ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৯
✍️ সাবিলা সাবি
পর্ব -২৯
মেক্সিকোর আকাশে ভোরের রক্তিম আভা তখনো পুরোপুরি কাটেনি। প্রকৃতির বুকে এক অদ্ভুত গুমোট অস্থিরতা বিরাজ করছে, যা দেখে আসন্ন কোনো ঝড়ের পূর্বাভাস স্পষ্ট বোঝা যায়। ঘড়ির কাঁটা তখন ঠিক সকাল সাতটার ঘরে।
ফারহান তার স্বভাবজাত কঠোরতা নিয়ে লুসিয়ার ঘরের দরজা ঠেলে ভেতরে পা রাখল। কক্ষের অন্দরে তখনো স্নিগ্ধ এক শান্তিতে আচ্ছন্ন। বিছানায় লুসিয়া অঘোরে ঘুমাচ্ছে। বাইরের জগতের হাহাকার বা অস্থিরতা তাকে স্পর্শ করতে পারেনি। ফারহান এক মুহূর্ত স্থির হয়ে লুসিয়ার ঘুমন্ত চেহারার দিকে তাকিয়ে রইল। পরক্ষণেই তার চোয়াল শক্ত হয়ে উঠল। পাশ থেকে কাঁচের গ্লাসটা তুলে নিয়ে কোনো দ্বিধা ছাড়াই সবটুকু পানি লুসিয়ার মুখে ঢেলে দিল সে।
তপ্ত ঘুমের মাঝে হিমশীতল জলের অপ্রত্যাশিত স্পর্শে লুসিয়া বিষম খেয়ে ধড়ফড়িয়ে জেগে উঠল। তার বুকের ধুকপুকুনি তীব্র হচ্ছে, চোখ দুটো বিস্ময়ে বিদীর্ণ। সামনে ফারহানকে নির্লিপ্ত পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে লুসিয়ার ভেতরটা রাগে জ্বলে উঠল।
লুসিয়া তীব্র চিৎকারে বললো “হোয়াট দ্য হেল ইজ দিস, ফারহান? তোমার স্পর্ধা হয় কী করে আমার ঘুমে এভাবে ব্যাঘাত ঘটানোর?”
ফারহান হাতের গ্লাসটা পাশের টেবিলের ওপর সশব্দে নামিয়ে রাখল। তার দৃষ্টি তখন বরফের মতোই শীতল। ফারহান নিচু কিন্তু তীক্ষ্ণ স্বরে বললো “এটা তোমার আয়েশি রাজপ্রাসাদ নয় লুসিয়া, এটা আমার ফ্ল্যাট। এখানে সূর্য ওঠে আমার নির্দেশে, দিন চলে আমার নিয়মে। সকাল হয়ে গেছে, উঠে পড়ো। আমাকে এখুনি বের হতে হবে।”
লুসিয়া ক্ষিপ্ত হয়ে পাশের দেয়াল ঘড়ির দিকে তাকাল। ঘুমের রেশ তখনো তার দুচোখে মেখে আছে। “মাত্র সাতটা বাজে ফারহান! এখনো তো ভালো করে ভোরও হয়নি। তুমি কি কাণ্ডজ্ঞান হারিয়ে ফেললে?”
ফারহান ঠোঁটের কোণে বিদ্রূপের হাসি ফুটিয়ে বললো “সাতটা মানে ভোর নয়, ওটা সকাল। তোমার মতো আয়েশি নবাবজাদীরা হয়তো দিন-দুপুরে জাগতে অভ্যস্ত, কিন্তু আমার কাছে প্রতিটি সেকেন্ড দামী হীরে-জহুরতের চেয়েও মূল্যবান। আমার দেরি হয়ে গেছে অলরেডি।”
ফারহান আলমারি থেকে লুসিয়ার শাড়িটা বের করে অবহেলার সাথে তার দিকে ছুঁড়ে দিল। “তর্ক করে সময় নষ্ট করার বিলাসিতা আমার নেই। দ্রুত তৈরি হয়ে নাও। তোমার নিজের পোশাক পরে এখনই রেডি হও।”
লুসিয়া রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে শাড়িটা তুলে নিল। ফারহানের এই অনমনীয় আর আধিপত্য বিস্তারকারী স্বভাবের কাছে সে বারবার নিজেকে বড় অসহায় বোধ করে। ফারহানের চোখের গভীরতা আজ অন্য কথা বলছে। সেখানে এক অস্থির তাড়া লক্ষ্য করা যাচ্ছে, যা দেখে মনে হয় কোনো ভয়ংকর ধ্বংসলীলার আগে নিজেকে শেষবারের মতো ঝালিয়ে নিচ্ছে সে।
লুসিয়া রাতের সেই শাড়িটা কোনোমতে গায়ে জড়িয়ে ঘর থেকে বেরিয়ে এল। ড্রয়িংরুমে পা রাখতেই নাকে এল কড়া মশলার ঘ্রাণ। অবাক হয়ে দেখল, ফারহান অত্যন্ত দক্ষ হাতে কিচেনে রুটি বেলছে। অন্যপাশে নিপুণ হাতে সবজি কাটছে সে। পাশের চুলায় চায়ের পানি টগবগ করে ফুটছে।
লুসিয়া কিছুটা বিস্ময় আর মুগ্ধতা নিয়ে এগিয়ে এল। সে বলল, “বাহ! তুমি রান্নাও করতে পারো? এমনকি রুটি বানাতেও জানো দেখছি!”
ফারহান ওর দিকে না তাকিয়েই সবজি কাটায় মন দিল। হাতের ক্ষিপ্রতা দেখে বোঝা যাচ্ছে এটি তার দীর্ঘদিনের অভ্যাস। ফারহান ঠাণ্ডা গলায় জবাব দিল, “কেন? সবাইকে কি তোমার মতো অকর্মা মনে হয়? আমি ছেলে হয়েও নিজের সব কাজ করতে পারি, আর তুমি তো মেয়ে হয়েও সাধারণ একটা ডিম ভাজতে পারবে কি না সন্দেহ।”
লুসিয়া এবার আর তর্কে জড়াল না। ক্লান্ত পায়ে কিচেনের পাশের সোফাটায় ধপ করে বসে পড়ল সে। আরজি জানাল, “আচ্ছা ঠিক আছে, অনেক হয়েছে। আমাকে এক কাপ কফি বানিয়ে দাও না প্লিজ? মাথাটা বড্ড ধরেছে।”
ফারহান জানাল, “এখানে কফি নেই। আমি কফি খাই না, অপছন্দ করি। আমি আদা-তুলসি দিয়ে কড়া লিকারের চা খাই। সেটা খেলে খাও, না হলে পানি খাও।”
লুসিয়া একটু অবাক হলো। আদা আর তুলসি দিয়ে চা! আভিজাত্যে বড় হওয়া মেয়েটা কোনোদিন এমন চায়ের স্বাদ নেয়নি। কৌতূহলী হয়ে সে বলল, “আমি কখনো এমন চা খাইনি। আচ্ছা দাও, আজ খেয়েই দেখি।”
ফারহান নিঃশব্দে দুটো কাপে গাঢ় রঙের চা ঢালল। এক কাপ লুসিয়ার দিকে এগিয়ে দিয়ে সে আবার সবজি কাটতে শুরু করল। লুসিয়া এক হাতে কাপটা ধরল, তবে তার দৃষ্টি চায়ের দিকে নেই। সে তাকিয়ে আছে ফারহানের দিকে। ফারহানের এই ঘরোয়া রূপটা ওর কাছে একদম নতুন। মনে মনে ভাবল, ছেলেটা তো একদম পারফেক্ট ‘হাজবেন্ড ম্যাটেরিয়াল’। কঠোর স্বভাবের আড়ালে এমন যত্নশীল একটা দিক আছে, তা ওর ধারণার বাইরে ছিল।
মুগ্ধ চোখে তাকিয়ে থেকে লুসিয়া চায়ের কাপে একটা বড় চুমুক দিল। মুহূর্তেই সেই মুগ্ধতা উধাও হয়ে মুখটা কুঁচকে গেল তার। তীব্র আদা আর তুলসির কড়া স্বাদে জিবটা জ্বলে উঠল।
মুখ বিকৃত করে লুসিয়া বলল, “উগহ! এটা কী বানিয়েছ ফারহান? এর চেয়ে তেতো ওষুধ খাওয়াও ভালো!”
ফারহান একপলক ওর দিকে তাকিয়ে আবার কাজে মন দিল। লুসিয়া কাপটা সরিয়ে রেখে বাঁকা চোখে তাকিয়ে বলল, “এখন বুঝলাম তোমার ব্যবহার কেন এমন রুক্ষ আর তেতো। সারাদিন যদি এই বিশ্রি চা পেটে যায়, তবে মেজাজ তো খিটখিটে হবেই। একদম এই চায়ের মতোই কড়া আর অসহ্য তুমি!”
ফারহান এবার একটা কুটিল হাসি হাসল। সবজি কাটা থামিয়ে সে লুসিয়ার দিকে তাকিয়ে বলল, “অসহ্য মনে হলে ছেড়ে দাও। তবে মনে রেখো লুসিয়া, এই তেতো চা যেমন শরীরের রোগ সারে, আমার এই কড়া ব্যবহারও তোমার মতো বিগড়ে যাওয়া মেয়েদের সোজা করতে বেশ কাজে দেয়।”
অবশেষে সকালের নাস্তা শেষ করে ফারহান যখন জ্যাকেটটা গায়ে জড়িয়ে বের হওয়ার জন্য দরজার দিকে পা বাড়াল, ঠিক তখনই লুসিয়ার ডাক তাকে থামিয়ে দিল।
“ফারহান!”
ফারহান ঘুরে দাঁড়াল। তার চোখেমুখে একরাশ বিরক্তি আর তাড়া। কিন্তু লুসিয়া দমে যাওয়ার পাত্রী নয়। সে ফারহানের খুব কাছে এসে দাঁড়াল। তার দুচোখে আজ অনেক না বলা প্রশ্নের ভিড়।
লুসিয়া ধীর স্বরে বলল, “আমি জানি তুমি আমার ব্যাপারে ভাবো। তুমি সবকিছু লুকিয়ে রাখতে পছন্দ করো ঠিকই, কিন্তু কিছু জিনিস মনে চেপে রাখার চেয়ে বলে দেওয়া ভালো। তুমি তো জানোই আমি তোমাকে চাই। তাহলে আমাকে মেনে নিতে তোমার সমস্যা কোথায়?”
ফারহান একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে অন্যদিকে তাকিয়ে শান্ত গলায় বলল, “আমি তোমাকে কতবার বলেছি লুসিয়া, আমি তোমাকে ভালোবাসি না। আর কোনোদিন বাসতে পারবও না। এই নাটক বন্ধ করো।”
লুসিয়া এবার রাগে ফেটে পড়ল। সে ফারহানের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে তীক্ষ্ণ গলায় বলল, “বাসো না? তাই বুঝি? তাহলে তোমার মোবাইলের স্ক্রিনপেপারে আমার ছবি কেন রেখেছ?”
ফারহান কিছুটা অপ্রস্তুত হলেও পরক্ষণেই নিজেকে সামলে নিল। সে ভ্রু কুঁচকে প্রশ্ন করল, “কোন ছবি? কী আবোলতাবোল বকছ?”
লুসিয়া জেদ নিয়ে বলল, “কেন? ওই যে খয়েরি শাড়ি পরা ছবিটা, যেটা সেদিন আমি তোমাকে পাঠিয়েছিলাম। ওটা তোমার ফোনের ওয়ালপেপারে কেন?”
ফারহান একটা উপহাসের হাসি হাসল। পকেট থেকে ফোনটা বের করে স্ক্রিনটা একবার দেখে নিয়ে বলল, “ওটা দেখে তুমি কীভাবে নিশ্চিত হলে যে ওটা তুমি? ওখানে কি তোমার চেহারা দেখা যাচ্ছে? ওটা আমি পিনটারেস্ট থেকে নামিয়েছি। স্রেফ একটা সাধারণ ছবি।”
লুসিয়া এবার অবজ্ঞার হাসি হাসল। ফারহানের চোখে চোখ রেখে সে ফিসফিস করে বলল, “ফারহান, আমার ঠোঁট, আমার কোমর আর আমার বডি পার্ট আমার চেয়ে বেশি তুমি চেনো না। ওটা যে আমার ছবি, সেটা আমি এক পলকেই বুঝেছি। এত লুকোচুরি কিসের? কেন স্বীকার করছ না যে তুমি আমার নেশায় পড়েছ?”
ফারহানের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে এক ঝটকায় লুসিয়ার হাতটা ধরে তাকে নিজের থেকে দূরে সরিয়ে দিল। তার কণ্ঠস্বর এখন বরফের মতো শীতল।
ফারহান কঠিন গলায় জানাল, “লুসিয়া, আজকে শেষবারের মতো বলে দিচ্ছি। আমি তোমাকে আমার ছোট বোনের নজরে দেখি। আমার কাছে এলিনা আর তান্বী যেমন, তুমিও ঠিক তেমন। তার বেশি কিছু না। কাল রাতে বৃষ্টির মধ্যে অ্যাপার্টমেন্টের নিচে ছিলে বলে দয়া হয়েছিল, তাই ঘরে আশ্রয় দিয়েছি। আশ্রয় দিয়েছি বলে কি এখন মাথায় চড়ে বসবে?”
লুসিয়া স্তব্ধ হয়ে ফারহানের দিকে তাকিয়ে রইল। ফারহানের এই ‘বোন’ সম্বোধনটা তার বুকে তপ্ত তীরের মতো বিঁধল। ফারহান তার চোখের দিকে আর না তাকিয়েই দ্রুত ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। দরজাটা সজোরে বন্ধ হওয়ার শব্দে লুসিয়ার পুরো শরীরটা একবার কেঁপে উঠল। সে বুঝতে পারছে ফারহান চরম মিথ্যা বলছে, কিন্তু ফারহান কেন এই দুর্ভেদ্য দেয়াল তুলে রাখছে, সেটাই এখন বড় রহস্য।
ফারহান দ্রুতপায়ে অ্যাপার্টমেন্টের পার্কিং জোনে নেমে এল। তার প্রতিটি পদক্ষেপে এক ধরণের অস্থিরতা থাকলেও বাইরে সে ছিল সম্পূর্ণ নির্বিকার। বাইকটা স্টার্ট দিয়ে সে যখন মূল ফটকের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, তখনই দেখল লুসিয়া ধীরপদে বেরিয়ে আসছে। ওর অবয়বে এক ধরণের বিষণ্ণ আভিজাত্য ফুটে থাকলেও চোখের কোণে একটু আগের সেই অভিমান তখনো স্পষ্ট।
ফারহান বাইকটা ওর সামনে এনে থামাল। হাতের বাড়তি হেলমেটটা লুসিয়ার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “এটা পরে নাও। ওঠো, তোমাকে বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে আসি।”
লুসিয়া হেলমেটটার দিকে এক পলক তাকিয়েই দৃষ্টি সরিয়ে নিল। তার কণ্ঠে আজ কোনো অনুনয় নেই, কেবল আছে এক ধরণের শীতল প্রত্যাখ্যান। সে শান্ত স্বরে জানাল, “প্রয়োজন নেই।”
কথাটা শেষ হতে না হতেই একটি কালো মার্সিডিজ ওদের সামনে এসে দাঁড়াল। লুসিয়া ফারহানের চোখের দিকে সরাসরি তাকিয়ে পুনরায় বলল, “আমার গাড়ি চলে এসেছে। তোমার দয়ার আর দরকার নেই।”
লুসিয়া আর কোনো কথা না বাড়িয়ে গাড়ির পেছনের সিটে গিয়ে বসল। গাড়িটি যখন ফারহানের পাশ দিয়ে চলে যাচ্ছিল, লুসিয়া জানালার কাঁচের ওপাশ থেকে একবার ফারহানের দিকে তাকাল। সেই চোখে ছিল এক অপার্থিব যন্ত্রণা, যা মুহূর্তের জন্য ফারহানের সেই কৃত্রিম নির্লিপ্ততাকে টলিয়ে দিল।
গাড়িটা মোড় পার হয়ে দৃষ্টির আড়ালে চলে যেতেই ফারহান এক গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলল। রাস্তার ধুলোর মাঝে সে কিছুক্ষণ স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। তার মনের ভেতরের দ্বন্দ্বগুলো তখন ঠিক ওই ধুলোর মেঘের মতোই জমাট বাঁধছে। সে নিজেও জানে না, কেন সে এই মেয়েটিকে বারবার কাছে টেনেও আবার সজোরে দূরে ঠেলে দিচ্ছে।
ফারহান আর সময় নষ্ট করল না। হেলমেটটা মাথায় গলিয়ে বাইকের গতি বাড়িয়ে সে শহরের ব্যস্ত রাস্তার ভিড়ে মিশে গেল।
.
.
.
.
দুপুরের প্রখর রোদে মেক্সিকোর আকাশ পুড়লেও ভিলা এস্পেরেন্জার অন্দরমহল তখন এক হিমশীতল স্তব্ধতায় ঢাকা। ঠিক সেই মুহূর্তে সব নিরাপত্তা বেষ্টনী চুরমার করে ভিলার বিশাল সদর দরজা ঠেলে ভেতরে প্রবেশ করল মেইলস্ট্রোম। কোনো গার্ড তাকে বাধা দেওয়ার সাহস পায়নি, বরং তার উপস্থিতির আকস্মিকতা সবাইকে পাথর করে দিয়েছিল।
মেইলস্ট্রোমের এই দুঃসাহসিক আগমনে ভিলার প্রতিটি সদস্যের মনে হলো তারা কোনো এক ভয়ংকর দুঃস্বপ্নের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে আছেন। মুহূর্তের মধ্যে খবর ছড়িয়ে পড়ল এবং বাড়ির সবাই হলরুমে এসে জড়ো হলেন। বিশাল সেই কক্ষের ঠিক মাঝখানে মেইলস্ট্রোম একা দাঁড়িয়ে। তার শরীর নিশ্চল, মুখাবয়ব নির্বিকার, কিন্তু দুচোখে এক অজেয় আত্মবিশ্বাসের দীপ্তি।
হলরুমের চারপাশে তখন লুসিয়া, মার্কো, জাভিয়ানের বাবা-মা এবং জাভিয়ানের চাচা অর্থাৎ মার্কোর বাবা উপস্থিত। প্রত্যেকের চোখেমুখে বিস্ময় আর এক অজানা আতঙ্ক খেলা করছে। মেইলস্ট্রোম কেন এসেছে সেই প্রশ্নের চেয়েও বড় হয়ে দেখা দিল অন্য এক জিজ্ঞাসা—এই দুর্ভেদ্য দ
ভিলায় প্রবেশের স্পর্ধা সে পেল কোথায়?
জাভিয়ানের বাবা সায়েম চৌধুরী চাপা গলায় গর্জে উঠলেন, “মেইলস্ট্রোম! তুমি এখানে? এই স্পর্ধা তোমার হয় কী করে?”
মেইলস্ট্রোম সরাসরি কোনো উত্তর দিল না। তার তীক্ষ্ণ দৃষ্টি একবার পুরো হলরুমের সবার মুখের ওপর দিয়ে ঘুরে এল। লুসিয়া ভয়ে মার্কোর হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। মার্কো দাঁতে দাঁত চেপে নিজের ক্ষোভ নিয়ন্ত্রণ করার চেষ্টা করছে। জাভিয়ানের চাচার কপালে বিন্দু বিন্দু ঘাম জমতে শুরু করেছে। এই একজন মানুষের উপস্থিতি গোটা ভিলার শক্তিশালী ভিত্তিটাকেই নাড়িয়ে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে।
পুরো হলরুমে তখন পিনপতন নীরবতা। কারো মুখে কোনো শব্দ নেই। কেবল শোনা যাচ্ছে মেইলস্ট্রোমের ভারী বুটের আওয়াজ আর উপস্থিত সবার দ্রুত হৃদস্পন্দন।
মেইলস্ট্রোমের এই হঠাৎ আসার পেছনে যে কোনো মরণপণ পরিকল্পনা আছে, তা বুঝতে কারো বাকি রইল না।মেইলস্ট্রোম এবার ধীরস্থির গলায় কথা বলে উঠল। তার প্রতিটি শব্দ ধারালো ছুরির মতো সবার কানে বিঁধল। সে জানালো, জাভিয়ান এমিলিও চৌধুরী তার সবথেকে বড় সম্পদ তান্বীকে কেড়ে নিয়েছে। বর্তমানে জাভিয়ান তাকে নিয়ে তার মায়ের সেই গোপন দুর্গে আত্মগোপন করে আছে।
এই খবর শোনার পর হলরুমের পরিবেশ আরও গুমোট হয়ে গেল। সবাই জানতেন তান্বী বাংলাদেশে আছে, অথচ তাদের চোখের আড়ালে এত কিছু ঘটে গেল তা কেউ টেরই পায়নি। জাভিয়ানও কাউকে কিছু জানানোর প্রয়োজন বোধ করেনি।
মেইলস্ট্রোম অবজ্ঞার হাসি হেসে বলল, “জাভিয়ানের সাথে আমার ব্যক্তিগত কোনো শত্রুতা ছিল না। কিন্তু নিয়তিই ওকে আমার প্রতিপক্ষ বানিয়ে দিয়েছে। সহজ কথায় আমরা এখন প্রেমের যুদ্ধে একে অপরের প্রতিদ্বন্দ্বী। আমি কেবল এটা বলতে এসেছি যে, জাভিয়ানকে হাতের কাছে পেলে আমি ওকে শেষ করে দেব। কারণ ভালোবাসা আর যুদ্ধে সবকিছুই বৈধ।”
জাভিয়ানের বাবা হুংকার দিয়ে বললেন, “তোমার তান্বীকে প্রয়োজন হলে তাকে নিয়ে যাও, কিন্তু আমার ছেলের গায়ে হাত দেওয়ার চেষ্টা কোরো না।”
পাশ থেকে জাভিয়ানের মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। তিনি আক্ষেপ করে বললেন, “এই মেয়েটা আমার ছেলের জীবনে অভিশাপ হয়ে এসেছে এখন বুঝলাম। ওর জন্যই আজ আমার ছেলের প্রাণ সংশয়।”
জাভিয়ানের চাচা সাইফ চৌধুরী তখন এগিয়ে এসে কড়া গলায় বললেন, “মেইলস্ট্রোম, তুমি জাভিয়ানের কোনো ক্ষতি করবে না।”
মেইলস্ট্রোম এবার সাইফ চৌধুরীর দিকে এগিয়ে গেল। তার ঠোঁটে সেই রহস্যময় হাসি ফুটে উঠল, যার গভীরে লুকিয়ে আছে বহুদিনের জমাটবদ্ধ অভিমান। সে বলল, “বাহ মিস্টার সাইফ চৌধুরী! জাভিয়ানের জন্য আপনার এত দরদ? এত মায়া?”
মেইলস্ট্রোম এবার ধীরপায়ে সায়েম চৌধুরীর সামনে গিয়ে দাঁড়াল। তার ঠোঁটের কোণে ঝুলে থাকা হাসিটা দেখতে ভয়ংকর। সায়েম চৌধুরীর চোখের দিকে তাকিয়ে সে একদম নিচু স্বরে বলল, “আপনার এই মায়া দেখে হাসি পাচ্ছে মিস্টার সায়েম চৌধুরী। যে মানুষটা নিজের আরেকটা ছেলেকে কবরে পাঠিয়ে দিয়েছে, তিলে তিলে তাকে আত্মহত্যার পথে ঠেলে দিয়েছে,তার মুখে অন্তত সন্তানের জন্য দরদ মানায় না। আপনি কেবল একজন ব্যর্থ বাবা নন, আপনি একজন খুনি।”
পুরো হলরুম তখন নিথর হয়ে গেল। সায়েম চৌধুরীর চেহারা মুহূর্তেই ফ্যাকাশে হয়ে গেছে। তিনি সম্ভবত কল্পনাও করেননি যে তার সেই সবচেয়ে নিকৃষ্ট অতীত এভাবে সবার সামনে বলবে।
মেইলস্ট্রোম এবার ঘুরে তাকাল মিসেস কার্গো চৌধুরীর দিকে। তার দৃষ্টিতে তখন তীব্র ঘৃণা। সে নির্লিপ্ত গলায় বলল, “আর আপনি? মা হওয়ার যোগ্যতা নিয়ে কি কখনো ভেবেছেন? দুধের বাচ্চা বাড়িতে একা ফেলে রেখে যে নারী সারা রাত ক্লাবে পার্টি করে বেড়ায়, তার মুখে আজ সন্তানের জন্য হাহাকার খুব বেমানান। আপনি মা নন, স্রেফ একজন স্বার্থপর নারী।”
মেইলস্ট্রোমের একেকটা কথা চাবুকের মতো সবার কানে বাজছিল। সে এবার মার্কোর দিকে এগিয়ে গেল। মার্কো রাগে কাঁপছে দেখে সে তাচ্ছিল্য করে বলল, “মিস্টার সাইফ চৌধুরী, এই ছেলেই কি আপনার গর্ব? জাভিয়ানের মান-সম্মান ডুবানোর জন্য তো একাই যথেষ্ট। দিনরাত বইপত্র আর ইনোসেন্স নিয়ে পড়ে থাকা কি চৌধুরী বংশের ছেলেকে সাজে? আপনার রক্ত কি এতটাই দুর্বল হয়ে গেল?”
মেইলস্ট্রোমের এই তীক্ষ্ণ আক্রমণে মার্কো ফেটে পড়ার উপক্রম হলেও বড়দের সামনে মুখ খুলতে পারল না।
ঠিক তখনই সাইফ চৌধুরী পাথরের মতো স্থির হয়ে কথা বলে উঠলেন। মেইলস্ট্রোমের চোখের ওপর দৃষ্টি রেখে তিনি অত্যন্ত শান্ত কিন্তু ভারী গলায় বললেন, “আমার রক্ত দুর্বল কি না, সেটা তোমার চেয়ে ভালো আর কেউ জানে না মেইলস্ট্রোম। নতুন করে আমাকে সেটা প্রমাণ করতে হবে না।”
সাইফ চৌধুরীর এই রহস্যময় কথাটি হলরুমের গার্ড আর সার্ভেন্টদের মাথায় ঢুকল না। কিন্তু মেইলস্ট্রোম এক মুহূর্তের জন্য চুপ হয়ে গেল। তার নিষ্ঠুর হাসির আড়ালে যেন বহু পুরনো কোনো ক্ষোভ আর যন্ত্রণার ছায়া উঁকি দিয়ে গেল। গার্ড আর সার্ভেন্টরা কেবল বিভ্রান্ত হয়ে এ ওর মুখের দিকে তাকাতে লাগল। তারা বুঝতে পারল না, সাইফ চৌধুরী আর এই দুর্ধর্ষ অপরাধীর মধ্যে এমন কোন গোপন ইতিহাস আছে, যার কারণে মেইলস্ট্রোমও কিছুটা থমকে গেল।
হলরুমের এক কোণে লুসিয়া তখন আড়ষ্ট হয়ে দাঁড়িয়ে। মেইলস্ট্রোম ধীরপদে ওর দিকে এগিয়ে আসতেই লুসিয়া এক অজানা আশঙ্কায় শিউরে উঠল। মানুষটার ধূসর চোখের মণি আর গালের সেই গভীর ক্ষতচিহ্ন লুসিয়ার ভেতরে ত্রাসের সৃষ্টি করছিল। অদ্ভুত এক সৌন্দর্য ওর অবয়বে মিশে থাকলেও তা থেকে কেবল আতঙ্কই ছড়িয়ে পড়ছিল চারদিকে।
মেইলস্ট্রোম লুসিয়ার খুব কাছে এসে দাঁড়াল। ওর কণ্ঠস্বর ছিল নিচু কিন্তু তাতে এক ধরণের শাসন মেশানো। সে বলল, “চৌধুরী বংশের মেয়ে হয়ে একটা ছেলের পেছনে এভাবে পড়ে থাকাটা কি তোমার ব্যক্তিত্বের সাথে যায়? বংশের মর্যাদা ক্ষুণ্ণ করছ তুমি। শোনো লুসিয়া, ছেলেদের পেছনে ছুটতে হয় না বরং ছেলেদের নিজের প্রতি আসক্ত করতে হয়।”
লুসিয়া কোনো উত্তর দিতে পারল না। মেইলস্ট্রোম একটু থেমে পুনরায় বলল, “তোমার ভাই জাভিয়ানের দিকে তাকাও। যে ছেলে একসময় মেয়েদের সহ্যই করতে পারত না, সে আজ একজনের জন্য হন্যে হয়ে আছে। আর তুমি মেয়ে হয়ে একটা ছেলের জন্য নিজেকে বিলিয়ে দিচ্ছ? ওই ছেলেটাকে বাধ্য করো যাতে ও তোমার পেছনে ঘোরে, তুমি ওর পেছনে না।”
লুসিয়া নিঃশব্দে তাকিয়ে থাকল। মেইলস্ট্রোম ঠিক কোন দিকে ইঙ্গিত দিচ্ছে সেটা বুঝতে ওর বাকি রইল না। হঠাৎ মেইলস্ট্রোম এক অদ্ভুত প্রস্তাব দিল। ও সরাসরি জিজ্ঞেস করল, “ক্যান আই হাগ ইউ?”
ঠিক সেই মুহূর্তে মার্কো দ্রুতবেগে সেখানে এসে উপস্থিত হলো। ও লুসিয়ার হাতটা এক হ্যাঁচকা টানে নিজের দিকে সরিয়ে নিয়ে গর্জে উঠল। মার্কো বলল, “আমার বোনের থেকে দূরে থাকো মেইলস্ট্রোম। একদম সীমা অতিক্রম করবে না।”
মেইলস্ট্রোম এক বিন্দু বিচলিত হলো না। ওর ঠোঁটে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে উঠল। সে মার্কোর চোখের দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর মতো ভীরুর কথায় আমি ভয় পাব ভাবলি? আমি ওকে প্রশ্ন করেছি, তোকে নয়। কী হলো লুসিয়া, তোমার উত্তর কী?”
লুসিয়া কিছুক্ষণ স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে কী যেন চিন্তা করল। তারপর সবাইকে অবাক করে দিয়ে ও ধীরে ধীরে মেইলস্ট্রোমের দিকে এগিয়ে গেল। মেইলস্ট্রোমের দীর্ঘ দেহের সামনে লুসিয়াকে খুব ছোট দেখাচ্ছিল। ও নিঃসংকোচে মেইলস্ট্রোমের প্রশস্ত বুকের ওপর মাথা ঠেকাল। মেইলস্ট্রোম তখন এক হাত দিয়ে লুসিয়াকে জড়িয়ে ধরে ওর কানের কাছে মুখ নিয়ে এল।
মেইলস্ট্রোম ফিসফিস করে বলল, “ওর পেছনে তোমার আর যাওয়ার প্রয়োজন পড়বে না। ও নিজেই তোমার সন্ধানে আসবে, সেই ব্যবস্থা করো।”
একথা শেষ করেই মেইলস্ট্রোম কারো উত্তরের অপেক্ষা না করে ভিলা থেকে বেরিয়ে গেল।
মেইলস্ট্রোম বেরিয়ে যাওয়ার পর পুরো হলরুমে এক ভয়াবহ নীরবতা জেঁকে বসল। সায়েম চৌধুরী পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন, যেন তার পায়ের তলা থেকে কেউ মাটি সরিয়ে নিয়েছে। লুসিয়া তখনো স্থির হয়ে ঘরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে, ওর শরীরে মেইলস্ট্রোমের সেই শীতল আলিঙ্গনের রেশ লেগে আছে।
সায়েম চৌধুরী হঠাতই বিকট শব্দে কাঁচের ফুলদানিটা মেঝেতে আছাড় মারলেন। ঝনঝন শব্দে নীরবতা ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। তিনি দাঁতে দাঁত চেপে বললেন, “এত বড় স্পর্ধা ওর! আমার বাড়িতে ঢুকে আমারই পরিবারের বীভৎস ইতিহাস শুনিয়ে গেল? আর তুমি লুসিয়া, তুমি ওই পশুর বুকে মাথা রাখলে কীভাবে?”
লুসিয়া কোনো উত্তর দিল না। তার দৃষ্টি মেঝের দিকে নিবদ্ধ। মার্কো তখন নিজের ভেতরে জ্বলতে থাকা ক্ষোভ দমানোর চেষ্টা করছিল। ও সায়েম চৌধুরীর দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত দৃঢ় গলায় বলল, “বড় আব্বু, এখন এসব বলে সময় নষ্ট করার মানে হয় না। মেইলস্ট্রোম একা এখানে আসেনি। ও আমাদের মানসিক শক্তি ভেঙে দিতে এসেছে। ও জানে জাভি ব্রো কোথায় আছে, কিন্তু সরাসরি আক্রমণ করার সাহস পাচ্ছে না বলেই এই নাটকটা করল।”
সায়েম চৌধুরী অস্থির হয়ে পায়চারি করতে করতে বললেন, “আমি এসব শুনতে চাই না মার্কো। জাভিয়ানকে যেভাবেই হোক খুঁজে বের করতে হবে। মেইলস্ট্রোম ওর ক্ষতি করার আগেই আমাদের ওখানে পৌঁছানো দরকার। জাভিয়ানের মা তো কেঁদে ভাসিয়ে দিচ্ছে, ওদিকে জাভিয়ান ফোন ধরছে না। আমাদের বংশের একমাত্র প্রদীপ এভাবে নিভে যেতে দেব না।”
মার্কো পকেট থেকে ফোন বের করে দ্রুত কাউকে টেক্সট করল। তারপর সে আত্মবিশ্বাসের সাথে বলল, “চিন্তা করবেন না। আমি আমার সোর্সদের কাজে লাগিয়েছি। জাভি ব্রো যে গোপন দুর্গ ব্যবহার করছে, সেটার শেষ প্রান্তের হদিস আমি পেয়ে যাব। সে আর রায়হান নিশ্চয়ই কোনো বড় চাল চালছে। আমি এখনই বের হচ্ছি।”
সাইফ চৌধুরী এতক্ষণ চুপচাপ একপাশে দাঁড়িয়ে ছিলেন। তিনি হঠাৎই মার্কোর কাঁধে হাত রেখে বললেন, “সাবধানে যাস বাবা। মেইলস্ট্রোম যতটা সামনে থাকে, তার চেয়ে বেশি থাকে আড়ালে। ওর পরবর্তী পদক্ষেপ কী হতে পারে সেটা বোঝা বড় কঠিন।”
মার্কো কেবল একবার মাথা নেড়ে সায় দিল। তারপর লুসিয়ার দিকে একপলক কড়া দৃষ্টিতে তাকিয়ে সে দ্রুত হলরুম ছেড়ে বেরিয়ে গেল। লুসিয়া তখনো সেখানে একা দাঁড়িয়ে ভাবছে মেইলস্ট্রোমের শেষ কথাটি—”ও নিজেই তোমার পেছনে আসবে।” কথাটার গূঢ় রহস্য ভেদ করতে গিয়ে লুসিয়ার শিরদাঁড়া দিয়ে এক হিমশীতল স্রোত বয়ে গেলো।
.
.
.
জাভিয়ান পর্দার আড়ালে থেকে এক মরণপণ লড়াইয়ের ছক কষে ফেলেছে। ওর প্রতিটি চাল অত্যন্ত হিসেবি। পরিকল্পনামতো ও নিজে সামনে থেকে মেইলস্ট্রোমকে ব্যস্ত রাখবে, আর সেই সুযোগে ভ্যালেরিয়া তান্বীকে নিয়ে গোপন সুড়ঙ্গ দিয়ে দুর্গের সীমানা পার হবে।
ভ্যালেরিয়া দ্রুত পায়ে তান্বীর ঘরে ঢুকল। ওর হাতে এক সেট টেকসই শার্ট আর ট্রাউজার। কোনো রকম ভূমিকা ছাড়াই ও তান্বীকে পোশাকগুলো পরতে ইশারা করল। তান্বী কিছুটা হকচকিয়ে গিয়ে নিজের পরিহিত পোশাকের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করল, “আপা, এগুলো পরতে হবে কেন? আমি তো এসব পরিনি কখনো।”
ভ্যালেরিয়া ক্ষিপ্র হাতে তান্বীর শার্টের কলারটা ঠিক করে দিতে দিতে গম্ভীর গলায় বলল, “বিপদের মুখে অভ্যাস চলে না তান্বী। এই পোশাক এখন তোর বর্ম। আগের বার যখন পালিয়েছিলি, তোর ওই ঝালরওয়ালা গাউনটাই তোকে বিপদে ফেলতে পারত।একবার হোঁচট খেলে মেইলস্ট্রোমের লোক তোকে ওখানেই ধরে ফেলত।”
তান্বীর কোমরের বেল্টটা টেনে শক্ত করতে করতে ভ্যালেরিয়া আবার বলল, “আমাদের সুড়ঙ্গ দিয়ে নামতে হবে। পথটা খুব একটা সুবিধের নয়, স্যাঁতসেঁতে আর এবড়োখেবড়ো। সেখানে চলতে গেলে এই পোশাকই তোকে সাহায্য করবে। আর শোন, এটা পরে নে।”
ভ্যালেরিয়া তান্বীর জামার নিচে একটি পাতলা কেভলার ভেস্ট পরিয়ে দিল। এটি কেবল বুলেটের আঘাত নয়, সুড়ঙ্গের ধারালো পাথরের চোট থেকেও তান্বীকে বাঁচাবে।
ভ্যালেরিয়া তান্বীর কাঁধে হাত রেখে ওর চোখের দিকে স্থির দৃষ্টিতে তাকাল। ওর কণ্ঠে তখন এক অদ্ভুত শীতলতা। সে বলল, “বাইরে জাভিয়ান নিজের জীবন বাজি রেখে স্রেফ তোর জন্য লড়ছে। ওর এই আত্মত্যাগ যেন বিফলে না যায়। নিজেকে শক্ত কর, আমাদের হাতে সময় একদম নেই।”
পোশাকের এই নতুন বাঁধন আর ভেস্টের ভারে তান্বী এক অন্যরকম অস্বস্তি বোধ করলেও ওর মনে অদ্ভুত এক সাহস জন্ম নিল। চিরকাল গুটিয়ে থাকা মেয়েটা এই সামরিক পোশাকের আড়ালে ক্রমে এক লড়াকু মানসিতে রূপান্তরিত হতে শুরু করল।
ভ্যালেরিয়া যখন তান্বীকে সুড়ঙ্গের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছিল, ঠিক তখনই তান্বী হঠাৎ পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওর দুচোখে তখন এক অবাধ্য ব্যাকুলতা। সে ভ্যালেরিয়ার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ভাঙা গলায় বলে উঠল, “আপা, জাভিয়ান কোথায়? আমি ওর সাথে একবার দেখা না করে এখান থেকে এক পা-ও নড়ব না। ওকে এই বিপদের মুখে ফেলে আমি এভাবে পালিয়ে যেতে পারব না।”
ভ্যালেরিয়া তান্বীর এই আকস্মিক অস্থিরতা দেখে ওর দুই কাঁধ চেপে ধরল। ওর কণ্ঠে এখন আর শুধু শাসনের সুর নেই, বরং এক ধরণের তীব্র সতর্কতা মিশে আছে। সে নিচু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, “তান্বী, বোঝার চেষ্টা কর! এখন আবেগ দেখানোর মতো একটা সেকেন্ডও আমাদের হাতে নেই। মেইলস্ট্রোম যেকোনো মুহূর্তে এই দুর্গের দোরগোড়ায় আছড়ে পড়বে। জাভিয়ান ইচ্ছে করেই সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যাতে মেইলস্ট্রোমের পুরো নজর ওর ওপর থাকে। ও ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধু তোকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে।”
তান্বীর চোখে জল চিকচিক করে উঠল। সে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু ভ্যালেরিয়া তাকে থামিয়ে দিয়ে পুনরায় বলল, “জাভিয়ানের সামনে এখন যাওয়া মানেই ওকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। ও নিজের জীবন বাজি রেখেছে স্রেফ তোর জন্য। তুই যদি এখন ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াস, তবে ওর মনোযোগ বিচ্যুত হবে—আর যুদ্ধের ময়দানে মনোযোগ হারানো মানেই মৃত্যু। ওকে ওর কাজটা করতে দাও তান্বী। যদি ওকে সত্যি ভালোবাসিস, তবে ওর এই ত্যাগের সম্মান রাখ। চল আমার সাথে!”
ভ্যালেরিয়ার এই অকাট্য যুক্তির সামনে তান্বী নিস্তেজ হয়ে পড়ল। ও বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে ওর একগুঁয়েমি জাভিয়ানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। বুকের ভেতর এক দলা হাহাকার আর অনিশ্চয়তা চেপে নিয়ে সে শেষবারের মতো শূন্য দরজার দিকে তাকাল। তারপর ধীরপায়ে সুড়ঙ্গের সেই অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে পথে পা বাড়াল।
ভ্যালেরিয়া যখন তান্বীকে সুড়ঙ্গের পথে নিয়ে যাওয়ার জন্য তাড়া দিচ্ছিল, ঠিক তখনই তান্বী হঠাৎ পাথর হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল। ওর দুচোখে তখন এক অবাধ্য ব্যাকুলতা। সে ভ্যালেরিয়ার হাতটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে ভাঙা গলায় বলে উঠল, “আপা, জাভিয়ান কোথায়? আমি ওনার সাথে একবার দেখা না করে এখান থেকে এক পাও নড়ব না। ওনাকে এই বিপদের মুখে ফেলে আমি এভাবে পালিয়ে যেতে পারব না।”
ভ্যালেরিয়া তান্বীর এই আকস্মিক অস্থিরতা দেখে ওর দুই কাঁধ চেপে ধরল। ওর কণ্ঠে এখন আর শুধু শাসনের সুর নেই, বরং এক ধরণের তীব্র সতর্কতা মিশে আছে। সে নিচু কিন্তু দৃঢ় স্বরে বলল, “তান্বী, বোঝার চেষ্টা কর, এখন আবেগ দেখানোর মতো একটা সেকেন্ডও আমাদের হাতে নেই। মেইলস্ট্রোম যেকোনো মুহূর্তে এই দুর্গের দোরগোড়ায় আছড়ে পড়বে। জাভিয়ান ইচ্ছে করেই সামনে গিয়ে দাঁড়িয়েছে যাতে মেইলস্ট্রোমের পুরো নজর ওর ওপর থাকে। ও ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে শুধু তোকে নিরাপদে সরিয়ে নেওয়ার সুযোগ করে দিতে।”
তান্বীর চোখে জল চিকচিক করে উঠল। সে কিছু একটা বলতে চাইল, কিন্তু ভ্যালেরিয়া তাকে থামিয়ে দিয়ে পুনরায় বলল, “জাভিয়ানের সামনে এখন যাওয়া মানেই ওকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেওয়া। ও নিজের জীবন বাজি রেখেছে স্রেফ তোর জন্য। তুই যদি এখন ওর সামনে গিয়ে দাঁড়াস, তবে ওর মনোযোগ বিচ্যুত হবে—আর যুদ্ধের ময়দানে মনোযোগ হারানো মানেই মৃ/ত্যু। ওকে ওর কাজটা করতে দে তান্বী। যদি ওকে সত্যি ভালোবাসিস, তবে ওর এই ত্যাগের সম্মান রাখ। চল আমার সাথে!”
ভ্যালেরিয়ার এই অকাট্য যুক্তির সামনে তান্বী নিস্তেজ হয়ে পড়ল। ও বুঝতে পারল, এই মুহূর্তে ওর একগুঁয়েমি জাভিয়ানের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। বুকের ভেতর এক দলা হাহাকার আর অনিশ্চয়তা চেপে নিয়ে সে শেষবারের মতো শূন্য দরজার দিকে তাকাল। তারপর ধীরপায়ে সুড়ঙ্গের সেই অন্ধকার আর স্যাঁতসেঁতে পথে পা বাড়াল।
সুড়ঙ্গের সংকীর্ণ সিঁড়ি বেয়ে তান্বী আর ভ্যালেরিয়া যখন নিচে নামছে, ঠিক তখনই বিপরীত দিক থেকে ঝোড়ো গতিতে প্রবেশ করল জাভিয়ান। ওর পরনে যুদ্ধের উপযোগী মিশমিশে কালো রঙের একটি ট্যাকটিক্যাল কার্গো প্যান্ট এবং শরীরে লেপ্টে থাকা গাঢ় ধূসর কমব্যাট শার্ট। শার্টের হাতাগুলো কনুই পর্যন্ত গোটানো, যার ফলে ওর হাতের পেশিগুলোর টানটান উত্তেজনা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। কাঁধের ট্যাকটিক্যাল হোলস্টার আর কোমরের বেল্টে ঝোলানো রণসরঞ্জাম ওকে এই অন্ধকার সুড়ঙ্গে এক ভয়ঙ্কর লড়াকু যোদ্ধার রূপ দিয়েছে। ওর কপালে জমে থাকা বিন্দু বিন্দু ঘাম আর গলার স্ফীত শিরাগুলো বলে দিচ্ছিল ও কতটা যুদ্ধের উত্তেজনার মধ্য দিয়ে এখানে এসে পৌঁছেছে।
জাভিয়ানকে দেখা মাত্রই তান্বী সমস্ত নিয়ম আর ভয়ের তোয়াক্কা ভুলে এক দৌড়ে ওর ওপর আছড়ে পড়ল। কোনো কথা বলার সুযোগ না দিয়েই সে জাভিয়ানের গলা দুই হাত দিয়ে জাপ্টে ধরল। জাভিয়ান বেশ দীর্ঘদেহী হওয়ায় তান্বীর পা দুটো মাটি ছেড়ে শূন্যে উঠে এল; সে কেবল জাভিয়ানের গলা জড়িয়ে ওর শরীরের সাথে মিশে ঝুলে রইল। আবেগের এই প্রবল জোয়ারে তান্বী নিজেকে জাভিয়ানের বলিষ্ঠ দেহের আশ্রয়ে সঁপে দিয়েছে।
জাভিয়ান প্রথমে কিছুটা হকচকিয়ে গেলেও মুহূর্তেই নিজের শক্ত দুই হাতে তান্বীর কোমর জাপ্টে ধরল। ওর ট্যাকটিক্যাল ভেস্টের শক্ত আবরণের ওপাশ থেকেও তান্বীর দ্রুত হৃদস্পন্দন স্পষ্ট টের পাওয়া যাচ্ছিল। এই গভীর আলিঙ্গনে যেন পৃথিবীর সমস্ত কোলাহল আর মেইলস্ট্রোমের আসন্ন বিভীষিকা মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। জাভিয়ান ওর মুখটা তান্বীর ঘাড়ের কাছে গুঁজে দিয়ে এক দীর্ঘশ্বাস ফেলল। এই স্পর্শটুকু যেন ওকে সামনের সব রক্তক্ষয়ী লড়াইয়ের নতুন রসদ জোগাল।
পুরো সুড়ঙ্গে তখন কেবল ওদের দুজনের দ্রুত নিশ্বাসের শব্দ। ভ্যালেরিয়া পাশে দাঁড়িয়ে ঘড়ির দিকে তাকাল। সময় দ্রুত ফুরিয়ে আসছে, কিন্তু এই বিচ্ছেদ-পূর্ব মিলনের তীব্রতা এতটাই গভীর ছিল যে, সে চাইলেও ওদের আলাদা করার কঠোরতা দেখাতে পারল না।
জাভিয়ান তান্বীর কানের কাছে মুখ নিয়ে অত্যন্ত নিচু স্বরে বলল, “ভয় পেয়ো না জিন্নীয়া, আমি আছিতো। তোমাকে আমি কিচ্ছু হতে দেব না।”
জাভিয়ান আলতো করে তান্বীকে কোল থেকে নিচে নামিয়ে রাখল। কিন্তু পা মাটিতে পড়তেই তান্বী ওর শার্টের কলারটা খামচে ধরল। ওর কান্নাভেজা গলায় এখন একগুঁয়ে জেদ। সে ধরা গলায় বলল, “জাভিয়ান, আমি একা যেতে পারব না। আমাকে সাথে রাখুন। আপনাকে ফেলে আমি কোথাও যাব না।”
জাভিয়ান এক মুহূর্ত স্থির হয়ে রইল। তারপর তান্বীর দুই গাল নিজের হাতের তালুতে আগলে নিল। ওর চোখের দৃষ্টিতে তখন মায়া আর শাসনের এক অদ্ভুত লড়াই চলছিলো। জাভিয়ান শান্ত অথচ গভীর গলায় বলল, “জিনিয়া, তুমি তো আমার ছোট বাচ্চা নও। এই সময়ে তোমাকে একটু শক্ত হতে হবে। বোঝার চেষ্টা করো, ভ্যালেরিয়া তোমাকে যে পথে নিয়ে যাচ্ছে সেটাই এখন একমাত্র নিরাপদ পথ। আমি কথা দিচ্ছি, আমি তোমার কাছে ফিরে আসব।”
তান্বী ফুঁপিয়ে উঠে বলল, “কিন্তু যদি আপনার কিছু হয়ে যায়? আমি কী নিয়ে বাঁচব?”
জাভিয়ানের কণ্ঠস্বর এবার কিছুটা গম্ভীর হয়ে উঠল, তাতে এক অটুট দৃঢ়তা স্পষ্ট। সে বলল, “শোনো, মানুষ তখনই হারে যখন সে ভেতর থেকে দুর্বল হয়ে পড়ে। আর তুমি হলে আমার সেই দুর্বলতা। যুদ্ধের ময়দানে যোদ্ধা যদি তার দুর্বলতাকে সাথে নিয়ে ঘোরে, তবে কি সে বাঁচবে? বলো, তুমি কি চাও আমি মেইলস্ট্রোমের কাছে হেরে যাই? আমি হারলে না পারব তোমাকে বাঁচাতে, না পারব নিজেকে রক্ষা করতে। তাই প্লিজ তান্বী, লক্ষ্মী মেয়ের মতো ভ্যালেরিয়ার সাথে যাও। বি গুড।”
জাভিয়ানের এই অকাট্য যুক্তির সামনে তান্বী নিস্তেজ হয়ে পড়ল। ও চোখের জল মুছে নিজেকে সামলে নেওয়ার চেষ্টা করল। অস্ফুট স্বরে বলল, “ঠিক আছে, আমি যাচ্ছি। কিন্তু নিজের খেয়াল রাখবেন। আপনার কিছু হলে আমি নিজেকে কোনোদিন ক্ষমা করতে পারব না।”
কথাটা শেষ করেই তান্বী হুট করে এক দুঃসাহসী কাজ করে বসল। সে জাভিয়ানের একদম কাছে এসে ওর গালে আলতো করে ঠোঁট ছুঁইয়ে এক গভীর আবেগী চুম্বন দিলো। জাভিয়ান মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল, ওর চোখের মণি স্থির। এই ছোট্ট ছোঁয়াটি যেন সামনের যুদ্ধের সমস্ত রক্তক্ষরণ সহ্য করার এক অলৌকিক শক্তি দিয়ে দিল ওকে।
সুড়ঙ্গের দেয়ালে হেলান দিয়ে ভ্যালেরিয়া তখন উল্টো দিকে ঘুরে দাঁড়িয়ে। এই দৃশ্যটি সহ্য করার ক্ষমতা ওর নেই। ওর বুকের ভেতরটা হাহাকার করে উঠছে, কলিজাটা যেন কেউ নির্মমভাবে ছিঁড়ে নিচ্ছে। কিন্তু ও জানে, এটাই বাস্তবতা। জাভিয়ানের ভালোবাসা অন্য কেউ, আর ওকে থাকতে হবে কেবল এক বিশ্বস্ত ছায়া হয়ে। ভ্যালেরিয়া দাঁতে দাঁত চেপে নিজের আবেগ দমানোর চেষ্টা করল। তারপর কর্কশ গলায় বলল, “সময় শেষ জাভিয়ান। আমাদের এবার বেরোতে হবে।”
ভ্যালেরিয়া আর তান্বী সুড়ঙ্গের ঘোর অন্ধকারের দিকে পা বাড়াল। জাভিয়ান দীর্ঘক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল, যতক্ষণ না ওদের পায়ের আওয়াজ পুরোপুরি মিলিয়ে গেল। ধুলো আর বারুদের গন্ধে ভরা ওই গুমোট সুড়ঙ্গে জাভিয়ান এখন একা।ও ধীরে ধীরে সুড়ঙ্গের বিশাল লোহার গেটটির হাতল ধরল। এই গেটটি বন্ধ করার অর্থ হলো তান্বীর সাথে ওর বর্তমানের সমস্ত যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া। গেটটি পুরনো, মরিচা ধরা—হাত দিতেই এক ধরণের ধাতব শীতলতা ওর হাতের তালু দিয়ে শরীরে ছড়িয়ে পড়ল।
জাভিয়ান একবার বুক ভরে শ্বাস নিয়ে সজোরে গেটটি টেনে আনল।ক্যাঁচক্যাঁচ শব্দে ভারী লোহার পাল্লাটা নড়ে উঠল। জাভিয়ান সমস্ত শক্তি দিয়ে গেটটা আটকে দিয়ে বড় লেভারটা ঘুরিয়ে দিল। ধাতব ঘর্ষণের এক কানফাটানো শব্দ সুড়ঙ্গের দেয়ালে প্রতিধ্বনিত হয়ে ফিরে এল।
লকটা পুরোপুরি লেগে যাওয়ার পর জাভিয়ান কপালে হাত দিয়ে গেটের গায়ে মাথা ঠেকাল। ওর চোয়াল শক্ত হয়ে আছে। ও জানে, এই লোহার দেয়ালের ওপাশে ওর প্রাণ পড়ে আছে, আর এই পাশে দাঁড়িয়ে আছে নিশ্চিত মৃত্যু অথবা এক রক্তাক্ত মহাযুদ্ধ। ও পকেট থেকে একটা ছোট ইলেকট্রনিক ডিভাইস বের করে গেটের প্যানেলে সেট করে দিল, যাতে ওপাশ থেকে কেউ এটা আর সহজে খুলতে না পারে।
জাভিয়ান সোজা হয়ে দাঁড়াল। ওর দুচোখে এখন আর কোনো মায়া নেই, বরং সেখানে জমা হয়েছে কালবোশেখির মেঘ। ও ওর বেল্ট থেকে বন্দুকটা বের করে একবার চেক করে নিল। তারপর ধীরপায়ে সুড়ঙ্গের প্রবেশপথের দিকে এগিয়ে গেল। এখন আর পালানোর পথ নেই, এখন কেবল ধ্বংস করার পালা।
সুড়ঙ্গের স্যাঁতসেঁতে অন্ধকারের ভেতরে খুব বেশি দূর এগোতে পারল না তান্বী আর ভ্যালেরিয়া। হঠাৎ সামনের দিক থেকে ধেয়ে আসা কয়েকটা জোরালো টর্চের আলো ওদের চোখেমুখে পড়ল। ভ্যালেরিয়া মুহূর্তের মধ্যে তান্বীকে নিজের আড়ালে সরিয়ে নিল। ও বুঝতে পারল, জাভিয়ানের হিসেবে কোথাও একটা মস্ত বড় গলদ থেকে গেছে। মেইলস্ট্রোম সুড়ঙ্গের গোপন ভেন্টগুলো আগে থেকেই দখলে নিয়ে লোক ঢুকিয়ে রেখেছিল, যা জাভিয়ানের নজরদারি এড়িয়ে গেছে।
অন্ধকার ফুঁড়ে সাত-আটজন সশস্ত্র লোক বেরিয়ে এল। ভ্যালেরিয়া দাঁতে দাঁত চেপে নিচু গলায় তান্বীকে নির্দেশ দিল, “তান্বী, তুই উল্টো দিকে দৌড় দে,যেভাবে পারিস দুর্গে ফিরে যা। আমি এদের সামলাচ্ছি।”
তান্বী ভয়ে সিঁটিয়ে গিয়ে অস্ফুট স্বরে বলল, “কিন্তু আপা, আপনাকে একা রেখে আমি…”
“তর্ক করিস না, পালা!” ভ্যালেরিয়ার ধমক শেষ হতে না হতেই প্রথম লোকটা ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
শুরু হলো এক অসম লড়াই। ভ্যালেরিয়া পেশাদার লড়াকুর মতো একের পর এক আঘাত প্রতিহত করছিল। ওর নিখুঁত পাঞ্চ আর লাথির চোটে একজন দেয়ালে ছিটকে পড়ল। কিন্তু লোকগুলো সংখ্যায় অনেক বেশি। মেইলস্ট্রোমের কড়া নির্দেশ ছিল—তান্বীর গায়ে যেন আঁচড়ও না লাগে, কিন্তু ভ্যালেরিয়াকে মেরে ফেললেও কোনো জবাবদিহি নেই। এই সুযোগটাই নিচ্ছিল ওরা।
লড়তে লড়তে ভ্যালেরিয়া যখন কিছুটা হাপিয়ে উঠেছে, তখন একজন পেছন থেকে ওর পাঁজরে জোরালো এক লাথি মারল। ভ্যালেরিয়া যন্ত্রণায় নুয়ে মেঝেতে পড়ে যেতেই বাকিরা ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়তে চাইল। তান্বী কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে কাঁপছিল, কিন্তু ভ্যালেরিয়াকে এভাবে মার খেতে দেখে ওর ভেতরের সুপ্ত ভীতিটা হঠাৎ তীব্র জেদে বদলে গেল। ও নিচ থেকে বড় একটা পাথর তুলে নিয়ে সর্বশক্তি দিয়ে ভ্যালেরিয়ার ওপর ঝুঁকে থাকা লোকটার মাথায় আছাড় মারল।
মাথা ফেটে র/ক্ত ঝরতে দেখে লোকটা গর্জে উঠে তান্বীর দিকে ফিরল। বাকিরাও থমকে দাঁড়াল। মেইলস্ট্রোমের ভয়ে তারা তান্বীকে স্পর্শ করতে পারছে না, কিন্তু ওদের লক্ষ্য ছিল ভ্যালেরিয়া। একজন আবার ভ্যালেরিয়ার দিকে বন্দুকের কুঁদো উঁচিয়ে এগোতেই তান্বী কাঁপাকাঁপা হাতে ওর কাছে থাকা পিস্তলটা বের করে তাক করল।
ভ্যালেরিয়া অবাক হয়ে চেঁচিয়ে উঠল, “তান্বী! কি করছিস তুই? তুই তো অস্ত্র চালাতে জানিস না!”
তান্বী স্লাইড টেনে লোড করার চেষ্টা করতে করতে দাঁত চেপে বলল, “আমি পারব আপা। মার্কো ভাইয়া আমাকে ট্রিগার টেপা শিখিয়েছিল একবার।”
লোকগুলো হো হো করে হেসে উঠল। তান্বীর হাতের কাঁপুনি দেখে ওরা নিশ্চিত হলো এ স্রেফ ফাঁকা আওয়াজ। ওরা আবার ভ্যালেরিয়াকে মারতে উদ্যত হতেই তান্বীর ভেতরটা জ্বলে উঠল। ও স্রেফ চোখ বন্ধ করল। মার্কোর সেই পুরনো টিপস কানে বাজল—’লক্ষ্য স্থির না থাকলেও শুধু ট্রিগার চেপে ধরে রাখবে।”
সুড়ঙ্গের নিস্তব্ধতা খানখান করে দিয়ে গর্জে উঠল পিস্তল। তান্বী দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে এলোপাথাড়ি গুলি ছুঁড়তে থাকল। অন্ধকারের মাঝে আগুনের ঝলকানি আর আর্তচিৎকারে নরক নেমে এল। কয়েক সেকেন্ড পর যখন সব চুপচাপ, তান্বী চোখ খুলে দেখল মেঝেতে মেইলস্ট্রোমের লোকগুলো নিথর হয়ে পড়ে আছে।
সুড়ঙ্গের সেই ভ্যাপসা গুমোট বাতাসে তখন কেবল বারুদের কটু গন্ধ আর পোড়া গন্ধ ভাসছে। তান্বী কয়েক মুহূর্ত পাথরের মতো দাঁড়িয়ে রইল। ওর সামনে নিথর হয়ে পড়ে থাকা দেহগুলো আর রক্তের কালচে স্রোত দেখে ওর পুরো শরীর রি রি করে উঠল। যে হাত দিয়ে ও কিছুক্ষণ আগে ট্রিগার চেপেছিল, সেই হাত দুটো এখন অনিয়ন্ত্রিতভাবে কাঁপছে।
হঠাৎ হাতের পিস্তলটা ধাতব শব্দ করে মেঝেতে পড়ে গেল। তান্বীর মনে হলো ওর চারপাশের দেয়ালগুলো ওকে গিলে খেতে আসছে। ও আর নিজেকে সামলাতে পারল না; একরাশ আতঙ্ক আর কান্না নিয়ে ও মেঝেতে বসে থাকা ভ্যালেরিয়ার বুকে আছড়ে পড়ল।
ভ্যালেরিয়াকে শক্ত করে জাপ্টে ধরে তান্বী ডুকরে কেঁদে উঠল। ওর কান্নায় কোনো শব্দ ছিল না, ছিল কেবল এক পৈশাচিক ভয়ের আর্তনাদ। ওর সারা শরীর থরথর করে কাঁপছে, যেন হাড়ের ভেতর দিয়ে বরফশীতল কোনো স্রোত বয়ে যাচ্ছে।
ভ্যালেরিয়া নিজেও তখন যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছিল, কিন্তু তান্বীর এই অবস্থা দেখে সে নিজের কষ্ট ভুলে গেল। সে ওর রক্তাক্ত হাত দিয়েই তান্বীকে আগলে নিল। তান্বী ভ্যালেরিয়ার কাঁধে মুখ গুঁজে অস্ফুট স্বরে বলতে লাগল, “আপা, আমি ওদের মেরে ফেলেছি… আমি মানুষ মেরেছি! ওরা আর নড়ছে না কেন আপা?”
ভ্যালেরিয়া তান্বীর মাথায় হাত বুলিয়ে দিতে দিতে ফিসফিস করে বলল, “শান্ত হ তান্বী, শান্ত হ। তুই না মারলে ওরা আমাদের মেরে ফেলত। তুই আমাদের বাঁচিয়েছিস।”
কিন্তু তান্বীর কানে কোনো কথা পৌঁছাচ্ছিল না। ওর চোখের সামনে কেবল বারুদে ঝলসে যাওয়া ওই মুখগুলো ভাসছে। যে মেয়েটা একটা পিঁপড়ে মারতেও দ্বিধা বোধ করত, পরিস্থিতির নিষ্ঠুরতা আজ তাকে এক খু*নি বানিয়ে দিল। অন্ধকার সুড়ঙ্গে তান্বীর সেই কান্নার প্রতিধ্বনি এক অসহ্য গাম্ভীর্যের সৃষ্টি করল।
ভ্যালেরিয়া যন্ত্রণায় কুঁচকে থাকা মুখটা কোনোমতে স্বাভাবিক করার চেষ্টা করল। ও বুঝতে পারল, সুড়ঙ্গের মূল পথে থাকা মানেই আত্মঘাতী হওয়া। মেইলস্ট্রোমের আরও লোক যেকোনো সময় এখানে ঢুকে পড়বে। ও দেয়ালের গায়ের পুরনো ভেন্টিলেটরের দিকে তাকিয়ে তান্বীর কান্না থামানোর চেষ্টা করল।
ভ্যালেরিয়া ধরা গলায় বলল, “তান্বী, শান্ত হ। সামনে আরও বড় বিপদ অপেক্ষা করছে। আমাদের এই পথ বদলাতে হবে। আমি দেখছি ভেন্টিলেটরের ওপাশে কোনো রাস্তা আছে কি না।”
কথাটা শেষ করেই ভ্যালেরিয়া নিজের শরীরের সমস্ত শক্তি এক করে দেয়াল বেয়ে উপরে উঠে গেল। ভ্যালেরিয়া অত্যন্ত ক্ষিপ্রতার সাথে দেয়ালের খাঁজগুলো আঁকড়ে ধরল। সুড়ঙ্গের এই পরিত্যক্ত অংশের ভেন্টিলেটরটি ছিল বেশ বড় এবং এর লোহার গ্রিলগুলো বহু আগেই মরিচা ধরে খসে পড়েছিল। ওটা এখন কেবল একটা খোলা কংক্রিটের গর্তের মতো। ভ্যালেরিয়া এক ঝটকায় উপরে উঠে উঁকি দিয়ে দেখল ওপাশে একটা সরু ঢালু পথ জঙ্গলের দিকে চলে গেছে। ও নিচু স্বরে তান্বীকে উদ্দেশ্য করে বলল, “তান্বী, এই ভেন্টিলেটর দিয়েই আমাদের পালাতে হবে। আমি আগে যাচ্ছি, তুই ঠিক আমার মতো করে উঠে আয়।”
ভ্যালেরিয়া বড় ওই ফাঁকা ভেন্টিলেটর দিয়ে শরীর গলিয়ে ওপাশে চলে গেল এবং ওপর থেকে লাফ দিয়ে নিচে নামল। ওপাশে গিয়েই সে চিৎকার করে ডাকল, “তান্বী! দেরি করিস না, চলে আয়!”
তান্বী তখনো ঘোরের মধ্যে। কাঁপতে থাকা শরীর আর চোখের জল মুছে সে দেয়ালের উঁচু খাঁজগুলো ধরার চেষ্টা করল। কিন্তু ওর শরীর এই ধকল নেওয়ার মতো অবস্থায় ছিল না। ও কোনোমতে অর্ধেকটা দেয়াল বেয়ে উঠলেও হঠাৎ ওর হাত পিচ্ছিল হয়ে গেল।
পরের মুহূর্তেই তান্বী সজোরে নিচে পাথুরে মেঝেতে পড়ে গেল। ওর মুখ আর হাতের একপাশ সরাসরি দেয়ালের তীক্ষ্ণ কোণ আর নিচের ধারালো পাথরের ওপর আছড়ে পড়ল। সুড়ঙ্গের নিস্তব্ধতা চিরে ওর আর্তচিৎকার প্রতিধ্বনিত হলো। তান্বীর গাল আর হাতের কনুই ফেটে গলগল করে রক্ত বেরোতে শুরু করল। যন্ত্রণায় ওর চোখের সামনে সবকিছু অন্ধকার হয়ে এল।
দেয়ালের ওপাশ থেকে ভ্যালেরিয়া ওর আর্তনাদ শুনে অস্থির হয়ে উঠল। সে বুঝতে পারল তান্বী গুরুতর চোট পেয়েছে।
আরো ভারী বুটের আওয়াজ এখন একদম কাছে চলে এসেছে। কোনোমতে সময় নেই বুঝে তান্বী যন্ত্রণাকে দাঁতে চেপে ধরল। ও এবার আর কোনো সাহায্য না নিয়ে নিজের সবটুকু শক্তি দিয়ে ভেন্টিলেটরের খসখসে দেয়ালটা আঁকড়ে ধরল। হাতের ছিলে যাওয়া চামড়া থেকে রক্ত চুইয়ে দেয়ালটা পিচ্ছিল হয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু জীবনের তাগিদে ও কোনোমতে শরীরটাকে টেনে ভেন্টিলেটরের সরু ফাঁক দিয়ে ওপাশে গলিয়ে দিল।
দেয়ালের ওপাশে অন্ধকার জঙ্গলের গলিটাতে ভ্যালেরিয়া তখনো দাঁড়িয়ে। তান্বী যখন ভেন্টিলেটরের ওপর থেকে নিচে নামার জন্য পা বাড়াল, তখন দেখল মেঝেটা বেশ নিচে। ওর রক্তাক্ত হাত দিয়ে শরীরের ভারসাম্য ধরে রাখা অসম্ভব।
ভ্যালেরিয়া দ্রুত নিজেকে দেয়ালের সাথে সেট করে নিয়ে বলল, “তান্বী, আমার কাঁধে পা রাখ। লাফ দিতে যাস না, তাহলে পায়ের হাড় গুঁড়ো হয়ে যাবে।”
তান্বী ওপর থেকে ভ্যালেরিয়ার আহত চেহারার দিকে তাকিয়ে শিউরে উঠল। ও ধরা গলায় বলল, “না আপা, আপনার আগে থেকেই অনেক চোট লেগেছে। আমি আপনার ওপর ভর দিতে পারব না।”
ভ্যালেরিয়া এবার প্রায় চিৎকার করে উঠল, “আবেগ দেখানোর জায়গা এটা না তান্বী! আমি ফাইটার গার্ল, আমার হাড় এত কাঁচা না। পা রাখ বলছি, নাহলে ওরা এখনই আমাদের খুঁজে ফেলবে!”
বুটের শব্দ এখন ভেন্টিলেটরের ঠিক ওপাশেই। তান্বী আর দ্বিধা না করে অত্যন্ত সতর্কতার সাথে নিজের পা ভ্যালেরিয়ার মজবুত কাঁধের ওপর রাখল। ভ্যালেরিয়া এক মুহূর্তের জন্য যন্ত্রণায় কুঁকড়ে গেলেও নিজেকে শক্ত করে ধরে রাখল যাতে তান্বী পড়ে না যায়। ।
ভ্যালেরিয়ার কাঁধের ভর নিয়ে তান্বী নিরাপদভাবে নিচে নেমে এল।মাটিতে পা রাখতেই তান্বী দেখল ভ্যালেরিয়ার ক্ষতস্থানগুলো দিয়ে নতুন করে রক্ত ঝরছে। ওপাশে মেইলস্ট্রোমের লোকগুলো ভেন্টিলেটরের ওপারে পৌঁছে গেছে বুঝতে পেরে ওরা আর এক মুহূর্তও নষ্ট করল না। রক্তাক্ত শরীর আর ধুলোমাখা অবস্থায় ওরা অন্ধকারের নতুন এক গোলকধাঁধায় দৌড়াতে শুরু করল।
.
.
.
.
সুড়ঙ্গের গেটটি সিল করে জাভিয়ান যখন দুর্গের বাইরে বেরিয়ে এল, দেখল সেখানে এক নিথর নিস্তব্ধতা। মেইলস্ট্রোম তার অস্ত্রধারী বাহিনী নিয়ে মাঝখানে দাঁড়িয়ে আছে। আর ওর ঠিক পাশেই পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে আছেন ইসাবেলা। জাভিয়ানকে দেখা মাত্রই মেইলস্ট্রোমের চোখে হিংস্রতা ফুটে উঠল, সে ওর পিস্তলটা জাভিয়ানের কপাল বরাবর তাক করল।
মেইলস্ট্রোম গর্জে উঠে বলল, “জাভিয়ান! তুই ভেবেছিলি ওকে সরিয়ে নিতে পারবি? আজ এই দুর্গের সাথে তোকেও আমি মাটিতে মিশিয়ে দেব।”
মেইলস্ট্রোম যখন ট্রিগারে চাপ দিতে যাবে, ঠিক তখনই ইসাবেলা তার ছেলের হাতের ওপর নিজের হাত রাখলেন। তাঁর শান্ত কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ় স্পর্শে মেইলস্ট্রোম থমকে গেল।
“ছেড়ে দাও ওকে,” ইসাবেলার কণ্ঠস্বর পুরো হলে প্রতিধ্বনিত হলো।
মেইলস্ট্রোম অবিশ্বাসের চোখে তাঁর দিকে তাকিয়ে বলল, “মম! তুমি কি বলছ? ও আমার সব পরিকল্পনা নষ্ট করেছে। ও আমার শত্রু মানে তোমার ও শত্রু!”
ইসাবেলা স্থির চোখে তাঁর ছেলের দিকে তাকালেন। তাঁর চোখে তখন এক মাতৃত্বসুলভ শাসন আর গভীর বিষাদ। তিনি বললেন, “শত্রু জাভিয়ান নয় মেইলস্ট্রোম, শত্রু তোমার এই প্রতিহিংসা। ওই মেয়েটাকে কেড়ে নিয়ে তুমি কিছুই পাবে না। আমি তোমাকে এই রক্তক্ষয়ী পথে আর এগোতে দেব না।”
মেইলস্ট্রোমের চোয়াল শক্ত হয়ে এল। সে চিৎকার করে বলল, “তুমি ওর পক্ষ নিচ্ছ? আমার মা হয়ে তুমি ওকে বাঁচাতে চাইছ?”
ইসাবেলা মেইলস্ট্রোমের পিস্তল ধরা হাতটা ধীরে ধীরে নামিয়ে আনলেন। তিনি খুব নিচু স্বরে বললেন, “আমি ওকে বাঁচাচ্ছি না, আমি তোমাকে বাঁচাতে চাইছি। তুমি আজ যাকে ধ্বংস করতে চাইছ, তা করতে গিয়ে তুমি নিজেকেই হারিয়ে ফেলবে। জাভিয়ানকে যেতে দাও, এটাই আমার আদেশ।”
মেইলস্ট্রোম যন্ত্রণায় আর রাগে ফুঁসতে লাগল। একদিকে ওর মায়ের আদেশ, অন্যদিকে জাভিয়ানের প্রতি ওর দীর্ঘদিনের ঘৃণা। ইসাবেলা এবার জাভিয়ানের দিকে তাকিয়ে ইশারায় ওকে চলে যেতে বললেন। কিন্তু মেইলস্ট্রোমের বাহিনী তখনো অস্ত্র উঁচিয়ে দাঁড়িয়ে।
মেইলস্ট্রোম তার মায়ের দিকে এক মুহূর্ত তাকাল, তারপর এক ঝটকায় তাঁর হাত সরিয়ে দিয়ে জাভিয়ানের দিকে ধেয়ে এল। ওর গলায় তখন বুনো চিৎকার, “মম, আজ তোমার আদেশ আমি মানতে পারছি না!”
মা আর ছেলের এই সংঘাতের মাঝখানে জাভিয়ান নিজেকে এক কঠিন পরিস্থিতির সামনে আবিষ্কার করল। সে জানে, ইসাবেলা মেইলস্ট্রোমকে থামানোর আপ্রাণ চেষ্টা করছেন, কিন্তু মেইলস্ট্রোম এখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে।
.
.
.
.
ঠিক সেই সময়ে দুর্গের পেছনের জঙ্গলের একটি গোপন ঢালু পথ দিয়ে ভ্যালেরিয়া প্রায় টেনেহিঁচড়ে তান্বীকে নিয়ে বেরিয়ে এল। তান্বীর সারা শরীর ধুলো আর রক্তে মাখামাখি, যন্ত্রণায় সে ঠিকমতো পা ফেলতে পারছে না। ভ্যালেরিয়া ওকে নিয়ে ঝোপের আড়ালে রাখা জাভিয়ানের সেই কালো রঙের বিশেষ গাড়িটার কাছে পৌঁছাল। জাভিয়ান আগে থেকেই জরুরি অবস্থার জন্য এই গাড়িটি এখানে মজুত রেখেছিল।
ভ্যালেরিয়া দ্রুত গাড়ির পেছনের ডিকি বা মালামাল রাখার অংশটি খুলে ফেলল। সেখানে কিছু কম্বল আর জরুরি সরঞ্জাম রাখা ছিল। ভ্যালেরিয়া ফিসফিস করে বলল, “তান্বী, জলদি এর ভেতর ঢুকে পড়। একদম নিচে শুয়ে থাকবি, কোনো শব্দ করবি না।”
তান্বী কোনোমতে ভেতরে ঢুকে ভ্যালেরিয়ার হাতটা শক্ত করে চেপে ধরল। ওর চোখে তখন এক রাজ্যের ভয়। ও কাঁপা গলায় বলল, “আপনি কোথায় যাচ্ছেন আপা? আমাকে একা রেখে যাবেন না!”
ভ্যালেরিয়া তান্বীর রক্তমাখা হাতটা নিজের হাত থেকে ছাড়িয়ে নিল। ওর চোখে এখন যুদ্ধের উন্মাদনা। ও শান্ত কিন্তু অটল গলায় বলল, “আমাকে যেতে হবে তান্বী। জাভিয়ান ওখানে একা লড়ছে।”
তান্বী ডুকরে কেঁদে উঠে বলল, “প্লিজ আপা, যাবেন না! আপনিও তো আহত।”
ভ্যালেরিয়া তান্বীর কপালে একটা হাত রেখে আলতো করে ভরসা দিল। তারপর বলল, “তুই এই গাড়িতে চুপচাপ শুয়ে থাক। এখানে তুই একদম নিরাপদ। জাভিয়ান কাজ শেষ করে নিজেই তোর কাছে আসবে। একদম নড়বি না!”
কথাটা শেষ করেই ভ্যালেরিয়া গাড়ির পেছনের ডালাটা সাবধানে আটকে দিল। অন্ধকার ডিকির ভেতর তান্বী একা শুয়ে রইল, কেবল বাইরের বাতাসের শোঁ শোঁ শব্দ আর দূরে ফাটতে থাকা গুলির আওয়াজ ওর কানে আসছিল।
ভ্যালেরিয়া একবার গাড়ির বডিতে হাত দিয়ে শেষবারের মতো পজিশন নিল, তারপর রিভলভারটা উঁচিয়ে ঝোড়ো গতিতে আবার দুর্গের মূল ফটকের দিকে দৌড় দিল।
.
.
.
দুর্গের বাইরে খোলা মাঠে জাভিয়ান স্থির হয়ে দাঁড়াল। ওর দুচোখে আগুনের হলকা, কিন্তু কণ্ঠে অমানবিক এক শীতলতা। মেইলস্ট্রোম যখন উন্মত্তের মতো ওর দিকে এগোতে চাইল, জাভিয়ান সপাটে বলে উঠল, “মেইলস্ট্রোম, তুই একটা মস্ত বড় ভুল করছিস। তান্বী এখন শুধুই কেউ নয়, ও আমার বিবাহিত স্ত্রী। একটা মেয়ে বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তুই কোন সাহসে ওকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখিস? এই পাগলামি বন্ধ কর।”
জাভিয়ানের এই সত্য উচ্চারণে পুরো মাঠে যেন এক মুহূর্তের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। মেইলস্ট্রোম থমকে দাঁড়াল, ওর চোয়াল শক্ত হয়ে এল আর ধূসর চোখের মণি সংকুচিত হলো। ও অট্টহাসি হাসতে চাইল, কিন্তু সেই হাসিতে কেবল হাহাকার আর ঘৃণা মিশে ছিল।
মেইলস্ট্রোম ওর পিস্তলের কুঁদোটা শক্ত করে চেপে ধরে বলল, “স্ত্রী? তোর সাথে ওর বিয়ে হয়েছে বলে ও তোর হয়ে গেল? তুই ওকে পাওয়ার অনেক আগে থেকে আমি ওকে দেখেছি। এটা আমার সাধারণ কোনো ভালোবাসা নয় জাভিয়ান—এটা আমার অবসেসন! ওর সাথে তোর বিয়ে হওয়ার আগেই আমি মনে মনে ওকে নিজের করে নিয়েছি।”
ও এক কদম এগিয়ে এসে দাঁত চেপে পুনরায় বলল, “বিয়ে হয়েছে কি হয়নি, তাতে আমার কিচ্ছু যায় আসে না। তান্বী শুধু আমার ছিল আর আমারই থাকবে। তোর ওই বিবাহিত তকমা আমার জেদের কাছে নস্যি। আমি ওকে ভালোবেসে নয়, আমি ওকে জয় করতে চাই।”
ছেলের এই বিকৃত মানসিকতা দেখে ইসাবেলা শিউরে উঠলেন। তিনি আর্তনাদ করে উঠলেন, “মেইলস্ট্রোম! তুমি কি পাগল হয়ে গিয়েছো? ও অন্যের স্ত্রী, এটা তুমি কীভাবে বলতে পারছো?”
কিন্তু মেইলস্ট্রোম আজ কোনো বাধা মানার অবস্থায় নেই। সে তার মায়ের দিকে তাকিয়ে এক ভয়ংকর দৃষ্টি হানল, তারপর জাভিয়ানের দিকে ফিরে বলল, “আজ আমাদের মধ্যে একজনই থাকবে জাভিয়ান। হয় তুই মরবি, না হয় আমি। কিন্তু তান্বীর ওপর থেকে আমার অধিকার আমি ছাড়ছি না।”
জাভিয়ান ওর কমব্যাট শার্টের হাতাটা শেষবারের মতো গুটিয়ে নিল। ওর শান্ত থাকা ধৈর্যের বাঁধ এবার ভেঙে গেছে। ও অত্যন্ত ধীরস্থিরভাবে বলল, “যে অধিকারের মূলে শুধু লালসা আর জেদ থাকে, সেই অধিকার আজ আমি তোর রক্ত দিয়ে মুছে দেব।”
জাভিয়ান আর মেইলস্ট্রোমের মধ্যে শুরু হলো এক রক্তক্ষয়ী হাতাহাতি লড়াই। মেইলস্ট্রোম উন্মত্তের মতো জাভিয়ানের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। দুজনের শক্তিশালী ঘাত-প্রতিঘাতে পুরো মাঠ কেঁপে উঠছে। মেইলস্ট্রোম একবার জাভিয়ানকে দেয়ালে চেপে ধরে ওর গলায় ছুরি বসাতে চাইল, কিন্তু জাভিয়ান নিপুণ দক্ষতায় সেটা এড়িয়ে গিয়ে মেইলস্ট্রোমের পাঁজরে জোরালো এক পাঞ্চ বসাল।
লড়াই যখন চরমে, ঠিক তখনই দুর্গের বাইরে থেকে ডজনখানেক পুলিশের গাড়ির সাইরেন আর হেলিকপ্টারের শব্দ ভেসে এল। জাভিয়ানের ব্যাকআপ ফোর্স পুরো দুর্গ ঘিরে ফেলেছে।
মেইলস্ট্রোম হাপাতে হাপাতে পিছু হটে চিৎকার করে বলল, “তুই ভেবেছিস পুলিশ ডেকে আমাকে আটকাতে পারবি? আমার বিরুদ্ধে কোনো প্রমাণ নেই!”
ঠিক সেই মুহূর্তে ইসাবেলা শান্ত পায়ে সামনে এগিয়ে এলেন। তাঁর হাতে একটি এনক্রিপ্টেড হার্ডড্রাইভ। তিনি মেইলস্ট্রোমের চোখের দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত ভারাক্রান্ত কিন্তু দৃঢ় কণ্ঠে বললেন, “প্রমাণ এখানে আছে, মেইলস্ট্রোম। তোমার সব অবৈধ কাজ, খু,নের সংখ্যা আর গত দশ বছরের যাবতীয় অপরাধের নথিপত্র আমি নিজে পুলিশের হাতে তুলে দিয়েছি।”
মেইলস্ট্রোম স্তব্ধ হয়ে গেল। নিজের মায়ের এই চরম বিশ্বাসঘাতকতা ও মেনে নিতে পারল না। ও অস্ফুট স্বরে বলল, “মম… তুমি?”
ইসাবেলা চোখ মুছে অন্যদিকে তাকিয়ে বললেন, “আমি তোমাকে থামাতে চেয়েছিলাম মেইলস্ট্রোম, কিন্তু তুমি শোনোনি,একজন সচেতন মা হিসেবে আমি চাই তোমার এই বিচার হোক। তোমার এই অন্ধ মোহ তোমাকে পশিয়ে পরিণত করেছে।”
মেইলস্ট্রোম ভাবছে তাঁর মা বেইমানি করেছে, কিন্তু ইসাবেলা মনে মনে জানেন, এই সিদ্ধান্ত নেওয়ার পেছনে তাঁর কতটা রক্তক্ষরণ হয়েছে।
ইসাবেলা জানতেন, মেইলস্ট্রোম যে পথে পা বাড়িয়েছে, সেখান থেকে ফিরে আসার কোনো পথ নেই। তান্বীর প্রতি ওর এই বিকৃত ‘অবসেশন’ আর জাভিয়ানের প্রতি অন্ধ ঘৃণা ওকে এতটাই পশুর স্তরে নামিয়ে নিয়ে গেছে যে, আজ যদি ও ধরা না পড়ত, তবে ও আরও শত শত প্রাণ কেড়ে নিত। ইসাবেলা বুঝতে পেরেছিলেন, নিজের ছেলেকে রক্ষা করার একমাত্র উপায় হলো তাকে এই জাভিয়ানের থেকে সরিয়ে আইনের খাঁচায় বন্দি করা।
মেইলস্ট্রোম বুঝতে পারল ওর পালানোর সব পথ বন্ধ। স্পেশাল ফোর্সের কমান্ডোরা দুর্গের মেইন গেইটের দরজা ভেঙে ভেতরে ঢুকে পড়ল। জাভিয়ান নিজের শার্টের কলারটা ঠিক করে নিয়ে শান্তভাবে মেইলস্ট্রোমের সামনে গিয়ে দাঁড়াল।
জাভিয়ান বলল, “আমি একা আসিনি মেইলস্ট্রোম। আমি পুরো সিস্টেম নিয়ে এসেছি। আজ তোর ওই অন্ধ অবসেসনের সমাপ্তি এখানেই।”
মেইলস্ট্রোমের হাতে হাতকড়া পরানো হলো। ও যখন পুলিশের জালে বন্দি হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, তখন ওর দৃষ্টি একবার জাভিয়ানের ওপর পড়ল—যেখানে ঘৃণা আর পরাজয়ের এক বীভৎস সংমিশ্রণ। ইসাবেলা দেয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে রইলেন, তাঁর চোখের জল যেন আজ এক দীর্ঘ যন্ত্রণার অবসান ঘটাল।
মেইলস্ট্রোমের হাতে তখন হাতকড়া পরানো হচ্ছে, চারদিকে জাভিয়ানের বাহিনীর জয়জয়কার। সবাই যখন স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, ঠিক তখনই কয়েকশ গজ দূরের একটা পরিত্যক্ত ওয়াচ টাওয়ারের চূড়ায় ঝিলিক দিয়ে উঠল একটি স্নাইপারের লেন্স।
মেইলস্ট্রোম অত্যন্ত ধূর্ত; গ্রেফতার হওয়ার ঠিক আগমুহূর্তে সে চোখের ইশারায় তার সবথেকে বিশ্বস্ত স্নাইপারকে চূড়ান্ত সংকেত দিয়ে দিয়েছিল।
জাভিয়ান তখন পিঠ ফিরিয়ে তার অফিসারদের সাথে কথা বলছে। স্নাইপারের সেই সাইলেন্সার লাগানো বন্দুকের নল থেকে যখন প্রথম গুলিটি বেরিয়ে এল, তখনো কেউ কিচ্ছু টের পায়নি। কিন্তু ভ্যালেরিয়া, যার দৃষ্টি আজীবন জাভিয়ানের নিরাপত্তার ওপর নিবদ্ধ ছিল, সে হঠাৎ সেই অতি ক্ষুদ্র আলোকচ্ছটা লক্ষ্য করল।
“জাভিয়ান! সরে দাঁড়াও!” ভ্যালেরিয়ার আর্তচিৎকার পুরো প্রান্তরকে চমকে দিল। জাভিয়ান কিছু বুঝে ওঠার আগেই ভ্যালেরিয়া ঝড়ের গতিতে এসে ওর ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল।
পরপর পাঁচটি গুলির শব্দ। সাই-সাই করে বাতাস চিরে বুলেটগুলো এসে বিঁধল ভ্যালেরিয়ার পিঠে আর পাঁজরে। জাভিয়ানকে আগলে রাখতে গিয়ে সে নিজের শরীরটাকে ঢাল বানিয়ে দিল।
জাভিয়ান ছিটকে মাটিতে পড়ার পর যখন নিজেকে সামলে নিল, ও দেখল ভ্যালেরিয়া ওর পায়ের কাছে নিথর হয়ে লুটিয়ে পড়ছে। ওর সাদা শার্টটা মুহূর্তেই রক্তের লাল বন্যায় ভিজে গেছে।
“ভ্যালেরিয়া!” জাভিয়ান চিৎকার করে ওকে দুই হাতে জড়িয়ে ধরল।
ভ্যালেরিয়ার ঠোঁটের কোণ দিয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে, কিন্তু ওর চোখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি। ও অস্ফুট স্বরে, প্রায় ফিসফিস করে বলল, “জাভিয়ান..তুমি ঠিক আছো তো? তোমার গায়ে… টোকা লাগেনি তো?”
জাভিয়ানের মতো শক্ত হৃদয়ের মানুষও তখন স্তব্ধ। ও ভ্যালেরিয়ার জখমগুলো হাত দিয়ে চেপে ধরার চেষ্টা করছিল, কিন্তু রক্ত থামছিল না। ওপাশে স্নাইপারকে পাল্টা গুলিতে খতম করল স্পেশাল ফোর্স, আর মেইলস্ট্রোম তখন পাগলের মতো হাসছে নিজের শেষ চালটা সফল হতে দেখে।
ভ্যালেরিয়া শেষবারের মতো জাভিয়ানের হাতটা একটু চেপে ধরল। ওর দৃষ্টি তখন ঘোলাটে হয়ে আসছে। সে ধুঁকতে ধুঁকতে বলল, “তান্বী… তান্বী ওই গাড়িতে আছে। ওকে… আগলে রেখো। আমার দায়িত্ব… শেষ।”
জাভিয়ান অবিশ্বাসের চোখে ওর আহত দেহের দিকে তাকিয়ে রইল।
ভ্যালেরিয়ার আহত দেহটা জাভিয়ানের বাহুবন্দি অবস্থায় রক্তে ভেসে যাচ্ছে। এই বীভৎস দৃশ্য দেখে
ইসাবেলা উন্মত্তের মতো দৌড়ে আসলেন।
তিনি দুই হাতে মেইলস্ট্রোমের কলার চেপে ধরে আর্তনাদ করে উঠলেন, “মেইলস্ট্রোম! একি করলে তুই
মি? তুমি কি একবারও ভাবলে না ও তোমার বোন ছিল? নিজের মানুষের ওপর গুলি চালাতে তোমার হাত কাঁপল না?”
মেইলস্ট্রোমের চোখে তখন কোনো অনুশোচনা নেই, বরং সেখানে এক পৈশাচিক আনন্দ খেলা করছে। সে তার মায়ের হাতের বাঁধন এক ঝটকায় খুলে দিয়ে তাচ্ছিল্যের সুরে বলল, “বোন? না মম, ও কোনো বোন নয়, ও ছিল আমার মহাশত্রু। আমার প্রতিটি কাজে বাধা দেওয়া আর আমার বিরুদ্ধে চরবৃত্তি করাই ছিল ওর কাজ।”
সে এক পা এগিয়ে এসে জাভিয়ানের কোলে পড়ে থাকা ভ্যালেরিয়ার দিকে ঘৃণাভরে তাকিয়ে পুনরায় বলল, “তাছাড়া ও আমার সাথে বেইমানি করেছে। আর তুমি তো ভালো করেই জানো মম, বেইমানের শাস্তি মেইলস্ট্রোম কী দেয়। ও চেয়েছিল জাভিয়ানকে বাঁচাতে, আর অন্যকে বাঁচাতে গেলে নিজেকেই মরতে হয়—এটাই দুনিয়ার নিয়ম।”
মেইলস্ট্রোম একটু থেমে ক্রূর হাসল, “মেয়েদের এত আবেগ ভালো নয়। ছেলেদের প্রতি এত অবসেসড হতে হয় না। ও জাভিয়ানের জন্য পাগল ছিল, তাই আজ ওর এই পরিনতি, আমার সাথে বেঈমানির ফল পেয়েছে ও এটাই ডিজার্ভ করে।”
জাভিয়ান এতক্ষণ পাথর হয়ে ছিল, কিন্তু মেইলস্ট্রোমের এই কথাগুলো ওর ভেতরের আগ্নেয়গিরিকে জ্বালিয়ে দিল। ও ভ্যালেরিয়ার দেহটা আলতো করে মাটিতে শুইয়ে দিয়ে উঠে দাঁড়াল। ওর চোখের মণি এখন টকটকে লাল। ইসাবেলা স্তম্ভিত হয়ে নিজের ছেলের দিকে তাকিয়ে রইলেন; তিনি আজ উপলব্ধি করলেন যে তিনি কোনো সন্তান নয়, বরং এক রক্তপিপাসু দানবকে জন্ম দিয়েছেন।
মেইলস্ট্রোম তখনো হাসছে, কিন্তু সেই হাসির স্থায়িত্ব খুব বেশিক্ষণ হলো না। জাভিয়ান কোনো কথা না বলে বাঘের মতো মেইলস্ট্রোমের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। পুলিশের ঘেরাও থাকা সত্ত্বেও জাভিয়ানের এই আক্রমণের গতি এত তীব্র ছিল যে কেউ ওকে আটকানোর সুযোগই পেল না।
চলবে…….
(পরবর্তী পর্ব পেতে অবশ্যই ৩ হাজার রিয়েক্ট কমপ্লিট করবেন)
Share On:
TAGS: ডিজায়ার আনলিশড, সাবিলা সাবি
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৯
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২৫
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৬
-
ডিজায়ার আনলিশড গল্পের লিংক
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৯
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১০
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ৮
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১২
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ১৮
-
ডিজায়ার আনলিশড পর্ব ২২