এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ১৫+১৬
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব_১৫
গোসল শেষে শ্রাবণ রুমের ভিতরে গিয়ে কাপড়চোপড় চেঞ্জ করে নিল ।তারপর ভেজা কাপড়চোপড় গুলি একটি বালতিতে ভিজিয়ে রাখল অন্য কেউ পড়ে ধুয়ে দিবে ঠান্ডা লাগছে শ্রাবণের।
শ্রাবণ কাপড়-চোপড় পড়ে টাওয়াল দিয়ে সুন্দর করে চুল গুলো মুছে নিচে নেমে এলো ।নিচে নেমে এসে দেখল বারান্দায় বিশাল আয়োজন ।পাটি বিছানো হয়েছে সবাই নিচে বসে আছে খাওয়ার জন্য।
অদ্ভুত হলেও সত্য ছয় বছর আগে যেগুলো ভালো লাগছিল না শ্রাবণের আজ সেই পরিবেশটাই ভালো লাগছে ।সবাই এভাবে বসে শীতের দিন বাহিরে রোদ উঠেছে নিচে বসে খাবে কেমন একটা অন্যরকম অনুভূতি হচ্ছে যা ঢাকার বাড়িতে অথবা আমেরিকায় থাকা অবস্থায় কখনো ফিল হয় নি। ৬ বছর আমেরিকা একা একা জীবন পার করার কারণেই এখন বুঝতে পারে পরিবারের ভ্যালু কি আত্মীয় স্বজনের ভ্যালু কি ।তাই হাসি মুখে নিচে নামছিলো শ্রাবণ।সিঁড়ি ভেঙ্গে নিচে নেমে আসতে আসতেই চোখ পরলো মেঘলার দিকে ।মেঘলা শ্রাবণের দিকে আড় চোখে তাকিয়ে ছিলো একবার ।এখন মাথা নিচু করে মুখ টিপে টিপে হাসছে।
শ্রাবণ নিচে নেমে এসে বসলো লামিয়ার পাশে ।লামিয়া থেকে একটু দূরে বসেছে মেঘলা ঠিক শ্রাবণের মুখোমুখি ।সামনে তাকালে মেঘলা কে দেখা যাচ্ছে । শ্রাবণের বসতে একটু আনকম্ফোর্টেবল ফিল হলেও বসতে পারল ।মেঘলা মাথা তুলে তাকাচ্ছেনা কিন্তু শ্রাবণ আড় চোখে বারবার তাকাচ্ছে মেঘলার দিকে।
বেয়াদব মেয়েটা এখনো মুখ টিপে টিপে হাসছে ভাবলো শ্রাবণ।
মেঘলার চোখের সামনে ভেসে আসলো দৃশ্যটি খালি গায়ে হাফপ্যান্ট পরা গোসল করা অবস্থায় ।কিভাবে দেখল শ্রাবণ ভাইকে যখনই মনে পড়ে তখনই মেঘলা হাসি পায় মেঘলার।
তবে পা জোড়া অসম্ভব সুন্দর শ্রাবণ ভাইয়ের ।সাদা ফর্সা পায়ের মধ্যে কালো সিল্কি লোম কি অদ্ভুতভাবে সংজ্ঞায়িত করছে মেঘলা ।বুঝাতে পারছে না তবে পা জোড়া খুব সুন্দর ছিল।
সাবিহা সুলতানা হেটে হেঁটে সবাইকে খাবার সার্ভ করছে ।আসমা বেগম আড় চোখে তাকালো তানিয়ার দিকে ।তানিয়া শ্রাবণের আরেক পাশে ঘেঁষে বসার চেষ্টা করছে কারন সবার শেষে গোসল করে এসেছে তানিয়া তাই ওর আসতে একটু দেরি হলো ।তানিয়া বসবে তার আগেই আসমা বেগম রাফিকে বললো,” রাফি শ্রাবণ ভাইয়ের পাশে বসো।”
শ্রাবণ ও একটু ইতস্তত বোধ করছিল তানিয়া এভাবে পাশে বসার চেষ্টার কারণে তবে রাফি বসলে ভালই হয় ।শ্রাবণও এত অন্তরঙ্গতা চায়না তানিয়া সাথে ।তানিয়া যেরকমটা সবার সামনে দেখাতে চেষ্টা করে।
রাফি কে জায়গা দেওয়ার জন্য শ্রাবণ আরেকটু ডান পাশে সরে এলো বাম পাশে বসলো রাফি।
শ্রাবণের সাথে বসলেও রাফির দৃষ্টি জোড়া নিবদ্ধ শুধু মেঘলার দিকে।
রাফি মেঘলার দিকে তাকিয়ে বললো,” বিকালে আমরা ঘুরতে যাব সবাই মিলে ।আমি কখনো গ্রাম দেখিনি আমাকে একটু সুন্দর করে ঘুরিয়ে দেখিও তো মেঘলা ।”
মেঘলা সাথে সাথে মাথা তুলে বললো,” আচ্ছা ঠিক আছে তাহলে ।দুপুরে খেয়ে বের হতে হবে শীতের দিন তো সাড়ে পাঁচটার মধ্যে অন্ধকার হয়ে যাবে।”
লামিয়া বললো,” তাহলে খেয়ে দেয়ে রেডি হচ্ছি ।আমরা সবাই মিলে ঘুরতে যাব ।”
শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,” ভাইয়া তুমিও কিন্তু আমাদের সাথে যাবে কেমন?”
তানিয়া রাফির পাশাপাশি বসলো ।বুঝতে পারলো আসমা বেগম তানিয়াকে ইচ্ছে করে বসতে দেয়নি ।তাই কোন কিছু বুঝতে না দিয়ে
চুপচাপ কষ্ট করে হলেও নিচে বসলো। যদিও পছন্দ হচ্ছে না তানিয়ার।
দুপুরের খাবার আয়োজনে আছে
সরষে শাক দিয়ে ছোট মাছ চচ্চড়ি আছে রুই মাছ ভাজা চিংড়ি মাছ দিয়ে মটরশুটি ভুনা আছে ডাল চচ্চড়ি গরম ভাত দেশি মুরগি কষা ।এই দিয়ে আজ দুপুরে খাবারটা পেট পুরে খেলে সবাই ।রান্না এত মজা হয়েছে কি বলবে?মাটি চুলা রান্না করেছিল ।অদ্ভুত রকমের স্বাদ লাগছে সবার কাছে বিশেষ করে শ্রাবণের ।গতবার যা খারাপ লেগেছিল তাই এখন কেন যেন বারবার ভালো লাগছে শ্রাবণের ।আড় চোখে তাকালো মেঘলার দিকে ।দেখলো মেঘলা খোলা চুলগুলো বারবার কপালে চলে আসছে খেতে সমস্যা হচ্ছে।
তাই সবার সামনেই শ্রাবণ অবচেতন মনে মুখ ফুসকে বলে ফেললো,” চুলগুলো একটু বেঁধে নে না ?এভাবে খুলে কি খাওয়া যায় নাকি?”
মেঘলা চোখ তুলে তাকালো শ্রাবণের দিকে ।তারপর বাম হাত দিয়ে কপালের চুলগুলো নিয়ে কানের পিঠে গুঁজে দিল ।কিন্তু লাভ নেই ।চুলগুলো আবার সামনে চলে আসছে।
শ্রাবণ বললো,” খাওয়ার আগে চুল বেঁধে খাবিনা ?এভাবে চুল ছেড়ে খাওয়া যায় ক্লিপ কোথায়?”
মেঘলার কোলে ছিল একটি ক্লিপ ।মেঘলা কোনরকমে এক হাত দিয়ে চুলগুলো পিছনের নিয়ে কোন মতে একটু আটকে রাখল যেন কোনমতে খাওয়াটা শেষ করে ওঠা যায় ।এদিকে আসমা বেগম খেয়াল করলেন শ্রাবণ অবচেতন মনেই আর চোখে খেয়াল করে মেঘলা কে বারবার।
খাওয়া পর্ব শেষ করে সবাই রেডি হয়ে বের হল গ্রাম ঘুরে দেখার উদ্দেশ্যে ।মেঘলা আজ পড়েছে কলাপাতা রঙের একটি থ্রি পিস।
চুলগুলো হালকা করে একটু খোলা খোলা ভাবে বেনী করে নিল ।ভেজা চুল তাই আঁটসাঁট করে বেনী করলো না ।সামিয়া বের হল সাদা কালারের একটি ড্রেস পড়ে ।সিয়াম দাঁড়িয়ে আছে বাইরে।
হঠাৎ লামিয়াকে সাদা ড্রেসে বের হতে দেখে সিয়াম একনজর তাকালো লামিয়ার দিকে ।কিন্তু মুখে কিছু বললো না ।সিয়াম এমনিতেও লামিয়ার সাথে একটু কম কথা বলে ।খুব ইন্ট্রোভারট টাইপের সিয়াম ।ভিতরে কি চলে না চলে কেউ কখনো বুঝতে পারে না ।খুব কম কথা বলে।
এদিকে তানিয়া বের হল একটি জিন্স এবং একটি টপস পড়ে।একটি স্কার্ফ জড়িয়ে নিল পাতলা গলার মধ্যে।
রাফি ও শ্রাবণ বাহিরে একসাথে দাঁড়িয়ে ছিল ।কলাপাতা রঙের ড্রেসে মেঘলা কে বের হতে দেখে রাফি বলে উঠল ,”ওয়াও দেখো ভাইয়া আমার পরী মেঘলা কে কত সুন্দর লাগছে এই রঙের ড্রেসে?”
শ্রাবণ একবার মেঘলা দিকে তাকালো ।তাকিয়ে দেখলো,” আসলেই অদ্ভুত লাগছে ! কেমন যেন লাগছে কলাপাতা রঙের ড্রেস আর গায়ের রং সবকিছু মিলেমিশে কেমন যেন অদ্ভুত এক মোহনীয় সৌন্দর্য সৃষ্টি করেছে ।
কিন্তু পরক্ষণে ঘাড় কাত করে নিচের দিকে তাকালো রাফির দিকে ।ওর পরী মেঘলা মানে কি ?এই ছেলেটা তো দিন দিন হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে।মজনু হতে দেরি নেই।কি অদ্ভুত শোনা যায় বড় ভাইয়ের বউয়ের জন্য পাগল ছোট ভাই।ভেবেই আবার ভাবলো বউ মানে? মেঘলা ওর বউ না। ছিঃ কি ভাবলো মাত্র।
রাফির দিকে তাকিয়ে ছোট্ট একটি দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে বললো,” সবাই তাড়াতাড়ি এসো ।বেলা তো পার হয়ে যাচ্ছে ।”
সবাই ধীরে ধীরে গ্রামে মেঠো পথ দিয়ে হাঁটতে শুরু করল ।দুই পাশে ছোট ছোট পুকুরের মতো কা*টা ।বড় বড় গাছ গাছের মাঝখান দিয়ে সরু চিকন কাঁচা রাস্তা ।সবাই হাটছে।কেউ মোবাইলে ছবি তুলছে কেউ দূরে দৃশ্য দেখছে।
সিয়াম এগিয়ে থেকে সবাইকে পথ দেখিয়ে দেখিয়ে নিয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ থেমে বললো,” সামনে নদীর পাড় আছে আপনারা কি যাবেন ভাইয়া ?”
“নদীর পাড়ে ?”জানতে চাইলো তানিয়া।শ্রাবণ বললো,” হ্যাঁ যাওয়া যায় ।গতবার এসে তো যায়নি এবার যাওয়া যেতেই পারে।”
বেশ কিছুক্ষণ হাঁটতে হাঁটতে ওড়া চলে এলো নদীর পাড়ে ।শান্ত স্নিগ্ধ নদীর ঢেউ সবাই মুগ্ধ নয়নে তাকিয়ে রইল নদীর দিকে ।এদিকে মেঘলা ছবি তোলার জন্য রাফির হাতে ক্যামেরা দিয়ে বিভিন্ন পোজে ছবি তুলতে লাগলো ।আর চোখে তাকালো শ্রাবণ।
চলবে_
আমি কি কারো গল্প কপি করে লিখি? কার কার সাথে মিল পেয়েছেন? কারো গল্পের সাথে ২/১ টা তথ্য মিলে গেলেই তাকে কপিবাজ লেখিকা বলা যায়? আমার 📖 আসছে শুনে এরকম তকমা?এতো অল্প সময়ে বই আসছে আমার প্রথম গল্পের খুশি ছিলাম। কিন্তু সব খুশি যেনো নিমিষেই শেষ।যদি আপনারা মিল না পান নিচে দেওয়া কমেন্ট এ লিংক এ ক্লিক করুন।তারপর মতামত জানাবেন।
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman
পর্ব ১৬
নদীর পাড়ে এসে দাঁড়াতেই সবার অশান্ত মন যেন শান্ত হয়ে গেল ।বিকেলে পদ্মা নদীর সৌন্দর্য যেন অন্যরকম ।
আকাশের লাল কমলা ও বেগুনি রংয়ের আভা নদীর পানিতে পড়তেই অন্যরকম একটি সৌন্দর্য তৈরি করল। দীর্ঘ সময় হেঁটে আসার ফলে যে ক্লান্তি ছিল বিকেলে নদীর পাড়ে দাঁড়াতেই নদীর স্নিগ্ধ বাতাস ঢেউয়ের সাথে ভেসে আসা পানির কল কল শব্দ সবকিছু মিলিয়ে পরিবেশ টাকে যেন মহাচ্ছন্ন করে রাখল ।
শ্রাবণ চোখ বন্ধ করেই দীর্ঘ একটি নিঃশ্বাস নিল।
যেন এক মুহূর্তে সবকিছু শান্ত হয়ে গেল শ্রাবণের ।সকল ক্লান্তি দূর হয়ে গেল ।চোখ মেলে তাকালো শ্রাবণ ঠিক এমন সময় ফোন এলো ফোনের স্ক্রিনে তাকিয়ে দেখলো উকিলের ফোন।
মুহূর্তেই শান্ত হৃদয় টা হঠাৎ করে অশান্ত হয়ে গেল শ্রাবণের ।ফোন রিসিভ করতেই ও পাশ থেকে বলে উঠলো ,”স্যার আজকে আপনার সব তথ্য দেওয়ার কথা ছিল তাহলে আগামীকালকের মধ্যেই কাগজটা তৈরি করে ফেলতে পারতাম।”
শ্রাবণ এক মুহূর্তের জন্য থমকে রইল ।চোখ দুটো চেয়ে আছে সামনের দিকে ।নদীর পাড়ে পানিতে একটু পরপর পা ভিজিয়ে দেখছে মেঘলা ।চোখ দুটো নিবদ্ধ মেঘলা দিকেই ।শ্রাবণ আমতা আমতা করে বললো,” গ্রামে এসেছি তিন-চার দিন লাগবে ঢাকায় ব্যাক করতে এসে কথা বলব।”
উকিল ও পাশ থেকে বললেন ,”আচ্ছা ।ঠিক আছে যেমন আপনার ইচ্ছা ।”
বলে ফোন রেখে দিল ।শ্রাবণ ফোন রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে রইল ।জুতা জোড়া হাতে নিয়ে রাফির সাথে এদিক-ওদিক দৌড়ে বেড়াচ্ছে সিয়াম একপাশে দাঁড়িয়ে আছে চুপচাপ নদীর শান্ত রুপ দেখছে।
তানিয়া শ্রাবণের পাশে দাঁড়িয়ে ছিল ।শ্রাবণ বাম দিকে তাকাতেই দেখল তানিয়া অদ্ভুত নজরে শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে আছে ।শ্রাবণ জানতে চাইলো ,”কি হয়েছে এভাবে তাকিয়ে আছো কেন ?”
তানিয়া বললো,” না কিছু না।কার ফোন এসেছিল ?”
শ্রাবণ বললো,” একটু প্রয়োজনীয় ফোন এসেছিল।”
কথাটি বলেই শ্রাবণ আবার সামনের দিকে তাকালো ।তানিয়া প্রতি কোন কিছু অনুভব করতে পারছে না শ্রাবণ। আজ বাদে কাল যাকে বিয়ে করবে অথচ এই মেয়ের প্রতি কোন ধরনের অনুভূতি সৃষ্টি হয় না শ্রাবণের ।যখন আমেরিকা ছিল বিয়ের প্রস্তাব দিয়েছিল শ্রাবণ রাজি হয়ে গিয়েছিল ভেবেছিল ধীরে ধীরে বন্ডিং বিল্ড আপ হবে কিন্তু কোন কিছুই হচ্ছে না।
এদিকে অবাধ্য চোখ জোড়া শুধু ছুটে যায় সেই ছোট্ট মেয়েটির দিকে যাকে ডিভোর্স দেওয়ার জন্য বদ্ধপরিকর শ্রাবণ। অথচ না চাইতেও মনের অজান্তেই চোখ জোড়া বারবার খুঁজে বেড়ায় শুধু ওই ছোট্ট মেয়েটিকে ।
বারবার চোখ বন্ধ করলে দেখতে পায় গালে টোল পড়া সেই ছোট্ট মেয়েটির হাসি ।চোখ বন্ধ করলেই যেন দেখতে পায় রসের গ্লাস হাতে দাঁড়িয়ে আছে ছোট্ট একটি মেয়ে ।বলছে খেয়ে নাও না হলে দাদি আমাকে বকা দিবে।
বারবার ভেসে আসে কানের কাছে সেই কথাটা ওকে বিয়ে করতে হলে লাগবে একটি শাড়ি একটি লিপস্টিক একটি কাজল ও একটি আলতা ।মুহূর্তেই ঠোঁটে কোনে হাসি খেলে গেল শ্রাবণের ।কি অদ্ভুত চাওয়া পাওয়া ছিল মেয়েটার !
অথচ এখন ওকে দেখলে দশ হাত দূরে সরে বেড়ায় ।একটি কথা মাটিতে পড়তে দেয় না ।একটি কথা বললে দশটি উত্তর শুনিয়ে দেয়।সেই মেয়ে জানে না যে বিয়ের জন্য এত কিছু করেছিল সেই বিয়ে ৬ বছর আগেই হয়ে গিয়েছে ।এখন তা ভাঙার পালা ।মুহুর্তেই শ্রাবণের হৃদয়টা আবার অশান্ত হয়ে গেল।
এসব ভাবতে ভাবতেই শ্রাবণের সামনে হেঁটে হেঁটে চলে এলো মেঘলা ।এসে বললো,” শ্রাবণ ভাইয়া আমরা সবাই নৌকায় চড়বো ।আপনি যাবেন আমাদের সাথে ?”
শ্রাবণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল মেঘলার দিকে ।হঠাৎ করে মেঘলা সামনে চলে আসায় যেন বুকের ভিতর স্পন্দন কয়েকটি বাড়িয়ে দিল শ্রাবণের।
শ্রাবণ হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়ল। বললো,” ঠিক আছে যাবো ।”
মেঘলা বললো,” আপনি সাঁতার জানেন তো?”
শ্রাবণ জিজ্ঞেস করলো,” তুই জানিস?”
মেঘলা উচ্ছ্বাসিত হয়ে হ্যাঁ সূচক মাথা নাড়লো। শ্রাবণ বললো,” ঠিক আছে তাহলে চলবে ।আমি ডুবে গেলে তুই আমাকে তীরে উঠিয়ে দিস ।”
মেঘলা বললো,” আচ্ছা ঠিক আছে । কিন্তু আপনি তো আমার থেকে অনেক বড় অনেক ভাড়ী ।আমি কি আপনাকে তুলতে পারবো।”
শ্রাবণ বললো,” পানি তে সব হালকা হয়ে যায়।”
মেঘলা বললো,”চলুন ।”
বলেই অতি উচ্ছ্বাসিত হয়ে শ্রাবণের হাত ধরে টানতে টানতে নিয়ে যেতে লাগলো ।তানিয়া ভয়ঙ্কর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল হাতের দিকে।
যে হাত কখনো ভুলেও টাচ করতে পারে না তানিয়া সেই হাত কত সহজেই ছুঁয়েছে মেঘলা।হাত ধরে নিয়ে যাচ্ছে অথচ শ্রাবণ নির্বিকার ।একটি কথাও বলছে না ।অথচ তানিয়া একটু কাছে আসলেই তো দূরে চলে যায় শ্রাবণ।
এসব ভেবে শ্রাবণের পিছনে পিছনে হাঁটতে লাগলো তানিয়া ।তবে চোখ জোড়া নিবদ্ধ শুধু দুজনে ধরে রাখা হাত টির দিকে।এদিকে শ্রাবণ অবাক হয়ে তাকিয়ে রইল মেঘলার দিকে ।ওর হাতটি ধরে টেনে নিয়ে যাচ্ছে এত ভালো লাগছে কেন ?কেনো এতো ভীষণ ভালো লাগছে শ্রাবণের? হৃদয়ে দোলা লাগছে কেন শ্রাবণের শ্রাবণ জানে না।
প্রথমে নৌকায় উঠলো সিয়াম ।রাফিকে উঠালো এরপর লামিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দিল সিয়াম লামিয়া লজ্জায় কুকড়ে গেল হাত দিবে কি দিবে না ভাবছে তারপর কাঁপাকাঁপা হাতি তুলে দিল সিয়ামের হাতে। লামিয়ার হাত ধরতেই সিয়ামের যেন কেমন অনুভুত হল হৃদয়ে। সময় যেন থমকে গেল ।নৌকা দুলুনির চেয়েও বেশি যেন দুলে উঠলো সিয়ামের হৃদয়। ভিতরে মনে হয় কত শত কম্পন উঠলো সিয়ামের হৃদয়ে।
লামিয়ারও বুকে যেনো খুশির দোলা লাগলো।
শ্রাবণ তানিয়া মেঘলা সবার পরে আসছে ।তাই শ্রাবন আগে উঠেই তানিয়াকে ধরে উঠালো ।তানিয়া এর আগে কখনো এরকম নৌকায় চড়েনি তাই ভয়ে ভয়ে এক পা দু পা করে এগিয়ে গেল নৌকার একটি নিরাপদ স্থানে ।যেখানে বসলে ভয় পাবে না তানিয়া ।
এদিকে মেঘলা উঠতে পারছে না তাই শ্রাবণ হাত বাড়িয়ে দিল মেঘলার দিকে।মেঘলা শ্রাবণের হাত ধরে নৌকাতে উঠলো। তবে উঠতে গিয়ে পায়ের একটু ব্যালেন্স হারিয়ে একটু ঝুঁকে পড়লো শ্রাবণের বুকে।বুকের সাথে ধাক্কা খেলো মেঘলা।মেঘলা নাকে একটু ব্যথা পেয়েছে তাই শ্রাবণ সাথে সাথে মেঘলা কে বললো,” কোথায় ব্যথা পেয়েছিস?”
মেঘলা নিজের নাকে হাত দিয়ে বললো,” না কোথাও ব্যথা পাইনি ।বলেই ধীরে ধীরে এগিয়ে গেল ।একটু সামনে বসলো ।শ্রাবণ বললো মাঝির ঠিক অপজিটে উঁচু অংশতে।
নদীর ঢেউয়ের ঢেউয়ে নৌকা ছলাৎ ছলাৎ শব্দে এগিয়ে চলছে ।মৃদুমন্দ বাতাস চলছে সাথে শান্ত স্নিগ্ধ ঢেউ ।মৃদু বাতাসে উড়ছে সামনে মেঘলার খোলা চুল।মাঝির গানে গানে সময় পার হয়ে গেলো কেও বলতে পারবে না। চুলগুলো বারবার টানছে শ্রাবণ কে ।শ্রাবণের দৃষ্টি সেই মেঘ কালো চুলের দিকে।
কিছুক্ষণ এভাবে তাকিয়ে থেকে শ্রাবণ মাথা নিচু করে ফেলল ।
সন্ধ্যা হওয়ার আগেই নৌকা তীরে ভেড়াতে বললো শ্রাবণ ।
আধা ঘন্টার মধ্যে নৌকা তীরে ভিড়িয়ে সবাইকে ধীরে ধীরে নামতে বলল নৌকার মাঝি।
আজকের মতো ঘোরাঘুরি পর্ব শেষ করে বাড়িতে চলে আসলো সবাই ।দরজার সামনে দাঁড়িয়ে পরল শ্রাবণ ।হঠাৎ মনে হলো পকেটে হাত দিয়ে সিগারেটের প্যাকেট খালি ।সিগারেট নেই তার মানে একটু সামনে হেঁটে গিয়ে দোকান থেকে সি*গারেট নিয়ে আসতে হবে ।তাই সিয়ামকে ডাকলো সবাই ভিতরে চলে গেল সিয়াম ।সিয়াম দরজায় এসে দাড়িয়ে বললো,” ভাইয়া ডেকেছো ?”
“হুম আমার সাথে একটু মোড়ের দোকানে আয়।সি*গারেট ও কিছু শুকনো খাবার আনতে যাব ।”
সিয়াম বললো,” আচ্ছা ঠিক আছে চলো ।”দুইজন হেঁটে হেঁটে চলে যাচ্ছে দোকানের কাছে ।সিয়ামের মনে অজানা অনেক প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে ।তাকিয়ে রইল শ্রাবণের দিকে ।মনে মনে ভাবছে বিয়ে করে মানবে না যখন তখন ৬ বছর আগে বিয়ে করেছিল কেন? প্রশ্নটা হাজারবার সিয়ামের মাথায় ঘুরে কিন্তু প্রশ্ন করতে সাহস পায় না ।তাই আজ কি মনে করে যেন শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বলল,” ভাইয়া একটা প্রশ্ন করব উত্তর দিবে?”
শ্রাবণ থেমে গেল ।বলল,” কি প্রশ্ন ?”
সিয়াম কোন ভূমিকা করলো না । বললো,” আচ্ছা মেঘলাকে যখন স্ত্রী হিসেবে মানবে না স্বীকৃতি দিবেনা বা এই বিয়েটাও তুমি চাচ্ছ না তাহলে ছয় বছর আগে বিয়ে করেছিলে কেন? এমনিতেই আমেরিকা চলে যেতে তাহলে না হয় সেদিন অস্বীকার করে চলে যেতে ।বিয়েটা নাই করতে?”
সিয়ামের এ প্রশ্নে থমকে গেল শ্রাবণ ।সময় যেন থমকে গেল ।মনে পড়ল সেই ৬ বছর আগের ঘটনা ।দাদু সেবার খুব অসুস্থ হয়ে পড়েছিল। শ্বাস নিতে এতটাই কষ্ট হচ্ছিল মনে হচ্ছিল যে কোন সময় দম চলে যাবে এমন অবস্থা।
ওষুধ দিয়ে ডাক্তার দিয়ে কোনভাবেই কাজ হচ্ছিল না ।মেঘলা ওনার অনেক শখের অনেক প্রিয় নাতি ছিল ।মেঘলা দূরে কোথাও চলে যাবে অন্য কারো বাড়িতে এটা উনি মানতে পারছিল না ।শ্রাবণ ওনার প্রথম নাতি হিসেবে খুব প্রিয় ছিল তাই কি করে যেন উনি ভেবে ফেলেছিলেন শ্রাবনের সাথে মেঘলা কে বিয়ে দিবে তাহলে দুইটা প্রিয় জিনিস সব সময় একসাথে বাঁধা থাকবে।
এই ইচ্ছা থেকেই মেঘলা কে সেদিন বলেছিল শ্রাবণের সাথে বিয়ের কথা ।ছোট্ট মেঘলা সেটাকে সত্যি মনে করে শ্রাবণের সাথে বিয়ের কথা বলেছিল ।দাদি তার ছেলেদের কাছে বিয়ের কথা জানায় ছেলেরা মায়ের আবদার ফেলতে পারে না।
এদিকে মেঘলা গিয়ে দাদিকে এবং আব্বু ছোট আব্বু সবার সামনে বলে ফেলে শ্রাবণ ভাইয়া আমাকে বিয়ে করবে বলেছে ।এটা শুনে যেন কারো আর কোন সন্দেহ রইলো না। সাথে সাথে বিয়ে ঠিক করে ফেলে ।দাদী ও মৃ*ত্যু শয্যায় প্রায় যখন শ্রাবণকে বিয়ের কথা বলা হলো ।শ্রাবণ কয়েকবার অস্বীকার করেছিল অনেক ভাবে না করেছিল।
কিন্তু দাদি হাত ধরে বিছানায় মৃ*ত্যু শয্যায় থেকে যখন অনুরোধ করে বললো শ্রাবণ ফেলতে পারেনি ।তবে বাবা এবং ছোট আব্বুকে একা ডেকে নিয়ে বলেছিল এটা শুধু দাদিকে খুশি করার জন্য এই বিয়ে আমি মানি না এবং তোমরাও কখনো মেঘলা সাথে বিয়ে নিয়ে কিছু বলবে না ।আমি এই বিয়ে কখনোই মেনে নিব না।
দুই ভাই তখন হয়তো ভেবেছিল রাগের বসে বলছে পরে ঠিকই মেনে নিবে ।কিন্তু সেই যে শ্রাবণ অস্বীকার করে আমেরিকা চলে গেল বিয়ের পর তারপর আর কখনো মেঘলার কোন খোঁজ খবর নেয়নি ।এমনকি যতবার জিজ্ঞেস করা হয়েছে শ্রাবণ অস্বীকার করেছে এই বিয়েকে ।
তাই সাজ্জাদ খান ও আশা ছেড়ে দিয়েছেন এবং এই বিয়ে নিয়ে উনার আর কোন স্বপ্ন নেই ।সবাইকে জানিয়ে দিয়েছেন কেউ যেন কখনো মেঘলা কাছে কিছু না বলে ।মেঘলার কখনো বিয়ে হয়নি এটাই সত্য এটাই বাস্তবতা।যে কয়েকজন আমরা জানি তারা কখনোই মেঘলা এবং শ্রাবণের বিয়ের কথা তাদের সামনে তুলবো না।
হঠাৎ সিয়ামের ডাকে ঘোর কাটে শ্রাবণের ।চলে গিয়েছিল সেই ছয় বছর আগে স্মৃতিতে ।তারপর সিয়ামের দিকে তাকিয়ে রইল শ্রাবণ। কি বলবে বুঝতে পারছে না ।আসলেই ছেলেমানুষী করে ফেলেছিল শ্রাবণ ।মানবে না যখন অস্বীকার করে চলে যেতেই পারতো ।দাদি তো আর বেঁচে থাকেনি ওদের সুখ দেখার জন্য।
চলবে__
Share On:
TAGS: এক শ্রাবণ মেঘের দিনে, নীলা রহমান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১৫৬+১৫৭
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৯৯
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮০
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৭০
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৬৩
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৬
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৫
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৬৭
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১৩৩+১৩৪
-
এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ৩০+৩১