বিছানার এক কোণে চাদর গায়ে মুড়ি দিয়ে কুঁকড়ে বসে আছে নূশা। নিজেকে এই চাদরের ভাঁজেই অদৃশ্য করে ফেলতে চাচ্ছে সে। তার শরীরের প্রতিটি রগ আতঙ্কে তড়তড় করে কাঁপতেছে, সেই কাঁপন তার চামড়ার উপরেই নয়, বরং হাড়ের মজ্জা অব্দি পৌঁছে গেছে হয়তো।
বিয়ের প্রথম রাত আজ তার। যা কি না হওয়ার কথা পরম আবেশের, তা পরিণত হয়েছে নূশার জীবনের এক পৈশাচিক অধ্যায়ে। ‘স্বামী’ নামক তকমাধারী মানুষটার কাছ থেকে যে আদিম ও পাশবিক আচরণের শিকার সে হয়েছে, তা কোনো সংজ্ঞায় বাঁধার সাধ্য নূশার নেই। সে জানত হয়তো এমন কিছু হতে পারে, কিন্তু এতটা অমানুষিক নির্যাতন তার উপর হবে তার শুভ্র শরীরে ওপর এতটা ঘৃণ্য আঘাত লেপ্টে থাকবে, তা নূশার দুঃস্বপ্নেরও অতীত ছিল।
এরমধ্যে ঘরজুড়ে দামী সুগন্ধি আর তামাকের কড়া ঘ্রাণ মিশে এক দমবন্ধ করা পরিবেশ তৈরি করেছে। বিছানার ঠিক পাশেই ইজি চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে আছে নূশার হাসবেন্ড ইথান অ্যাশার। একত্রিশ বছর বয়সী এই মানুষটির কাঁধে বর্তমান ফ্রান্সের ডিফেন্স সেক্রেটারির গুরুভার। অথচ নূশার কাছে সে এখন শুধুমাত্রই এক মূর্ত আতঙ্ক। ইথান নির্বিকার রুপে বসে আছে। ইথানের আঙুলের ডগায় জ্বলতে থাকা সিগারেট থেকে ধোঁয়া কুণ্ডলী পাকিয়ে উপরে উঠে যাচ্ছে। সেই ধোঁয়ার আড়ালে তার ভায়োলেট রঙ্গের পাথুরে চোখের দৃষ্টি স্থির হয়ে আছে নূশার থরথর কম্পমান শরীরের উপর। তবে ইথানের মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই, কোনো সান্ত্বনার শব্দ নেই তার মুখে এক গভীর, রহস্যময় নীরবতা শুধু আছে। সে দেখছে নূশাকে, তাও এমনভাবে দেখছে এমন চোখে দেখছে মনে হচ্ছে কোনো এক শিকারের নিস্তেজ হয়ে যাওয়ার দৃশ্য শিকারি দেখে উপভোগ করছে।ইথানের কাছে এই বিয়েটা একটা গলার কাঁটার মতো। সে পুরোদস্তুর ফরাসি আদব-কায়দায় বড় হওয়া মানুষ, তবে তার ধমনীতে বইছে আধা-সিলেটি রক্ত মা দাদী সিলেটি তার। মা আর দাদির এই আদিখ্যেতা তার কাছে অসহ্য লাগে।
তাদের জেদের কাছে হার মেনেই সুদূর বাংলাদেশ থেকে নূশাকে এই প্যারিস শহরে উড়িয়ে আনা হয়েছে তাদের কেবল একজন ‘সিলেটি পুত্রবধূ’ চাই বলে।
কিন্তু ইথান হার মানার পাত্র নয়। বিয়ে হয়েছে মতের বিরুদ্ধে সংসার সে করবে ঠিকই, তবে তা হবে তার নিজস্ব নিয়মে। মনে মনে সে এক ভয়াবহ ছক কষছে নূশার জীবনকে সে এতটাই দুর্বিষহ করে তুলবে যে, মেয়েটি যাতে নিজেই ডিভোর্স দিয়ে লেজ গুটিয়ে পালায়।
ইথান ঘাড়টা ঈষৎ বাঁকিয়ে নূশার দিকে তাকায়। এই দৃষ্টিতে মিশে আছে একরাশ তিক্ততা আর অবজ্ঞা। সে ঠান্ডা গলায় বলে,
“মাত্র একবারেই এই অবস্থা? যাও, ফ্রেশ হয়ে এসো। নয়তো সেই সুযোগটুকুও পাবে না। সত্যি বলতে, তোমার শরীরটা আমার বেশ পছন্দ হয়েছে।”
ইথানের এমন কুরুচিপূর্ণ কথা শুনে নূশার সর্বাঙ্গ কেঁপে ওঠে। অপমানে আর আতঙ্কে তার কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসছে, তবুও সাহস সঞ্চয় করে সে তোতলামি মেশানো স্বরে বলে,
“আ..আপনার আচরণে তো মনে হচ্ছে, আ..আপনি এই বিয়েতে রাজি ছিলেন না। তাহলে কেন আগে বললেন না? কেন আমার জীবনটা এভাবে নষ্ট করলেন?”
নূশার কথা শেষ হতেই ইথান সশব্দে ইজি চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ায়। হাতে থাকা জ্বলন্ত সিগারেটটা অবহেলায় পাশের টেবিলে রেখে ধীরপায়ে এগিয়ে আসে নূশার ঠিক সামনে দাঁড়ায়। নূশা ভয়ে চোখ নামিয়ে নেয়, এই মানুষটির দিকে তাকানোর সাহসও তার নেই। তারমধ্যে ইথানের পরনে এখন নামমাত্র পোশাক, কোমরে কেবল একটি কালো তোয়ালে প্যাঁচানো।হঠাৎ করেই ইথান নূশার গায়ে জড়ানো চাদরের কোণটা শক্ত হাতে খাবলে ধরে। নূশার মুখের ওপর ঝুঁকে দাঁতে দাঁত চেপে হিসহিস করে বলে,
“তোমার মতো মেয়ের প্রতি আমার ইন্টারেস্ট থাকবে? হাস্যকর! শোনো, তোমার মতো কেন, কোনো মেয়েমানুষই তো আমার পছন্দ নয়। আমার পরিবারের ওই মানুষরূপী গাধাগুলো আমার প্রফেশনাল ক্যারিয়ার ধ্বংস করার ভয় দেখিয়ে, ব্ল্যাকমেইল করে তোমাকে আমার গলায় ঝুলিয়ে দিয়েছে। কিন্তু এখন? এখন তো তুমি আমার বিয়ে করা বউ। তোমার সাথে যা খুশি করার অধিকার আমার আছে, তাই না? আর আমি ঠিক সেটাই করছি।”
নূশা ইথানের এমন অযৌক্তিক কথা শুনে ফ্যালফ্যাল করে তার মুখের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর ঘৃণামিশ্রিত কণ্ঠে বলে ওঠে, “ভুল! আপনি বিয়ে করেছেন বলে আমায় কিনে নেননি। আমার শরীরটাকে তো শেষ করে দিলেন! আমার অনুমতির প্রয়োজনটুকুও বোধ করলেন না? রাস্তার কুকুরের মতো আমাকে ছিঁড়ে খেলেন কীভাবে? এতটাই নিচু কাজ করলেন? পরিবারের ওপর জমানো রাগ আর জিদ আমার ওপর কেন মেটাচ্ছেন?”
ইথান তাচ্ছিল্যের হাসি হেসে উত্তর দেয়, “মেটাব। আজ থেকে আমার রাগ-জেদ মেটানোর মেডিসিন তুমিই। যদি বলো কিনে নিয়েছি, তবে হ্যাঁ নিলে নিয়েছি। এতে তোমার কিছু করার নেই। তুমি চাইলেও কিছু করতে পারবে না। আজ থেকে আমি যা বলব, তাই হবে। আমার কথার এক ইঞ্চি এদিক-সেদিক হলে সোজা দেশে পাঠিয়ে দেব। আমি খুব ভালো করেই জানি, কত কষ্টের বিনিময়ে এসেছো গরিবের মেয়ে তুমি। আর মূলত টাকা ও প্রপার্টির লোভেই তুমি এখানে এসেছ।”
কথাগুলো বলেই ইথান আচমকা নূশার শরীরে জড়ানো চাদরটা হেস্কা টান দেয়। নূশা দুহাতে প্রাণপণ শক্তিতে চাদরটা আঁকড়ে ধরে চিৎকার করে ওঠে, “না! আমাকে আর মৃত্যুযন্ত্রণা দেবেন না, আমি আর নিতে পারছি না।”
ইথান ধমক দিয়ে বলে, “যাও, গিয়ে ফ্রেশ হয়ে এসো। তোমাকে এই অবস্থায় টাচ করার রুচি নেই আমার।”
এ কথা বলে ইথান নূশার কাছ থেকে কিছুটা দূরে সরে যায়। নূশা বিছানা থেকে নামার চেষ্টা করে, কিন্তু তার শরীর যে আর চলছে না, অচল হয়ে আছে সর্বাঙ্গ। সারা শরীরে প্রচণ্ড ব্যথা, রন্ধ্রে রন্ধ্রে যন্ত্রণা। দাঁতে দাঁত চেপেও বিছানা থেকে পা ফেলার শক্তি পাচ্ছে না সে। নূশার এই অবস্থা দেখে একরাশ বিরক্তি নিয়ে ইথান এগিয়ে আসে তার দিকে ফের। তারপর এক টানে নূশার গা থেকে চাদরটা সরিয়ে তাকে কোলে তুলে নেয় নূশা কে। নূশার ভীষণ ঘৃণা হচ্ছে ঘৃণা ইথানকে দেখে। মনে হচ্ছে, এ কোনো মানুষ নয়, মানুষরুপী এক জানোয়ার। মানুষ হলে আজ নূশার এমন করুণ অবস্থা সে করত না। আহা! কত আর্তনাদই না নূশা করেছিল, কিন্তু সে শোনেনি এসব। উল্টো নূশার মুখ চেপে ধরেছিল। নূশাকে ওয়াশরুমে নামিয়ে দিয়ে ইথান গটগট করে টুপসা টাপাস পা ফেলে বেরিয়ে যায় যাওয়ার আগে বলে যায়, “নিজে নিজে আসতে পারতে না, তাই এনে দিলাম। কিন্তু এখান থেকে তোমায় নিতে পারব না, আমার কোল এতটা সস্তা না।”
ইথান বেরিয়ে যেতেই নূশা ধীরে ধীরে শাওয়ার ছেড়ে ফ্লোরে বসে পড়ে। পানির ধারার সাথে সাথে তার চোখের পানি সে বিসর্জন দিতে থাকে। এখন সে কী করবে? তার কি কোনো উপায় নেই? নিয়তি কি তা বদলাবে না?গরিব ঘরের মেয়ে নূশা। তার জীবনটা কোনো রূপকথা নয়, বরং অভাবের কালিতে লেখা এক ধূসর পাণ্ডুলিপি বলতে গেলে। জন্ম এক জীর্ণ কুঁড়েঘরে, যেখানে নুন আনতে পান্তা ফুরোয়। বাবা গ্রামের মসজিদের ইমাম, সাথে মাদ্রাসার সামান্য শিক্ষকতা করেন। তাঁর এই দুয়ের স্বল্প আয়েই চলে তাদের ছয় জনের সংসার। অভাব যেখানে নিত্যসঙ্গী। দাদা-দাদী, ষোল বছরের দুই যমজ বোন আর চৌদ্দ বছরের কিশোর ভাই সবার মুখের অন্ন জোগাতে বাবাকে দিনরাত এক করতে হয়। উনিশ বছর বয়সী নূশা, সংসারের বড় মেয়ে হিসেবে খুব অল্প বয়সেই বুঝে গিয়েছিল, জীবন মানেই সংগ্রাম।
কিন্তু ভাগ্যের চাকা আচমকাই ঘুরে গেল নূশার, নাকি বলা ভালো থমকে গেল? আত্মীয়তার সুতো ধরে ফুফুর বাড়িতে এক পলক দেখেন তাকে ইথানের মা মিসেস মাইরা এই দেখা থেকেই পাগল হয়ে তার বাবার কাছে প্রস্তাব দেন প্রথমে তার বাবা রাজি না হলেও পরে রাজি হয়ে যান অতঃপর সে আসে ফ্রান্স আসার দুদিন পরি হয় তাদের বিয়ে। ইথান বাইরের দেশের বিত্তবৈভবে মোড়া এক প্রতাপশালী পুরুষ। নূশা এই বিয়ে নিয়ে ক্ষণিকের জন্য বোকা বনে গিয়েছিল। অভাবের সংসারে বড় হওয়া নূশা অর্থের লোভ কোনোদিনও করেনি, সে শুধু চেয়েছিল একটু শান্তি, একটু সম্মান। ভেবে এসেছিল গরিবের মেয়ে সে, কোনো এক সাধারণ দিনমজুর বা চাষির ঘরেই হয়তো তার ঠাঁই হবে। সেখানে অভাব থাকলেও, হয়তো ভালোবাসার অভাব হবে না।
কিন্তু আজকের এই রাত এই বিষাক্ত বাসর রাত নূশার সেই ভুল ভেঙে চুরমার করে দিল। যেটাকে সে পরম সৌভাগ্য বলে মেনে নিয়েছিল, আজ মনে হচ্ছে সেটাই তার জীবনের সবচেয়ে বড় দুর্ভাগ্য।
ইথান মানুষটা কথা বলে না, মনে হয় শিকার করে। কোনো ভূমিকা নেই, কোনো কোমলতা নেই, সদ্য বিবাহিত স্ত্রীর প্রতি নেই বিন্দুমাত্র সম্মান। আজ রাতে ইথান তার উপর যেভাবে ঝাঁপিয়ে পড়েছিল, তাতে কোনো প্রেম ছিল না ছিল মাত্র অন্ধ লালসা আর ক্ষমতার আস্ফালন। গ্রামের ঐ অশিক্ষিত চাষিও হয়তো তার স্ত্রীকে এর চেয়ে বেশি মর্যাদা দিত। যখন ইথান নূশার শরীরটা নিজের মধ্যে নিয়েছিল নূশার মনে হয়েছিল, তার শরীরটা হয়তো এই প্রাসাদে দামি বিছানায় পড়ে আছে, কিন্তু তার আত্মাটা আজ অপমানিত, লাঞ্ছিত। যে পুরুষ প্রথম রাতেই স্ত্রীর সম্মানের তোয়াক্কা করে না, তার সংসারে সামনে আরও কত বড় ঝড় অপেক্ষা করছে? ভাগ্যের জোরে পাওয়া এই তথাকথিত ‘বড় ঘর’ আসলে তার জন্য এক সোনার খাঁচা, যেখানে তার স্বপ্নগুলো হয়তো আজীবনের জন্য কয়েদি হয়ে রইবে।
নূশা অনেক কষ্টে সোজা হয়ে দাঁড়ায়। শরীরের প্রতিটি হাড় তার বিদ্রোহ করছে, তবুও দাঁতে দাঁত চেপে সে গোসল সেরে নেয়। শাওয়ারের হালকা গরম পানি গায়ে পড়তেই শরীরের জড়তা কিছুটা কাটে। গোসল শেষ করে সে একবার পুরো ওয়াশরুমটার দিকে তাকায় তাকিয়ে বিস্ময়ে বিমূঢ় হয়ে যায়। এটা কি আসলেই ওয়াশরুম নাকি কোনো রাজকীয় শয়নকক্ষ! নূশাদের পুরো বাড়ির দুটো ঘরের আয়তনও হয়তো এই ওয়াশরুমের সমান হবে না। দেয়াল ও মেঝে জুড়ে কুচকুচে কালো ‘নেরো মারকুইনা’ মার্বেল পাথর বসানো, আর তার ওপর আবছা অ্যাম্বার আলোর আভা। একপাশে কালো গ্রানাইটের তৈরি একটি বিশাল ‘ফ্লোটিং ভ্যানিটি’। সেখানে এবড়োখেবড়ো আগ্নেয়শিলার ওপর পানি পড়লে তা কোনো শব্দ ছাড়াই নিমেষেই অদৃশ্য হয়ে যাচ্ছে। ঠিক ওপরেই ছাদ থেকে ঝোলানো ফ্রেমবিহীন এক স্মার্ট মিরর, যার পেছনের লুকানো আলো এক অদ্ভুত ইলুশন সৃষ্টি করছে। শ্যাম্পু বা দামি লোশন রাখার জন্য কোনো সাধারণ র্যাক নেই, বরং দেয়ালের ভেতরেই খোদাই করা আলোকিত তাকে সাজানো রয়েছে কালো ক্রিস্টাল ও ম্যাট গোল্ডের ছোট ছোট বোতল। ঘরের মাঝখানে এক বিশাল কালো বাথটাব, আর কাঁচের দেয়াল দিয়ে আলাদা করা অত্যাধুনিক শাওয়ার জোন।
নূশা আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখে। ভ্যানিটির ড্রয়ারগুলো খুঁজে কোনো তোয়ালে না পেলেও একটা কালো বাথরোব পায় সে। সেটাই গায়ে জড়িয়ে নিয়ে নিজেকে ঢেকে সে নিজের ভবিষ্যতের কথা ভাবতে থাকে। নূশার বুঝতে বাকি নেই, এই শ্বেতপাথরের প্রাসাদে তার নিশ্বাস নেয়ার জায়গা নেই। ইথান আর তার জগতটা দুই মেরুর বাসিন্দা একজন দম্ভের শিখরে, অন্যজন মাটির কাছাকাছি। তাদের এই সম্পর্কের সমীকরণ মেলানো অসম্ভব। কিন্তু চাইলেই তো আর হুট করে সব ছেড়ে পালানো যায় না। পালানোর জন্যও ওড়ার শক্তি লাগে, পায়ের নিচে শক্ত মাটি লাগে, যা এই মুহূর্তে নূশার নেই। তাই আপাতত মাথা নিচু করে ঝড়ের দাপট সয়ে যাওয়া ছাড়া তার সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই।
এটা শুধু যে তার নিজের লড়াই নয়, বরং পেছনে ফেলে আসা তার শীর্ণকায় পরিবারটির অস্তিত্ব রক্ষার লড়াই। বাবার জীর্ণ কাঁধ আর কত ভার সইবে? সারাজীবন তো শুধু দিয়ে-ই গেলেন, ইমামতি আর মাদ্রাসার ধুলোমাখা পথেই ক্ষয়ে গেল মানুষটার জীবন। এখন তো নূশাকেই হতে হবে ভাইবোনদের ভবিষ্যৎ গড়ার কারিগর বাবা যে আর পারেন না নিতে সংসারের ভার। কষ্ট হয় যে বাবার। যমজ বোন দুটো আর ছোট্ট ভাইটার পড়াশোনা, তাদের জীবন সবকিছুর দায়িত্ব এখন অলিখিতভাবে নূশার কাঁধেই যদিও বাবা তাকে এসব নিয়ে চিন্তা করতে বারণ করেছেন। কিন্তু নূশা তো বুঝতে পারে বাবার শরীরটাও আর আগের মতো শক্তপোক্ত নেই।
নূশা মনে মনে এক কঠিন শপথ নেয় এখন। তাকে নিজের পায়ে দাঁড়াতে হবে। এই দেশে এই শহরে, এই সমাজে একা মাথা উঁচু করে বাঁচার মতো সামর্থ্য অর্জন করতে হবে। কোনো চাকরি বা উপার্জনের পথ খুঁজে না পাওয়া পর্যন্ত এই অপমান, এই অবহেলা সে গিলে খাবে অমৃতের মতো। যেদিন নিজের পকেটে জোর হবে, যেদিন কারোর দয়া ছাড়া বাঁচার সাহস হবে, সেদিনই নাহয় এই সোনার খাঁচা ভেঙে বেরিয়ে যাবে সে। তবে যাওয়ার আগে সে চেষ্টা করে দেখবে। পাষাণ ইথানের মনটা কি কোনোভাবেই গলানো সম্ভব? যদি এই মানুষটার জীবনে সে বিন্দুমাত্র গুরুত্ব পায়, যদি অলৌকিক কোনো পরিবর্তন আসে তবে হয়তো এই সম্পর্কটা নতুন কোনো নাম পাবে। আর যদি তা না হয়, যদি ইথান নিজের মতোই রয় তবে নূশা নিজের পথ নিজেই চিনে নেবে। তখন আর পিছুটান থাকবে না, থাকবে শুধু সামনে এগিয়ে যাওয়ার প্রত্যয়।
নিজেকে কিছুটা শান্ত করে নূশা ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে আসে। ইথানকে রুমে না দেখে সে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। তাড়াতাড়ি লাগেজের কাছে গিয়ে একটা সুতির থ্রি-পিস বের করে নেয় উদ্দেশ্য আবারও ওয়াশরুমে গিয়ে পোশাকটা বদলে নেওয়া। কিন্তু ঘুরে দাঁড়াতেই নূশার বুকটা ধক করে ওঠে। ইথান বেলকনির দরজায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এক হাতে ধরা তার রেড ওয়াইনের গ্লাস। সে গ্লাসে চুমুক দিয়ে নেশাসক্ত চোখে নূশার দিকে তাকিয়ে আছে। তার ভায়োলেট চোখের এই নেশাক্ত চাহনি দেখে নূশা ভয়ে কুঁকড়ে যায়। না জানি এখন কি করে দেয় আবার। নূশা চোখ নামিয়ে দ্রুত ওয়াশরুমের দিকে পা বাড়ায় ও পা বাড়াতেই ইথানের গম্ভীর কণ্ঠস্বর ভেসে আসে পিছন থেকে, “আমার তোমাকে আবারও প্রয়োজন! এদিকে এসো।”
নূশা থমকে দাঁড়ায় পিছনে ফিরে করুন চোখে ইথানের দিকে তাকিয়ে আকুতি করে, “আজ থাক না আমার শরীরটা খুব খারাপ লাগছে।”
ইথান তাচ্ছিল্যের সাথে বলে, “তাতে আমার কী? আমার তোমার শরীরের প্রয়োজন, তার সুস্থতা-অসুস্থতা নিয়ে মাথা ঘামানোর সময় আমার নেই এদিকে আসো মেয়ে।’
কথাগুলো বলতে বলতে ইথান নূশার দিকে ধীরপায়ে এগিয়ে আসে। নূশা দুপা পিছিয়ে গিয়ে কম্পিত কণ্ঠে বলে, “আপনার কি একটুও মায়া হয় না? আমার প্রতি কেন এত অবিচার করছেন?”
ইথান এক পৈশাচিক হাসি হেসে বলে, “না, হয় না। মায়া-দয়া আমার ভেতর নেই। আই অ্যাম লাইক আ রোবট!”
বলেই হাতের ওয়াইনের গ্লাসটা উঁচিয়ে ধরে সজোরে মেঝেতে ফেলে দেয় ইথান। কাঁচ ভাঙার শব্দে নূশা শিউরে ওঠে। মনে হচ্ছে সে কোনো মানুষের সামনে নয়, এক হিংস্র জানোয়ারের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। তার সারা শরীর আতঙ্কে হিম হয়ে আসছে। বড় বড় চোখ করে সে তাকিয়ে থাকে ইথানের দিকে। মনে মনে শুধু আল্লাহকে ডাকতে থাকে, “ইয়া আল্লাহ! তুমি একটু দয়া করো আমাকে!”
নূশার এই আতঙ্কিত চাহনি দেখে ইথান আরও এক পা এগিয়ে আসে নূশার দিকে ইথানের ঠোঁটে ঝুলছে একটা খাঁটি বাঁকা হাসি। যাকে সচারাচর স্মার্ক বলা হয়। এই হাসি রুমে প্রবেশ করেই সে নূশার উদ্দেশ্যে হেসেছিল অতঃপর কোনো কথাবার্তা ছাড়াই নিজের চাওয়া হাসিল করে নিয়েছিল।
তুষারিণী ——— ১
সানজিদাআক্তারমুন্নী
Share On:
TAGS: তুষারিণী, সানজিদা আক্তার মুন্নী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE