ডাকপ্রিয়র চিঠি
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
০৫
মারিদের অসহায় আর্তনাদ চোখে পড়ার মতো ছিল। উপস্থিত সকলে মারিদের দিকে তাকিয়ে। এরই মাঝে শোনা গেল ফোনের ওপাশ থেকে কতগুলো পুরুষের হইচই। কেউ একজন চিৎকার করে বলছে,
‘এই শালিরে সবাই মিলে গুলি কর। গুলি কর। মাইরা দে। মাইরা দে!
লোকগুলোর চিৎকারের সঙ্গে সঙ্গে পরপর গুলির শব্দ শোনা গেল। সেই সাথে শোনা গেল অপরিচিতার গগন কাঁপানো চিৎকার… তারপর? তারপর সঙ্গে সঙ্গে ‘টুটু’ শব্দ করে অপরিচিতার কলটি বিচ্ছিন্ন হয়ে গেল। হয়তো ফোনটি হাত থেকে পড়ে ভেঙে গেছে, তাই…
অপরিচিতার কল বিচ্ছিন্ন হতেই মারিদ অস্থির ও উত্তেজিত হয়ে চিৎকার করে উঠল, ‘শিট! শিট! শিট! আপনি এইভাবে হারাতে পারেন না অপরিচিতা। আমার এখনো আপনাকে দেখা বাকি, কথা বলা বাকি, আপনার সাথে সারাটা জীবন পথ চলা বাকি। আমাকে মাঝপথে ফেলে এইভাবে হারিয়ে যেতে পারেন না। আমি তা হতে দেব না।
মারিদ কথাগুলো আওড়াতে আওড়াতে কম্পিত দু’হাতে বারবার ‘বসন্তের পাখি’ নামের নাম্বারটিতে কল মেলাচ্ছে। প্রতিবারই সেই নাম্বার থেকে শোনা যাচ্ছে, ‘এই মুহূর্তে আপনার কাঙ্ক্ষিত নাম্বারে সংযোগ প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। অনুগ্রহ করে একটু পর আবার চেষ্টা করুন, ধন্যবাদ। The number you dialed cannot…’ পরপর এতটুকু কথা ফোনের ওপাশ থেকে শোনা যেতেই মারিদ রাগে জেদে ফের আর্তনাদের চিৎকার করে উঠল, ‘শিট! শিট! শিট! অপরিচিতা আআআআ!
অতি প্রিয় কিছু হারানোর ভয়ে মারিদ দিশেহারা হয়ে উঠল। হাতের ফোনটা রাগে সজোরে আছাড় মারল মেঝেতে। মুহূর্তে ফোনটি ছত্রভঙ্গ হয়ে তার যন্ত্রাংশগুলো মেঝেতে ছড়িয়ে পড়ল। মারিদকে ঘিরে দাঁড়িয়ে ছিল তার বাবা সৈয়দ মাহবুব আলম। মারিদের কী হয়েছে, কেন সে এমন করছে? সেটা তিনি বুঝতে না পারলেও ছেলের আর্তনাদে তিনিও ভীত। উনার একটি মাত্র ছেলে। মাহবুব আলম মারিদের পিঠে হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিতে দিতে বারবার অস্থির ভঙ্গিতে বলে উঠলেন,
‘আব্বা, আপনি শান্ত হন। অস্থির হবেন না। কী হয়েছে আপনার আমাকে বলুন। আমি আছি আপনার পাশে। সব ঠিক হয়ে যাবে। আপনি প্লিজ শান্ত হন।
মাহবুব আলম একজন উচ্চশিক্ষিত ব্যবসায়ী মানুষ। পেশাগত জীবনে তিনি বেশ শক্ত ও গম্ভীর প্রকৃতির মানুষ হলেও যখন পরিবারের কথা আসে, তখন তিনি বেশ নমনীয় ও স্বজনপ্রিয় হয়ে যান। বিশেষ করে যখন প্রসঙ্গ উনার ছেলে মারিদের আসে, তখন তিনি আরও নমনীয় ও বন্ধুসুলভ হয়ে ওঠেন। একটি মাত্র ছেলে উনার। অবহেলা করার প্রশ্নই ওঠে না, বরং মাহবুব আলমের ধারণা মারিদের মতো হিরের টুকরো ছেলে লাখে নয়, কোটিতে একটি হয়। আল্লাহর অশেষ দয়া যে উনাকে মারিদের মতো সুপুত্র দান করেছেন। তাই তিনি উনার ছেলের প্রতি খুবই যত্নশীল। মাহবুব আলমের কথা শেষ হতে না হতেই শোনা গেল রিফাতের গলা। সেও খানিকটা অস্থির ভঙ্গিতে মারিদকে প্রশ্ন করে বলল,
‘কী হয়েছে মারিদ? তুই এমন করছিস কেন? কার ফোন ছিল? কী হয়েছে আমাদের বল। আমরা আছি তোর পাশে।
মারিদের ব্যক্তিগত সহকারী হাসিব। সেও সবার সাথে মারিদের কেবিনে দাঁড়িয়ে ছিল। সবার মতোই হাসিবের চোখেমুখে কৌতূহল তীব্র। মারিদ কার ফোন পেয়ে এতটা অস্থির উত্তেজিত হচ্ছে, সেটা জানার আগ্রহ তারও বেশ। কিন্তু উপস্থিত সবাইকে ডিঙিয়ে প্রশ্ন করার মতো সাহস হাসিবের নেই। মারিদ কারও কোনো কথার উত্তর না দিয়ে বরং চট করে টেবিলের ওপর থেকে কলম নিয়ে এক টুকরো কাগজে অপরিচিতার নাম্বারটা লিখল কম্পিত হাতে। সেটি তৎক্ষণাৎ হাসিবের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
‘আমার এই নাম্বারের লাস্ট লোকেশন চাই হাসিব। সময় পাঁচ মিনিট। দ্রুত কর।
‘জি স্যার।
মারিদের হাত থেকে কাগজের টুকরোয় লেখা নাম্বারটি নিয়ে হাসিব দ্রুত বের হয়ে যেতেই মারিদ দু’হাতে মাথা চেপে চেয়ারে বসল। মারিদ চাইলেই দৌড়ে অপরিচিতার কাছে পৌঁছাতে পারছে না, আর না অপরিচিতাকে বাঁচাতে পারছে। মারিদের অপরিচিতা কোথায় আছে? কিভাবে আছে? সে কে? মারিদ কিছুই জানে না। এই না জানার কারণেই আজ মারিদ এই পরিস্থিতিতে দাঁড়িয়ে। মারিদের অপরিচিতাকে কারা অ্যাটাক করেছে? কেন করেছে? কী হয়েছে তার সাথে? এসবের কিছুই মারিদ জানে না। অস্থির দিশেহারা মারিদের আজ মনে হচ্ছে, এতদিন অপরিচিতার পরিচয় না জেনে সে মস্ত বড় ভুল করেছে। অপরিচিতার ফ্যান্টাসি রক্ষা করতে গিয়ে সে জানতেই পারল না সে কার সাথে এতদিন কথা বলেছে, ফোনের ওপাশের মানুষটা আসলে কে ছিল? উফফ!
মারিদের মতো একজন বিচক্ষণ মানুষ কিভাবে এত বড় বোকামি করল? অপরিচিতা না হয় ফ্যান্টাসির জন্য মারিদের থেকে পরিচয় লুকিয়ে রেখেছিল, কিন্তু মারিদ? সে তো কোনো ফ্যান্টাসি রক্ষা করেনি, তাহলে সে কেন অপরিচিতার অজান্তে তার তথ্য নিজের কাছে রাখল না? মারিদ চাইলেই তো আরও আগে অপরিচিতার সব তথ্য নিজের কাছে রাখতে পারত। অপরিচিতার পরিচয় জেনে অপরিচিতার থেকে বিষয়টি লুকিয়ে রাখলে হয়তো আজ অপরিচিতার বিপদে সে এইভাবে হাত গুটিয়ে বসে থাকতো না। বরং এতক্ষণে মারিদ অপরিচিতার লোকেশন অনুযায়ী সেখানে চলে যেতে পারত। মারিদ আলতাফ ভীষণ বড় ভুল করেছে আর আজ সেই ভুলের শাস্তি স্বরূপ অপরিচিতাকে হারাতে বসেছে। আল্লাহ না করুক, যদি মারিদের অপরিচিতাকে সে চিরতরে হারিয়ে ফেলে তো?
অপরিচিতাকে হারানোর তীব্র ভয়ে মারিদ দু’হাতে নিজের চুল টেনে পুনরায় চিৎকার করে উঠল চেয়ার ছেড়ে। জেদি ভঙ্গিতে দু’হাতে সজোরে ছিটকে ফেলল টেবিলের উপরে রাখা অফিসের ফাইলপত্রগুলো। মারিদকে হঠাৎ পাগলের মতো আচরণ করতে দেখে রিফাত এগিয়ে এসে মারিদকে বাধা দিতে চাইলে মারিদ দু’হাতে ধাক্কা মারল রিফাতকে। হঠাৎ ধাক্কায় রিফাত তাল সামলাতে না পেরে ছিটকে কয়েক কদম দূরে সরে যেতেই তৎক্ষণাৎ এগিয়ে এলেন মাহবুব আলম। তিনি দু’হাতে মারিদকে জড়িয়ে ধরতে পাশ থেকে একইভাবে জড়িয়ে ধরলেন মারিদের ছোট চাচা সৈয়দ মকবুল আজম। দুজন মারিদকে জড়িয়ে ধরায় মারিদ গর্জন করে চিৎকার করল। দিশেহারা হয়ে আউড়াল,
‘ আমার সবটা শেষ হয়ে যাচ্ছে বাবা। আমার অপরিচিতা বিপদে আছে, অথচ আমি কিচ্ছু করতে পারছি না। আমার এই ব্যর্থতা আমাকে পাগল বানাচ্ছে। সবকিছু ধ্বংস করে দিতে মন চাইছে। প্লিজ বাবা, সেভ হার। আই কান্ট লিভ উইদাউট হার। আই কান্ট।
মারিদের কথা শেষ হতে না হতেই মাহবুব আলম অস্থির ভঙ্গিতে বললেন,
‘ আব্বা, আপনি শান্ত হন। আমাকে বলেন কে আপনার অপরিচিতা? কার বিপদ হয়েছে। আমি এক্ষুনি পুলিশ ফোর্স পাঠাচ্ছি সেখানে। দরকার পড়লে আমিও যাব। তারপরও আপনি উত্তেজিত হবেন না। আপনার বাবা আপনার পাশে আছে। আপনি একা নন।
জেদি মারিদ কাঠ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। বাবা-চাচা কিংবা রিফাতের কারও কথায় কোনো উত্তর করল না আর। মারিদকে জেদি ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মাহবুব আলম মারিদকে ছেড়ে দিলেন। বারবার মারিদের শরীর স্পর্শ করে সান্ত্বনা দিচ্ছেন এটা সেটা বলে। অথচ মারিদ পাথরের মূর্তির মতো দাঁড়িয়ে। চোখ দুটো ক্রমশই রক্তিম হয়ে উঠছে। অতি জেদে চোয়াল শক্ত করে দু’হাত মুঠোয় পিষছে। কারও কথা কানে যাচ্ছে না তাঁর। মারিদের এই মূহুর্তে হাত গুটিয়ে বসে থাকার ব্যর্থতা তাকে ভিতর থেকে তোলপাড় করছে। এর মাঝেই দশ-বারো মিনিটের মধ্যে হাসিব পুনরায় ফিরে আসল। হাতে এক টুকরো কাগজ, তাতে একটি ঠিকানা। দ্রুততা হাসিব সেটি মারিদের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
‘ স্যার, আপনার দেওয়া নাম্বারের লাস্ট লোকেশন দেখাচ্ছে যশোর জেলায়, মণিরামপুর থানায়, খানপুর গ্রামের বাজারের আশেপাশে কোথাও একটা হবে।
যশোর জেলার নামটা শুনতে মারিদ অবিশ্বাস্য নজরে তাকাল হাসিবের দিকে। হাসিবের বলা ঠিকানাটা যেন মারিদের বিশ্বাস হয়নি এমন। কারণ এতদিন মারিদ মনে করেছিল তার অপরিচিতা হয়তো ঢাকার বাসিন্দা এবং সে মারিদের আশেপাশে কোথাও একটা থাকে। এজন্য অপরিচিতা মারিদের সামনে আসতে চাইত না ভয়ে, বরং নিজেকে লুকিয়ে রাখতে চাইত। কিন্তু এখন লোকেশন ট্রেস করতে গিয়ে বেরিয়ে আসল মারিদের অপরিচিতা ঢাকার মধ্যে নয়, বরং যশোর জেলায় আছে। আচ্ছা, মেয়েটা যশোরে কেন গিয়েছিল বেড়াতে? নাকি মেয়েটার বাড়িই যশোরে? মারিদের এত প্রশ্নের উত্তর কে দিবে? তাছাড়া ঢাকা থেকে এত দূরে যশোরে চাইলেই মারিদ চট করে পৌঁছাতে পারবে না। এতে সময়ের প্রয়োজন। এত সময় তো মারিদের নেই। মারিদের অপরিচিতা বিপদে আছে, আর মারিদ সময়মতো পৌঁছাতে পারছে না ব’লেই দিশেহারা মারিদ অস্থির, উত্তেজিত ভঙ্গিতে হাসিবকে ফের আদেশ করে বলল,
‘ হাসিব! হেলিকপ্টারের খবর দে। আমি যশোরে যাব। সঙ্গে এই নাম্বার ব্যবহারকারীর সকল ডিটেইলস বের কর। কে বা কারা এই সিম ব্যবহার করত, তার সকল তথ্য চাই আমার। কোনো কিছু যেন বাদ না পড়ে।’
‘জি স্যার,।
মারিদের কথায় সম্মতি জানিয়ে হাসিব তৎক্ষণাৎ চলে গেল। হাসিব যেতে যেতে কল করে লোক লাগাল ফের কল সেন্টারে। মারিদের দেওয়া নাম্বারটা দিয়ে বলল, যেন রেজিস্ট্রেশন করা সিমের ব্যবহারকারীর সকল তথ্য জরুরি ভিত্তিতে তাঁকে পাঠাতে। সেই সাথে হেলিকপ্টারকে খবর দিতে সময় নিয়ে মারিদের বিল্ডিংয়ের ছাদে উপস্থিত হলো একটি হেলিকপ্টার। মারিদ পূর্ব থেকে ছাদে উপস্থিত থাকায় সে তৎক্ষণাৎ দৌড়াল সেদিকে। মারিদের পিছন পিছন রিফাত আর হাসিব দুজনই উঠল। হেলিকপ্টারটি আকাশে উড়ে যেতে মাহবুব আলম সেদিকে তাকিয়ে রইলেন চিন্তিত মুখে। মারিদ কোথায় গেছে তিনি জানেন, তারপরও ছেলের জন্য তিনি বেশ চিন্তিত। যদিও রিফাত-হাসিব গিয়েছে সঙ্গে, তারপরও তিনি তার মেজো ভাই সৈয়দ রবিউল শাহে ফোন করে মারিদের কথা জানালেন। সেই সাথে বললেন, যশোরের মণিরামপুর থানায় যোগাযোগ করে সহযোগিতা চাইতে বিশেষভাবে, যেন মারিদকে থানার পুলিশ সর্বোচ্চ সহযোগিতা করে। হলোও তাই। মারিদ যশোরে পৌঁছানোর আগেই তার চাচা যশোর জেলার মণিরামপুর থানাসহ আরও বেশ কিছু থানায় ফোন করে জানালেন মারিদের বিশেষ খেয়াল রাখতে। অথচ দিশেহারা মারিদ যশোরে পৌঁছাতে পৌঁছাতে সময় তখন সন্ধ্যা সাতটা পার হয়ে গেল। অপরিচিতার ফোন এসেছিল ৪ঃ৪৫ মিনিটে আর মারিদ যশোরে পৌঁছাল ৭ঃ১৫-তে। প্রায় দু’ঘণ্টার মতো সময় লাগল এর মাঝে। এত সময়ে নিশ্চয়ই মারিদের অপরিচিতাকে বাঁচানো সম্ভব নয়? তারপরও মারিদ লোকেশন অনুযায়ী প্রথমে মণিরামপুর থানায় নামল। পুলিশ ফোর্সসহ গাড়ি নিয়ে বের হলো লোকেশন অনুযায়ী খানপুর গ্রামের বাজারের সম্মুখে।
চাঁদবিহীন আকাশে সন্ধ্যা সাতটার সময় কেমন গা ছমছম পরিবেশ দেখাচ্ছিল গ্রামের রাস্তাগুলোতে। মানুষ হাতে টর্চ নিয়ে যাতায়াত করছে। এর মাঝে একত্রে পুলিশের পাঁচ, ছয়টি জিপ গাড়ি থামতে দেখে যাতায়াতকারী মানুষগুলো সেদিকে তাকাচ্ছে ভয়ে ভয়ে। থানার ওসি নিজে মারিদের সঙ্গে এসেছেন। উপর থেকে অর্ডার এসেছে যেন মারিদের সঙ্গে তারা মেয়েটির সন্ধান করে। চব্বিশ ঘণ্টার আগে কোনো কিডন্যাপিং কেস হাতে নেওয়া হয় না তাদের, অথচ মারিদ আলতাফের টাকা আর ক্ষমতার জোরে একটি-দুটি পুলিশ নয়, পুরো পুলিশ ফোর্স এসেছে মারিদ আলতাফের সিকিউরিটি হয়ে।
অন্ধকার রাস্তায় পরপর এত গাড়ির আলোয় আলোকিত পরিবেশ। গমগমে বুটের শব্দে সারিবদ্ধভাবে একত্রে বন্দুক হাতে পুলিশ ফোর্স রাস্তায় নামতেই চারপাশে কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হলো। মারিদের পাশাপাশি ওসি সাহেব দাঁড়ালেন। হাসিবের হাতে আইফোনের একটি ট্যাব নেওয়া। তাতে অপরিচিতার নাম্বারের লাস্ট লোকেশন দেখাচ্ছে এখানকার আশেপাশে। চল্লিশের অধিক পুলিশের হাতে হাতে বন্দুকের পাশাপাশি যান্ত্রিক টর্চ লাইটও নেওয়া। অন্ধকার রাস্তায় তীব্র কোলাহলপূর্ণ পরিবেশ সৃষ্টি হলো তখনই। অশান্ত মারিদ রাস্তায় নামতেই চারপাশে সূক্ষ্ম আর সজাগ দৃষ্টি ঘোরাল। রাতের আঁধারে পরিবেশ বোঝা দায়। এই স্থানে যদি আজ বিকেলে চারটে নাগাদ কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে অবশ্যই গ্রামবাসীরা জানবে। তাই সেই অনুসন্ধান করেই মারিদ আশেপাশে তাকাতে তাকাতে ওসির উদ্দেশ্যে বলল
‘ আপনাদের টিমের পুলিশদের পাঁচটি দলে বিভক্ত হয়ে যেতে বলুন। একটা টিম আমাদের সাথে থাকবে, বাকিগুলো এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে বলুন। সবাই একত্রে থাকলে কাজ হবে না। যা করার দ্রুত করুন। কুইক!
ওসি রায়হান সাহেব মারিদের কথা অনুযায়ী তাই করলেন। আগত পুলিশের টিমকে পাঁচটি দলে বিভক্ত করে চার দল পুলিশকে পাঠানো হলো গ্রামের চারদিকে, লোকেশন অনুযায়ী গ্রামের ভিতরে গিয়ে মেয়েটির সন্ধান করতে। অপর একটি দল নিয়ে ওসি সাহেব মারিদের সঙ্গে সামনে এগোলেন। কিছু দূরে হাঁটতে সামনে দেখা গেল একজন অর্ধবয়স্ক লোককে। টর্চ হাতে বাজার থেকে বাড়ি ফিরে যাচ্ছিলেন। এরই মাঝে ওসি সাহেব লোকটিকে দাঁড় করিয়ে কৌশলে কথা চালাল। লোকটির নাম-ঠিকানা জেনে প্রশ্ন করে বললেন,
‘ আপনি তো এই গ্রামের লোক, তাই না মাহফুজ আলী?
‘জি স্যার।
‘ তা আপনার বাড়ি কোন দিকে?
সহজ সরল মাহফুজ আলী আঙুল তুলে সামনে দেখিয়ে বলল…
‘এই তো স্যার, একটু সামনেই।
মাহফুজ আলীর কথায় ক্রিমিনাল মাইন্ডের ওসি সাহেব বললে…
‘ আজ বিকেলে আপনি কই ছিলেন? বাড়িতে নাকি বাজারে?
‘ জি স্যার, বাজারেই ছিলাম।
পরপর বয়স্ক লোকটির কথায় ওসি সাহেব বয়স্ক মাহফুজ আলীর কাঁধে হাত রেখে বন্ধুসুলভ আচরণ করে বললেন,
‘ বাজারে থাকলে তো আপনি বলতেই পারবেন আজ বিকেলে চারটে নাগাদ এখানে কোনো দূর্ঘটনা ঘটেছে কিনা? মানে চুরি-ডাকাতি কিংবা কেউ কিডন্যাপ হয়েছে এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে আজ?
ওসির কথায় বেশ থমথমে মুখে মাহফুজ আলী বলল,
‘ না স্যার। এমন কোনো ঘটনা ঘটতে শোনা যায়নি আজ। আমি তো সারাবেলা বাজারের ছিলাম কিন্তু এমন কোনো ঘটনা ঘটতে শুনি নাই স্যার।
‘ আপনি সত্যিটা বলছেন? নাকি কারও ভয়ে মিথ্যা বলছেন কোনটা? আমাদের কাছে কিন্তু ইনফরমেশন আছে আজ বিকেল চারটে নাগাদ আপনাদের গ্রাম থেকে একটা মেয়ে নিখোঁজ হয়েছে। মিথ্যা বললে কিন্তু ফেঁসে যাবেন আপনি।
ওসি সাহেবের কথায় এবার খানিকটা ভয়ভীত দেখাল বয়স্ক মাহফুজ আলীকে। তিনি সত্যি জানেন না আজ বিকেলে তাদের গ্রাম থেকে কেউ নিখোঁজ হয়েছেন কিনা। ভয়ভীত মাহফুজ আলী থমথমে মুখে ফের একই স্বীকারোক্তি দিয়ে বলল,
‘ দারোগা স্যার, আমি সত্যি বলছি। আমার জানা মতে আজ আমাদের গ্রামে এমন কোনো ঘটনা ঘটতে শুনি নাই। তারপরও যদি আমার অজান্তে কোনো ঘটনা ঘটে থাকে, তাহলে আমি বলতে পারব না স্যার।
‘আচ্ছা ঠিক আছে, কোনো সমস্যা নেই। চলুন আমরা বাজার থেকে ঘুরে আসি। আসুন।
পুলিশের নজর সবকিছুর উপর থাকে। আর সেই নজরে অপরাধী-নিরপরাধী সকলকেই সন্দেহের তালিকায় রাখা হয়। এই যেমন নিরীহ মাহফুজ আলীও রেহাই পেল না। সবে চায়ের দোকানের আড্ডা ছেড়ে বাসায় যাচ্ছিল মাহফুজ আলী। এর মাঝে হঠাৎ করে পুলিশ তাকে দাঁড় করিয়ে একে একে কথা চালিয়ে এখন আবার মাহফুজ আলীকে সঙ্গে নিয়ে যাচ্ছেন। আর এই ব্যাপারটায় মাহফুজ আলী ভীষণ ভয়ভীত। গ্রামের সহজ সরল মানুষ সে। এসব পুলিশের তল্লাশিতে ভয় পায়। তারপরও তিনি ভয়ে ভয়ে পুলিশের সঙ্গে গেলেন। দিশেহারা মারিদকে এখন বেশ শান্ত ও গম্ভীর দেখাচ্ছে। মারিদের মুখ দেখে তার মনের অবস্থা বলা মুশকিল। এই যে বয়স্ক মাহফুজ আলী মারিদের অপরিচিতার খোঁজ দিতে পারল না, এতে মারিদের ভেতরের তোলপাড় অবস্থাটা কাউকে বোঝানোর মতো না। সে চাইছে সবকিছু তোলপাড় ধ্বংস করে তার অপরিচিতাকে খুঁজে বের করতে। মারিদ দু’হাত শক্ত মুঠোয় পিষে নিজেকে কন্ট্রোল করল। রিফাত ওসি সাহেবের অপর পাশে দাঁড়িয়ে। হাসিব মারিদের পিছন পিছন হাঁটছে মারিদের অফিশিয়াল ফোনটা নিয়ে। অন্য হাতে আইফোনের ট্যাব নেওয়া। মারিদের নিজের ফোনটা তো বিকেলে ভেঙে ফেলেছে, সেজন্য মারিদের পরিবারের সঙ্গে সে এই ফোনে যোগাযোগ করছে। মারিদের বাবা সৈয়দ মাহবুব আলম থেকে শুরু করে মারিদের মেজো চাচা, ছোট চাচা কিছুক্ষণ পর পর হাসিবকে ফোন করে মারিদের খোঁজ চাচ্ছেন, সাথে মারিদের অনুসন্ধানকৃত মেয়েটির খোঁজ পেয়েছে কিনা, সেটাও জানতে চাচ্ছেন। এতে বরাবরই হাসিবের একই উত্তর হচ্ছে, ‘মেয়েটির সন্ধান তারা এখনো পায়নি। পেলে অবশ্যই জানাবে।
অথচ এর মাঝেই হাসিবের হাতের ট্যাবে মারিদের দেওয়া অপরিচিতার নাম্বারের সকল তথ্য সেন্ট্রাল কল থেকে তাদের লোক পাঠাল। তথ্যটি দেখে হাসিব খানিকটা কপাল কুঁচকাল। এড্রেসে সিলেট দেওয়া। যশোর থেকে এখন আবার সিলেট? ব্যাপারটা কেমন এলোমেলো লাগছে হাসিবের তারপরও সে মারিদকে ডাকল না। বরং মেয়েটির খোঁজ করা শেষে মারিদকে এই তথ্যটি দিবে ভেবে সেও মারিদের পিছন পিছন গ্রামের বাজারে পৌঁছাল। গ্রাম্য বাজার হওয়ায় সন্ধ্যা সাতটা নাগাদ বেশ ভালোই মানুষের উপস্থিতি ছিল বাজারে। দোকানপাট তখনো সব খোলা। মানুষের আনাগোনা ও কোলাহল বেশ। এলাকার মাহফুজ আলীকে নিয়ে থানার ওসি গ্রামের বাজারে প্রবেশ করতে মানুষের মধ্যে হইচই পড়ে গেল এলাকায় পুলিশ এসেছে বলে। গ্রামের বাজারে তখন এলাকার চেয়ারম্যানেরও উপস্থিতি ছিল। তিনি থানার ওসির সঙ্গে বেশ কিছু নতুন মুখ দেখে চায়ের দোকান থেকে বেরিয়ে আসলেন। ওসি সাহেব চেয়ারম্যানের সঙ্গে হাত মেলাতে মেলাতে কৌশলে বললেন,
‘ কি চেয়ারম্যান সাহেব, এলাকার খবর কি? শুনলাম আপনাদের এলাকায় নাকি মেয়েরা নিখোঁজ হচ্ছে? ব্যাপারটা কি সত্যি?
‘না স্যার। আমাদের এলাকায় তো এরকম কোনো ঘটনা ঘটতে শোনা যায়নি।
চেয়ারম্যান সাহেবের কথায় ওসি সাহেব বেশ রসিয়ে রসিয়ে বলল…
‘ শাক দিয়ে মাছ ঢাকতে চাচ্ছেন চেয়ারম্যান সাহেব? এতে লাভ হবে মনে করেন? বিড়াল কিন্তু গন্ধ শুঁকে চলেই এল। এবার সামলাবেন কিভাবে?
‘ স্যার, আমরা কেউ আপনাকে মিথ্যা বলছি না। আমি বাদে আমার এলাকার অনেকেই উপস্থিত আছে এখানে। আপনি চাইলে এখানের উপস্থিত সকলকে এক এক করে জিজ্ঞাসা করতে পারেন। সবাই একই কথা বলবে।
চেয়ারম্যান সাহেবের কথায় ওসি সাহেব ফের রসিয়ে রসিয়ে বলল….
‘সবাই একই কথা বলবে কিনা, সেটা আপনি ঠিক করে দিচ্ছেন কেন চেয়ারম্যান সাহেব? কে কী বলবে, সেটা তো আপনি ঠিক করবেন না, তাই না?
‘না স্যার! আসলে…’
‘ আপনার আসল-নকল পরে দেখব চেয়ারম্যান সাহেব। আগে আমরা আসামি দেখি। তারপর না-হয় আপনাকে দেখব। নাকি আপনিই আসামি? কোনটা?
ওসি সাহেবের কথায় চেয়ারম্যান সাহেব আরও কিছু বলতে চাইলেন। কিন্তু মারিদ কথার মাঝে বাধা দিয়ে শক্ত চোয়ালে দাঁত পিষে ওসি সাহেবের উদ্দেশ্যে বলল
‘এই লোক আমাদের টাইম ওয়েস্ট করছে, ওসি সাহেব। আপনি সামনে এগোন।
মারিদের কথায় চেয়ারম্যান সাহেব সূক্ষ্ম দৃষ্টিতে তাকাল মারিদের দিকে। অবজ্ঞায় তিনি আর কিছু বলতে চাইলেও মারিদ শুনতে চাইল না। বরং ভিড় ঠেলে মারিদ সামনে এগোতে মারিদকে অনুসরণ করল বাকিরা। মারিদ সামনে এগোতে এগোতে হাসিবের দিকে হাত বাড়িয়ে দিতে হাসিব নিজের হাতের ট্যাবটি মারিদের হাতে তুলে দিল। মারিদ ট্যাবে দেখানো লোকেশন জুম করে সামনে এগোল। পুরো এলাকার বাজারে তল্লাশি করেও অপরিচিতার সন্ধান কেউ দিতে পারল না। অবশেষে মারিদ ওসি সাহেবকে দিয়ে এলাকাবাসীদের লোভ দেখাল। যে বা যারা মারিদের অনুসন্ধানকৃত মেয়েটির খোঁজ দিতে পারবে, তাদের নগদে ত্রিশ লাখ টাকা দেওয়া হবে বলে নিধারণ করল। টাকার লোভে এলাকাবাসীদের মাঝে হইচই দেখা গেল। পুলিশ ফোর্সের সঙ্গে পুরো এলাকাবাসীও মারিদের অপরিচিতার খোঁজে নেমে পড়ল। খানপুর গ্রামের আশেপাশের গ্রামগুলোতেও মানুষ ছড়িয়ে পড়ল শতশত। রাতভর এলাকাজুড়ে ও আশেপাশের এলাকায় অপরিচিতার তল্লাশি চলল। অথচ দুর্ভাগ্যবশত কেউই মারিদের অপরিচিতার খোঁজ দিতে পারল না। শত শত, হাজার হাজার এলাকাবাসীর খোঁজাখুঁজিতেও অপরিচিতার বিন্দুমাত্র তথ্য বেরিয়ে আসল না। মারিদের টাকা দু’হাতে খরচ করতে দেখা গেল হাসিব ও রিফাতকে। এলাকাবাসী যে বা যারা অপরিচিতার খোঁজে নেমেছে, তাদের সবাইকে কিছু অর্থসহ খাবার দেওয়া হচ্ছে পুলিশের মাধ্যমে। এই কার্যক্রম চলল রাত তিনটার নাগাদ। মারিদ এলাকার বাজারের একটা বেঞ্চে মাথা নুয়ে শক্ত হয়ে বসে। চারপাশে শুধু একই গুঞ্জন। আদৌও মারিদের অনুসন্ধানকৃত এমন কোনো মেয়ে আছে কিনা? তাছাড়া যদি সত্যি খানপুর গ্রামে কোনো মেয়ের উপর অ্যাটাক করা হতো, তাহলে এলাকাবাসীর মধ্যে কারও না কারও চোখে তো পড়তো বিষয়টা। অথচ গ্রামবাসীদের কথা অনুযায়ী, তাদের গ্রামে আজ এমন কোনো ঘটনা ঘটতে শোনা যায়নি।
নেই! নেই! নেই। অপরিচিতার খোঁজ কোথায় নেই। হঠাৎ করেই যেন মেয়েটি ঘায়েব। শক্ত কাঠ হয়ে বসে থাকা মারিদের মনের অবস্থা বোঝা দায়। রিফাত সেই বিকেল থেকে দৌড়াদৌড়ি করতে করতে এখন সে বেশ ক্লান্ত। রাত তখন তিনটা দশ মিনিট। রিফাত ক্লান্তিতে মারিদের পাশাপাশি একটা বেঞ্চে বসতে বসতে বলল,
‘ আমার মনে হয় না তোর অপরিচিতা নামের কোনো মেয়ের উপর আজ এই গ্রামের অ্যাটাক হয়েছে। যদি এমন কিছু হতো, তাহলে হাজার হাজার গ্রামবাসীর মধ্যে কারও না কারও নজরে তো সেটা অবশ্যই পড়তো, তাই না? একটা মেয়ের উপর দিনের বেলায় কেউ গুলি করছে আর সেটা কেউ দেখবে না, এমনটা তো হওয়ার কথা না মারিদ। তুই মেয়েটাকে আবার কল করে দেখবি, ফোন যায় কিনা?
রিফাতের কথায় মারিদের ছোট উত্তর আসলো তক্ষুনি….
‘ফোন বন্ধ।
মারিদের কথায় রিফাত বেশ চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল…
‘আমি আসলে কাহিনিটা বুঝতে পারছি না মারিদ। মেয়েটার চিৎকার, গুলির শব্দ, লোকদের হইচই এসব কিছু আমিও শুনেছি। আবার মেয়েটার ফোনের লাস্ট লোকেশন এই এলাকা দেখাচ্ছে। অথচ এখানে এসে মেয়েটির কোনো অস্তিত্ব খুঁজে পাচ্ছি না। গোটা পাঁচ এলাকায় আমাদের মানুষ ছড়িয়ে পড়েছে, কারও মুখে শুনলাম না এমন কোনো ঘটনা ঘটেছে আজ। স্ট্রেঞ্জ! তোর কাছে বিষয়টা ঘোলাটে লাগছে না?
নিশ্চুপ মারিদ মাথা নুয়ে তখনো রিফাতের কথাগুলো শুনল। মারিদকে হ্যাঁ বা না উত্তর করতে না দেখে রিফাত বুঝল মারিদের বেগতিক মনের অবস্থাটা। তাই রিফাত মারিদকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল,
‘ আমাদের এবার ঢাকায় ফিরে যাওয়া উচিত মারিদ। বাসায় সবাই টেনশন করছে। এইভাবে আর কতক্ষণ খুঁজবি?
মারিদ জেদি গলায় বলল…
‘যতক্ষণ লাগে।
‘যদি না পাস?
‘ তাহলে মাটি খুঁড়ে হলেও লাশ বের করব। তারপরও বের করব। আমার মেয়েটিকে চাই, মানে চাই। অ্যাট এনি কস্ট।
‘তুই জেদ দেখাচ্ছিস মারিদ। এইভাবে কতদিন খুঁজবি?
‘যতদিন লাগে।
রিফাত নিশ্চল দু’চোখে তাকিয়ে রইল মারিদের দিকে। মারিদ ত্যাড়া ও জেদি মানুষ, সেটা সে বাল্যকাল থেকে দেখে এসেছে, কিন্তু মারিদকে কখনো মেয়েলি বিষয় নিয়ে জেদ দেখাতে দেখেনি। মারিদের ভাষ্যমতে, মারিদ কোনো এক মেয়ের সাথে ছয় মাস যাবত কথা বলে, অথচ মেয়েটিকে সে কখনো দেখেনি আর না মেয়েটির পরিচয় জানে। একটি অপরিচিত মেয়ের সাথে মারিদ এতদিন কথা বলছে, সেই খবর রিফাতও জানে না। হ্যাঁ, একদিন দুপুরে মারিদ গাড়িতে বসে বলেছিল সে পারিবারিক পছন্দে বিয়ে করবে না, নিজের পছন্দে করবে। তখন রিফাত ধরে নিয়েছিল মারিদের পছন্দের একটা মানুষ আছে। কিন্তু এই কথা মারিদ কখনো নিজের মুখে স্বীকারোক্তি দেয়নি যে তার পছন্দের মানুষ আছে বলে। আজ এতদিন পর হঠাৎ শুনতে পারে মারিদের সেই পছন্দের মেয়েটির উপর কারা যেন অ্যাটাক করেছে। পাগল পাগল হয়ে মারিদ ঢাকা থেকে এত দূরে যশোরে ছুটে আসল সবকিছু ছেড়েছুঁড়ে। অথচ এখানে এসে পুলিশ প্রশাসন থেকে শুরু করে শত শত গ্রামবাসীকে মেয়েটির খোঁজে লাগাল অত্র পাঁচ এলাকায়। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত কেউই মারিদের অপরিচিতার খোঁজ দিতে পারল না। এখন রিফাতের মনে হচ্ছে, আসলেই মারিদের জীবনে অপরিচিতা নামে কেউ ছিল? নাকি সবকিছু মারিদ নিজের হ্যালুসিনেশন থেকে করছে? মারিদ কি কোনোভাবে মানসিকভাবে অসুস্থ? মারিদকে দেখে তো তা মনে হয় না রিফাতের? আবার মারিদ ছয় মাস যাবত কোনো মেয়ের সাথে দিনরাত ফোনে কথা বলেছে, সেটা রিফাতের চোখেও তো পড়েনি। অথচ প্রায় দিনই তো রিফাত মারিদের সঙ্গে থাকত, কই তখন তো মারিদকে কারও সাথে ফোনে কথা বলতে দেখা যায়নি? মারিদের অপরিচিতা কি আসলেই সত্য নাকি মিথ্যা? যদি সত্যি হয়ে থাকে, তাহলে মেয়েটি এখন কোথায় আছে?
রিফাতের দ্বিধার মধ্যে মারিদের অপরিচিতার অনুসন্ধান রাত চারটে নাগাদ শেষ হলো। সবারই একই কথা, এমন কোনো ঘটনা এই পাঁচ এলাকার ভিতরে ঘটেনি। এবার পুলিশও এলাকাবাসীর কথায় বিশ্বাস করল। সারারাত পুরো গ্রামের প্রতিটি ঘরে ঘরে গিয়ে মেয়েটির খোঁজ করেও যখন পায়নি, তখন সবাই বিশ্বাস করল মারিদের বলা এমন কোনো ঘটনা ঘটে এই এলাকায়। অথচ মারিদ তখনো অবিশ্বাসের তীরে রইল। রিফাত এলাকাবাসীদের থেকে বিদায় নিয়ে তারা পুনরায় পুলিশ স্টেশনে পৌঁছাল। সেখান থেকে হেলিকপ্টার করে ঢাকার উদ্দেশ্যে রওনা হলো ভোর পাঁচটায়। ক্লান্ত মারিদ আরও ক্লান্ত হয়ে গেল। সারাদিনের অনাহার আর দৌড়ঝাঁপে অতিরিক্ত মানসিক টেনশনে সে হঠাৎ করেই রিফাতের কাঁধে ঢলে পড়ল, বেহুঁশ হয়ে। মারিদ বেহুঁশ হতেই অস্থির উত্তেজনা দেখা গেল রিফাত আর হাসিবের মাঝে। রিফাত হেলিকপ্টারের পাইলটকে বলল হেলিকপ্টারটি সরাসরি ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে যেতে। আর হাসিবকে বলা হলো মারিদের অসুস্থতার খবরটি আপাতত মারিদের পরিবারের কাউকে না জানাতে। মারিদের সুস্থতা নিশ্চিত করেই সৈয়দ বাড়িতে ফোন দিবে রিফাত। সারারাতের দৌড়াদৌড়িতে রিফাতও বেশ ক্লান্ত। সঙ্গে যা নগদ টাকা নিয়ে গিয়েছিল, সব শেষ এলাকাবাসীদের দিয়ে। বেশ বড়সড় অ্যামাউন্টের টাকা ট্রান্সফার করা হয় ঐ এলাকার চেয়ারম্যান সাহেবের অ্যাকাউন্টে, যারা মেয়েটির খোঁজে সাহায্য করেছিল যে সকল এলাকাবাসীদের টাকাগুলো দিতে। চেয়ারম্যান সাহেব আশ্বস্ত করল যে, সে এই অ্যামাউন্টের টাকা গ্রামবাসীদের মাঝে বিতরণ করবে। রিফাত মারিদকে ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে ভর্তি করিয়ে ঘুমের ইনজেকশন দিল। অনিদ্রা আর অতিরিক্ত মানসিক টেনশন থেকে জ্ঞান হারিয়েছে মারিদ। যথাযথ ঘুম হলে সুস্থ হয়ে যাবে। রিফাত ক্লান্ত দু’চোখে মারিদকে দেখে কেবিন থেকে বের হতেই হাসিবকে দেখল কেবিনের দরজার সামনে দাঁড়িয়ে। রিফাত হাসিবের উদ্দেশ্যে বলল,
‘তুমি বাসায় যাও হাসিব। আমি আছি তোমার স্যারের পাশে। তুমি বাসায় গিয়ে কিছুক্ষণ রেস্ট নাও। তারপর না হয় আবার এসো এখানে। যাও।
রিফাতের কথায় হাসিব প্রথমে যেতে রাজি না হলেও পরবর্তীতে রাজি হলো। হাসিব রিফাত থেকে বিদায় নিয়ে বেরিয়ে যেতে রিফাতের ফোনে বিদেশি নাম্বার থেকে কল আসল। পরিচিত নাম্বার দেখে রিফাত বেশ ক্লান্তিতে সেই কলটি রিসিভ করল। দুর্বল চিত্তে বলল,
‘তুই দেশে আসবি কবে রাদিল?
ফোনের ওপাশ থেকে শোনা গেল রাদিলের উৎকণ্ঠা। বেশ চিন্তিত স্বরে রাদিল জানতে চেয়ে বলল,
‘মারিদের জ্ঞান ফিরেছে?
‘না।
‘মেয়েটার খোঁজ পেয়েছিস?
‘না।’
রিফাত পুনরায় একই প্রশ্ন করল রাদিলকে। বলল…
‘তুই দেশে আসবি কবে?
রাদিল খানিকটা চিন্তিত স্বরে উত্তর দিয়ে বলল..
‘আমার আরও দুটো এক্সাম বাকি। শেষ না করে ফিরতে পারছি না। তুই মারিদের পাশে থাক রিফাত। ওর জ্ঞান ফিরলে আমাকে ফোন দিস, কথা বলব।
‘আচ্ছা।
চলমান….
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)