এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ২৭+২৮
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman #familytime
পর্ব ২৭
[আগেই দুঃখিত বলে নিলাম পর্ব টা খুব একটা বড় হবে না দুপুরে দাওয়াত ছিল তাই লিখতে পারিনি। কিন্তু রেসপন্স করবেন। পেইজে লাল বাতি জ্বলছে।]
শ্রাবন সামনের দিকে তাকিয়ে আছে ।তানিয়া পিছনে দাঁড়িয়ে নীরবতা ভেঙে বললো,” কি দেখছো এত মনোযোগ দিয়ে?”
শ্রাবণ বললো,” কই ?মনোযোগ দিয়ে কি দেখব ?এমনি দাঁড়িয়ে ছিলাম ।”
তানিয়া বললো,” না আমি এসেছি তারপরও তুমি আমার সাথে দুটো কথা বলছো না ,নিচের দিকে এখনো তাকিয়ে আছো ।এমন কি আছে ওখানে?”
শ্রাবণ বললো ,”তুমি বলো আমি শুনছি তো।আমি আর কি বলবো?”
তানিয়া বললো,”আজ বাদে কাল আমাদের বিয়ে হবে অথচ তুমি আমার সাথে বলার মতো কথা খুঁজে পাওনা?
অথচ নিজেই বলছো নিচে দেখার মত কিছু নেই ।তাহলে আমার দিকে ঘুরে কথা বলছো না কেন?”
শ্রাবণ একটু পিছনে ঘুরে তাকালো ।তাকিয়ে বললো,” আচ্ছা ঠিক আছে ।বলো কি বলবে ?”
তানিয়া বললো,” এমন নয় কোন মুখস্ত কথা শিখে এসেছি যেটা তুমি জানতে চাইলে উগরে দিব ।মানুষ মানুষের সাথে এমনিও কথা বলে।”
শ্রাবণ জানে তানিয়া যা বলছে তা ঠিক কিন্তু কেন যেন তানিয়ার সাথে কথা বলার মত কোন কমন টপিক খুঁজে পায় না শ্রাবণ।
শ্রাবণ কথার মাঝখানে আবারো আর চোখে উঠানের দিকে ।তাকালো মেঘলার দিকে।কাহিল সিয়ার শব্দে একটু পরপর শ্রাবণের ধ্যানভঙ্গ হচ্ছে ।শ্রাবণ আবার ওই দিকে মনোযোগ দিতেই তানিয়া বললো,” এমন কেন মনে হয় তোমার দৃষ্টি অন্য কিছু বলে ?”শ্রাবণ অবাক হয়ে তানিয়ার দিকে তাকালো । বললো,” অন্য কিছু বলতে কি বলতে চাচ্ছ?”
“যেন মনে হচ্ছে তুমি শুধু নিচের দিকে না পার্টিকুলার কোন একটা বিষয় দেখছ ।”বললো তানিয়া।শ্রাবণ মুচকি হেসে বললো,” আচ্ছা তাই নাকি ?তাহলে বল কি দেখছি?”
তানিয়া আর কোন রাক ঢাক রাখল না ।খোলামেলা কথা বলা প্রয়োজন তাই মুখ খুলেই বললো,” মেঘলা।”
মেঘলার নামটা শুনতেই শ্রাবণের বুকের মধ্যে যেন একটা হার্টবিট থমকে গেল ।তারপর মুচকি হেসে বললো,” মেঘলা ?দেখতেই পারি ও তো আমার……. থেমে গেল শ্রাবণ ।”
তানিয়া বললো,” হ্যাঁ ওতো তোমার কি ?”
শ্রাবণ বললো,” চাচাতো বোন দেখতেই পারি।”
তানিয়া বললো,” তাহলে এমন কেন মনে হয় তোমার দৃষ্টি অন্য কথা বলে ?তোমার দৃষ্টি ওকে চাচাতো বোনের নজরে দেখেনা ।এত অল্প বয়সি ছোট্ট একটা মেয়ে তার সাথে তোমার কত কথা হয় অথচ যার সাথে তোমার বিয়ে ঠিক হয়েছে তার সাথে তুমি কথা বলার জন্য কথা খুঁজে পাওনা।”
শ্রাবণ নিচের দিকে তাকালো ।কোন কথার উত্তর দিতে পারছে না ।কি উত্তর দিবে ?আমতা আমতা করে বললো,” আসলে ও তো ছোট ভুল টুল করে শাসন করি এটাই তোমার কথা মনে হয়।”
তানিয়া একটু হাসলো ।হেসে এগিয়ে এসে রেলিং এর কাছ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বললো,” আমিও তো কত ভুল করি ।কই আমাকে তো একটু শাসন করলে না ।এই যেমন সকাল বেলা উঁচু হিল পড়ে বাহিরে বের হলাম একবারও তো বললে না এই রাস্তাগুলোতে উচু হিল পড়ে যাওয়া যায় না।”
শ্রাবণ অবাক হয়ে গেল তাই তো ।খেয়াল করে নি। সত্যি শ্রাবন খেয়ালই করেনি তানিয়া কি জুতা পড়েছে।
শ্রাবণ মনে করার চেষ্টা করল মেঘলা কি পড়েছে ?কালো রঙের ড্রেস পড়েছিল ,কালো কালার একটা চাদর পড়া ছিল সাদা স্নিকার পড়া ছিল। অথচ অদ্ভুত তানিয়া উঁচু হিল পড়েছে সেটা শ্রাবণের খেয়াল নেই ।অর্থাৎ খেয়াল করে দেখেনি। কিছু একটা হচ্ছে শ্রাবণের মনের ভিতরে শ্রাবণ নিজেও বুঝতে পারছে না ।শ্রাবণ দেয়ালে পিঠ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে বললো,” আসলে কি বলতে চাচ্ছ তানিয়া খুলে বল।”
তানিয়া বললো,” আমার ভালো লাগছে না তুমি মেঘলা দিকে এতটা মনোযোগ দিয়ে তাকিয়ে থাকো বা ওর ছোট ছোট বিষয় তুমি খেয়াল রাখো ।চাচাতো বোন ঠিক আছে বোন আছে বোনের মত রাখো।
যেখানে আমার সাথে দুদিন পর তোমার বিয়ে হবে সেখানে তোমার মনোযোগের কেন্দ্রবিন্দু কি আমি বা আমাদের সম্পর্কটা হওয়া উচিত না?”
শ্রাবণ ঘুরে আবার সামনে উঠানের দিকে তাকালো ।মেঘলা ও লামিয়া খিলখিলিয়ে হাসছে আর একটা পর একটা কাহিল সিয়ায় পাড় দিচ্ছে।হঠাৎ করেই কেন যেন দৃশ্যটা খুব মনোমুগ্ধকর লাগছে শ্রাবনের কাছে ।শ্রাবণ যেন আবার হারিয়ে গেল দৃশ্যটির মাঝে ।
তাকিয়ে রইল এক দৃষ্টিতে। শ্রাবণের বয়স এখন ২৭ বছর চলে মেঘলা শ্রাবণ এর চেয়ে ১০-১১ বছরের ছোট ।১৬ শেষ হয়েছে বা চলছে মেঘলার ।পুরোপুরি এখনো জানেনা শ্রাবণ। মেঘলা ছোট বাচ্চা একটি মেয়ে বিশেষ করে শ্রাবণ যেখানে আমেরিকার মতো জায়গায় লেখাপড়া করে এসেছে ।
যেখানে সমবয়সীদের প্রেম ভালোবাসা বিয়ের সম্পর্ক দেখেছে সেখানে এত বাচ্চা ছোট একটি মেয়ে ওর বিয়ে করা বউ ভাবতে কেমন অবাক লাগছে ।সাথে সাথে অবচেতন মনেই কোন এক জায়গায় শিহরণ বয়ে যাচ্ছে শ্রাবণের।
শ্রাবণ তাকিয়ে আছে মেঘলার দিকে আর ভাবছে ,”শ্রাবণ চাইলেই এই মেয়েটা ওর বউ হতে পারতো !কিন্তু শ্রাবণ কখনো চাইনি ।কিন্তু ওদের বিয়েটা তো সত্য এটা অস্বীকার করার কোন উপায় নেই ।কারণ ডিভোর্স দিতে হবে মেঘলা কে।”
ডিভোর্সের কথা মনে আসতেই আবার তাকালো মেঘলা দিকে ।একবার ডিভোর্স হয়ে গেলে এই মেয়ের দিকে এভাবে চোখ তুলে তাকাবার অধিকার হারিয়ে ফেলবে শ্রাবণ। হারাবে জোর করার অধিকার হারাবে শাসন করার অধিকার ।
সবকিছুই হারিয়ে ফেলবে ।এখন তো শুধু চাচাতো বোন হিসেবে যে সম্পূর্ণ শাসন বা অধিকার আসে হয়তো তা নয় ।হয়তো অবচেতন মনে শ্রাবণ ওর উপরে অধিকার খাটায় কারণ ও জানে মেয়েটা ওর বিবাহিত স্ত্রী।
আর ভাবতে পারছে না শ্রাবণ ।চোখ বন্ধ করে ফেললো। নিজের সাথে নিজে যুদ্ধ করছে শ্রাবণ ।এদিকে ঢাকায় গিয়ে ডিভোর্সের প্রসেস শুরু করে ফেলতে হবে ।কিন্তু কেন বারবার এই চোখ দুটো মেঘলা দিকেই নিবদ্ধ হতে চায় ?বারবার মেঘলাকে দেখতে চায় ?মেঘলাকে শাসন করতে চায় নিয়ন্ত্রণ করতে চায়?ওর ভিতরের পুরুষ সত্ত্বা বার বার অধিকার করতে চায় নিয়ন্ত্রণ করতে চায়।
কেন মেঘলা ওড়না ছাড়া বাহিরে গেলো ওর বুকের ভিতরে খচখচ করে ।কেন মেঘলা কে অন্য কোন ছেলে দেখলে এমন কি নিজের আপন ভাই রাফি দেখলে পর্যন্ত ওর বুকের ভিতর কেমন যেন একটা অনুভূতি হয়?
আচ্ছা মেঘলা আর ওর ডিভোর্সের পর মেঘলার তো কোথাও বিয়ে হবে !এমনও তো হতে পারে রনির সাথে বিয়ে হবে ! ও দাওয়াত খেতে আসবে বড় ভাই হিসেবে দায়িত্ব পালন করবে ।ওর কি সেদিন মনে হবে না মেঘলা এর বিবাহিত স্ত্রী ছিল ?চাইলে ও মেঘলা কে পেতে পারতো? সংসার হতো।ছেলে মেয়ে হতো।
তানিয়া শ্রাবণের দিকে অদ্ভুতভাবে তাকিয়ে আছে ।শ্রাবণ এখনো চোখ বন্ধ করে ভাবছে ।নীরবতা ভেঙে তানিয়া বলে উঠলো ,”কি এত ভাবছো শ্রাবণ?”
শ্রাবণ অবচেতন মনে বললো,”ভাবছি নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে।”
তানিয়া আর জিজ্ঞেস করার সাহস পেল না সেই ভবিষ্যতে ভাবনার মধ্যে কোথাও কি তানিয়াকে দেখছে কিনা ?কারণ তানিয়া না শুনতে চায় না ।যত দ্রুত সম্ভব বিয়েটা করে ফেলতে হবে ।৩-৪ বছর ধরে শ্রাবণকে ভালোবেসে এসেছে তানিয়া যদিও শ্রাবণ বাসে নি কিন্তু বিয়ের জন্য রাজি তো হয়েছে এতেই চলবে।
শ্রাবণ চোখ বন্ধ রেখে ভাবল যদি রনির সাথে মেঘলার বিয়ে হয় কেমন হবে ?সাথে সাথে চোখ জোড়া খুলে ফেললো শ্রাবণ ।মেঘলাকে বধু সাজে লাল টুকটুকে শাড়ি পরা রনির পাশে কোনভাবে সহ্য করতে পারেনি শ্রাবণ। চোখ খুলে সাথে সাথে তাকালো আবার মেঘলা দিকে। হাসছে খিলখিলিয়ে ।
হাসছে ও টোল পড়া গালের দিকে তাকিয়ে আছে শ্রাবণ। মেঘলার টোল পড়া গালে রনি ছুঁয়ে দেয় ।রনি কেন ছুঁয়ে দিবে ?বিষয়টি ভাবতেই হাত দুটো মুষ্টিবদ্ধ হলো শ্রাবণের ।ওর টোল-পড়া গালে রনি কেন ছুঁয়ে দিবে ?রনির কোন অধিকার নেই।
এদিকে একদিকে চালের গুঁড়ি কুটা হচ্ছে আরেক দিকে পিঠাপুলি বানানো শুরু হয়ে গেছে ।গ্রামে এরকমই সব কাজ একসাথে চলে ।এগারোটা নাগাদ মোটামুটি কয়েকটি পিঠা তৈরি করা হয়ে গিয়েছে ।এক এক চুলায় একেক ধরনের পিঠা তৈরি করা হচ্ছিল ।নিচে থেকে আসমা বেগম সবাইকে ডাক দিলেন বাচ্চা পার্টিদের।
সাথে শহিদুল খান এবং সাজ্জাদ খানকেও ডেকে পাঠালেন ।সবাই উঠানে একসাথে বসলো ।একসাথে পাটি বিছিয়ে রোদের নিচে বসে ধোঁয়া ওঠা গরম পিঠা খাবে এর মজাই আলাদা ।এই দৃশ্য কখনো শহরে অনুভব করা যায় না ।একদিকে চুলায় পিঠা হচ্ছে আরেক দিকে গরম গরম পিঠা উঠছে।সাথে সাথে প্লেটে আবার সার্ভ করা হচ্ছে।
আসমা বেগম ও সাবিহা সুলতানা একটা একটা করে পিঠা বানাচ্ছে ।লামিয়া ও মেঘলা সবাইকে সব ধরনের পিঠা সার্ভ করছে ।পাশের বাড়ির যে দুজন চাচী এসেছিল তাদের বাচ্চারাও একই সাথে বসেছে।
সবাইকে পিঠা সার্ভ করতে করতে লামিয়া যখন পিঠার সার্ভ করছে সিয়াম কে সিয়াম একনজর তাকালো লামিয়ার দিকে ।লামিয়া টাকালো সিয়ামের দিকে ।লামিয়া হালকা একটু মুচকি হাসলো ।সিয়াম জানে এই হাসির অর্থ কি ?
কিন্তু যত ইগনোর করতে চাচ্ছে মেয়েটাকে মেয়েটা ততই ওর মগজে যেন জেকে বসছে ।আজকাল সিয়ামের একা থাকলেও মাঝেমধ্যে লামিয়াকে মনে পড়ে। কিন্তু ভুলেও লামিয়া কে পাত্তা দেয় না ।তেমন একটা কথা বলে না ।
যা হয়েছে মেঘলা ও শ্রাবণ ভাইয়ের এই ধরনের কোন সিচুয়েশনে পুনরাবৃত্তি চাই না ।ব্যাপারটাকে এখানেই শেষ করতে চায় সিয়াম।
এদিকে রাফিকে পিঠাটা দিয়েই মেঘলা পিঠাটা দুই ভাগে ভাগ করে দিল বললো,” এখানে এভাবে দুই ভাগে ভাগ করে রাখলে ভিতর থেকে গরম ধোঁয়া বের হয়ে যাবে পিঠা ধীরে ধীরে ঠান্ডা হবে ।তুমি খেতে পারবে ।”
রাফি মুগ্ধ হয়ে শুনল মেঘলার কথা ।মেঘলার সব কথাই বড্ড ভালো লাগে আজকাল রাফির কাছে।
এদিকে শ্রাবণ এক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে ।রাফি ও মেঘলার খুনসুটি দেখে আজকাল কেমন হীনমন্যতায় ভুগছে শ্রাবণ ।রাফি ও মুগ্ধ নজরে যদি মেঘলা দিকে তাকায় রাফিকেও মাঝে মাঝে অসহ্য লাগছে ওর ।যদিও বাচ্চা ছেলে। যেমন এই মুহূর্তে লাগছে ।একটা পিঠাও কি নিজে ভেঙে খেতে পারে না ?
১২ বছর তো কম নয় ।১২ বছর বয়সে তো কত কিছুই করেছিল শ্রাবণ অথচ রাফি পিঠাও ভেঙে খেতে পারে না ।আর এই ন্যাকা মেয়ে টাও বুঝে না ।দেখতেছে রাফি মুগ্ধ হয়ে ওর দিকে তাকিয়ে থাকে তারপরও ছেলেটাকে লাইক দিয়ে যাচ্ছে।
সাথে দুষ্টুমি করে খুনসুটি করে ।মেঘলা চলে আসলো শ্রাবণ এর কাছে ।শ্রাবণকে যেই পিঠা দিবে অমনি বাইরে স্কুটির শব্দ শুনতে পেল ।দেখল সকাল সকাল রনি এসে হাজির ।রনি এসে সবাইকে সালাম দিয়ে বললো,” চাচি মা দেরি করে ফেললাম।”
সাথে সাথে সাবিহা সুলতানা বললো,” না না বাবা দেরি হয়নি ।তোমাকে তো আমি বলেই দিয়েছিলাম আসতে। আস্তে আস্তে এসে বসে পড়ো ।মাত্রই খাওয়া শুরু করেছে সবাই।”
শ্রাবণের চোয়াল শক্ত হলো ।আবার রনি ! রনি কেন এখানে এসেছে ?তারপর তাকালো মেঘলা দিকে ।দেখল মেঘলা রনি দিকে তাকিয়ে হাসলো।
তারপর শ্রাবণের দিকে তাকিয়ে বললো,”ভাইয়া কোন পিঠাটা আগে দিব ?”
শ্রাবণ বিরক্ত হয়ে বললো,” যেটা ইচ্ছা সেটা দে।”
মেঘলা একটি ভাপা পিঠা উঠিয়ে শ্রাবণের প্লেটে দিয়ে বললো,” এটা খান মিষ্টি মিষ্টি খেজুর গুড়ের গন্ধ পাবেন ।খুব মজা লাগবে ।”
বলেই হাত দিয়ে পিঠাটা ভেঙে দিয়ে বললো,” ভেঙে দিলাম এখন দেখবেন তাড়াতাড়ি ঠান্ডা হয়ে যাবে।”
বলেই যেই রনির কাছে যাবে ওমনি আবার বললো,” দাড়া এক মিনিট ।তোর বাটিতে ওই পিঠা টা কি?” মেঘলা বললো ,”ও এটা এটা চিতই পিঠা ।”
শ্রাবণ বললো,”হলো এটা ও ভেঙে দে।”
মেঘলা পিঠা শ্রাবণের প্লেটে দিয়ে ভেঙে দিয়ে আবার যেই সামনের দিকে যাবে অমনি আবার শ্রাবণ বললো,” দাড়া ওই পিঠাটা কি ?”
মেঘলা বললো,” এটা তেলের পিঠা। “
শ্রাবণ বিরক্ত ।খুব বিরক্ত ।তাই বললো,”এটাও ভেঙে দে।”
বাধ্য হয়ে মেঘলা এই পিঠাটাও ভেঙে দিয়ে বললো,” এবার তিনটা পিঠা দিয়েছি ।হয়েছে ।আগে এগুলো খাওয়া শেষ করেন তারপর আমি আবার নিয়ে আসছি ।”
বলেই রনির দিকে এগিয়ে গিয়ে একটি একটি করে পিঠা প্লেটে দিতে লাগলো মেঘলা।
এই দৃশ্যটি মোটেও ভালো লাগছে না দুই জোড়া র*ক্তচক্ষুর ।রাফি এবং শ্রাবণের ।দুই ভাই পাশাপাশি বসে আছে এবং দুজনেরই নজর মেঘলা ও রনির দিকে।
চলবে__
একশ্রাবণমেঘের_দিনে
neela_rahman #familytime #Romance
পর্ব ২৮
একে একে সবার পিঠা খাওয়া শেষ হল ।কিছুক্ষণ গল্প স্বল্প হল ।এদিকে শ্রাবণ আর চোখে বারবার তাকাচ্ছে ।মেঘলা একটু পরপর রনির কাছে যাচ্ছে গিয়ে জিজ্ঞেস করছে কিছু লাগবে কিনা।
বারবার মেঘলাকে কেন গিয়ে জিজ্ঞেস করতে হবে ?এবাড়ির আরো মানুষ আছে সিয়াম আছে সিয়াম গিয়ে তো জিজ্ঞেস করতে পারে।কিন্তু না এই মেয়েটাই বারবার গিয়ে জিজ্ঞেস করবে ।মেজাজ ধীরে ধীরে গরম হচ্ছে শ্রাবণের। কিন্তু কোন কিছু প্রকাশ করছে না ।কপাল এই ঠান্ডার মধ্যে ও ঘামছে।রনি উঠে সবার কাছ থেকে বিদায় নেওয়া উদ্দেশ্যে বললো,” চাচি মা তাহলে আজকে যাই আবার পরে এক সময় আসবো।”
“পরে এক সময় আসবে মানে ?আজকে আরো কিছুক্ষণ থেকে যাও ।গল্প করে যাও ।দুপুরে হাসের মাংস দিয়ে চিতই পিঠা ছিট পিঠা বানাবো খেয়ে যাও।”বললো সাবিহা সুলতানা।
“হ্যা খেয়ে যাও।আমরা তো দুদিন পর চলে যাব তাই না লামিয়া আপু ?বললো মেঘলা।
লামিয়া ওর সাথে সাথে বললো,” হ্যাঁ হ্যাঁ রনি কিছুক্ষণ থেকে যাও ।আমরা চলে গেলে তো আবার কবে না কবে দেখা হবে ঠিক নেই।তাই আরো কিছুক্ষণ থেকে গল্প করে যাও।”
রনি বললো,” ঠিক আছে তোমরা সবাই যখন বলছ তাহলে আরো কিছুক্ষন থেকে যাই ।”
কথাটা শুনেই সাথে সাথে রাফির মুড অফ হয়ে গেল।
রাফি মন খারাপ নিয়ে ধীরে ধীরে এগিয়ে এসে শ্রাবণের পাশে চেয়ারটাতে বসে পড়ল ।রাফির মন খারাপ দেখে শ্রাবণ বললো ,”কিরে মুখ টা প্যাঁচার মতো করে রেখেছিস কেন?”
রাফি শ্রাবণের দিকে অসহায়ের দৃষ্টি দিয়ে তাকিয়ে বললো,” আমার খুব ভয় হচ্ছে ভাইয়া ।”
শ্রাবণ অবাক হয়ে বললো,”ভয় ?কিসের ভয় ?”
রাফি একটু এদিক ওদিক তাকিয়ে শ্রাবণে কানে কানে বললো,” মেঘলা কে হারিয়ে ফেলার ভয়।”
শ্রাবণ চোখ দুটো সরু করে রাফির দিকে তাকিয়ে বললো,” মানে ?হারিয়ে ফেলার ভয় মানে ?”
রাফি আবার একটু কাছে ঘেঁষে বললো,” দেখছো না ?রনি কিভাবে কিভাবে যেন তাকায় মেঘলার দিকে ।আমার একটুও ভালো লাগেনা।
মেঘলা তো আমার তাই না ?মেঘলার দিকে কেন আরেকজন এইভাবে তাকাবে ?”
কথাটা শুনেই সাথে সাথে ভ্রু জোড়া কুঁচকে গেল শ্রাবণের ।মেঘলা ওর মানে ? কি শুরু হয়েছে এইসব ?একদিকে রনি অন্যদিকে রাফি এটা কি ?আর কোন মেয়ে খুঁজে পাইনি দুনিয়াতে ওরা?দুনিয়ার বুকে কি শুধু এই একটি মাত্র মেয়ে আছে মেঘলা ?সবার কেন মেঘলা কে নিয়ে টানাটানি করতে হবে ?
আর এদিকে পিচ্চি ১২ বছরের রাফি চার বছরে বড় মেঘলা সাথে ওর কি সম্পর্ক থাকতে পারে?
শ্রাবণ রাফিকে বললো,” লজ্জা করে না তোর ?মেঘলা তোর চাচাতো বোন আর তোর থেকে চার বছরের বড় ।কোথাও শুনেছিস চার পাঁচ বছরে বড় মেয়েদের প্রেমে পড়ে কেউ? তোর বয়স কত ?ফিডার ছেড়েছিস কবে ?এখনই প্রেমের কি বুঝিস তুই ?নাক টিপলে এখনো দুধ পড়ে ।এখনো মাকে ছাড়া ঘুমাতে পারিস না তাহলে?
ঠিকঠাক মত হিসু করে ঘুম না পারালে রাতে তো বিছানায় হিসু করে দিস তুই ।আবার মেঘলাকে পছন্দ করিস বয়স হয়েছে তোর পছন্দ করার?”
রাফি মনে মনে ভাবল ,”কোন সম্মান পেল না তাও নিজের আপন বড় ভাইয়ের কাছে ।আসলো মেঘলাকে নিয়ে একটু দুঃখ প্রকাশ করতে কই বড় ভাই ছোট ভাইকে সান্ত্বনা দিবে তা না বলছে নাক টিপলে দুধ পরে বিছানায় হিসু করে।এগুলো যদি মেঘলা শুনতে পায় মেঘলা কি কখনো ভালোবাসবে ওকে?”
তাই চুপচাপ সামনের দিকে তাকিয়ে রইল ।এদিকে শ্রাবণেরও মেজাজটা গরম হচ্ছে কেন যেন ।মনে মনে আফসোস হচ্ছে ছোট ভাইকে কতগুলো কথা শুনিয়ে দিল ।কিন্তু শোনাতে হতো বড্ড পেকেছে ছেলেটা ।এটা কি ওর প্রেমের বয়স ?মাত্র সিক্সে উঠলো এখনো দাঁত সবগুলো পড়েনি এখনই বড় ভাইয়ের কাছে এসে বড় ভাইয়ের বউকে ই প্রেমের প্রস্তাব দিচ্ছে?ভাবা যায়?”
সবাই বসে ছাদে আড্ডা মা*রছে ।দুপুর পার হয়ে গিয়েছে। পিঠার সাথে হাঁসের মাংস ঝোল রান্না করেছিল ।রনি আজ সারাদিনের মেহমান। দুপুরে চিতে পিঠা দিয়ে হাঁসের মাংস খেয়েছে খেয়ে সবাই ।সাথে সিট পিঠা।একটু ছাদে বসেছে গল্প করার জন্য ।এদিকে শ্রাবণ নিজের রুমেই শুয়ে আছে ।তবে দরজা খোলা ।বিছানা থেকেই ওদের আড্ডা জায়গাটা দেখা যাচ্ছে এবং প্রত্যেকটি কথা ওর কানে আসছে।
তানিয়া আড্ডায় অংশগ্রহণ না করলেও কিছুক্ষণ পর ধীরে ধীরে ছাদের উদ্দেশ্যে এসে দেখলো ছাদে রাফি সিয়াম লামিয়া মেঘলা রনি থাকলেও শ্রাবণ নেই ।শ্রাবণ নিজের রুমে।
তানিয়া যেয়ে ছাদে সবার সাথে বসল ।কথা না বললে ও সবার কথা শুনতে থাকলো ।একচুয়ালি তানিয়া দেখতে চাচ্ছে শ্রাবণ এসে এখানে অংশগ্রহণ করে কিনা ?কিন্তু না দেখলে শ্রাবণ বাইরে আসেনি। তানিয়া একটু ধাতস্থ হলো।
অনেকক্ষণ এভাবে আড্ডা মা*রা হয়ে গেলে সবাই বললো,” এখন যাওয়া উচিত ।প্রায় সন্ধ্যা হয়ে আসছে ।”
রনির বাসাটাও একটু দূরে ।তাই রনি বললো ,”আর থাকা যাবে না ।বাসায় রাগ করবে দেরি হলে।আজ চলে যাচ্ছি ।”বলেই সবার কাছ থেকে বিদায় নিয়ে রনি নেমে গেল।
সাথে সাথে সবাই নেমে গেল ।মেঘলা ও নেমে গেল।
আসমা বেগম এর কাছে শ্রাবণ ফোন করে কফি চেয়েছিল ।মেঘলার কাছে বা অন্য কারো কাছে চায়নি ।মেজাজ খুব গরম ছিল শ্রাবণের তাই কারো সাথে কথা বলার ইচ্ছা ছিল না।
এদিকে আসমা বেগম কফি তৈরি করে বারান্দার আসতেই মেঘলাকে দেখতে পেল ।মেঘলাকে দেখেই ওনার মাথায় বুদ্ধি আসলো মেঘলাকে দিয়েই কেন কফি উপরে পাঠিয়ে দিক না?বারবার আশেপাশে মেঘলা কে দেখলে হয়তো বা শ্রাবণের ইচ্ছা ঘুরেও যেতে পারে ।মানুষ চোখের সামনে একটা জিনিস বারবার দেখলে তার প্রতি মোহ মায়া জন্ম নেয়। সেখানে মেঘলা তো অনেক মায়াবী একটি মেয়ে আর তাছাড়া মেঘলা কোন সাধারণ মেয়ে নয় শ্রাবণের বিয়ে করা বউ ।মেঘলাকে দেখলে অবশ্যই শ্রাবণ একটু হলেও মায়া হবে।শত হলেও বউ।
তাই মেঘলা কে ডাক দিয়ে বললো,” যা তো মা শ্রাবণকে উপরে কফি টা দিয়ে আয়।”
মেঘলার যাওয়ার একটু ইচ্ছা ছিল না কিন্তু বড় আম্মুর মুখের উপরে না করতে পারবে না ।তাই চুপচাপ মেনে নিয়ে কফি নিয়ে ধীরে ধীরে এগোতে লাগলো চিলেকোঠার রুমের দিকে।
দরজার কাছে আসতেই মেঘলা দাড়িয়ে গেল ।তানিয়ার বলা কথাগুলো বারবার মনে পড়তে লাগলো ।কিন্তু বারবার সিচুয়েশন এমন হয় চাইলেও দূরত্ব বজায় রাখা যাচ্ছে না ।একতো চাচাতো ভাই তার উপর এক বাড়িতে থাকে চাইলে কি এইরকম দূরত্ব বজায় রাখা যায়?
দরজা নক করতেই শ্রাবণ বললো,” দরজা খোলা ভিতর আয় ।”
মেঘলা কফি নিয়ে ভিতরে আসতে শ্রাবণ মেঘলার হাত থেকে কফিটি নিল ।তাকালো মেঘলা দিকে ।তারপর বললো,” রনির সাথে এত কিসের কথা তোর?”
মেঘলা অবাক হয়ে গেল । বললো,” কই এত কথা বললাম ?শুধু তো একটু বসতে বলেছি। আর এটাতো ভদ্রতা ।মেহমান এলে তার সাথে কথা বলতে হবে না ?তাকে বসতে বলতে হবে না?”
শ্রাবণ বললো,” মুখে মুখে তর্ক করবি না ।আমরা বড়রা আছি ভদ্রতা দেখানোর জন্য ।ওকে বসতে বলার হলে খেতে বলার হলে আমরা বলব তুই কেন এগিয়ে বারবার সামনে যাস?”
মেঘলা বললো,” আশ্চর্য ও আমার ছোটবেলার বন্ধু ।আমি সামনে যাবো না ?আমি না গেলে কে যাবে?”
“তোকে আগেও বলেছি মেঘলা বাড়ির মেয়েদের আমি বাহিরের কোন ছেলেদের সাথে এত কথা বলা পছন্দ করি না। কথা শুনিস না কেন আমার ?আমি যে তোর বড় ভাই একটি কথা বলছি সে কথা তুই শুনতে পারছিস না কেন? দ্বিতীয়বার কখনো যেন বাড়ি মুরুব্বীদের উপরে আগবাড়িয়ে কথা বলতে না দেখি ।মনে থাকবে? এবার যা নিচে যা।”বললো শ্রাবণ।
মেঘলা আশ্চর্য হয়ে গেল ।সবাই কেন বারবার ওকে বুঝায় কি করতে হবে কি করতে হবে না ?কার সাথে কথা বলতে হবে কার সাথে মিশতে হবে ?মেঘলা কি নিজস্ব কোন মতামত নেই ?কিন্তু মেঘলা মুখে কোন কথা না বলে চুপচাপ রুম থেকে বের হয়ে গেল।
শ্রাবণ এদিকে রাগে ফুঁসতে লাগলো ।এই মেয়েকে ডানে যেতে বললে বায়ে যায় বায়ে যেতে বললে ডানে যায় ।কখনোই কোন কথা শুনতে চায় না শ্রাবণের। ইচ্ছে করছে চাপকে দু*ধদাঁত গুলো ফেলে দিতে।
পর দিন সকালে সবাই চিতই পিঠা দুধ ও গুড়ের ভেজানো দিয়ে নাস্তা করছিল। এমন সময় সাবিহা সুলতানা বললেন ,”আজকে দুপুরে রান্না-বান্না করবো না ।দাওয়াত আছে আমাদের পাশের গ্রামের ।”
শ্রাবণ কিছু না জেনে জিজ্ঞেস করলো,” কাদের বাড়িতে দাওয়াত ছোট আম্মু ?”
সাবিহা সুলতানা বললেন ,”রনিদের বাড়িতে ।কাল দাওয়াত দিতে এসেছিল আমার কাছে দাওয়াত দিয়ে গেছে।”
বলেই সাবিহা সুলতানা ভিতরে চলে গেলেন ।শ্রাবণ চুপচাপ খাওয়া শেষ করে নিলো। খাওয়া শেষ করে হাত ধুতে ধুতে মেঘলার দিকে তাকিয়ে আস্তে করে বললো,” রনিদের বাড়িতে দাওয়াত আগে বলিস নি কেন?”
মেঘলা আশ্চর্য হয়ে যাচ্ছে । বললো,” এতে আগে বলার কি আছে ?সবাইকে দাওয়াত দিয়েছে।সবাই যাবে ।তাই আলাদা আলাদা করে কাউকে বলতে হবে নাকি?”
শ্রাবণ মেঘলা দিকে তাকিয়ে বললো,”তুই নিশ্চয় অনেক খুশি হয়েছিস ওদের বাড়িতে এখন দাওয়াত খেতে যাবি তাই?”
মেঘলা আশ্চর্য হয়ে গেল । বললো,” এতে খুশির কি আছে ?আর দুঃখিত হওয়ার ই বা কি আছে?”
শ্রাবণ বললো,” দেখে তো মনে হচ্ছে অনেক খুশি।”
মেঘলা চুপ হয়ে গেল ।উত্তর দেওয়ার মতো কোন ভাষা খুঁজে পেল না।চেয়ে রইলো শ্রাবণের চোখের দিকে।
চলবে_
Share On:
TAGS: এক শ্রাবণ মেঘের দিনে, নীলা রহমান
CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৬১
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১১১+১১২
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১০১+১০২
-
এক শ্রাবণ মেঘের দিনে পর্ব ৪+৫
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ৪৩
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৯
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৫০
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১১৩
-
সুখময় যন্ত্রনা তুমি পর্ব ১০৩
-
সুখময় যন্ত্রণা তুমি পর্ব ৮৮