ডাকপ্রিয়র চিঠি
লেখিকা:_রিক্তা ইসলাম মায়া
০৬
দুপুর বারোটা। সৈয়দবাড়ি জুড়ে তোড়জোড় চলছে দুপুরের আয়োজনে। হাতে হাতে কাজ করছেন সৈয়দ বাড়ির তিন বউ। সালমা সৈয়দ, ফাতেমা সৈয়দ, মুনিয়া সৈয়দ। আজ শুক্রবার, তাই বাড়িতে বাচ্চাকাচ্চা সহ সকলেই উপস্থিত। মারিদের বাপ-চাচারা তিনজন, সকলেরই বউ-বাচ্চা নিয়ে আলাদা আলাদা সংসার থাকলেও, তিন পরিবার আজও একত্রে বাস করে। আর এর কারণ অবশ্য বয়স্ক সৈয়দ শাখ। তিনি জীবিত অবস্থায় তিন ছেলেকে নিয়ে একত্রে বসবাস করতে চান বলেই আজও সৈয়দ পরিবারকে ভাঙতে দেখা যায়নি। মারিদদের গুলশানের বাড়িটি মোট ছয়তলা ভবনের। প্রথম তিন ফ্ল্যাট একত্রে মারিদের বাপ-চাচারা ব্যবহার করলেও, বাকি ওপরের তিন ফ্ল্যাট ভাড়া দেওয়া। এই বাড়ির ভিটেমাটিতে মারিদের দাদা সৈয়দ শাখের পুরোনো একটা বিল্ডিং ছিল, সেটা এক যুগ আগে ভেঙে নতুনভাবে গড়েছেন মারিদের বাপ-চাচারা। এখন ছেলে-মেয়ে, নাতি-নাতনিদের নিয়েই ছেলেদের বানানো বাড়িতে থাকছেন সৈয়দ শাখ। চৌদ্দ সদস্যের মিলিত যৌথ পরিবার হলো সৈয়দ পরিবার। এখানে আত্মীয়তার মেলবন্ধন দেখা যায় বেশ। সপ্তাহজুড়ে থাকে সকলের ব্যস্ততা, কিন্তু শুক্রবার এলেই যেন সৈয়দ বাড়িতে ঈদের আমেজ পড়ে। সেদিন বাড়িতে ছোট-বড় সবাইকে পাওয়া যায়। বাড়ির ছেলেরা অবশ্যই দুপুরের নাগাদ খাওয়া দাওয়া শেষে যার যার কাজে বেরিয়ে যায়। তবে শুক্রবার সকালটা সবাই বাসাতেই থাকে।
তবে এখন সময় দুপুর বারোটা গড়িয়ে একটা পয়তাল্লিশের ঘরে। বাড়ির ছেলেরা সবাই ততক্ষণে মসজিদে গেছেন জুমার নামাজে। সৈয়দ বাড়ির তিন গিন্নি রান্না সেরে যার যার ঘরে নামাজ পড়ছেন। বাকি ছোট বড় সদস্যরা যারযার ঘরেই আছে। খানিক বাদে দুপুরের খাবারের জন্য নিচে নামবে। তবে এর মাঝে বসার ঘরে বসে থাকতে দেখা গেল সৈয়দ বাড়ির ছোট মেয়ে পাখিকে। সঙ্গে অবশ্য তার চাচাতো ভাই রাতুলও হয়েছে। দুজনই মনোযোগ দিয়ে চিত্র অঙ্কন করছে। রং-তুলির সব রংগুলো রাতুলেরই। পাখি রাতুলকে সাহায্য করার বাহানায় সেও চিত্র আঁকতে বসেছে। এর মাঝে কোথা থেকে রাতুলের যমজ ভাই রাদ হাজির হলো। হাতে যান্ত্রিক ফোন। সে পাখিকে হাতের ফোনটি এগিয়ে দিয়ে কিছু বলবে, তার আগেই হঠাৎ ‘ঠাস’ শব্দ হলো। শব্দটি কিসের সেটা বুঝেও পাখি শব্দটি শুনতে পায়নি এমন ভান করে এড়িয়ে যেতে চেয়ে চিত্র আঁকায় মনোযোগ বাড়িয়ে দিল। অথচ হঠাৎ বায়ু দূষণে রাদ কিছু বলবে, তার আগেই পাশ থেকে রাতুল নাক চেপে পাখির উদ্দেশ্যে বলল..
‘ ছিঃ, কী গন্ধ! তুমি পা*দ দিয়েছো পাখি আপু?
রাতুলের কথায় তৎক্ষণাৎ অস্বীকার করে পাখি বলল…
‘চুপ! এসব ছোটলোকি পা*দ আমি দিই না। রাদ দিয়েছে।
দোষ রাদের কাঁধে চলে যেতেই রাদ এক হাতে ফোন ধরে অন্য হাতে নাক চেপে তাড়াহুড়োয় বলল…
‘আমি দিইনি। আমি দেইনি। তুমি দিয়েছো পাখি আপু।
বয়সে রাদ-রাতুল দু’জনই পাঁচ বছর পেরিয়ে সবে ছয় বছর পরল। ওদের ভুল বুঝিয়ে পাখি বলল….
‘পা*দে আমার নাম লেখা ছিল দেখেছিস?
‘না।
‘তাহলে আমি দেইনি। এসব ছোটলোকি পা*দ আমি দিই না, বুঝলি?
পাশ থেকে রাতুল নাক চেপে কৌতূহল নিয়ে বলল…
‘তাহলে তুমি বড়লোকী পা*দ দাও আপু?
‘হ্যাঁ।
কথাটা বলেই ফের শব্দ হলো। এবারও একই কাজটা পাখির দ্বারাই হলো। পাখির কথায় সবেমাত্র রাতুল নাক থেকে হাত ছেড়েছিল। পুনরায় একই কাজ করতে ছোট রাতুল ফের নাক চেপে কিছু বলবে, তার আগেই রাদ পাখির সামনে দাঁড়িয়ে নাক চেপে চেপে বলল….
‘ছিঃ, কী গন্ধ! কী গন্ধ!
রাদের কথায় পাখি খুব স্বাভাবিকভাবে চোখ তুলে এক পলক রাদকে দেখে পুনরায় কাগজে ছবি আঁকায় মনোযোগ দিল। ছোট ভাইদের সামনে এমন ঠুসঠাস শব্দ করাটা অস্বাভাবিক কিছু না। বরং যৌথ পরিবারে ছোট ভাই-বোনদের সামনে এমন ঠুসঠাস শব্দ করাটা স্বাভাবিক ব্যাপার। পাখির সামনে তো পাখি বোনেরা করে। তাহলে পাখি কেন করবে না? পাখি কাগজে রঙ লাগাতে লাগাতে ছোট দুই ভাইয়ের উদ্দেশ্যে ছন্দ মিলিয়ে বলল….
‘পাদ এসেছে যায়, পাদ দিয়েছি তাই।
পা*দ নাই যার, পোড়া কপাল তার।
চিত্র অঙ্কন ছেড়ে রাতুল নাক চেপে দৌড়ে পালাতে চাইলে পাখি চট করে রাতুলের হাত চেপে ধরলে ছোট রাতুল পাখির থেকে নিজেকে ছাড়াতে চেয়ে নাক চেপে বলল:
‘পাখি আপু ছাড়ো। অনেক গন্ধ।
পাখি জোরপূর্বক রাতুলকে নিজের পাশে বসিয়ে দিতে দিতে বলল:
‘আরে, এইগুলো গন্ধ না। গন্ধ না। ভিটামিন, ভিটামিন! আমি ভিটামিন ছড়াচ্ছি, বুঝলি? বস গাধাদল কিচ্ছু বুঝে না।
‘তোর পেটে আর কী কী ভিটামিন আছে শুনি?
হঠাৎ কারও কথায় পাখি চমকে ওঠার মতোন বসে গেল যখন ফোনের ওপাশে ভিডিও কলে রাদিলকে দেখল। রাদ এক হাতে নাক চেপে অন্য হাতে ফোনটা পাখির দিকে এগিয়ে রেখেছে। মূলত সে এখানে ফোনটা নিয়েই এসেছিল পাখিকে দিতে, কিন্তু এর মাঝে পাখির হঠাৎ বায়ু দূষণে সে ফোনের কথা বলতে ভুলে যায় এক মুহূর্তের জন্য। পাখি থমথমে মুখে ফোনের দিকে তাকাতেই রাতুল নাক চেপে দৌড়ে চলে যেতে যেতে ফের বলল, ‘তোমার ভিটামিনে পঁচা গন্ধ করে পাখি আপু। ইয়াক!
রাদও হাতের ফোনটা পাখির সামনে রেখে দৌড়ে চলে গেল একই কথা বলল। লজ্জায় থমথমে মুখে পাখিকে বসে থাকতে দেখে রাদিল দৃষ্টি ঘোরাল পাখির ওপর। প্রায় সাত আট মাস পর দেখছে এই মেয়েকে সে। দিনে টর্চ নিয়ে ঘুরলেও এই মেয়ের সন্ধান পাওয়া দুষ্কর। পাখি যেন পাখিই, চঞ্চলতার শেষ নেই। আর মিথ্যা? যেন জবানে জবানে রাখে এই মেয়ে। থমথমে পাখি আপত্তিকর পরিস্থিতি পরে বোকা হাসল। নিজেকে লজ্জার হাত থেকে বাঁচাতে চেয়ে বলল…
‘আপনি যেটা ভাবছেন সেটা কিন্তু ঘটেনি রাদিল ভাই। আসলে ব্যাপারটা হলো, আমি রং-তুলি করার সময় রঙের শিশিগুলো পরে একত্রে বেজে উঠল শব্দ করে। তারপর রংগুলোও মিশে যাওয়ায় কেমন একটা পঁচা পঁচা গন্ধ বের হচ্ছে বলে ওরা আমাকে দোষ দিচ্ছে। আসলে ওরা ছোট মানুষ তো, তাই ওরা বুঝতে পারেনি কোনটা বায়ু দূষণ আর কোনটা কী? তবে আপনি তো বড় মানুষ, আপনি বুঝবেন আসলে দোষটা আমার নয় রঙের।
পাখির মিথ্যা কথায় রাদিল সম্মতি দিয়ে বলল…
‘ আমি জানি তুই নিষ্পাপ। এবার যা, মারিদকে ফোনটা দিয়ে আয়।
রাদিলকে সম্মতি দিতে দেখে পাখি সহজ হয়ে বসল। তৎক্ষনাৎ বলল…
‘ভাই তো কাল থেকে বাসায় নেই রাদিল ভাই।
‘এসেছে একটু আগে। তুই হয়তো দেখিসনি। মারিদের রুমে ফোনটা নিয়ে যা। আমি কথা বলব।
পাখি ড্রইংরুমের ফ্লোরে বসে সোফার টেবিলে চিত্র আঁকছিল। রাদিলের ফোনটা হাতে নিয়ে পাখি ড্রইংরুম থেকে সিঁড়ির দিকে তাকাল। মারিদের রুমটা দোতলায় নয়, তিনতলায়। পাখি সিঁড়ি বেয়ে ওপরে যেতে হবে বলে অলসতা দেখাল। বলল…
‘রাদিল ভাই, আমার কোমরে ব্যথা। সিঁড়ি বেয়ে ওঠানামা করতে পারি না। তুমি বরং মারিদ ভাইয়ের ফোনে ফোন দাও কেমন। আমি রাখছি।
‘ তোরে ফোন দিছি যে তুই ফোন রাখবি? মারিদের ফোনে ফোন দিতে পারলে আমি তোকে বলতাম এখন? মারিদের ফোন ভেঙে গেছে। তুই ফোনটা নিয়ে যা পাখি।
মারিদকে ঘিরে ঘটে যাওয়া ঘটনা গুলো সৈয়দ পরিবারের কেউ জানে না। যদিও মারিদের বাবা-চাচারা মারিদের যশোরের যাওয়া ব্যাপারটা জানে তবে ওনারা সেটা বাড়িতে কাউকে জানেন নি সবাই টেনশন করবে বলে। তবে মারিদের সকালে জ্ঞান হারানোর ব্যাপারটাও পরিবারকে জানানো হয়নি। রাদিল কাল থেকে মারিদের সঙ্গে কথা বলতে ব্যাকুল হয়ে উঠেছে অথচ প্রতিবারই কোনো না কোনো সমস্যা হচ্ছে। এরমাঝে পাখি ফের বাহানা দিয়ে বলল…
‘আরেহ রাদিল ভাই, ডাক্তার বলেছে আমাকে টেনশন না নিতে।
‘ ফোনের সাথে টেনশনের কী সম্পর্ক?
‘ আছে অনেক সম্পর্ক আছে। তুমি বুঝবা না রাদিল ভাই। তুমি আগে চিকিৎসা করে দেখো আমার রোগের অভাব নাই।
পাখির কথায় রাদিল বিরক্তিতে কপাল কুঁচকাল। অনিহা শর্তেও প্রশ্ন করে বলল….
‘ কিসের রোগ তোর শুনি?
ভারি হতাশা গলায় পাখি একহাতে ফোন চেপে অন্য হাত গালে ঠেকিয়ে বলল…
‘ আমার কতো রোগ। রোগে শেষ নাই রাদিল ভাই। তুমি তো ডাক্তার মানুষ। আমাকে একটু ভালোভাবে দেখে বলোতো আমি ঘুমালে কেন চোখে দেখি না। খেলে কেন পেটে খিদে লাগে না। শুলে খালি অলসতা লাগে। সারাদিন ফোন চালাতে মন চাই। পড়তে ভালো লাগে না। ঘুরতে ভালো লাগে। আবার পড়াতে বসলে বান্ধবীদের সঙ্গে আড্ডা কথা মনে পরে। মাঝেমাঝে অকারণে মন খারাপ হয়ে যায় আমার। আমার এতো রোগের চিকিৎসা কি রাদিল ভাই তুমি বলো।
পাখির কথায় রাদিল বিরক্তি গলায় বলল…
‘তোকে বিয়ে দিলে ঠিক হয়ে যাবি।
কথাটা রাদিল এমনই বলল যেন পাখি লজ্জা পেয়ে আর কথা না বাড়ায় রাদিলের সঙ্গে। এতে পাখি রাদিলের ফোন মারিদকে দিয়ে আসবে। অথচ রাদিলের ভাবনার বিপরীতে গিয়ে পাখি চট করে রাদিলের কথার সম্মতি দিয়ে উৎফুল্লতায় বলল…
‘আমি তো সেটাই বলি রাদিল ভাই। আমাকে বিয়ে দিয়ে দাও। ঘরে একটা জামাই আসুক। কিন্তু তোমরাই তো সিরিয়াল ছাড়ছো না। আমার সিরিয়াল যে কবে আসবে আল্লাহ জানে। আচ্ছা রাদিল ভাই, তুমি সুফিয়া আপুকে বিয়েটা করে নাও না। তাহলে আমার সামনে দুটো সিরিয়াল কমে যাবে। করবে বিয়ে সুফিয়া আপুকে?
পাখির উৎফুল্লতার কথায় রাদিল কপাল কুঁচকাল। এই মেয়ে এখুনি বিয়ে নিয়ে ভাবছে? রাদিল তীক্ষ্ণ গলায় বলল…
‘ যৌতুক হিসেবে তুই থাকবি?
‘ যৌতুক?
‘হ্যাঁ। যৌতুক হিসেবে যদি তোর বাপ তোকে দেয়, তাহলে তোর সুফিয়া আপুকে বিয়ে করতে রাজি।
রাদিলের কথায় পাখি চট করে আপত্তি জানিয়ে বলল….
‘আমি তোমার সাথে যৌতুক হিসেবে যেতে পারব না রাদিল ভাই। আমার ডাক্তার মানুষ পছন্দ না। আমার তো আমাদের স্কুলের হ্যান্ডসাম টিচারকে পছন্দ। কী দারুণ দেখতে আমাদের স্যার!
বেশ অদ্ভুত ভাবে পাখির দিকে দৃষ্টি ঘুরাল রাদিল। তীক্ষ্ণ গলায় বলল….
‘তুই স্কুলে স্যার দেখতে যাস?
‘মালটা চোখের সামনে ঘুরলে দেখব না বলছ?
পরপর বেশ অনেক গুলো কথায় শোনল রাদিল পাখি থেকে। বাংলাদেশ থাকলে পাখি সচারাচর রাদিলের সামনে এতো কথা বলে না। আর না রাদিল কখনো পাখিকে সেই সুযোগ দেয় বলার। এই মেয়ে আজ এতো কথা রাদিলকে কেন শোনাচ্ছে সেটা বুঝতে পারছে না রাদিল। তবে কথাগুলো রাদিলের পছন্দ হয়নি। সেজন্য রাদিল বেশ শক্ত গলায় পাখিকে শুধিয়ে বলল….
‘তোর ভালোই উন্নতি হয়েছে পাখি। আমাকে ‘আপনি’ থেকে ‘তুমি’ ডাকছিস। স্যারকে পছন্দ করিস, সেটাও আমাকে জানাচ্ছিস। আমি দেশে আসলে এই সাহস থাকবে তো? নাকি সামনে আসবি না?
রাদিলের কথায় পাখি বেশ সাহস দেখিয়ে বলল…
‘আমি সৈয়দ বাড়ির মেয়ে। এসব ডাক্তার-টাক্তারে ভয় পাই না বুঝলে রাদিল ভাই।
কথাটা বলেই ‘টু টু’ শব্দে পাখির কলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেই রাদিল হাতের ফোনটার দিকে তাকিয়ে কপাল কোঁচকে। মেয়েটা আজ বেশি সাহস দেখাল না? আবার ‘আপনি’ থেকে সোজা ‘তুমি’তে চলে আসল। এত পরিবর্তন কবে হলো? রাদিল পিএইচডি ডিগ্রির অর্জনের জন্য লন্ডনে এসেছে আজ বছর দেড়েক হবে। তবে সাত-আট মাস আগে সে একবার বাংলাদেশে গিয়ে সপ্তাহ দশদিন ঘুরে এসেছিল। তারপর থেকে আর বাংলাদেশে যাওয়া হয়নি তার। এখন তার এক্সাম চলছে। দুটো বাকি আছে আর। এই দুটো এক্সাম শেষ হলে সে একেবারে বাংলাদেশে চলে যাবে। রিফাত গত বছরই পিএইচডি শেষ করে বাংলাদেশে ফিরেছে। রাদিলের কিছু ব্যক্তিগত কারণে সে এক বছর পর এসেছে পিএইচডি করতে। তবে সে যখন বাংলাদেশে এসেছিল, তখন পাখির সঙ্গে দেখা হয়েছিল; এরপর আর হয়নি। সৈয়দ বাড়ির বাকি সবার সঙ্গে রাদিলের ফোনে কথা হলেও পাখি, সুফিয়া, আফিয়া—এই তিন বোনের সাথে তার কথা হয় না কখনো। মূলত রাদিল ওদের এড়িয়ে যায়। কিন্তু মারিদের ফোন ভেঙে ফেলায় রাদিল তার ছোট মামি মুনিয়া—মানে রাদ-রাতুলের মা-এর কাছে ফোন দিয়েছিল মারিদের সঙ্গে কথা বলতে। কিন্তু মুনিয়া বেগমের অনুপস্থিতিতে রাদ ফোনে গেম খেলছিল বলে খুব স্বাভাবিকভাবে ছয় বছরের ছোট রাদ রাদিলের ফোনটা রিসিভ করে পাখিকে দেয়। তাই রাদিল আজ পাখিকে দেখতে পেল। তবে রাদিল মনে করেছিল রাদিলের এক বলাতে পাখি ফোনটা মারিদকে দিয়ে আসবে অথচ এত বলার পরও মেয়েটা মারিদকে ফোন দিল না, উল্টো এক্সট্রা সাহস দেখাল। আচ্ছা, মেয়েটা এত সাহস পেল কোথায়? পাখি চঞ্চল, কথায় কথায় মিথ্যা বলে—এটা সে জানে। কিন্তু ‘আপনি-তুমি’র মধ্যে প্যাঁচ লাগাল কেন মেয়েটা? কী চলে মেয়েটার মধ্যে?
~~
চিন্তিত রিফাত মারিদের খোঁজ না পেয়ে হাসপাতাল থেকে দৌড়ে এসেছে সৈয়দবাড়িতে। সিঁড়ি বেয়ে ওপরে ওঠার সময় ড্রইংরুমে তেমন কাউকে দেখতে পেল না কয়েক জন্য সার্ভেন্ড ছাড়া। তবে বাড়ির বাগানে পাখির সঙ্গে রাদ-রাতুল দুজনকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলেও রিফাত সেদিকে গেল না। সে আপাতত মারিদকে নিয়ে চিন্তিত। সকালে মারিদকে ঘুমের ইনজেকশন দিয়ে সেও কিছুক্ষণ মারিদের কেবিনের সোফায় শুয়ে পড়েছিল। সারারাতের ক্লান্তিতে চোখে তীব্র ঘুম নেমে আসতে হঠাৎ রাদিলের ফোন পেয়ে ঘুম থেকে উঠে দেখে সময় প্রায় দেড়টা বাজে। মারিদকে বিছানায় না পেয়ে হাসপাতাল থেকে ছুটে এসেছে বাড়িতে। রিফাত মারিদের ঘরে দরজা ঠেলে প্রবেশ করে দেখল মারিদ সবে গোসল শেষ করে ভেজা মাথায় হাতের আইফোনের ট্যাবে কিছু চেক করছে শক্ত চোয়ালে। গায়ের টি-শার্ট আধভেজা, হয়তো তাড়াহুড়ো করে গোসল শেষ করে বেরিয়েছে বলে শরীর মোছার সময় হয়নি। রিফাত মারিদের ঘরে ঢুকতে ঢুকতে বলল…
‘কিরে ভাই? তুই হাসপাতাল থেকে চলে আসবি, সেটা আমাকে বলে আসবি না?
রিফাতের কথায় মারিদ উত্তর করল না, আর না চোখ তুলে তাকাল। মারিদের দৃষ্টি তখনো হাতের বড়ো ট্যাবে। বারবার জুম করে কী খুঁজছে রিফাত জানে না। তবে এতটা বুঝতে পারছে যে মারিদের অপরিচিতা-সংক্রান্ত কিছু হবে হয়তো। বিগত একুশ ঘণ্টা রিফাত যতটুকু বুঝেছে, মারিদ আলতাফ মেয়েটির খোঁজে শুধু ব্যাকুল নয়, পাগলও বটে। মারিদের মতোন মানুষ এত ভালোবাসল কখন মেয়েটিকে? তাছাড়া রিফাতরা কাল রাতে তন্ন তন্ন করে খোঁজার পরও মেয়েটির বিন্দুমাত্র সন্ধান পায়নি। এমনকি সন্দেহ হতে পারে এমন কোনো কথা বা ঘটনাও ঘটেনি। এখন রিফাতেরই তো মনে প্রশ্ন জাগছে, আসলেই কি ‘অপরিচিতা’ নামের কোনো মেয়ে আছে? যদি থেকে থাকে, তাহলে লোকেশন অনুযায়ী গিয়ে পেল না কেন মেয়েটিকে? রিফাত মারিদের বিছানায় ‘ঠাস’ করে বসতে বসতে বলল:
‘অপরিচিতার নাম্বার কি এখনো বন্ধ, মারিদ?
অস্থির মারিদ উত্তর করল না। মারিদের নীরবতাকে রিফাত সম্মতি ধরে নিয়ে ফের প্রশ্ন করে বলল:
‘মেয়েটাকে কীভাবে খুঁজবি কিছু ভেবেছিস? রাদিল…
রিফাতের কথা শেষ করার আগেই মারিদের হাতের ট্যাবে মারিদের অ্যাসিস্ট্যান্ট হাসিবের কল আসল তক্ষুনি। মারিদ ফোন রিসিভ করতেই ওপারের হাসিব ব্যস্ত ভঙ্গিতে বলল:
‘স্যার, আপনার দেওয়া সিমের তথ্য অনুযায়ী এই সিমটি ‘তাতিয়ান’ নামক একজন পাহাড়ি লোকের নামে সিমটা রেজিস্টার করা। লোকটির বাড়ি সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলায়, পান্থুমাই গ্রামে। লোকটির বয়স জাতীয় পরিচয়পত্র অনুযায়ী ৬৫ বছর দেখাচ্ছে স্যার।
হাসিবে কথা মারিদ ছোট উত্তর বলল…
‘আমাদের ফ্লাইট কবে?
হাসিব তাড়াহুড়োয় উত্তর দিয়ে বলল…
‘জি স্যার, আজ বিকেল পাঁচটায় আমাদের সিলেটের ফ্লাইট। তবে এর আগে আপনি একটু কনস্ট্রাকশন সাইটে আসবেন? এখানকার ম্যানেজার আপনার সাথে দেখা করতে চাচ্ছে।
‘আমার অফিসে পাঠিয়ে দে।
‘আজ তো শুক্রবার! আপনি অফিসে আসবেন, স্যার?
‘ আসব।
‘তাহলে আমি বিষয়টা ম্যানেজারকে জানিয়ে দিচ্ছি।
হাসিবের কল বিচ্ছিন্ন হয়ে যেতেই রিফাত কপাল কোঁচকে মারিদকে ফের প্রশ্ন করে বলল..
‘তুই সিলেট যাবি মারিদ?
‘
‘হ্যাঁ।’
‘কেন? মেয়েটির খোঁজে?
‘হ্যাঁ।’
‘মেয়েটির বাড়ি কি সিলেট?
‘জানি না। তবে সিমের তথ্য অনুযায়ী তাই দেখাচ্ছে।
মারিদের কথায় রিফাত সন্দিহা গলায় বলল…
‘আমার তোর অপরিচিতার ব্যাপারটা কেমন ঘোলাটে লাগছে, মারিদ। মেয়েটির শেষ লোকেশন যশোর জেলা দেখাচ্ছে, আবার এখন সিমের তথ্য বের হলো সিলেট জেলা। ব্যাপারটা অদ্ভুত না?
রিফাতের কথায় মারিদ ফের হাতের ট্যাবে চোখ বোলাল। চোখ-মুখ তখনো লাল। অতিরিক্ত মানসিক টেনশনে এমন অস্থির অস্থির দেখাচ্ছে মারিদকে। কাল থেকে মারিদের অপরিচিতা নিখোঁজ। তার সঙ্গে কথা না বলে গোটা একটা রাত পার হয়ে দুপুর হলো মারিদের, এই যে মেয়েটা নিখোঁজ আর তার জন্য মারিদের কোনো কিছুতে শান্তি লাগছে না, মন ছটফট করছে, এটা কাকে বোঝাবে মারিদ? মারিদ পারছে না চিৎকার করতে। তার মন শুধু অপরিচিতা জন্য ছটফট করছে এমনটা নয়, মারিদের নিজেকে পাগল পাগলও লাগছে ক্ষণে ক্ষণে। অপরিচিতার লোকেশন কোথায় থেকে কোথায় যাচ্ছে তাতে কিছু যায় আসে না মারিদের। অপরিচিতাকে খুঁজতে গিয়ে যদি মারিদের বাংলাদেশের চৌষট্টি জেলায় চক্কর কাটতে হয়, তাহলে মারিদ আলতাফ সেটাও করবে। তারপরও তার অপরিচিতাকে চাই, মানে চাই। অ্যাট এনি কস্ট। রিফাত মারিদের অপরিচিতাকে নিয়ে ব্যাকুলতা বুঝতে পারল। ভালোবাসা বুঝি এমনই হয়। রিফাত দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল:
‘মেয়েটিকে খুঁজতে তোর হুটহাট এইভাবে যেখানে-সেখানে যাওয়া ঠিক হবে না, মারিদ। তুই সাধারণ মানুষের মধ্যে কেউ নোস। তোর সিকিউরিটি প্রয়োজন। ব্যবসায়িক শত্রুর তোর কমতি নেই। সেজন্য বলি, তুই না গিয়ে লোক পাঠিয়ে তাতিয়ান লোকটাকে ঢাকা নিয়ে আসতে বল। তোর সিলেট যাওয়াটা ঠিক হবে না। বিপদে পড়তে পারিস।
রিফাতের কথায় মারিদ শক্ত চোয়ালে বলল…
‘ মানুষটা যখন আমার তখন আমি নিজে গিয়ে খুঁজব আমার মানুষটা কোথায় আছে। এবার যেখানে যাওয়া লাগে আমি সেখানে সেখানে যেতে প্রস্তুত।
‘আচ্ছা, যদি মেয়েটাকে সিলেট গিয়েও সন্ধান না পাস, তখন কী করবি?
‘আবার খুঁজব।
‘বারবার খুঁজেও যদি না পাস, তাহলে কী করবি?
মারিদের একই উত্তর আসল আবারও….
‘তাহলে বারবার খুঁজব। তারপরও হার মানার প্রশ্ন ওঠে না।
মারিদের জেদে রিফাত খানিকটা কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে বলল…
‘আচ্ছা, ধর তোর এত খোঁজাখুজির পর জানতে পারলি তোর অপরিচিতা মানুষটা তোর পরিচিত কেউ বের হয়েছে, তখন কী করবি? একসেপ্ট করবি নাকি ছেড়ে দিবি?
রিফাতের অদ্ভুত প্রশ্নে মারিদ সরাসরি তাকাল রিফাতের দিকে। চোখ-মুখ তখনো রক্তিম লাল। অপরিচিতাকে খুঁজে পাওয়ার তাড়নায় রিফাতের প্রশ্নটায় মনোযোগ দিতে পারল না মারিদ। অথচ মারিদ যদি মনোযোগ দিতো তাহলে বুঝতে পারতো রিফাতের কথাটি ফেলার নয়।
চলিত…..
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১২