তাজমহল #দ্বিতীয়_খন্ড
পর্ব_৩০
প্রিমাফারনাজচৌধুরী
শাইনা মেয়েকে নিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। বাকিরা ঘুমায়নি। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী আর রওশনআরা সিদ্দিকীর মধ্যে একদফা কথা কাটাকাটি হয়ে গেছে। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বুঝতে পারছেন না উনি কি দোষ করেছেন। তিনি তো নিজেই স্তব্ধ হয়ে গেছেন কথাটা শুনে। মেয়েটা বিয়ে করছিল না বলে একটা দুশ্চিন্তায় ভুগছিলেন তিনি। কিন্তু মেয়েটা তো এখন আরও দুশ্চিন্তায় ফেলে দিল।
রায়হান ঝিমলিকে ঘরে এসে বলল,”আগুন লাগিয়ে দিয়েছ। এখন নিভাবে কে?”
ঝিমলি বলল,”আম্মু তো আমার উপরও রেগে গেছে। আমার কি দোষ? যা সত্যি তাই বলে দিয়েছি। আনিস ভাই কি খারাপ? আমার তো উনাকে খারাপ লাগে না। আমার বোন থাকলে উনার ঘাড়ে ঝুলিয়ে দিতাম। পিউর জেন্টলম্যান। ননদিনী রায়বাঘিনীর জন্য পার্ফেক্ট।”
“আনিস খারাপ না। খারাপ পরিস্থিতি। তাজকে নিয়ে এতকিছু হয়েছে সেখানে এই সম্পর্ক নিয়ে আগানোর কথা ভাবতেই পারছেনা আম্মু আব্বু।”
ঝিমলি বলল,”আমি কিন্তু ঢাকায় যাচ্ছি না মিস্টার। ঝগড়া দেখবো।”
“কীসের ঝগড়া?”
“দুই বাড়ির।”
বলেই সে ফিক করে হেসে ফেললো। রায়হান তার দিকে হতাশ চোখে চেয়ে রইলো।
“তুমি মজা নিচ্ছ?”
“চাটগাঁইয়া ছেলে বিয়ে না করলে কতকিছু যে মিস করে ফেলতাম। ভাগ্যিস করলাম।”
রায়হান বলল,”আমার মোটেও মজা লাগছে না।”
ঝিমলি বলল,”শাইনা ভালো করেছে। খেয়েদেয়ে ও ঘুমিয়ে পড়েছে।”
“অতিরিক্ত টেনশনে ঘুম আসে। ওরও ওই অবস্থা। ওর টেনশন আরও বেশি হচ্ছে।”
“তা ঠিক। যাই নিচে গিয়ে দেখে আসি।”
ড্রয়িং রুমে পরিস্থিতি উত্তপ্ত। তিতলি খবর নিয়ে এল তাসনুভার কাছে। তাসনুভা শুয়ে আছে সোজা হয়ে, বুকের উপর বালিশ জড়িয়ে ধরে। তিতলি তার পাশে বসে বলল,
“আপু এখন আব্বু চা খাচ্ছে। মেজো ভাইয়া চুপচাপ আব্বু আর চাচ্চুর কথা শুনছে। বড়ো ভাইয়া আব্বুকে সাবধানে কথা বলতে বলছে। তৌসিপ্পে কথা শুনতে শুনতে সোফায় ঘুমিয়ে পড়েছে। তাশফিন খেলা দেখছে। আর..
তাসনুভা ধমকে উঠে বলল,”শাটআপ তিতলি! এইসব জানতে চাইনি। কি কথা হচ্ছে সেইসব জানতে চেয়েছি।”
তিতলি বলল,”ওকে গিয়ে শুনে আসি। তুমি ঘুমিয়ে পড়লে আমি আবারও ডেকে তুলবো।”
“প্লিজ গো।”
তাসনুভা চোখ বন্ধ করলো আবারও। তিতলি তার ঘুমে ব্যাঘাত ঘটাচ্ছে। আশ্চর্য কি এমন ঘটেছে যার জন্য সবাইকে না ঘুমিয়ে সারারাত মিটিং করতে হবে?
রায়হান বলল,”বাকি কথা কাল সকালে হবে। এখন এত অশান্তি করে কি হবে?”
তাজউদ্দিন সিদ্দিকী চুপ করে রইলেন।
রওশনআরা বললেন,”আমি বুঝতে পারছিনা এত এত ভালো সম্বন্ধ ফেলে কেন ওকে পাশের বাড়ির ছেলের প্রতি ঝুঁকতে হবে? আশরাফের মায়ের পা মাটিতে পড়বে না আর। ভাববে এই বাড়ির সবাই ঠেকায় পড়েছে। একজন তো বিয়ে করলো ওই বাড়ি থেকে বাড়ির কারো কথা না শুনে। তারপর কি হলো সব তো দেখতেই পেলাম চোখের সামনে। ছ’মাস যেতে না যেতেই লন্ডন থেকে দেশে ফিরতে হলো। বউয়ের কথায় ওঠবস করতে হচ্ছে। তারপরও শান্তি আছে? এখন সে আবার লন্ডনে ফিরবে। তার বউয়ের আবারও অশান্তি শুরু হবে। তারা নিজেদের সিদ্ধান্ত নিজেরাই নেয়। নিজেরাই ঝামেলা বাঁধায়। তারপর সব সামাল দিতে হয় আমাদের। সবসময় তাদের কথায় কেন আমাদের চলতে হবে। আমরা বেঁচে থেকে কি করছি?”
তিনি যেন বহু পুরোনো রাগও আজ উগরে দিচ্ছেন। তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বলল,
“সেটা হয়ে গেছে। বাদ দাও।”
“বাদ দেওয়ার কারণেই তো আরেকজন সাহস পেয়েছে। তারা কীসে কম যে ওই বাড়ির ছেলেমেয়েদেরই দরকার পড়ে তাদের? তাদের কি কোনো অংশে কম বানিয়েছি? আমাদের কথার কোনো মূল্য নেই তাদের কাছে। অবশ্য ছোটোগুলোর কি দোষ দেব? বড়োরাই তো এইসব শিখিয়েছে তাদের।”
পরিস্থিতি অস্বাভাবিক হয়ে উঠছে। রায়হান বলল,
“আম্মু পুরোনো কথা না বলে এখন কি করা যায় সেটা বলো। নুভাকে ঢাকায় পাঠিয়ে দাও। ব্যস ওখানে দেখেশুনে বিয়ে দিয়ে দেব।”
“তুমি ভুলে যাচ্ছ নুভা তোমার মতো নয় যে মা বাবার কথা চুপচাপ শুনবে।”
তাজদার সাথে সাথে দাঁড়িয়ে পড়লো। বলল,”আমি ঘরে যাচ্ছি। ঘুম পাচ্ছে।”
তাজউদ্দীন সিদ্দিকী বলল,”হ্যাঁ যাও।”
রওশনআরা বললেন,”ছেলেমেয়েকে একদম প্রশয় দেবেন না। আমরা মরে যাইনি। ওরা যা খুশি সিদ্ধান্ত নিতে পারেনা। তাজ তুমি তোমার বোনকে বলে দেবে ও যা চাইছে তা হবে না। তোমার কারণে ও এত সাহস পেয়েছে। এখন তুমি এইসব মিটমাট না করে দেশ থেকে যাবে না। আমি জানিনা তুমি কিভাবে কি করবে। কিন্তু তুমি তোমার বোনকে বিয়ে দিয়ে তারপর দেশ ছাড়বে। পাশের বাড়িতে আমি মেয়ে দেব না। যাই হয়ে যাক।”
“আমি থাকবো না এইসবের মাঝখানে। নুভা হ্যান্ডেল করবে সব। আমি এখানে একটা কথাও বলবো না।”
“তুমি বলবে। কারণ তুমি ওকে এইসবে জড়াতে বাধ্য করেছ। কি দরকার ছিল ওদের একসাথে ট্যুরে নিয়ে যাওয়ার? ওখান থেকে আসার পর ওর মধ্যে পরিবর্তন দেখেছি আমি। আজকেই বা কি দরকার ছিল এতকিছু করার? আমাদের মানসম্মান…
“ওই বাড়ির মেয়ে বিয়ে করায় তোমাদের মানসম্মান কমে গেছে?”
“হ্যাঁ কমেছে। তোমার না কমলেও আমাদের কমেছে।”
“এখন আমি কি করতে পারি?”
রায়হান বাঁধা দিল।
“আম্মু ওকে ছাড়ো।”
তাজদার চ বর্গীয় শব্দ করে বলল,”বলতে দাও। এখন আমি কি করলে তোমরা খুশি হবে সেটা বলো।”
রওশনআরা রাগে টগবগ করছেন। মুখ ফিরিয়ে রাখলেন।
“তুমি কোনদিন আমার কথা শুনেছ? নুভা ঠিক তোমার মতো হয়েছে। তোমাদের কাছে আমার সিদ্ধান্তের কোনো মূল্য নেই। মেয়ের বাবা হয়েছ। যেদিন ও তোমার কোনো সিদ্ধান্তকে গ্রাহ্য করবে না সেদিন আমার যন্ত্রণাটা বুঝবে।”
তাজদার বলল,”এখন আমাকে কি করতে বলছো সেটা ক্লিয়ার করে বলো। আর এটাও বলো কি করলে তুমি আমাকে আর কক্ষণো বিয়ের খোঁটাটা দেবেনা।”
রওশনআরা চুপ করে রইলেন। তাজদার মায়ের দিকে চেয়ে রইলো।
“আম্মু আমি একটা প্রশ্ন করেছি। তুমি আমাকে কথাটা বলছো ঠিক আছে। কিন্তু শাইনাকে বললে তোমার প্রতি ওর মনে বিতৃষ্ণা বাড়বে, কমবে না।”
“তোমার বউয়ের মন পেতে হবে এখন?”
“তাহলে ওকেও তুমি এভাবে খোঁটা দিয়ে যাবে?”
“তোমার বউ তোমাকে বলেছে এসব? আমি তো জানতাম সে বোবা। কথা বলতে জানে না। তোমাকে সব বলেছে ঢাকায়? বলবে তো। বলার জন্যই বরকে নিয়ে এসেছে কান্নাকাটি করে।”
রায়হান কাউকেই থামাতে পারছে না। কোথাকার জল কোথায় গিয়ে গড়াচ্ছে। তাজদারকে দেখেও সে অবাক হচ্ছে। বোধহয় এই প্রথম আম্মুকে ওকে এত কথা বলে নিজেও স্বস্তি বোধ করছে। কারণ এর আগে কখনোই তাকে এত কথা শোনানোর সুযোগ পায়নি আম্মু। সে কোনো কথা বলার আগেই কেটে পড়তো। আজ মনের ঝাল মিটিয়ে নিচ্ছে রওশনআরা। একটা ছেলেমেয়েও মা বাবার সম্মানের কথা চিন্তা করে না। এদের বেশি স্বাধীনতা দিয়ে বড়ো ভুল হয়ে গেছে।
তাজদার আর দাঁড়ায়নি। গটগট পায়ে হেঁটে ঘরে চলে গেছে। দরজা ভাজিয়ে দেয়া ছিল। বিছানায় তাজনাহা ঘুম। শাইনা জগ থেকে গ্লাসে পানি ঢালছে। পরনে একটা কালো কাফতান নাইটি। চুলগুলো খোলা। বাবু ঘুম তাই সে আলো জ্বালাচ্ছে না। এটুকুনি একটা মেয়ে আলো জ্বালালে সে কিভাবে যেন টের পেয়ে যায়। গ্লাসে পানি খেতে খেতে তাজদারের দিকে ফিরলো।
তাজদার আলো জ্বালাতেই সে আবারও চট করে আলো নিভিয়ে মনে করিয়ে দিল আলো জ্বালানো যাবে না। তাজদার ডিমলাইটের আলোয় রিডিং গ্লাসটা খুঁজে বের করলো। তারপর সেটা চোখে দিয়ে ল্যাপটপটা নিয়ে বসে পড়লো।
কিছুক্ষণ পর তাজনার ঘুম ভেঙে গেছে। শাইনা জানে এই টাইমে তার ঘুম ভেঙে যায়। ঠিক এই সময়টাতে তারও ঘুম ভেঙে যায়।
সে ড্রয়ার থেকে কয়েকটা চিপস, বিস্কিট, চকলেট নিয়ে এসে বসলো। মাঝরাতে ক্ষিদে লাগলে টুকটাক এইসব খায়। অন্য কিছু খেতে ইচ্ছে করে না। তবে ঢাকায় থাকাকালীন মাঝরাতে দুজন মিলে নুডলস, পাস্তা, পিৎজা অনেক ভাজাভুজি করে খেত। এই বাড়িতে এইসব করে খাওয়ার সুযোগ নেই। তবে ফ্রিজে কিছু থাকতে পারে। কিন্তু সে ঠান্ডা কিছু খেতে পারবে না। বাবু কাঁদছে। সে চুলটা বেঁধে নিয়ে কোলে তুলে নিল। তারপর কুড়মুড় শব্দ করে চিপস খেতে লাগলো।
বাবু খাওয়া শেষ করে তার মুখের দিকে চেয়ে রইলো। রাতের বেলা তার চোখে ঘুম নেই। সে বাবুকে তাজদারের কোলে দিয়ে এল।
“দুটো ডিউটি একসাথে করা পসিবল?”
“আমার দ্বারা পসিবল। আমি মানুষ নাকি?”
“আই নৌ!”
শাইনা বিছানায় শুয়ে পড়লো। এটা না করলে সারারাত ল্যাপটপ নিয়ে বসে থাকবে। তাজদার এবার ল্যাপটপ বন্ধ করে মেয়েকে বিছানায় রেখে খেলনাপুতুল দেখিয়ে হাসাতে লাগলো। আর তার ফাঁকে শাইনার দিকে তাকালো।
“তুমি ঘুমাওনি?”
“ঘুমিয়েছি। আপনাদের ফ্যামিলি ড্রামা দেখার জন্য জেগে থাকার সময় আমার নেই। ক্রিঞ্জ ফ্যামিলি!”
“আমার ফ্যামিলি ক্রিঞ্জ?”
“ইয়েস।”
“তুমি এই ফ্যামিলির একজন মেম্বার।”
“আপনিও।”
“শাটআপ!”
“ইউ জাস্ট শাটআপ।”
“ইউ শাটআপ এগেইন শাইনা মমতাজ।”
বলেই রাগে গজগজ করতে পাশ ফিরে শুয়ে পড়লো সে।
কিছুক্ষণ পর বাপ মেয়ে দুজনেই একসাথে ঘুমিয়ে পড়েছে। শাইনা দুজনের গায়ে লেপ তুলে দিয়ে দুজনের কপাল দুটো চুমু খেয়ে শুয়ে পড়লো।
শাইনার দুলাভাইরা সকাল সকাল ঢাকঢোল পিটিয়ে বউ বাচ্চা নিয়ে শ্বশুরবাড়ি হাজির। শারমিলা আর শাবরিন মহাবিরক্ত। ধমকে বলল,”এদের এত খুশি কীসের বুঝতে পারছিনা। আপনারা আগে থেকে জানতেন নাকি?”
জামিল বলল,”আগে থেকে জানতাম মানে? আমরা সেদিনই বুঝেছিলাম যেদিন তালতো বোন বলল আনিস ভাই আপনাকেই লাগবে।”
ইমতিয়াজ বলল,”কিন্তু আমাদের শ্বাশুড়িমা ছাড়া জমবে না। উনাকে খবর দাও দ্রুত।”
আফসার সাহেব বললেন,”রওনা দিয়েছে। আসার পর কি করে আল্লাহ জানে।”
সাবরিনা সবার অবস্থা দেখে হাসছে। আশরাফ আশ্চর্য হয়ে বলল,
“তোমার হাসি পাচ্ছে?”
সাবরিনা বলল,”মেজো ভাইয়ের কথা ভেবে হাসি পাচ্ছে। বেচারা সকাল সকাল ঘর থেকে বেরিয়ে গেছে। কাল রাতে শাওন কি বলেছে কে জানে। দুই ভাই মারপিট লেগে গেল।”
দাদিমা এসে সোফায় বসলেন। বললেন,
“তোমরা এত ফুল মালা কীসের জন্য এনেছ আমি তো বুঝতে পারছিনা।”
জামিল বলল,”শ্বাশুড়ি মাকে মিষ্টিমুখ করাবো। ছেলের বিয়ে পাকা হলো বলে কথা।”
শারমিলা বলল,”কচু হয়েছে। ওই মেয়ে আমাদের বাড়িতে এসে সংসার করবে বলে মনে হয় আপনার?”
“করবে করবে। আমার সম্বন্ধি পটাতে যখন পেরেছে তখন সামলে নিতেও জানবে।”
শাবরিন বলল,”ও জীবনেও এই বাড়িতে থাকবে না। ওকে আমরা ছোটো থেকে চিনি। কি নাকউঁচু মেয়ে। কথায় কথায় মানুষকে ছোটো করে। শানুকে কত জ্বালিয়েছে বিয়ের পর থেকে। এখনো ওর সাথে ভালো সম্পর্ক হয়নি। ভাইয়ের ভয়ে এটা সেটা করে। আমরা কি ওকে চিনিনা? ও আমার ভাইয়ার জীবন তেজপাতা বানিয়ে ছাড়বে। ডেঞ্জারাস মেয়ে।”
ইমতিয়াজ বলল,”শানু কি বলে?
শাবরিন বলল,”ওই বেয়াদব তো কথা বলতেই চায় না। বলে বেশি কথা বললে তাজ ভাই নাকি সন্দেহ করবে।”
সাবরিনা বলল,”ভুল কিছু তো বলেনি। ভাইয়া আবার ভেবে বসবেন ও মানা করে দিয়েছে।”
আশরাফ বলল,”ওকে এসবের সাথে জড়িয়ে লাভ নেই। বড়োআম্মু এমনিতেই ওকে নানান কথা শোনায়।”
আফসার সাহেব বললেন,”হ্যাঁ, আমার মেয়েটা একটু শান্তিতে সংসারটা করুক।”
দাদিমা বললেন,”তোর মেয়ে বোবা। তাই বলে বোবার শত্রু নেই একথা ভুল। বোবাদের মানুষ পেয়ে বসে। আমি কতবার শিখিয়ে দিলাম তোর বড়োমা ঠেস গুঁতা মারলে তুইও সুন্দর করে জবাব দিয়ে দিবি। বলবি আমি এমনটা করিনি, বলিনি। না তোর মেয়ের মুখ ফাটেনা। ঝগড়া করতে হয় নাকি? সুন্দর করে বলে দিলে হয়।”
শারমিলা বলল,”ও ওইসব পারবে না। সবাইকে দিয়ে হালচাষ হয় না। বড়োআম্মু আগে ওকে পছন্দ করতো। সেটা মনে করে ও কিছু বলতে পারে না। পারবেও না। তাজ ভাই সামলাতে পারলে ভালো। নইলে দেখবে এইসবের জন্যও ওকে কথা শোনাতে ছাড়বে না।”
শাহিদা বেগম এলেন। সঙ্গে আনিসও। মাকে বাসস্ট্যান্ড থেকে নিয়ে এসেছে সে। শাহিদা বেগম বাপের বাড়ি থেকে ক্ষেতের শাকসবজি নিয়ে এসেছেন। ব্যাগটা নিয়ে আনিস রান্নাঘরের দিকে চলে গেল সোজা।
শাহিদা বেগম বোরকা খুলে বসলেন সোফায়।
“ওমা! সকাল সকাল জামাইরা বাড়িতে হাজির!”
জামিল আর ইমতিয়াজ শ্বাশুড়ির গলায় মালা পরিয়ে দিল। তারপর সাবরিনাকে বলল,
“মিষ্টি নিয়ে আসুন।”
“কি হয়েছে বলবে তো আমাকে।”
“দাঁড়ান এত তাড়াহুড়ো করলে সমস্যা। বসেন আগে। একটু জিরিয়ে নিন।”
সাবরিনা প্লেটে করে মিষ্টি নিয়ে এল। আনিস এসে সোফায় হেলান দিয়ে বসে পড়েছে বাবার পাশে। জামিল আর ইমতিয়াজের কান্ডকারখানা চুপচাপ দেখে যাচ্ছে সে।
শাহিদা বেগম বললেন,”এটা কোন মেয়ে? বোয়ালখালীর মেয়েটা নাকি? নাকি চন্দনাইশেরটা?”
জামিল বলল,”আগে মিষ্টি খান।”
“জামাইগুলোও আমার সাথে মশকরা করে।”
হেসে উঠলো সবাই। জামিল শ্বাশুড়িকে মিষ্টি খাইয়ে দিল। শাওন এসেছে। ভিডিও করছে। শাইনাকে পাঠাবে। এই বাড়ির তামাশা দেখা মিস হয়ে যাবে নইলে।
শাহিদা মিষ্টি চিবোতে চিবোতে আনিসের দিকে তাকালেন।
“তুই কিছু বল। সবাই কি শুরু করেছে? আপনি কিছু বলেন।”
আফসার সাহেব বললেন,”খাওয়া শেষ করো আগে।”
“একটু পানি দাও।”
সাবরিনা পানি এগিয়ে দিল। শাহিদা বেগম পানি খেলেন। জামিল বলল,
“আম্মা আগামী সপ্তাহেই বিয়ে। এটাই পাকাকথা। এইবার আনিস ভাইয়ের বিয়ে আটকায় কে!”
শাহিদা বেগম আবারও আনিসের দিকে তাকালো।
“মেয়ে কোথাকার?”
“আজিমপুরের।”
শাইনার বেগম কপাল কুঁচকে ফেললেন।
“আজিমপুর!”
“মানে এই পাড়ার।”
“এই পাড়ার?”
“পাশের বাড়ির।”
শাহিদা বেগম ভাবতে লাগলেন।
“শিউলি? ওকে ওর জামাই নিয়ে গেছে। ডিভোর্স হয়নাই তো।”
জামিল আর ইমতিয়াজ একসাথে কেশে উঠলো।
“আম্মা আনিস ভাইকে আপনার কি মনে হচ্ছে? উনি কেন শিউলিকে বিয়ে করতে যাবে। এই পাড়ায় আরও মেয়ে আছে তো।”
“কে? ধুর এত ভণিতা করো না তো জামাই।”
শাওন বলল,”জুনুনআরা সিদ্দিকী।”
“এইটা আবার কে?”
“তোমার ছোটো মেয়ের ননদ। তাজদার সিদ্দিকীর বোন। তাজনা বুড়ির ফুপু। বড়োআম্মুর মেয়ে।”
শাহিদা বেগম স্তব্ধ হয়ে কপাল চেপে ধরে আনিসের দিকে চেয়ে আছেন।
তারপর শুরু হলো আসল যুদ্ধ। শাহিদা বেগম কপাল চাপড়াচ্ছেন।
“জেনেশুনে আগুনে পা দিয়েছিস তুই? আমি তো ভাবতাম তো মাথায় সব মগজ। এখন তো দেখছি। হায় আল্লাহ হায় আল্লাহ এইসব কেমন কথা! আম্মা আপনি কিছু বলেন। এই ছেলেকে কি এখনো ধরে ধরে ভালোমন্দ শেখানোর বয়স আছে? তুই এটা কি করলি আনিস! আবার আমার দিকে তাকিয়ে আছে। তুই ফুতও হইলিনা, ভূত হইলিনা। আমি পেটে এটা কি ধরলাম?”
ইমতিয়াজ বলল,”আপনি কিছু তো বলেন আনিস ভাই।”
আনিস নড়েচড়ে বসলো।
“আগে সবাই বলা শেষ করুক।”
শাহিদা বেগম কপাল আর বুক চাপড়াতে চাপড়াতে ভেতরে চলে গেলেন।
“ফুতে জেনেশুনে কোথায় ঝাঁপ দিল আল্লাহ!”
শাওন আনিসের দিকে চেয়ে বলল,”আনিস তুমি কিন্তু কাজটা ভালো করলানা। এজন্যই তো বলি কাল মাছ তুলে তুলে এত যত্ন করে কেন খাওয়াচ্ছিল। তুমি তলে তলে টেম্পু চালাও আর আমরা বললেই হরতাল?”
আনিস বলল,”তোর কান বরাবর দেব চড়। বেয়াদব!”
“জ্বলে জ্বলে! হাছা কথা শুনলেই জ্বলে।”
আনিস কপাল কুঁচকে তার দিকে চেয়ে রইলো।
রান্নাঘরে সবাই শাহিদা বেগমকে সান্ত্বনা দিচ্ছিল। তখুনি শাওন সেখানে গিয়ে বলল,
“তাহলে আগামী শুক্রবারে বিয়ে হচ্ছে। ডিজে ডিজে চলবে। আভিতে পার্টি শুরু হোগেয়া।”
শাহিদা তার নাচানাচি দেখে গর্জে ওঠে তার দিকে চা ছাঁকনি ছুড়ে মেরে বললেন,
“তুই গোলাম ওই বাড়িতে বাকি যেটা আছে ওটাকেও নিয়ে আয়।”
শাওন বলল,”আম্মা আম্মা আমি কিন্তু এসব বিষয়ে ভীষণ সিরিয়াস। একদম মশকরা করবানা। নিয়ে আসতেও পারি। এক স্টেজে দুই ছেলের বিয়ে। হা হা!”
শাহিদা বেগম উঠে দাঁড়ালেন।
“ঝাডা ইয়েন হডে গোলামোর ছা গোলাম।”
শাওন দৌড়ে পালালো। সাবরিনা ঘরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে হাসছে।
শাইনা সকাল থেকে একদম চুপ। ঘর থেকে বিনা কারণে বের হলো না। রান্নাঘরে হাজারটা কথা চলছে। সে গেলে থেমে যাচ্ছে সবাই। সবার চেহারা দেখে অন্তত এটুকু বোঝা হয়ে গেছে কাল রাত তুফান যাচ্ছে এই বাড়িতে।
সকাল থেকে তাজদার সিদ্দিকীর সাথেও তার কোনো কথাবার্তা হয়নি। সকালের নাশতার টেবিলে একবার চোখাচোখি হয়েছিল। তারপর কোথায় যেন বেরিয়ে গেছে। ফোনও করেনি।
দুপুরে বাড়ি ফিরলো। তার মুখের দিকে তাকালো। সে তাকালো না। সে এইসব বিষয়ে কোনো কথা বলতেই চাইছে না। তাজদার গোসল করে তাজনাকে কোলে নিয়ে ঘুম পাড়ালো। তারপর খেয়েদেয়ে রুমে এসে আবারও তার মুখের দিকে তাকালো।
শাইনা একটু ভাতঘুম দেবে। আম্মা ফোন করেছে। বলেছে বাড়িতে যেতে। সে যাবে কি যাবে না এখনো নিশ্চিত না।
তাজদার হঠাৎ গমগমে গলায় খোঁচা মেরে বলল, “পাশের বাড়ি আর আমার রুমে প্রচুর কারেন্ট। পা রাখা যাচ্ছে না।”
শাইনা সারাদিন চুপ থাকলেও এটুকু বুঝতে পারছিল তাজদার সিদ্দিকী তার মুখ থেকে কিছু শুনতে চাচ্ছে। তাই সকাল থেকেই খোঁচাচ্ছে। ইনিয়েবিনিয়ে তার মুখ খোলার চেষ্টা করছে। অবশ্য তার এমন অবস্থা হয়েছে যে ইদানীং শাইনা ঝগড়া না করলে তার ভালোই লাগে না। সহজ কথায়, পেটের ভাত হজম হয় না।
শাইনা এবার তার ইচ্ছে পূরণ করলো। বিছানার চাদর ঠিক করতে করতে বলল,
“কারেন্ট বেশি জেনেও শক খেতে গেলে পাশের বাড়ির কি দোষ?”
তাজদার কাবার্ড খুলতে খুলতে বলল, “ভুল জায়গায় তারা কারেন্ট দেখায় কেন?”
“কারেন্ট ক্ষতির জেনেও পা বাড়ায় কেন?”
“কারণ ওদের শক খেতে ভালো লাগে। পরে পুড়ে ছাই হয়ে গেলে তখন বোঝে মজা।”
“আগুনে পুড়ে সোনা খাঁটি হয়।”
“ওরে ডায়লগ!”
“আপনি যেখানে যাচ্ছেন সেখানে যান।”
তাজদার বেরিয়ে গেল।
বেলা পড়তেই তাজদার বাড়ি ফিরলো। তার চিল্লাচিল্লি শুনে ঘুম ভেঙে গেল মা মেয়ের। শাইনা তাজনাকে বুকের উপর নিয়ে চোখ বন্ধ করে শুয়ে রইলো।
“হ্যালো!”
শাইনা চোখ মেলতেই তাজদার সিদ্দিকীকে দেখলো। তাদের দিকে ঝুঁকে আছে। চোখমুখ অস্বাভাবিক।
“কী?”
“আপনি আপনার বেবিকে নিয়ে দু’দিনের জন্য নাইওর যান। কিছু ফ্রুটস এনেছি। ওগুলো নিয়ে চলে যান। ওঠুন।”
শাইনার কপাল কুঁচকে গেল। ইচ্ছেমতো চিল্লানোর জন্য তাকে চলে যেতে বলছে। সে চলে গেলে এখানে কি হবে সে কি জানে না? যাবে না সে ওই বাড়িতে। সে চুপচাপ বসে রইলো বিছানায়।
তাজদার বাবুর জিনিসপত্র গুছিয়ে দিতে লাগলো। শাইনা বিছানা থেকে নেমে ব্যাগটা টেনে নিয়ে জায়গা মতো রেখে দিল।
তাজদার অবাক হয়ে তাকালো তার দিকে। বলল,”কি সমস্যা?”
শাইনা বলল,”আমি চলে গেলে আপনি এখানে ইচ্ছেমতো চিল্লাতে পারবেন?”
এই প্রশ্নটাই কিছুটা প্রশয়ও ছিল। তাজদার নিচের ঠোঁট কামড়ে তার দিকে তাকালো। তারপর মুখ ফিরিয়ে রাখলো। নাকের পাটা কাঁপছে।
শাইনা বলল,”আপনি কি ভাইয়ার সাথে কথা বলেছেন?”
“বলেছি।”
“কি বলেছে?”
“তার সময় লাগবে।”
“আপনি এই সামান্য কথাটায় অপমানিত?”
“অফকোর্স।”
এবার শাইনার দিকে দৃষ্টি ফেলে বললো সে। শাইনা কপাল কুঁচকে বলল,
“এখন কি সিদ্ধান্ত নিয়েছেন তাজদার সিদ্দিকী?”
“নুভাকে আমি ভালো একটা ছেলে দেখে আগামী এক সপ্তাহের মধ্যেই বিয়ে দিয়ে দেশ ছাড়বো। দ্যাটস মাই প্রমিজ।”
“তারপর?”
“তারপর আর কিচ্ছু না। আমি বলছি তুমি চলে যাও। আমাকে আমার মতো করে আমার ফ্যামিলির সাথে ডিল করতে দাও।”
“আমি থাকলে কি সমস্যা?”
শাইনাকে চেপে ধরে বিছানায় বসিয়ে দিয়ে সে বলল,”অনেক সমস্যা।”
শাইনা কুঁকড়ে গেল।
“জানোয়ারের মতো হাত!”
“সরি।”
শাইনা হাত সরিয়ে নিল। তাজদার ছাড়লো না দেখে বাহুতে কামড় বসিয়ে দিল।
“দূরে যান।”
তাজদার বেরিয়ে গেল গটগট পায়ে হেঁটে।
শাহিদা বেগম ফোন করেছেন। শাইনা ফোন রিসিভ করে চুপ করে বসে রইলো।
শারমিলা বলল,”শানু তাজ ভাই কি তোকে কিছু বলেছে?”
শাইনা গর্জে বলল,”লাউডস্পিকার দাও আপা।”
শারমিলা লাউডস্পিকার দিল। শাইনা বলল,
“আম্মা কোথায়?”
শাহিদা বেগম বললেন,”আছি বল।”
“মেয়ে বিয়ে দেয়ার সময় লন্ডনওয়ালা দেখে বিয়ে দিয়ে ফেলেছ চোখ বন্ধ করে। এখন ছেলের বউ আনার সময় এত নাটক কেন? আমি মেয়ে বলে ছেলে আগে খারাপ ছিল জানার পরও বিয়ে দিয়ে বোঝা নামিয়ে ফেলেছিলে তাই না? মেয়েই তো। জাহান্নামে যাক। আমার কি? কিন্তু ছেলের বউ তো যেমন তেমন আনা যাবে না।”
শাবরিন বলল,”তোমার মেয়েও কিন্তু শ্বশুরবাড়ির হয়ে কথা বলছে আম্মা।”
“আম্মা একটা কথা ভালো করে শোনো। ওই মেয়ে বেয়াদব। গুরুজন ছোটোজন মানে না। তেমন তার ভাইও মানতো না। তার সাথে আমি সংসার করছি। তোমার ছেলে যদি বলে সংসার করতে পারবে তাহলে সেখানে তোমরা কে?”
“তুই তোর ননদের হয়ে কথা বলছিস? মেয়েটা তোর সাথে কি কি করেছে ভুলে গেছিস?”
“কিচ্ছু ভুলিনি। ভুলবোও না। কিন্তু আমার ভাই তাকে পছন্দ করলে সেখানে আমি কে মানা করার? সেও তার ভাইকে মানা করছিল আমাকে বিয়ে না করার জন্য। তার ভাই শোনেনি। আমার ভাইকে আমি সেকথা বলতেও পারবো না।”
“ও করবে না বিয়ে। জেনেশুনে অশান্তি কেউ জীবনে টেনে নেবে না। আকারে ইঙ্গিতে বলছে বড়োদের সম্মতি না থাকলে অশান্তির মধ্যে দিয়ে সে কোনো বিয়েশাদি করবে না।”
শাইনা ফোন কেটে দিল। বাইরে গিয়ে শুনলো
তাজদার তাসনুভাকে বলছে,”তুমি কাল সকালে আমার সাথে ঢাকা যাচ্ছ। একটা কথাও শুনতে চাই না আমি।”
তাসনুভা চুপচাপ মেনে নিয়ে ঘরে চলে যাচ্ছিল তখুনি শাইনার সামনে পড়ে গেল। তারপর নিজের ঘরের দিকে চলে গেল।
শাইনা তার পাশ কেটে চলে যাচ্ছিল তখুনি তাজদার তার হাত ধরে টেনে নিয়ে এল ঘরে। বলল,
“চলো আমি দিয়ে আসি।”
“যাব না আমি কোথাও। আপনার গলা ফাটিয়ে চিল্লাতে ইচ্ছে করছে। যান চিল্লান। আমি কিছু বলবো না।”
চলমান…
Share On:
TAGS: তাজমহল সিজন ২, প্রিমা ফারনাজ চৌধুরী
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১৭+১৮
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১২+১৩
-
তাজমহল সিজন ২ গল্পের লিংক
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৯
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ১৪
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৩১
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২১
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ২৪
-
তাজমহল সিজন ২ পর্ব ৭+৮