দিওতোমারমালাখানি – ৪
গুলশানের একটি অভিজাত রেঁস্তোরা। রুচি হেলেদুলে এলো। আসবার আগে পার্লার হয়ে এসেছে। পার্লারে সাজবার সময় সামান্য গিল্টফিল হচ্ছিল। তবে, অফিসে ব্যস্ত দিন পার করে যে আলুথালু অবস্থা থাকে, তাতে করে নিজের কাছেই নিজেকে প্রেজেন্টেবল লাগে না। যে কেউই হোক না কেন, প্রথম দেখাটা একটু পরিপাটি হওয়াটাই সৌজন্যতা। তাতে নিজেকে পণ্য মনে হওয়ার কিছু নেই। রুচি আস্থা ফিরে পেলো। সাধারণত এই সময়ে মেয়েরা ভেঙে পড়ে। সঙ্গী যখন অন্য কাউকে গুরুত্ব দেয়, নিজেকে অযোগ্য মনে করতে শুরু করে। রুচি ব্যতিক্রম। ওর দু:খবোধ হয়েছে। কিন্তু নিজেকে তুচ্ছ মনে হয়নি। সাময়িকভাবে বয়স, চেহারার বয়সী ছাপ একটু দুর্বল করে দিয়েছিল। কিন্তু ও বিশ্বাস করে প্রতিটি বয়সেরই একটা সৌন্দর্য আছে। সেটা উপভোগ করাই শ্রেয়। আর স্বনির্ভর মেয়েরা সব বয়সেই সুন্দর। একপাশে সিঁথি করে রাখা চুলগুলোর মধ্যে হাত চালিয়ে পেছনে পাঠিয়ে দিলো সেগুলোকে। রেস্টুরেন্টের ঝকঝকে আলোর মাঝখানে ওকে আরো আত্মবিশ্বাসী দেখাল।
নির্দিষ্ট টেবিলের সামনে এসে চমৎকৃত হলো ও। ভদ্রলোক একটা ফুলের বুকে সামনে নিয়ে বসে আছেন। বসে আছেন না বলে ধ্যানমগ্ন হয়ে আছেন বলাটা যথার্থ। চোখ বুজে আছেন। মেরুদণ্ড চিতিয়ে বসে, দুই হাতটা বুকের উপর বেঁধে রেখেছেন। বসবার ভঙ্গিটা চমৎকার। বিনীত কিন্তু দৃঢ়। বয়সে রুচির কাছাকাছি। বায়োডাটাতে তেত্রিশ লেখা ছিল। বয়স অনুপাতে দেহের গঠন দারুণ। স্বাস্থ্যবান, কিন্তু মেদহীন ঝরঝরে শরীর। উজ্জ্বল শ্যামলা ত্বকে দোহারা গড়ন। মুখটা চারকোণা ধরনের। চোয়াল বেশ স্পষ্ট। চোখের উপর সোনালি রিমের চশমা বেশ মানিয়ে গেছে। ভদ্রলোকের বুকেতে মোড়ানো কাগজের ফাঁক দিয়ে উঁকি দিচ্ছে তরতাজা লিলি। সেদিকে চোখ রেখে রুচি সহাস্যে বলল,
–মাহমুদ রব্বানি? আমি শাহিনা ইসলাম। সবাই রুচি ডাকে৷
মাহমুদ তাকাল সাথে সাথেই। বদান্যতা দেখাতে উঠে দাঁড়াল। সাবধানী হাসি খেলে গেল ঠোঁটের কোণায়। বলল,
–হ্যাঁ। প্লিজ।
বসবার চেয়ারটাকে নির্দেশ করল ও।
রুচি বসতে বসতে বলল,
–খুব বেশি অপেক্ষা করাইনি তো?
–না, না। আপনি একদম ঠিক সময়ে এসেছেন। আমিই আগে এসে গিয়েছি। আসলে আমার বদভ্যাস এটা। আগে গিয়ে বসে থাকি। আপনি ভালো আছেন? অফিস থেকে এলেন বুঝি?
–হ্যাঁ। মাঝখানে পার্লারে গিয়েছিলাম। আমার উপর কড়া নির্দেশ ছিল সেজেগুজে আসতে হবে। তবে, সেজেছি আমি আমার নিজের জন্য। আমার ভালো লাগছিল নিজেকে প্যাম্পার করতে। অনেকদিন নিজেকে নিয়ে ভাবিনি। নিজেকে এক্সপ্লোর করার বাকি আছে অনেককিছু। আমি কী পছন্দ করি, আমার কী ভালো লাগে সেসবই যেন জানি না! এখন থেকে মনে হয় ভাবব।
রুচি বিষন্ন হলো। ওর গলায় ব্যথা বাজল। চুপচাপ হয়ে গেল দুজনেই। মাহমুদ নীরবতা ভেঙে বলল,
–আপনি তো কর্পোরেটে আছেন।
–হ্যাঁ। অ্যাসিস্ট্যান্ট ম্যানেজার। কাস্টমার এক্সপেরিয়েন্স। দিনভর মানুষের সমস্যা শুনি। তাদের কত অভিযোগ থাকে। আমারই যেন শুধু কোনো অভিযোগ নেই।
মাহমুদকে না, রুচি যেন অন্য কাউকে নালিশ জানাচ্ছে। মাহমুদের চেনা লাগল সুরটা। নিজেও একই পথ পাড়ি দিয়ে যাচ্ছে। বলল,
–আমারও তাই। লোকজনের সমস্যা মেটাই। নিজেরটা জমা থাকে। কেউ জানতেও চায় না। বলিও না।
রুচি সম্বিত পেলো,
–আই এম সরি। আমি অন্যমনস্ক হয়ে গিয়েছিলাম। বাই দ্য ওয়ে, কী নেবেন আপনি?
অনেকক্ষণ ধরেই দুটো মেনুকার্ড দুজনের হাতে। দুজনেই জানে খাবারটা এখানে বাহুল্য, তাই অর্ডার করেনি কেউই। রুচির কথায় মাহমুদ একটা কফি চেয়ে নিলো। রুচিও তাই। কফির গ্লাসে চুমুক দিয়ে মাহমুদ বলল,
–রুচি, আমার ব্যাপারে সবই আপনাকে বলা হয়েছে সম্ভবত। তারপরও আমি নিজে জানাতে চাই, আমি ডিভোর্সি, সেটা কি আপনি জানেন?
রুচি মাথা নাড়ল। ও জানে। শান্তা আন্টি এই সম্বন্ধটা এনেছেন। জাকিয়া স্বান্তনা দিতে বলেছিলেন বিয়ের দরকার নেই। কিন্তু কোমর বেঁধে লেগে পড়েছেন। রুচির কেন যেন মনে হচ্ছে এই সম্পর্কটা আর এগোবে না। একটা ওয়ানটাইম মিটিং হিসেবেই থেকে যাবে। তাই আর কৌতুহল বাড়াল না ও। লোকের ব্যক্তিগত জীবন সম্পর্কে ওর আগ্রহ নেই।
মাহমুদই নিজের থেকে বলল,
–একটা বছর আমি খুব জঘন্য দাম্পত্যের ভেতর দিয়ে গিয়েছি। এতটা বাজে এক্সপেরিয়েন্স যে, দ্বিতীয়বার আবার বিয়েতে আপত্তি ছিল। তবে সময় গড়িয়েছে আর আমি জীবনের ব্যাপ্তি নিয়ে ভাবতে শিখেছি। এখন আর কাউকে দোষ দিই না। মনে করি, আমি হয়তো ঠিক মানুষটা ছিলাম না। এবার বলুন, আমার দিক থেকে আপনার এক্সপেক্টেশন কী?
রুচি চোখ নামিয়ে নিলো। প্রথম পরিচয়ে সব লোকেই ভালো দিকটাই প্রকাশ করে। অন্ধকার রয়ে যায় পরবর্তী আবিষ্কারের জন্য। তবে, মাহমুদকে সৎ মনে হচ্ছে। রাস্তার মাঝখানে রেখে পালিয়ে যাবে না হয়তো!
তাতে রুচির কী? তার সাথে তো দ্বিতীয়বার আর দেখা হচ্ছে না!
মাহমুদ বলল,
–শান্তা আন্টির কাছে আপনার সম্পর্কে সবই শুনেছি। আপনি স্মার্ট, স্বাধীনচেতা, দায়িত্বশীল। বাবার অবর্তমানে ভাই-বোনের অভিভাবক হয়ে বিয়ে করেননি, এটা আমার সবচেয়ে বেশি ভালো লেগেছে।
রুচির ফোন সাইলেন্ট করা। ডিসপ্লেতে তৌহিদের নাম ভেসে উঠল। কয়েকবার কল এসেছে। অফিস টাইমে তৌহিদ কখনোই কল দেয় না। আজকেও ছুটির পর থেকে লাগাতার কল ঢুকছে। রুচি মোবাইলটাকে পার্সের ভেতর ঢুকিয়ে রাখল। নড়েচড়ে সোজা হয়ে বসল। বলল,
–মাহমুদ সাহেব, ওটাও সত্যি। কিন্তু সম্পূর্ণ সত্যি না।
সময় নিলো রুচি। থেমে থেমে বলল,
–আমার রিসেন্টলি ব্রেক আপ হয়েছে। দশ বছরের চেনাজানা, আট বছরের প্রেম ছিল আমাদের। ইট ওয়াজ নো লেস দ্যান আ ম্যারিটাল রিলেশনশিপ। ওর জন্য অপেক্ষা করতে করতেই বিয়ে করা হয়ে ওঠেনি। ভেবেছিলাম, বিয়ে ওকেই করব। অন্য কিছু ভাবা হয়নি। আমিও এক্স সম্পর্কে নেতিবাচক কিছু বলব না। তবে, শেষ পর্যন্ত বিয়েটা যে হয়নি, সেটা ওর দিক থেকে আগ্রহে ভাটা পড়ে গিয়েছে বলে। অনেকটা পথ পাড়ি দিয়ে ফিরে এলাম যেন অযথাই।
বলতে বলতেই উঠে দাঁড়াল রুচি। দুইহাত জোর করে বলল,
–আই এম স্যরি, মাহমুদ সাহেব। আমার খুব বড়ো ভুল হয়ে গেছে। আমার মনে হচ্ছে আমি এখনো মুভ অন করতে পারিনি। স্টিল আই লাভ হিম! অফিসিয়ালি ব্রেক আপও করিনি। ওদিকটা বন্ধ না করে, অন্য কারো জন্য দরজা খুলে দেওয়াটা আমার নিজের কাছেই অফেন্সিভ লাগছে। কাইন্ড অফ চিটিং। আমি খুবই দু:খিত। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করবেন।
ছুটে বেরিয়ে এলো রুচি।
কান্না পাচ্ছে। নিজেকে খুব অসহায় লাগছে। তৌহিদের প্রতি সমস্ত অনুভূতি থেকে মুক্তি পেতে আকুল হয়ে উঠেছে প্রাণ!
কবে যে আর মনে পড়বে না ওকে!
মাঝেমাঝে কাজে ব্যস্ত হয়ে ভুলে থাকা যায়। মনে হয়, আর মনে পড়বে না। তারপর একাকি হলেই কষ্টগুলো গ্রাস করে নেয় ওকে। অস্থির লাগে।
অনেকটা সময় নিয়ে নিজেকে সামলালো রুচি। বাসায় ফিরতে ফিরতে আটটা বেজে গেল। বাসার নিচেই তৌহিদের দেখা পেলো। ক্লান্ত ভঙ্গিতে এগিয়ে এলো তৌহিদ। অভিযোগ করল না কোনো, জানতে চেয়ে বলল,
–তোমাকে কল দিচ্ছি কয়েকদিন ধরে। ধরছ না। সমস্যা কোনো? ফেসবুকেও নেই!
প্রথম প্রশ্নটার উত্তর দিলো না রুচি। ফেসবুক একাউন্ট সম্পর্কে বলল,
–আমাদের মিউচুয়াল ফ্রেন্ডের সংখ্যা তো কম না! ভার্সিটির প্রায় সবাই আছে লিস্টে। আমি আসলে কারোর সহানুভূতি নিতে চাইছি না!
তৌহিদ রুচির বলা কথাটা বুঝল। না বলাগুলোও বুঝে নিলো। আত্মপক্ষ সমর্থনে ভাষা জোগালো না মুখে। রুচি ডাকল,
–নিচে দাঁড়িয়ে আছ কেন? চলো, বাসায় চলো?
তৌহিদ হাসলো,
–গিয়েছিলাম। আন্টি বের করে দেয় নাই বা মুখের উপর দরজা লাগিয়ে দেয় নাই। কিন্তু টের পেলাম, আমি এখন ওই বাসায় আনওয়েলকামড!
রুচি কিছু বলতে যাচ্ছিল, আদনান নামলো ধুপধাপ। রুচিকে উদ্দেশ্য করে বলল,
–মাথাব্যথা হচ্ছে খুব। একটা ডিসপ্রিন নিয়ে আসি। নাকি প্যারাসিটামল আনব?
রুচি প্রশ্নের কারণ বুঝতে পারল না। অপ্রস্তুত হয়ে জবাব দিলো,
–প্যারাসিটামলই ভালো হবে মে বি!
আদনান চলে গেল ফার্মেসিতে। ফেরার পথে রুচির দিকে তাকিয়ে হাসলো।
এক মিনিটের মাথায় আবার নামলো। বলল,
–তখন বলতে ভুলে গিয়েছিলাম। আপনাকে অনেক সুন্দর লাগছে। আমার কথা শুনে মেরুন লিপস্টিক না দেওয়ার জন্য ধন্যবাদ। এই গোলাপিতে কী স্নিগ্ধ দেখাচ্ছে, বলেন তো! আমার তো চোখই সরছে না। মনে হচ্ছে উইন্টারেই বসন্ত এসে গেছে!
শেষ তিনটে শব্দ গানের সুরে গাইলো আদনান।
রুচি অত্যন্ত বিরক্ত হলো। এরকম গায়ে পড়ে আলাপ করা মানুষ ওর পছন্দ না। ভদ্রচিত মৃদু হেসে চোখ ফিরিয়ে নিলো। তৌহিদকে উদ্দেশ্য করে বলল,
–কিছু বলার জন্য খুঁজছিলে আমাকে?
তৌহিদও বেশ অবাক হয়েছে। রুচিকে আকর্ষণীয় লাগছে সেটাও নজর কাড়ছে। ও আনমনা হয়ে জানতে চাইল,
–কে লোকটা?
–আদনান। আমাদের উপরতলার টেনেন্ট।
–ওহ, তোমাকে বলা হয়নি, আমার মনে হয় ঢাকার বাইরে পোস্টিং হচ্ছে।
–সমস্যা হবে তো। আন্টি তো মনে হয় না বাড়ি ছেড়ে তোমার সাথে যাবেন। একা হয়ে যাবেন বেচারা! চেষ্টা করে দেখো, গ্রেটার ঢাকাতে হলেও প্রতিদিন বাসা থেকেই অফিস করতে পারবে।
–শুধু সেটা না, রুচি! আসলে আমি অন্য একটা কথা বলতে চাইছি।
রুচি মাথা নাড়ল,
–বলো৷
–বলছি, কিন্তু তুমি কোথা থেকে এলে? এত রাত হলো অফিস থেকে ফিরতে?
রুচি হেসে ফেলল,
–এক ভদলোকের সাথে দেখা করতে গিয়েছিলাম। শান্তা খালা ঘটকালি করেছেন। ভদ্রলোক অগ্রনী ব্যাংকের কোন ব্রাঞ্চে যেন আছেন। এজিএম। শর্ট টাইম ডিভোর্সড। ডিভোর্স শুনে মঈন গাইগুই করছিল। কিন্তু আমার বয়সের সাথে তো খুব বেশি চুজি হলে হয় না!
আদনান আবার ফিরল। রুচির হাত ধরে টানলো এবার,
–আসুন তো, আসুন! আমার হাত কেটে গেছে, আর আপনি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে আড্ডা দিচ্ছেন! আসুন তো, হাতে ওষুধ লাগিয়ে দেবেন। তাড়াতাড়ি আসুন।
রুচিকে আপত্তি করার কোনো সুযোগই দিলো না ও। টেনে নিয়ে গেল। তৌহিদকে বিদায় বলবার সময়টুকুও ওকে দিলো না আদনান।
তৌহিদের জন্য সবকিছুই বড়োসড়ো ধাক্কার মতো লাগল। ও ভেবেছিল রুচি খুব ভেঙে পড়বে। কিন্তু ভাঙাচোরার লক্ষণ বিন্দুমাত্রও খুঁজে পেলো না ও। বরং অনেক বেশি উদ্ভাসিত রুচি, অনেক বেশি আলোকিত, অনেক আনন্দিত। ওর স্বাভাবিক সৌন্দর্যও ঈর্ষণীয়ভাবে নজর কাড়ছে। খানিকটা যেন লাস্যময়ীও হয়েছি। রুচির উল্লেখ করা ওই ডিভোর্সী ভদ্রলোক কিংবা এই আদনান সবাইকে হিংসা হতে লাগলো। ওই ভদ্রলোক কী বলল? রুচিকে পছন্দ করেছে সে? আর রুচি? রুচিও কি তৌহিদের রিপ্লেসমেন্ট এত সহজে ভেবে ফেলেছে? এই আদনানের সাথেই বা এত ঘনিষ্ঠতা কবে হলো? রুচির হাত ধরল ও? ওর চোখ বলছে ও পছন্দ করে রুচিকে। আর রুচি? এত তাড়াতাড়ি বিয়ের পিঁড়িতে বসে যাবে? ওর রুচি অন্য কারো হয়ে যাবে? অন্য কাউকে ভালোবাসবে? পর হয়ে যাবে?
তৌহিদের মন পুড়তে থাকল! বুক ভারী হয়ে আসতে লাগল। অসহ্য যন্ত্রণা যেন…
চলবে…
আফসানা আশা
Share On:
TAGS: আফসানা আশা, দিও তোমার মালাখানি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৮ (খ)
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৬
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ১
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৭
-
দিও তোমার মালাখানি গল্পের লিংক
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৫
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৩
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ২
-
দিও তোমার মালাখানি পর্ব ৮