দিশেহারা (১৪)
সানা_শেখ
বিষন্ন হয়ে সোফায় বসে ছিল শ্রবণ। ওর সাথে খেলার মতো তেমন কেউ ছিল না। সিয়াম তখনও ওর চেয়ে অনেক ছোটো। অনিমা চৌধুরী ছেলেকে শ্রবণের ধারে কাছেও যেতে দেননা। মেডকে কড়া নিষেধাজ্ঞা দিয়ে যেতেন যেন সিয়ামকে শ্রবণের কাছে যেতে না দেয়।
হঠাৎ কলিং বেল বেজে ওঠে। মেড এগিয়ে গিয়ে দরজা খুলে দেয়। শ্রবণ সোফায় বসে থেকেই দরজার দিকে তাকিয়ে ছিল ঘাড় ঘুরিয়ে।
ভেতরে প্রবেশ করে ওর বাবা শামীম রেজা চৌধুরী। তার কোলে তিন বছরের স্পর্শ। পাশে হেঁটে এগিয়ে আসছে তনিমা চৌধুরী। তার পরনে দামী গর্জিয়াস শাড়ি।
বাবার পাশে নারী আর কোলে ছোটো বাচ্চা দেখে সোফা থেকে নেমে এগিয়ে আসে পাঁচ বছরের শ্রবণ।
ছোটো ছোটো চোখ জোড়ায় কৌতূহল। বাবার মুখের দিকে তাকিয়ে বাচ্চা বাচ্চা কন্ঠে জিজ্ঞেস করে,
“আব্বু, কে উনি?”
শামীম রেজা চৌধুরী হাসি মুখে বলেন,
“ও তোমার নতুন আম্মু, আর এ হচ্ছে তোমার ছোটো ভাই, স্পর্শ।”
ছোটো শ্রবণ ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে ছিল কিছু সময়। ছোটো মস্তিষ্ক সবকিছু বুঝতে একটু সময় নিয়েছিল।
মায়ের মৃ’ত্যু’র মাত্র একমাস, এর মধ্যে বাবা দ্বিতীয় বিয়ে করে নিল? বোনের মৃ’ত্যু’র মাত্র ষোলো দিন হয়েছে।
তনিমা চৌধুরীকে আগে চিনতো না শ্রবণ, উনি আগে কখনও আসতেন না চৌধুরী বাড়িতে।
বড়ো ছেলের কান্ডে হতবাক হয়ে গিয়েছিলেন সামাদ চৌধুরী। শাহীন রেজা চৌধুরী তো বলার মতো কিছু খুঁজেই পাচ্ছিলেন না। ওনার স্ত্রীর বড়ো বোন এমন কিছু করবে উনি দুঃস্বপ্নেও ভাবেননি। উনি এটাও ভেবে পাচ্ছিলেন না যে তনিমা চৌধুরীর আগের হাজব্যান্ডের কী হয়েছে। উনি কোনোদিন তনিমা চৌধুরীর প্রথম হাজব্যান্ডকে দেখেননি। উনি অনেকবার জিজ্ঞেস করেছিলেন, কেউ উত্তর দেয়নি।
শামীম রেজা চৌধুরী আর তনিমা চৌধুরী বাড়ির সবাইকে যা বোঝায়, সবাই সেটাই বোঝে। কিন্তু শ্রবণ? ও বুঝতে চায়নি কিছু, মেনে নিতে পারেনি বাবার দ্বিতীয় বিয়ে। ওর মায়ের জায়গায় অন্য কেউ, এটা কিছুতেই মানতে পারছিল না।
আস্তে আস্তে দিন আগাতে থাকে, শ্রবণ নিজে থেকেই বাড়ির সকলের সাথে দূরত্ব তৈরি করে শুধু দাদা সামাদ চৌধুরী বাদে। সবাই নিজেদের নিয়ে ব্যস্ত, ওকে নিয়ে ভাবার সময় নেই। দাদা সামাদ চৌধুরীও তখন অফিসের কাজে ভীষন ব্যস্ত থাকতেন। অফিসিয়াল কাজে শহরের বাইরেই থাকতেন বেশি।
শামীম রেজা চৌধুরী তো বড়ো ছেলেকে ভুলেই গিয়েছিলেন। ওনার যে আরো একটা ছেলে আছে, সেটা মনেই রাখতেন না। ওনার যত আদর-যত্ন, আদিখ্যেতা, ভালোবাসা সব স্পর্শের জন্য। শ্রবণ দূর থেকে সব দেখতো, মনে মনে ভীষন কষ্ট পেতো, একা একা কাঁদত, অনেক সময় ধরে না খেয়ে থাকলেও কেউ খোঁজ নিতো না দাদা ব্যতীত। শামীম রেজা চৌধুরীকে দেখলে মনে হতো স্পর্শ ওনার নিজের ছেলে আর শ্রবণ সৎ ছেলে। সৎ ভাইকে বাবা এত ভালোবাসে সেটা শ্রবণের শিশু মন মানতে চাইতো না। ওর বাবা ওকে ভালোবাসবে, ওকে আদর করবে, কোলে নেবে কিন্তু ওর বাবা তো ওর কথা ভাবেই না উল্টো সারাদিন সৎ ছেলেকে নিয়ে পড়ে থাকে।
শামীম রেজা চৌধুরী দ্বিতীয় স্ত্রী আর ছোটো ছেলের সাথে রাতে ঘুমাতেন। একটা দিনও শ্রবণের কথা স্মরণ করেননি, ওর কাছে যাননি। দাদা বাড়িতে না থাকলে শ্রবণকে একা একা ঘুমাতে হয়েছে। কোনো কোনো রাতে একা একা ভয় লাগতো, ঘুম আসতো না। বালিশে মুখ গুঁজে চোখ বন্ধ করে গুমরে গুমরে কাঁদতো, কেউ খোঁজ নিতো না।
আস্তে আস্তে ছোটো শ্রবণের মনের মধ্যে রাগ, জেদ, ক্ষোভ জন্ম নিতে শুরু করে। বাড়ির সকলের কাছ থেকে পুরোপুরি দূরত্ব তৈরি করে নেয়। বুঝতে পেরে গিয়েছিল, এই বাড়িতে ওর আর কোনো মূল্য নেই।
চুপচাপ থাকলেও ভেতরে ভেতরে আস্ত একটা আগ্নেয়গিরি লালন করছিল।
সকলের সামনে তনিমা চৌধুরী ভালো মা হওয়ার অভিনয় করলেও আড়ালে সে শ্রবণের কথা অনুযায়ী আস্ত একটা ডাইনি। শ্রবণ ছোটো ছিল বলে দুই বোন যা নয় তাই ব্যবহার করতো ওর সঙ্গে। শ্রবণ ছোটো থাকলেও বুঝতে পারতো সবই, একেবারে অবুঝ ছিল না।
এভাবেই এক বছর পেরিয়ে যায়।
একদিন বিকেলে শ্রবণ টিভি দেখছিল একা একা। এর মধ্যে স্পর্শ ওর কাছে এগিয়ে আসে। শ্রবণের সাথে খেলতে চায়। শ্রবণ ওকে ইগনোর করে টিভির পর্দায় তাকিয়ে থাকে। স্পর্শ ওর হাত ধরে টানাটানি শুরু করে খেলার জন্য, সিয়াম ঘুমিয়ে গেছে, ওর সঙ্গে খেলার মতো এখন আর কেউ নেই তাই শ্রবণের কাছে এসেছে।
শ্রবণ বিরক্ত হয়ে বেশ কয়েকবার স্পর্শকে সরিয়ে দেয় কিন্তু নাছোড়বান্দা স্পর্শ শ্রবণের সাথেই খেলবে। শেষে ভীষণ বিরক্ত হয়ে হাত ঝাড়া মা’রে শ্রবণ। হাতের সাথে ধাক্কা লেগে স্পর্শ নিচে পড়ে যায় নিজের খেলনার উপর। ব্যথা পেয়ে কেঁদে ওঠে গলা ছেড়ে।
তনিমা চৌধুরী রুম থেকে দৌড়ে বেরিয়ে আসেন। মেড ততক্ষণে স্পর্শকে নিচ থেকে তুলেছে। ছোটো ছোটো খেলনা গাড়ির উপর পড়ে হাত ছিলে র’ক্ত বেরিয়ে এসেছে একটু।
ওনার বুঝতে বাকী থাকা না শ্রবণ যে ওনার ছেলেকে ধাক্কা মে’রে’ছিল।
তনিমা চৌধুরী ভীষণ রেগে শ্রবণের গালে চড় বসিয়ে দেন। সৎ মায়ের হাতে চড় খেয়ে মোটেও বিস্মিত হয়নি শ্রবণ, কারণ এর আগেও তার হাতে মা’র খেয়েছে কয়েকবার। সৎ মা ওর গায়ে হাত তোলে এই কথা কাউকে বলার মতো কোনো কারণ খুঁজে পায়নি ছোটো শ্রবণ। এমনিতেও শ্রবণ একটু চাপা স্বভাবের, কাউকে কোনো কিছু সহজে বলে না।
মেড মাথা নিচু করে বলে,
“ম্যাম, শ্রবণ স্পর্শকে ইচ্ছে করে ফেলেনি। স্পর্শ শ্রবণকে বিরক্ত করছিল —
বাকী কথা শোনার প্রয়োজন মনে করেন না তনিমা চৌধুরী। মেডের দিকে গরম চোখে তাকিয়ে বলেন,
“কী বলেছিলাম মনে আছে নাকী আবার মনে করিয়ে দিতে হবে? নিজের কাজে যাও।”
মেড চলে যায়। তনিমা চৌধুরী ছেলেকে কোলে নিয়ে আদর করতে করতে রুমের দিকে এগিয়ে যান। শ্রবণ রাগে হুশ জ্ঞান হারিয়ে টিভির রিমোট আছাড় মে’রে ভেঙে ফেলে। স্পর্শের ক্রিকেট ব্যাট হাতে নিয়ে টিভি ভেঙে ফেলে। বেশ কয়েকটা দামী দামী ফুলদানি আর সোপিস ছিল, সেগুলোও ভেঙে ফেলে। কাচের টি টেবিলটাও ভেঙে ফেলে। মেড দূরে দাঁড়িয়ে দেখলেও এগিয়ে আসে না ওকে থামানোর জন্য।
ঘণ্টা খানিক পর বাড়িতে ফিরে আসেন শামীম রেজা চৌধুরী। ড্রয়িং রুমে একবার নজর বুলিয়ে সোজা প্রবেশ করেন বড়ো ছেলের রুমে। শ্রবণ তখন স্টাডি টেবিলে বসে আছে।
শামীম রেজা চৌধুরী নির্মমভাবে মে’রে’ছিলেন সেদিন শ্রবণকে। তনিমা চৌধুরী স্পর্শের হাতের আর ড্রয়িং রুমের ছবি তুলে শামীম রেজা চৌধুরীকে পাঠিয়েছিলেন। হাজারটা মিথ্যে কথা বানিয়ে বলেছিলেন। শামীম রেজা চৌধুরী সত্যতা যাচাই না করেই ছেলের গায়ে প্রহার করেছিলেন। সেদিন সামাদ চৌধুরী ঢাকায় ছিলেন না, অফিসিয়াল কাজে ঢাকার বাইরে গিয়েছিলেন কয়েক দিনের জন্য। রাতেই গা কাঁপিয়ে ভীষণ জ্বর আসে শ্রবণের। মা’রের কারণে বরফ সাদা চামড়া প্রায় ফেটে গিয়েছিল, নরম চামড়ার ভেতরে র’ক্ত জমাট বেঁধে বেগুনি রঙের হয়ে গিয়েছিল।
এরকমই চলতে থাকে প্রতিনিয়ত। সামাদ চৌধুরী অফিসের কাজে এতই ব্যস্ত থাকতেন যে নাতির খোঁজ খবর নিতে পারতেন না সেভাবে। শ্রবণ নিজে থেকেও দাদাকে কিছু বলতো না। শাহীন রেজা চৌধুরী তো নিজের বউ-বাচ্চা নিয়েই ব্যস্ত। আর দুই বোনের অত্যাচার সহ্য করতো শ্রবণ।
একদিন সামাদ চৌধুরীর নজরে পড়ে যায় শ্রবণের গায়ের মা’রে’র দাগ। শ্রবণকে হাজার প্রশ্ন করেও ওর মুখ থেকে উত্তর বের করতে সক্ষম হননি।
আস্তে আস্তে শ্রবণের মানসিক চাপ বাড়তে থাকে। বাড়ির কাউকেই সহ্য করতে পারে না। যাকে দেখে তেড়ে যায় তাকেই মা’র’তে। শামীম রেজা চৌধুরী মা’র’তে আসলে উল্টো ওনাকেই মা’র’তো শ্রবণ। একবার ব্যাট দিয়ে বাড়ি মে’রে মাথা ফাটিয়ে দিয়েছিল। চিৎকার চেঁচামেচি করে বাড়ি মাথায় তুলত। এত রাগ বেড়ে গিয়েছিল যে কাউকেই সহ্য করতে পারতো না।
সামাদ চৌধুরী নাতিকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যান। ডাক্তারের পরামর্শে আবার নিয়ে যান সাইকিয়াট্রিস্ট এর কাছে।
জানতে পারেন শ্রবণের মানসিক অবস্থা আশঙ্কাজনক, এভাবে চলতে থাকলে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে ফেলবে খুব শীগ্রই।
ওকে স্বাভাবিক জীবন দিতে চাইলে অবিলম্বে নিরাপদ পরিবেশে রাখতে হবে। সবসময় মানসিক চাপের মধ্যে থাকে। এত মানসিক চাপ দেওয়া যাবে না।
সামাদ চৌধুরী বাড়িতে ফিরে সকলের সঙ্গে অনেক রাগারাগি করেন। তনিমা চৌধুরী ভালোর মুখোশ পরে নাটক করেন। শামীম রেজা চৌধুরী জানান রাগ সামলাতে না পেরে ছেলের গায়ে হাত তোলেন। শ্রবণ কেন এমন করে? অথচ উনি বুঝতেই চাননি শ্রবণকে ওনারাই এমন বানিয়েছেন। বাচ্চাটা তো শুরু থেকে এমন ছিল না, ওকে এমন বানানো হয়েছে অতি যত্নে।
শ্রবণের চিকিৎসা শুরু হয়। সাইকিয়াট্রিস্ট কিছু জিজ্ঞেস করলে উত্তর দিত না শ্রবণ, কোনো কথা বললে মনোযোগ দিত না।
চোখ মুখ কঠোর করে রাখতো। দাদা ছাড়া কারো সাথেই কথা বলতে চাইতো না। স্কুলে গেলেও চুপচাপ, কোনো বাচ্চার সাথে মেশে না।
শ্রবণের চিকিৎসা চলতে থাকে, কিছুটা সুস্থও হয়। সামাদ চৌধুরী আবার ব্যস্ত হয়ে পড়েন অফিসের কাজে। শ্রবণ তখন নিজের আলাদা দুনিয়া নিয়ে ব্যস্ত।
এভাবেই সময় আগায়। প্রাইমারি স্কুল শেষ করে হাই স্কুলে ভর্তি হয়। স্ত্রীর প্ররোচনায় বড়ো ছেলেকে বোর্ডিংএ দিয়ে দেন শামীম রেজা চৌধুরী। তখন শ্রবণের মেজাজ আরও খিটখিটে, রাগ নাকের ডগায়।
সামাদ চৌধুরী নিজেও ভেবে চিনতে আর কিছু বলেননি। বাড়ির চেয়ে বোর্ডিংএ ভালো থাকবে এটাই ভেবেছিলেন।
একাকিত্ব, নিঃসঙ্গতা, বিষাদ, হতাশা, রাগ ক্ষোভ শ্রবণকে আরো শেষ করে দিতে শুরু করে।
বোর্ডিংএর বড়ো বড়ো ছেলেরা র্যাগিং করতো। রেগে তাদের সঙ্গে মা’রা’মা’রি শুরু করতো। চৌধুরী বাড়িতে বার বার নালিশ যেত। শামীম রেজা চৌধুরী শ্রবণকে বাড়ি নিয়ে গিয়ে মা’র’তেন অন্যদের সঙ্গে ঝগড়া মা’রা’মা’রি করার কারণে। ওনার কাছে কেন বিচার আসে?
সময় পেরিয়ে যায় আরো। এর মধ্যে শ্রবণ একবার প্রায় মানসিক রোগী হয়েই গিয়েছিল। অনেক চেষ্টার পর সুস্থ করা হয়। বাড়িতে ফিরিয়ে নিয়ে আসতে চাইলেও শ্রবণ আর আসে না। কলেজে ওঠার পর নিজের জন্য আলাদা ফ্ল্যাট নেয়। ফ্ল্যাটেই থাকতে শুরু করে একাই। সামাদ চৌধুরী ওর সঙ্গে থাকতে চাইলেও শ্রবণ রাজি হয় না। ফ্ল্যাটটা ওর নিজের নামেই রেজিস্ট্রি করা।
পুরো চৌধুরী বাড়ি, কোম্পানী আর যত জায়গা সম্পত্তি আছে তার অর্ধেকের মালিক শ্রবণ একাই। বাবার ভাগ থেকেও আরো পাবে উত্তরাধিকারী হিসেবে।
বিভীষিকাময় শৈশব আর কৈশোর পেরিয়ে শ্রবণ এখন কঠিন এক মানব। হাতে গোনা কয়েকজন মানুষ ব্যতীত কারো জন্য ওর মনে দয়া মায়া জন্মায় না।
শ্রবণ ছোটো বেলা বা পুরোনো কোনো কথা কখনও বলে না, তোলেও না। সবাই ভাবে শ্রবণ অতীত ভুলে গেছে, কিন্তু কেউ জানে না এই অতীতের প্রত্যেকটা ছোটো ছোটো ঘটনাও শ্রবণের স্মরণে এখনো স্পষ্ট।
শ্রবণ পারে না শামীম রেজা চৌধুরী, তনিমা চৌধুরী আর অনিমা চৌধুরীকে পিষে মে’রে ফেলতে।
সবাইকে নিজেদের মতো ছেড়ে, সবকিছু থেকে দূরেই ছিল। নিজেকে গুটিয়ে নিয়েছিল আলাদাভাবে।
কিন্তু ভয়াবহ এক সত্যি এসে আবার ওকে আঘাত করেছে।
বিচার-নালিশ এই দুটো শব্দকে ভীষণ ঘৃণা করে শ্রবণ। কেউ ওর নামে বিচার দিলে নালিশ করলে ওর মাথায় আগুন ধরে যায়। মায়ের মৃ’ত্যুর পর এই বিচার আর নালিশ ওর অর্ধেক জীবন ধ্বংস করে দিয়েছে।
শ্রবণ স্পর্শের মাথায় হাত রেখে মৃদু ঝাঁকি দিয়ে ডাকে,
“স্পর্শ।”
বড়ো ভাইয়ের ডাক শুনে ধড়ফড়িয়ে সোজা হয়ে বসে স্পর্শ। শ্রবণ তাকিয়ে থাকে স্পর্শের মুখের দিকে। ছেলেটার চোখ দুটো লাল টকটকে হয়ে আছে। চুলগুলো এলোমেলো উস্কখুস্ক।
“ভাইয়া, ঠিক আছো?”
“আমি ঠিক আছি, তুমি এখানে কেন? সারারাত এভাবেই বসে ছিলে?”
“সারারাত না, ঘণ্টা দুই আগে বোধহয় ঘুমিয়েছি।”
“বাড়িতে যাওনি কেন?”
“তোমাকে রেখে কীভাবে বাড়িতে যাব?”
“বেড থাকতে এভাবে বসে ঘুমিয়েছিলে কেন?”
“সমস্যা হয়নি আমার। ডাক্তারকে ডাকব?”
“প্রয়োজন নেই।”
স্পর্শ বড়ো ভাইয়ের হাত মুঠো করে ধরে অপরাধীর ন্যায় বলে,
“ভাইয়া, মাফ করে দাও আমাকে।”
“তুমি কেন মাফ চাইছ?”
“এই সবকিছুর জন্য তো আমিও দায়ী।”
“কীভাবে? আমি আগে তোমাকে দোষী ভাবতাম তবে গতকাল আমার সব ভাবনা উল্টে-পাল্টে গেছে। অপরাধী ওরা, ভিকটিম আমরা তবে ওরা আমার সঙ্গে যা করেছে তোমার সঙ্গে তা করেনি।”
স্পর্শের চোখ থেকে কয়েক ফোঁটা পানি গড়িয়ে পড়ে। শ্রবণ চোখ বন্ধ করে উপরের দিকে মুখ করে বলে,
“বাড়িতে যাও, ফ্রেশ হয়ে খেয়ে বিশ্রাম নাও।”
“আমি ওই বাড়িতে আর যাব না।”
“কেন?”
“আমি ওদের সঙ্গে থাকতে পারবো না।”
“কোথায় থাকবে তাহলে?”
“জানিনা।”
“আমি বলছি তুমি বাড়িতে যাও। একা থাকায় কতটা সুখ সেটা তুমি জানো না।”
স্পর্শ ভাইয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। শ্রবণের চোখ বন্ধ, ফ্যানের বাতাসে চুলগুলো দুলছে। চেহারা শুকনো দেখাচ্ছে।
“ভাইয়া।”
শ্রবণ ঘাড় ঘুরিয়ে তাকায়। স্পর্শ ভাইয়ের হাতটা আরো শক্ত করে ধরে বলে,
“সরি।”
“বাড়িতে যাও।”
“মাফ করবে না আমাকে?”
“করে দিয়েছি। তুমি আমাকে মাফ করে দিও, আমি তোমার সঙ্গে অন্যায় করেছি।”
স্পর্শ তাকিয়ে থাকে পলকহীন।
রুমে প্রবেশ করেন সামাদ চৌধুরী, ওনার পেছন পেছন শাহীন রেজা চৌধুরীও প্রবেশ করেন ভেতরে।
একটু আগেই ডাক্তার এসে দেখে গিয়েছে শ্রবণকে। এখন আর সেরকম কোনো সমস্যা নেই।
শ্রবণ দাদা আর কাকার সঙ্গে টুকটাক কথা বলে।
শ্রবণ গম্ভীর স্বরে বলে,
“এখান থেকে ছুটি দেবে কখন?”
“আরো দুটো টেস্ট করিয়ে দুপুরের পর ছুটি দেবে।”
“আবার কীসের টেস্ট? এত বছরে যখন ম’রি’নি, গতকাল স্ট্রোক করার পরেও বেঁচে গেছি তখন আর এত দ্রুত ম’র’বো না। কিছু হবে না আমার, আমি এখনই বাড়িতে যাব।”
“ডাক্তার যেতে দেবে না। তুমি এখনো সুস্থ নও।”
শ্রবণ কিছু বলতে গিয়েও মুখ বন্ধ করে নেয়। বাড়িতে ফিরে তিনটার কী অবস্থা করবে কারো কল্পনায়ও নেই।
বাপ-ছেলে কেবিন থেকে বেরিয়ে যান। শ্রবণ উপরে ঘুরতে থাকা ফ্যানের দিকে তাকিয়ে ছিল এর মধ্যে কেবিনে প্রবেশ ঘটে আরো একজনের।
শ্রবণ ঘাড় কাত করে দেখে সোহা এসেছে। সাথে সাথেই আবার উপরের দিকে তাকায় শ্রবণ। চোখ জোড়া বন্ধ করে গম্ভীর স্বরে বলে,
“কী দেখতে এসেছিস? ম’রে’ছি কিনা সেটা দেখতে?”
সোহা চুপ করে থাকে। শ্রবণ রাগী স্বরে বলে,
“বের হ এখান থেকে, তোদের কাউকে দেখতে চাই না আমি। তোকে সহ্য হয় না আমার, ম’রতে না চাইলে সর সামনে থেকে।”
সোহা কিছু বলেও না, বাইরেও যায় না। শ্রবণ দাঁতে দাঁত পিষে বলে,
“কী বলছি কানে যাচ্ছে না? বের হ এখান থেকে, দাদু ভাইকে আসতে বল ভেতরে।”
সোহা বিনা বাক্যে কেবিন থেকে বেরিয়ে যায়। একটু পরেই ভেতরে প্রবেশ করেন সামাদ চৌধুরী। শ্রবণ একবার দাদার দিকে তাকিয়ে আবার উপরের দিকে তাকিয়ে বলে,
“ডিভোর্স লয়ারের ব্যবস্থা করো।”
সামাদ চৌধুরী বিস্মিত হয়ে বলেন,
“কেন? কী করবে?”
“ডিভোর্স দেব। বিকেলে ওনাকে বাড়িতে আসতে বলবে।”
“ডিভোর্স দেবে মানে কী? কেন ডিভোর্স দেবে? তাহলে বিয়ে করেছিলে কেন?”
শ্রবণ নিরুত্তর থাকে। সোহাকে মোটেও সহ্য হচ্ছে না, নাম স্মরণ হলেও রাগে মাথা ফেটে যাচ্ছে। ডাইনির বাচ্চাকে আর নিজের জীবনে রাখবে না।
চলবে…………
গল্প পড়ে চুপচাপ চলে না গিয়ে একটু রেসপন্স করুন।
Share On:
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিশেহারা পর্ব ২৫
-
দিশেহারা পর্ব ১৫
-
দিশেহারা পর্ব ৩
-
দিশেহারা পর্ব ২৮
-
দিশেহারা পর্ব ২৯
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ৬
-
দিশেহারা পর্ব ৪২
-
দিশেহারা পর্ব ১
-
দিশেহারা গল্পের লিংক
-
তোমার সঙ্গে এক জনম পর্ব ১