ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকা:_রিক্তা ইসলাম মায়া
০৩
‘ক্লাসে বসে এত মনোযোগ দিয়ে কী লিখছিস তুই?
পাশাপাশি সিটে বসতে বসতে কথাটা বলল মাহি। চিঠি লেখায় মনোযোগী তনিমা মাহির দিকে তাকাল না। বরং সেইভাবে কাগজে কলম চালিয়ে লিখতে লিখতে বলল…
‘প্রেমপত্র লিখছি।
তনিমার কথাটা প্রথমে বুঝতে না পেরে মাহি পাশ থেকে তনিমার লেখায় উঁকি দিয়ে দেখতে চেয়ে বলল…
‘প্রেমপত্র লিখছিস? কিসের? দেখাতো তোর প্রেমপত্রটা একটু দেখি।
পাশ থেকে মাহি উঁকি মারতে তনিমা চট করে লেখার কাগজের ওপর বই চাপিয়ে ঢেকে নিল। বিরক্তির চোখে মাহির দিকে তাকিয়ে বলল…
‘ কারও ব্যক্তিগত জিনিস দেখতে নেই। জানিস না?
তনিমার কথায় মাহি কপাল কুঁচকে বলল…
‘তোর আর ব্যক্তিগত জিনিস। তোর কী এমন আছে যেটা আমি জানি না?’
‘সব জানলেও এটা জানতে পারবি না। এটা আমার একান্ত তাঁকে নিয়ে লেখা একটা চিঠি। আমি চাই সে ছাড়া অন্য কেউ আমার চিঠি না পড়ুক।
তনিমার কথাটা এবার বেশ সিরিয়াস মনে হলো মাহির কাছে। খেয়ালি ভাব ছেড়ে কপাল কুঁচকাল মাহি। অবিশ্বাস্য গলায় শুধাল…
‘সত্যি তুই ক্লাসে বসে প্রেমপত্র লিখছিস তনি?’
‘হুম।’
‘কাকে?’
‘সোহাগ ভাইয়াকে।
‘আমাদের কলেজের ফাইনাল ইয়ারের সোহাগ ভাইয়া? যার কথা তুই আমাকে বলিস? ওই সোহাগ ভাইকে তুই চিঠি পাঠাবি?
‘হ্যাঁ।
তনিমার সম্মতিতে খানিকটা অসন্তুষ্টি প্রকাশ করে মাহি সোজা হয়ে বসল। ব্যাগ থেকে খাতাপত্র বের করতে করতে ব্যঙ্গ করে বলল মাহি…
‘পছন্দ করেছিস সবে মাত্র তিন মাস হলো, এর মধ্যে তুই চিঠি লিখতে বসে গেছিস? ডাক্তারি ছেড়ে এখন কবি হবি নাকি তনি?
ঢাকা মেডিকেল কলেজের প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থী তনিমা আর মাহি। দুজনের বন্ধুত্ব প্রাইমারি থেকেই। পাশাপাশি বাড়ি হওয়ায় দুজন স্কুল, কলেজ এমনকি ভালো স্টুডেন্ট হওয়ায় একই মেডিকেলে চান্স পেয়েছে। যার দারুণ তনিমার সকল খবরই মাহির জানা। তবে সোহাগের প্রতি তনিমার ভালো লাগা প্রায় তিন মাস যাবত। মেডিকেলে ভর্তি হওয়ার প্রথম দিকেই তনিমার নজরে পরেছিল ফাইনাল ইয়ারের সোহাগকে। ছেলেটা বেশ নম্র, ভদ্র আর ব্রিলিয়ান্ট স্টুডেন্ট। প্রেম-ভালোবাসার মধ্যে নেই, হয়তো পড়াশোনার ক্ষতি হবে ভেবে তাই এরিয়ে চলে। তনিমা শুনেছে ডাক্তারি পড়া সোহাগের প্রথম লক্ষ্য। বেশ কয়েকবার অবশ্য তনিমার সঙ্গে সোহাগের যাতায়াতের পথে দেখা-সাক্ষাৎ হয়েছে, কিন্তু কখনো কথা হয়নি দুজনের। মূলত সোহাগ ছেলেটির প্রশংসা সকলের মুখে শুনতে শুনতে তনিমার মনে সোহাগের প্রতি ভালো লাগা জন্ম নেয়। সেই থেকে তনিমা সোহাগের ফোন নাম্বারও জোগাড় করে কলও করেছিল বেশ কয়েকবার। কিন্তু ভদ্রলোক সোহাগ ভাই তনিমাকে রং নাম্বার ভেবে ব্লক করে দেয়। এ জন্য মূলত পড়ুয়া সোহাগ ভাইকে তনিমা তার স্টাইলে চিঠি লিখতে বসেছে। এই ভেবে, যদি ভদ্রলোক ওর চিঠি পড়ে ওর মনের কথা গুলো বুঝতে পারে নয়তো ফোনে তো ওকে ব্লক করে রেখেছে। তনিমা মাহির কথার জবাবে বলল…
‘ বিষয়টা কবি হওয়ার না মাহি। আসলে আমার মনের কথাগুলো সোহাগ ভাইয়ার কাছে পৌঁছাতে চাইছি বলে এই চিঠির মাধ্যমটা বেছে নিয়েছি। এছাড়া দ্বিতীয় অপশন দেখছি না আমি।
তনিমার কথাটা শেষ হতে না হতেই মাহি ফের ব্যঙ্গ করে বলল…
‘তুই এমনভাবে বলছিস যেন সোহাগ ভাই দুনিয়াতে না থেকে চাঁদের দেশে বসবাস করে। এই বিল্ডিংয়ের তিনতলার ল্যাবে গেলেই পেয়ে যাবি তোর ফেমাস সোহাগ ভাইকে। দেখবি চোখে মোটা চশমা আর গলায় স্টেথোস্কোপ ঝুলিয়ে কেমিক্যাল লাশের পরীক্ষণে ব্যস্ত। যা, গিয়ে দেখ।’
মাহিকে ব্যঙ্গ করে সোহাগের বর্ণনা দিতে দেখে খানিকটা ক্ষেপে যায় তনিমা। ব্যাগে বইখাতা গুছিয়ে চলে যেতে নিলে তৎক্ষণাৎ মাহি তনিমাকে টেনে জায়গায় বসিয়ে দিয়ে ক্ষমা চেয়ে বলল…
‘আচ্ছা, সরি। সোহাগ ভাইকে নিয়ে আর কিছু বলব না। তবে তুই চিঠি না লিখে ভাইয়ার সঙ্গে সরাসরি ফোনে কথা বলতে পারিস। বিষয়টা কাজে দেবে।
তনিমা মন খারাপ করে বলল…
‘আসলে আমি সোহাগ ভাইকে বেশ কয়েকবার কল দিয়েছিলাম, কিন্তু সোহাগ ভাইয়া আমার কল রিসিভ করে না। যদিও প্রথম একবার রিসিভ করেছিল, কিন্তু যখন বুঝতে পারল আমি রং নাম্বারে কলটা দিয়েছি, তখন তিনি আমার কলটা কেটে নাম্বারটা ব্লকলিস্টে ফেলে দেন। ফেসবুকেও একটা ফেক আইডি দিয়ে উনাকে মেসেজ করেছি, কিন্তু উনি আমার মেসেজ সিন করেনি আর না ফ্রেন্ড রিকোয়েস্ট একসেপ্ট করেছেন। সে জন্য মূলত বাধ্য হয়ে শেষ অপশন হিসেবে এই চিঠির মাধ্যম অবলম্বন করেছি। আসলে আমি যতটুকু জানি, সোহাগ ভাইয়া অনেক পড়ুয়া মানুষ। প্রেম-ভালোবাসার মধ্যে নেই। তাই আমিও শেষ একবার চেষ্টা করে এই চিঠিটা ওনার কাছে পৌঁছাতে চাইছি। যেহেতু উনি পড়ুয়া মানুষ, সে জন্য আশা করছি আমার এই চিঠি উনি পড়বেন আর ভাগ্য ভালো থাকলে এই চিঠির উত্তরটাও দিতে পারেন।’
তনিমার কথায় মাহি চট করে পাল্টা প্রশ্ন করল…
‘আর যদি উত্তর না দেন তখন কী করবি?
‘তখন অপেক্ষা করব ওনার ফাইনাল ইয়ারের পরীক্ষা শেষ হওয়া পর্যন্ত। তারপর সরাসরি আমি নিজে গিয়েই ওনাকে আমার মনের কথাগুলো জানাব।’
‘ আর তখনও যদি রিজেক্ট করে দেয় তো?
‘তখনেরটা তখন দেখা যাবে। অগ্রিম ভাবতে চাচ্ছি না।
তনিমার কথায় মাহি খানিকটা চিন্তিত ভঙ্গিতে বলল…
‘আচ্ছা, চিঠি লিখছিস ভালো কথা, কিন্তু পাঠাবি কীভাবে? সোহাগ ভাইয়ার আশেপাশে তো সারাক্ষণ ওনার বন্ধু-বান্ধব থাকে। ওনাকে একা পাওয়া মুশকিল। তাছাড়া সোহাগ ভাইয়ের বন্ধু-বান্ধব যদি জানে তুই জুনিয়র হয়ে সিনিয়রকে প্রেমপত্র দিয়েছিস, তাহলে ঝামেলায় পড়ে যাবি তনি। ওরা কিন্তু পুরো ক্যাম্পাসে তোকে পচিয়ে ফেলবে হাসাহাসি করে। ভেবেচিন্তে কিন্তু চিঠিটা পাঠাস। ওরা সিনিয়র বলে কথা।
মাহির কথায় তনিমাও সেইভাবে স্বতঃস্ফুতার সঙ্গে বলল…
‘আমি জানি বিষয়টা। সে জন্য চিঠিতে আমার পরিচয় গোপন রাখব। আমি কে? আমার নাম কি? আমার পরিচয় কি তা কিছু লিখব না। তবে যদি এই চিঠির উত্তরটা আসে, তাহলে সুযোগ বুঝে কোনো একদিন অন্য কোনো চিঠিতে নিজের পরিচয় জানাব। তবে এখন আপাতত পরিচয় লুকিয়ে বেনামি চিঠি পাঠাব।
তনিমার কথায় মাহিও সম্মতি দিয়ে বলল…
‘সেটাই ভালো হবে। তবে এই চিঠি পাঠাবি কীভাবে?’
তনিমা খানিকটা ভেবে বলল…
‘ক্যান্টিনে যখন ওরা আড্ডা দিতে বসে, তখন সুযোগ বুঝে সোহাগ ভাইয়ার বইয়ের ভিতরে রেখে দেব চিঠিটা।’
‘এক দিন নাহয় লুকিয়ে পাঠালি। রোজ রোজ কি এইভাবে পাঠাবি?’
‘ আরে না। এতো রিস্ক নিয়ে রোজ রোজ চিঠি কে পাঠাবে? তবে এই চিঠিতে লোকেশন দেওয়া থাকবে নেক্সট চিঠিগুলো কোথায় পাঠানো হবে। আমার বাকি চিঠি গুলো সেই লোকেশন অনুযায়ী যাবে বুঝলি?
‘ হুম।
~~
দুপুর ১টা ২৩ মিনিট! কাঠফাটা রোদের উত্তাপ শহরে। গরমে অতিষ্ঠ মানুষ। এমন অতিষ্ঠ গরমে মারিদের জিপ গাড়িটি এসে থামল ঢাকা মেডিকেল কলেজের চত্বরে। সারি সারি গাড়ির সঙ্গে মারিদ নিজের জিপ গাড়িটিও পার্কিং করল। গাড়ি থেকে নামতে নামতে হাতের মুঠোয় গাড়ির চাবির রিংটি পিষল। সূক্ষ্ম নজরে আশেপাশে তাকাতে তাকাতে মুখের মাস্কটি খুলল অতি সন্তর্পণে। চোখে তার রোদচশমা। গায়ে কালো অফিশিয়াল পোশাক। বলিষ্ঠ দেহে কালো শার্টের সঙ্গে কালো প্যান্ট ইন করা। গলায় টাই বা গায়ে কোট নেই। বরং অতি গরমে শার্টের হাতা দুটো টেনে কনুই পর্যন্ত গোটানো। বাঁ হাতের কবজিতে একটা দামি ঘড়িও দেখা গেল। মাত্র কনস্ট্রাকশন সাইট থেকে সরাসরি এখানে এসেছে সে। সে জন্য খানিকটা ক্লান্ত সে। সকাল সাতটায় বের হয়েছিল আর এখন দুপুর হতে চলল, তার খাওয়া-দাওয়া নেই। কনস্ট্রাকশন সাইটের ঝামেলা মিটিয়ে ম্যানেজার আর পুলিশদের বিদায় করে এদিকে এসেছে সে। মূলত মারিদকে বেশ কয়েকবার ফোন করে এখানে আসতে বলেছে রিফাত। হঠাৎ মারিদকে এত জরুরি তলবে কেন এখানে আসতে বলল রিফাত, সেটা আপাতত জানে না মারিদ। তবে রিফাত এই ঢাকা মেডিকেল কলেজের একজন শিক্ষক। সপ্তাহে তিন দিন ক্লাস থাকে রিফাতের। বেশিরভাগ সময় রিফাতের ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে ল্যাবেই কাটে। পেশায় রিফাত একজন পিএইচডি ডিগ্রি অর্জন করা ডাক্তার হলেও সে ডাক্তারির পাশাপাশি ঢাকা মেডিকেল কলেজেও পার্টটাইম শিক্ষকতা করছে সাত-আট মাস ধরে। মারিদ ঢাবিতে পড়াশোনা করলেও সে একজন বংশগত ব্যবসায়ী। তাছাড়া মারিদের সবসময় ডাক্তারির চেয়ে ব্যবসার প্রতিই ঝোঁক ছিল। আর এই মেডিকেল কলেজের চত্বরে সে পড়াশোনার তাগিদে না আসলেও অন্যান্য কারণে বহুবার এসেছে। তবে আজকে মারিদ নিজের কারণে এখানে আসেনি। এসেছে রিফাতের ডাকে। এবার রিফাতটা যে কই, কে জানে? মারিদকে ডেকে রিফাতের লাপাত্তা ব্যাপারটায় বেশ বিরক্ত মারিদ।
অতিষ্ঠ গরমে তপ্ত রোদে দাঁড়িয়ে মারিদ বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে আশেপাশের অনুসন্ধানী চোখে তাকিয়ে রিফাতের খোঁজ করে পকেট থেকে ফোন বের করল। অন্য হাতে চাবির রিংসহ পকেটে হাত গুঁজে সেইভাবে দাঁড়াল গাড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে। আশেপাশে যাতায়াতরত ছাত্র-ছাত্রী সকলের দৃষ্টি বাঁকে বাঁকে মারিদের দিকেই যাচ্ছে। সুদর্শন পুরুষের দিকে সবার দৃষ্টি যাবে সেটাই স্বাভাবিক। তবে এর বাইরেও মারিদের এখানে চেনা পরিচিত অনেকেই আছে, যারা মারিদ আলতাফকে খুব ভালো ভাবেই চেনে। বলতে গেলে, মারিদ আলতাফ নামে ডাকে বেশ বদনাম এই শহরে। বেশ অসংখ্যবার মারামারিতে খবর এসেছে তাঁর। মেজাজ বেশ তীক্ষ্ণ। চট করে রেগে যাওয়ার মতো ব্যামো আছে বলেই মারিদকে সবাই ঘাড় ত্যাড়া লোক বলে চেনে। বদনাম মারিদ আশেপাশে সকলের দৃষ্টি পরখ করে ক্ষিপ্ত মেজাজে রিফাতকে ছোট করে মেসেজ লিখল’ ‘ক্যাম্পাসের নিচে দাঁড়িয়ে আছি। তাড়াতাড়ি আয়। নয়তো চলে যাব।’
মেসেজটা লিখে মারিদ ডায়াল নাম্বারে গেল। কল লিস্টে থাকা ‘বসন্তে পাখি’ সেইভ নাম্বারটি দেখে কল মেলাল তাতে। শেষ দুজনের কথা হয়েছিল সকাল ছয়টার দিকে। তারপর ব্যস্ততায় মারিদ কল দেওয়ার সুযোগ পায়নি বলে এখন কল মেলাল। কিন্তু অপর পাশের কল রিং হতে হতে কলটি কেটে যেতেই মারিদ কপাল কুঁচকাল। সচরাচর কখনো এমন হয় না যে মারিদ কল দিয়েছে আর সাথে সাথে ওপাশের ফোনটি রিসিভ হয়নি। মারিদ দ্বিতীয়বারের মতো কল করতে চাইলে তক্ষুনি কেউ মারিদকে গমগমে গলায় সালাম দিল…
‘আসসালামু আলাইকুম মারিদ ভাই। কেমন আছেন?’
সামনে সোহাগকে হাসি মুখে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে মারিদ ডায়ালকৃত কলটি তৎক্ষণাৎ কেটে ফোনটি পকেটে গুঁজে বেশ স্বাভাবিকভাবেই সোহাগের সালামের উত্তর দিতে দিতে কপাল কুঁচকে বলল…
‘ওয়ালাইকুম সালাম।
মারিদের কুঁচকানো মুখ ভঙ্গিতে সোহাগ চট করে বুঝে ফেলল মারিদ তাকে তখনো চিনতে পারেনি। সেজন্য সোহাগ আগ বাড়িয়ে মারিদকে নিজের পরিচয় দিয়ে বলল…
‘ আপনি আমাকে চিনতে পেরেছেন ভাই? আমি সোহাগ।’
সোহাগ নামটি বলতে মারিদ পাল্টা প্রশ্নে একই ভঙ্গিতে বলল…
‘ নাজিম কাকার ছেলে রাইট?
‘জি ভাই।’
‘পড়াশোনা কেমন চলছে তোমার?’
‘এইতো আলহামদুলিল্লাহ ভাই, চলছে কোনো রকম। কিন্তু আপনি এখানে কী করছেন? কোনো প্রয়োজন এসেছেন ভাই?’
‘হ্যাঁ।’
‘আমার হেল্প লাগবে ভাই?’
মারিদ গম্ভীর মুখ ভঙ্গিতে সোহাগকে জানাল…
‘আপাতত না। রিফাতের জন্য অপেক্ষা করছি।’
‘স্যারের ক্লাস তো শেষ। হয়তো চলে আসবেন এক্ষুনি।’
‘হুম।’
তারপর মারিদের সঙ্গে সোহাগকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা গেল আরও মিনিটখানেকটা সময়। মারিদ থেকে বিদায় নিয়ে সোহাগ চলেই যাবে এর মাঝে তনিমা সোহাগকে ক্যান্টিনে খুঁজে না পেয়ে মাঠে এসে দেখতে পেল গেটের সামনে দাঁড়িয়ে সোহাগ কারও সঙ্গে কথা বলছে। দূর থেকে তনিমা সোহাগের সঙ্গে দাঁড়িয়ে থাকা মারিদকে ঠিকঠাক লক্ষ করেনি। বরং একাকী সোহাগকে দেখে তনিমা ক্যান্টিনের কর্মরত থাকা সাত-আট বছরের একটি ছেলেকে ডেকে তার হাতে পঞ্চাশ টাকার একটি নোট গুঁজে দিয়ে বলল, সোহাগের হাতে তনিমার চিঠিটি দিয়ে আসতে। ছোট ছেলেটির নাম রাসেল। সে তনিমার মুখে বলা সোহাগ নামক ছেলেটিকে চিনতে পারল না। এই কলেজের ক্যান্টিনে সে নতুন কাজ করতে এসেছে মাত্র মাসখানেক সময় হলো। এত অল্প সময়ে সে ঠিকঠাক ছাত্র-ছাত্রীদের চেনে না বলে তনিমা আঙুলে দেখানো ছেলেটির দিকে তাকিয়ে বলল…
‘আমি সোহাগ নামের কাউরে চিনি না আপা। কারে দেব আপনার চিঠি?’
তনিমা ফের আঙুল তুলে গাড়ি পাশে দাঁড়ানো সোহাগকে দেখিয়ে বলল…
‘ঐ যে কালো শার্ট পরা ভাইয়াটা দেখছ, তাঁকে গিয়ে এই চিঠিটা দেবে। কিন্তু আমার নাম বলবে না, কেমন? তুমি কি আমার নাম জানো?’
তনিমার কথায় ছেলেটি তৎক্ষনাৎ অসম্মতি জানিয়ে পাল্টা প্রশ্ন করে বলল….
‘না আপা। আপনার নাম তো জানি না। আপনার নাম কি?
‘ তোমার আমার নাম জানতে হবে না। তুমি গিয়ে শুধু এই চিঠিটা দিয়ে দৌড়ে চলে আসবে তাহলেই হবে। যাও, তাড়াতাড়ি, নয়তো ভাইয়াটা চলে যাবে, যাও যাও।
সোহাগকে চলে যেতে দেখে তনিমা ছোট ছেলেটিকে দৌড়ে পাঠিয়ে সেও ক্যাম্পাসের মাঠ থেকে ক্লাসে চলে গেল। অথচ সোহাগের পাশাপাশি মারিদও দাঁড়িয়ে ছিল গাড়িতে পিঠ ঠেকিয়ে। গাড়ির জন্য তনিমা মারিদকে লক্ষ না করলেও মারিদের পাশাপাশি সোহাগও কালো শার্ট পরেছিল সেদিন। ছোট ছেলেটি চিঠি হাতে দৌড়ে আসতে আসতে ততক্ষণে সোহাগ মারিদ থেকে বিদায় নিয়ে চলে যায়। রাসেল নামক ছোট ছেলেটি সোহাগের জায়গায় মারিদকে কালো শার্টে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে সে তনিমার চিঠিটি মারিদের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে হাঁফানো শ্বাসে বলল…
‘ভাইজান, আপনার চিঠি। লন।’
সাদামাটা পোশাকে সাত-আট বছরের একটি ছেলেকে মারিদের দিকে একটি কাগজে মোড়ানো কিছু বাড়িয়ে দিতে দেখে মারিদ কপাল কুঁচকে তাকাল সেদিকে। সন্দিগ্ধ গলায় বলল…
‘আমার চিঠি?
ছেলেটি তৎক্ষণাৎ মারিদের হাতের ওপর চিঠি রেখে দৌড়ে চলে যেতে যেতে চিৎকার করে বলল…
‘হ ভাইজান! আপা দিছে আপনারে।’
‘আপা দিছে আপনারে’ এই বাক্যটিতে মারিদের কুঁচকানো কপাল আরও কুঁচকে গেল। মারিদের অপরিচিতা কাল রাতেই বলেছিল তার নামে বেনামি চিঠি লিখবে। তাহলে এটা কি মারিদের অপরিচিতার চিঠি? মারিদকে চিঠি দেবে বলে সে তখন ফোন তুলছিল না। তার মানে মারিদের অপরিচিতা ঢাকা মেডিকেল কলেজের শিক্ষার্থী? এখন নিশ্চয়ই মারিদের আশেপাশে কোথাও আছে। লুকিয়ে মারিদকে দেখছে হয়তো। মারিদের অপরিচিতা মারিদকে দেখছে, এই ভাবনাটা মাথায় আসতে মারিদ চট করে আশেপাশে তাকাল দৃষ্টি ঘুরিয়ে। চোখে রোদচশমা খুলে হাতে চিঠিটায় নজর ঘোরাল। কেমন অদ্ভুত শিরশির অনুভূতি হলো তার অপরিচিতার দেওয়া প্রথম চিঠি ছুঁতে পেরে। এই চিঠিটাতে নিশ্চয়ই তার অপরিচিতার ছোঁয়া লেগে আছে। মারিদের মন ব্যাকুলে বারবার হাতের চিঠিটায় চোখ বুলাল। পকেটের ফোনটি বের করে তৎক্ষনাৎ ডায়াল লিস্টে ‘বসন্তের পাখি’ নামক নাম্বারে ছোট করে মেসেজ লিখল ‘আপনি কি ঢাকা মেডিকেল স্টুডেন্ট অপরিচিতা? এই মূহুর্তে কি আমার আশেপাশে আছেন? থাকলে একটু সামনে আসবেন? অল্প দেখব। আপনার চিঠি পেয়ে অদ্ভুত অনুভূতি হচ্ছে। প্লিজ আসবেন?
মারিদের ব্যাকুলতার মাঝে হঠাৎ মনে হলো তার অপরিচিতা বলেছিল চিঠির কথা ফোনে বলা যাবে না। ফোনের কথা ফোনে হবে আর চিঠির কথা চিঠিতে। তাই মারিদ ছোট মেসেজটি লিখেও ডিলিট করে দিল। পাঠাল না। বরং মনকে বুঝাল ব্যাকুল না হতে। মেয়েটি তার কাছে সময় চেয়েছে, মারিদের উচিত তাকে সময় দেওয়া। তাছাড়া মেয়েটি তো আর পালিয়ে যাচ্ছে না মারিদকে ছেড়ে। ঢাকা মেডিকেলের শিক্ষার্থী যখন, তখন মারিদের আশেপাশেই কোথাও আছে মেয়েটি। অস্থির মারিদ নিজের মনকে দমিয়ে গম্ভীর মুখে তাকাল ক্যাম্পাসের দিকে। রিফাতকে আসতে দেখা গেল সেদিক থেকে। মারিদ গম্ভীর মুখে পুনরায় চোখে রোদচশমা পরতে পরতে হাতের চিঠিটা পকেটে গুঁজে গাড়িতে উঠে বসল। অপর হাতে চাবির রিং বের করে মারিদ গাড়ি স্টার্ট করতে রিফাত মারিদের পাশাপাশি সিটে বসতে বসতে ক্লান্তিতে হাতের অ্যাপ্রন আর স্টেথোস্কোপটা জিপের পেছনের সিটে ফেলতে ফেলতে বলল…
‘ ভাই আগে রেস্টুরেন্টে চল। সেই ক্ষুধা লেগেছে। উফ!
মারিদ গাড়ি ঘুরাতে ঘুরাতে বলল…
‘আমাকে এখানে ডাকার কারণ?
মারিদের কথায় রিফাত হেয়ালি করে বলল…
‘আমার টাকা শেষ। ভাবলাম তোর টাকায় লাঞ্চ করব, সে জন্য ডেকেছি।’
রিফাতের অহেতুক কথায় মারিদ উত্তর করল না। বরং বিরক্তিতে কপাল কুঁচকে গাড়ি স্টিয়ারিং ঘুরাল। মারিদকে চুপ থাকতে দেখে রিফাত সত্যি জানিয়ে বলল…
‘ আচ্ছা শোন বলছি, তোর মা আর আমার মা মিলে আমাকে দায়িত্ব দিয়েছে তোকে বিয়ের জন্য রাজি করাতে। আজ সন্ধ্যায় ওরা একটা মেয়ে দেখতে যাবে। সে জন্য ওরা আমাকে খুব তেল মেরেছে যেন তোকে নিয়ে যাই মেয়ের বাড়িতে। আমিতো জানি তুই বিয়ের জন্য রাজি হবি না। সেজন্য ভাবলাম তুই যখন বিয়ে করবিই না, তখন আগে ট্রিট খেয়ে নিই। তুই বিয়ে করলেও ট্রিট পাই আবার না করলেও আমি ট্রিট পাই, বুঝলি।
রিফাতকে বিষন্নয়ে চমকে দিয়ে মারিদ হঠাৎ বিয়েতে সম্মতি দিয়ে গাড়ি স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে বলল…
‘তোকে কে বলেছে আমি বিয়ে করব না। বাসায় ফোন করে বল, আমি সন্ধ্যায় মেয়ে দেখতে যাব।
মারিদের কথাটা কেমন অবিশ্বাস্য লাগল রিফাতে নিকট। রিফাত অবিশ্বাস্য গলায় শুধালো…
‘সত্যি তুই বিয়ে করবি?
‘কেন, আমাকে কি তোর তৃতীয় লিঙ্গ মনে হয়? যে বিয়ে করতে চাইব না।
‘ আরে না, ধুর। দাঁড়া আগে আমি বাসায় খবর দিই।
রিফাত খুশিমনে নিজের ফোন খুঁজতে গাড়ির পেছনে রাখা ব্যাগে হাত বাড়াল। ততক্ষণে মারিদের কোলে থাকা ‘বসন্তের পাখি’ কলটি কেটে গেল। মারিদ গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরাতে ঘুরাতে সেদিকে তাকাল। ১ মিনিট ০৬ সেকেন্ড লাইনে ছিল কলদাতা। মূলত মারিদ গাড়িতে বসতেই ‘বসন্তের পাখি’ নামে কলটি এসেছিল তার ফোনে। মারিদ সুযোগ বুঝে কলটি রিসিভ করে ফোনটি কোলে রাখে উল্টো করে। মূলত মারিদ পূর্ব থেকে জানত রিফাত মারিদের বিয়ের প্রসঙ্গ টানবে কথায় কথায়। হলোও তাই! রিফাত মারিদের বিয়ের প্রসঙ্গ টানতে মারিদও সম্মতি জানাল কলদাতাকে শুনিয়ে শুনিয়ে। মূলত মারিদ বিয়ের খবরটা শুনে অপরিচিতা কেমন রিয়্যাকশন দেয়, সেটা জানতে চায় মারিদ। তাছাড়া মারিদ জানে মেয়েটি তাকে পছন্দ করে, তারপরও মারিদ চায় অপরিচিতা তা নিজের মুখে স্বীকার করুক এবং স্বইচ্ছায় মারিদের সামনে আসুক। মারিদের বয়স ত্রিশের কোঠায়। সে এসব প্রেম-ট্রেমে বিশ্বাসী নয়। অপরিচিতাকে ভালো লাগে, তার মানে মারিদ সোজা বিয়ে করে নেবে মেয়েটিকে এবার সে দেখতে যেমনই হোক। চেহারা দিয়ে ভালোবাসা হয়না। মনে মিল হলেই হলো। আর মারিদের মন বসে গেছে মেয়েটির উপর। এই যেমন আজ মারিদ কতো ব্যস্ত ছিল। ব্যস্ততায় সে সকাল থেকে না খাওয়া তারপরও মেয়েটিকে সে প্রতি সেকেন্ডে সেকেন্ডে মিস করেছে। আর এই ব্যকুলতাটা মারিদেরকে ক্রমে অধৈর্য্য পুরুষের রুপান্তর করছে। বাকি রইল অপরিচিতার ফ্যান্টাসি? তাহলে এসব ফ্যান্টাসি বিয়ের পরে চলুক, সমস্যা নেই। কিন্তু আগে বিয়েটা করে নিক। মারিদের মনস্তাত্ত্বিক ভাবনায় ততক্ষণে রিফাত মারিদের মা সালমা সৈয়দকে কল মিলাল। প্রথমবার রিং হতেই শোনা গেল ভদ্রমহিলা গলার স্বর। রিফাত সালাম দিয়ে বলল…
‘মামি, মারিদ বিয়েতে রাজি হয়েছে। বলেছে সন্ধ্যায় মেয়ে দেখতে যাবে। তোমরা আয়োজন ক…’
রিফাতের কথা শেষ হওয়ার আগেই মারিদ গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে কপাল কুঁচকে বলল…
‘আমি বিয়ে করব, তোকে কখন বললাম?’
মারিদকে পাল্টি নিতে দেখে রিফাত তৎক্ষণাৎ সালমা সৈয়দের কল কেটে দিতে দিতে তাড়াহুড়োয় বলল…
‘মামি, আমি ভুল বলেছি। মারিদ বিয়েতে রাজি হয়নি। বিয়ে ক্যানসেল।’
ফোন কেটেই রিফাত কপাল কুঁচকে মারিদকে তীক্ষ্ণ গলায় প্রশ্ন করে বলল…
‘মাত্র না বিয়েতে সম্মতি দিলি? তাহলে মুহূর্তে পাল্টি নিলি কেন?’
মারিদ সেইভাবে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘোরাতে ঘোরাতে দূরের রাস্তার দিকে তাকিয়ে জবাবে বলল…
‘বিয়ে করব বলেছি, কিন্তু পরিবারের পছন্দে বিয়ে করব এটাতো বলিনি। তোর বুঝার ভুল।
মারিদের কথায় এতক্ষণ না চমকালেও এবার বেশ চমকাল রিফাত। খানিকটা অবিশ্বাস্য গলায় শুধাল…
‘তার মানে তুই নিজের পছন্দে বিয়ে করবি মারিদ?’
রিফাত চমকানো মনোভাব বাড়িয়ে দিয়ে মারিদ ফের সম্মতি দিয়ে বলল…
‘করলাম। এতে সমস্যা কোথায়?’
‘ তার মানে তুই কাউকে পছন্দ করিস? মেয়েটা কে মারিদ?
মারিদ আর পছন্দের বিয়ে সত্যি? এই মেজাজী ছেলেও কাউকে পছন্দ করতে পারে? আল্লাহ এটা রিফাত জানে না? মারিদ কি প্রেম করছে? এজন্য এতদিন ধরে বিয়ে করতে চাইছে না? রিফাতের কোনো কথায় মারিদকে আর উত্তর করতে দেখা যায়নি। কেমন গম্ভীর মুখে ছিল বাকিটা সময়। কিন্তু অস্থির রিফাতের ব্যকুলতার শেষনেই যবে থেকে বুঝতে পারলো মারিদের কোথাও পছন্দ আছে বলে। অথচ প্রেমে অবিশ্বাসী মারিদ এটা বুঝতে পারল না সে ক্রমশ একটা অনিশ্চিত ভবিষ্যতে দিকে এগোচ্ছে।
চলতি…
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৩
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৯
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৪