ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকাঃরিক্তাইসলাম মায়া
১৯
চাঁদবিহীন আকাশে অন্ধকারে ঘিরে আছে ঘন কুয়াশার চাদর। মাঘ মাসের কনকনে শীত। সিকদার বাড়ির পাহারায় থাকা লাঠিয়াল লোকগুলো কুঠিরের বাইরে আগুন জ্বালিয়ে একত্রে বসে। কেউ বসে বসে ঘুমাচ্ছে, কেউ বা ঘুমে ঝিমুচ্ছে। মানিক সওদাগর সিকদার বাড়িতে এসেছে সেই অনেকক্ষণ হলো। গায়ের মোটা জ্যাকেটের ওপর কালো চাদর জড়িয়ে আছে। গলার মাফলার পেঁচিয়ে নাক-মুখ ঢেকে আছে শীত থেকে বাঁচতে। হাতে একটা টর্চ লাইটও আছে। নূরজাহান যে ঘরটাতে থাকে, সেই ঘরের দক্ষিণের দরজায় পিঠ ঠেকিয়ে বসে আছে সে দু-চোখ বন্ধ করে। বন্ধ দরজার ভেতরে শুয়ে আছে আশনূর আর নূরজাহান। এই ঘরটা নূরজাহানের। ইট-পাথরের ভিটা পাকা, টিনের ঘর। মানিক নূরজাহানের ঘরের দরজার পাকা সিঁড়িতে বসে। ঘুমন্ত নূরজাহানের ঘরের ভেতরের নিশ্বাস চলছে আর মানিকের শীতের তাপদাহ বাইরে। মানিক সওদাগর—এই নামের মাঝে খারাপের শেষ নেই। লোকে তাকে ইবলীশের মানুষ রূপী বলে। তার অগণিত খারাপ কাজের মাঝে একটা ভালো কাজ হচ্ছে নূরজাহানের প্রতি পবিত্র ভালোবাসা রাখা। এই একটা ভালো কাজ ছাড়া তার মাঝে আর কোনো ভালো গুণ খুঁজে পাওয়া যাবে না। সব অপকর্মের পাপ শুরুই হয় মানিক সওদাগরের নামে। মানিকের দৃষ্টি যেদিন নূরজাহানকে দেখল, সেই দিন দুনিয়া থমকে যাওয়ার মতো আসক্ত হয়ে গেল নূরজাহানের প্রতি। খাওয়া, দাওয়া, ঘুম, কাজ—সবকিছু হারাম করে সবকিছুর ঊর্ধ্বে নূরজাহানকে চাইল। তাকে পাওয়ার জন্য কত পাপ, কত নিষিদ্ধ কাজ করল তার হিসাব নেই। ভবিষ্যতেও এমন অগণিত খারাপ কাজ কিংবা ধ্বংসে লিপ্ত হতে পিছুপা হবে না। মানিকের সবকিছুর ঊর্ধ্বে শুধু নূরজাহানকেই চাই।
কত কত বিষাক্ত অতীত জমে আছে তার নূরজাহানকে প্রেমের পাগল হওয়ার পেছনে। মানিকের হঠাৎ খোলা গলায় গান ধরতে মন চাইল। কিন্তু এই মুহূর্তে গান ধরলে শালার বুড়া শ্বশুর এসে হাঙ্গামা করবে। মানিকের সঙ্গে এই রাতে আবার একটা দন্দ্ব হয়ে যায়। নূরজাহান এমনিতে তাকে ভালোবাসে না, বাপের বিরুদ্ধে গেলে তখন আরও ভালোবাসতে চাইবে না। ঘৃণা করবে। নূরজাহানের চোখে মানিকের জন্য ঘৃণা ভীষণ পোড়ায় মানিককে। ভালোবাসার মানুষের চোখে ঘৃণা সহ্য করা যায় না।
হাসান সিকদার বাইরে লোক পাহারায় বসিয়েছিল মানিক সওদাগরকে আটকাতে। অথচ সেই মানিক নূরজাহানের ঘরের বাইরে দিব্যি বসে বসে ঘুমাচ্ছে। নূরজাহানের শূন্যতায় আরামে বিছানাতেও ঘুম হয় না মানিকের, অথচ এখন কত অযত্ন-অবহেলার মাঝেও দিব্যি ঘুমিয়ে যাচ্ছে সে। ভালোবাসা সুখ বোঝে না। দুঃখের মাঝে ভালোবাসা থাকলে সেটাই স্বর্গ সুখ। রাত যখন ফুরিয়ে আসল, তখন ঘুম ভেঙে যায় মানিকের। আশেপাশে তাকিয়ে নিজের অবস্থান বুঝে জ্যাকেটের পকেট হতে মোবাইল বের করে সময় দেখল। ৩:৪৭। রাত চারটায় আযান হয়। এখন চলে না গেলে হাসান সিকদার উঠে যাবেন নামাজের জন্য অজু করতে। মোবাইল পকেটে গুঁজে মাথা ঘুরিয়ে দরজায় চুমু খেল। দরজার চুমুটা সে অদৃশ্যভাবে নূরজাহানের কপালে খেয়েছে। হাতের টর্চ লাইট নিয়ে মানিক উঠে দাঁড়াল। যেভাবে এসেছে, সেভাবে সিকদার বাড়ি হতে পেরিয়ে বিশ কদমের মাটির রাস্তায় উঠল। পাহারাদার রাখা হয়েছিল মানিককে আটকাতে, অথচ সেই পাহারাদারের সামনে দিয়ে মানিক সওদাগর বেরিয়ে গেল। গায়ের চাদরটা কাঁধে জড়িয়ে হাতের টর্চ লাইট জ্বালাল। অন্তত সুরেলা কণ্ঠে উঁচু স্বরে গান ধরল…
~ বন্ধু তোমার বাড়ি,
তোমার ঘর, তোমার আঙিনা,
সবখানে বিচরণ করি তুমি জানো না।
তুমি যখন ঘুমাও থাকি তোমার স্বপ্নে,
ভালোবাসার পাগল হইলাম তোমার কারণে,
বন্ধুরে এ এ এ, তুমি মোরে ভুইলা যাও না।
অ বন্ধুরে এ এ তুমি মোরে ভুইলা যাও না।
~~
দিন পেরিয়ে সন্ধ্যা হলো। শীতের সন্ধ্যা। সূর্যটা পশ্চিম আকাশে ডুবে গেছে অনেকক্ষণ হলো। ধরণীর বুকে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনিতে মাগরিবের আযান পড়ছে। সিকদার বাড়ির উঠোনে বিদ্যুতিক আলো জ্বলছে। সেই সাথে জ্বলছে পদ্মা, মেঘনা, যমুনা, কাঠগোলাপ—এই চারটে ঘরের বারান্দায় একটা করে লাইট। এই অসময়ে মারিদদের গাড়িটা এসে থামল সিকদার বাড়ির পূর্বদিকে থাকা বিশাল বড় বটগাছের নিচে। সামনে বিশ কদম পশ্চিমে হেঁটে সিকদার বাড়ির টিনের বেড়া দেওয়া বাড়িটিতে পৌঁছাতে হয়। হাসান মেম্বার কাজের ছেলে মান্নাকে নিয়ে এতক্ষণ বটগাছের নিচে দাঁড়িয়ে ছিল মারিদদের অপেক্ষায়। গাড়ি থামতে, গাড়ির পেছন থেকে রাদিল, মারিদ দুজন দুপাশ হতে বেরুলো। হাসিব ড্রাইভিং সিট হতে বেরুলো। হাসান সিকদার মারিদ, হাসিব দুজনকে চেনেন, এর আগে দুজন এখানে এসেছিল। কিন্তু রিফাতের জায়গায় রাদিলকে চিনতে পারলেন না। হাসান সিকদারকে এগিয়ে আসতে দেখে মারিদ সালাম দিয়ে বলল…
‘ আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল।
সুন্দর এবং উজ্জ্বল হেসে হাসান সিকদার এগিয়ে এসে মারিদের সঙ্গে হাত মিলিয়ে বললেন…
‘ ওয়ালাইকুম সালাম বাজান। তোমাগো আসতে পথঘাটে কোনো অসুবিধা হয় নাই তো?
‘ না আঙ্কেল, কোনো সমস্যা হয়নি। আপনি ভালো আছেন?
‘ হুঁ বাজান, আল্লাহ রাখছে তোমাগোর দোয়ায়। উনারে তো ঠিক চিনলাম না বাজান? উনি কেডা?
কথাটা রাদিলকে উদ্দেশ্য করে বললেন হাসান সিকদার। রাদিল সৌজন্যমূলক হেসে হাত বাড়িয়ে সালাম দিয়ে বলল…
‘ আসসালামু আলাইকুম আঙ্কেল। ভালো আছেন?
‘ হুঁ বাজান, ভালা তয় তোমারে চিনবার…
হাসান সিকদারের কথা শেষ হওয়ার আগে মারিদ রাদিলের পরিচয় দিয়ে বলল…
‘ ওহ, একজন প্রফেশনাল ডাক্তার আঙ্কেল। নাম রাদিল চৌধুরী। আমার ফুফাতো ভাই। ওহ আমাদের হসপিটালের কাজে সাহায্য করবে।
সকলের কুশলাদির শেষে মারিদ, রাদিল, হাসিব হাসান সিকদারের বাড়িতে গিয়ে উঠল। তারানূর বেগম মধ্যের ঘরটা—নাম মেঘনা। তিনি সেই ঘরটার বারান্দায় দাঁড়িয়ে মারিদদের অপেক্ষায় ছিলেন। মারিদদের উপস্থিতিতে তারানূর বেগমও সকলের সঙ্গে আন্তরিকতা দেখিয়ে কুশলাদি বিনিময় করলেন। মান্নাকে বলল…
‘ মান্না, যা তো, মেহমানগোরে কলপাড়ে লইয়া যা। তাগোরে হাত-মুখ ধুইতে দে। মেলা পথ গাড়ি চড়াইয়া আইছে। বিশ্রাম দরকার। হেগোরে আগে ঘরে লইয়া আসবি, নাস্তা কইরা হেরপর মেহমান ঘরে লইয়া যাবি বিশ্রাম করতে।
‘ আইচ্ছা দাদী। আপনেরা আমার লগে আয়েন। আমি কলপাড়ে লইয়া যাইতাছি।
মারিদ, রাদিল, হাসিব মান্নার সঙ্গে কলপাড়ে গেল হাত-মুখ ধুতে। হাসান সিকদার তাড়াহুড়ো করে গেলেন মাগরিবের নামাজ পড়তে। তারানূর বেগম নামাজ পড়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে ছিলেন, তাই তিনি পাকঘরের দিকে গেলেন মেহমানদের নাস্তার আয়োজনে। আজকে বাড়িতে মাজিদ আছে। মাজিদ হাসান সিকদারের বড়ো ছেলে। সে আসরের সময় থানচির সদরে গিয়েছিল মেহমানদের জন্য বাড়িতে বাজার আনতে। একটু পরই চলে আসবে।
কলপাড়ের খুঁটিতে হলুদ আলোর বাল্ব জ্বলছে মাথার ওপর। চারপাশের পরিবেশ ক্যাঁচক্যাঁচে হলুদ লাগছে। হাসিবের কথা বলা যাচ্ছে না, তবে মারিদ কিংবা রাদিল কেউই এই পরিবেশের সঙ্গে অভ্যস্ত নয়। মারিদ যদিও এর আগে দু’দিন ছিল এই বাড়িতে, সেজন্য বেশ একটা অসুবিধা হচ্ছে না, তবে রাদিল বেশ ঘাড় ঘুরিয়ে আশপাশটা পর্যবেক্ষণ করছে। মারিদ, রাদিল, হাসিব সকলের পায়ে কালো শুজ। মারিদ পায়ের কালো শুজ ও মোজা খুলে কলপাড়ে বাইরে রাখল। গায়ের কোট হাসিবের হাতে। শার্টের হাতা, কালো প্যান্ট পায়ের ওপর গুটিয়ে কোমড় বেঁকে হাত-মুখে পানি দিচ্ছে। কল চাপ দিচ্ছে মান্না। এর মাঝে একটা মেয়েলি কণ্ঠ শোনা গেল…
‘ আপনাদের স্যান্ডেল।
মারিদ, হাসিব, রাদিল, মান্না—সকলেই আশনূরের দিকে ঘুরে তাকাল। মান্না কল চাপছে, অথচ মারিদ টিউবওয়েলের নিচে হাত দিয়ে আশনূরকে দেখছে তীক্ষ্ণ চোখে। হয়তো আশনূরের মাঝে কিছু খুঁজছে। আশনূর একটা সুতির থ্রি-পিস পরে। অন্ধকার আর হলুদ লাইটের আলোয় থ্রি-পিসের রঙটা বোঝা যাচ্ছে না, তবে গায়ের ওপর একটা নকশি চাদর জড়িয়ে মাথায় কাপড় দেওয়া। রাদিল এক ফাঁকে মারিদের দৃষ্টি ভঙ্গি বুঝে আশনূর থেকে তিন জোড়া স্যান্ডেল নিতে নিতে বলল…
‘ আপনি আশনূর?
আশনূর ইতস্ততায় হাসল। মারিদের দৃষ্টি আশনূরের চোখে পড়ল। রাদিলকে আশনূর চেনে না। তবে রাদিলের মুখে নিজের নাম শুনে আশনূর সৌজন্য হেসে উত্তরে বলল…
‘ জি। আপনি চিনলেন কীভাবে?
রাদিল, মারিদ, রিফাত—তিনজনই লম্বা-চওড়া বলবান পুরুষ। মারিদ রাদিল ও রিফাত থেকে এক ইঞ্চি লম্বায় বেশি হবে। রিফাত, রাদিল সমান ছয় ফুট হলেও মারিদ লম্বায় ছয় ফুট এক ইঞ্চি। তিনজনের এই গ্রুপের মধ্যে মারিদ সবচেয়ে বেশি ফর্সা। সে মায়ের রঙ পেয়েছে সাদা ফর্সা। রাদিল বাবার রঙ পেয়ে শ্যামবর্ণের পুরুষ। রিফাত মাঝামাঝি ধরনের ফর্সা ছেলে। রিফাতকে খুব ফর্সাও বলা যায় না আবার শ্যামবর্ণেরও সে না। সে হলো হলদেটে রঙের ছেলে। তিনজনের কম্বিনেশনের এই গ্রুপে দুজন ডাক্তার আর একজন ব্যবসায়ীক। রাদিলের চোখ ব্রাউন। সে হাসলে বেশ সুন্দর দেখায়। রাদিল দারুণ হেসে আশনূরকে বলল…
‘ আপনাদের বাড়ির গল্প অনেক শুনেছি। সেই গল্পে আপনার নামটাও ছিল। তাই সেভাবে আপনাকে চিনি বলতে পারেন। আপনার কি এতে কোনো আপত্তি আছে এতে মিস?
রাদিলের সুন্দর হাসি আর গোছানো কথায় আশনূরের ইতস্তততা বেড়ে গেল। আশনূর মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি দিল, যার অর্থ ওর কোনো আপত্তি নেই। আশনূর চলে যেতে গিয়ে আড়চোখে মারিদকে এক পলক দেখে রাদিলকে বলল…
‘ আপনারা হাত-মুখ ধুয়ে ঘরে আসুন। আব্বু নামাজ পড়ছেন। আপনাদের জন্য দাদী অপেক্ষা করছেন।
কথা বলে আশনূর পালিয়ে যাওয়ার মতো করে চলে যায়। যদিও আশনূর মারিদের সাথে বেশ পরিচিত এর আগের বার থেকেই, তবু আজ হঠাৎ কেন জানি অস্বস্তি বোধ করছে আশনূর মারিদের সামনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে। মারিদ, রাদিল, হাসিব বসার ঘরে এসে বসেছে। ডাইনিংয়ে মান্না, শেফালী একে একে শীতের পিঠা রাখছে। শীতের পিঠা লোভনীয় জিনিস। হাসিব, মারিদ—হাসান সিকদারের পরিবারের সঙ্গে পরিচিত, কিন্তু রাদিল চোখ ঘুরিয়ে বসার ঘরটা পর্যবেক্ষণ করছে। হাসান তখনো নামাজে। তারানূর বেগম একটা সোফায় বসে হাসিব, রাদিলের সঙ্গে কথা বলছেন। মারিদের ফোনে চার্জ না থাকায় সে বলল…
‘ ফোনটা বন্ধ। চার্জে দেওয়া যাবে দাদী?
‘ হুঁ, দেওন যাইব। ক্যান দেওন যাইব না? ঐ যে দেখো পালঙ্কের কিনারায় একখান বোর্ড আছে, ঐখানে তোমার ফোনডা চার্জে দেওগা। যাও।
মারিদ ফোন হাতে উঠে গেল। ফোনে চার্জ ছিল না বলে হাসিবকে দিয়ে গাড়িতেই চার্জারটা নিয়ে রেখেছিল। তাই হাসিব থেকে চার্জার নিয়ে সে পালঙ্কের পাশে দাঁড়িয়ে ফোনটা পিনে সেট করে ফোনটা অন করার জন্য একটু সময় নিয়ে দাঁড়াল। হাত-মুখ ধোয়াই মাথার চুল ভেজা। ফর্সা পায়ে স্যান্ডেল। গায়ের পোশাক চেঞ্জ করা হয়নি। নাস্তা করে রুমে গিয়ে চেঞ্জ করবে। মারিদ হাতের ফোনটি অন করার সময় বেখেয়ালি চোখ গেল বালিশের নিচে থাকা ডাইরিটাকে। সাদা বালিশের নিচে ডায়েরির অল্প কোণা দেখা যাচ্ছে। এই ডায়েরিটা মারিদ চেনে। সেদিন রাতে হাসান সিকদারের ছোট মেয়ে লিখছিল এটা। হাসান সিকদারের ছোট মেয়ের নামটা মারিদ তৎক্ষণাৎ মনে করতে পারল না। খানিকটা সময় নিয়ে মাথায় চাপ দিয়ে মনে পড়ল। নূরজাহান। অথচ আশনূর বলেছিল এটা আশনূরের ডায়েরি। মারিদ জানে না এই ডায়েরিটার কার। তবে অন্যের ব্যক্তিগত জিনিসে অনুমতি ছাড়া ধরতে নেই, কিন্তু মারিদ নিজেকে আটকাতে পারল না এই ডায়েরিটাকে ছুঁতে। এই ডায়েরিটাকে ঘিরে মারিদের অদ্ভুত একটা কৌতূহল কাজ করে, মনে হয় মারিদের সব জটিলতার সমাধান হয়তো এই ডায়েরিতে থাকতে পারে। মারিদ ফোন চার্জে লাগিয়ে পাশের টেবিলের ওপর রাখল। তারানূর বেগমকে পিঠ করে আড়ালে ডায়েরিটি হাতে নিল। নীল রঙের ডায়েরির ওপর লেখা ‘ডাকপ্রিয়’। নামটা দেখে মারিদের ভিতর মুচড়ে উঠল। অপরিচিতা একদিন বলেছিল সে মারিদের ডাকপ্রিয় হয়ে চিঠি লিখবে। তাহলে কি এটা মারিদের অপরিচিতার ডায়েরি? সেদিন রাতের অন্ধকারে মারিদ ডায়েরিটা ঠিকঠাক দেখতে পারেনি। আজ মারিদ অতি কৌতূহলতায় পৃষ্ঠা উল্টাতে গিয়ে একত্রে বেশ কিছু পৃষ্ঠা উল্টে যায় মারিদের হাতে। মারিদ ডায়েরির পাতায় চোখ ফেলতেই দেখতে পেল…
~কিছু মানুষ অনাকাঙ্ক্ষিত
~কিছু স্মৃতি ব্যথিত
কিছু সম্পর্ক অবরুদ্ধ
~কিছু যন্ত্রণা অপ্রত্যাশিত।
কিন্তু একাকিত্ব সার্বক্ষণিক।
মারিদ লেখাটা পড়ে পৃষ্ঠা উল্টাতে অপর পৃষ্ঠায় লেখা পেল…
‘ আপনি তো আমার ছিলেন ব্যবসায়ীক সাহেব, তাহলে হারিয়ে গেলেন কীভাবে? প্লিজ ফিরে আসুন, হয় স্বপ্নে নয়তো দুঃস্বপ্নে। তবুও ফিরে আসুন। বাস্তবতা বড়ই নিষ্ঠুর, আপনাকে পাওয়ার মতো দুঃসাহস আমার নেই।
একেই বলে হয়তো এক আকাশ সমান স্তব্ধ হয়ে যাওয়া। মারিদ থমকে যাওয়ার মতোন লেখাটিকে বারবার পড়ল। মারিদের বুঝতে দেরি নেই, এটা তার অপরিচিতার লেখা ডায়েরি। হাসান সিকদারের কোনো এক মেয়েই মারিদের অপরিচিতা। মারিদের হাতে মৃদু কম্পন, তার তেজি শ্বাস ফেলতে দেখা গেল। হয়তো অতি উত্তেজনায় নিশ্বাস ফেলতে কষ্ট হচ্ছে মারিদের। কত বাধা-বিপত্তি পেরিয়ে আজ সে অপরিচিতার ডায়েরি অবধি পৌঁছেছে। অতি উত্তেজনায় মনে হচ্ছে মারিদ অপরিচিতার ডায়েরির সঙ্গে নয়, বরং স্বয়ং অপরিচিতার সঙ্গে কথা বলছে। মারিদ অস্থির দৃষ্টিতে ফের নিচের একটুকরো লেখার অংশে চোখ বুলাল। সেখানে লেখা পেল…
‘ ~আমাদের দেখা হয় না, কথা হয় না। তবু আপনি আছেন। আমার স্মৃতিতে, দুঃস্বপ্নে, অসম্ভাবনায়। মন খারাপের গানে। মাঝরাতে তীব্র বুক ব্যথায়। হাহাকার শূন্যতা। তবুও আপনি আছেন। এই কেমন থাকা?
~মাঝেমধ্যে ভাবি এই বুঝি হারিয়ে ফেললাম। অথচ হারাবার মতো আর কিছুই বাকি নেই, তবুও মনে হয় এই বুঝি সব হারিয়ে ফেললাম। এই কেমন না পাওয়ার গল্প আমাদের?
হঠাৎ তারানূর বেগমের কন্ঠ শোনা গেল…
‘ এই হইলো আমার পোলা হাসানের বউ।
‘ আসসালামু আলাইকুম আন্টি।
‘ ওয়ালাইকুম সালাম। বসো বাবারা, তোমাদের দাঁড়াতে হবে না।
হাসিব, রাদিল দুজনই দাঁড়িয়ে ছিল শাহানা বেগমের সাক্ষাৎকারে। হাসিব, মারিদ এর আগের বার শাহানা বেগমের সঙ্গে পরিচিত। শাহানা বেগম হাল্কা-পাতলা, লম্বাটে গঠনের মহিলা। গায়ের রঙটা আশনূরের মতোন শ্যামবর্ণের। শাহানা বেগমকে দেখলে যেকেউ বলবে আশনূর মায়ের মতো দেখতে হয়েছে। শাহানা বেগম মারিদের সন্ধান করতে রাদিল, মারিদকে ডাকল…
‘ মারিদ! মারিদ! মারিদ।
রাদিল ডাকল মারিদকে। মারিদ অপরিচিতার ডায়েরির পাতায় ডুবে থাকায় রাদিলের ডাক কানে ঢোকেনি। এই ফাঁকে হাসিব ডাকল, ‘স্যার, স্যার’ বলে। মারিদ তাও শুনল না। শাহানা বেগম এগিয়ে এসে মারিদকে ডাকতে মারিদ চমকে পিছনে ফিরে শাহানা বেগমকে দেখে সৌজন্য হেসে সালাম দিয়ে কুশলাদি করে বলল…
‘ আসসালামু আলাইকুম আন্টি, ভালো আছেন?
শুদ্ধ এবং স্পষ্ট ভাষায় শাহানা বেগম উত্তর দিয়ে অল্প হেসে বললেন…
‘ জি আলহামদুলিল্লাহ। আপনার আম্মু-আব্বু, আপনার পরিবার কেমন আছে বাবা?
‘ জি আন্টি আলহামদুলিল্লাহ, সবাই ভালো আছেন।
‘ আপনার আম্মুকে আমার সালাম দিবেন। আসুন, নাস্তা করবেন। অনেকটা জার্নি করে এসেছেন, আপনাদের বিশ্রাম প্রয়োজন।
‘ জি আন্টি, চলুন।
মারিদ অপরিচিতার ডায়েরিটা পিছনে লুকিয়ে রেখে ছিল। সে শাহানা বেগমের চোখ এড়াতে আস্তে করে পুনরায় বালিশের নিচে রেখে দিল ডায়েরিটা। মারিদ অপরিচিতা ডায়েরিটা চেয়েছিল সঙ্গে করে নিয়ে যাবে কিন্তু হঠাৎ শাহানা বেগমের উপস্থিত ডায়েরিটা সরাতে পারেনি বলে ডায়েরিটা পুনরায় জায়গায় রাখতে হয় মারিদকে। মারিদের মন ছটফট করছে ডায়েরিটির পরের পৃষ্ঠাগুলো পড়তে, কিন্তু আপাতত শাহানা বেগমের সামনে এটা করা সম্ভব নয়। মারিদের কেন জানি শাহানা বেগমকে বেশ চতুর মহিলা মনে হয়। প্রথমবার মারিদ এই বাড়িতে আসার পর থেকে শাহানা বেগমের কথা-বার্তায় একটা গাম্ভীর্য ভাব লক্ষ করেছে। সেই সাথে শাহানা বেগম মারিদের প্রতি বেশ আন্তরিকতার দেখায় সেটাও লক্ষ করেছে। এই যে এখন নিজে থেকে মারিদের খোঁজ-খবর নিতে আসল সেটাও মারিদ লক্ষ করেছে। এর আগের বারও শাহানা বেগম আশনূরকে দিয়ে বেশ খোঁজ-খবর নিয়েছেন মারিদের। মারিদ ডায়েরিটা রেখে শাহানা বেগমের পিছনে গিয়ে বসল ডাইনিংয়ে। ততক্ষণে হাসান সিকদারও চলে এসেছেন। মাজিদ থানচির সদর থেকে বাজার হাতে বাড়ি ফিরে রাত বারোটায় ততক্ষণে মারিদরা ডিনার শেষে ঘরে চলে যায় বিশ্রামে সেজন্য মাজিদের সঙ্গে মারিদের দেখা আর হয়নি।
~
‘ আপনার পা কাটলেন কীভাবে?
নূরজাহান চমকে পাশে তাকাল। কুয়াশাচ্ছন্ন রাতের আঁধারে লাইটের কৃত্রিম আলোয় মারিদকে দেখল কালো ট্রাউজার প্যান্টের সঙ্গে সাদা হুডি পরে, মাথা ঢেকে রেখেছে হুডির টুপিতে। নূরজাহান কাটা পায়ের রক্ত ধুতে কলপাড়ে এসেছিল। রাত প্রায় একটার ঘর পেরিয়ে। নিস্তব্ধ আঁধার রাত। বাড়ির সবাই ঘুমিয়ে। নূরজাহান এত রাতে পা কীভাবে কাটল, মারিদের জানা নেই। তবে নূরজাহানের সঙ্গে মারিদের এই নিয়ে তৃতীয়বার সাক্ষাৎ। প্রথমবার মারিদ অতি উত্তেজনায় কথা বলতে পারেনি, দ্বিতীয়বার নূরজাহান পালিয়ে গিয়েছিল, কথা বলেনি। আজ মারিদ নূরজাহানের সঙ্গে কথা বলবে বলেই সে কাঠের জানালা দিয়ে নূরজাহানকে কলপাড়ে দেখে ঘর থেকে বেরিয়ে এসেছে। নূরজাহান রক্ত পড়া ভেজা পায়ে মারিদকে দেখে চলে যেতে উদ্যত হলে মারিদ পথ আটকে বলল…
‘ পালাচ্ছেন কেন? পায়ে রক্ত পড়ছে, আগে সেটা পরিষ্কার করুন। এতটা পা কাটলেন কীভাবে আপনি?
নূরজাহান চলে যেতে গিয়ে পায়ে ব্যথায় দাঁত চেপে দাঁড়াল। কলপাড়ে মেঝে ভিজে যাচ্ছে রক্তে। মারিদ নূরজাহানের ধবধবে সাদা পায়ের দিকে তাকাল। মনে হচ্ছে ফর্সা পায়ে কেউ লাল আলতা ঢেলে দিয়েছে। গায়ে শীতের কাপড় নেই। গায়ের ওড়না মাথায় গোল করে শরীরে পেঁচানো। নূরজাহান চলে না গিয়ে টিউবওয়েল ধরে কলপাড়ে দাঁড়াল। মারিদকে শান্ত স্বরে বলল…
‘ আপনি এখানে কেন এসেছেন? বাড়ির কেউ দেখলে খারাপ ভাববে। আপনি ঘরে যান। আমি ঠিক আছি।
নূরজাহানের শান্ত দৃষ্টি, শান্ত স্বরের কথায় মারিদের মনে হলো নূরজাহান মেয়েটি মারিদকে চেনে। নূরজাহানের ভাবভঙ্গি কেমন শান্ত, স্বাভাবিক। মারিদ খানিকটা কপাল কুঁচকে বলল…
‘ আপনি আমাকে চেনেন?
‘ আপনি আমাদের বাড়িতে এসেছেন। বাড়ির মেহমানদের চেনাটা স্বাভাবিক। আমিও সেইভাবে চিনি আপনাকে। আপনি এখন ঘরে যান। অনেক রাত হয়েছে গিয়ে ঘুমান।
তথ্য অনুযায়ী মারিদের সামনে আশনূর অপরিচিতা হিসেবে সামনে এসছে। অথচ মারিদ অদ্ভুতভাবে অপরিচিতা হিসেবে নূরজাহানকে টানে। কেন টানে মারিদ তা জানে না। কিন্তু নূরজাহানের মাঝে অপরিচিতার ঝলক ভাসে, যেটা আশনূরের মাঝে মারিদ খুঁজে পায় না। এই যে এখন নূরজাহানের কথার ধরণগুলো মারিদের অপরিচিতার মতোন লাগছে। যেটা আশনূর বলার সময় মারিদ ফিল করতে পারে না। মারিদ বলল…
‘ আপনাকে আমার পরিচিত মনে হচ্ছে কেন? আমরা কি পূর্ব পরিচিত?
খানিকটা অসন্তুষ্টিতে তৎক্ষনাৎ উত্তর দিল নূরজাহান বলল…
‘ আমরা পূর্ব পরিচিত নই। আমার আপনাকে পরিচিত মনে হচ্ছে না। আপনি এখন দয়া করে ঘরে যান। মধ্য রাতে দুজন ছেলে-মেয়েকে এইভাবে কেউ বাড়ির উঠোনে দাঁড়িয়ে কথা বলতে দেখলে বিষয়টি খারাপ ভাবে নেবে। আশা করছি আপনি আমার কথা বুঝতে পারছেন।
মারিদ থমে যাওয়ার পাত্র নয়। সে নূরজাহানকে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে পরখ করে বলল…
‘ আমার মনে হয় না আপনি কারও দেখা নিয়ে ভয় পাচ্ছেন না। আপনি অন্য কিছু নিয়ে আমাকে ভয় পাচ্ছেন? আসলেই কি তাই?
নূরজাহান বেশ শান্ত এবং স্থির দৃষ্টিতে মারিদকে কয়েক পলক দেখে সে নিজেই রক্ত ভেজা পা নিয়ে খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে হেঁটে মারিদকে পাশ কাটিয়ে চলে যেতে লাগল। মধ্যরাতে মারিদের সঙ্গে কথা বলে নূরজাহান কারও চোখে পড়তে চায় না। বাড়ির মেহমানের সঙ্গে নূরজাহান দাঁড়িয়ে আছে, সেটা কেউ ভালো ভাবে নেবে না। নূরজাহান এমনই বদনাম। নতুন করে অন্য কারও নামে আর বদনাম জড়াতে চায় না। মারিদ নূরজাহানের পথ আটকাল না। তবে নূরজাহানকে পিছু ডেকে বলল…
‘ আপনার ঘরের দরজায় ফার্স্ট এইড বক্স রেখে যাব। পায়ের ক্ষতস্থান পরিষ্কার করে দ্রুত ব্যান্ডেজ করে নেবেন, নয়তো রক্তক্ষরণ বন্ধ হবে না।
চলিত….
[ আমি কী লিখছি, আমি জানি। গল্পটা কোথায় যাচ্ছে, সেটাও আমি জানি। আপনাদের কাছে গল্পটা প্যাঁচ কিংবা জগাখিচুড়ি মনে হতে পারে, কিন্তু আমার কাছে সব ক্লিয়ার। গল্পের এই কাহিনি গুলো কেন লেখা হচ্ছে সেটা পুরো উপন্যাসটা একত্রে পড়লে বুঝতে পারবেন। আস্তে আস্তে আপনারাও সবকিছু ক্লিয়ার হবেন। আমি এই গল্পটা লিখতে কোনো তাড়াহুড়ো করব না। আর না কারও কথা শুনব। আমি যেভাবে কাহিনি সাজিয়েছি সেভাবে এগোবে গল্পটা। এখানে তনিমা কেন? মারিদও মেইন লিড চরিত্র না। গল্পের মাত্র ৩৫% প্রকাশ পেয়েছে। আরও ৬৫% বাকি আছে। আর গল্পটা অনেকগুলো চরিত্র নিয়েই লেখা হবে। প্রত্যেকটা চরিত্রের আলাদা আলাদা কাহিনি থাকবে। বলতে পারেন, আমার লেখালেখির জীবনের সবচেয়ে বড় উপন্যাস হবে এটা ইনশাআল্লাহ। আরেকটা কথা, আপনাদের যদি মনে হয় গল্পের নামটা যাচ্ছে না, তাহলে #ডাকপ্রিয়র_চিঠি নামটা চেঞ্জ করে শুধু #ডাকপ্রিয় করে দেব। অবশ্যই সবাই মতামত জানাবেন। উপন্যাস (চিঠি অংশটা) একদম গল্পের শেষ দুই-তিন পর্বে বুঝতে পারতেন কেন আমি ‘চিঠি’ শব্দটা উপন্যাসের নামের সঙ্গে যুক্ত করেছিলাম। তারপরও যদি মনে হয়, তাহলে নামটা চেঞ্জ করে দেব।]
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৫
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৭
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭