Golpo romantic golpo উড়াল মেঘের ভেলায়

উড়াল মেঘের ভেলায় পর্ব ২২


উড়াল মেঘের ভেলায়

লেখনীতে— #ঝিলিক_মল্লিক

পর্ব_২২

[কপি করা কঠোরভাবে নিষিদ্ধ।]

আভিয়ান আরেকবার কাছে এগোতেই রানিয়া হঠাৎ ওকে জোরেসোরে এক ধাক্কা দিলো। আচমকা ধাক্কা সামলাতে না পেরে আভিয়ান কয়েক পা পিছু সরে গেল। হঠাৎ কি হলো ওর! রানিয়ার দিকে বিস্মিত চোখে তাকিয়ে হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে রইলো। ওর কাছ থেকে এই মুহূর্তে এমন আচরণ আশা করেনি আভিয়ান। ভেবেছিল, ওর ফিরে আসার খুশিতে রানিয়া এগিয়ে এসে ওকে জড়িয়ে ধরবে উচ্ছ্বাসে। আনন্দিত হবে, উদযাপন করবে।
কিন্তু আভিয়ানের ধারণা ভুল প্রমাণিত হলো। রানিয়া সেকাজ না করে বরং আরো ওকে ধাক্কা দিয়ে দূরে সরিয়ে দিলো। জীবন-মরণ অবস্থা থেকে বেঁচে ফিরে এমন পরিস্থিতি কোনোভাবেই আশা করেনি আভিয়ান। মনে মনে কিছুটা রাগ হলো ওর। তবে এই মুহূর্তে সংবরণ করার যথাযথ চেষ্টা করলো ও।

রানিয়া আভিয়ানের দিকে একপল তাকালো। এরপর শক্ত মুখখানা ঘুরিয়ে নিলো অন্যদিকে। আভিয়ান প্রায় কয়েক মিনিট একদৃষ্টিতে রানিয়ার দিকে তাকিয়ে রইলো। হয়তো কোনোকিছু বলবে সেই আশায়। কিন্তু রানিয়া ব্যাপারটা অনুভব করতে পারলেও শুরুতে কিছু বললো না।
আবার কি একটা মনে করে কিছুক্ষণ পরেই পাশ ফিরে আভিয়ানের মুখ বরাবর আঙুল উঁচিয়ে ও রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে বললো,
— “আমার এবং আমার সন্তানের সাথে আপনার কোনোরকম কোনো যোগোযোগ বা পরিচয় থাকবে না। আমরা আপনাকে চিনি না, আপনিও আমাদের চিনবেন না আজকের পর থেকে। আমরা আপনার কাছে দূরের মানুষ হিসেবে আছি, আর সেভাবেই থাকবো। দূরে থাকবেন আমাদের কাছ থেকে।”

আভিয়ান সামনে এগোনোর চেষ্টা করে বললো, “দূরে থাকবো মানে? কেন দূরে থাকবো? তুমিও আমার। আর তোমার পেটে বড় হওয়া সন্তানও আমার। তাহলে কেন তোমাদের কাছ থেকে দূরে থাকতে হবে আমাকে?”

“খবরদার! এই সন্তান শুধুমাত্র আমার। আপনার নয়।”

“তাহলে এই সন্তানের বাবা কে? বলো আমাকে।”

“বাবা নেই ওর।”

“বাবা নেই মানে? তাহলে কি বাতাস লেগে ও তোমার পেটে চলে এসেছে? মাথা গেছে তোমার একেবারে? মেন্টাল অ্যাসাইলামে অ্যাডমিট করে দিয়ে আসবো?”

কথাটা শোনামাত্রই রানিয়া আবারও ক্ষেপলো। জোরে চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে বলতে লাগলো,
“মেন্টাল অ্যাসাইলামে দিয়ে আসবেন মানে? মেন্টাল অ্যাসাইলামে কেন? আমি পাগল? আপনার আমাকে দেখে পাগল মনে হয়? ওহ এখন তো মনে হবেই। আপনার উদ্দেশ্য পূরণ হয়ে গেছে না? যা চেয়েছেন, তা তো পেয়েই গেছেন। আমার দ্বারা যেসব উদ্দেশ্য হাসিল হওয়ার কথা, সেগুলো তো হয়েই গেছে। আপনার জেদ পূরণ হয়েছে। আমাকে শাস্তি দেওয়া শেষ তো! এখন আর আমাকে কেন লাগবে? এখন তো আমাকে পাগল-ই মনে হবে। বুঝতে পারছি আমি। সব বুঝতে পারছি।”

“কী বুঝতে পারছো? বলো আমাকে, আমিও শুনি একটু।”

রানিয়া বেড থেকে উঠতে গিয়েও উঠলো না। বেডে বসে থেকেই ফুঁসতে ফুঁসতে আভিয়ানের প্রশ্নের জবাবে বললো, “এতো কথা বলতে চাইছি না আপনার সাথে। আমাকে একা ছাড়ুন।”

“বলতে পারছো না কেন? জবাব দিতে কেন পারছো না? তর্কে না পারলে কথা বলতে চাইছি না, তাই না? বেয়াদব মেয়ে।”

আভিয়ান তখন রানিয়ার কাছাকাছি-ই। ওর দুই হাতের বাহু চেপে ধরে কাছে টেনে নিয়ে হিসহিসিয়ে বলছে কথাগুলো। রানিয়া আভিয়ানের রাগান্বিত চাহনি দেখেও দমলো না। বরং, আরো কিছুটা মুখ চড়িয়ে বললো, “ঠিক আছে। আমি বেয়াদব-ই ঠিক আছি। বেয়াদব বলেছেন না আমাকে? আরো করবো বেয়াদবি? কী করবেন? করে নেন।”

রানিয়া কথাগুলো বলতে বলতে আভিয়ানের শার্টের কলার টেনে ধরে গায়ের সবটুকু জোর খাটিয়ে অনবরত ধাক্কা দিতে লাগলো পেছনের দিকে। তবে ওর গায়ের জোর এই শক্ত-সামর্থ্য সামরিক অফিসারের নিকটে নিতান্তই তুচ্ছ ঠেকলো। আভিয়ান বোধহয় তাচ্ছিল্যের হাসি-ই দিলো ওর কান্ড দেখে। রানিয়ার সেটা চোখ এড়ালো না। এতে আরো বেশি ক্ষেপলো ও। আভিয়ানকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য জেদ চেপে বসলো মাথায়। ও এবার না পেরে কাঁদতে শুরু করলো। আভিয়ান ওর পিঠ আঁকড়ে ধরে নিজের সাথে জোর করে মিশিয়ে নিয়ে বললো, “ভেবেছিলাম আস্ত একটা গাধী। কিন্তু তুমি তো সাপ বেরোলে!”

“হ্যাঁ আমি সাপ। কালনাগিনী। কালনাগিনীর বিষ কেমন বিষাক্ত জানেন তো? ছোবল দিলে বাঁচতে পারবেন না। সোজা উপরে। এজন্য দূরে থাকুন আমার কাছ থেকে। আপনার মুখও দেখতে চাই না আমি। আর আমি মরে গেলেও আপনি আমার মুখ দেখবেন না। দেখা গেল, বাচ্চা জন্ম দিতে গিয়েই মারা গেলাম। স্বাভাবিক ব্যাপার।”

শেষোক্ত কথাটা কর্ণগুহরে প্রবেশ করা মাত্রই আভিয়ান ছিটকে দূরে সরিয়ে দিলো রানিয়াকে। ওর কাঁধে ধাক্কা দিতে দিতে বললো, “এই তুমি কী বললে? সাহস থাকলে আবারও বলো? কী হলো? বলছো না কেন? বলো!”

আভিয়ান শেষ পর্যন্ত চেঁচিয়ে উঠলো।

ওর চেঁচামেচিতে রানিয়া ঘাবড়ে গেল। কেঁপে উঠলো এবার। কিছুটা পিছু সরে গেল। আভিয়ান ভয়ঙ্কর মেজাজে আছে। চড়-থাপ্পড়ও বসিয়ে দিতে পারে। কোনো গ্যারান্টি নেই। আভিয়ান আঙুল উঁচিয়ে ওকে শাসিয়ে বললো, “তুই আসলেই একটা বেয়াদব। ফার্দার তোর মুখ থেকে যেন এসব মরা-টরার কথা শুনি না। মরা কি এতোই সোজা? আল্লাহ খারাপ মানুষদের দেরিতে তোলেন। চিন্তা করিস না। তুই এতো তাড়াতাড়ি মরবি না। আর এখন এই সময়ে প্রেগন্যান্ট মেয়েদের ঠিকমতো নামাজ-কালাম পরা উচিত, ইবাদত করা উচিত। নামাজ-কালাম এক ওয়াক্ত-ও পরিস? পরিস না তো মনে হয়। এসব না করে তুই এতো নেগেটিভিটি নিয়ে আছিস। বেয়াদব!”

আভিয়ান একরাশ চড়া মেজাজ নিয়ে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেল৷ রানিয়া ততক্ষণে বেডের সাথে সিঁটিয়ে গেছে। এতোক্ষণ মনে যেই তেজটা ছিল, সেটাও এখন একেবারে মিইয়ে গেছে। আভিয়ানের রাগের কাছে ওর এই তেজ টিকবে না স্বাভাবিক। রানিয়া বেডে বসেই শুনতে পেল, বাইরে দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আভিয়ান তার মা’কে বলছে, “মা, তোমার বৌমাকে দেখে রেখো। আর সময়মতো হসপিটাল থেকে নিয়ে এসো।”

ওদিকে রানিয়ার শাশুড়ি আশফি বেগম উদ্বিগ্ন হয়ে ছেলেকে জিজ্ঞাসা করছেন, “তা তুই কোথায় যাচ্ছিস?”

“একটা কাজ আছে। সেরে আসি। ফিরতে রাত হবে। আবার না-ও ফিরতে পারি। তাফসিরকে নিয়ে যাচ্ছি সাথে।”

আভিয়ান বোধহয় জবাবটা দিয়েই বেরিয়ে গেল। ওর গলার আওয়াজ আর শোনা গেল না। এদিকে রানিয়ার প্রচুর ওভার থিংকিং হচ্ছে। আভিয়ানের বলা সমস্ত রূঢ় কথা মনে পড়ে টপটপ করে চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পরতে লাগলো ওর।
.
.
রানিয়াকে নিয়ে বড়মামার বাসায় আসা হয়েছে যখন, তখন রাত দেড়টা বাজতে চলেছে প্রায়। ফোনটা বের করে একবার সময় দেখে নিয়েছে ও। এসেই ওকে ইকরাম ভাইদের ঘরে বসিয়ে রাখা হয়েছে। ইকরাম ভাইয়ের বউ শেফালি ভাবি ওকে বসিয়ে রেখে গিয়েছেন ওর জন্য রাতের খাবার আনতে। সেই দুপুরের পর থেকে আর কিছু পেটেই পরেনি ওর। তারওপর ও যে প্রেগন্যান্ট — এই খবর ইতিমধ্যেই সবাই পেয়ে গেছে৷ এজন্য স্বাভাবিকের তুলনায় রানিয়ার যত্ন-আত্তিটা তুলনামূলকভাবে বেড়ে গেছে। ওর শাশুড়ি তার বড়ভাইয়ের বৌমাকে বলে গিয়েছেন, যেন মনে করে রানিয়াকে রাতের খাবারটা খাইয়ে দেওয়া হয়।
শেফালি ভাবি সান্ধ্য-রাত্রে রান্না করা গোরুর মাংস গরম করা আর গরম চিনিগুড়া চালের ভাত নিয়ে আসলেন। রানিয়াকে মাছ, মাছের ঝোল এমনকি মাছের স্পর্শে থাকা কোনো তরকারি দেওয়া আপাতত নিষিদ্ধ করেছেন ওর শাশুড়ি। এতোদিনে আশফি বেগম বুঝে গিয়েছেন, কেন তার বৌমার মাছের গন্ধে বমি হতো। প্রেগন্যান্সির এই সময়কালে এমনই হয়। তাই আপাতত ওর মাছ খাওয়া বারণ।
রানিয়া খেতে বসার জন্য হাত ধুতেই ওর শাশুড়ি ঘরে প্রবেশ করলেন। রানিয়ার কাছে এগিয়ে এসে প্লেটটা নিজ হাতে তুলে নিয়ে বললেন— “তুমি হাত মুছে নাও। আমি খাইয়ে দিচ্ছি তোমাকে।”

রানিয়া দ্বিধান্বিত হলো। আশফি বেগম ব্যাপারটা খেয়াল করে মৃদু হেঁসে বললেন, “দ্বিধার কিছু নেই মা। শাশুড়িও মা হয়, যদি তুমি মনে করতে পারো। তাছাড়াও আগে খাইয়ে দেওয়া হয়নি, কারণ তখন তোমার অসুস্থতার কথা জানতাম না। কিন্তু এখন তো জানি। জেনেশুনে কেন তোমাকে আমি কষ্ট করতে দেবো বলো? কষ্ট করে নিজ হাতে খেতে হবে না। এখন থেকে শাশুড়ির হাতেই খেও।”

রানিয়ার দ্বিধা এবার পুরোপুরি কেটে গেল। ঠোঁটের কোণে সুক্ষ্ম হাসি ফুটে উঠলো ওর। ভদ্র মেয়ের মতো বসে চুপচাপ সবটুকু খাবার খেয়ে নিল। খাওয়া শেষ হতে ওর শাশুড়ি আলিশাকে ডেকে বললেন, কাঠের দোতলায় রানিয়া যেই ঘরে গতদিন ছিল, সেখানে ওকে দিয়ে আসতে।
খালামণির কথা শুনে আলিশা আর মাইশা রানিয়াকে সেখানে দিয়ে আসলো।
.
.
রাত প্রায় আড়াইটা বাজতে চললো। রানিয়ার চোখে এখনো অবধি একরত্তিও ঘুম নেই। ঘুমাবেই বা কিভাবে! যেই মানুষটা পাশে ঘুমিয়ে থাকলে স্বস্তি হয়, শান্তিতে ঘুমিয়ে থাকা যায়; সেই মানুষটাই তো নেই এখন। নিশ্চিন্তে ঘুমাতেও পারছে না রানিয়া। নানান রকমের চিন্তা-ভাবনা মাথায় আসছে। তা-ও অদ্ভুত সব ভাবনা। কোনোকিছুই ভালো ঠেকছে না ওর। ও উঠে কিছু সময় পায়চারি করলো। বসে থাকতে ভালো লাগছে না। কোমর কেমন যেন অবশ হয়ে আসছে। কনসিভ করার পর থেকেই এই সমস্যাটা প্রায় প্রতিনিয়ত হচ্ছে ওর। এরজন্য ডাক্তার দেখানো দরকার। আগামীকাল-ই শাশুড়িকে এই বিষয়ে বলবে বলে ঠিক করলো রানিয়া।
ওর রীতিমতো এখন বিরক্ত লাগছে। লোকটা এখনো আসছে না কেন! বলেছিল, ফিরতে অনেক রাত হতে পারে আবার না-ও ফিরতে পারে রাতে। তবুও রানিয়া অপেক্ষা করছে আভিয়ানের জন্য।
ঘড়িতে সময় দেখলো ও। ঘড়ির কাটা যখন তিনটার কাছাকাছি, ঠিক সেই সময়ে কাঠের দোতলার সমতল দরজার কড়া নড়ার শব্দ কানে আসলো রানিয়ার। ও সজাগ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো বাইরের দিকে। সেকেন্ড কিছু সময়ের ব্যবধানে আভিয়ান ঘরের মধ্যে প্রবেশ করলো। ওর আগমনে রানিয়ার কোনো ভ্রুক্ষেপ হলো না। আভিয়ান ভেতরে এসেই পরনের শার্টটা পাল্টে একটা কালো রঙের শার্ট পরলো। রানিয়ার দিকে না তাকিয়েই উষ্ণ স্বরে ওকে উদ্দেশ্য করে বললো, “কামিজ পাল্টে একটা শাড়ি পরে নাও।”

রানিয়া বিছানায় উঠে বসতে যাচ্ছিল। আভিয়ানের হঠাৎ এহেন কথা শুনে ভ্রু কুঁচকে ফেললো। পাশ ফিরে কৌতূহলী গলায় প্রশ্ন করলো — “শাড়ি কেন পরতে হবে?”

“একটা কাজ আছে তাই।”

“কী কাজ?”

“এখন বলা যাবে না। গেলেই দেখতে পাবে।”

“কোথায় যেতে হবে এখন এতো রাতে?”

“এক জায়গায়।”

“কোন জায়গা? নাম বলুন। নাহলে আমি যাব না।”

“বললাম তোহ্ এক জায়গায় যেতে হবে। নাম বলতে পারবো না এখন। গেলেই দেখতে পাবে।”

আভিয়ান কিছুটা ঝাঁঝালো গলায় কথাটা বলে উঠতেই রানিয়া চটজলদি ওর সামনে এসে দাঁড়ায়। বুকে দুই হাত গুঁজে রেখে শক্ত মুখ করে বলে, “সুন্দরভাবে না বললে আপনি কেন, এখন আপনার চৌদ্দগোষ্ঠী এসেও আমাকে এখান থেকে নড়াতে পারবে না। বুঝেছেন?”

আভিয়ান কিছু একটা ভেবে ভদ্রোচিতভাবে মাথা নাড়লো। এরপর আচনক রানিয়ার হাত মুঠোয় পুরে ওকে কাছে টেনে নিয়ে নরম গলায় বললো, “জান, প্লিজ এই ড্রেস চেঞ্জ করে একটা শাড়ি পরে নাও। তোমার হাসবেন্ড রিকোয়েস্ট করছে না? হাসবেন্ডের কথা না শুনলে পাপ হয়। কথা শুনো জান। ইমিডিয়েটলি রেডি হয়ে নাও।”

চলবে

নোটবার্তা: আর মাত্র একটা পর্ব আছে এই গল্পের। আর গল্পের প্রয়োজনেই কিছুটা বিরতিতে ছিলাম। আগামীকাল অথবা পরশু আরেকটা পর্ব পেয়ে যাবেন।

Share On:

TAGS: ,



CLICK HERE GO TO OUR HOME PAGE
Related Posts
 

0 Responses

Leave a Reply