা? নিজের বউকেও চিনছে না? ও একা এসেছে নাকী জোর করেই তো নিয়ে এসেছে।
শ্রবণ চোখ বন্ধ করে নিয়ে বলে,
“এই বজ্জাত মহিলা বের হন আমার রুম আর ফ্ল্যাট থেকে। এই ফ্ল্যাটে মহিলা মানুষদের প্রবেশ নিষেধ শুধুমাত্র মাজেদা আন্টি বাদে।”
সোহা ধীর স্বরে বলে,
“তুমি আমাকে চিনতে পারছো না?”
“না, কে আপনি?”
“আমি সোহা।”
“কোন সোহা?……. এই ডাইনির বাচ্চা তুই এখানে কেন? বের হ আমার ফ্ল্যাট থেকে।”
“তুমিই তো আমাকে নিয়ে এসেছ।”
“আমি নিয়ে এসেছি? কেন নিয়ে এসেছি?”
“ভুলে গেছো সব? ভালোভাবে মনে করার চেষ্টা করো আমি তোমার ওয়াইফ।”
শ্রবণ অবাক হয়ে চোখ টেনে তোলার চেষ্টা করে সোহার দিকে তাকিয়ে বলে,
“আমি, বিয়ে করেছি?”
“হ্যাঁ।”
“কবে?”
“অনেকদিন হয়েছে।”
শ্রবণ ভাবুক হয়ে যায়, কবে বিয়ে করেছে ভাবতে শুরু করে। কিছুতেই মনে পড়ছে না কবে বিয়ে করেছে। ওর বউ আছে? আশ্চর্য, যেই ছেলে মেয়েদের থেকে একশ হাত দূরে থাকে সে বিয়ে করেছে?
জ্বরের ঘোরে শ্রবণের অবস্থা নেশাখোর মাতালের মতো। জ্বরের তীব্রতায় ছটফট করছে। উল্টা পাল্টা কথা বলছে বিড়বিড় করে। আবার ফাঁকে ফাঁকে কাকে যেন গালী দিচ্ছে। বউয়ের কথা ভাবতে গিয়ে এখন সেটাও ভুলে গেছে।
কিট বক্স বের করে জ্বরের ঔষুধ খোঁজে। এইচ প্লাস ট্যাবলেট আছে দুটো। ওখান থেকে একটা বের করে শ্রবণের শিয়রে দাঁড়ায়। এখন ঔষধটা খাওয়ানো গেলেই হয়।
“ওঠো, ঔষুধ খাও জ্বর ভালো হয়ে যাবে।”
শ্রবণ বলে না কিছু, সোহার দিকে তাকায়ও না। জ্বরের কারণে শ্রবণের ফরসা চেহারা লাল হয়ে গেছে। কেমন করছে, মায়া হচ্ছে সোহার।
শ্রবণের বাহুতে মৃদু ধাক্কা দিয়ে বলে,
“ওঠো, জ্বরের ঔষুধ খাও ভালো লাগবে।”
“ওই কু’ত্তা’র বাচ্চা শু’য়ো’র আমার টাকা মে’রে দিয়ে পালিয়ে গেছে।”
“কে?”
“নাম যেন কী ভুলে গেছি।”
“ওঠো।”
“খিদে পেয়েছে আমার, দুপুরে খাইনি; রাতেও খাইনি। খাব, খাবার নিয়ে আয়।”
“রাতে খাওনি?”
“না।”
“গরুর মাংস দিয়ে ভাত কে খেলো?”
“জানিনা।”
“ঔষুধটা খাও সব জানতে পারবে।”
“খাব না ঔষুধ, ভাত খাব, ভাত নিয়ে আয়।”
সোহা শ্রবণকে শোয়া থেকে তোলার চেষ্টা করে। শ্রবণ উঠবে না জেদ ধরে বলে,
“খাব না বা/লের ঔষুধ, খাবার নিয়ে আয় খিদেয় আমার পেট চোচো করছে।”
সোহা কোনো রকমে টেনে টুনে তুলে ঔষুধ খাইয়ে দেয় জোর করে। শ্রবণ ঔষুধ গিলেই সোহার কাঁধের ওপর মাথা এলিয়ে দেয়। নরম স্বরে বাচ্চাদের মতো করে বলে,
“ভাত খাব খিদে পেয়েছে আমার।”
“তুমি শুয়ে থাকো আমি ভাত নিয়ে আসছি।”
সোহা উঠে যেতে চাইলেও শ্রবণ ছাড়তে নারাজ ওকে। কাঁধে মাথা রেখে কোমর জড়িয়ে ধরে বসে রইলো। ওর শরীরের তাপে সোহার চামড়াই যেন ঝলসে যাবে।
সোহা নিজের কাঁধ থেকে শ্রবণের মাথা সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করে বলে,
“ছাড়ো ভাত নিয়ে আসি।”
শ্রবণ নিশ্চুপ হয়ে থাকে। ওর এত গভীর স্পর্শে সোহার শরীর শিউরে উঠছে বারংবার। বুকে ভেতর কম্পন বেড়ে গেছে। অচেনা অনুভূতি ছুঁয়ে যাচ্ছে মন মস্তিষ্কে। শ্রবণ ওর কাঁধে মাথা রেখেও বিড়বিড় করে যেন কি বলছে। এতক্ষণের সব ছটফট পাগলামি থেমে গেছে। একদম শান্ত হয়ে বসে আছে।
“শীত করছে।”
“এখানে শুয়ে পড়ো ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে শরীর ঢেকে দেই।”
“খাব।”
“তাহলে ছাড়ো আমাকে।”
সোহা শ্রবণের কাছ থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে উঠে দাঁড়ায়। শ্রবণ ঘাড় সোজা করে বসে থাকতে পারছে না। নিজে থেকেই শুয়ে পড়ে, সোহা ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে শরীর ঢেকে দিয়ে রুম থেকে বের হয়।
ভয়ে অন্তরাত্মা কাঁপতে শুরু করেছে। সারাদিন খায়না তখন কিছুই না, আর আজকে এই রাতের বেলা নাকী খিদে পেয়েছে! আবার বলছে রাতে নাকী খায়নি অথচ পেট ভরে খেয়ে ঘুমিয়েছিল। এখন খাব খাব করে গলা শুকিয়ে ফেলছে।
ভয়ে ভয়ে ভাত আর তরকারি গরম করে রুমে ফিরে আসে।
“ওঠো, ভাত নিয়ে এসেছি।”
শ্রবণ শরীর টেনে নিয়ে উঠে বসে তবে মাথা ঠিক রাখতে পারছে না, এদিক ওদিক হেলে পড়ে যাচ্ছে। সোহা খুব ভালো করেই বুঝতে পারছে শ্রবণ নিজের হাতে খেতে পারবে না, এখন ওকেই খাইয়ে দিতে হবে।
পানির গ্লাস আর প্লেট হাতে নিয়ে বিছানায় উঠে শ্রবণের ডান পাশে বসে। ও বসতেই শ্রবণ ওর গা ঘেঁষে বসে কাঁধে মাথা এলিয়ে দেয় আবার। এখানে মাথা রাখলে শান্তি লাগে। ব্ল্যাঙ্কেট দিয়ে বুক পর্যন্ত ঢেকে রেখেছে।
সোহা ভাত মেখে কম্পিত হাতে তুলে ধরে শ্রবণের মুখের কাছে। শ্রবণ বিনা বাক্যে বাধ্য ছেলের মতো ভাত মুখে পুরে নেয়। নাক-মুখ কুঁচকে ভাত গিলে বলে,
“ভাতের মধ্যে কী দিয়েছিস? এত তেতো কেন? বিশ্রী লাগছে, খাব না।”
কেমনটা লাগে? এত কষ্ট করে তাহলে কেন ভাত তরকারি গরম করল?
বলে বলে জোর করে আরও কয়েক লোকমা খাওয়ায় সোহা। পানি খাইয়ে প্লেট গ্লাস একপাশে রেখে হাত ধুয়ে আসে। টাওয়েল ভিজিয়ে এনে জোর করে শরীর মুছিয়ে দেয় এর জন্য গালিও খায়। চড় মা’র’তে নিয়েছিল সোহা সরে যাওয়ায় লাগেনি।
বালতিতে পানি এনে মাথায় পানি ঢেলে দেয়। মাথায় পানি ঢালার ফলে অনেক আরাম পায় শ্রবণ। ভালো লাগছে এখন।
শরীর ঠাণ্ডা হয়ে আসতেই বালতি আর ভেজা টাওয়েল ওয়াশরুমে রেখে আসে।
রুমের লাইট অফ করে বিছানায় উঠে শুয়ে পড়ে। শ্রবণ চুপচাপ শুয়ে আছে, নড়ছেও না চড়ছেও না।
ঘুমিয়ে গেছে নাকী?
সোহার ভাবনার মাঝেই শ্রবণ এগিয়ে এসে ওকে ব্ল্যাঙ্কেটের ভেতর টেনে নিয়ে শক্ত করে জড়িয়ে ধরে।
“কি করছো, ছাড়ো আমাকে।”
“চুপ, ডোন্ট ডিস্টার্ব।”
চলবে……………..
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ১৮
-
দিশেহারা পর্ব ৫
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৫
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৪
-
দিশেহারা পর্ব ২১
-
দিশেহারা পর্ব ১৬
-
দিশেহারা পর্ব ১৪
-
দিশেহারা পর্ব ৩২
-
দিশেহারা পর্ব ৪১
-
দিশেহারা পর্ব ১৩