ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকা:রিক্তাইসলাম_মায়া
২১
সূর্য ঠিক মাথার উপর। সময় ১২:২৮। শীতকাল হওয়ায় সূর্যের আলোর তেজ নেই তেমন। নরম আর উষ্ণময়। চারপাশে কুয়াশাও রয়েছে। তনিমা ক্লাসে বসে, পাশে মাহি। রিফাত তনিমাদের বায়োকেমিস্ট্রি ক্লাস করাচ্ছে। হোয়াইট বোর্ডে লিখে কিছু বোঝাচ্ছে রিফাত। সকলের মনোযোগ সেদিকেই। কিন্তু তনিমার মনোযোগ বারবার ছুটে যাচ্ছে রিফাতকে লক্ষ্য করে। রিফাতের হাতের লেখাটা বেশ অনেকটা মিলে যাচ্ছে তনিমার চিঠিওয়ালার সাথে, সেজন্য তনিমার দৃষ্টিভঙ্গি রিফাতের উপর মনোযোগ হারাচ্ছে। অস্থির উত্তেজনা বারবার গ্রাস করছে তনিমাকে। তনিমা অস্বস্তিতে পড়ে যাচ্ছে। ছাত্রী হয়ে টিচারকে চিঠি লেখার—ব্যাপারটা লজ্জাজনক, আবার চিঠিওয়ালার প্রতি অসংখ্য অনুভূতিগুলোও তনিমাকে প্রতিবাদ জানাচ্ছে। তনিমা যখন চিঠি লিখত তখন স্যারকে ভেবে তো লেখেনি, লিখেছে সোহাগকে ভেবে। কিন্তু সেই চিঠি যদি রিফাতের হাতে পড়ে থাকে তাহলে রিফাত কেন তনিমাকে চিঠি লিখত? সেও কি তনিমার জায়গায় অন্য কাউকে ভেবে চিঠি লিখত তনিমাকে? নাকি তনিমাকে চিনেই রিফাত চিঠিগুলো লিখত? চিঠির লেখাগুলো স্পষ্ট করে চিঠিওয়ালা কাউকে ভালোবেসেই চিঠিগুলো লিখত। তাহলে কি সেটা তনিমাকে নাকি অন্য কাউকে নিয়ে লেখাছিল? নাকি তনিমাই আবার ভুল করছে রিফাতকে চিঠিওয়ালা ভেবে? আচ্ছা, তনিমা কি একবার রিফাত স্যারের সঙ্গে কথা বলে দেখবে?
অস্বস্তিতে তনিমা দ্বিধায় পড়ে গেল। এর মাঝে ক্লাস শেষ হওয়ার ঘণ্টা পড়ে যেতেই রিফাত ক্লাস শেষ করে খাতাপত্র নিয়ে বেরিয়ে যেতেই তনিমাও ধড়ফড়িয়ে উঠে দাঁড়াল। রিফাতকে কী প্রশ্ন করবে তনিমা জানা নেই। তবে মনের সংশয় দূর করার জন্য হলেও একবার কথা বলা দরকার তনিমার। তনিমার গায়ে একটা কাশ্মীরি চাদর। কাঁধে কলেজ ব্যাগটা চাপিয়ে ছুটল রিফাতের পিছনে। রিফাত করিডোর দিয়ে হেঁটে যাচ্ছিল অফিস-রুমের দিকে। ভাবখানা গম্ভীর। হঠাৎ তনিমা পিছন থেকে ডাকল….
‘স্যার।
খুবই নরম গলায় ডাকল তনিমা। রিফাত ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনে তনিমাকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন করে বলল….
‘ইয়েস, কিছু বলবেন?
রিফাত প্রফেশনাল হিসেবে প্রত্যেকটা স্টুডেন্টের সঙ্গে ‘আপনি’ সম্বোধন করে। এটা রেস্পেক্ট। সেক্ষেত্রে তনিমাকেও তাই বলা হলো। তনিমা রিফাতকে ডেকেও কথা বলছে না। বরং অকারণে অস্বস্তিবোধ করছে রিফাতের সামনে দাঁড়িয়ে। রিফাত তনিমার ভাবভঙ্গি দেখে কপাল কুঁচকাল। তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে বলল….
‘আর ইউ ওকে মিস তনিমা?
‘জি স্যার।
‘কী জন্য ডেকেছেন বলুন।
তনিমা ফের হাঁসফাঁস করল রিফাতকে চিঠিওয়ালার প্রসঙ্গে কথা বলতে। ব্যাপারটা প্রেমজনিত, তাই সে লজ্জা পাচ্ছে ক্যাম্পাসে দাঁড়িয়ে স্যারকে কিছু বলতে। যদি রিফাত চিঠিওয়ালা না হয় আর এটা নিয়ে যদি রিফাত তনিমাকে অপমান করে তাহলে সে লজ্জায় আর ক্যাম্পাসেই আসতে পারবে না। অপমানের ভয়ে তনিমা মনের কথাগুলো ঢোক গিলে নিল। আর জবান অবধি আনল না। ভয়ে তনিমা প্রসঙ্গ পাল্টে বলল…
‘আমার ছুটি লাগবে স্যার।
ছুটির কথা শুনে রিফাতের কুঁচকানো কপালটা আরও কুঁচকে গেল। একজন মেডিকেলের স্টুডেন্টের ছুটি চাওয়াটা নির্বোধের কাজ। একজন মেডিকেল স্টুডেন্টকে হতে হবে পড়াশোনার প্রতি সিরিয়াস ও ডেডিকেটেড। অকারণে তাদের ছুটি কাটানোর সাজে না। রিফাত গম্ভীর গলায় বলল…
‘কয়দিন?
‘জি স্যার, তিন দিন।
‘নট একসেপ্টেড। এক দিন ছুটি পাবেন, তাও সেটা আমার ক্লাস টেস্ট পরীক্ষার পরদিন। পরশু দিন আমার ক্লাস টেস্ট পরীক্ষা, যান গিয়ে প্রিপারেশন নিন। গো।
রিফাত ব্যক্তিগত জীবনে চঞ্চল হলেও সে প্রফেশনাল জীবনে খুবই স্ট্রিক্ট এবং গম্ভীর মানুষ। পড়াশোনার প্রতি কোনো ছাড় তার কাছে চলে না। লাইফে সবকিছু নিয়ে ছেলেখেলা করলেও সে কখনো পড়াশোনা নিয়ে ছেলেখেলা করেনি, তাই মারিদ, রাদিলের মতোই সেও বরাবরই ভালো নম্বর পেয়েছে প্রতিটা স্তরে। তনিমা অস্বস্তিতে রিফাতের চলে যাওয়া দেখল। তনিমার ছুটি লাগবে না। সে কথা কাটাতে গিয়ে হাঁসফাঁস করে রিফাতকে ছুটির কথাটা বলে ফেলেছে। কিন্তু এইভাবে তো চলবে না। তনিমার যেভাবে হোক রিফাতের সঙ্গে একবার চিঠিওয়ালার প্রসঙ্গে কথা বলার দরকার। কিন্তু সরাসরি রিফাতের সঙ্গে কথা বলার সাহস তনিমার নেই। স্যার হিসেবে তনিমা রিফাতকে ভয় পাচ্ছে। তাহলে কীভাবে কথা বলবে? আবার চিঠি লিখবে? না, এটাতেও রিস্ক। তনিমা আবার ধরা পড়ে যাবে; যদি চিঠিওয়ালা রিফাত না হয় তাহলে রিফাত তনিমার চিঠি প্রিন্সিপাল স্যারকে দেখিয়ে পরিবার ডাকার সম্ভাবনা আছে। তাহলে কী করবে তনিমা?
চট করে তনিমার মাথায় আসল রিফাতের পার্সোনাল নম্বরটা সংগ্রহ করতে হবে। রং নম্বর সেজে তনিমা রিফাতকে কল দিলে তখন ধরা পড়ার চান্স নেই। তনিমাও তখন সরাসরি রিফাতকে চিঠিওয়ালার প্রসঙ্গে কথা বলতে সমস্যা হবে না। কিন্তু তনিমা রিফাতের নম্বর সংগ্রহ করবে কীভাবে? কার কাছে রিফাতের নম্বর পাবে? রিফাত আর রাদিল দুজন বন্ধু প্লাস আত্মীয় এটা ক্যাম্পাসের সবাই জানে। রিফাত যেমন স্যার তেমনই রাদিলও স্যার হয় তনিমাদের। রাদিল থেকেও তনিমা রিফাতের নম্বরটা নিতে পারবে না, তাহলে রিফাত এমনিতে জেনে যাবে যে তনিমা রাদিল থেকে রিফাতের নম্বর নিয়েছে। অন্যমনস্ক তনিমা কী করবে ভেবে না পেয়ে পুনরায় ক্লাসে গেল।
~~
সিকদার বাড়ির উঠানে একটা ভ্যানগাড়ি এসে থেমেছে। ভ্যানগাড়িতে বসে হাসান সিকদারের ছোট বোন আলেহা সিকদার। বয়স পঁয়তাল্লিশের ঊর্ধ্বে। গায়ে কালো বোরকা, মুখে নেকাব উঠিয়ে ভ্যানগাড়ি থেকে নামতেই আশনূর বসার ঘর হতে চিৎকার করে দৌড়ে এসে জড়িয়ে ধরল আলেহা বেগমকে।
‘আসসালামু আলাইকুম ফুপি, কেমন আছো? এতোদিন পর আমাদের কথা মনে পড়ল তোমার?
আচম্বিত জড়িয়ে ধরায় আলেহা খানিকটা চমকে পিছনে গেলেন। দুহাতে আশনূরকে জড়িয়ে সালামের উত্তর দিয়ে বলল….
‘আমি ভালো আছি, তোরা কেমন আছিস? আগের থেকে শুকিয়ে গেছিস মনে হয়?
আলেহা একজন স্কুল শিক্ষিকা। সে সর্বত্র শুদ্ধ ভাষায় কথা বলে। তবে সবসময় বলে না। যখন অতিরিক্ত রেগে যায় তখন মাঝেমধ্যে আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলে ফেলে মনের অজান্তে। আশনূর মাথা তুলে দাঁড়াল, উত্তরে বলল…
‘ আমি শুকায়নি তুমি অনেক শুকিয়ে গেছো ফুপি। তুমি আর আমাদের বাড়িতে আসো না কেন? আমাদের ভুলে গেছো?
আলেহা আশনূরের মাথায় হাত বুলিয়ে আদর করে বলল….
‘তোরা ছাড়া আমার আর কে আছে বল? দেরিতে আসি কিংবা তাড়াতাড়ি আসি, আমাকে তো ঘুরে ফিরে তোদের কাছেই আসতে হবে। তোরাই তো আমার শেষ সম্বল। আচ্ছা ছাড় এসব। তোর আব্বা কই আশনূর? তোর দাদীকে দেখছি না কেন? ওরা কই?
ততক্ষণে বাড়ির উঠানে এসে দাঁড়িয়েছে মান্না। নুহাশ আশনূরের পিছন পিছন ছুটে এসেছে আলেহাকে দেখে। আলেহা আশনূরকে ছেড়ে ছোট নুহাশকে কোলে নিয়ে মান্নাকে বলল….
‘আনাজের পাতিগুলো রান্নাঘরে নিয়ে যাও মান্না।
‘জে ফুপুআম্মা।
ভ্যানগাড়িতে বেশ কয়েক পাতি ভর্তি শাকসবজি এনেছে আলেহা। এসব শাকসবজি আলেহার নিজের জমিতে চাষ করা সবজি। মান্না সেগুলো মাথায় করে রান্নাঘরের দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আশনূর আলেহার কথার উত্তরে বলল…
‘দাদী যোহরের নামাজ পড়ছে। আব্বা, মাজিদ ভাই বাড়িতে নাই একটা কাজে বেরিয়েছে ওরা। আম্মা ভাবি রান্নাঘরে রান্না করছে মেহমানদের জন্য। তুমি এসেছ সেটা আম্মা জানে না ফুপি।
‘মাজিদ বাড়িতে আছে?
‘হ্যাঁ।
‘সাজিদ, আহাদ ওরা আসেনি?
‘না।
‘আচ্ছা আয় ঘরে যায়।
আলেহা নুহাশ ও আশনূরকে নিয়ে ঘরে ঢুকতে দেখতে পেল তারানূর বেগম বসার ঘরের খাটের কিনারায় একখানা জায়নামাজে নামাজ পড়ছেন। মোনাজাতে আছেন তিনি। আলেহা মাকে একপলক দেখে নুহাশকে কোল থেকে নামাল। গায়ের কালো বোরকাটা খুলে কাপড়ের আনলায় রেখে আশনূরকে বলল….
‘ যা-তো আমার জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়তো আশনূর। শীতের দিনেও কেমন গলাটা শুকিয়ে গেছে।
‘এক্ষুনি আনছি ফুপি।
আশনূর যাওয়ার আগেই শাহানা বেগম এক গ্লাস পানি নিয়ে বসার ঘরে আসল। মান্না সবজির পাতি নিয়ে রান্নাঘরে ঢুকে শাহানাকে আলেহার আসার খবরটা জানায়। আলেহাকে পানির গ্লাস বাড়িয়ে দিয়ে শাহানা বলল…
‘ কেমন আছো আলেহা? তোমার আইতে পথে কোনো অসুবিধা হই নাই তো?
‘কেন অসুবিধা হলে খুশি হতে বুঝি ভাবি?
শাহানা বেগমের বাড়িয়ে দেওয়া পানির গ্লাসটা নিল না আলেহা। বরং আশনূরকে ফের বলল….
‘যা, ফুপির জন্য এক গ্লাস পানি নিয়ে আয়।
আলেহা একজন শক্ত কাটখোট্টা মানুষ। মুখে ঠাস ঠাস উত্তর দেওয়া উনার স্বভাব। ন্যায় অন্যায় যাই হয় সে তৎক্ষনাৎ বলে দেওয়া মানুষ। মনে কথা হজম করে রাখতে পারে না। ননদ-ভাবীর সম্পর্কটা বদনাম আরও বিশ বছর আগেই। তাই নতুন করে আলেহা আর আদ্যিক্ষেতা দেখায় না। আশনূর মায়ের দিকে এক পলক তাকাতে শাহানা বেগম চোখের ইশারায় বলল আলেহাকে পানি এনে দিতে। মায়ের ইশারায় আশনূর চলে যেতে শাহানা বেগম হাতের গ্লাসটা সোফার টেবিলের উপর রাখল। মাজিদের বউ নদী পর্দা ভেদ করে বসার ঘরে এসেই সালাম দিয়ে বলল…
‘আসসালামু আলাইকুম ফুপু। ভালো আছেন?
অনেক দিন পর আপনাকে দেখলাম।
আলেহা নদীর সালামের উত্তর দিয়ে বলল…
‘ফুপি তোমাদের বাড়িতে আসি না এতে তোমাদের শান্তিতে থাকার কথা বউ। আমি আসলেই তো তোমার শাশুড়ির সংসারে অশান্তি হয়। আমি আবার তোমার শ্বশুর আর দাদী-শাশুড়ির মতো মুখ বুজে চোখ বন্ধ করে রাখতে পারি না। উচিত কথা মুখ থেকে বেরিয়ে যায়। তাই তোমার শাশুড়িকে শান্তি দিতে তোমাদের বাড়িতে আসি না। আবার নিজের বাপের বাড়িও ফেলে পারি না। যতদিন নাড়িছেঁড়া টান থাকবে ততদিন দেরি হলেও এই বাড়িতে আসব। তোমার শাশুড়ীর অশান্তি হলেও আসব।
নদী মুখ ফুটে আর কিছু বলতে পারল না শাহানা বেগমের গম্ভীর থমথমে মুখটা দেখে। অপমানে থমথমে মুখ হয়ে আছে শাহানা বেগমের। তিনি কিছু না বলে জায়গা ছেড়ে চলে যান। আশনূর হাতে এক গ্লাস পানি এনে দেয় আলেহাকে। আলেহা পানিটুকু পান করতে নদীর ডাক পড়ল রান্নাঘরে। শাহানা বেগম বেশ শক্ত গলায় ডাকছেন নদীকে। আলেহার কথায় বেশ অপমানিত বোধ করেছেন তিনি। হাসান সিকদারের দুই বোন। বড় বোন হাফেজা বছর তিনেক আগেই মারা গেছে ক্যান্সার রোগে আক্রান্ত হয়ে। ছোট বোন আলেহাই জীবিত। আলেহার স্বামীও বছর তিনেক আগে একই বছরে আগুনে পুড়ে মারা যায়। মারা যায় বলতে তাকে মারা হয়। মোল্লা সওদাগরের বড় ছেলে মানিক সওদাগর আলেহার স্বামীর বাড়িতে আগুন জ্বালিয়ে দেওয়ায় সেই আগুনে পুড়ে আলেহার স্বামী ইব্রাহিম মারা যায়। ভাগ্যের জোরে সেদিন আলেহা বেঁচে গিয়েছিল। মানিক সওদাগরের আলেহার স্বামীর বাড়ি পোড়ানোর একমাত্র কারণ ছিল আলেহার ছেলেকে দিয়ে নূরজাহানকে বিয়ে করানো। মানিক সওদাগরের উৎপাতে যখন নূরজাহানের জীবন বিষিয়ে উঠেছিল তখন নূরজাহানের বাবা হাসান আর আলেহা গোপনীয়ভাবে এবং পারিবারিক বৈঠকে নূরজাহানকে আলেহার একমাত্র ছেলে রাসেলের সঙ্গে ফোনে বিয়ে দিয়ে দেন। ভাই-বোনের উদ্দেশ্য ছিল—নূরজাহানকেও গোপনীয়ভাবে পাসপোর্ট ভিসা করে রাসেলের বউ হিসেবে আমেরিকায় পাঠিয়ে দিবে। কিন্তু মানিক সওদাগর কীভাবে যেন নূরজাহানের গোপন বিয়ের খবরটা পেয়ে যায়। রাসেলের সঙ্গে নূরজাহানের ফোনে বিয়ে হওয়াটা আটকাতে না পারলেও নূরজাহানকে শ্বশুর বাড়িতে নিতে পারেনি আলেহা। তার আগেই আলেহার স্বামী ইব্রাহিমকে মারধর করে ঘরে বেঁধে পুরো ঘরবাড়িতে কেরোসিন ঢেলে আগুনে জ্বালিয়ে দেয় মানিক। সেই আগুনে আলেহার স্বামী ইব্রাহিম মারা যায়। আলেহাও নিঃস্ব হয়ে যায়। তারপরই আলেহার ছেলে মানিকের ভয়ে নূরজাহানকে অস্বীকার করে গত বছর আমেরিকায় এক প্রবাসী বাঙালি মেয়েকে বিয়ে করেছে। সে আর কখনো বাংলাদেশে আসবে না বলেও জানিয়েছে। আলেহার সন্তান বলতে একটা ছেলে রাসেল। সে আমেরিকায় থাকে। মেয়ে নেই। শ্বশুর-শাশুড়ি নেই। পুরো বাড়িতে একজন কাজের মেয়েকে নিয়ে থাকে আলেহা। আগুনে পুড়ে যাওয়া ঘর দুটো পুনরায় বানিয়েছে আলেহা। রাসেল মাকে রোজ বলে তার কাছে আমেরিকায় চলে যেতে কিন্তু আলেহা যায় না। তিনি স্বামীর শেষ সম্বল আঁকড়ে বাঁচতে চায়।
নদী চলে গেল। আশনূর আলেহার পাশে বসল। তারানূর বেগম মোনাজাত শেষ করে মেয়েকে এতদিন পর দেখে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে কেঁদে দিলেন। আলেহা উপর দিয়ে শক্ত বোঝালেও উনার মনটা বেশ নরম। আর নরম বলেই যেখানে গোটা দুনিয়া আলেহার স্বামী ইব্রাহিমের মৃত্যুতে নূরজাহানকে দায়ী করে, সেখানে তিনি নূরজাহানের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি আলাদা রাখেন। তারানূর বেগমের কান্না দেখে আলেহা বলল….
‘বাচ্চাদের মতো করে প্যাঁচ প্যাঁচ কইরা কাঁদবা নাতো আম্মা। আমার অসহ্য লাগে।
‘তুই এমন কাঠখোট্টা ক্যামনে হইলি আলেহা? আমার হাফেজা যদি আইজ বাইছা থাকতো তাইলে আমারে এতদিন না দেইখা থাকবার পারতো না। তুই মেলা পাষাণ হইয়া গেছিস আলেহা।
‘বড় আপা না মইরা আমি মইরা গেলে ভালোই হইতো আম্মা, তোমাদের এতো অশান্তি হইতো না। সবাই শান্তিতে থাকতে পারতা।
আলেহা নূরজাহানের ঘরে গেল। নূরজাহানের কাটা ব্যান্ডেজ করা পাটা বিছানায় একটা বালিশের উপর রেখে গায়ে কাঁথা মুড়ে শুয়ে। গায়ে জ্বর পরশু রাত থেকেই। কাল রাদিল পাটা ব্যান্ডেজ করে দেওয়ার পর নূরজাহানকে রাদিলের দেওয়া প্রেসক্রিপশনে ওষুধ খাওয়াচ্ছে হাসান। সকালে নূরজাহানকে হাসান নিজে খাবার খাইয়ে ওষুধ দিয়ে গেছেন। পায়ের ব্যথা বেড়েছে, সেই সাথে বেড়েছে গায়ের জ্বর। তেতো মুখে সকালে একটু খাবার খেয়েছে তারপর আর কেউ নূরজাহানের খাওয়ার খবর নেয়নি। বড্ড পানি তৃষ্ণা পেয়েছে কিন্তু পায়ের ব্যথায় উঠছে না। শক্ত হয়ে বিছানায় পড়ে আছে, উফ শব্দও করছে না। আলেহা ঘরে ঢুকতে নূরজাহানের বালিশের উপর রাখা কাটা পাটা নজরে পড়তে কপাল কুঁচকাল। নূরজাহান জ্বরের ঘোরে খানিকটা এদিক-সেদিক হচ্ছে। বারবার জিভ দিয়ে ঠোঁট ভেজাচ্ছে তৃষ্ণায়। আলেহা সবকিছু লক্ষ্য করে গম্ভীর গলায় ঘরে প্রবেশ করে বলল…
‘পায়ে ব্যথা পেলি কীভাবে?
পরিচিত কণ্ঠ কানে যেতে নূরজাহান বালিশ থেকে ঘাড় উঁচিয়ে তাকাল পিছনে। আলেহার গম্ভীর মুখটা দেখে নূরজাহান খুশিতে উৎফুল্ল হয়ে তৎক্ষণাৎ ডাকল…
‘ফুপিমণি, তুমি এসেছো?
‘বললি না তো পায়ে ব্যথা পেলি কীভাবে?
নূরজাহানের কথা কাটিয়ে ফের আলেহা একই প্রশ্ন করল। খুশিতে আত্মহারা নূরজাহান বিছানায় উঠে বসল। চুলগুলো এলোমেলো হয়ে পিঠ ছড়িয়ে বিছানায় দলা হয়ে পরে রইল। আলেহা কাছাকাছি আসতেই নূরজাহান ঝাপটে জড়িয়ে ধরে বলল…
‘ফুপি তোমাকে কতদিন ধরে দেখি না, ছুঁতে পারিনি। তোমার শরীরের মা মা গন্ধটা আমাকে খুব টানে। তুমি কেন আসো না ফুপি আমায় দেখতে?
‘আদ্যিক্ষেতা দেখাবি না নূরজাহান, ছাড়। পা কাটলি কীভাবে সেটা বল।
আলেহা জোর করে নূরজাহানকে নিজের থেকে সরিয়ে নূরজাহানের কাটা পাটা তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে দেখতে লাগল। নূরজাহান সবাইকে যে কথাগুলো বলেছে সেই একই কথাগুলো আলেহাকেও বলল…
‘রাতে অন্ধকারে বাথরুমে যেতে গিয়ে দরজায় পড়ে ব্যথা পেয়েছি ফুপি।
‘এই মিথ্যাটা তো সবার জন্য ছিল। আমাকে সত্যিটা বল কীভাবে পেয়েছিস।
‘এটাই সত্য ফুপি।
‘তোর বাপের বোন, তোর ফুপি হয় আমি। আমাকে মিথ্যা বলে তোর বাপও ঠাঁই পায় নাই কখনো। তুই তো তার মেয়ে, তুই কীভাবে ঠাঁই পাবি? সত্যিটা বল নূরজাহান, ব্যথা কীভাবে পেলি? শাহানা ভাবি তোকে আঘাত করেছে না?
আলেহার চোখের দৃষ্টি তীক্ষ্ণ। নূরজাহান চুপ করে যায়। আলেহা বুদ্ধিমতী ও চতুর মহিলা। কে সত্য কে মিথ্যা বলছে সেটা মুখ দেখে চট করে বুঝে ফেলার ক্ষমতা এই আলেহার আছে। নূরজাহান সবার কাছে মিথ্যা বলে পার পেয়ে গেলেও আলেহার সঙ্গে পারল না। আলেহা নূরজাহানের মিথ্যা কথাগুলো চট করে বুঝে গেছে। বসার ঘরে তারানূর বেগমও বলেছেন নূরজাহানের পায়ে ডাক্তার কাঁচের টুকরো পেয়েছে অথচ নূরজাহান বলছে সে দরজায় পা লেগে ব্যথা পেয়েছে। এই বাড়িতে কোনো কাঁচের দরজা নেই, আছে কাঠের দরজা। আর কাঠের দরজায় কাঁচ থাকবে না যে নূরজাহান পরে ব্যথা পাবে। নূরজাহান ফের মিথ্যা বলে বলল…
‘আম্মা কেন আমাকে ব্যথা দিবে? আমিই অন্ধকারে পড়ে গিয়েছিলাম ফুপি। তুমি বেশি ভাবছো।
‘শোন নূরজাহান, তোকে জন্ম না দিলেও তুই কিন্তু আমার হাতে বড় হয়েছিস। তোর রন্ধ্রে রন্ধ্রে পরিচিত আমি। শাহানা ভাবি তোর সঙ্গে খারাপ ব্যবহার করে সেটা জানি, তোকে এখনো মারে?
‘আম্মা কেন মারবে? আর যদি মারেও তাহলে একজন মায়ের অধিকার আছে তার সন্তানকে শাসন করার ফুপি।
‘অধিকার সেখানেই দেখানো যায় যেখানে ভালোবাসা থাকে। যেখানে ভালোবাসা নাই সেখানে কোনো শাসন হয় না, অত্যাচার হয়। শাহানা ভাবি ভালোবেসে তোকে বারবার আঘাত করে না। কোনটা মায়ের শাসন আর কোনটা অবহেলা সেটা বুঝার মতো বয়স আমার হইছে।
দুপুর গড়িয়ে বেলা হলো। সময় ৩:৩৪। হাসান, মাজিদ মারিদদের নিয়ে এখনো বাড়ি ফেরেনি। সকালে নাস্তা শেষে পাঁচ পুরুষ বেরিয়েছিল হাসপাতালের জমিটার মাপজোখ করতে। হাসপাতালের জমিটার কাল রাতেই রেজিস্ট্রি হয়েছে মারিদদের নামে। আজ সেই জমিটার আমিন দিয়ে নাপছে (মাপছে)। আলেহা এসেছে বারোটায়। আলেহা ভাইয়ের অপেক্ষা করে অবশেষে সবাইকে নিয়ে খেতে বসল। শাহানা বেগম বলেছিল সবাইকে ডাইনিং টেবিলে বসতে কিন্তু আলেহা নূরজাহানকে নিয়ে ভাতঘরের ফ্লোরে পাটি বিছিয়ে বসেছে। তারানূর, আশনূর, নুহাশ, তুতুল, নদী, সকলেই গোল করে বসেছে খেতে। নদী তুতুলকে ভাত মেখে খাওয়াচ্ছে। নূরজাহানের পা নিয়ে বসতে সমস্যা হচ্ছে বিদায়, সে পাটির উপর ছোট মোড়ায় বসেছে। সকলেই খাবার খাচ্ছে। শাহানা বেগম সকলের প্লেটে খাবার তুলে দিলেও নূরজাহানকে দিচ্ছেন না। ব্যাপারটা উপস্থিত সবাই দেখেও অদেখা করল। আলেহা নূরজাহানের পাতে মাছ তুলে দিতে নূরজাহান শাহানাকে বলল…
‘আমরা সবাই খাচ্ছি। আপনিও খেয়ে নিন আম্মা।
নূরজাহানের কথায় শাহানা উত্তর দিলেন না। বরং মুখটা আরও গম্ভীর হয়ে গেল। সবার সাথে নূরজাহান খেতে বসায় শাহানা খেতে বসেন নি। তিনি পরে খাবেন। সবাই জানে শাহানা কেন পড়ে খাবেন। নূরজাহানও জানে। তারপরও নূরজাহান মেয়ে হয়ে শাহানার মন জয় করতে সবসময় ছোট বড় সকল চেষ্টা করে যায় শাহানার পিছনে। যদি কোনো একদিন নূরজাহানের জন্য শাহানার মায়া হয় তাই।
নূরজাহান ফের শাহানাকে খাওয়ার জন্য বলতে শাহানা বেগম উঠে চলে গেলেন রান্নাঘরে। আলেহা ধমক স্বরে নূরজাহানকে বলল….
‘খাওয়ার সময় এতো কথা বলিস কেন তুই? চুপচাপ খেতে পারিস না?
নূরজাহান মাথা নুইয়ে খেতে শুরু করে। তারানূর বেগম আলেহাকে বলল…
‘রাসেল ফোন দেয়?
‘দেয়।
‘ তোরে দেখতে হেই দেশে আইব না?
‘না।’
‘ক্যান দেখতে আইব না? বিদেশের বাইত্তে কইদিন থাকব? হেই এহন বিয়াইশাদি করছে, আল্লাহ বাঁচাইলে একদিন পোলা মাইয়াও হইব। হেগরে বাপ-দাদার ভিটা মাটি দেখান লাগব না? সারাজীবন কি ভিনদেশের মাটিতে থাকব?
আলেহা দৃষ্টি তুলে নূরজাহানের দিকে তাকাতে পারল না। উনার ভিতরে একটা অপরাধবোধ কাজ করছে। খুব শখ করে নূরজাহানকে উনার একমাত্র ছেলের সঙ্গে বিয়ে দিয়েছিলেন। ভেবেছিলেন নূরজাহানকে সবার অগোচরে আমেরিকায় পাঠিয়ে দিবেন রাসেলের বউয়ের পরিচয়ে। কিন্তু মানিক নূরজাহানের বিয়ের দিন আলেহার স্বামীকে বেঁধে ঘরসহ আগুনে জ্বালিয়ে দেওয়ায় রাসেল নূরজাহানকে অস্বীকার করে। লাল টুকটুকে বউ সাজে নূরজাহানকেও আলেহা নিজের বাড়িতে উঠাতে পারল না। রাসেল নূরজাহানকে বিয়ে করতে গিয়ে বাবা হারিয়েছে, মাকে হারাতে চায় না বলে সে মানিকের ভয়ে নূরজাহানের সঙ্গে ফোনের বিয়েটা অস্বীকার করেই গত বছর বিয়ে করে নিয়েছে। ছেলের কাজে আলেহা অপরাধবোধ করেন। তিনি নূরজাহানের জীবনটা গোছাতে গিয়ে আরও এলোমেলো ও জটিল করে দিলেন। গ্রামে বদনাম রটে গেল নূরজাহান তালাকপ্রাপ্ত নারী হিসেবে। নূরজাহান ভাবাবেগহীনভাবে খাচ্ছে। দাদী-ফুপির কথায় সে নিরুত্তর। ছোট ছোট লোকমা তুলে মুখে দিচ্ছে। আলেহা ভারি মনে মুখে খাবার তোলার আগে বলল….
‘ছেলের বিদেশে থাকার মন চাইলে থাকব। আমার এতে বাধা নেই। ছেলে জন্ম দিয়েছি, লালন-পালন করেছি, পড়াশোনা শিখিয়েছি, আমার দায়িত্ব শেষ। এখন সে তার নিজের ভালোমন্দ বুঝে কাজ করে বাকিটা জীবন চলবে। মা-বাবা হিসেবে আমাদের দায়িত্ব চুকে গেছে। এবার সে তার বউকে নিয়ে দেশে থাকুক কিংবা বিদেশে সেটা তাদের ব্যাপার।
‘ ক্যান তোর পোলার দায়িত্ব নাই? বুড়া বয়সে হেই তার মাইরে দেখব নাতো কেডাই দেখব? বাপটা তো আগুনে পুইড়া মইরা গেল। এহন মাটা কি হের দায়িত্বে পড়ে না?
‘আম্মা সবসময় বেশি কথা ভালো লাগে না। খেতে বসেছি শান্তি মতো খেতে দাও। আর নয়তো বলো, উঠে যাই আমি।
আলেহার শক্ত গলায় তারানূর বেগম চুপ করে যান। বুঝতে পারেন মেয়ের মনে কিছু একটা নিয়ে কষ্ট চেপে আছে। তারানূর আর কথা বাড়ালেন না। নূরজাহান তখনও মাথা নুইয়ে খাচ্ছে। তুতুল খাবার খাবে না বলে সে চিৎকার করছে তাই নদী ছেলেকে নিয়ে উঠে চলে গেল রুমে। খাওয়া শেষে শেফালি এঁটো প্লেট-বাসন ধুয়ে রেখে গেছে। আশনূর সেগুলো তুলে রাখছে র্যাকে। নূরজাহান পাশাপাশি আশনূরকে সাহায্য করছে। খাওয়া দাওয়া শেষ হয়েছে আরও আগেই। শাহানাও খেয়ে নিয়েছে। আশনূর নূরজাহানের জ্বরের মলিন মুখটা দেখে বলল….
‘তোর কাজ করতে হবে না, ঘরে যা তুই। আমি করে নিব।
নূরজাহানের হাতের চা আলেহা, তারানূর আর হাসানের খুব পছন্দ। দুপুরে খাওয়া শেষে তাদের চা খাওয়ার অভ্যাস আছে। নূরজাহানের কাটা পা নিয়ে কাজ করতে সমস্যা হচ্ছে। মাটির চুলায় সে ছোট পাতিলে চা বসাল। রান্নাঘরের র্যাক থেকে চিনি-পাতার বয়াম নিয়ে বলল….
‘ফুপি আমার হাতের চা খেতে চেয়েছেন বুবু। আমি করে দিচ্ছি।
আশনূর মানা করতে গিয়েও করল না। বরং নূরজাহানের পাটা লক্ষ্য করে বলল…
‘পায়ে এখন ব্যথা আছে? দুপুরে ওষুধ খেয়েছিলি?
‘হ্যাঁ।
আশনূর চুপ করে যায়। নূরজাহান মাটির চুলায় গাছের ডালপালা দিয়ে আগুন ধরাল। আশনূর নূরজাহানের পিঠের দিকে তাকিয়ে বলল…
‘পরশুদিন রাতে আম্মা তোর ঘরে গিয়েছিল তারপরই তুই পায়ে ব্যথা পেয়েছিস না?
নূরজাহান পিছনে তাকাল না। ফুটন্ত পানিতে চিনি আর চা পাতা ঢেলে বলল…
‘আম্মা তোমার জন্য আমার ঘরে গিয়েছিল বুবু। আমি তো অন্ধকারে পড়ে ব্যথা পেয়েছি।
আশনূর কয়েক সেকেন্ড নূরজাহানের পিঠের দিকে তাকিয়ে উঠে গেল। সে আর কথা বাড়াল না। নূরজাহান যে শাহানা বেগমকে বাঁচাতে মিথ্যা বলছে সেটা আশনূর প্রথম দিনই বুঝতে পেরেছিল। নূরজাহান ছয়টা কাপে চা ঢেলে উঠে দাঁড়াল। ঘরে যারা মহিলারা আছে সকলের জন্য নূরজাহান চা বানিয়েছে। আশনূর তারানূর আর আলেহার সঙ্গে গিয়ে বসেছে। বিকাল পাঁচটা বাজে এখনো হাসান মারিদদের নিয়ে বাড়ি ফেরেনি খেতে। নূরজাহান রান্নাঘর পেরোতে ভাতঘরে শাহানা বেগমকে দেখল ফ্রিজ হতে কিছু বের করে রাখছে টেবিলের উপর। নদী নিজের ঘরে ছোট ছেলেকে নিয়ে শুয়ে। নূরজাহান দুহাতে ট্রে এক হাতের তালুতে নিয়ে অপর হাতে একটা চায়ের কাপ শাহানার দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বলল….
‘আম্মা আপনার চা।
শাহানা ফ্রিজ বন্ধ করে নূরজাহানকে এড়িয়ে গেল টেবিলের দিকে। টেবিলের উপর মাছের বরফের প্যাকেটটা রাখা। সেটা পানিতে ভিজাতে দিবেন। নূরজাহান শাহানার পিছনে গিয়ে দ্বিতীয়বার চায়ের কাপটা বাড়িয়ে ধরল….
‘আম্মা আপনার চা-ট..
‘নষ্টের জাত, দূরে গিয়া মর। আমার লগে পিরিতি দেখাইতে মানা করছি না তোরে!
নূরজাহান হাতের চায়ের কাপটা টেবিলের উপর রাখতে চেয়েছিল। কিন্তু শাহানা হঠাৎ রাগে হাত ঝাঁকি দেওয়ায় উনার হাতে থাকা শক্ত বরফের মাছের প্যাকেট ছুটে গিয়ে পড়ল নূরজাহানের কাটা পায়ে। পাথরসম লোহার কিছু পায়ে পড়তে নূরজাহান ককিয়ে চিৎকার করল। নূরজাহানের হাত ফসকে ট্রিতে থাকা বাকি চায়ের কাপগুলো পড়ল নূরজাহানের গায়ে। নূরজাহান ব্যথায় ককিয়ে উঠে মৃদু চিৎকার করল..
‘আল্লাহ গো!
গরম চায়ের সাথে বরফের ইটের মতো শক্ত কিছু কাটা পায়ে পড়তে ব্যান্ডেজের উপর দিয়ে রক্ত ছুটে গেল। নূরজাহান টেবিল ধরে দাঁড়াতে চাইল। চোখ-মুখ ব্যথায় নীল হয়ে যাচ্ছে। চোখে সতেজ ব্যথার পানি জমেছে। নূরজাহানের চিৎকার আর কিছু ভাঙার উচ্চ শব্দে বসার ঘর হতে দৌড়ে আসে আলেহা, তারানূর আর আশনূর। নূরজাহানের চোখে পানি আর ব্যান্ডেজ করা পায়ে রক্তে লাল হয়ে যেতে দেখেই আলেহা দৌড়ে নূরজাহানকে ধরে শাহানাকে কটমট করে বলল..
‘তোমার নূরজাহানের প্রতি এতো বিষ কেন ভাবি? মেয়েটাকে বারবার জখম করতে তোমার বুক কাঁপে না? আজ নূরজাহানের জায়গায় আশনূর হলে তুমি পারতে নিজের মেয়েকে এভাবে আঘাত করতে?
শাহানা নিজেও হতভম্ব হয়ে গেল। তিনি নিজেও বুঝতে পারেনি মাছের প্যাকেট ছুটে নূরজাহানের পায়ে পড়বে। নূরজাহান শাহানা বেগমের থমথমে মুখটা দেখে পরিস্থিতি সামলাতে চেয়ে আলেহাকে থামানোর জন্য বলল….
‘আম্মা কিছু করেনি ফুপি। ফ্লোরে পানি ছিল সেটা আমি দেখিনি তাই পা ফসকে পড়ে গেছি।
নূরজাহানের কথা আলেহা কানে তুলল না। বাপের বাড়ির মানুষজন কে কেমন সেটা আলেহার জানা আছে। আলেহা নূরজাহানকে ধমকে বলল…
‘ শাহানা তোর মা না। আশনূরের মা। তোর মা মরে গেছে। সৎ মার ঘরে থেকেও সৎ মার নাড়িভুঁড়ি এতো বছরেও বুঝলি না। কেন বারবার যাস অপাত্রে ভালোবাসা নিয়ে? সে কোনোদিন তোর কদর বুঝব?
‘এহন বাড়াবাড়ি করতাছো আলেহা। আমি দেইখা দুখ দেই নাই কাউরে।
শাহানার কাছে নূরজাহানের ব্যাপারটা অনাকাঙ্ক্ষিত হলেও আলেহার কথাগুলো ছিল সত্য আর তিক্ত। সত্য কথা তিক্ত হবে সেটাই স্বাভাবিক। সবাই সত্য মেনে নিতে পারে না। শাহানার ক্ষেত্রেও সেটাই হলো। শাহানা উঁচু গলায় আলেহাকে প্রতিবাদ জানাতে, আলেহা মেজাজী ভঙ্গিতে বলল….
‘তোমার ভালো মানুষির চেহারা অন্য কাউকে বোঝাও ভাবি, যারা বোঝে না তাদের বোঝাও। তোমার ভালো মানুষির মুখোস আমার চেনা আছে। তোমার স্বামী আর শাশুড়ির মতোন আমি অন্ধ না যে নূরজাহানের উপর অবিচার দেখেও চুপ কইরা থাকব। তুমি ইচ্ছা কইরা নূরজাহানের পা কাটছো। তুমি নূরজাহানের পায়ে ব্যথা দিছো সেটা অস্বীকার করতে পারবে ভাবি? আমার ভাই দরজায় কাঁচ লাগায় রাখে নাই যে নূরজাহান অন্ধকারে কাঁচের দরজায় পড়ে পা কাটবে। তুমি নিশ্চয়ই কাঁচ দিয়া ওরে মারছো। যেটা নূরজাহান তোমারে বাঁচাতে গিয়ে সবাইকে মিথ্যা বলছে যে ওহ দরজায় পড়ে পা কাটছে। এতো অবিচার আল্লাহ সইব না ভাবি।
শাহানার গম্ভীর মুখটা মুহূর্তে শক্ত আর ঘৃণাভরে গেল নূরজাহানের উপর। ঘৃণিত দৃষ্টিতে নূরজাহানের দিকে তাকাল। আলেহাকে বলল….
‘আমি নূরজাহানের উপর অবিচার করি আলেহা? নাকি তোমরা হুগলে মিল্লা আমার উপর অবিচার কইরা গেছো? আমি কী করি নাই সতিনের মাইয়ার জন্য? এই মাইয়ারে আমি আমার সংসারে ঠাঁই দিয়েছি। আর কী চাও তোমরা? আমি চইল্লা যাই?
শাহনার কথায় তীব্র প্রতিবাদে রাগে ফুসে উঠল আলেহা বলল…
‘তোমার সংসারে ঠাঁই দিয়েছ মানে? এই সংসারটা কী তোমার একার ভাবি, ওর মার না? এই বাড়িটা নূরজাহানের বাবার না? আশনূরের যতটুকু অধিকার আছে নূরজাহানেরও ততটুকু অধিকার এই বাড়িঘরের উপর। তাইলে সবকিছু তোমার একা কীভাবে হয়? আমার ভাতিজি কী তোমার বাপের বাড়িতে থাকছে গিয়ে যে তুমি ঠাঁই দিছো বলো? তোমার এতো হিংসা কেন?
শাহানা নূরজাহানের প্রতি ঘৃণা আর তিরস্কার নিয়ে আলেহাকে বলল…
‘আমি হিংসা করলে তুমি এই মাইয়ারে তোমার নিজের বাইত্তে নিয়া রাখলা না কেন তাইলে? বড় মুখ কইরা ছেলেরে দিয়া বিয়া করানোর পরও ক্যান এই মাইয়ারে আমার সংসারে ফালাই রাখছো তুমি? নিয়া যাও আপদরে। আমার ঘর খালি করো। এই মাইয়া আমার সহ্য হয়না।
শাহানার কথায় আলেহার ভিতরটায় হঠাৎ যেন হাহাকারে ভরে গেল। শখ নূরজাহানের তিরস্কার বুকে আগুন জ্বলে। আলেহা শক্ত চেহারায়ও চোখে জল নিয়ে বলল…
‘এই রত্ন যদি আমার ঘরে সামলাইয়া রাখতে পারতাম তাহলে তোমার ঘরে এতো অবহেলায় অযত্নে ফেলে রাখতাম না ভাবি।
‘আমার ঘরে থাকতে হইলে আমার নিয়মেই চলতে হইব হুগলেরে। এর থেইকা বেশি আমি পারুম না সতিনের মাইয়ার খেদমত করতে। এই মাইয়ারে কী আমি খাওয়াইতেছি না পরাইতেছি না, তাইলে আর কী অসুবিধা তোমাগোর?
‘তুমি খাওয়াচ্ছ পরাচ্ছ মানে? ও কি তোমার বাপের খায় নাকি পরে? নূরজাহান ওর বাপের খায়, তাইলে তুমি খোঁটা দেওয়ার কে ভাবি?
‘আমি কে? আমি এই সংসারের আসল মালকীন। এই বাইত্তে আমি আগে বউ হইয়া আইছি। এই সংসারটা আমার। আমার সংসারে পরনারী নিয়া আইসো তোমরা। আমার জীবনডা বিষায় দিয়া এহন কইতাছো আমি বলার কেডা? সতিনের লগে সংসার করনের কষ্ট তুমি কোনোদিন বুঝবা না আলেহা। তোমার ঘরে তো আর সতিন নাই তাই তুমি বুঝবা না সতিনের মাইয়ারে নিজের সংসারে ঠাঁই দেওন কতখানি কষ্টের। আমি যতবার এই মাইয়ার দিকে তাকাই ততবার আমার সারা অঙ্গ বিষাইয়া উঠে বিষাক্ত অতীতে। আমি আইজও কোনো কিছু ভুলবার পারি নাই আলেহা। আইজও সবকিছু ভুইলা স্বামীর দ্বিতীয় বউয়ের মাইয়ারে আপন কইরা লইতে পারি নাই। আমি খারাপ আছিলাম না, তোমরা হুগলে মিল্লা আমারে খারাপ বানাইছো। তুমি, তোমার ভাই আর তোমার মা মিল্লা আমার সুন্দর সংসারটারে শেষ কইরা আমারে আগুনে ঠেলে দিছো দিনের পর দিন। আমি তোমাগোরে কোনোদিন মাফ করমু না আলেহা। আমার রুহের বদদোয়াই ধ্বংস হইয়া যাইব সবকিছু। যেমন কইরা ধ্বংস হইছে নূরজাহানের মা, তেমন কইরা একদিন ধ্বংস হইব নূরজাহানও। মিলাইয়া নিও।
আলেহা শাহানা দুজনের বাকবিতন্ডায় তারানূর বেগম এতক্ষণ চুপ ছিলেন। শাহানা নূরজাহানকে কষ্ট দিলেও তারানূর বেগম কখনো প্রতিবাদ করেন না। চুপ থাকেন। এখনো চুপ থাকতেন। কিন্তু শাহানার মুখে নূরজাহানকে দেওয়া অভিশাপের তিনি মূহুর্তে রেগে যান। তীব্র প্রতিবাদে চেতে উঠে মুহূর্তে ধমকে উঠলেন শাহানাকে…
‘বড় বউ! মুখ সামলাইয়া কথা কও। আশনূরের লাহান নূরজাহানও তোমার মাইয়া হয়। হেই তোমার এতো অবহেলার পরও কোনোদিন মুখ ফুইটা কয় নাই তুমি তারে কষ্ট দিছো, মারছো। আমরা অন্ধ না। সব দেখি ও বুঝি। তুমি নূরজাহানরে কষ্ট দিতে দেইখাও কোনোদিন কই নাই যাতে তুমি কষ্ট না পাও। তয় এতটা বাড়াবাড়ি করবা যে তোমার জেদের কারণে একদিন সব শেষ হইয়া যায়। নূরজাহানরে অভিশাপ দিয়ো না। নিষ্পাপের উপর অভিশাপ পড়ে না। উপরে আল্লাহ আছে, তিনি সব দেহেন। হক বিচার করেন। তোমার এই জেদের কারণে হাসান তোমার উপর উদাসীন। নূরজাহানের মাই মৃত তুমি জীবিত, হেরপরও তুমি জীবিত হইয়াও নূরজাহানের মার জায়গা হাসানের মন থেইকা নিতে পারতাছো না এইডা শুধুমাত্র তোমার এই জেদ আর অহংকারের লাইগা। সব রাগ-জেদেই একখানা সময় সীমা থাহে বউ। হেরপর আর সেই রাগ-জেদ ভালো লাগে না। নূরজাহানের মা মৃত আজ কত বছর হইল কিন্তু তুমি তোমার রাগ-জেদ এহোনো মৃত মানুষটার উপর থেইকা ফালাইতে পারলা না। মায়েরে কাছে পাওনা দেইখা তুমি হের মাইয়া নূরজাহানরে দিনের পর দিন কষ্ট দিয়া যাইতাছো, তাও তোমার জেদ মাটি হয় না। ক্যান, হেরপর তুমি আর কী চাও? নূরজাহানরে মাইরা ফালাইবা? এইডা চাও তুমি?
~~
খালি জমিটার আমিন দিয়ে মাপা হচ্ছে। ঢাকা থেকে দুজন ইঞ্জিনিয়ার এসেছে জমির নকশা তৈরিতে। এই জমির উপর হাসপাতাল বানানোর আগে জমির ভালোভাবে পরখ করে মাটি পরীক্ষা করে এই জমির উপর হাসপাতালের ডিজাইন তৈরি করবে তারা। আজ সকালে খানচি সদরের একটা হোটেলে লোকগুলো উঠেছে মারিদের নির্দেশনায়। হাসপাতাল বানানোর জন্য মারিদ লম্বা সারির দুটো জমি কিনেছে একই মালিক হতে। হাসপাতাল বানানোর জন্য জমি কেনার ব্যাপারটা হাসান সিকদার বেশ গোপনীয়ভাবেই সেরেছেন রাতের আঁধারে। নয়তো মোল্লা সওদাগর আর তার ছেলেরা এই কাজে বাধা দিতো। গ্রামে একটা হাসপাতাল হোক সেটা তারা চাই না। যে লোকটা মারিদকে জমি বিক্রি করেছে তার নাম মাহফুজ আলী। শুনেছে মানিক সওদাগর নাকি দুদিন আগে মাহফুজ আলীর বাড়ি গিয়ে হুমকি-ধমকি দিয়ে এসেছিল মাহফুজ আলীকে যেন হাসানের কাছে হাসপাতালের জন্য জমিটা বিক্রি না করে। হাসপাতালের জমিটা মানিক কিনবে তারপরও হাসানকে যেন না দেয়। মাহফুজ আলী মানিকের ভয়ে হাসান সিকদারের কাছে জমি বিক্রি করবে না বলে প্রথমে বেঁকে যায়। হাসান, মাজিদ অনেক চেষ্টা করেও যখন মাহফুজ আলীকে রাজি করাতে পারছিল না, তখন মারিদ ও রাদিল মাহফুজ আলীর সঙ্গে কথা বলে জমির মূল্যের চাইতে দ্বিগুণ টাকা বায়না দিয়ে রাতারাতি জমিটা মারিদের নামে করে নেয়। দ্বিগুণ টাকার লোভে মাহফুজ আলী মারিদকে জমি বিক্রি করে দিলেও সে সারাদিন ধরে মানিক সওদাগরের ভয়ে আছে। থানচি জেলায় মানিক সওদাগরের নামটা অনেক বড়। তার সাথে টক্কর দিয়ে মাহফুজ আলীর মতো সাধারণ মানুষ কখনোই ভালো থাকবে না। জমির মাপে দুপুর গড়িয়ে বিকাল পাঁচটার ঘরে পৌঁছায়। হাসান, মাজিদ, মারিদ, রাদিল, হাসিব, মাহফুজ আলী, তার দুই সন্তান, জমি মাপার আমিন, আমিনের সঙ্গে আরও একজন সহকারী কর্মচারী, মারিদের ঢাকা থেকে আনা দুজন ইঞ্জিনিয়ারসহ মোট বারোজন চৌরাস্তা মোড়ে খালি জমিতে দাঁড়িয়ে। হঠাৎ এর মাঝে কোথা থেকে একটা জিপে করে ছয়-সাতজন ছেলে সেখানে পৌঁছে লাঠি হাতে মাহফুজ আলী ও তার দুই ছেলেকে পেটাতে লাগল। উপস্থিত সকলে হতভম্ব।
মারিদরা আক্রমণকারী লোকগুলোকে না চিনলেও বাকিরা ঠিকই চিনল। মানিক গ্রামে থাকলে হাসান সবসময় হাতে করে একটা লাঠি নিয়ে চলেন। হুটহাট আক্রমণ করা মানিক সওদাগরের কাজ। আজ হাসপাতালের জমির কাজে বাধা দিবে সেটা হাসান ও মাজিদ জেনেই বাড়ি থেকে বের হওয়ার সময় লাঠি হাতে বেরিয়েছিলেন। মানিক হকিস্টিক হাতে বয়স্ক মাহফুজ আলী ও তাঁর দুই ছেলেকে দলবল নিয়ে মারছে আর অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ করে বলছে….
‘শুয়োরের বাচ্চা, বাইনচোদ তোরে আমি কইছিলাম না জমি বেচবি না। হেরপরও তুই আমারে ডিঙ্গাইয়া জমি বেচনের সাহস কেডায় দিছে তোরে?
মানিকের এলোমেলো লাঠির আঘাতে বয়স্ক মাহফুজ আলীর মাথা ফেটে রক্ত ঝরল। মাহফুজ আলীর দুই ছেলের অবস্থা আরও করুণ। মানিকের ছেলেপেলে সবাই মিলে ওদের পেটাচ্ছে। মাহফুজ আলী মানিকের পায়ে পড়ে দুই ছেলের জন্য আর্তনাদ করে বলল….
‘বাজান আমার ভুল হইয়া গেছে। আমাগোরে মাফ কইরা দেও। আমার পোলা দুইডা ছাইড়া দেও বাজান। আমি বুঝবার পারি নাই ,আমার ভুল হইয়া গেছে, আমাগোরে মাফ কইরা দেও বাজান। ছাইড়া দেও।
চোখের পলকে মারধর দেখে আমিন আর উনার সহকারী কর্মচারীকে নিয়ে ভয়ে পাশে সরে দাঁড়ালেন। পাশাপাশি এলাকা হওয়ায় আমিন সাহেব মানিক সওদাগর ও তার পরিবারের জুলুম সম্পর্কে অবগত। লাঠি হাতে হাসান দৌড়ে গেলেন আগে। হাসান মানিকে ধাক্কা দিয়ে মাহফুজ আলীকে বাঁচাতে চাইল। মানিক চটে গেল হাসানের ধাক্কা পাওয়ায়। নূরজাহান সামনে নাই তাই হাসানকে মারতে মানিকের বাধাও নেই। হাসানের ধাক্কার সঙ্গে সঙ্গে মানিক গর্জে উঠে ভারি আঘাত করল হাসানের মাথায়।
‘ শালা শশুরের বাচ্চা। যত নষ্টের মূল তুই।
হাসানের মাথায় আঘাত করার সঙ্গে সঙ্গে তিনটে গর্জনের চিৎকার ভেসে এল। মারিদ, রাদিল আর মাজিদের। মারিদ, রাদিল ও মাজিদ তিনজন একত্রে কিছুটা দূরে দাঁড়িয়ে ছিল ইঞ্জিনিয়ারদের সঙ্গে। হাসপাতালের বিল্ডিং কোন দিকে বানালে উত্তম হবে সেই বিষয়ে পরামর্শ হচ্ছিল। এর মাঝে মানিকের গাড়ি ওরা প্রথম লক্ষ্য করেনি। কিন্তু মাহফুজ আলী ও তার ছেলেদের পেটাতে দেখে মাজিদ তৎক্ষণাৎ দৌড়ায় মানিকের মোকাবেলা করতে। ততক্ষণে হাসান সিকদার মানিকের লাঠিতে আঘাত পেতেই মারিদ ও রাদিল চিৎকার করে দৌড়ায় সবকিছু থামাতে। মানিক হাসানকে আঘাত করে দ্বিতীয় প্রহারটা করল মাজিদকে। মানিকের এলোমেলো আঘাতে মাজিদ হাসানের উপর পড়ে গেল বাবাকে বাঁচাতে। মারিদ দৌড়ে এসে মানিককে ধাক্কায় সরিয়ে দিল হাসানের থেকে। রাদিল হাসিব দুজন মিলে হাসান মাজিদকে টেনে তুলছে। মারিদের ধাক্কায় মানিক কিছুটা পিছিয়ে যেতেই ফের হিংস্র গর্জনে মানিক তেরে এসে মারিদের শার্টের কলার চেপে ধরে বলল…
‘এই বাল চোদাও? আমার এলাকায় দাঁড়াইয়া কাহিনী মারাও? এই শহুইরা মাল! গেট লস্ট থানচি। আমারে নাইড়া জানে বাঁচবি না। কাঁচা খাইয়া ফালামু। জান লইয়া পালা বাইনচো*দ। আমি ভালা মানুস না।
মারিদ দুহাত মুষ্টিবদ্ধ করে দাঁড়িয়ে। অতিরিক্ত রাগে তার কপালের রগ ফুলে যায়। অথচ মারিদের দৃষ্টি কেমন শান্ত ও স্থির মানিকের হিংস্র দৃষ্টির দিকে তাকিয়ে। রাদিল, হাসিব এগিয়ে এসে মানিকের থেকে মারিদকে ছাড়াল। হাসান ও মাজিদ পুনরায় লাঠি নিয়ে দাঁড়িয়েছে মানিকের মোকাবেলা করতে। পরিস্থিতি যখন ধস্তাধস্তির দিকে তখন মানিকের ছেলেপেলে এসে মানিককে ধরে আটকাল। মানিক রাগে তোপে দুই দাঁতে মাঝে জিব কামড়ে আঙুল তুলে মারিদকে ফের শাসিয়ে বলল…
‘এই থানচিতে আইসা চরম ভুল করছিস ডাক্তার। সময় আছে জান লইয়া পালা। বারবার কমু না। আমার অনুমতি ছাড়া এই গেরামে একটা ইটও নড়ে না। তোর হাসপাতাল বানানো তো বিলাসিতা। চইলা যা ডাক্তার। জান লইয়া পালা। নইলে তোর পিছনে মানিক সওদাগর পইড়া যাইব। পালা ডাক্তার, পালা।
মারিদ রগচটা মেজাজের মানুষ। ঢাকার অলিগলি সাক্ষী দেয় মারিদের রগচটা স্বভাবের। কারণে অকারণে কতবার কত মানুষ মার খেয়েছে মারিদের হাতে তার হিসাব নেই। অথচ আজ প্রথমবার কেউ অকারণে মারিদের শার্টের কলার চেপে তাকে হুমকি-ধমকি দেওয়ার পরও মারিদ শান্ত ও স্থির। মানিককে মারছে না আর না কিছু বলছে। মারিদের এই শান্ত ও স্থির থাকাটা রাদিল ও হাসিবের মাথায় ঢুকল না। এতটা ভালো মানুষ মারিদ না, তারপরও কেন মারিদ স্বভাবের বাইরে ভালো মানুষ সাজছে সেটাও বুঝল না? রাদিল মানিকের বিরোধিতা করে বারবার কপাল কুঁচকে মারিদের তীক্ষ্ণ দৃষ্টির দিকে তাকাচ্ছিল। মারিদের কপালের ফুলে ওঠা রগ আর দুহাতে মুষ্টিবদ্ধ করা হাতের তেজ বলছে মারিদ আলতাফ এই মূহুর্তে ভিষণ রেগে নিজের রাগ কন্ট্রোল করছে। কিন্তু দৃষ্টি বলছে মারিদ আলতাফ বিশাল কিছুর আয়োজনে সে শান্ত ও স্থির। মারিদের মাথায় আসলে কী চলে?
চলিত…..
[ আগামী দুই পর্বে আশা করছি আপনাদের মনে আশা সকল প্রশ্নের উত্তর পেয়ে যাবে। আরেকটা কথা আপনারা যারা #ডাকপ্রিয়র_চিঠি উপন্যাসটা পছন্দ করেন, সময় নিয়ে পড়েন তাদের কাছে অনুরোধ রইল অবশ্যই এই উপন্যাসটা রিভিউ দিবেন এবং এই গল্পটার প্রচার করবেন আর যারা রিদ-মায়াকে ভালোবাসেন তাঁরা রিদ-মায়ার পাশাপাশি এই গল্পটাকেও ভালোবাসবেন অনুরোধ রইল। ]
[ বানান ভুল ম্যানশন করবেন কমেন্টে]
আমার আইডির লিংক..
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৪
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)