“- আই কান্ট কান্ট্রোল বেইব, ইউ আর সো হট”..
শপিংমলের লিফটে নিজের উডবি হাসব্যান্ড ও বেস্টফ্রেন্ডকে অর্ধনগ্ন, ঘনিষ্ঠ হয়ে চুম্বনরত অবস্থায় দেখে থমকে যায় মৃত্তিকা। চোখ জোড়া জ্বলে ওঠে মেয়েটার। পায়ের পাতা শিরশির করে ওঠে। হাতে থাকা শাড়ির পেপার ব্যাগ পরে যায় টাইলসে। লিফট বন্ধ হওয়ার আগ মুহুর্তে মৃত্তিকাকে দেখতে পায় ইয়াসিন। রুবির ঘাড় থেকে মুখ সরিয়ে হতভম্ব চোখে তাকায় মৃত্তিকার দিকে। এক লহমায় রুবিকে বুক থেকে ছিটকে ফেলে লিফটের মাঝে হাত রাখে। অধৈর্য্য ভঙ্গিতে আতঙ্কিত পায়ে এগিয়ে আসে মৃত্তিকার দিকে। মৃত্তিকার চোখ ফেটে দু ফোঁটা তপ্ত পানি গড়ায়। হাহাকার করে ওঠে বুক। ইয়াসিনকে এগোতে দেখে মৃত্তিকা দ্রুত ব্যাগ নিয়ে ছুটে পালিয়ে যায়। তার পিছু পিছু ছুটে আসে ইয়াসিন। পেছন থেকে কাতর স্বরে ডাকে,
“- মৃত্তিকা, দাঁড়াও। কথা শোনো আমার”।
মৃত্তিকা দাঁড়ায় না। চঞ্চল পায়ে ছুটে চলে। সবার দৃষ্টি তাদের দুজনের দিকে নিবদ্ধ। মৃত্তিকা এসকেলেটর এ চড়ে সোজা নিচ তলায় চলে আসে। স্লাইড ডোর ঠেলে বেরিয়ে আসে রাস্তায়। আশেপাশে রিকশস ব্যতিত যানবাহন নেই। রিকশা দিয়ে গেলে ইয়াসিন তাকে ধরে ফেলবে। এই ভয়ে মৃত্তিকা এগিয়ে যায় মাইক্রো কারটির দিকে। দরজায় টোকা নাড়ে খুব আতঙ্কিত ভঙ্গিতে। চোখে মুখে একরাশ ভয় মৃত্তিকার। হাত-পা থরথর করে কাঁপছে বারংবার। পিছু ফিরে ইয়াসিনের পায়ের শব্দ শোনার চেষ্টা করছে সে। গাড়ির গ্লাস নামিয়ে একটি পুরুষালি কণ্ঠস্বর ভেসে আছে,
“- হোয়াট”?
মৃত্তিকা পুরুষটির গম্ভীর, রাগী স্বরে চমকায় ভারি। কম্পিত ঠোঁট জোড়া চেপে ধরে সে। খুব দ্রুত, ভীতু স্বরে বলে ওঠে,
“- আমায় একটু লিফট দেবেন? আমি খুব বিপদে আছি, এক্ষুণি আমাকে বাড়ি পৌঁছাতে হবে। চিন্তা করবেন না, আমি আপনাকে পে করবো”।
বারবার পিছু ফিরে তাকাচ্ছিল মৃত্তিকা। তার এহেন তটস্থ ভঙ্গি পুরুষটিকে কিছুটা নরম করে তোলে। গম্ভীর, রাশভারি কণ্ঠে বলে,
“- ওঠো”।
এক বাক্যে মৃত্তিকা গাড়ির দরজা খুলে ব্যাকসিটে বসে পরে। লোকটি দ্রুত গাড়ি স্টার্ট দেয়। গাড়ি চলতে শুরু করতেই বুক ফুলিয়ে শ্বাস টানে মৃত্তিকা। রাত এখন ন টা বাজে। শপিং মলের নিচ তলায় ঔষধের দোকান আছে। মৃত্তিকা তার আব্বার ঔষধ কিনতে এসেছিল। ভেবেছিল ঔষধ কেনার পাশাপাশি দুটো ওড়নাও কিনে ফেলবে। সেজন্যই দূরের মলে এসেছিল এ রাতেও। কিন্তু হুট করে এমন অপ্রত্যাশিত, অযাচিত দৃশ্য চোখে পরবে ভাবেনি মোটেও। বুক ক্রমাগত কাঁপছে মেয়েটার। বিশ্বাস হচ্ছে না সবটা। ঘৃনায় গা গোলাচ্ছে। তার ফোন বাজছে, আম্মা কল করছে। ফোন না তুললে দুশ্চিন্তা করবে। কিন্তু মৃত্তিকার যা অবস্থা তাতে হাত-পা নড়ছে না। শ্বাস নিতেও কষ্ট হচ্ছে। মায়ের কলটা কেটে যেতেই “জানু” দিয়ে সেভ করা নম্বরটি থেকে কল আসে। ঘৃণা, অভক্তিতে মৃত্তিকার গা জ্বলে ওঠে। রেগে যায় তৎক্ষনাৎ। অসাড় হাতটা টেনে কল ওঠায় সে। ওপ্রান্তের মেয়েটিকে কথা বলতে না দিয়েই মৃত্তিকা বলে,
“- কেন কল করেছিস? তোর সাহস দেখে আমি অবাক হচ্ছি রুবি, এত নিচু একটা কাজ করার পরও তুই আমাকে কল করিস কোন সাহসে? আই হেইট ইউ রুবি, আই হেইট ইউ। এত জঘন্য একটা কাজ করতে তোর বিবেকে বাঁধল না? তুই জানতিস না সামনের মাসে আমার আর ইয়াসিনের বিয়ে? বল জানতিস না? তোরা দুজন আমাকে ঠকিয়েছিস। বারবার আমাকে মিথ্যে বলে ডেট করেছিস। ছিঃ! থু দিলাম তোর মুখে”।
কলটা কেটে দেয় মৃত্তিকা। রুবির নম্বরটা ব্লকড করে দেয় সে। ফোনটা ব্যাগে পুরে ভিজে একাকার হওয়া কপোল দ্বয় মুছে নেয় ওড়না দিয়ে। হাঁসফাঁস করে মেয়েটা। তিক্ততায় বুক ভার হয়ে আসে। সম্মুখে তাকাতেই গাড়ির মালিকের দিকে চোখ পরে মৃত্তিকার। লোকটা গাড়ির আয়নায় চোখ রেখে তাকে দেখছে। অস্বস্তিতে পরে যায় মৃত্তিকা, আঁটসাঁট হয়ে বসে সে। খেয়াল করে গাড়ির মালিক ভিষণ লম্বা, চওড়া-প্রশস্ত বুক, পিঠ তার। ফর্সা নজরকাড়া গায়ের গড়ন, প্রাপ্তবয়স্ক সুদর্শন যুবক। মুখ দেখার অবকাশ নেই। লোকটা মাস্ক পরে আছে। পোশাক-আশাক দেখে উচ্চবিত্ত পরিবারের সন্তান মনে হয়। লোকটার চোখের মণির রঙ কালো নয়, হালকা সবুজাভ। চোখ জোড়া অদ্ভুত রকমের সুন্দর। মৃত্তিকা জুবুথুবু হয়ে বসে। লজ্জা পায় খানিক। তার খেয়ালই ছিল না সে গাড়িতে আছে। এত উঁচু আওয়াজে রুঢ় কথা বলায় লোকটা হয়তো তাকে খারাপ ভেবে নিয়েছে।
“- কোথায় নামবে”?
মৃত্তিকা থমকে তাকায়। সাধারণত অপরিচিত কোনো ছেলে-মেয়ে একে অপরকে তুমি সম্বোধন করে না। হুঁশ ফিরে পেতেই বলে,
“- রোড নং ২ এ”।
লোকটা কাঁচের দিকে তাকিয়ে বলে ওঠে,
“- পিছনের সুজুকি আমাদের সাথে সাথে আসছে। গাড়ির মালিক হয়তো তোমায় ফলো করছে”।
মৃত্তিকার শরীর দুলে ওঠে। ক্লান্ত স্বরে সে বলে ওঠে,
“- আপনি স্পিডটা একটু বাড়াবেন? আমি ওই লোকটার থেকে দুরত্ব বজায় রাখতে চাইছি। সে আমার জন্য বিপদজনক।”
বলার সাথে সাথেই লোকটি গাড়ির গতি বাড়িয়ে দেয়, এতটাই দ্রুত গাড়িটি চলতে থাকে যে ভয় পায় মৃত্তিকা। কোনো উচ্চবাচ্য করে না যদিও। রোডে পৌঁছে গাড়িটি থামতেই মৃত্তিকা নেমে পরে। ব্যাগ হাতড়ে টাকা খুঁজতে খুঁজতেই গাড়িটি প্রস্থান করে। সবেগে চলে যায় মৃত্তিকার সামনে গিয়ে। হা হয়ে যায় মৃত্তিকা। ধন্যবাদ টুকু জানাতে না পারায় হতাশ হয়ে তাকিয়ে রয়। ইয়াসিন কি ফিরে গিয়েছে? কে জানে?
ফ্ল্যাটে ঢুকে মৃত্তিকা দ্রুত দরজা লাগিয়ে দেয়। ঘামছে সে। মাথা ভনভন করছে। বেস্টফ্রেন্ড আর বয়ফ্রেন্ডের আপত্তিকর মুহুর্ত চোখের সামনে ভাসছে। তাদের নগ্ন কামনার গোঙানি কানে বাজছে বারবার। ঘৃণায় গা গুলিয়ে আসে মৃত্তিকার। দু কান চেপে ধরে রাখে। বাবার ঘরে ঔষধের পাতাগুলো রেখে দ্রুত নিজের ঘরে গিয়ে খিল আটে দরজায়। আচমকা ঝরঝর করে কেঁদে ফেলে মৃত্তিকা। মুখে হাত চেপে ঢুকরে কাঁদে। ইয়াসিনের সাথে তার সম্পর্ক গত দু বছর ধরে। একসাথে সুন্দর সুন্দর মুহুর্ত কাটিয়েছে ওরা, একত্রে হেঁটেছে কয়েক কিলোমিটার পথ। সেই ইয়াসিন আজ অন্য কারো দেহে লেপ্টে আছে। তাও মৃত্তিকারই বেস্ট ফ্রেন্ড রুবির সাথে। এরকম একটা দৃশ্য কখনো কল্পনা করেনি মৃত্তিকা। ভাবতে ভাবতে চিৎকার করে কেঁদে ওঠে সে। শাড়ির কুঁচি এলোমেলো হয়ে যায় মেয়েটার। চট করে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ার টেবিলের সামনে ব্যগ্র হয়ে এগিয়ে যায়। ইয়াসিনের দেয়া ডায়েরিটা তুলে এক টানে ছিঁড়ে ফেলে মলাট। পরপর ছিঁড়ে ফেলে সবগুলো পৃষ্ঠা। ইয়াসিনের দেওয়া দামী ব্র্যান্ডের ঘড়িটাও ছুঁড়ে দেয় বেলকনির গ্রিলে। তছনছ হয়ে যায় ঘড়িটি, টুকরো অংশ ছড়িয়ে পরে সর্বত্র। ফের মুখ ঢেকে কেঁদে ফেলে মৃত্তিকা। একের পর এক নিজের মাথায় ক্রমাগত থাপড়াতে থাকে। যন্ত্রণায় ছটফট করে মেয়েটা। উন্মাদের ন্যায় মুখ চেপে হাত-পা ছোড়াছুঁড়ি করে। কেন এমন হলো? সবটা কেন এমন অগোছালো হয়ে গেল?
আজ মৃত্তিকার টেস্ট পরীক্ষা। পরীক্ষার মাঝে দুদিন গ্যাপ থাকায় কিছুটা পড়াশোনা করে রেখেছিল। গতকালকের ঘটনা তাকে এতটাই আহত করেছে যে চাইলেও পড়ায় মন দিতে পারেনি। পড়তে বসা তো দূর, মৃত্তিকা গতরাতে চোখের পাতা এক করেনি। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলে ঢোল হয়ে গেছে মেয়েটার। মাথা যন্ত্রণায় ফেটে যাচ্ছে। টেস্ট এক্সাম না থাকলে আজ বাড়ি থেকে কোনোমতেই বের হতো না সে।
রাস্তায় জ্যাম প্রচুর। বিশাল এই জ্যামের উৎস খুঁজে পায় না মৃত্তিকা। ওদিকে পরীক্ষা শুরু হতে চল্লিশ মিনিট বাকি। যেতে লাগবে বিশ মিনিট। খাতা তার আগেই দেবে। এর মাঝে জ্যামে আটকে থাকলে এক্সাম হলে ঢুকতে দেবে না কর্তৃপক্ষ। ওদিকে জ্যাম ছোটার নামগন্ধ নেই। অটোওয়ালা চাচা মৃত্তিকার দিকে চেয়ে বলে,
“- মা, জ্যাম আইজ আর ছাড়বো না। সামনে কয়েকটা পোলা মারামারি করতাছে। বড় ঘরের পোলাপাইন, কেউ কিছু কইতে পারতাছে না। তুমি নাইমা যাও, আমি গাড়ি ঘুরাই। কতক্ষণ আর বইসা থাকমু”?
মৃত্তিকা বিরক্ত হয় এবার। চট করে ব্যাগ কাঁধে তুলে নেমে পরে ফুটপাতে। হেঁটে গেলে সর্বনিম্ন পঁয়তাল্লিশ মিনিট লাগবে। এত সময় তার হাতে নেই। সারা রাত পড়েনি বলে সকালে বই নিয়ে বসেছিল। পড়া শেষ করতে গিয়েই লেট হয়ে গেছে। মৃত্তিকা সামনে এগিয়ে যায়, সেখান থেকে অটো পাওয়ার আশায়। তাকে নেমে হাঁটতে দেখে অনেকে অবাক হয়ে তাকায়। বিশাল মারামারি বেঁধেছে। সবাই দল হয়ে দেখছে আর মজা নিচ্ছে। কারো সামনে যাবার সাহস নেই। তবুও মৃত্তিকা এগিয়ে গিয়ে ঘটনাস্থল ঘিরে থাকা মানুষদের সরিয়ে চেঁচিয়ে বলে ওঠে,
“- আপনাদের সমস্যা কি? মারামারি, হানাহানি করতে হলে অন্য জায়গায় গিয়ে করুন। রাস্তার মাঝখানে নাটক করছেন কেন? কত মানুষের ভোগান্তি হচ্ছে দেখতে পাচ্ছেন না”?
দুটো দল মারামারি করছে। রাস্তার মাঝখান থেকে সরছেই না ওরা। ছয়টা বাইক আর একটা বিএমডব্লিউ কার রাস্তার মাঝখানে পার্ক করে রেখেছে। এদিকটায় ট্রাফিক পুলিশ নেই। কারো কোনো হেলদোলই নেই। দু দলে মোট নয় জন ছেলে। সকলেই প্রাপ্তবয়স্ক, তাদের হাতে লাঠি, লোহার রড। একেকজনের চাহনি ভয়ঙ্কর। উচ্চস্বরে কথাগুলো বলার পর মৃত্তিকা বুঝে ফেলে কথাটা বলা ঠিক হয়নি। ওরা এলাকার বখাটে ছেলেপেলে। ওদের হাত অনেক উঁচু। কারো কথার তোয়াক্কা ওরা থোরাই করবে? ভাবতেই মিইয়ে যায় মৃত্তিকা। তার কথা শুনে সবাই কয়েক সেকেন্ডের জন্য থামে। হিংস্র চোখে মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে ফের নিজেদের কাজে ব্যস্ত হয়ে পরে। কেবল আফিম নামক ছেলেটা হাত ঝেরে এগিয়ে আসে মৃত্তিকার নিকটে। জড়সড় হয়ে দাঁড়ায় মৃত্তিকা। মুখ তোলার সাহস করে না। মাথার ওড়নায় মুখ ঢেকে যায় ওর। আফিম সিগারেট ধরায়। লাইটার পকেটে গুঁজে গম্ভীর কণ্ঠে বলে,
“- রাস্তা আজ ব্লক। যেতে পারবে না। অন্য পথে যাও”।
মৃত্তিকা চট করে মাথা তুলে বলল,
“- আর আধঘন্টা বাদে আমার পরীক্ষা।”
আফিম চলে যেতে গিয়েও পিছু ফেরে। সাথে সাথে মৃত্তিকা গত কালকের দেখা সবুজাভ চোখ পুনরায় দেখে থমকায়। আঙ্গুল উঁচিয়ে প্রশ্ন করে,
“- আপনি গতকালকের ওই মানুষটা না? আমাকে লিফট দিয়েছিলেন যে”।
আফিমের চোখের মণি অন্যরকম। তাকে এই চোখে মানাচ্ছেও। এই চোখ দেখেই তাকে চিনে ফেলে মৃত্তিকা। গতকাল লোকটার মুখ দেখেনি, আজ দেখতে পেরেছে। তার সুঠাম, দানবীয় দেহে আঁটসাঁট হয়ে আটকে আছে অফ হোয়াইট শার্ট। আঙুলের ফাঁকে রেখেছে জ্বলন্ত সিগারেট। মুখ গোল করে বিষাক্ত ধোঁয়া ছাড়ছে। মৃত্তিকাকে আফিম প্রথমেই চিনে ফেলেছে। তবে গতকালকের বিষয় নিয়ে কথা বলার আগ্রহ দেখা যায় না তার অভিব্যক্তিতে। কেবল মাথা নেড়ে আলস্য ভঙিতে বলে,,
“- হু, তুমি ওই ছিচকাদুনে মেয়েটাই তো”?
এহেন সম্বোধনে বিব্রত হয় মৃত্তিকা। হানাহানি করতে থাকা একটি ছেলে ডেকে ওঠে সবুজাভ চোখের মানুষটিকে। জোরে বলে,
“- আফিম, এদিকে আয়। শান্তর গলা কাইট্টা দিছে”।
ছুটে যায় আফিম। হিংস্র গর্জন করে ঝরের গতিতে এগিয়ে গিয়ে একটা ছেলের কলার চেপে ধরে সে। আরেকটি ছেলে কাছে এলেই তাকে কনুই দিয়ে ঘুষি মারে। এলোপাথাড়ি মারতে থাকে তিনটা ছেলেকে। ওর সাথে যুক্ত হয় আরো চারটি ছেলে। এক পর্যায়ে আফিম লাথি দেয় একটি ছেলের অন্ডকোষে। ছেলেটি চিৎকার করে ওঠে। লুটিয়ে পরে পথে। ভয়ে মৃত্তিকার জান যায়। তাদের আর্তনাদে মৃত্তিকার চোখ ভরে ওঠে। আফিমের দলের শান্ত নামের ছেলেটির গলায় ছুরি বসিয়েছে অপর দল। ওকে নিয়ে আফিমের দলের তিনজন হাসপাতালে যাবে। আফিমকে একটু আগে ডেকে ওঠা ছেলেটি বলে,
“- আফিম, এনাম হাসপাতালে চল”।
আফিম এক নজর মৃত্তিকার দিকে চায়। ভীত, তটস্থ ভঙ্গিতে তার দিকে চেয়ে আছে মেয়েটা। চোখে-মুখে আতঙ্ক মেয়েটার। হয়তো ভাবছে এই গুন্ডার সাথে গতকাল এক গাড়িতে কি করে বাড়ি ফিরল সে? তা ভেবেই গুটিয়ে গিয়েছে একদম। তিরতির করে কাঁপছে মেয়েটির পাতলা অধর। আফিম মেয়েটির এই ভয়টাকে দ্বিগুন করতে বলে ওঠে,
“- তোরা শান্তকে নিয়ে যা। আমি এই সুইট সিক্সটিন কে হলে পৌঁছে দিয়ে আসছি। আমার গাড়ি নিয়ে যা, তোর বাইকের চাবিটা দে”।
ওরা একে অপরের দিকে তাকায়। শান্তর গলার ফিনকি থেকে রক্ত বের হচ্ছে। তবুও আফিমের এই কথায় গর্জে উঠে ছেলেটা বলে ওঠে,
“- শালা! বন্ধু জীবন-মরণের সংগ্রাম করতেছে,, আর তুই মাইয়া লইয়া ঘুইরা বেড়াইতে যাস। মাইয়া দেখলেই ভদ্র হইয়া যাস। বাটপার, বন্ধুর চেয়ে নারীসঙ্গ প্রিয় তাইনা”?
ফিচেল হাসে আফিম। মৃত্তিকার দিকে তাকিয়ে তার পুরো বডি স্ক্যান করে সে। থুতনিতে হাত রেখে পর্যবেক্ষণ করে মৃত্তিকাকে। মৃত্তিকা হাসফাস করে। জ্বলন হয় পুরো দেহে। তাকে পুরোপুরি দেখা হলে আফিম ঠোঁট বাকিয়ে বলে,
“- নারী যদি এত সুন্দর হয়, তাহলে তার সঙ্গী হওয়া দোষের না। চলো সুইটি, তোমাকে পরীক্ষার হলে দিয়ে আসি”।
মৃত্তিকা ভয় পেয়ে যায়। ছেলেটার মতিগতি ভালো না। একটু আগে যেভাবে মারপিট করেছে তাতে তাকে একটুও বিশ্বাস করা যাবে না। তার চোখের চাহনিও খুব বাজে, কথাবার্তা বখাটে, উচ্ছৃঙ্খল ছেলেদের মতো। এর সাথে কোনোমতেই কোথাও যাবে না মৃত্তিকা। সে দ্রুত বলে ওঠে,
“- আমি যাবো না আপনার সাথে”।
আফিম ভ্রু কুঁচকে চেয়ে বলে,
“- ডিসিশন আমার, বাইকে ওঠো”।
মৃত্তিকা মানতে চাইল না। কেউ ওর হয়ে কিছু বললও না। আফিম বাইকে বসে তাড়া দিয়ে বলল,,
“- আসবে নাকি জোরজবরদস্তি করতে হবে”?
মৃত্তিকার অন্তরাত্মা কেঁপে ওঠে। ভয়ে থিতিয়ে যায় সে। তবুও কণ্ঠে জোর এনে বলে,
“- আমি কিন্তু পুলিশ ডাকবো”।
আফিম গা দুলিয়ে হেসে বলে,
“- পুলিশ তোমাকে হলে পৌঁছে দেবে? আমি বখাটে হতে পারি, চরিত্র আমার মাশাআল্লাহ্। স্টিল ভার্জিন”।
মৃত্তিকার গা গুলিয়ে আসে আফিমের কথা শুনে। আফিম এবার রেগে বলে,
“- আর বিশ মিনিট আছে, গেলে এসো। তোমার কাছে অপশন নেই। একটা গাড়িওয়ালারও ক্ষমতা নেই আমার প্যাসেঞ্জার নিয়ে যাওয়া”।
মৃত্তিকা ছেলেটির আত্মবিশ্বাস দেখে তব্দা খেয়ে যায়। ধীরে উঠে বসে আফিমের বাইকের ব্যাকসিটে। সিট ধরে মার্জিত ভাবে বসে রয় সে। আফিম হেসে বাইক স্টার্ট করে। খুব দ্রুত বাইক চালায় সে। অস্বস্তি আর ভয়ের মিশেলে মৃত্তিকার গলা শুকিয়ে আসে। কোনোমতো চেপে ধরে আফিমের কাঁধ। বিচলিত স্বরে বলে,
“- গতিটা কমান একটু”।
পরীক্ষা শেষে কিছুটা রিল্যাক্স হয়ে হল থেকে বের হয় মৃত্তিকা। আফিম সময়মতো পৌঁছে দিয়েছে তাকে। হলে ঢোকার পর কোনো সমস্যাই হয়নি। তবে পরীক্ষা মন মতো হয়নি। টেনেটুনে পাশ আসবে।
মৃত্তিকা বের হতেই রুবি দৌড়ে আসে তার দিকে। তাকে দেখে মৃত্তিকার নরম ত্বক জ্বলে ওঠে। তেজী চোখে তাকায় সে রুবির দিকে। অন্যদিকে পা বাড়িয়ে চলে যেতে নিতেই তাকে আটকায় রুবি। চটে যায় মৃত্তিকা। রুবির বাহুতে আলতো ধাক্কা দিয়ে হিংস্র কণ্ঠে বলে,
“- তুই আমার চোখের সামনে থেকে সরে দাড়া রুবি। তোর মতো মেয়েকে আমি আমার আশেপাশে দেখতে চাই না।”
রুবি জিভ দিয়ে ঠোঁট ভিজিয়ে বলে,
“- তুই শুধু আমার দোষটাই দেখছিস, ইয়াসিন ভাইয়ার দোষ দেখছিস না? সে-ই আমাকে শপিংমলে ডেকেছিল”।
হাসি পায় মৃত্তিকার। সে খিলখিল করে হেসে বলে,
“- তুই বুঝি ছোট বাচ্চা? চকলেটের লোভ দেখিয়ে তোকে নিয়ে গিয়েছে ইয়াসিন? আরে তুই তো একটা স্বার্থপর মেয়ে। তুই তোর আব্বুর জন্মদিনে গিফট দিতে পারছিলি না বলে কত হতাশ হয়েছিলি মনে আছে? আমি আমার ব্রেসলেট বিক্রি করে তোকে টাকা ধার দিয়েছিলাম। বিনিময়ে তুই আমাকে কি দিলি বল? কি দিলি আমাকে? ইয়াসিনের নম্বর ব্যস্ত দেখানোর কারণটা তাহলে তুই ছিলি বল”?
যতটা রাগ, হিংসা নিয়ে কথা গুলো বলতে শুরু করে, শেষে এসে কণ্ঠ ততটাই নিচু হয় মেয়েটার। কান্না গিলে নেয় সে। চোখ ভরে ওঠে তপ্ত নোনাজলে। নাকের পাটা কাঁপে মেয়েটার। রুবি নত কণ্ঠে বলে,
“- ইয়াসিন ভাই তোকে ভালোবাসে না কারণ তুই তাকে সময় দিস না। তুই সবসময় ফ্যামিলি নিয়ে পরে থাকিস বলে বিরক্ত হয়ে ইয়াসিন ভাই আমাকে কল করে”।
“- তাই বলে তার সাথে নগ্ন হয়ে মলে…ছিঃ। একবারও ভাবলি না এসব জানলে আমার কেমন লাগবে? আর পরিবার? তুই জানিস না আব্বু অসুস্থ? জানিস না ভাবি সারাদিন কতটা জ্বালায় আমাকে? ইয়াসিনও তো সব জানে। এসব ফালতু বাহানা দিস না। তোরা দুজন মিলে আমাকে ঠকিয়েছিস। খুব বাজে ভাবে ঠকিয়েছিস। আমি কোনোদিন তোদের ক্ষমা করবো না”।
রুবি থামে। বুঝতে পারে মেয়েটাকে আর বুঝিয়ে লাভ হবে না। নরম স্বরে জিজ্ঞেস করে বলে,
“- তুই কি তবে ইয়াসিন ভাইকে বিয়ে করবি না”?
মৃত্তিকা থু থু ফেলে বলে,
“- ওর দিকে ঘুরেও তাকাবো না আমি৷”
“- কিন্তু তুই যে ওকে ভালোবাসিস”।
মৃত্তিকা তাচ্ছিল্য করে হাসে। চোখ বেয়ে পানি গড়ায় ওর। মেয়েটার ক্রন্দনরত চোখ গুলো কতই না মলিন দেখায়।
“- ভালোবাসা? তোরা ভালোবাসার মানে বুঝিস রুবি? তোর সাথে আমার বন্ধুত্ব তিন বছর ধরে। একসাথে ক্লাস করি আমরা, একসাথে ঘুরি-ফিরি। একে অপরকে না দেখে থাকতে পারতাম না আমরা। সেই তুই কি না আমারই হবু বরের সাথে এতটা ঘনিষ্ঠ হলি? রুহ্ কাঁপল না তোর? একবার আমার মুখটা মনে পরল না? ইয়াসিনের সাথে তুইও আমাকে ঠকালি? এই তোর বন্ধুত্ব?
চলবে?
ওরা মনের গোপন চেনে না
সূচনা_পর্ব
বৃষ্টি_শেখ
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১০
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪