ওরামনেরগোপনচেনেনা
পর্ব সংখ্যা [১০]
ক্লান্ত শরীরটা হাঁটার মতো মনোবল হারিয়েছে। সূর্যের তেজ ক্রমশ বাড়ছে। মাথার চান্দি হয়ে উঠেছে গরম। কর্ম ব্যস্ততায় গার্মেন্টসের দিকে ছুটে যাচ্ছে মানুষ। মৃত্তিকার শরীর ভার হয়ে উঠেছে। দেহ-মন তুমুল দ্বন্দ্বে জড়িয়েছে। বাড়ি ফেরা দরকার, অথচ পাশের মানুষটি কোনোভাবেই মৃত্তিকাকে ছাড়তে নারাজ।
রাস্তার এ ধারে একটা মোটর গ্যারেজ আছে। গ্যারেজটি আফিমের দলের একটি ছেলের ব্যবসায়ের স্থান। পেট্রল আর গ্রীসের গন্ধ আসছে। স্ক্রু-ড্রাইভার, বিভিন্ন যন্ত্রপাতি, টায়ার ও পার্টস ছড়িয়ে ছিটিয়ে পরে আছে। কয়েকটি চকচকে বাইক, আবার কাঁদা শুকিয়ে লেপ্টে পরে আছে কয়েকটি পুরোনো বাইক। একটি প্রাপ্তবয়স্ক ছেলে কাজ করছে বসে বসে। আফিম তাকায় সেদিকে। ফার্মেসি থেকে কিছু ক্ষণ আগে কিনে না অয়েন্টমেন্ট আর ব্যান্ডএইডের দিকে তাকায় সে। গ্যারেজের ছেলেটি আফিমকে দেখেই সম্মান দেখি হাসি মুখে সালাম জানায়। সালামের উত্তর দিয়ে আফিম বলে,
“- একটু কাজ আছে, তুই কিছুক্ষণ ঘুরে আয়”।
রোগা-সোগা ছেলেটি ভীতু, জড়সড় ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে থাকা সুন্দরী মেয়েটিকে দেখে এক পলক। বিস্ময়ে চোয়াল হা হয়ে যায় ছেলেটার। পরমুহূর্তেই কি বুঝে গাল ভরে হেসে বলে,
“- সমস্যা নাই ভাই, আপনি থাকেন। আমি যাচ্ছি”।
ছেলেটি তড়িঘড়ি করে চলে গেল। তব্দা খেয়ে দাঁড়িয়ে রইল মৃত্তিকা। কেঁপে উঠল বক্ষপিঞ্জর। গরমে ফর্সা গাল লাল রঙ ধারণ করেছে তার। কপালের ছোট চুলগুলো ঘামে লেপ্টে আছে মুখের পাশে। আফিম গ্যারেজে ঢুকে একটি টুল টেনে আনে। হাত আর মুখের ফু দিয়ে টুলের উপরের ধুলোর আবরণ দূর করে। মৃত্তিকার পানে চেয়ে বলে,
“- এখানে বসো”।
মৃত্তিকার পা নড়ছে না। ছেলেটা চাইছে কি? কেন তাকে এতটা হেনস্তা করছে? টিউশনিতে যেতে দেয়নি আফিম। বলেছে মৃত্তিকার সাথে তার কথা আছে। মৃত্তিকা ভেবেছে আজই শেষ কথা বলে নেবে। এরপর আফিমের আশেপাশেও থাকবে না সে। থুতনির জ্বলন কমেনি। রাগ চলে গিয়ে অস্বস্তি আটকে রেখেছে তাকে। বাড়ি থেকে জায়গাটা দুর আছে। এদিকে তার বাড়ির মানুষ আসবে না। কিন্তু গ্যারেজে একটা অপরিচিত, প্রাপ্তবয়স্ক ছেলের সাথে বসা কতটা মানানসই? যদি আফিমের মনে বাজে চিন্তা থাকে? তাকে যদি বাজে মতলবে নিয়ে আসে এখানে? কাকে ডাকবে, কে শুনবে চিৎকার? মেয়েলি মন ভয়ে কাবু হয়ে আসে। ঠোঁট, গলা শুকিয়ে আসে ক্রমেই। বাঁধ সেধে মৃত্তিকা বলে,
“- আমি বসবো না, আপনি যা বলার বলুন”।
আফিম সবুজাভ চোখ মৃত্তিকার দিকে ঘোরাতেই থমকায় মৃত্তিকা। রেগে ওঠে খুব। তেজ দেখিয়ে বলে,
“- আপানর মতলবটা কি? এখানে এনেছেন কেন?”
আফিম বেশ স্বাভাবিক স্বরে বলল,
“- ওয়েনমেন্ট লাগিয়ে দিতে এনেছি”।
“- আমার হাত আছে, শরীরে জোর আছে। আমি কেন আপনার সাহায্য নেবো”?
আফিমের চোখ দুটো এত সুন্দর। তাকালে তাকিয়েই থাকতে ইচ্ছে হয়। কথার মাঝে এমন ভাবে তাকায় ছেলেটা, হৃদয় ছলকে ওঠে মৃত্তিকার। কণ্ঠ রোধ হয়ে আসে। সাজানো গোছানো বাক্যগুলে উলটপালট হয়ে যায়। বিভ্রান্তিকর পরিবেশ সৃষ্টি হয়।
আফিম খুব স্বাভাবিক ভঙ্গিতে মলমের প্যাকেট খুলতে খুলতে বলে,
“- হাত আছে, জোর ও আছে। ভালোবেসে যত্ন করার মানুষটা নেই”।
মৃত্তিকা থমকাল কিয়দংশ সময়। বুকের ভিতরটা এমন মুচড়ে উঠল কেন? সত্যটা এত তিক্ত ঠেকল কেন? কান্না পেল কেন মৃত্তিকার? আজকাল সে এত আবেগী হয়ে উঠেছে কেন কে জানে? কথায় কথায় ফ্যাচ ফ্যাচ করে কেঁদে ফেলা কোন ধরণের স্বভাব? টিনেজারদের মতো অ্যাটেনশন সিকার হয়ে গেছে সে? তাছাড়া আফিমকে দেখলেই তার এই রোগ বেশি ধরা পরে।
মৃত্তিকা ঘন ঘন শ্বাস ফেলে কান্না আটকায়। মুখ গোল করে পর পর শ্বাস ফেলে। চট করে চোখ লুকিয়ে কপালে ভাঁজ ফেলে রাগী কণ্ঠে বলে,
“- দয়া না দেখালেও চলবে ”।
“- দয়া নয়, ইটস কল্ড পিওর লাভ। আগেও বলেছি, আজ সত্য স্বীকার করছি। তোমাকে মনে ধরেছে। বিয়ে করলে তোমাকেই করবো”।
মৃত্তিকা বলার মতো কিছুই পায় না। আফিমের কথাগুলো তার ঠাট্টা,দুষ্টুমি মনে হয়। চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকে সে। গ্যারেজের ছেলেটা দু হাতে দু কাপ গরম, উষ্ণ ধোঁয়া ওড়ানো দুধ চা নিয়ে আসে। একটা কাপ আফিমের হাতে দিয়ে আরেকটা কাপ মৃত্তিকার হাতে দেয়। মৃত্তিকার তেষ্টা পেয়েছে। চা টা দেখেই বোঝা যাচ্ছে খেতে বেশ ভালো হবে। দুধের সর পরে আছে চায়ের উপরিভাগে। ঘ্রাণ ও ছড়িয়েছে ভালো। মৃত্তিকা না করল না। প্রথম বারেই তুলে নিল কাপটি। নাকোচ না করে চা হাতে নেয়ায় আফিম অবাক চোখে মৃত্তিকার পানে চেয়ে মুচকি হাসে মেয়েটার অগোচরে। গলা উচিয়ে টিনের ছাউনির নিচে দাঁড়ানো দুর্বল হৃদয়ের নারীটিকে ডেকে ওঠে,
“- ম্যাডাম, এদিকে আসুন। দয়া করে হলেও ভালোবাসুন”।
থ বনে গেল মৃত্তিকা। আফিমের বলার ভঙ্গি চমৎকার। নাটকীয় ভাবে চোখে চোখ রেখে অবিলম্বে আহ্বান জানায় মৃত্তিকাকে। তার পেশিবহুল বাহু শার্টের ভিতর থেকেও বোঝা যাচ্ছে। প্রসারিত বুক খানায় ডেনিমের শার্টটা দারুণ লাগছে। ছেলেটা সুন্দর এ নিয়ে সন্দেহ নেই, তবে মারাত্মক বখাটে, মাস্তান। একটু আগেই কারণ ছাড়াই একটি ডাক্তারের গায়ে হাত তুলে বসল। ভালো ছেলে হলে অমনটা করতো? মোটেই না।
রাস্তায় পথচারীরা আছে। দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হচ্ছে মৃত্তিকার। এমির অপর একটি টুলে বসেছে। গ্যারেজটা টিনের। তবে নতুনের মতো চকচকে টিন গুলো। তেমন একটা নোংরাও নয়। ফুরফুরে বাতাস বয়ে আসছে এদিকে। একটি রাউন্ড ফ্যান ছেড়ে দিয়েছে ছেলেটা। ক্লান্ত শরীরটা এবার একটু সতেজ মনে হচ্ছে। মৃত্তিকা গ্যারেজের ভিতরে ঢোকে। টুল টেনে আফিমের থেকে দুরত্ব বাড়িয়ে বসে সে। ব্যাগটা রাখে কোলের উপর। চায়ের কাপে চুমুক দেয় সে। আফিম তাকিয়ে থাকে এক ধ্যানে। তার চোখে মুগ্ধতার রেশ দেখতে পায় মৃত্তিকা। মোহ, বাসনা দেখতে পায় চোখের দৃষ্টিতে। মৃত্তিকা দুর্বল চোখে দেখে আফিমকে। ঠোঁটের কোণে তাচ্ছিল্যের হাসি ফুটে ওঠে। বিড়বিড় করে গান তুলে বলে,
“- বুকের পাজর ভাঙে বিধি, নয়ন বলে শুধুই কাঁদি,
হারাই যখন আপন জনারেএএএ।
অসময়ের ঝড় তুফানে, স্বপ্ন-আশা হারায় মানে,
ভাঙেরে কূল নদীর কিনারেএএএ ওও”।
রাতের খাওয়া দাওয়া শেষ করে বাড়ির সকলে ঘরে ঢুকেছে। মৃত্তিকা পড়ার টেবিলে বসে আছে। পড়ায় যদিও মন নেই। চিন্তা হচ্ছে বড্ড। আফিম কোনো মতেই পিছু ছাড়ছে না। মৃত্তিকা বোকা নয়, সে আজ বুঝতে পেরেছে আফিমের একতরফা অনুভূতির পরিধি। যা সম্ভব না, যাতে আগ্রহ নেই, তা নিয়ে ভাবে না মৃত্তিকা। ভয় তার আফিমকে নিয়ে। ছেলেটা বখাটে, গুণ্ডা। কখন কি করে বসে বোঝা যায় না। কোনদিন না যেন দেখে আফিম বাড়িতে চলে এসেছে। উল্টাপাল্টা কথা বলছে তার বাবাকে। তখন কি হবে?, সবাই ভুল বুঝবে না তাকে?
টেবিলের উপরে রাখা গ্লাসটায় পানি নেই। আলস্য ভঙিতে মৃত্তিকা উঠে টেবিল ছেড়ে। গায়ে তার ঢিলেঢালা ছোট গেঞ্জি। গরমের সময় এ ধরণের পোশাক আরাম দেয়। ওড়না গলায় পেঁচিয়ে ভোঁতা মুখ করে পানি আনতে হেঁটে যায় সে। পথে বাবার রুমে চোখ পরতেই দরজার ফাঁক গলিয়ে দেখে মেহমেত পা ভাঁজ করে বসে আছে আতিকুর রহমানের সামনে। কোনো একটি বিষয় নিয়ে আলোচনা করছে তারা, গম্ভীর দেখাচ্ছে দুজনকে।
মৃত্তিকার পা থেমে গেল। একটু দাঁড়াল সে। ঘরের ভেতর থেকে মেহমেত ভাইয়ের ধীমি স্বর শোনা গেল,
“- কতদিন এভাবে বিয়ে না করে থাকবে? পরে ভালো ছেলে পাওয়া না।”
মৃত্তিকার বাবা শুনলেন না ছেলের কথা। বললেন,
“- মাত্রই মেয়েটা শোক থেকে উঠেছে। এখনই নতুন করে শুরু করবে কি করে”?
“- আব্বু, ছেলেটা ভালো। বয়সে আমার জুনিয়র হলেও পদে আমার চেয়ে উঁচুতে আছে। মৃত্তিকা কতদিন ইয়াসিনের জন্য বসে থাকবে? ওই ছেলে বিয়ে করে ফেলেছে কবেই। এত ভালো প্রস্তাব সবসময় আসবে বলো? ওর ভালো কি ও বোঝে”?
“- তুমি যত যাই বলো, মৃত্তি মন থেকে না চাইলে আমি ওর বিয়ে দেবো না। থাকুক না মেয়েটা আমার ঘরে, সমস্যা কি? তিন বেলা ভাত ছাড়া আর কিছু তো দিতে পারি না মেয়েটাকে। পড়াশোনার খরচ নিজেই চালায়, হাত পেতে দুটো টাকা চায় না কখনো। এমন মেয়েকে আজীবন ঘরে রেখে দেয়া যায়।”
বিরক্ত হয় মেহমেত। বলে,
“-, বিয়ে তো একদিন দিতেই হবে।”
মৃত্তিকা দরজা খুলে দেয় আচমকা। গ্লাসটা নিয়ে ঘরের ভেতরে ঢুকে হাসি মুখে বলে,
“- আমার বিয়ে করতে কোনো সমস্যা নেই আব্বু।”
মেহমেত গর্জে ওঠে,
“- বড়দের মাঝখানে কথা বলতে আসলি কেন? আব্বু আর আমি কথা বলছি, তুই কি করিস”?
মৃত্তিকা হেসে এগিয়ে আসে আরো। বলে,
“- ভাইয়া, ভুলে যাচ্ছো আমি আর ছোট নই। বিশের কোটা পেরিয়েছি। প্রাপ্তবয়স্ক মেয়েকে ছোট বলে ছোট করো না। “
আতিকুর রহমান বললেন,
“- তুমি এসব নিয়ে ভেবো না। এত তাড়াহুড়োর দরকার নেই”।
মৃত্তিকা তার বাবার পাশে গিয়ে বসে। বলে,
“- আব্বু, আমার কোনো সমস্যা নেই। মন থেকে বলছি, তোমরা যাকে আমার জন্য নির্বাচন করবে, আমি তাকেই মন থেকে মেনে নেবো। তোমার মেয়ে বোকা নয়, এক নোংরা লোকের জন্য সে নিজের জীবনটাকে নষ্ট করবে না।”
মেহমেত সন্দেহী হয়ে জিজ্ঞেস করে,
“- সত্যি বলছিস? বিয়েতে তোর মত আছে মৃত্তি”?
মৃত্তি গভীর নয়নে দেখে ভাইকে। মিছে হাসি ফুটিয়ে বলে,
“- একদম, মুভ অন করতে পারবো আমি”।
মেহমেত ব্যতিব্যস্ত হয়ে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বলল,
“- ছেলেটা ভালো….
মৃত্তিকা বাধ-বাকি কথা শুনতে চাইল না। শুনতে মন চাইল না। ছেলের ব্যাপারে জানতে আগ্রহ হলো না ওর। বিছানা থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল,
“- পড়তে বসবো, তোমাদের যা ভালো মনে হয় করো। আমি রাজি”।
ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে আছে রুবি। তার গালে দুটো ব্রন উঠেছে, বিশ্রী দেখাচ্ছে খুব। চেহারার এই পরিবর্তনে নিজের উপরই রাগ হচ্ছে রুবির। তার পরনে নাইট ড্রেস। পাতলা ফিনফিনে ছোট্ট পোশাক। ইয়াসিন ফোন টিপছে শুয়ে শুয়ে। কিছুক্ষণ আগেই অফিস থেকে ফিরেছে, এখন ফোন নিয়ে বসে আছে। এতে আরো কিছুটা চটে যায় রুবি। তবে অভিব্যক্তি দেখায় না। চুলগুলোকে ছেড়ে দেয় সে। পোশাকের চওড়া গলা নামিয়ে আনে বুকে। মিটি মিটি হেসে অত্যন্ত আবেদনময়ী ভঙ্গিতে এগিয়ে যায় ইয়াসিনের দিকে। ইয়াসিনের হাত থেকে খপ করে কেড়ে নেয় দামী মুঠোফোন। চমকে যায় ইয়াসিন। তাকে চমকাতে দেখে গা দুলিয়ে শব্দ করে হেসে ফেলে রুবি। মুঠোফোন ছুঁড়ে দেয় নরম গদিতে। ইয়াসিনের উরুর উপর উঠে দু পা ইয়াসিনকী কোমরের পাশ দিয়ে গলিয়ে দেয়। নাটকীয় স্বরে বলে,
“- অফিস থেকে এসে ফোন নয়, বউকে সময় দিতে হয়”।
বলার পর পরই রুবির হাত বিচরণ করে ইয়াসিনের বুকে। নগ্ন করে ফেলে সে নিজেকে। পুরুষত্ব জেগে ওঠে ইয়াসিনের। খাবলে ধরে রুবির ঠোঁট জোড়া। হিংস্র ভঙিতে দেহে পরশ আঁকে। দুজনই মত্ত হয়ে পরে গভীর আবেশে। দীর্ঘসময় অন্তরঙ্গতার পর রুবি আর ইয়াসিন একে অপরকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে থাকে। ইয়াসিনকে মন মরা লাগছে। তেমন একটা সুখকর অনুভূতি তার অভিব্যক্তিতে প্রকাশ পাচ্ছে না। বিষয়টায় ভারি বিরক্ত হয় রুবি। অভিমান করে বলে ওঠে,
“- তুমি আমাকে আগের মতো ভালোবাসো না”।
ধ্যানচ্যুত হয় ইয়াসিন। একটু হেসে বলে,
“- এইযে ভালোবাসলাম”।
রুবি মুখ উঁচিয়ে সুদর্শন ছেলেটির দিকে তাকায়। নারীর ইন্দ্রিয় স্পষ্ট টের পায় ইয়াসিনের চোখে প্রেম নেই, ভালোবাসা নেই। নগ্ন দেহ দেখলে সব পুরুষই লোলুপ দৃষ্টিতে তাকাবে। ইয়াসিনও ঠিক তেমনই। পৌরষবোধ জাগলেই কাছে টানে রুবিকে। ভালোবেসে নয়, মায়া করে নয়। যেন নিজ চাহিদা মেটাতেই এগিয়ে আসতে বাধ্য হয় সে। রুবি দুর্বল চোখে চেয়ে বলে,
“- তুমি এখনও মৃত্তিকাকে ভালোবাসো তাই না”?
রাখঢাক করে না ইয়াসিন। সত্যটা স্বীকার করে বলে,
“- মৃত্তিকাকে ভালোবাসি না, ভালোবাসলে এভাবে ওকে ঠকাতে পারতাম না”।
“- তার মানে তুমি মানছো আমরা ওকে ঠকিয়েছি”?
“- হু”।
“- আমার প্রতি তুমি খুব উদাসীন ইয়াসিন। মৃত্তিকার সাথে সম্পর্ক থাকাকালীন তো তুমি এমন ছিলে না। কত রসিক ছিলে, কত যত্নশীল ছিলে। তোমার চোখে ওর জন্য মুগ্ধতা থাকতো, মায়া থাকতো, আবেগ থাকতো। কই আমার বেলায় তো সেসব নেই”।
“- কারণ তোমাকে না চাইতেই পেয়ে গেছি। আর চাওয়ার আগেই যে জিনিস পাওয়া যায়, তাতে আকর্ষণ কাজ করে না। মৃত্তিকাকে আমি দু বছর ধরে চেয়ে গেছি। ও তোমার মতো নয়। মৃত্তিকা সহজ, কিন্ত সহজলভ্য নয়। তোমাকে যেভাবে পেয়েছি, আমি হলফ করে বলতে পারি মৃত্তিকাকে সেভাবে পেতাম না। দু বছরের চাওয়া, ছোঁয়ার চেষ্টার তীব্রতা এতই বেশি ছিল যে ওর প্রতি আকর্ষণ অনেক বেশি কাজ করেছে। বিয়ের আগেই তোমার শরীর বহুবার ছুঁয়েছি আমি, অথচ মৃত্তিকার নাগালই পাইনি দু বছরে। ওরকম পবিত্র মেয়েকে ছোঁয়ার জন্য বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হতে হয়। সহজে তাকে পাওয়া যায় না। কিন্তু দেখো, তুমি নিজে এসে ধরা দিয়েছো। কষ্ট না করেই যা পেলাম, তার প্রতি মায়া কাজ করবে কিভাবে?”
ফ্যাল ফ্যাল করে ইয়াসিনের দিকে তাকিয়ে থাকে রুবি। তার সহজ স্বীকারোক্তি শুনে থমকে যায় মেয়েটা। কম্পিত কণ্ঠে বলে ওঠে,
“- তোমার আফসোস হয় মৃত্তিকাকে পাওনি বলে”?
“- মাঝে মাঝে হয়। আবার মাঝে মাঝে মনে হয়, মৃত্তিকার মতো মেয়ের যোগ্য আমি না।”
রুবির চোখ ছলছল করে ওঠে। চেঁচিয়ে বলে,
“- আমাকে বিয়ে করেছো কেন”?
ইয়াসিন অত্যন্ত মার্জিত, স্বাভাবিক কণ্ঠে বলে,
“- জেদের বশে। মৃত্তিকা আমাকে রিজেক্ট করেছিল। তাই ওকে কাঁদাতে, ওকে দেখিয়ে দিতে আমি তোমাকে বিয়ে করেছিলাম জেদ দেখিয়ে”।
“- তাই বলে তুমি আমাকে ভালোবাসবে না? তুমি তো আমাকে ভালোবাসতে। মৃত্তিকার থেকে সময় না পেয়েই তো তুমি আমার কাছে এসেছিলে”।
ইয়াসিন হাসে। এগিয়ে রুবির ঠোঁটে চুমু খায় বেশ কয়েকবার। বলে,
“- ঘুমাও রুবি, এ নিয়ে আর কথা না হোক”।
“- তুমি বলো, মৃত্তিকাকে যেভাবে ভালোবাসতে, আমাকেও সেভাবে ভালোবাসবে”?
“ হু, সেভাবেই বাসবো। ঘুমাও”।
বলেই চাদর দিয়ে মুড়িয়ে নিল রুবির দেহ। দীর্ঘশ্বাস ফেলল ইয়াসিন। রুবিকে কথা দিল ঠিকই, তবে রাখতে পারবে কি? সংসার জীবনে এমন অহরহ মিথ্যা বলতে হয়। নইলে সম্পর্ক টেকে না। ছল, চতুরতা করে হলেও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে হয়। মৃত্তিকাকে পায়নি বলে বড্ড আফসোস হয় ইয়াসিনের। মেয়েটা যদি থাকতো পাশে? লাজে মুখ খানা এইটুকুনি হয়ে যেত। বাহুডোরে মিশে যেত মেয়েটার নরম কায়া। কি আদুরে! মৃত্তিকাকে পেয়ে গেলে আর কিছু চাওয়ার থাকতো না। মেয়েটা ভালোবাসার দিক থেকে একদম লয়্যাল ছিল। কোনো দিন একটুও কার্পন্য করেনি ভালোবাসতে। কেবল ছুঁলেই যে ভালোবাসা বাড়ে এ কথাটা মিথ্যে প্রমাণিত করেছে স্বয়ং মৃত্তিকা। না ছুৃঁতে দিয়েও সম্পর্ককে গভীর করেছে সে। ইয়াসিনকে ধৈর্য ধরতে শিখিয়েছে সে, সবুর করতে বলেছে। খুব দামী কিছু পেতে হলে যে অপেক্ষা করতে হয় তা মৃত্তিকা প্রতিনিয়ত বুঝিয়ে দিয়েছে ইয়াসিনকে। তাই তো তাকে পাওয়ার প্রবল ইচ্ছে আরো তীব্র হয়েছে। নিষিদ্ধ মানুষগুলোর প্রতিই ঝোঁক বেশি থাকে। মৃত্তিকা যদি নিজেকে সপে দিতো ইয়াসিনের নিকট, এতটা আগ্রহ কাজ করতো না।
স্ত্রীকে বাহুডোরে পেঁচিয়ে অন্য নারীর কথা ভাবতে ইচ্ছে হয় না মোটেও। তবুও সেই কোমল নারীর শান্ত মুখের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। চোখ বুজে নেয় ইয়াসিন। রুবির দিকে তাকায় ভালো করে। তাচ্ছিল্য করে হাসে একটু। সে না হয় শরীর পেতে মৃত্তিকাকে ঠকিয়েছে, রুবি কেন ঠকিয়েছে মৃত্তিকাকে? বন্ধুত্বকে কলুষিত করেছে কেন? এরপর আর কেউ কোনোদিন নিজের প্রিয় বন্ধুকে অন্ধ বিশ্বাস করতে পারবে?
বাইকে তেল নেই। তেল কেনার টাকা আপাতত শান্তর কাছে নেই। চাকরির ইন্টারভিউ দিতে দিতে ক্লান্ত ছেলেটা। হতাশ হয়ে এখন আর চাকরি করতে ইচ্ছে হয় না। আফিম সবসময় বলে ব্যবসা করতে, টাকা সে দেবে। কিন্তু শান্ত আফিমের থেকে টাকা নিতে চায় না। সে নিজ যোগ্যতায় চাকরি পেতে চায়। এজন্য নিয়মিত একগাদা বই পড়ে যাচ্ছে। ফলাফল শূণ্য।
সে এখন বসে আছে বাসে। মামা হুট করে ডেকেছন। সম্পত্তির ভাগবাটোয়ারা করবে বলে। শান্তর মা এসব বোঝে না। তাই ছেলেকে পাঠিয়েছে সব দেখেশুনে নেয়ার জন্য। বাসে প্রচণ্ড ভিড়। যাত্রীদের ঠেলাঠেলিতে গরম আরো বেড়েছে মনে হচ্ছে। অবশ্য শান্ত একটা সিট পেয়েছে, আরাম করে বসেছে সেথায়। একটু বাদেই একটি মেয়ে উঠে বাসে। পরনে হলদে রঙের লং টপস, আর জিন্সের প্যান্ট। গলার দু পাশে স্কার্ফ পেঁচিয়ে রাখা। চুলগুলো আঁকাবাকা কিছুটা। তাড়াহুড়ো করে বাসে উঠেই সে সিট খুঁজতে ব্যস্ত হয়ে পরে। একগাদা লোককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে তেতে ওঠে মেয়েটা। চেঁচিয়ে ডাকে বাসের হেলপারকে। উচ্চস্বরে বলে,
“- এই মামা, আপনি বললেন সিট আছে। কই সিট? ফালতু ব্যাডা, মিথ্যা বলে গাড়িতে উঠালেন কেন? ভাড়া নিতে আসেন শুধু। কেলিয়ে দাঁত কপাটি ভেঙে দেবো একদম”।
দাঁত কিড়মিড় করে কথাটা বলে ওঠে মেয়েটা। তার উচ্চস্বর ও দাম্ভিকতায় হেলপার চুপসে যায়। মেয়েটিকে বসানোর জন্য এপাশ-ওপাশে চোখ বুলায়। জোয়ান, তাগড়া একটি ছেলেকে বসে থাকতে দেখে হেলপার এগিয়ে আসে শান্তর দিকে। নিচু স্বরে বলে,
“- ভাই, একটু উঠেন, মহিলাদের বসতে দেন”।
শান্তর বলতে ইচ্ছে হলো সিট ভরা থাকা সত্বেও আপনারা মিথ্যা বলে যাত্রী তোলেন কেন? কিন্তু অন্তর্মুখী স্বভাবের হওয়ায় প্রতিবাদ করার সাহস পেল না ছেলেটা। মলিন হেসে উঠে দাঁড়াল সে। তাকে উঠতে দেখেই মেয়েটি ধপ করে বসে পরল সিটে। ব্যাগ থেকে টিস্যু পেপার বের করে মুখটা মুছে নিল। শান্ত উপরের লম্বাটে লোহার অংশ ধরে দাঁড়িয়ে রইল। বাসে তেমন একটা ওঠা হয় না ওর। তাই স্বাভাবিক ভাবেই দাঁড়িয়ে থাকতে কষ্ট হলো শান্তর। এতটা পথ এভাবে যেতে হবে ভাবতেই দীর্ঘশ্বাস ফেলে শান্ত। মেয়েটি আড়চোখে দেখে একবার শান্তকে। তার অপ্রস্তুত ভঙ্গি, আর নড়চড় দেখে মেয়েটা বুঝতে পারে সম্মুখের ছেলেটি বাসে যাতায়াত করতে অভ্যস্ত নয়। চুলগুলো কানের পিছে গুঁজে মেয়েটা বলে ওঠে,
“- পড়ে যাবেন? উঠবো আমি, বসবেন”?
শান্ত লজ্জা পেল ভীষণ। মেয়েটা বেশ চালাকচতুর। সামান্য ভাবভঙ্গি দেখেই শান্তর অস্বস্তি বোধ ধরে ফেলেছে। বোকা হেসে ছেলেটা বলে ওঠে,
“- না আপু, সমস্যা নেই। আপনি বসুন”।
আপু ডাক শুনে সাথে সাথে তেতে ওঠে মেয়েটা। বলে,
“- অ্যাই, আপনার বয়স কত”?
ভ্যাবাচ্যাকা খায় শান্ত। বোকা হয়ে তাকিয়ে থাকে। ভাবে মেয়েটা রেগে গেল কেন? প্রথম কথোপকথনে বয়সই বা জিজ্ঞেস করছে কেন? তব্দা খেয়ে দ্রুত উত্তর দেয় সে,
“- এইতো, ছাব্বিশ বছর, ছয় মাস, সতেরো দিন”।
মেয়েটি ফের প্রশ্ন করে,
“- আমার বয়স জানেন”?
দু পাশে বাচ্চাদের ন্যায় মাথা দুলিয়ে না বোঝায় শান্ত। অর্থাৎ সে জানে না। মেয়েটি বলে,
“- আমার বয়স উনিশ। আপনার চেয়ে অনেক ছোট। চোখ কি কপালে তুলে হাঁটেন? বউয়ের বয়সী মেয়েকে কেউ আপু বলে? আপনি জানেন আমি আপনার নামে মানহানির মামলা করতে পারি”?
হা হয়ে যায় শান্ত। মেয়েটি ভীষণ চটপটে, কথা বলার ভঙ্গিও চমৎকার। রেগেমেগে মেয়েটি উঠে দাঁড়ায়। বলে,
“- বসুন আপনি, আমি দাঁড়িয়ে যাচ্ছি”।
শান্ত বিনয়ী ভঙ্গিতে ফের বলে উঠল,
“- না না আপু। আমার সমস্যা হচ্ছে না”।
মেয়েটি চোখ পাকিয়ে তাকায় শান্তর দিকে। বলে,
“- ঠিক আছে, পালাপালি করে বসি। আধঘন্টা আমি বসবো, আধঘন্টা আপনি বসবেন।”
শান্ত রাজি হয়। মেয়েটি এবার কিছুটা নরম সুরে বলে,
“- সিট ধরে দাঁড়ান, নইলে পড়ে যাবেন।”
মেয়েটির সিট ধরে দু পা ফাঁক করে দাঁড়াল শান্ত। খুঁটিয়ে দুয়েকবার দেখল মেয়েটিকে। মেয়ে মানুষ এত রাগী হয় কি করে? তার মতো শান্ত, নম্র হতে পারে না? একটু বাদেই মেয়েটির পাশের সিটের অপরিচিত ব্যক্তি নেমে যায় স্ট্যান্ডে। কেউ সিটে বসে পরার আগেই মেয়েটি টেনে ধরে শান্তর হাত। ব্যতিব্যস্ত কণ্ঠে বলে,
“- বসুন তাড়াতাড়ি, কেউ সিট ধরে ফেলবে”।
শান্তর মন সায় দেয় না। মেয়েদের সাথে সে দুরত্ব মেনে চলে। মেয়েটার পাশে বসে যাবে, ভাবতেও শরীর কেমন যেন করছে। সে অপ্রস্তুত কণ্ঠে বলে,
“- আমি বসবো না”।
শুনল না মেয়েটি। উঠে এসে এক প্রকার ধাক্কা দিয়ে শান্তকে ফেলে দিল জানালার পাশের সিটে। পরের সিটে বসে পরল নিজেও। গা দুলিয়ে শব্দ করে হেসে বলল,
“- এত লজ্জা পেলে হবে? আমি মেয়ে মানুষ হয়ে লজ্জা পাচ্ছি না। আপনি পুরুষ হয়ে লজ্জা পাচ্ছেন?”
শান্ত লজ্জা পেল ভীষণ। এভাবে কেউ তাকে কখনো বলেনি। বরং বন্ধুমহলের সবাই তার খুব প্রশংসা করে এ কারণে। মজা করে টিটকারিও করে মাঝেসাঝে। তবে একটা মেয়ের মুখে কথাটা শুনে শান্তর মরে যেতে ইচ্ছে করল। মেয়েটি একটু ভেবে হাসি থামিয়ে বলল,
“- তবে আপনার মতো আলা ভোলা ছেলে পাওয়া দুষ্কর। এমনই ইউনিক থাকবেন”।
চমকে উঠল শান্ত লাজুক ভঙ্গিতে হাসল। মেয়েটি নিজেও হেসে বলে উঠল,
“- আপনার হাসিটা সুন্দর, আই লাইক ইট”।
শান্ত খানিক দ্বিধাদ্বন্দে ভুগে বলল,
“- আপনার নাম”?
“- রাইমা”।
কয়েকবার নামটা উচ্চারণ করল শান্ত। আর কোনো কথা হলো না রাইমাড সাথে। কিছুক্ষণ পরই মেয়েটা নিদ্রায় তলিয়ে গেল। স্বচ্ছ চোখে রাইমাকে দেখল শান্ত। মেয়েটির গায়ের রং শ্যামলাটে। কিন্তু নজরকাড়া। গন্তব্যে পৌঁছাতেই নেমে গেল শান্ত মেয়েটি অবলীলায় ঘুমিয়ে রইল সিটে।
বাড়ি থেকে বের হয় না মৃত্তিকা। ইচ্ছে করে না বাইরের আলো দেখতে। আজ তাকে দেখতে আসবে পাত্রপক্ষের লোক। মেহমেত ভাই অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। বাড়িতে আজ খাওয়াদাওয়ার বিশেষ ব্যবস্থা করা হয়েছে। গরুর মাংস, পোলাও, রোস্ট, মুরগির মাংস, সাদা ভাত, বেগুন ভাজা, ডিম ভুনা, মিষ্টি, দই সবকিছুই তৈরি করা হয়েছে বাড়িতে।
মৃত্তিকাকে একটা শাড়ি পরতে দেয়া হয়েছে। আলতা রঙের শাড়ি। পাড়ের কাছটা হালকা সোনালী রঙের। জাহানারা মৃত্তিকার ঘরে আসে একটি সোনার গহনা নিয়ে। মৃত্তিকার গলায় তার নেকলেসটা পড়িয়ে দিয়ে জাহানারা বলে ওঠে,
“- এই হারটা পড়, এত সাদামাটা থাকলে হবে? ছেলে পক্ষ এসে দেখবে মেয়ের গায়ে সোনার গহনা নেই। দেখেই বুঝে যাবে আমাদের আর্থিক অবস্থা ভালো না”।
মৃত্তিকা কড়া চোখে তাকায়। বলে,
“- তোমার হার আমি পড়বো না ভাবি। আমার নেই, কেন অন্যেরটা পড়বো”।
মুখ বাঁকায় জাহানারা। বলে,
“- মুখে মুখে তর্ক করো কেন? ভালো কথা বললে গায়ে লাগে না। ভালো ভেবে নিজের গয়না দিচ্ছি, তবুও একটু ভালো করে কথা বলতে পারো না”।
“- তোমার ভালো কথার মাঝে খোঁচা থাকে, তাই তো ভালো করে উত্তর দিতে পারি না।”
মৃত্তিকার মা তর্ক শুনে এগিয়ে আসে। মৃত্তিকাকে থামিয়ে বলে,
“- গয়নাটা পড়ে নে। একেবারে খালি হাত-পায়ে যেতে হয় না”।
মায়ের কথার উপর কথা বলতে পারে না মৃত্তিকা। সিঁথি কাটে মাঝ বরাবর। ভাবির হাতের চিকন সোনার চুড়ি পরে নেয় সে, গলায় নেকলেস পরে। ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক আর মুখে পাউডার মাখে, চোখে হালকা করে কাজল নেয়। নিজেকে আয়নায় দেখে বেশ কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকে মৃত্তিকা। এত সাজেও মুখটা শুকনো লাগছে না? মেয়েকে দেখে মৃত্তিকার মা আবেগাপ্লুত হয়ে পরে। মেয়ের গালে কয়েকটা চুমু বসিয়ে বলে,
“- তোকে অনেক সুন্দর লাগছে রে মৃত্তি। এক্কেবারে পরীর মতো, দেখবি আজ বিয়ের দিনক্ষণ ঠিক হয়ে যাবে”।
মৃত্তিকা লাজে নুইয়ে পরে। মৃত্তিকার বাবাও মেয়েকে এ সাজে দেখে তাকিয়ে থাকে। ছেলের বাড়ির লোক আসে দুপুরের পর। আসার সাথে সাথে তাদের খেতে দেয় মৃত্তিকার ভাবি। ইরহামকে কোলে তুলে দাড়িয়ে তাদের সাথে কথা বলে মেহমেত। ছেলের মা আর বাবা এসেছে ছেলের সাথে। খাওয়াদাওয়া শেষে মৃত্তিকাকে যখন নিয়ে আসা হয় সবার সামনে, মৃত্তিকার বুক কাঁপে। অন্য কারো সামনে এভাবে সেজেগুজে বসে থাকতে খুব হীনমন্যতায় ভোগে সে। কষ্ট হয় খুব। বুক ভার হয়ে আসে ক্রমাগত। নুইয়ে রাখে মাথা। চোখ তুলে চায় ও না ছেলেটির দিকে। টুকটাক প্রশ্ন করে ওরা। রান্নাবান্না জানে কিনা, পড়ছে কোথায়, টিউশন কোথায় করায় এসবই। মৃত্তিকা খুব নত স্বরে উত্তর দেয়। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় ঘরে। ঘরে বসেই সে জানতে পারে ছেলের তাকে খুব পছন্দ হয়েছে। মৃত্তিকার সাথে আলাদা করে কথা বলতে চায়।
রাজি না হওয়ার অপশন নেই। মৃত্তিকার ঘরে বসে ছেলেটা। নাম তার সাকিন। মৃত্তিকা দাঁড়িয়ে থাকে সম্মুখে। জড়তা ফুটে ওঠে তার আচরণে। কাচুমাচু হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। সাকিব একটু হেসে জিজ্ঞেস করে,
“- আপনার কি আগে কোথাও সম্পর্ক ছিল? বা এখন কারো সাথে আপনার সম্পর্ক আছে”?
মৃত্তিকা মিথ্যে বলতে পারে না। বলে,
“- ছিল, এখন নেই”।
“- তাকে ভালোবাসেন”?
“- ঘৃণার নিচে ভালোবাসা ধামাচাপা পরেছে। এখন কেবল ঘৃণাই কাজ করে”।
অপ্রস্তুত কণ্ঠে সাকিব ফের শুধোয়,
“- বিয়ের পর সমস্যা হবে না তো? বলবেন না তো এক্সকে ভুলতে পারছেন না, আমাকে মেনে নিতে পারছেন না”?
মৃত্তিকা খুব স্বাভাবিক ভাবেই বলল,
“- না, আমি তার কাছে আর ফিরে যেতে ইচ্ছুক নই। তার প্রতি আমার আগ্রহ নেই। এ নিয়ে কোনোদিন কোনো সমস্যা হবে না”।
সাকিব উঠে চলে গেল। একটু পরই মিষ্টির একটি বাটি নিয়ে দৌড়ে এলো ইরহাম। মৃত্তিকাকে একটি মিষ্টি খাইয়ে দিয়ে হাসি মুখে বলল,
“- মনির বিয়ে, মনির বিয়ে”।
ইরহামের পিছু ছুটে এলো জাহানারা। মৃত্তিকার পিঠে পরে থাকা শাড়ির আঁচলটা মৃত্তিকার মাথায় তুলে দিল সে। নববধূর বেশে তাকে সাজিয়ে বলল,
“- চলো, আজই ওরা আংটি পড়িয়ে যাবে। বিয়ে ফাইনাল।”
স্তব্ধ চোখে তাকায় মৃত্তিকা। অবাধ্য অশ্রু গাল বেয়ে ঝরে পরে। ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রয় ভাবির পানে। সে বিয়ে করবে বলেছিল ঠিকই, তবে বিয়ে ঠিক হওয়ায় একটুও আনন্দ হচ্ছে না তার। বরং প্রচণ্ড কান্না পাচ্ছে। দাপিয়ে কাঁদতে ইচ্ছে করছে মৃত্তিকার। সবটা এত দ্রুত না হলেও পারতো। অন্য কাউকে কেন নিজের সাথে ভাবতে পারছে না মৃত্তিকা? মন কেন সায় দিচ্ছে না? ভাবাভাবির সময় পেল না মৃত্তিকা। তাকে টেনে নিয়ে যাওয়া হলো ড্রয়িংরুমে সাকিব তার অনামিকা আঙুলে চকচকে সোনার আংটি পড়িয়ে তবেই ক্ষান্ত হলো। সমস্বরে চেঁচিয়ে সবাই আলহামদুলিল্লাহ্ পাঠ করল। মিষ্টিমুখ হলো, হই হুল্লোড় হলো। এত দ্রুত ঘটে গেল সবটা, মৃত্তিকা তার অভিব্যক্তি প্রকাশ করার সুযোগ টুকুও পেল না। কেবল কানাঘুঁষায় শুনতে পেল, দু সপ্তাহ পরই বিয়ে। কোনো লেনদেন মেই। মেয়েকে পেলেই তারা খুশি। খুশিতে এক চোট কাঁদল মৃত্তিকার মা। মৃত্তিকা তার আঙুলের আংটির দিকে চেয়ে রইল শূন্য দৃষ্টিতে। এই আংটিটা কি মনে করিয়ে দিচ্ছে? সে সাকিব নামের একটি পুরুষের হবু বউ? বাগদান হয়ে গেছে তার?
চলবে?
লেখনীতেঃ #বৃষ্টি_শেখ
[ নোটঃ অনেক কষ্টে এতটুকুই লিখলাম। কাল পরীক্ষা, দোয়ায় রাখবেন ]
Share On:
TAGS: ওরা মনের গোপন চেনে না, বৃষ্টি শেখ
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৯
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৩
-
ওরা মনের গোপন চেনেনা পর্ব ৬
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৫
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৭+৮
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ৪
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ১১
-
ওরা মনের গোপন চেনে না পর্ব ২
-
ওরা মনের গোপন চেনে না গল্পের লিংক