ডাকপ্রিয়র_চিঠি
লেখিকাঃ_রিক্তা ইসলাম মায়া
১২
‘ আপনি ভয় না পেয়ে যা বলার নির্ভয়ে বলুন। আমরা কেউ আপনার ক্ষতি করব না। আমরা সবাই আইনের লোক। আমার উপর আস্থা রাখুন।
সিআইডি অফিসার তাজউদ্দীন আহমেদ কথা গুলো বলেই তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে তাকালেন দোকানি মাহফুজ আলীর দিকে। মাহফুজ আলীর চোখেমুখে গভীর ভয়, কপালে ঘামের ফোঁটা। তাজউদ্দীন সাহেব শান্ত অথচ দৃঢ় কণ্ঠে আশ্বস্ত করলেন দোকানি মাহফুজ আলীকে। কিন্তু ভয়ার্ত মাহফুজ আলীর আপত্তি জানিয়ে বলল,
‘ আমাকে বিশ্বাস করুন স্যার। আমি সত্যি কিছু জানি না।
‘আপনি বলেছেন এই নাম্বারটা আপনি চেনেন না? কখনো ফ্লেক্সিলোড করেননি তাইতো?
মাহফুজ আলী আবারও একই ব্যাখ্যা দিয়ে তাজউদ্দীন সাহেবকে বললেন,
‘স্যার, আমি একজন দোকানি মানুষ। আমার কাছে রোজ কত মানুষ আসে রিচার্জ করতে। এত মানুষের ভিড়ে আমি আপনার দেওয়া নাম্বারটার তথ্য কীভাবে দেব? তাও এক বছর আগের তথ্য চাইছেন আপনারা। এক বছর আগে কত মানুষই তো আমার কাছ থেকে ফ্লেক্সিলোড করেছে, এখন আমি এত মানুষের কথা কীভাবে মনে রাখব স্যার?
খুব কৌশলে দোকানি মাহফুজ আলী তাজউদ্দীন সাহেবকে উত্তরটা দিলেন। সিআইডি অফিসার তাজউদ্দীন আহমেদ একজন চতুর মানুষ। পেশাগত চতুরতা ওনার রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবাহিত। আসামি দেখে তার অঙ্গভঙ্গি বলে দিতে সক্ষম কে সত্য বলছে আর কে মিথ্যা। মূলত এই চতুরতার জন্যই তাদেরকে বিশেষভাবে সিআইডি পোস্টে রাখা হয়। তাজউদ্দীন সাহেবের কাছে দোকানি মাহফুজ আলীর কথাটা যুক্তিসংগত মনে হলেও আপাতত তিনি বিশ্বাস করতে পরছেন না। আসামি নিজেকে বাঁচাতে এমন কত যুক্তিই দেখায় কিন্তু আসামির সব যুক্তি মেনে না নেওয়াটা হলো ওনার পেশাগত অভিজ্ঞতা। তাছাড়া ওনারা খবর পেয়েই এখানে এসেছে। অপরিচিতা মেয়েটির নাম্বারে লোকেশন এই দোকানির দোকানেও পাওয়া গেছে সেই সুবাদে মাহফুজ আলীও সন্দেহের তালিকায় যুক্তি। তাই তাজউদ্দীন সাহেব শান্ত ভঙ্গিতে খানিকটা হুমকি দিয়ে বললেন,
‘দেখুন মাহফুজ সাহেব, আমাদেরকে আপনার সাধারণ লোক মনে হতে পারে, তবে আমরা কিন্তু সাধারণ কেউ নয়, সিআইডির লোক। এখানে আমরা বিশেষ কিছু তদন্তের জন্য এসেছি, আপনার কোনো ক্ষতি করতে নয়। তবে যদি আমরা আমাদের সঠিক তথ্য না পাই, তাহলে অবশ্যই আপনাকে এই মুহূর্তে আমাদের সঙ্গে থানায় যেতে হবে। তখন নিশ্চয়ই আপনার ভালো লাগবে না বিষয়টা?
অফিসার তাজউদ্দীনের শান্ত স্বরের হুমকিতে ভয় দেখা গেল মাহফুজ আলীর মাঝে। তিনি খানিকটা কাঁচুমাচু করতে অফিসার তাজউদ্দীন সাহেব পুনরায় মাহফুজ আলীকে আশ্বস্ত করে বললেন,
‘যা বলার নির্ভয়ে বলুন মাহফুজ সাহেব। আমরা কেউ আপনার ক্ষতি করব না। আইনের ওপর বিশ্বাস রাখুন। সঠিক তথ্য দিয়ে আমাদের পাশে থাকুন।
‘ আমাকে জেলে দিবেন নাতো স্যার?
‘ না দিব না। বিশ্বাস রাখুন।
অফিসারের আশ্বস্ত পেয়ে খানিকটা সময় নিয়ে মাহফুজ আলীর থমথমে মুখে বলতে শুরু করলেন,
‘স্যার, এই একই নাম্বারের খোঁজে আমার কাছে এক বছর আগে আরও বেশ কিছু মানুষ এসেছিল। আমাকে তখন আপনাদের মতোই এমনভাবে প্রশ্ন করেছিল। দোকানে তখন আমার একজন কর্মচারী ছেলে ছিল, ছেলেটি এই নাম্বারটার সম্পর্কে কিছু জানতো না বলে ওহ সেদিন কিছু বলতে পারেনি লোকগুলোকে, সেজন্য লোকগুলো আমার দোকানসহ আমার কর্মচারী ছেলেটাকেও বেশ মারধর করে। খবর পেয়ে আমি দোকানে দৌড়ে এসে দেখি আমার দোকানের সবকিছু ততক্ষণে ভেঙেচুরে কর্মচারী ছেলেটাকেও আটকে রেখেছিল ঐ গুন্ডা টাইপের মানুষগুলো। আমি আসাতে আমাকেও জব্দ করে জিজ্ঞাসা করে এই নাম্বারের মালিকের খোঁজ দিতে। সেদিন আমি অনেক ভয় পেয়েছিলাম স্যার। নিজেদের জীবন বাঁচাতে ফ্লেক্সিলোডের হিসাবের খাতা ঘেঁটে মেয়েটির সন্ধান করি। যদিও মেয়েটিকে আমি কখনো দেখিনি। সবসময় কালো বোরখা, লম্বা হিজাব, মুখে নেকাব আর হাতে-পায়ে মোজা পরে আসতো আমার দোকানে। মেয়েটিকে আমি সবসময় পর্দাশীল অবস্থায় দেখেছি। তবে মাঝেমধ্যে মেয়েটি রাত দশটার পরেও আসত আমার দোকানে রিচার্জ করতে। নিয়মিত কাস্টমার ছিল বলে আমিও মেয়েটির পোশাক-আশাকেই চিনে ফেলতাম। তারপর একদিন মেয়েটিকে এমনি তাঁর নাম-ঠিকানা জিজ্ঞাসা করেছিলাম। কিন্তু মেয়েটি সেদিন আমাকে তার নাম-পরিচয় দেয়নি, শুধু বলেছিল, মেয়েটির নাম-পরিচয় দিলে নাকি আমি বিপদে পড়ে যাব। কী বিপদে পড়ব সেটা সেদিন বুঝিনি, তবে মেয়েটিকে আমার কাছে বেশ অন্যরকম লাগল। সবসময় মেয়েটি নিজেকে লুকিয়ে রাখার চেষ্টা করত। যেন সে কারও থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছে এমন মনে হতো। এই ধরনের মেয়ে আমি কখনো দেখিনি স্যার। তবে মেয়েটি খুব মিষ্টি স্বরে কথা বলত। যেহেতু মেয়েটি আমার নিয়মিত কাস্টমার ছিল, তাই মেয়েটিকে আমি স্বাভাবিকভাবেই চিনতে চাইতাম এই এলাকার কার মেয়ে সে? তবে মেয়েটি কার বাড়িতে থাকত, সেটা জানতাম না। কিন্তু একদিন দেখলাম মেয়েটির সঙ্গে আরও একটি মেয়ে রাত এগারোটার সময় আমার দোকানে ফ্লেক্সিলোড করতে আসে। এত রাতে সচরাচর কোনো মেয়ে মানুষ আমার দোকানে ফ্লেক্সিলোড করতে আসে না। ওদের দেখে আমি খানিকটা অবাক হই। তারপর মেয়েটিকে কৌতূহল নিয়ে প্রশ্ন করে জানতে চাই, ‘মেয়েটির বাড়ি আমার দোকানের আশেপাশে কোথাও কিনা?’ মেয়েটি বলেছিল, ‘জি আঙ্কেল।’ কৌতূহলী হয়ে আমি তখন মেয়েটির নামও জিজ্ঞাসা করি, মেয়েটি খুব স্বাভাবিকভাবেই জানায় ওর নাম অপরিচিতা। নামটা আমার কেন জানি সেদিন বিশ্বাস হয়নি স্যার, তারপরও আমি এই নামেই মেয়েটির নাম্বার আমার ফোনবুকে লিখে রাখতাম। তারপরও একদিন আপনাদের মতোই কিছু মানুষ এসে আমার দোকানপাট ভাঙচুর করে এই অপরিচিতা মেয়েটির সন্ধান চায়। আমি মেয়েটির সঠিক সন্ধান দিতে পারিনি বলে তারাও আমাকে খুব মারধর করে। এজন্য আমি টানা একটা মাস হাসপাতালে ছিলাম। এখন আবার একই নাম্বারের খোঁজে এক বছর পর আপনারা এসেছেন। আমি সত্যি বলছি স্যার, ফ্লেক্সিলোডের বাইরে মেয়েটিকে আমি আজও চিনি না। আমাকে বিশ্বাস করুন।
‘আপনি যে তখন বললেন অপরিচিতা মেয়েটির সঙ্গে আরও একটি মেয়ে এসেছিল সেদিন, ঐ মেয়েটিকে আপনি চেনেন? মুখ দেখেছেন?
‘না স্যার, চিনি না। দুজনই বোরখা পরা ছিল। মুখটাও নেকাবে ঢাকা ছিল। তাই দেখিনি।
মাহফুজ আলীর কথায় খানিকটা সন্দিহান পোষণ করে অফিসার ফের বললেন,
‘একটা মানুষ টানা ছয় মাস আপনার নিয়মিত কাস্টমার ছিল আর আপনি তার সম্পর্কে কিছুই জানেন না বলছেন? বিষয়টা অবিশ্বাস্য না মাহফুজ সাহেব?
ভয়ার্ত মুখে জড়সড় মাহফুজ আলী উত্তর দিয়ে বললেন,
‘আমি সত্যি বলছি স্যার, মেয়েটি কখনো আমাকে নিজের পরিচয় দেয়নি। যদিও আমি বেশ কয়েকবার জিজ্ঞাসা করেছিলাম, কিন্তু উত্তর পাইনি মেয়েটির থেকে। আমি সত্যি জানি না মেয়েটি কে ছিল স্যার। যদি জানতাম তাহলে অবশ্যই আপনাদের এতক্ষণে বলে দিতাম কারণ এই একই নাম্বারে জন্য বারবার হেনস্থ হতে এখন ভয় পাচ্ছি। আমাকে ক্ষমা করুন স্যার আমি আর কিছু জানি না।
দোকানি মাহফুজ আলীর কথা অফিসার তাজউদ্দীন সাহেবের বিশ্বাস হলো কি না জানা নেই। তবে তিনি হুট করেই উঠে দাঁড়ালেন, দোকান হতে বেরিয়ে যেতে যেতে মাহফুজ আলীর থেকে বিদায় নিয়ে বললেন..
‘ আজ চলি তাহলে মাহফুজ সাহেব। আমাদের আবার দেখা হবে। আল্লাহ হাফেজ।
অফিসার তাজউদ্দীন আহমেদ বেরিয়ে যেতেই ওনার পেছন পেছন হাসিবসহ সাত-আটজন পুলিশ বেরুল দোকান থেকে। এতক্ষণ সবার উপস্থিতি মাহফুজ আলীর দোকানেই ছিল। ঢাকা থেকে রংপুর জেলায় রাতেই উপস্থিত হয় মারিদরা। তথ্য অনুযায়ী জানা যায় অপরিচিতা এই মাহফুজ আলীর দোকান থেকেই ফ্লেক্সিলোড করতো। আর সেই অনুযায়ী তাজউদ্দীন সাহেব এতক্ষণ মাহফুজ আলীর জবানবন্দি নিচ্ছিল। হাসিব এতক্ষণ অফিসারের পাশাপাশি দাঁড়িয়ে দোকানদার মাহফুজ আলীর কথাগুলো রেকর্ড করছিল, মারিদকে শোনানোর জন্য। মারিদ তাদের সঙ্গে এসেছে, তবে সে এই মূহুর্তে গাড়িতে বসে। এখানে আসেনি। গোপনীয়তা রক্ষা করতে চাইছে। তবে সঙ্গে করে অবশ্য রংপুর সদর থানা পুলিশ নিয়ে এসেছে মারিদ। কোনো এলাকায় পুলিশের সাহায্য ছাড়া হুট করেই সেই এলাকায় তদন্ত করা যায় না। এতে নানান ঝামেলার সৃষ্টি হয়। তাছাড়া মারিদের কারও সন্ধান চাই, আর সেটা পুলিশের সাহায্য ছাড়া অসম্ভব। মারিদ নিজেও তার সঙ্গে করে দুজন সিআইডির অফিসার নিয়ে এসেছে ঢাকা থেকে। এবং সকলের নিরাপত্তার কথা চিন্তা করে বেশ কয়েকজন বডিগার্ডও এনেছে সে। আজকাল মারিদের ওপর হামলা হচ্ছে হুটহাট, সেজন্য মারিদকে না চাইতেও নিরাপত্তার জন্য বডিগার্ড রাখতে হচ্ছে।
অফিসার তাজউদ্দীন সাহেব দোকান থেকে বেরিয়ে সামনে এগোলেন। পরপর তিনটি গাড়ি একত্রে সারিবদ্ধভাবে দাঁড়িয়ে। প্রথম গাড়িটি পুলিশের জিপ, দ্বিতীয়টি মারিদের, তৃতীয়টি মারিদের বডিগার্ডের। পোশাকধারী বডিগার্ডগুলো বন্দুক হাতে মারিদের গাড়ির চারপাশে দাঁড়িয়ে। অফিসার পুলিশের জিপ পেরিয়ে মারিদের গাড়ির সামনে যেতেই একজন দেহরক্ষি বডিগার্ড গাড়ির পেছনের দরজা খুলে দিতে তিনি উঠে বসলেন। গাড়ি দরজা ভেতর থেকে টেনে বন্ধ করে মারিদের দিকে তাকিয়ে বললেন,
‘ব্যাপারটা জটিল মনে হচ্ছে আলতাফ সাহেব। দোকানি মাহফুজ আলীর জবানবন্দিতে যতটুকু বুঝলাম, আমাদের আগেও নাকি কারা মেয়েটির খোঁজে মাহফুজ আলীর কাছে এসেছিল। মেয়েটির সম্পর্কে সঠিক তথ্য না পাওয়ায় মাহফুজ আলীসহ তার কর্মচারীকে মারধর করে তার দোকানও ভাঙচুর করে।
গম্ভীর মারিদ মাহফুজ আলীর বিষয়ে মনোযোগী নন। সে সরাসরি অপরিচিতার তথ্য চেয়ে প্রশ্ন করে বলল,
‘মেয়েটির কোনো তথ্য পেয়েছেন?
‘না, আপাতত মেয়েটির তেমন কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তবে মাহফুজ আলীর বলছেন তিনি মেয়েটির সম্পর্কে কিছু জানেন না।
‘ আর আপনি সেটা বিশ্বাস করেছেন?
মারিদের কথায় ততক্ষণে গাড়ির সামনের সিটে উঠে বসল হাসিব। হাতের ফোনটার রেকর্ড অপশন চালু করে মারিদের দিকে সেটি এগিয়ে দিয়ে বলল,
‘স্যার, এখানে অফিসার আর মাহফুজ আলীর কথোপকথনের রেকর্ড আছে। আপনি এটা একবার শুনুন।
মারিদ সময় নিয়ে সবটা রেকর্ড শুনল। মাহফুজ আলীর কথার সূত্র ধরে মারিদের হঠাৎ অতীতের ঘটনা মনে পড়ল। ঠিক এভাবেই একদিন অপরিচিতা মারিদকে রাত এগারোটার পর ফোন দিয়েছিল। মারিদ তার ব্যস্ততার মাঝেও অপরিচিতার ফোনের অপেক্ষায় ছিল। কারণ অপরিচিতা বলেছিল সে রাতের বেলায় আগে থেকে মারিদকে কল না দিলে মারিদ যেন কল না দেয়। কারণ রাতে অপরিচিতার সঙ্গে তার পারিবারিক মানুষ ঘুমায়, তাই। খুব স্বাভাবিকভাবেই মারিদ দিনের বেলা কল দিলেও রাতের বেলা সে কখনো অপরিচিতাকে কল করতো না বরং অপরিচিতা কলের অপেক্ষা করত। সেদিন রাতে অপরিচিতার কল এসেছিল প্রায় এগারোটার পর। মারিদ অপরিচিতার কল কেটে সে কল ব্যাক করে। অপরিচিতা মারিদের কল রিসিভ করতে সালাম দিয়ে বলল,
‘আসসালামু আলাইকুম। আজ মনে হয় কল দিতে আমার একটু দেরি হয়ে গেছে, তাই না?
মারিদ সালামের উত্তর দিয়ে বলল,
‘জি, অনেকটা। কোথায় আপনি?
‘আমি বাসায় উঠছি।
‘বাসায় উঠছি মানে? এত রাতে কোথায় গিয়েছিলেন?
‘এই তো, একটু ফ্লেক্সির দোকানে গিয়েছিলাম রিচার্জ করতে।
‘এত রাতে রিচার্জ করতে একা চলে গেছেন আপনি?
‘উহুম, আমি একা যাইনি। সঙ্গে একটা কাজিন বোন আছে। তাছাড়া দোকানটা আমাদের এক পরিচিত আঙ্কেলের। আমি সবসময় ওনার থেকেই রিচার্জ করি। আঙ্কেল বিশ্বস্ত মানুষ। আমাদের বিল্ডিংয়ের পাশাপাশিই দোকানটা। আপনি চিন্তা করবেন না।
অপরিচিতা কথায় মারিদ সেদিন আপত্তি জানিয়ে বলেছিল…
‘ বিশ্বস্ত হলেও আমি আপনার এত রাতে বাইরে গিয়ে রিচার্জ করার প্রয়োজন দেখছি না, অপরিচিতা। আপনার ফোনে সামান্য রিচার্জ করার সামর্থ্য আমার আছে। তাছাড়া ফোন তো আমি আপনাকে দেয় তাহলে আপনার বাইরে গিয়ে রিচার্জ করার প্রয়োজন কি?
‘আপনার সামর্থ্য থাকলেই যে আমাকে আপনার থেকে নিতে হবে এমনটা তো নয়, ব্যবসায়ী সাহেব। আমি মানুষটা ছোট হলেও কিন্তু আমার আত্মসম্মান বেশ প্রকট। তাছাড়া আপনার জীবনে আমার জায়গাটা খুব নড়বড়ে। যেদিন আপনার ওপর আমার ব্যক্তিগত অধিকার থাকবে, সেদিন খুব অধিকার দেখিয়ে আপনার থেকে সবকিছুই নেব ইনশাআল্লাহ। আপাতত ততদিন না হয় সবকিছু তোলা থাক। আর আমার ফোনের ব্যালেন্স একেবারেই শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই আপনাকে সামান্য মিসকল পযন্ত করতে পারছিলাম না। জানি আপনি আমার ফোন না পেয়ে কল দেবেন না। সেজন্য আমার একটা কাজিন বোনকে নিয়ে সবার অগোচরে বাসা থেকে বেরিয়েছিলাম রিচার্জ করতে। এখন আপনি চিন্তা করবেন না, আমি হেফাজতেই আছি। তবে যদি কোনো দিন আমার ফোন পাওয়া বন্ধ হয়ে যায়, তাহলে নিজ দায়িত্বে আমাকে খোঁজে নিবেন কেমন?
‘স্যার? স্যার? শুনছেন?
মারিদ বিরক্তির চোখ খুলে তাকাল হাসিবের দিকে। হাসিব সামনের সিট থেকে উঁকি মেরে পিছন ফিরে মারিদের দিকে তাকিয়ে। পাশাপাশি বসা অফিসার তাজউদ্দীনও মারিদের দিকে একই কৌতূহলী ভঙ্গিতে তাকিয়ে। হাসিবের কল রেকর্ড শুনতে শুনতে মারিদ সিটে গা এলিয়ে চোখ বন্ধ করে অতীতে ডুবে যায়। হাসিবের ডাকে সে সম্বিতে ফিরে আসে। মারিদ শান্ত দৃষ্টিতে হাসিব ও অফিসারের কৌতূহলী দৃষ্টি দেখে সোজা হয়ে বসল। ডানহাতে কপালের একপাশ চুলকে হাসিবের উদ্দেশ্যে আদেশ করে বলল,
‘ যা-তো হাসিব, দোকানদার মাহফুজ আলীকে গাড়িতে ধরে নিয়ে আয়। আমি কথা বলব।
‘জি স্যার।
হাসিব মারিদকে তৎক্ষনাৎ সম্মতি দিয়ে চলে গেল। মারিদের পাশাপাশি সিটে বসে থাকা তাজউদ্দীন সাহেব খানিকটা সন্দিহান পোষণ করে মারিদ থেকে জানতে চাইলেন,
‘ আলতাফ সাহেব কোনো সমস্যা?
অফিসারের কথায় মারিদ সোজাসাপটা উত্তর দিয়ে জানায়,
‘দোকানদার মাহফুজ আলী আপনাকে মিথ্যা ইনফরমেশন দিয়েছে অফিসার। সে অপরিচিতা মেয়েটিকে পূর্ব থেকেই চেনে। অপেক্ষা করুন। সত্যিটা জানতে পারবেন।
মারিদের কথায় অফিসার চুপ করে বসল। মাহফুজ আলীর মিথ্যা বলছে এটা তাজউদ্দীন সাহেবেরও মনে হয়েছে। হয়তো মাহফুজ আলী কিছু লুকানোর চেষ্টা করছে। এবার দেখা যাক কী লুকাতে চাইছে। মারিদের অপেক্ষার মাঝেই কয়েক মিনিটের ভিতরে মাহফুজ আলীকে নিয়ে ফিরল হাসিব। গাড়ির সামনের সিট খুলে মাহফুজ আলীকে গাড়িতে বসিয়ে হাসিব বাইরে দাঁড়াল গাড়ির দরজা লাগিয়ে। ভয়ার্ত মাহফুজ আলী অফিসারের পাশাপাশি মারিদকে দেখেই খানিকটা ভয়ে জড়সড় হলেন। ওনাকে পুনরায় কেন ডাকা হয়েছে তা জানে না মাহফুজ আলী। তাছাড়া তিনি মাস্ক পরিহিত মারিদকে দেখে মনে হচ্ছে চেনেন না। মারিদ মাহফুজ আলীকে সরাসরি অপরিচিতা প্রসঙ্গে প্রশ্ন করে বলল..,
‘দেখুন মাহফুজ সাহেব, আমি ঘুরিয়ে-পেঁচিয়ে কথা বলতে পছন্দ করি না। সরাসরি পয়েন্টে আসি। আমি জানি আপনি অপরিচিতা মেয়েটিকে চেনেন। সে কোন বাড়ির মেয়ে, সেই লোকেশনও আপনার জানা আছে। আমার যতটুকু মনে পড়ে, অপরিচিতা আপনাকে আঙ্কেল বলে সম্বোধন করত, রাইট?
গাড়ির এসির মধ্যেও বয়স্ক মাহফুজ আলীকে ঘামতে দেখা গেল। উনার ভয়ার্ত মুখটা আরও চুপসে গেল মারিদের কথার ভয়ে। তখন তিনি অফিসারকে যা জবানবন্দি দিয়েছিল সেই সবটাই সত্য ছিল শুধু অপরিচিতা মেয়েটি কোন বাড়ির ছিল, এই বিষয়টা তিনি লুকিয়ে ছিলেন। আর উনার এটা লুকানোর পেছনেও যথেষ্ট কারণ আছে। কিন্তু এখন মারিদের তীক্ষ্ণ প্রশ্নে তিনি সত্যিটা গোপন রাখতে হিমশিম খাচ্ছে। তারপরও তিনি আমতাআমতা করে কথা ঘুরাতে চেয়ে মারিদকে বলল…
‘আসলে স্যার, আমি মেয়েটির মুখ কখনো দেখিনি। সেজন্য…
মাহফুজ আলীকে বলতে না দিয়ে মারিদ আবারও তীক্ষ্ণ প্রশ্নে বলল…
‘আমি জানি আপনি আমার অপরিচিতার মুখ কখনো দেখেননি। এই বিষয়ে আমি অবগত। আপনি শুধু আমাকে সত্যিটা জানান। আপনার মিথ্যা তথ্য শুনতে আমি আগ্রহী নই।
মারিদের ‘আমার অপরিচিতা’ শব্দটাতে মাহফুজ আলীর ভয়ার্ত হলো। তিনি বুঝতে পারলেন অপরিচিতা মেয়েটি মারিদের পূর্ব পরিচিত কেউ..,
‘ স্যার আপনি চেনেন অপরিচিতা মেয়েটিকে?
‘ আপনাকে যা প্রশ্ন করা হয়েছে তার উত্তর দিন। আমি না চিনলে অবশ্যই আপনাকে এত লোক লাগিয়ে খুঁজে বের করতাম না তাই না?
মারিদের শক্ত গলার কথায় মাহফুজ আলীর ভয়ার্ত মুখে বলতে লাগল…
‘আসলে স্যার, অপরিচিতা মেয়েটির খোঁজে আমার কাছে এক বছর আগে বেশ কিছু মানুষ এসেছিল। আপনি হয়তো শুনেছেন আমাকে তারা মারধর করে আমার দোকানপাট ভেঙেছে। আসলে মেয়েটি কে, আমি আজও সঠিকভাবে জানি না স্যার। মেয়েটির মুখ আমি কখনো দেখিনি। তবে সেদিন রাতে এগারোটার সময় আমার দোকানে অপরিচিতা যে মেয়েটিকে নিয়ে এসেছিল, সেই মেয়েটিকে আমি চিনতাম স্যার। মেয়েটি এই এলাকার মারুফ সাহেবের বড় মেয়ে তানিয়া ছিল। ক্লাস নাইন শেষ করে টেনে উঠবে সেবার। আমার দোকানের পাশাপাশি বিল্ডিং হওয়ায় প্রায়ই আমার দোকানে তানিয়া মেয়েটি আসত মালামাল ক্রয় করতে। সেজন্য আমি তানিয়াকে চিনতাম। আমি ফোনের রিচার্জের সঙ্গে মুদিমালের দোকানও চালাই স্যার। সেজন্য তানিয়া পরিবার আমার নিয়মিত কাস্টমার ছিল। সেইভাবে আমি ঐ অপরিচিতা মেয়েটিকে চিনতাম। মারুফ সাহেবের মেয়ে তানিয়া আমার ভাতিজি লাগে। তানিয়া একদিন বলেছিল অপরিচিতা ওর দূরসম্পর্কের মামাতো বোন হয়। ব্যাস, এতটুকু আমি অপরিচিতা মেয়েটির সম্পর্কে জানি স্যার। এর থেকে বেশি অপরিচিতার সম্পর্কে আমার জানা নেই। সত্যি বলছি স্যার, আমি তখন এই কথাটায় অফিসার স্যারকে লুকিয়ে ছিলাম। এতে আমার কোনো দোষ নেই। আমাকে আপনারা জেলে দিবেন না স্যার। দয়া করুন। আমি একজন গরিব মানুষ। পেটে দায়ে এই এলাকায় বউ বাচ্চা নিয়ে থাকি।
‘মারুফ সাহেবের বিল্ডিং কোনটা মাহফুজ সাহেব? আমাদের ওদের বাসায় নিয়ে চলুন।
পাশ থেকে মাহফুজ আলীকে প্রশ্নটা করলেন তাজউদ্দীন সাহেব। অথচ মাহফুজ আলী ফের কিছু তিক্ত সত্য জানিয়ে বলল…
‘স্যার, ওরা তো কেউ আর এই এলাকায় থাকে না। যেদিন আমার দোকানে হামলা হয়েছিল, সেদিন মারুফ সাহেবের বাড়িতেও নাকি ঐ লোকগুলো অপরিচিতার খোঁজে হামলা করেছিল। প্রাণের ভয়ে মারুফ সাহেবের পরিবার পরদিনই এলাকা ছেড়ে চলে যায় অন্য শহরে। তবে শুনেছিলাম লোকগুলো নাকি অপরিচিতা মেয়েটিকে মারুফ সাহেবের বাড়িতে পায়নি। অপরিচিতার বাবা নাকি হামলাকারীর দুই-এক দিন আগে অপরিচিতাকে নিয়ে চলে যান। কিন্তু কোথায় গেছেন সেটা আমি জানি না স্যার।
জটিলতা পর জটিলতা দেখা দিচ্ছে। অপরিচিতাকে নিয়ে একটা প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে গেলে নতুন আরও পাঁচ প্রশ্নের সৃষ্টি হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো অপরিচিতার খোঁজে সেদিন কারা এসেছিল মাহফুজ আলীর দোকানে? হামলাকারী লোকগুলোই বা কারা ছিল? কেন তারা অপরিচিতার খোঁজ করছে? অপরিচিতাকেই কেন বা কেউ মারতে চেয়ে হামলা করবে? অপরিচিতার কথায় তো কখনো মারিদের মনে হয়নি অপরিচিতা বিশাল ব্যাকগ্রাউন্ডের কেউ, যার জন্য অপরিচিতার ওপর বারবার হামলা করবে। নাকি মারিদকে বুঝতে দেয়নি অপরিচিতা নিজের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে? কোনটা সত্যি, অপরিচিতা নাকি মাহফুজ আলীর তথ্য? ভীষণ অস্থিরতা আর সংশয় কাজ করল মারিদের মনে। ভিতরকার তোলপাড় ছটফট কাউকে বুঝতে দিল না মারিদ। বরং মুখটা গম্ভীর রেখেই মারুফ সাহেবের খোঁজ করে মারিদ ফের বলল…
‘আপনি আমাদের মারুফ সাহেবের অ্যাড্রেস দিতে পারবেন মাহফুজ সাহেব?
‘আমার কাছে মারুফ সাহেবের কোনো খোঁজ নেই স্যার। ওনার বাড়ির অ্যাড্রেস কীভাবে দেব? সেই এক বছর আগে মারুফ সাহেব নিজের বউ-বাচ্চা নিয়ে কোন শহরে চলে গেছেন সেটা আমি জানি না।
‘ মারুফ সাহেবের নিকটতম কোনো আত্মীয়দের আপনি চেনেন, যার কাছে গেলে মারুফ সাহেবের খোঁজ পাব?
‘স্যার, এই বিষয়ে আমি তেমন কিছু বলতে পারব না। কারণ মারুফ সাহেবকে আমি কাস্টমার হিসেবে চিনতাম। ওনার পরিচিত আত্মীয় কারা, আমি সেটা জানি না। কারণ আমি নিজেও অন্য জেলার মানুষ। এই শহরে দোকানদারি করে চলি। তবে আমি যতটুকু জানি মারুফ সাহেব চাকরির সুবিধার্থে বউ-বাচ্চা নিয়ে এই এলাকায় ভাড়া থাকতেন। ওনার বড় মেয়ে তানিয়া এই এলাকার হাইস্কুলে টেনে পড়ত। ছোট ছেলেটা পড়ত কিন্ডারগার্টেনে। মারুফ সাহেবের বউকে প্রায় দেখতাম ছেলে-মেয়েদের স্কুলে নিয়ে যেতে। তারপর আমি আর কিছু জানি না স্যার। আমি একজন ভাড়াটিয়া হয়ে আরেকজন ভাড়াটিয়ার নিকটতম আত্মীয়ের খবর কিভাবে রাখব?
যেহেতু মারুফ সাহেব আমার ঘনিষ্ঠ কেউ ছিল না, তাই আমি এই সম্পর্কে কিছু জানি না। তবে মারুফ সাহেবের বাড়ি ছাড়ার খবরটা আমি নিয়েছিলাম, কারণ ওনার বাড়ির আত্মীয়ের জন্য আমার ওপর হামলা হয়েছিল। সেজন্য আমি খবর নিয়েছিলাম ওরা কেউ ভালো আছে কিনা, কিন্তু পরে যখন জানলাম মারুফ সাহেব শহর ছেড়ে দিয়েছেন, তখন আর খোঁজ করিনি। কিন্তু আজ আপনাদের আসাতে পুনরায় সেসব কথা বের হলো।
মাহফুজ আলীর কথায় মারিদের কপালে ভাঁজ পড়ল বেশ কয়েকটা। মারিদ কপাল কুঁচকে কোনো কিছুর হিসাব মেলাতে লাগল। এর মাঝে অফিসার তাজউদ্দীন সাহেব বলে উঠলেন…
‘আচ্ছা, মারুফ সাহেব কোথায় চাকরি করতেন সেটা জানেন?
‘না স্যার। মারুফ সাহেব কোথায় চাকরি করতেন সেটা জানি না, তবে শুনেছিলাম তিনি কোনো একটা ব্যাংকে চাকরি করতেন। এবার কোন ব্যাংকে চাকরি করতেন, তা সঠিক জানি না।
মারুফ সাহেব কোন ব্যাংকে চাকরি করতেন, সেই সূত্র ধরে যদি উনারা মারুফ সাহেবের কর্মস্থলে গিয়ে খোঁজ করেন তাহলে হয়তো মারুফ সাহেবের বাড়ির ঠিকানা পাওয়া যেত। যেহেতু চাকরি করতে সিভি জমা দিতে হয়, তাহলে অবশ্যই সিভিতে মারুফ সাহেবের বাড়ির নাম-ঠিকানা উল্লেখ্য থাকবে। অফিসার তাজউদ্দীন সাহেব যখন আরও কিছু প্রশ্ন করবেন, তক্ষুনি মাঝে থেকে মারিদ বিচক্ষণতার সঙ্গে প্রশ্ন করে বলল..
‘মারুফ সাহেবের মেয়ের নামটা জানি কী বলেছিলেন আপনি?
‘জি স্যার, তানিয়া।
‘মেয়েটি কোন ক্লাসে পড়ে জানি?
‘ স্যার শুনেছিলাম, নাইন পাস করে টেনে উঠবে।
‘ হিসাব মতে যদি ২০১৫-তে তানিয়া মেয়েটি নাইন পাস করে টেনে উঠে তাহলে সে এই বছর এসএসসি পরীক্ষার্থী হবে। এবার কোনো স্কুলই নিউ টেনে পড়ুয়া মেয়েকে ট্রান্সফার করবে না। কারণ তার রেজিস্ট্রেশন অলরেডি নাইনে হয়ে গেছে। এই অবস্থায় উক্ত শিক্ষার্থী লেখাপড়া করতে চাইলে তাকে অবশ্যই সেই স্কুলের হয়ে পরীক্ষা দিতে হবে, আর নয়তো তানিয়াকে এক বছর গ্যাপ দিয়ে পুনরায় নাইনে ভর্তি হতে হবে অন্য কোথাও। নতুনভাবে নাইনে ভর্তি হতে গেলেও কাগজে জটিলতা দেখা দেবে আগেরবার রেজিস্ট্রেশন হওয়ায়। এই ক্ষেত্রে একজন সচেতন মা-বাবা কখনো মেয়ের এক বছর গ্যাপ দিয়ে পুনরায় নাইনে ভর্তি করাবে না। বরং তানিয়ার পড়াশোনা চালিয়ে নিতে চাইবে অন্য জেলায় সেটেল হয়ে গেলেও। যেমন হতে পারে মেয়েকে বাড়িতে রেখে সারাবছর পড়াশোনা করাল আর পরীক্ষার সময় স্কুলে নিয়ে আসল পরীক্ষা দেওয়াতে। এখন আমার যদি খুব বেশি ভুল না হয়, তাহলে আজকে এসএসসি পরীক্ষার প্রথম দিন। তানিয়াকে পরীক্ষা দেওয়াতে নিশ্চয়ই ওর বাবা-মায়ের মধ্যে কেউ একজন নিয়ে আসবে আজ সেন্টারে। এখন আমরা যদি তানিয়ার পরিবারের সঙ্গে একবার কানেক্ট করতে পারি, তাহলে নিশ্চয়ই অপরিচিতার খোঁজ পাওয়া যাবে। রাইট মাহফুজ সাহেব?
মারিদের চতুর বুদ্ধি দেখে মাহফুজ আলীর সঙ্গে তাজউদ্দীন সাহেবও খানিকটা হতবাক হলেন। এমন চতুর আর বিচক্ষণ মানুষের দেখা তাজউদ্দীন সাহেব খুব কমই পেয়েছেন। সত্যি প্রশংসনীয়। মারিদ আবারও বিচক্ষণতার পরিচয় দিয়ে বলল…
‘মেয়েটি কোন স্কুলে পড়ত আপনি সেটা বলতে পারবেন?
‘জি স্যার। সামনের মোড়ে যে রংপুর সরকারি বালিকা উচ্চ বিদ্যালয়টা আছে ঐটাতে পড়ত।
‘মেয়ের বাবা-মায়ের পুরো নাম বলতে পারবেন?
‘ তানিয়ার মায়ের নামটা জানি না স্যার। তবে বাবার নাম আর তানিয়ার পুরো নামটা বলতে পারব।
‘সমস্যা নেই, আপনি যতটুকু জানেন ততটুকুতেই চলবে। আপনি আপাতত তথ্যগুলো দিয়ে যান। পরে আপনার প্রয়োজন হলে অবশ্যই ডাকব। হাসিব! হাসিব!
মারিদ হাঁক ছেড়ে ডাকল গাড়ির পাশে দাঁড়িয়ে থাকা হাসিবকে। গাড়ির কাচ নামানো থাকায় হাসিব তৎক্ষণাৎ কোমর ঝুঁকিয়ে গাড়ির ভেতরে উঁকি মারতে মারিদ আদেশ করে বলল,
‘মাহফুজ সাহেব থেকে প্রয়োজনীয় তথ্যগুলো কাগজে তুলে নে। হাতে সময় কম, দ্রুত করো। যাহ।
হাসিব মারিদকে সম্মতি জানিয়ে ডাকল মাহফুজ আলীকে….
‘ আপনি আমার সঙ্গে আসুন মাহফুজ সাহেব।
মাহফুজ আলীর মারিদকে সালাম দিয়ে হাসিবের পিছন পিছন গেল। এর মাঝে মারিদ বারবার ঘড়িতে সময় দেখাচ্ছেন অস্থিরতায়। এখন সময় ১১:১৫। তার মানে এখন হলে পরীক্ষা রানিং চলছে। দুপুর একটায় পরীক্ষা শেষ হওয়ার আগে স্কুল থেকে তানিয়া নামের সকল তথ্য বের করে পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছাতে হবে তাদের। হাতে সময় দুই ঘণ্টার চেয়েও কম আছে। দ্রুত না করলে এই সুযোগটাও হাতছাড়া হয়ে যাবে মারিদের। মারিদ চাই না অপরিচিতাকে খোঁজে পাওয়ার কোনো সুযোগ তার হাতছাড়া হোক। মারিদের অপেক্ষার মাঝেই মিনিট কয়েক পর হাসিব হাতে এক টুকরো সাদা কাগজের মাহফুজ আলীর দেওয়া তথ্যগুলো লিখে ফিরতেই মারিদ সেই কাগজে চোখ বুলাতে বুলাতে বলল…
‘ হাসিব, গাড়ি ঘোরা, হাইস্কুলে চল দ্রুত।
‘জি স্যার।
হাসিব ড্রাইভিং সিটে বসে গাড়ির স্টিয়ারিং ঘুরিয়ে টান দিতেই মারিদের গাড়ির পেছন পেছন পুলিশের জিপসহ মারিদের বডিগার্ডের গাড়িটিকেও চলতে দেখা গেল। মারিদ চলন্ত গাড়িতে বসে আবারও হাসিবের উদ্দেশ্যে আদেশ করে বলল,
‘হাসিব, তোর সঙ্গে তাজউদ্দীন সাহেবকেও নিয়ে যাবি স্কুলে। যেহেতু আজ এসএসসি পরীক্ষা, তাই স্কুলের প্রিন্সিপালকে পাওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে প্রিন্সিপালের পরিবর্তে সহকারী শিক্ষককে অবশ্যই স্কুলে পাবি তোরা। সহকারী শিক্ষককে বলবি আজকের পরীক্ষার্থীদের লিস্ট দিতে তোদের। তোরা সেই লিস্ট ঘেটে সেখানে তানিয়া নামের যতগুলো মেয়ে আছে, সবার একটা আলাদা লিস্ট করবি। তারপর সেই লিস্টে দেখবি কোন তানিয়ার বাবার নাম হাসানুজ্জামান মারুফ লেখা আছে। যদি একাধিক তানিয়ার বাবার নামও মিলে যায়, তাহলেও সমস্যা নেই। তুই শুধু লিস্টে লিখে রাখবি তাহলে চলবে, বাকিটা আমি সামলে নেব। আর হ্যাঁ, তোর আর তাজউদ্দীন সাহেবের সঙ্গে অবশ্যই পুলিশদের নিয়ে যাবি। এই এলাকার পুলিশ দেখলে নিশ্চয়ই শিক্ষকরা তোদের তথ্য দিতে অস্বীকার করবে না। বরং তোদের ভয় পাবে। তারপরও যদি কোনো সমস্যা হয়, তাহলে আমাকে ফোন করবি, বুঝেছিস?
‘জি স্যার।
মারিদের বুদ্ধিমত্তার পরিচয় হাসিব যখন থেকে মারিদের পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট হিসেবে কাজে যোগ করেছে তখন থেকেই পেয়েছে। মারিদ একজন চতুর আর বিচক্ষণ মানুষ বলেই সে আজ ব্যবসায়িক কাজে এত সফলতা অর্জন করেছে যে মারিদ দেশ থেকে বিদেশের মাটিতেও তার ব্যবসায়িক প্রবণতা রয়েছে বেশ। পাশে বসা তাজউদ্দীন সাহেব সকাল থেকেই মারিদের বিচক্ষণতার প্রমাণ পাচ্ছেন। এবার তিনি সরাসরি মারিদের বুদ্ধিমত্তার প্রশংসা করে বললেন,
‘আনডাউটেডলি ইউ আর এ ওয়াইজ ম্যান।
নিজের প্রশংসা শুনেও মারিদ উত্তর করল না আর না কিছু বলল তাজউদ্দীন সাহেবকে। মারিদ শুধু তার অপরিচিতার খোঁজে দিশেহারা।
~~
‘ স্যার, তানিয়া নামে দুজন মেয়ের তথ্য পাওয়া গেছে এসএসসি পরীক্ষার্থীদের মধ্যে। একজন তানিয়ার বাবার নাম মানিক মিয়া। অন্যজন তানিয়ার বাবার নাম হাসানুজ্জামান মারুফ, মা ফাতেমা বেগম। খুব সম্ভবত আমরা যে তানিয়ার পরিবারকে খুঁজছি, সেই তানিয়া এটি স্যার।
ফোনের ওপাশ থেকে তানিয়ার সন্ধান পেতে মারিদের বুকের ভেতরটা হঠাৎ কেমন মোচড় দিয়ে উঠল চিনচিন ব্যথায়। মারিদের মনে কোথাও আশার আলো জেগে উঠল, হয়তো এইবার অপরিচিতার খোঁজ পেল বলে। মারিদ স্কুল গেটের সম্মুখে পার্কিং করা গাড়িতে বসে। গাড়ির জানালা দিয়ে স্কুলের গেটের দিকে তাকিয়ে মারিদ বলল,
‘ পারফেক্ট! এবার তথ্য নিয়ে দ্রুত বেরিয়ে আয় হাসিব। আসার সময় স্কুলের প্রিন্সিপালের নাম্বারটাও নিয়ে আসবি। কোন কেন্দ্রে পরীক্ষা হচ্ছে, সেটাও জেনে আসবি, বুঝেছিস?
‘জি স্যার।
অল্প কিছু সময়ের মধ্যে হাসিব প্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে বেরিয়ে আসতে মারিদ ঘড়ির দিকে তাকাল। ১২:২৫। এক ঘণ্টার ভিতর পরীক্ষার কেন্দ্রে পৌঁছে তানিয়াসহ ওর অভিভাবককে খুঁজে বের করতে না পারলে মারিদ অপরিচিতার সন্ধান পাবে না। হাসিব গাড়িতে বসতে মারিদ তাড়া দিল কেন্দ্রীয় পরীক্ষার হলে পৌঁছাতে। তার আগে মারিদ নিজে স্কুলের প্রিন্সিপালের নাম্বারে কল মেলালেন। প্রিন্সিপালের সঙ্গে প্রয়োজনীয় কথাবার্তা সেড়ে মারিদ জানাল সে রংপুর থানা পুলিশসহ দুজন সিআইডি অফিসারকে নিয়ে আসছে উনার স্কুলের শিক্ষার্থীর তানিয়া ও তার অভিভাবকের সঙ্গে দেখা করতে। বিষয়টা বেশ জটিল মনে করে প্রিন্সিপাল সাহেব তৎক্ষনাৎ তানিয়ার অভিভাবকের খোঁজ করলেন। জানা গেল, তানিয়ার মা ফাতেমা বেগম মেয়েকে পরীক্ষা হলে নিয়ে এসেছেন। আপাতত তিনি পরীক্ষার হলের বাইরে বসে আছেন মেয়ের জন্য। প্রিন্সিপাল সাহেব একজন লোক পাঠিয়ে তানিয়ার অভিভাবকে হলের ভিতরে টিচার্স রুমে বসালেন। ততক্ষণে পরীক্ষা হলেও ছুটি হতে দেখা গেল। মারিদের কেন্দ্রে পৌঁছাতে সময় তখন একটার ঘরে। শিক্ষার্থীরা যার যার মতো করে হল ছেড়ে বেরুচ্ছে। শিক্ষার্থীদের হইচইয়ের মধ্যে মারিদ মধ্যস্থ গাড়ি থেকে বেরুতে আশেপাশে দাঁড়িয়ে থাকা অসংখ্য অভিভাবকও শিক্ষার্থীদের একত্রে দৃষ্টি পরল মারিদদের ঘিরে। পরপর তিনটি গাড়ি কেন্দ্রের সামনে থামতে সকলের দৃষ্টি ভিড়ে গেল সেদিকে। মারিদের মুখে মাস্ক আর চোখে রোদচশমা পরে, গায়ে কালো হুডি জড়িয়েছে। হুডির টুপি কপাল অবধি টেনে মুখ ঢেকে দু’হাত হুডির পকেটে গুঁজে হলে দিকে হাঁটতে মারিদকে মধ্যস্থতায় রেখে চারপাশে ঘিরে হাঁটল পুলিশসহ বেশ কিছু বডিগার্ড। মারিদের পাশাপাশি হাসিব আর তাজউদ্দীন সাহেবও অবস্থান করতে দেখা গেল। এর মাঝে দেখা গেল কেন্দ্রীয় হলের সামনে প্রিন্সিপালকে দাঁড়িয়ে থাকতে। তিনি এগিয়ে এসে মারিদকে নিয়ে হলে প্রবেশ করলেন। যেহেতু উপজেলার থানা পুলিশ ছিল মারিদের সঙ্গে তাই মারিদকে নিয়ে পরীক্ষার কেন্দ্রে প্রবেশ করতে কারও কোনো সমস্যা হলো না। মারিদ প্রিন্সিপালকে অনুসরণ করে একটি কক্ষে প্রবেশ করতে দেখল একজন বয়স্ক মহিলার পাশাপাশি স্কুল ড্রেস পড়ুয়া মেয়ে দাঁড়িয়ে হাতে পরীক্ষার ফাইলপত্র নিয়ে। হঠাৎ এত পুলিশ আর অপরিচিত মারিদের আগমন দেখে মহিলাটিও ভয়ে আসন ছেড়ে তৎক্ষনাৎ দাঁড়িয়ে যায় তানিয়ার হাত চেপে। মারিদ মহিলাটির ভয় বুঝে হাসিবের দিকে তাকাল, ইশারায় বুঝাল পুলিশদের নিয়ে বেরিয়ে যেতে। মারিদের ইশারা অনুযায়ী হাসিব তৎক্ষণাৎ সকল পুলিশদের নিয়ে কক্ষের বাইরে দাঁড়াল, ভিতরে প্রিন্সিপালসহ তাজউদ্দীন সাহেবকে মারিদের সঙ্গেই রেখে গেল। মারিদ মহিলাটির মুখোমুখি চেয়ারে বসতে বসতে বললেন…
‘দেখুন মিস, আমি আপনার সময় নষ্ট করতে চাচ্ছি না। তাই সরাসরি পয়েন্টে কথা বলি। আমি এখানে আপনার দূরসম্পর্কের ভাইয়ের মেয়ের খোঁজ করতে এসেছি। যার জন্য এক বছর আগে আপনাদের ওপর হামলা হয়েছিল এবং আপনি আপনার পরিবারকে নিয়ে রংপুর জেলা ছেড়েছিলেন, সেই ভাতিজি খোঁজ চাই আমার। এখন সে কোথায় আছে? তার বর্তমান ঠিকানাটা আমার লাগবে। আর হ্যাঁ, আপনি চাইলেও কিন্তু আমাকে মিথ্যা বলতে পারবেন না। কারণ আমি অলরেডি আপনাদের সম্পর্কে সকল তথ্য জেনেই এখানে এসেছি। তাই আমাকে মিথ্যা বলে নিজেদের বিপদ না বাড়াবেন মিস।
মারিদের সোজাসাপটা কথায় মা-মেয়ে দুজনের মধ্যেই আতঙ্কিত রেশ দেখা গেল তৎক্ষনাৎ। যেন ভয়ংকর কোনো অতীতের কথা মনে করিয়ে দিয়েছে মারিদ। মারিদের কথায় তানিয়া কিংবা তানিয়ার মা ফাতেমা বেগম কেউ মুখ খুলছে না ভয়ে। দুজনই ভয়ে একে অপরের মুখ চাওয়াচাওয়ি করছে। এরমাঝে সাহস করে তানিয়াই মারিদকে প্রশ্ন করে বলে বসল…
‘আপনি কে? আপনি আমার কাজিনের খোঁজ কেন করছেন? নূ….
কারও নাম বলতে গেলেই ফাতেমা বেগম তানিয়ার হাতটা খপ করে চেপে চোখের ইশারায় শাসিয়ে কোনো কিছু বলতে নিষেধ করল তানিয়াকে। মায়ের কড়া দৃষ্টিতে তানিয়া দমে যেতেই ফাতেমা বেগম বললেন…
‘দেখুন স্যার, আপনি যাকে খুঁজছেন সে আরও এক বছর আগেই মারা গেছে। আমার ভাইজিকে কবর দিয়েই আমরা রংপুর জেলা ছেড়েছি। দয়া করে, আমাদের জন্য আর কোনো নতুন মুশকিল তৈরি করবেন না। আমরা এমনি বিপদে আছি।
অপরিচিতার মৃত্যুর সংবাদে মারিদ তৎক্ষণাৎ কোনো প্রশ্ন করতে পারল না আর। বরং সে কেমন শক্ত হয়ে কিছু সময়ের জন্য বসে রইল। অপরিচিতার মৃত্যু সে আজও মেনে নিতে পারে না। মারিদের আজও দৃঢ় বিশ্বাস হয়, অপরিচিতা বেঁচে আছে। আর যদি মারাও যায়, তাহলে মারিদ অপরিচিতার কবরটার সঙ্গে হলেও একবার সাক্ষাৎ করে আসবে। মারিদ শুকনো গলায় ঢোঁক গিলে গলা ভেজাতে চাইল কিন্তু পানির অভাবে তার গলা শুকিয়ে কাঠ। মারিদ মাস্কের ভিতরে জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে তাকাল তানিয়ার দিকে। ফাতেমা বেগম অপরিচিতাকে মৃত বলে ঘোষণা দিলেও তানিয়ার চোখে-মুখের দৃষ্টি বলছে অন্য কিছু। তাছাড়া তানিয়া তখন হয়তো অপরিচিতার নামটা বলতে চেয়েছিল ‘নূ’ বলে, যেটা ফাতেমা বেগমের বাঁধা দেওয়ায় বলতে পারেনি সে। মারিদ ফাতেমা বেগমকে ছেড়ে এবার সরাসরি তানিয়ার দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করে বলল…
‘অপরিচিতা বেঁচে আছে কি না, মারা গেছে, সেটা জানতে চাইব না। আমার শুধু অপরিচিতার বর্তমান অ্যাড্রেস চাই। যদি অপরিচিতা মৃত হয়, তাহলে তার বর্তমান কবরস্থানের ঠিকানা কাগজে লিখে দাও তানিয়া। আশা করছি তুমি তোমার মায়ের মতো মিথ্যা বলবে না আমাকে।
মারিদের কথা শেষ হতেই আতঙ্কিত ভঙ্গিতে তানিয়া মারিদকে প্রশ্ন করে বলল,
‘ আপনি ব্যবসায়ী সাহেব?
‘জি! আপনি কি আমাকে চেনেন?
তানিয়া কিছু বলতে গিয়েও মায়ের হাত চেপে থাকায় কিছু বলতে পারল না। তাই সে নিজের ফাইল থেকে কলম নিয়ে অফিসের থাকা এক টুকরো কাগজে একটা অ্যাড্রেস লিখে মারিদের দিকে বাড়িয়ে দিতে দিতে বলল,
‘আমরা আপনাকে এর থেকে বেশি সহায়তা করতে পারব না স্যার। আমাদের ক্ষমা করবেন। আমরা নিরুপায়।
মারিদ তানিয়ার দেওয়া কাগজটার দিকে তাকাল। এক টুকরো কাগজে একটা অ্যাড্রেস লিখে। হয়তো এটা মারিদের কাঙ্ক্ষিত মানুষটার সন্ধান লিখা তাতে।
[ আমার দু’দিন লেগেছে এই পার্টটা লেখতে। দুঃখিত এতো লেট করে গল্প দেওয়ার জন্য। আর হ্যাঁ গল্প নিয়ে অবশ্যই রিভিউ পোস্ট করবেন। ধন্যবাদ সবাইকে ]
চলিত…
Share On:
TAGS: ডাকপ্রিয়র চিঠি, রিক্তা ইসলাম মায়া
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৭
-
রিদ মায়ার প্রেমগাঁথা গল্পের লিংক
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৮
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২০
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৮(প্রথমাংশ+শেষাংশ)
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ৬
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২১
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ২
-
ডাকপ্রিয়র চিঠি পর্ব ১৯