ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
০৯
দুপুর ১টা ৩৩ মিনিট। গ্রীষ্মের সূর্যটা যেন আগুন ঢালছে। তপ্ত রোদে গা পুড়ে যাওয়ার ভাব। শহর ছাড়িয়ে একটু দূরে, হাইওয়ের ওপর মারিদদের গাড়িটা ছুটে চলেছে অদূরে গন্তব্যে। গাড়ির পেছনের সিটে বসে মারিদ। মনোযোগ তার হাতে ধরা ফাইলের ম্যাপে। মারিদের কুঁচকানো কপালের বলিরেখা বলে দিচ্ছে সে এই মুহূর্তে কতটা ডুবে আছে হাতের ফাইলে। সামনের সিটে ড্রাইভারের পাশাপাশি বসে হাসিব। মারিদের এই অসময়ে অফিস থেকে বেরোনোর কারণ, তাদের কনস্ট্রাকশন প্রোজেক্টের জন্য আরও কিছু জমি প্রয়োজন। স্থানীয় কিছু লোক তাদের জমি বিক্রি করতে ইচ্ছুক। তাই মারিদ নিজেই সরাসরি তাদের সঙ্গে কথা বলবে একবার। তারপর বাকিটা হাসিব সামলে নেবে। আপাতত মারিদ তার কনস্ট্রাকশন সাইটের অফিসে যাবে। সেখানে মারিদের অপেক্ষায় ম্যানেজার লোকগুলোকে নিয়ে বসে। মিটিং শেষে মারিদ একবার ধানমন্ডি যাবে বাবার অফিসে। বিগত দুদিনে মারিদ সেদিকে যাইনি একবারও। মারিদ দেশে এসেছে আজ দুদিন হলো। বিগত দুই দিনে মারিদ লোক লাগিয়ে চিঠির খোঁজ করেছিল। মারিদ নিজেও বাংলাদেশে ফিরে ছুটে গিয়েছিল ঢাকা মেডিকেল কলেজের চত্বরে। সেখানে খালি ডাকবাক্স পেয়েছে। অপরিচিতার কোনো চিঠি মেলেনি মারিদের। তবে মারিদের ধারণা মতে সেখানে অপরিচিতার একটা চিঠি থাকার কথা ছিল। অপরিচিতা শেষ ফোনকলের পাঁচ দিন আগে মারিদ চিঠি পাঠিয়েছিল অপরিচিতাকে। সেই সুবাদে এখন ডাকবাক্সে অপরিচিতার চিঠি থাকার কথা। অথচ নেই। তার মানে অপরিচিতা মারিদের দেওয়া চিঠি পেয়েও সে চিঠির উত্তরে মারিদকে চিঠি লেখেনি। অপরিচিতা মারিদকে কেন চিঠি লেখেনি সেটা মারিদ জানে না তবে মারিদের ধারণা মতে মারিদের চিঠি নেওয়ার জন্য অপরিচিতা শেষ পাঁচ দিনের মধ্যে কোনো একদিন এসেছিল ডাকবাক্সের নিকট। এজন্য মারিদ ডাকবাক্সের আশেপাশে সকল বিল্ডিং কিংবা রাস্তায় কোনো রকম সিসি ক্যামেরা আছে কিনা সেটা জানার জন্য লোক লাগিয়েছিল। আর এতে মারিদের নিকট খবর আসল ডাকবাক্সের আশেপাশে বিল্ডিংয়ে কিংবা রাস্তায় কোনো রকম সিসি ক্যামেরা নেই। তার মানে অপরিচিতা জেনে-বুঝে খুব কৌশলে মারিদকে এমন একটা জায়গায় চিঠি পাঠাতোর বাছাই করল যেখানে পূর্ব থেকেই কোনো ক্যামেরা ছিল না। চাইলে মারিদ যাতে অপরিচিতার অবধি পৌঁছাতে না পারে সেই ব্যবস্থা করেই মেয়েটি মারিদের জীবনে এসেছিল।
দীর্ঘদিনের খোঁজাখুঁজিতে মারিদ অন্তত এতটা বুঝতে পেরেছে অপরিচিতা জেনে-বুঝেই মারিদের জীবনে এসেছে। অপরিচিতার উদ্দেশ্য কী ছিল মারিদ জানে না তবে এতটা বুঝেছে অপরিচিতা মারিদের জীবনে সত্যিকারের বসন্তের পাখি হয়েই এসেছিল। বসন্ত শেষে যেমন বসন্তের পাখি নিরুদ্দেশ হয়ে যায় ঠিক তেমনই অপরিচিতাও মারিদের জীবনে ক্ষণিকের জন্য এসে নিরুদ্দেশ হয়ে গেছে। মারিদ এতোদিনে বুঝতে পারছে অপরিচিতা খুব কৌশলে এতদিন মারিদকে ফ্যান্টাসি কথা বলে বলে নিজেকে গোপন রেখেছে মারিদ থেকে। মেয়েটা কে ছিল সত্যি মারিদ জানে না। আর না এটা বুঝতে পারছে অপরিচিতার লাস্ট কলটা আসলেই সত্যি ছিল নাকি মিথ্যা্? মারিদকে বলা ভালোবাসি কথাটাও কি অপরিচিতার ছলনা ছিল? মারিদের অপরিচিতা কি আসলেই ছলনাময়ী ছিল নারী? মারিদের সঙ্গে ভালোবাসার নাম করে বিশ্বাসঘাতকতা করল? অপরিচিতাকে ঘিরে মারিদের মনে অসংখ্য প্রশ্নের ঝড় বইল। অথচ একটা প্রশ্নেরও কোনো উত্তর নেই। মারিদ আদৌ কোনো প্রশ্নের উত্তর পাবে কিনা জানা নেই। আর না মারিদ জানতে চায়। মারিদ অপরিচিতাকে চায় না। আর না অপরিচিতা সংক্রান্ত কোনো প্রশ্নের উত্তর চায়। আজকাল মারিদের মন বিষিয়ে উঠছে অপরিচিতাকে ঘিরে।
দীর্ঘদিনের বিষাক্ত অনুভূতি থেকে মারিদ হঠাৎ সিদ্ধান্ত নিল সে আর অপরিচিতার খোঁজ করবে না। যে স্বেচ্ছায় হারিয়ে যায় তাকে মারিদের জীবনে দরকার নেই। মারিদ আলতাফ ভালো থাকতে জানে। সে আর যায় হোক মারিদের জীবনে অন্তত কোনো ছলনাময়ী নারী প্রয়োজন নেই। অপরিচিতা ছলনাময়ী। অপরিচিতা ইচ্ছাকৃতভাবেই মারিদের জীবন থেকে চলে গেছে সেজন্য মারিদও আর খুঁজবে না মেয়েটিকে। তীব্র জেদ থেকেই মারিদ অপরিচিতাকে ভুলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিল। সেজন্যে অপরিচিতা খোঁজে সিআইডির সকল তদন্ত বন্ধ করে দিল। মারিদের হঠাৎ সিদ্ধান্তে তনিমার লেখা চিঠিগুলোও সন্ধান করা আর হলো না। অথচ মারিদ চাইলেই চিঠির খোঁজে তনিমা অবধি পৌঁছাতে পারতো। মারিদের হঠাৎ জেদে ঘোলাটে রয়ে গেল অপরিচিতা আর তনিমার চিঠি। সবকিছু পিছনে ফেলে মারিদ শুধু নিজের কাজে মনোনিবেশ করল।
তারপর থেকে সবকিছু ঠিকঠাক চলছে। গম্ভীর মারিদকে আজকাল আরও গম্ভীর বদমেজাজি দেখাচ্ছে। কথায় কথায় হুটহাট রেগেও যাচ্ছে। এই আজ সকালে বাসা থেকে অকারণে রেগে না খেয়ে বেরিয়ে গেল। অফিসে পৌঁছে কাজে সামান্য ভুল হওয়ায় ম্যানেজারের সঙ্গে রেগে গেল। একটু আগে হাসিবের সঙ্গে রেগে গেল তারপর ড্রাইভারের সঙ্গে। মূলত মারিদের মন ভালো নেই বিদায় তার মেজাজটাও ভালো থাকছে না। আর এই বিষয়টা মারিদ নিজেই বুঝতে চাচ্ছে না। সে এক প্রকার জেদ নিয়ে অপরিচিতা থেকে দূরে সরতে চায়। এবার মারিদ কতটা সফল হবে কে জানে? আদৌ মারিদ অপরিচিতাকে ভুলতে পারবে কিনা সেটা সময়ের সাথে সাথে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়। আচ্ছা যায় হোক!
মারিদের গাড়ীটা চলছিল আপন গতিতে, এর মাঝে হঠাৎ, মারিদের চলন্ত গাড়িটা তীব্র হইচইয়ের শব্দে থেমে যেতে মারিদের মনোযোগে ব্যাঘাত ঘটল না, বরং সে তখনো ফাইলের পাতায় ডুবে।
হঠাৎ রাস্তায় গন্ডগোল হতে দেখে মারিদের ড্রাইভার রাশেদ গাড়ি থেকে নেমে সামনে এগিয়ে গেল পরিস্থিতি বোঝার জন্য। কিন্তু তার মিনিটখানেক পর রাশেদকে উত্তেজিত ভঙ্গিতে পুনরায় গাড়ির দিকে দৌড়ে আসতে দেখে হাসিব তৎক্ষণাৎ পিছনে বসা মারিদকে এক পলক দেখে সেও ঝটপট গাড়ি থেকে বেরোলো। গাড়ির মুখোমুখি হতে হতে রাশেদ হাঁপাতে হাঁপাতে হাসিবের উদ্দেশ্যে চিৎকার করে বলল,
‘ হাসিব ভাই! মারিদ স্যারকে তাড়াতাড়ি গাড়ি থেকে বের হতে বলেন। সামনে সুখ ম্যাডামের উপর কারা যেন হামলা করেছে! তাড়াতাড়ি আসেন। সুখ ম্যাডাম বিপদে।
গাড়ির কাচ নামানো থাকায় ড্রাইভার রাশেদের চিৎকার মারিদের কানেও পৌঁছাল। ড্রাইভার রাশেদ যখন দ্বিতীয়বার চিৎকার করবে তার আগেই মারিদ দক্ষ হাতে গলার টাই টেনে খুলে ছিটকে ফেলল গাড়িতে। গাড়ির দরজা ঠেলে বেরোতে বেরোতে প্যান্টে গোঁজা রাখা কালো শার্টটি টেনে কোমরের ওপরে ফেলতে ফেলতে এগিয়ে গেল গাড়ির পেছনের ডিকির দিকে। দক্ষ হাতে গাড়ির ডিকি খুলে তৎক্ষণাৎ হকিস্টিক নিয়ে দৌড়াল সেদিকে।
রাস্তার মাঝামাঝি একটা অ্যাম্বুলেন্স দাঁড়িয়ে। সেটাকে কেন্দ্র করেই চলছে দুই পক্ষের রক্তারক্তির লড়াই। আহত দলের মধ্যে সুখও একজন। আহত দলের পক্ষ নিয়ে সুখও জোরদার লড়াই করছে অ্যাম্বুলেন্সটিকে বাঁচাতে। সুখের হাতে মোটাতাজা একটা লাঠি। সেটা দিয়ে প্রহার করছে। ছোট মানুষ হওয়ায় সুখ যতটা পারছে ততটাই চেষ্টা করছে আক্রমণকারী হতে অ্যাম্বুলেন্সটাকে বাঁচাতে। এই অ্যাম্বুলেন্সে কী আছে সুখের জানা নেই। তবে রক্তাক্ত সুখের কপাল ফেটে মুখ, শরীর লাল লাল হয়ে আছে ততক্ষণে। গায়ের সাদা স্কুল ড্রেসটাও সেই রক্তে রঞ্জিত। মূলত লাঠিসোঁটা আর দা নিয়ে দশ-বারোজনের মতো ছেলেপেলে আক্রমণ চালিয়ে একজন মধ্যবয়স্ক লোক আর ড্রাইভারের উপর। সুখ এই রাস্তা দিয়ে যাওয়ার পথে যখন দেখল দশ-বারোজন ছেলেপেলে মিলে দুজন লোককে আঘাত করছে তখন সেও কোনো কিছু না ভেবেই অবুঝের মতোন ঝাঁপিয়ে পড়ে এই ছেলেগুলোর হাত থেকে আহত লোকগুলোকে বাঁচাতে। আর এতে রক্তারক্তির লড়াইয়ে আঘাতের শিকার সুখও হয়। পরিস্থিতি যখন বেগতিক। আক্রমণকারী ছেলেগুলো যখন সুখসহ বাকি দুজন লোকগুলোর উপরও চড়াও হয়ে পড়ছিল তখনই আশা আলো হয়ে উপস্থিত হয় মারিদ। দক্ষ হাতে হকিস্টিক তুলে মারিদ এলোমেলো আঘাত করতে লাগল আক্রমণকারী ছেলেগুলোর উপর। মারিদের তেজপূর্ণ হকিস্টিকের ভারি এতটাই প্রহার ছিল যে উপস্থিত ছেলেগুলোর কেউ পাল্টা আঘাত করার মতো সুযোগই পাচ্ছিল না মারিদকে। এর মধ্যে মারিদের পিছন পিছন হাসিব আর রাশেদও একই ভঙ্গিতে হকিস্টিক নিয়ে আক্রমণ চালাল ছেলেগুলোর উপর। চোখের পলকে হইচই কলরব শুরু হয়ে গেল চারপাশে।
জনমানবহীন রাস্তায় ধীরে ধীরে ততক্ষণে গাড়ির ভিড় বাড়তে লাগল। আশেপাশের মানুষ গাড়ি থেকে নেমে চারপাশে ভিড় জমাতে লাগল। ঢাকা শহরের মতো জায়গায় কেউ কারও সাহায্য এগিয়ে আসে না। বরং সবাই দাঁড়িয়ে তামাশা দেখে। এই মুহূর্তেও সকলে সার্কাস দেখার মতো ভিড় জমাচ্ছে চারপাশে। কেউ কেউ বা হাতের ফোনে ছবি ভিডিও করছে তারপরও কেউ সাহায্যের জন্য এগিয়ে আসছে না।
মারিদদের হঠাৎ আগমনে আঘাতপ্রাপ্ত লোকটাও কেমন তেজি দেখাল। শক্তিবলে পালোয়ান টাইপের লোকটা এতক্ষণ গায়ের জোরে একা গুন্ডাগুলোকে সামলাচ্ছিল ড্রাইভারকে নিয়ে। এর মাঝে প্রথমে সুখ তারপর মারিদের আগমনে তিনি সাহস পেয়ে হৈহৈ চিৎকার করে আক্রমণকারী গুন্ডাগুলোকে পিটাতে লাগল। যেন কোনো চির শত্রুতার ক্ষোভ মেটাচ্ছেন ছেলেগুলোকে পিটিয়ে। হাসিব মধ্যবয়স্ক লোকটার তেজ দেখে কয়েক মুহূর্তের জন্য সে মারামারি রেখে কেমন হতবাক হয়ে দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু সামনে থেকে যকন একটা ছেলে পাল্টা আক্রমণ করল তখনই হাসিব পাল্টা প্রহার করে। রক্তারক্তির মাঝে আক্রমণকারী ছেলেগুলো মারিদদের আক্রমণের প্রহার সামলে উঠতে না পেরে একেকজন এলোমেলো দৌড়াল প্রাণ বাঁচাতে। একে একে ছেলেগুলো পালিয়ে যেতেই তৎক্ষণাৎ মারিদের শক্তপোক্ত হাতের থাপ্পড় পড়ল সুখের গালে। আঘাত পাওয়া শরীরে পুনরায় আঘাত পেতেই সুখের মাথা ঝিম মেরে উঠল চোখে অন্ধকার দেখে। কী হয়েছে সুখের সাথে সেটা বুঝে উঠার আগেই পুনরায় থাপ্পড় পড়ল সুখের অপর গালে। আর এতে করে তৎক্ষণাৎ রাস্তায় ছিটকে পড়তেই সুখ ঝরঝর করে কেঁদে উঠল মারিদের ভয়ে। ভয়ার্ত গলায় আওড়াল “ভাই! ভাই” করে।
সুখের ডাকে রাগান্বিত মারিদ দাঁতে দাঁত পিষে ফের সুখের দিকে তেড়ে যেতে চাইলে পাশ থেকে হঠাৎ কেউ মারিদের হাতটা টেনে তাঁর কপাল ঠেকিয়ে ঝরঝরে করে চোখের পানি ফেলে বলতে লাগল…
‘আল্লাহ আপনার সহায়ক হোক বাবা। আজ আপনি আমার আম্মাজানের জীবন বাঁচাইছেন। আমার অনেক বড় উপকার করেছেন। আল্লাহ আপনার সহায় হোক। সহায় হোক।
হঠাৎ হাতের টানে মারিদ নত মস্তিষ্কের লোকটার দিকে তাকাল। ক্ষিপ্ত মেজাজে লোকটার দিকে তাকিয়ে মারিদ কপাল কুঁচকাল। বেশ বলিষ্ঠবান মধ্যবয়সি একটা লোক। গায়ে রঙ শ্যামবর্ণের হলেও লোকটা দেখতে বেশ শক্তপোক্ত পালোয়ান টাইপ ছিল। গায়ের সাদা ফতুয়া সঙ্গে সাদা লুঙ্গি পরা। মারামারিতে লোকটার মাথা থেকে পা অবধি যেন লাল রক্তে রঞ্জিত হয়ে আছে। শরীরে আঘাতগুলোও যেন তাজা রক্তে মাখোমাখো। মারিদের হাতের ওপর লোকটার রক্তাক্ত হাত দুটোও যেন থরথর করে কাঁপছে। এর মাঝে লোকটা কথাগুলো বলতে বলতে মারিদের হাতটা নিজের দু-চোখে মুখে লাগিয়ে চুম্বন করে উঠে দাঁড়াল। পিছন ঘুরে তৎক্ষণাৎ সুখকে রাস্তা থেকে টেনে তুলে দাঁড় করাল। ক্রন্দনরত সুখের মাথায় লোকটার রক্তাক্ত কম্পিত হাতটা রাখল সযত্নে। স্নেহময় মমতায় লোকটা সুখের উদ্দেশ্যে বলল…
‘আজ আপনি আমার জন্য ফেরেশতা হয়ে এসেছেন আম্মা। আল্লাহ আপনার মঙ্গল করুক। এই বাবা আপনারে দোয়া করে যায়। আপনি ভালো থাইকেন। আল্লাহ আপনারে হেফাজতে রাখুক।
‘ মেম্বার সাব তাড়াতাড়ি আসেন। আমাদের আম্মাজান জানি কেমন করছে। তাড়াতাড়ি আসেন।
অ্যাম্বুলেন্সের ড্রাইভার লোকটার হাঁক ছাড়া ডাকে তৎক্ষনাৎ মধ্য বয়স্ক লোকটা অস্থির, উত্তেজিত হয়ে আতঙ্কিত ভঙ্গিতে দৌড়াল অ্যাম্বুলেন্সের দিকে। অথচ মারিদ, হাসিব, রাশেদ, সুখের সঙ্গে রাস্তার মানুষজনও ভিড় জমে দাঁড়িয়ে লোকটার দিকে তাকিয়ে। রক্তাক্ত লোকটা যে অ্যাম্বুলেন্সের কাউকে নিয়ে আতঙ্কিত সেটা উপস্থিত সকলেরই বোধগম্য হলো। এর মাঝে রক্তাক্ত লোকটা দৌড়াতে দৌড়াতে ঝরঝর করে চোখের পানি ছেড়ে আওড়াতে লাগল….
‘আপনার কিচ্ছু হইব না আম্মাজান। আপনার আব্বা এখনো বাঁইচা আছে। কেউ আপনারে নিতে পারব না আমার থেইকা। আমি আপনারে বাঁচামু। আপনি বাঁচবেন আম্মাজান। আপনি বাঁচবেন। আপনারে বাঁচতেই হইব।
সবকিছু ধোঁয়াশা আর ঘোলাটে রেখে লোকটা দৌড়ে চলে গেল অ্যাম্বুলেন্স করে। আপনজন হারানোর হাহাকার বুঝি এমনই হয়। সুখ মারিদের থাপ্পড় খেয়ে যাও এতক্ষণ কাঁদছিল কিন্তু অপরিচিত লোকটার কথায় সুখের কান্না থেমে যায়। শক্তপোক্ত লোকটার শরীরের অসংখ্য আঘাতের চিহ্ন। পা থেকে মাথা অবধি লোকটার শরীর রক্তে মাখোমাখো। তখন সুখ না বুঝে এই হামলায় ঢুকে পরেছিল গুন্ডাগুলোর থেকে এই লোকগুলোকে বাঁচাতে। অথচ হামলাকারীরা ছেলেগুলোর কেউ সুখের উপর তেমন আক্রমণ করছিল না বরং ছেলেগুলোর সকলেই সুখকে বারবার ঠেলে ফেলে অ্যাম্বুলেন্সের দিকে যাচ্ছিল। হামলাকারী ছেলেগুলোর উদ্দেশ্যই ছিল অ্যাম্বুলেন্সকে ঘিরে। যার রেশ টেনে ছেলেগুলো বারবার এই মধ্য বয়স্ক লোকটাকে আঘাত করছিল। যাতে লোকটা অ্যাম্বুলেন্সের সামনে থেকে সরে যায় আর ওরা অ্যাম্বুলেন্সটাকে নিয়ে চলে যেতে পারে। এমনটা সুখের মনে হলো। এর বাহিরের আসল কাহিনি কী হতে পারে সেটা সুখ জানা নেই। তবে সুখ অল্প ঝলকে দেখেছে এই অ্যাম্বুলেন্সে ভিতরে একটা শরীর মৃত্যু’লাশের মতোন পরে আছে মুখে অক্সিজেন মাস্ক লাগিয়ে। সিটের বাহিরে লম্বা চুলের বেনি পরে থাকতে দেখে সুখ বুঝেছে এই দেহটি কোনো মেয়ের হবে। হয়তো এই লোকটার মেয়ে হবে আর তাকে ঘিরে এই হামলাগুলো হয়েছিল এতক্ষণ। সুখের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনার মাঝেই হাতে টান পড়তেই সুখ হোঁচট খেয়ে পরতে গিয়েও নিজেকে সামলে নেয়। মারিদের হাঁটা গতির সঙ্গে পা মেলাতে গিয়ে ছোট সুখ এক প্রকার দৌড়াতে লাগল। রাগান্বিত মারিদের রাগ বুঝে চট করে মিথ্যা বলে বলল…
‘ভাই আমার কোনো দোষ নেই। আমি স্কুল থেকে বাড়িতে যাচ্ছিলাম তখন পথ হারিয়ে এই রাস্তায় চলে এসেছি, বিশ্বাস করো আমি সত্যি বলছি।
সুখের মিথ্যায় মারিদ দাঁতে দাঁত পিষে সুখকে এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে ফেলে গাড়ি উপর। সুখ মারিদের গাড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে দাঁড়াতে দাঁড়াতে মারিদের রাগান্বিত মুখটার দিকে তাকিয়ে শুকনো গলায় ঢোক গিলে ঠোঁট ভিজাল। দ্বিতীয় মিথ্যাটা মারিদকে কী বলবে সেটা ভেবেও নিল। কিন্তু চতুর মারিদ চট করে সুখের বলা মিথ্যাটা ধরে শক্ত চোয়ালে বলল…
‘বেয়াদবের বাচ্চা আর একবার মিথ্যা বলবি তাহলে গাড়ি চাকার সঙ্গে বেঁধে বাসায় নিয়ে যাব।
মারিদকে ভয়ংকর রেগে যেতে দেখে সুখ আর মিথ্যা বলতে চাইল না। মারিদকে মিথ্যা বলে পারে না সুখ। মারিদ কেমন চট করে সুখের সবগুলো মিথ্যা ধরে ফেলে। তাই এটা সেটা বলে বুঝাতেও পারে না। এজন্য সুখ মারিদ বাদে বাড়িতে কাউকে ভয় পায় না আর। একমাত্র বড় ভাই মারিদকেই সুখ ভীষণ ভয় পায়। চুন থেকে পান খসতে মারিদের তোপে মুখে পরতে হয় সৈয়দ বাড়ির সকলকে। এমনকি সুখের বাপ-চাচারাও মারিদকে খুব সমীরণ করে চলে। সুখ রিফাত, রাদিলকে যা-ও একটু ঠেঙ্গিয়ে চলতে পারে কিন্তু মারিদের সামনে নাক সোজা হয়ে চলতে হয় সুখের। এখন আবার সুখ স্কুল থেকে এতো দূরে ঢাকার বাহিরে বান্ধবীদের সঙ্গে চলে এসেছে একা ঘুরতে। সেই বান্ধবীদের ভালো মনে হয়নি বলে সুখ ওদের ফেলে একা একা বাড়ি ফিরতে গিয়ে রাস্তায় মারামারিতে জড়িয়ে কপাল, হাত, শরীর ফাটিয়ে বসে আছে এটা দেখে মারিদ ভাই নিশ্চয়ই চুপ থাকবে না। বরং মারিদ সুখকে আস্ত চিবিয়ে খাওয়ার কথা। অপরাধী সুখ মারিদের রাগের আভাস পেয়ে কথা ঘোরাতে চেয়ে আমতা আমতা করে বলল…
‘ভাই অ্যাম্বুলেন্সে একটা মেয়ে ছিল অক্সিজেন মাস্ক লাগানো। মেয়েটা খুব অসুস্থ ছিল জানো?
সুখের কথায় ক্ষিপ্ত মারিদকে আরও ক্ষিপ্ত হতে দেখে সুখ বুঝল মারিদের সঙ্গে কথা ঘুরিয়ে কাজ হবে না। সেজন্য সরাসরি মূল প্রসঙ্গে আসল। কিন্তু দাদা সৈয়দ শাহের নামে মিথ্যা বলে সুখ ফের বলল….
‘ভাই এবার আমি সত্যি বলছি, আমাকে বিশ্বাস করো। স্কুলে আসার সময় দাদাভাই আমাকে বলছিল সুখ, রাস্তাঘাটে কোনো অসহায় মানুষ দেখলে নেক মনে সাহায্য করবি তাদের। এজন্য আমি নেক মনে মারামারি করতে গিয়েছিলাম। এই যে আঘাতগুলো দেখছো এইগুলো হচ্ছে নেকির ফল। এখন তুমি বলো আমার এখানে কোনো দোষ আছে? আমি তো নির্দোষ নিষ্পাপ। আসল দোষী যদি কেউ হয়ে থাকে তাহলে সেটা দাদাভাই হবে। তুমি বরং আমাকে ছেড়ে বাসায় গিয়ে দাদাভাইকে প্রশ্ন করো, দাদাভাই কেন আমার মতোন ছোট মানুষকে এসব ভুলবাল শিক্ষা দিচ্ছে। আজ ওনার একটা ভুল শিক্ষার জন্য যদি আমি বিপথে যেতাম তাহলে তুমি তোমার আদুরের বোন হারাতে না ভাই বলো?
সুখের কথায় মারিদের পিছনে থাকা হাসিব ফিক করে হেসে ফেলল। বেচারা হাসতে চায়নি। অনেক চাপাচাপি করেও নিজের হাসি আটকে রাখতে পারেনি সুখের কথায়। হাসিবের হাসিতে সুখ পিছনে তাকাতে মারিদ রক্তিম চোখে হাসিবের দিকে তাকাল। হাসিব মারিদের রাগান্বিত দৃষ্টি বুঝে চট করে ‘সরি স্যার, বলে গাড়িতে গিয়ে বসল। ভাই-বোন দুটোই ডেঞ্জারাস। বলা যায় না কখন না জানি হাসিবকে ফাঁসিয়ে দেয় কোনো অযুহাতে। হাসিবের পিছন পিছন ড্রাইভারও গাড়িতে ওঠে বসতে সুখ ফের মায়াময় কণ্ঠে মারিদকে ডাকতে চাইল…
‘ভাই শোনো।
সুখের ভণ্ডামিতে মারিদ গলল না। বরং আগে নেয় রাগে চোয়াল শক্ত করে বলল…
‘চুপ বেয়াদবের বাচ্চা! আমি এখানে না আসলে কী হতো তোর সাথে ধারণা আছে? সবকিছুতে পাকনামি করা লাগে তোর? মারামারি করতে গেলি কেন? সাহাস বেড়েছে?
‘ ভাই মারামারি করতে চাইনি। কিন্তু লোকগুলো সত্যি বিপদে পরেছিল।
মারিদ দাঁতে দাঁত পিষে বলল…
‘ বিপদে না মরে যাক এতে তোর কি? তোরে কে বলছে রাস্তায় গুন্ডামী করতে?
‘ সরি ভাই।
নত মস্তিষ্কে সুখ সরি বলতেই মারিদ ফের বলল…
‘ গাড়ি কই তোর?
মারিদের রাগে সুখ অপরাধী নেয় বলল…
‘গাড়ির ইঞ্জিনে কী জানি হয়েছে। সেজন্য ড্রাইভার আঙ্কেল গাড়ি নিয়ে গ্যারেজে গেছে। আমি একা একাই বাড়ি যাচ্ছিছিলাম।
‘এটা তোর বাড়ির যাওয়ার রাস্তা?
‘না।
‘তাহলে এই রাস্তায় আসলি কেন?
‘বান্ধবীদের সাথে এসেছিলাম ঘুরতে।
সুখের কথায় মারিদের খিঁচড়ে যাওয়া মেজাজটা আরও চটে গেলে সুখ সেটা বুঝে ফের মিথ্যা বলে বলল…
‘ভাই আমার মাথাটা কেমন ঘুরছে। শরীরটাও খারাপ লাগছে। তুমি আমাকে না বকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাও তাড়াতাড়ি। আমি আর দাঁড়াতে পারছি না ভাই। ইশ পড়ে যাচ্ছি। আমাকে ধরো ভাই। ধরো।
কথাগুলো বলতে বলতে সুখ নাটকীয় ভঙ্গিতে পরে যেতে নিতে মারিদ সুখের বাহু চেপে ধরল। রাগান্বিত মারিদের রাগটা না কমলেই সুখের অসুস্থতা কথা চিন্তা করে আর শাসাল না সুখকে। বরং যত্ন করে সুখকে নিয়ে গাড়িতে উঠে বসল। সুখের মাথাটা নিজের কাঁধে চেপে হাসপাতালের উদ্দেশ্য গাড়ি ছুটাল। একটা মাত্র বোন মারিদের। বোনের অসুস্থতা নিয়ে ছেলেখেলা নয়। কিন্তু সুখ অ্যাম্বুলেন্সের কাকে বাঁচাতে নিজেকে রক্তাক্ত করল। লোকগুলোই বা কে ছিল?
[ আপনারা নায়িকা কে সেটা জানতে চাচ্ছেন সেটার জন্য আপাতত অপেক্ষা করুন। গল্পের কাহিনিটা ধারাবাহিক ভাবে এগোচ্ছে। আপনারা নিজেই বুঝতে পারবেন গল্পের নায়িকা কে?
আর হ্যাঁ গল্পের ভালো-মন্দ রিভিউ অবশ্যই চাই।]
চলিত…
[ বানান ভুল ম্যানশন করবেন কমেন্টে]
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০