ডেনিম_জ্যাকেট — পর্ব ৪৬
অবন্তিকা_তৃপ্তি
একসপ্তাহ পর, দুপুর ২:৩০, প্রতাবপুর গ্রাম!
এই মুহূর্তে সিদ্দিক বাড়ির প্রতিটা সদস্য বসে আছে কবিতার বাবার বাড়ি; অর্থাৎ কায়ার বাবার সামনে। কায়ার বাবা মোস্তফা গম্ভীর মুখে মাথাটা নিচু করে কিছু একটা ভাবছেন। উনার পাশে তোফাজ্জল; অর্থাৎ অদিতির বাবা চুপ করে বসে আছেন। ঠিক বসে আছেন বললে ভুল হবে; মূলত উনি বারবার তীক্ষ্ম চোখে স্নিগ্ধকে পরখ করে যাচ্ছে। বেচারা স্নিগ্ধের গলাটাই বুঝি এবার শুকিয়ে আসছে। স্নিগ্ধ সেই যে মাথাটা নামিয়েছে; ভূলক্রমেও আর তোফাজ্জলের চোখের দিকে অব্দি তাকায়নি।
আজ অদিতি-ধ্রুবও এসেছে এখানে। ওরা এসেছে দাওয়াত পেয়ে; গ্রামের মেয়ে— অদিতিকে থাকতে বলেছেন ওর মা। আর ধীর ভীষণ জেদ করছিল— নানা যাবে; তাই ওর জেদেই আসতে হয়েছে। ধ্রুব-অদিতির ছেলেটা এত দুষ্টু; কিন্তু নানা তোফাজ্জলের কাছে আসলেই ও শান্ত হয়ে যায়। গম্ভীর মুখে দুজন তখন হল্প করে যায়— দুনিয়ার যত গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা। ধীর কথা বলে অনর্গল; তোফাজ্জলও ওর এসব অজগুবই আবিষ্কারের গল্পের ভীষণ মনোযোগী, আগ্রহী শ্রোতা।
এইমুহূর্তে ছেলেটা তোফাজ্জলের কোলে বসে তার ঘন সাদা দাড়িতে হাত দিয়ে খেলে যাচ্ছে— তোফাজ্জলের অবশ্য এতে বিরক্তি নেই। উনি বারবার নাতিকে ধরে ধরে টেনে আনছেন, এত নড়ছে ছেলেটা— এক বুঝি পড়ে গেল কোল থেকে।
অদিতি বসার ঘরে ধীরকে নিতে এসেছিল, ধীর সকালেও নাস্তা করেনি। খাওয়ানো লাগবে ওকে। এসে দেখে ধীর ভীষণ মনোযোগী হয়ে নানার মতোই সবাইকে তীক্ষ নজরে দেখার এক্টিং করছে। অদিতি এসে তোফাজ্জলের পাশে দাঁড়াল———-‘আব্বা, ও খাবে।’
তোফাজ্জল তাকালেন ধীরের দিকে——-‘নানাভাই: খেয়ে আসো যাও।’
ধীর শুনেই নাছোড়বান্দার ন্যায় তোফাজ্জলের গলা জড়িয়ে ধরে জেদ দেখাল——-‘না: আমি যাব না। আমি নানা থাকব; নানা থাকব; নানাই থাকবো। ইউ গো।’
অদিতি ছেলেকে চোখ রাঙিয়ে কিছু বলতে যাবে: পাশ থেকে ধ্রুব আটকালো———‘থাকুক। দুপুরে আমার সাথে বসিয়ে খাইয়ে দেব। তুমি ভেতরে যাও।’
ধীর তো খুশিতে নেচে বাবাকে থাম্বস আপ দেখালো। ধ্রুব হাসলো, চোখ টিপলো ও— অর্থাৎ ধীরের সাপোর্ট অলওয়েজ তার বাবা আছেই। অদিতি কি বলবে? বাপের সামনে আজকাল ছেলেকে কিছু বলাও যায়না। অদিতি ধ্রুবর দিকে রাগী চাউনি নিক্ষেপ করে ভেতরে ঢুকে গেল।
ধ্রুবকে ডাকল ইফাজ। ধ্রুব লেগে গেল একমাত্র শ্যালক ইফাজের সাথে ফিসফিস করে গল্প করতে। অদিতি রান্নাঘরে চা বানাচ্ছে সবার জন্যে।
কবিতা তো ভীষণ ভয়ে ভাইয়ের পাশে এক কোণে বসে আছেন। নিজেদেরও প্রেমের বিয়ে— কিন্তু ভাইয়া তো জানতেন না সেটা। শুধুমাত্র মা জানতেন কবিতা-সাদাতের এই প্রেম সম্পর্কে। মায়ের সাপোর্টের কারণেই— একটা লাভ ম্যারেজকে গ্রামে অ্যারেঞ্জ ম্যারেজ হিসেবে চালিয়ে দিয়েছেন চালাক সাদাত।
এবারেও ঠিক তাই করা হলো। কবিতার ভাই অর্থাৎ কায়ার বাবাকে বলা হয়নি; এটা প্রেমের বিয়ে। বলা হয়েছে— কবিতার ভাসুরের ভীষণ পছন্দ হয়েছে কায়াকে; তাই তিনি এসেছেন তার ছোট ছেলের জন্যে কায়ার হাত চাইতে।
মোস্তফা ভীষণ টেনশনে ছিলেন, পাশ থেকে তোফাজ্জল এবার স্নিগ্ধের দিকে তাকালেন। স্নিগ্ধ একটা কালো পাঞ্জাবি পরে এসেছে আজ; ভীষণ পরিপাটি— তোফাজ্জলের পাশে নিতান্তই ভদ্র ঘরের নয় চুপটি করে বসে আছে। কে বলবে— এই ছেলেটা কয়েক বছর আগে একটা চূড়ান্ত অসভ্য ছেলে ছিল। একটা চুড়ান্ত অসভ্য ঘটনা ঘটিয়েই বিয়ে করেছে মোস্তফার ভোলা-বালা মেয়েটাকে।
মোস্তফার নীরবতায় শঙ্কা তৈরি হলো সবার মনে। তাই এইবার পাশ থেকে আনোয়ার কথা তুললেন——-‘ভাই. . কী ভাবলেন প্রস্তাবে? আমরা কি ‘হ্যাঁ’ ধরে নেব?’
মোস্তফা তোফাজ্জলের দিকে তাকালেন; উত্তরের আশায়। তোফাজ্জল স্বর একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললেন, তারপর বলা শুরু করলেন———‘ভাই. . গ্রামের অনেকেই জানে; কায়া আপনাদের বাড়িতে পড়াশোনা করেছে। এখন আপনাদেরই বাড়ির ছেলেকে বিয়ে করলে গ্রামে একটা কানাঘুষা তো হবেই। আমাদের ভয় মূলত এটা নিয়েই।’
আনোয়ারের মুখ ছোট হয়ে গেল সাথেসাথেই। তিনি কড়া চোখে স্নিগ্ধের দিকে তাকালেন। স্নিগ্ধ বাবার এই আগুন চোখ দেখে কেশে উঠল বেচারা: সাথেসাথেই মুখটা লুকিয়ে নিলো চোরের ন্যায়। আনোয়ার ভাবতে বসেছেন: একটা ছেলেও কি প্রেম ছাড়া বিয়ে করতে পারলো না? বড় ছেলেটাও বিয়েতে নাটক করেছে: এটাও এখন শুরু করেছে।
অজাত-কুজাতের দল একটা!
কুহুর বাবা সাদাত এবার কথা তুললেন, নিজের পুরনো রাগটুকু নিয়ে খোচা দিয়েই শোনালেন——-‘ভাইজান; আপনি সমাজের কথা একটু অতিরিক্ত ভাবেন। প্রস্তাবটাকে জটিল করে কেন দেখছেন? আপনাদের মেয়ের বিয়ে আপনারা দেবেন; সমাজ কি দেবে?’
তোফাজ্জল শুনলেন: এবার মোস্তফা কিছু বলার আগেই ধ্রুব পাশ থেকে গম্ভীর স্বরে তোফাজ্জলের দিকে চেয়ে বলল———‘আপনাদের সবার আগে নিজেদের ছেলে-মেয়ের কথা ভাবা উচিত আংকেল। ভালো পরিবার; ভালো ছেলে পেয়েছেন— হাতছাড়া করার কোনো কারণ তো দেখছি না আমি। নাকি কোনো বিদেশি পর্তুগালের ছেলে ধরার ইচ্ছে আপনাদের আবার?’
ধ্রুব পুরনো ঐতিহাসিক ক্ষোভটা থেকে খোচাটা সোজাই ছুড়ে দিল অদিতির বাবার দিকে। ছুড়ে দিয়ে আবার বাকা হাসছে অসভ্য ধ্রুবটা। তোফাজ্জল ভ্রু কুঁচকে তাকালেন। তিনি খোচাটা ভালোই গায়ে নিয়েছেন, একটা সময় অদিতির বিয়ে একটা পর্তুগাল প্রবাসী ছেলের সাথে ঠিক করা হয়েছিল। ভেঙে গেছে কিভাবে সেই বিয়ে— সেটা তো তোফাজ্জলের বুঝতে বাকি নেই— কার জন্যে কার কৃপায় হয়েছে এই অকাজটা। উনি ধ্রুবকে মেজাজ দেখিয়ে, নিজেও পালটা খোচা সিয়ে বললেন——-‘জি বাবাজীবন; ওসব পর্তুগালের বিয়েটা আমরা বাবারা ঠিক করে দিলেও: কিভাবে কিভাবে যেন আপনাদের উপস্থিতিতেই, বাবাদের ঠিক করা মেয়েদের এই বিয়েগুলো ভেঙে যায়।’
ধ্রুব এটা শুনে পরপর চোরের মতো মুখ লুকিয়ে স্নিগ্ধকে দেখিয়ে বললো———-‘বিয়ে নিয়ে আলাপ করছিলাম আমরা।’
তোফাজ্জল বাকা হাসলেন——-‘আমরাও তো এই টপিকেই কথা বলছি, বাবা।’
ধ্রুব আর বাকিটা সময় কথাই বলতে পারলো না। ওদিকে বাপের চেপে এক কাঠি উপরে উঠে ধীর ভীষণ আগ্রহ নিয়ে নানার দাড়ি টেনে বলল——-‘নানাভাই; পর্তুগাল কী?’
ছেলের এমন আহাম্মক; ছোটলোকি জিনিসে আগ্রহ দেখে ধ্রুবে মনে হলো বলতে—- পর্তুগাল হচ্ছে তোর বাপকে মামা বানানোর চক্রান্ত করার দেশ।’
তোফাজ্জল হায়াৎ ধ্রুবর ইনসেকুইরিটি বুঝেন: উনি ধীরকে বুঝিয়ে জবাব দিল——‘একটা দেশ: বাবা। দেশ ভালো: কিন্তু ওই দেশের একজন ছেলেকে তোমার বাবার পছন্দ নয়, হু?’
তোফাজ্জল এবার বাকিদের সাথে , বিয়ের বাকি কথাবার্তায় মন দিলেন। কথা বার্তার অনেক শেষে; মোস্তফাকে কানে কানে কিছু বললেন তোফাজ্জল। মোস্তফা তোফাজ্জলের বলার শেষে সবার দিকে চেয়ে ভীষণ আপ্লুত কণ্ঠে জানিয়ে দিলেন—-‘ঠিক আছে. . এই বিয়েতে রাজি আমরা।’
সাথেসাথেই স্নিগ্ধ অবাক হয়ে তাকাল মোস্তফার দিকে— ওর চোখে রাজ্যের বিস্ময়! পড়োর ফ্যালফ্যাল করে তাকালো পর্দার ওপাশে থাকা কায়ার দিকে। কায়ারও একই অবস্থা; ও পাথরের মতো নিজেও স্নিগ্ধের দিকে ফ্যালফ্যাল চোখে তাকিয়ে আছে।
স্নিগ্ধ একটা শুকনো ঢোক গিললো; সোফায় হেলান দিয়ে হাতের মুঠোতে হাতল খামচে ধরে চোখ বুজে হা করে শ্বাস টানল।স্নিগ্ধের এই অস্থির আচরণ কেউ দেখতে না পেলেও— ধ্রুব ঠিকই দেখেছে। মনেমনে হাসল ধ্রুব। ক বছর আগে বিয়ে ঠিক হবার পর ধ্রুবর রিয়াকশনও ঠিক এমনি ছিলো।
পর্দার পেছনে লুকিয়ে লুকিয়ে এতক্ষণ ধরে কথা শুনতে থাকা কায়া অব্দি মূর্তি হয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছে: কুহু তো লাফিয়েই উঠে দুহাতে শক্ত করে ধরে রেখেছে কায়াকে, চিল্লিয়ে বলে যাচ্ছে———‘কায়ার বাচ্চা . ও মেরি জান! . আমরা জা হচ্ছি . . জা জা। ফ্রম ক্রাইম পার্টনার টু জা. . . উফ! জার্নিটা কি চমৎকার রে!’
কুহুর এতসব উত্তেজনা; আগ্রহ, চেঁচিয়ে বলা একেকটা কথা——- কোনকিছুই তখন কায়ার কানে ঢুকছেই না। কায়া তখনও পাথরের মতো দাঁড়িয়ে আছে। ওর বিশ্বাস হচ্ছে না এসব, শরীর কাঁপছে অসম্ভবরকম। একটাসময় রীতিমত ও কাঁপা শরীর নিয়েই হেলে পড়ল কুহুর গায়ের ওপর। কুহু সাথেসাথেই ওকে আগলে ধরে ওকে জড়িয়ে ধরল— কায়ার কুহুর বুকের সাথে মিশে থাকে অনেকক্ষণ; একটাসময় আপনা-আপনি চোখের কোন থেকে নিঃশব্দে দুটো ফোঁটা জল গড়ায় ওর। শেষপর্যন্ত—- এই কঠিন সমাজ শাহবীর সিদ্দিক স্নিগ্ধকে স্বীকৃতি দিবে কায়ার স্বামী হিসেবে। কায়ার স্বামী. . . স্বামী. . স্বামী, স্বামী!
বড়দের মধ্যে বাকি কথা শেষ হয়েছে। সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, কায়ার পরীক্ষা শেষে বিয়েটা হবে। বিয়ের আগে তিনমাস সময় আছে। কায়ার এই তিনমাসে ছয়দিন হোটেলে থেকে এক্সাম দিবে। আজ থেকে কবিতার বাসায় থাকা বন্ধ ওর।
আজ থেকে ঠিক তিনমাস পর কায়া-স্নিগ্ধের বিয়ে। বিয়ের আগে হলুদ, মেহেদী হবে। তার আগে এ কদিন কেনাকাটায় চলে যাবে পুরোটা মাস। এই পরীক্ষার সময় কায়া-স্নিগ্ধের দেখাশোনা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে, সেই ব্যাপারটা পার্সোনালি শামিমাকে দায়িত্ব দিয়ে দেওয়া হয়েছে। মোস্তফার এত-এত শর্তের মধ্যে বেচারা স্নিগ্ধ ভীষণ অসহায় হয়েই ধ্রুবের দিকে তাকাল একবার; একটুখানি সাপোর্ট পাওয়ার জন্যে। তিন, তিনটে মাস! স্নিগ্ধ টোটাল দুরুত্বে থাকহে কায়ার থেকে। কিভাবে সম্ভব? মরেই যাবে না স্নিগ্ধ!
ধ্রুব স্নিগ্ধকে আশ্বাস দিল চোখের ইশারাতে। ব্যাস! স্নিগ্ধ যা বোঝার বুঝে গেল। ও মাথাটা নিচু করে করে হেসে উঠল নিঃশব্দে। ওভাবেই নত মস্তিকে স্রেফ কপাল উঁচিয়ে পর্দার আড়ালে থাকা মেয়েটাকে দেখলো—- মেয়েটা ওর বিয়ে করা স্ত্রী; যাকে এবার সমাজের সামনে স্বীকৃতি দিয়ে স্নিগ্ধ ঘরে তুলতে যাচ্ছে! কায়া টাকুয়ে দেখে স্নিগ্ধকে, স্নিগ্ধও চেয়ে রও অপলক.!
চোখে চোখে চলে হাজারো কথা; না বলা অভিযোগ, বলতে পারা কিছু কথার আঘাত! সবাটি বুঝি আজ বলা হলো!
————-
দুপুরে একসাথে সবাই খেতে বসবে এখন। টেবিল সার্ভ করা হচ্ছে। কুহু; কবিতা, আর কুহুর মা সবাই হাতে হাতে ডাইনিং টেবিল সেট করছেন। পাত্রপক্ষ হিসেবে স্নিগ্ধদের ভালো খাতিরদারি করা হচ্ছিল।
ওদিকে আজ পুরোটাসময় কাব্য আলাপে ছিলো না, ঢাকায় একটা জরুরি কাজে আটকে ছিলো। ও মাত্রই প্রতাবপুর এসেছে। কাপড়-চোপড়ে গাড়ির ধুলোবালি সেটে আছে। সেভাবেই কাব্য ডাইনিং এ না গিয়ে শামিমাকে বলল——-‘আম্মু. . হাতমুখ ধুবো। একটু দেখো প্লিজ কোনো রুম খালি আছে কিনা।’
শামিমা শুনে ব্যস্ততার দোহাই দেখিয়ে কুহুকে যমের দোরে ঠেলে দিয়ে বললেন——‘যা না আম্মু. . ওকে একটা রুমে নিয়ে যা। ভালো একটা শার্ট দেখিয়ে দিস পড়ার জন্যে; কুটুম বাড়িতেও কালো পরে বসে থাকবে না হলে।’
কাব্য কুহুকে একপলক দেখল: কুহুও খাবারের প্লেট হাতে তখন তাকিয়েছে ওর দিকেই। শামিমা সামনে থাকায় কাব্য আর কথা বাড়াল না, কুহুর পেছনে পেছনে চলে গেল।
কুহু একটা খালি রুমে এসে নিজে একবার বাথরুমটা দেখে নিল। তারপর কাব্যের দিকে চেয়ে নিচু কণ্ঠে বলল——‘বাথরুম ক্লিন আছে: যেতে পারেন।’
কাব্য বাথরুমে যেতে যেতে, হঠাৎ কুহুর দিকে না ফিরেই বলে উঠলো——-—‘আম্মুর কথাতে ইচ্ছার বিরুদ্ধে এখানে থাকতে হবে না; চলে যা।’
বলে ও সোজা বাথরুমে ঢুকে গেল। কুহু কাব্যের যাওয়ার দিকে তাকিয়ে রইল একদৃষ্টিতে! কেন যেন— কাব্যের এই অবহেলা আজ ওকে পোড়াচ্ছে। কই? সাত মাস আগেও কাব্য ভাই তো ঠিক একইভাবে: বরং এর থেকেও ভয়ংকরভাবে ওকে অবহেলা করেছেন; পুড়িয়েছেন; কাঁদিয়েছেন———তখন তো কুহুর এতটা গায়ে লাগেনি। বরং জেদে কেঁপেছে: রাগ হয়েছে, তোলপাড় করে দিতে ইচ্ছে হয়েছে পুরোটা জীবন, আশপাশ— সবটা।
তাহলে. . . তাহলে আজ কেন ওসবের জায়গায়: স্রেফ কষ্ট লাগছে; অপরাধবোধ হচ্ছে। মনে হচ্ছে— কাব্যের এই ব্যবহারের জন্যে ও দায়ী। কাব্য ভাইকে ও সেদিন ওভাবে বলেছে, পুরুষ হিসেবে কাব্য ভাইয়ের আত্মসম্মানে আঘাত করেছে। কাব্য ভাই সেসময়ের আচরণে অনেক কষ্ট পেয়েছেন; হার্ট হয়েছেন— কুহু বুঝে সেটা।
কিন্তু . . . কুহুর সাথেও অন্যায় হয়েছে একইভাবে.! এটুকু কষ্ট কাব্য ভাই ডিজার্ভ করেন! পরপর কুহু নিজেকেই উল্টো প্রশ্ন করে: আর তুই? তুই কি ডিজার্ভ করিস? কাব্য ভাইকে অবহেলা করে; আঘাত করে তুইও কি ভালো আছিস? একটা সুন্দর সংসার তোকে হাতছানি দিয়ে ডাকছিল; তুই কুহু সেটা নিজের হাতে সেই সংসারের গলা টিপে মে রে ফেলেছিস!
কুহুর মাথাটাই ধরে যাচ্ছে। আর ভাবতেও বড্ড বেশি ক্লান্ত লাগছে। ও দীর্ঘশ্বাস ফেলে কাব্যের ব্যাগ থেকে একটা স্কাই ব্লু পোলো টিশার্ট বের করে রাখলো বিছানার উপর।
খানিক পর কাব্য বেরিয়েছে: গলায় পেছন থেকে সামনে ঝুলানো সাদা টাওয়ালটা! বুকটা উদোম এখনো, ওই উদোম পুরুষালি শরীরটা দেখামাত্রই কুহুর বুকটা কেঁপে উঠল কিছুসময়ের জন্যে। মনে পড়লো হঠাৎ— সেদিন রাতে কাব্য এভাবেই হয়তো খালি গায়ে কুহুর সাথে ছিল; এই উদোম গায়েই কুহুর সাথে লেপটে থেকে ছুঁয়েছে কুহুকে।
ইস. . হঠাৎ অবচেতন মনে কুহুর আফসোস হতে লাগল। কী হতো ওই রাতটায় কুহুর মাতলামো হঠাৎ করে শেষ হয়ে গেলে; কুহু একটু হলেও হুঁশে থাকলে। জীবনের প্রথম রাতটা কাব্যের সাথে এতটা দুর্বিষহ কাটতো না তাহলে। আর কুহুর ছোট চড়ুইপাখির সংসারটাও এভাবে ওর চোখের সামনে ধুকে-ধুকে মরতো না!
আচমকা কুহু নিজের হুঁশে ফেরে। রাত.. কিসের রাত? ওই ধরনের কোনো রাতের অস্তিত্ব নয় কুহুর জীবনে। কাব্য ভাইয়ের সাথে ওই রাত কুহু স্বেচ্ছায় কাটায়নি। কাব্য ভাই দোষী এখনো, ভুলে যায়নি কুহু— আর না ভুলবে কোনদিন!
কুহুর কাব্যের জন্যে কষ্ট পাওয়া কমে গেল।
‘আপনার টিশার্ট, এটাই পরবেন!’ —- বলে ও পোলো টিশার্ট-প্যান্ট বিছানায় রেখে পালিয়ে বেরিয়ে যাবে। তাড়াহুড়োতে হঠাৎ পালঙ্কের কোনায় লেগে পায়ে একটা সজোরে ব্যথা পেল। রীতিমতো ব্যথায় চিৎকার করে উঠল বেচারি— পায়ে হাত চেপে পিছিয়ে গিয়ে আর্তনাদ করে উঠল।
কাব্য টিশার্টটা সবে হাতে নিয়েছিল— পড়বে বলে। কুহুর আর্তনাদ শুনে রাগটুকু নিমিষেই মাথা থেকে চলে গেল, দ্রুত টিশার্ট ফেলে এগিয়ে আসল——‘ব্যথা পেয়েছিস?’
শীতের সময় সামান্য ব্যথাও বড্ড জোরে লাগে। কুহু চোখ-মুখ কুঁচকে আঙুল ভাঁজ করে মেঝেতেই বসে পড়েছে, কাঁদো কাঁদো হয়ে গেছে মুখটুকু, বেচারির মতো।
কাব্য একপল ওই আদুরে মুখটা দেখলো— চোখ-মুখ কুচকে পা চেপে ঠোঁট কামড়ে বসে আছে। কাব্য ওই মুখটুকু দেখে দুবার যেন হার্টবিট মিস করলো। পরপর নিজেকে সামলে, মুখচোখ গম্ভীর করে নিল। কুহুর পা টেনে নিজের কাছে নিল, কুহু আর্তনাদ করে উঠল——-‘মায়া নেই; এভাবে টানলেন কেন? ব্যথা হচ্ছে আমার।’
কাব্য পায়ের আঙুলে ধীরে-ধীরে মালিশ করতে করতে পায়ের দিকে মাথা ঝুঁকে চেয়ে থেকে গম্ভীর কণ্ঠে জবাই বলল——-‘কাব্য খারাপ: সে একটা ব্লাডি ব্ল্যাকমেইলার, তার মায়া দেখানোটাও মিথ্যা, বাটপাড়ি। ভয় পাওয়ার দরকার নেই, আমার ফোনটা ব্যাগের ভেতরে, পায়ের ছবি ভাইরাল করবো না।’
কুহু কাব্যের এহেন জবাব শুনে আহত ভঙ্গিতে কাব্যের দিকে তাকাল। ওর এই আহত মুখ কাব্য দেখেনা। পা মালিশ করে দিতে থাকে। কুহু অপলক তাকিয়ে রইল কাব্যের পায়ের দিকে নিচু করে মনোযোগ দেওয়া মুখের দিকে। মুখে-চোখে কি অসম্ভব অভিমান-রাগ, অথচ পা মালিশ করে দিচ্ছে চুড়ান্তে যত্নে! ভারি অদ্ভুত লোক.!
কাব্য কাজ শেষ করে কুহুর পা ছেড়ে দিল। কুহুর বিধ হলো— ওর পায়ের ব্যথাটাও কমে এসেছে। কাব্য উঠে গিয়ে পেছন ফিরে কুহুর বাড়িতে দেওয়া পোলো শার্ট গায়ে চড়াতে চড়াতে বলল——-‘ওয়ান পয়েন্ট. . আমার সামনে ওড়না ছাড়া আসিস না, বলা তো যায় না কখন তোর ওড়না ছাড়া ছবিও বা ক্লিপ ভাইরাল করে দিই।’
কাব্যের কণ্ঠে স্পষ্ট মলিনতা; খোচা মেরেছে কুহুকে। কুহু সাথেসাথেই নিজের দিকে তাকালো। ওড়না? ওড়নাটা কই ওর? তারপর একহাত বুকের উপর রেখে ওড়না খোজার জন্যে পাশে তাকাতেই দেখে, ওটা পড়ে আছে মেঝেতে। কুহু সাথেসাথেই ওড়না টেনে গায়ে জড়িয়ে নিল।
কাব্য সেটা দেখে ছোট করে একটা শ্বাস টেনে, মলিন চোখে চেয়ে চুপচাপ বেরিয়ে গেল রুম থেকে।
কুহু ওর যাওয়ার দিকে আহত চোখে তাকিয়ে রইলো——– কাব্য ভাই ওভাবে চলে গেলেন? কী ভাবলেন? কুহু তার ভয়ে ওড়না জড়িয়েছে? কিন্তু কুহু তো লজ্জায় জড়িয়েছে ওড়নাটা!
কুহু অবাক হলো হঠাৎ— ওর মধ্যে কাব্যের সামনে লজ্জার ব্যাপারটা কবে থেকে শুরু হলো? ঘেন্না-রাগ-জেদের মধ্যে কি লজ্জা আসে? লজ্জা তো ভালোবাসলেই তবে আসে!
———————————
দুমাস পনেরো দিন পর:
আজ সিদ্দিক বাড়ির সবাই বেরিয়েছে স্নিগ্ধের বিয়ের কেনাকাটা করতে।তবে কুহু আজ বেরোয়নি ওদের সাথে।
হঠাৎ সকাল থেকে শরীরটা কেমন ম্যাজম্যাজ করছে। অবশ্য এই সমস্যাটা কদিন ধরেই হচ্ছে! শরীরটা ভীষণ দুর্বল লাগছে আজ কদিন ধরে। খাবারেও একদমই রুচি নেই। কুহু শুকিয়ে যাচ্ছে হঠাৎ, গায়ের কুর্তিটাও আজকাল ঢিলে হচ্ছে!
ক্লান্ত কুহু অসুস্থতার ওসব বুঝে না। সামনে পরীক্ষা। এখন এসব বললে কুহুর বাবা-মা দুজনেই ভাববেন ও পরীক্ষায় ফাঁকি দেওয়ার জোনেই বাহানা বানাচ্ছে। বিয়ের পরেও— কবিতা-সাদাতের ওর পড়াশোনার উপর হুকুম-চেচানো শেষ হয়নি।
রোজ সাদাত কুহুর থেকে খোজ নেন— পড়া কতদূর এগিয়েছে, ফাকি দেওয়া হচ্ছে কি না।
খোদা, বিয়ে করেও রক্ষা নেই!
কুহু বইটা খুলে বসেছিল সবে। আজ আর টেবিলেও বসেনি; বিছানার উপরেই বই ছড়িয়ে-ছিটিয়ে পড়তে বসেছে। হঠাৎ শার্লিন কল দিল। কুহু এবার বালিশে হেলান দিয়ে ক্লান্ত ভঙ্গিতে কলটা রিসিভ করল।
শার্লিন ওপাশ থেকে বলে———-: ‘কি রে, কেমন আছিস?’
কুহু বালিশে শরীরটা ছেড়ে দিয়ে মলিন কণ্ঠে ছোট করে জবাব দিল———‘মোটামোটি।’
‘পড়া কতদূর এগিয়েছে তোর? আমার ভাই রেলগাড়ির মতো এগোচ্ছে। কালকে ফেইল করলে . . ভয়েই আমার গলা শুকিয়ে যাচ্ছে ভাই আমার।’————— শার্লিনের কণ্ঠ কাপল; বেচারি ভয়েই শেষ! বাবা পুলিশ অফিসার, উনি বড্ড কঠিন শার্লিনের পড়াশোনার ব্যাপারে।
কুহু এবার ভীষণ ক্লান্তভাবে বিছানাতেই শুয়ে পড়লো এবার। শুয়েও অশান্তি লাগছে অনেক, আরাম পাচ্ছে না একদমই। ওভাবেই ও বলল——‘আমি মনে হয় এবার ফেইলই করব, শার্লিন।’
‘কেন? তোর তো প্রেপ ভালো ছিল এইবার। রিভিশন দে জাস্ট।’—- শার্লিন বললো!
কুহু ক্লান্ত কণ্ঠে বলে যায়———-‘কিন্তু রিভিশনের জন্যেও তো পড়তে হবে। পড়তেই তো পারছি না ইয়ার। শরীরটা কী ক্লান্ত ভাই. . . . না খেতে খেতে ওজন অব্দি কমে গেছে। সকালবেলা কেন যেন বেশি খারাপ লাগে।’
শার্লিন থামলো। পরপর নিভু-নিভু সন্দিহান কণ্ঠে এবার বলল——‘তার মানে মর্নিং সিকনেস; রাইট?’
‘মেইবি।’ —- কুহু দায়সারা ভাবে জবাব দিল। ওর মাথাতেও তখন এসব আসেনি!
শার্লিন এবার থামলো। ভয় নিয়ে এবার আস্তে করে বললো——-‘কুহু রাগ করিস না। একটা কুয়েশশন করি! তুই কি কাব্য ভাইয়ের সাথে . . . অব. .বলতে চাচ্ছিলাম. . ইন্টিমেট হয়েছিস কখনো?’
শার্লিন কথাটা বলেই চোখ-মুখ কুচকে অপেক্ষা করল কুহুর গালি খাওয়ার জন্যে। কিন্তু কুহু ওকে অবাক করে দিয়ে ভীষণ নিরুত্তাপ কণ্ঠে বলল——‘হু, হয়েছি।’
শার্লিন অবাক হয়ে তাকাল, মুখ হা হয়ে এলো ওর——-‘কিহ?’
কুহু ওকে এই ব্যাপারে আর আশকারা দেখালো না।থমথমে কণ্ঠে বলল——-‘বাদ এই টপিক। অনেক কাহিনি. .এক্সপ্লেইন করে বলার রুচি নেই।’
শার্লিন এবার ধমকেই উঠলো——-‘গাধী. . . এটা বাদ দেওয়ার মতো টপিক না। শোন.. . তোর পিরিয়ডের সাইকেল এসেছিল এই মাসে?’
কুহু তখনও বুঝেনি কিছু, ও সরলভাবে বললো———-‘না। সাইকেল তো মেইবি দুইমাস ধরেই আসেনি।’
শার্লিন মাথায় হাত, এবার থেমে থেমে ও জিজ্ঞেস করলো—-‘আর গর্ভনিরোধক কিছু ইউজ বা খেয়েছিলি?’
‘না. দেখ এগুলো জিজ্ঞেস করছিস কেন? বেশি পার্সোনাল হয়ে যাচ্ছে এখন।’—— কুহু রেগে উঠল এবার। যতই বন্ধু হুক, স্বামী-স্ত্রীর এসব কথা শার্লিনকে বলার মতো কুহু বোকা না।
শার্লিন দাত পিষে বললো———-‘কারণ তুমি অলরেডি একটা ভেরি পার্সোনাল জিনিস ক্যারি করছ; যদি আমি ভুল না হই।’
কুহু দিল এক ধমক———‘ছাগলের মতো কথা বলিস না তো। ফোন কাটছি আমি, পরে কথা বলবো।’
শার্লিন এবার রেগে গিয়ে ধমকেবলল———‘ফোন কাটবি না। আর ছাগল আমি না; ছাগল হলি তুই। গাধীর বাচ্চা. . . তুই প্রেগন্যান্ট!’
কুহু শার্লিনের এই বিস্ফোরক কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে সটান শোয়া থেকে বসে গেল। আহাম্মক হয়ে নিজের পেটের দিকে একহার তাকিয়ে আবার সামনে কাব্যের ঝুলিয়ে রাখা ফোটোর দিকে তাকালো। এতক্ষণে. . . ঠিক এতক্ষণে কাব্যের রাগী-জেদী-একরোখা স্ত্রী কুহু সবকিছুর হিসাব মেলানোর চেষ্টা করল এবার; এতক্ষণে..!
চলবে
রিঅ্যাক্ট-কমেন্ট করবেন, হ্যাঁ? খুশি হয়ে আজ সবার মন্তব্যের রিপ্লাই দিব!
Share On:
TAGS: অবন্তিকা তৃপ্তি, ডেনিম জ্যাকেট
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩০
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৬
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২৬
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৪
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ২০
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১২
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ১৮
-
ডেনিম জ্যাকেট পর্ব ৩৪